অনুপম মণ্ডল >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতা লেখালেখির নেপথ্য-কথা

0
310

অনুপম মণ্ডল >> কবিতাগুচ্ছ ও কবিতা লেখালেখির নেপথ্য-কথা

কবিতা লেখার নেপথ্য কাহিনি >>

কখনও লিখবো, এমন কিছু ভাবিনি। আমি জীবনে অনেক কিছুই হতে চেয়েছি। কিন্তু লেখক হতে চাইনি কখনও।  তবে, পড়ার অভ্যাস ছিলো আমার। ঘণ্টার পর ঘণ্টা আমি বই নিয়ে কাটিয়ে দিতাম আমি।  আসলে আমি পরিবারের বাইরে কারোর সাথে মিশতে পারতাম না। ভার্সিটিতে ওঠার পরে টের পেলাম, আসলে আমার ভেতরে প্রতিভা বলে কিছুই নেই।  আমি জীবনকে বাজে খরচ করতে চাইনি। কিছু করতে চেয়েছিলাম। থার্ড ইয়ারে পড়ার সময়ে ভাবলাম গল্প লিখবো। কেননা আমার তখন প্রচুর গল্প পড়ার অভিজ্ঞতা ছিলো। কিন্তু বুঝিনি এ-পথ এতটা কঠিন। ওই সময়ই কবিতা লেখা শুরু করলাম। খুব গুরুত্ব দিইনি। কিন্তু দেখলাম কবিতা, পত্রিকায় প্রকাশিত হচ্ছে। তারপর থেকে ভাবলাম কবিতাই লেখা যাক তবে। আমি জানি এ-পথ আমার নয়। আমি যখন জীবনানন্দ দাশ পড়ি, গৌতম বসু বা সমর সেন পড়ি, তখনই কেবল বুঝতে পারি। এ-পথে চলার মতো প্রতিভা আমার নেই। ঝড়ে উড়ে উড়ে এঁটো পাতাটি যেভাবে তার অস্তিত্ব খুঁজে নিতে চায়, আমি সেভাবেই নিজের নিজের অস্তিত্ব, অসংখ্য ব্যর্থতা সমেত খুঁজে চলেছি মাত্র ।

কবিতাগুচ্ছ >>

ক্রন্দন থামিয়াছে

ক্রন্দন থামিয়াছে। ওই মৃত্তিকায় রথের চাকার দাগ, ওই রথের চাকার গায়ে মৃত্তিকার দাগ, বহুদূর থেকে অনুভব করা যায়। আলো কমিতেছে। এইখানে বায়ুসকল, অধিক মন্থর। বসুধা নীরব হইতেছেন। পথিকেরা নক্ষত্রমণ্ডলী দেখিয়া, দিক নির্ণয় করিতেছে। কিছু পরে, তাহাদের যাত্রার ধ্বনি ফুরাইবে। ওই অটুট নিদ্রাকে প্রণামের সময় বুঝি, আরো একবার আসিয়াছে। অদৃষ্টের প্রতি করজোড় লক্ষ করিয়া মাতা বলিতেছেন “তাহাদের কল্যাণ হউক”। কল্যাণ হউক। রাত্রি গভীর হইতেছে।

প্রেত

জঙ্গলে, কেটে ফেলা আন্দোলিত জিহ্বা থেকে, কতো অসংলগ্ন ধ্বনি উড়ে যায় দিগন্তের দিকে— আর আমি, চট বিছিয়ে ঘন, ছোপ ধরা দাঁতের প্রেতটিকে আহ্বান করি; তার স্কন্ধদেশে হাত রেখে বলি, তবে এখন গাত্রোত্থান করুন, অনেক দেরি হয়ে গেছে—

কিয়ৎক্ষণ বিলম্বে, অনন্ত রাত্রির তলে, গর্জন করতে গিয়ে, কেঁদে ওঠে নীহারিকা-শিশুটি।

 

ফেরা

দুই ধারে ঘন তালবীথি— আর মাঝখানে, জোনাকির আলোধোয়া এই পথ। কখনও ফেরার সময় হলে, আমরা এইখানে, এই পাকুড় গাছটির নিচে, কিছুক্ষণ দাঁড়াই।

তখন দিগন্তে, পঞ্চমীর চাঁদ ডুবিয়া গিয়েছে। পেঁচা ডাকছে দূর বনের মাথায়। মহুয়ার মলিন গন্ধটুকু হাওয়ায় হাওয়ায় গেঁথে রয়েছে।

 

ওই নিঝুম দিগন্তের পারে

ওই নিঝুম দিগন্তের পারে, সন্ধ্যার পটে রক্তিম সূর্যটা নিবে এলো প্রায়—তখনও ভোর বেলাকার নিঃসঙ্গ তারাটি, তালবীথির মাথার উপর ঝুঁকে রয়েছে—কত অগ্নিকেতন—কত কত অন্ধকারময়ি রাত্রির বৈভব—বকুলের শীর্ণ গাছটি বেয়ে, কী একটা শক্ত লতা উঠে গিয়েছে জানিনে—

বিকেলের শান্ত দীঘির পাড়ে, কতবার হেলে পড়েছে অধোশাখ পলাশের ছায়া—ওগো দেবতা, বাঁশবনের দীর্ঘ সারির ফাঁক দিয়ে কতো কতকাল, বুঝি সন্ধ্যা নেমেছে এই পথে—

ঝরনা শুকিয়ে গেলে

ঝরনা শুকিয়ে গেলে, সেই লাল কাঁকরের পথটির পাশে, আমাদের গল্প করবার মতো বিষণ্ণতা পৃথিবীতে আসে। দূরে, কি গম্ভীর নির্জনতার দিকে, খাড়া, নেমেছে লতারা। ঠিক অতটুকু চওড়া একটা নিবিড় অন্ধকার, মিড় থেকে খসে পড়া কোনো পুরনো গানের মতো, ঝরে পড়ছে ধীরে। ওই অনন্ত রাত্রির পারে, তাঁর, দীপখানি নিবে এলো প্রায়।

কুয়াশার বন

বহু পুরাতন কাঠের সাঁকোটি পেরিয়ে যেতে যেতে তার সাথে আলাপ হয়;

যে ধ্বনি— যে মুখ-নিঃসৃত বেদধ্বনি আর একবার নররূপধারী মনুষ্যকুলের জন্য

প্রস্তুত— আমরা কী তার ক্ষয়ে যাওয়ার প্রান্তে, হাঁটু গেড়ে বসে পড়বো—

দূরে নভোমণ্ডল প্রতিভাসিত হইতেছে—

মাতা

ঘন সিঁথির মতো বাঁকা পথটির মাথায় শ্মশানের মিহি আলো এসে পড়েছে— সম্মুখে ওই অতি ক্ষুদ্র নদী— দেখা যায়— ঘাটের ওপারে, অনঘ প্রতিমাখানি কিছু আগেই অস্ত গিয়েছে। বুঝিবা, পথশ্রান্ত, অর্ধশুষ্ক, তৃণাবৃত পা-দু’খানি তার।

শালপত্রের পাত্র হাতে এসেছে, এইখানে— সে— কোলের মধ্যে, অতি সন্তর্পণে, মাতা, যেরূপে সন্তান রক্ষা করিয়া চলে—