অমর মিত্র > ব্রেইলে লেখা বাক্যগুলি >> আখ্যান >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
243

ব্রেইলে লেখা বাক্যগুলি

জয়িত্রী সাংবাদিকতা পড়ছে। জয়িত্রী সেযান শহরে মার্কো পোলোর  গাইড। শহরের মেয়র তাকে এই দায়িত্ব দিয়েছে। জয়িত্রীর লাভ হয়েছে কম না। হাজার হাজার মাইল ঘুরে আসা ভেনিসীয় পর্যটক মার্কোর কাছে যে খবর পেয়ে যাচ্ছে, তা সে পাবে কোথায়? মেয়রের কথায় জয়িত্রী সব নোট রাখছে। সেযান টাইমস পত্রিকায় লিখবে গুছিয়ে নিয়ে। মেয়র তা বলেছেন। সেযান শহরের মানুষ জেনে নিক পৃথিবীর খবর, অদৃশ্য এক ঘাতক কীভাবে সব স্তব্ধ করে দিয়েছে। খবর দিচ্ছে খবরিয়া মার্কো পোলো যে কিনা লকডাউনের সময় ভেনিসের পথে যাত্রা করে ভেনিস ভেবে এই শহরে এসে পৌঁছেছে। মার্কো ভেনিস ভুলে গেছে। ১৭ বছর বয়সে ভেনিস থেকে বাবা নিকোলো পোলো এবং কাকা মেফিও পোলোর সঙ্গে সেই যে বেরিয়েছিল কনস্টান্টিনোপল জেরুজালেম আর্মেনিয়া, জর্জিয়া হয়ে এশিয়ার পথে, তারপর কী হলো মার্কোর মনে নেই। ১২৯৫-এ ২৪ বছর বাদে ভেনিসে ফিরেছিল যখন নিকোলো পোলো, মার্কোও ফিরেছিল তো। ফিরেছিল না ফিরছে সে। ক্রমাগত ফিরেই চলেছে নিজের শহরে অথবা এমন এক শহরে, পৃথিবীর মানুষ বলে তা মার্কোর শহর। মার্কো বলে, ঢাকাও তার শহর, কলকাতাও তার শহর, নিউইয়র্ক, সিডনি, লন্ডন, মাদ্রিদ, ভেনিস, মিলান… তারই শহর। লকডাউনের সময় পরবাসীরা নিজ গৃহে ফিরবে, তাই মার্কোও ফিরছে। দিল্লি, অমৃতসর, লাহোর, করাচি, কাবুল, সমরখন্দ, আস্তানা…। মার্কো জিজ্ঞেস করল, অ্যালেক্স সাড়া দিল?

কবে ফিরতে পারবে জানি না, একা একটা ঘরে বসে আছে, আচমকা বন্ধ হয়ে গেল যাওয়া আসা। জয়িত্রী বিষণ্ণ মুখে কথাটি বলল, লকডাউন কবে শেষ হবে মার্কো?

মহামারী চলতে থাকবে, তারই ভিতর মানুষের বেঁচেও থাকবে।

গাল ভর্তি দাড়ি, কী অন্ধকার মুখ, ওর শহরের নাম ভ্যাস্তেরস, সুইডেনের রাজধানী স্টকহলম থেকে ১০০ কিমি দূরে। কদিন আগেও সেখানে তুষারপাত হয়েছে। ছোট শহর। দেড় লক্ষর মতো মানুষের বাস। সে একটা বাঙলোয় একা, বাড়িগুলো ছাড়া ছাড়া, একটা থেকে আর একটার দূরত্ব আছে, কথা হয় না, মানুষের মুখ দেখা যায় না, দূরে এক বৃদ্ধা থাকেন, তাঁরা হাত নাড়েন, কী রকম একা, উফ!

মার্কো বলল, পৃথিবী এক পরিবর্তনের ভিতর দিয়ে যাচ্ছে, মন শান্ত করো, শোনো, অন্য কথা বলি, ঢাকাই কুট্টির রসিকতা, শহরের এক বাবু, চোগা চাপকান, সুরমায় সুশোভিত, সে চায়ের পেয়ালা নিয়ে আয়েশ করে বসেছে চা-কফিখানায়, চা এসেছে সুদৃশ পেয়ালা ভরে, সে দেখল চায়ে ভাসছে এক মরা মাছি, সে চিৎকার করে  ডাকল  ওয়েটারকে, মাছি কেন চায়ের ভিতর?

ওয়েটার হেসে বলল, পাঁচ টাকার চায়, মাছি পড়ব না তো কি এরোপ্লেন পড়ব?

এই কথা কেন? জয়িত্রী জিজ্ঞেস করল।

মন খারাপ থেকে বের করে আনতে বললাম, ঢাকা অনেক পুরান শহর, ঢাকার মানুষ রসিক, ঢাকায় শুনেছি ৭০০ মসজিদ আছে, হাজার হাজার রিকশা চলে, বাবুরা রিকশায় হাওয়া খেতে খেতে বাড়ি ফেরেন, বাড়ি থেকে বেরিয়ে রিকশা চাপেন। আগে ছিল ফিটন, তার সঙ্গে জোড়া দুবলা ঘোড়া, এখন তার বদলে রিকশা, কিন্তু নামী দামী গাড়িও কম না, অবশ্য তাদের আগে রিকশা ছোটে, বাসও আছে, ডবল ডেকার, প্যাসেঞ্জাররা বাসে উঠেই কন্ডাকটরকে বিঁধতে আরম্ভ করে, ভাগ্না, গাড়োয়ানকে বলো নিচে নেমে ঠেলতে, গাড়ি আর যায়ই না। কন্ডাক্টর উত্তর দেয়, আরে মামা বস, যে টেকা ভাড়া দিছ, তার চেয়ে বেশি টায়েম ফ্রি দিচ্ছি, এক ভাড়ায় ডবল যাচ্ছ…।

ঢাকার বয়স ৪০০ বছর হবে, পুরোন নাম জাহাঙ্গীরনগর, ঢাকার মসলিন নিতে একসময় দূর-দূরান্ত থেকে বণিকেরা আসত। ঢাকাই জামদানির সুখ্যাতি পৃথিবীজুড়ে। কিন্তু এখন সব বন্ধ। গারমেন্টস ফ্যাক্টরির কর্মীরা বাড়ি ফিরে গিয়ে আবার এসেছে ফিরে। কাজ ছাড়া অন্ন নেই। ভাইরাস আসে আসুক। কত মারবি মার।   ঢাকার শহীদ মিনারে ফুল দিয়েছিলাম ২১শে ফেব্রুয়ারি মধ্যরাতে, শোনো বাংলাদেশে ভাষার জন্য কী হয়েছিল।

জয়িত্রী জানে। তখন মার্কো ঢাকার মানুষের কথা বলতে লাগলেন। কী শুনেছেন কী দেখেছেন মার্কো তা। ঢাকা শহরের প্রান্তেও এক নদী আছে, বুড়িগঙ্গা। ঢাকার এক পুরোন শহর আছে, নতুন শহর আছে। নতুন শহরে আকাশচুম্বী বাড়ি দেখতে দেখতে রিকশায় করে পুরান শহরের হাভেলিতে পৌঁছে যেতে পার।  মহামারীর কারণে দুই ঢাকাতেই ছুটি চলছে। সব বন্ধ। কোভিড-১৯ এসে গেছে উড়ানে উড়ানে। নিমোনিয়া হয়ে মানুষ মরছে। মরছে আবার বেঁচেও যাচ্ছে।

৩০.০৩ তারিখে ঢাকার এক রাগী কন্যা জান্নাতুম নয়িম প্রীতি লিখল

“আমি কেয়ামতে বিশ্বাস করিনা, কিন্তু প্রকৃতির প্রতিশোধে বিশ্বাস করি। আমরা সচেতন মানুষরা আশংকা করছিলাম একসময় এন্টিবায়োটিক ওষুধে আর কাজ হবেনা, মুড়ির মতো করে এন্টিবায়োটিক লেখা আমাদের ডাক্তাররা থামান নাই। এখন সেইসব ওষুধ খেয়ে রেজিটেন্স পাওয়ার কমানোর পরে আরও শক্তিশালী একটা ফ্লু অর্থাৎ করোনা যখন এল, তখন আমরা হা করে আছি আর হাজারে হাজারে মারা যাচ্ছি। গত বছর গ্রেটা থানবার্গ যখন বিশ্বনেতাদের বারবার করে দুনিয়ার তাপমাত্রা কমাতে বলল – নোবেল প্রাইজ কমিটিও তারে পাত্তা দিলো না, নোবেল পাইলেন ইথিওপিয়ার প্রধানমন্ত্রী আবি আহমেদ আলি। অথচ আনবিক যুদ্ধ থামানোর চেয়েও, স্পেস শাটল বানানোর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় তাপমাত্রা কমানো।

টাইম ম্যাগাজিনের কয়দিন আগেই ইউভাল নোয়া হারারি লিখেছেন – দুনিয়ার সবচেয়ে বড় সংকট মহামারী না, সবচেয়ে বড় সংকট হচ্ছে – দুনিয়ার একজন নেতা না থাকা!

দুনিয়ার সবচেয়ে ক্ষমতাধর রাষ্ট্র আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প কি বলেছেন গতকাল জানেন? করোনায় মারা যাওয়া মানুষের সংখ্যা এক লাখের কাছাকাছি রাখতে পারাই হবে তার কৃতিত্ব!

অথচ সিরিয়ায় শিশুদের ওপর বোমা ফেলা, প্যালেস্টাইনের ওপর ইজরায়েলের আধিপত্য বিস্তার থেকে সৌদি আরবের সাথে জোট বেঁধে কি পরিমাণ টাকা খরচ করেছেন প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প? বিগত ইরাক যুদ্ধেই বা মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের কতো খরচ ছিল?

চীন উইঘুরদের কন্সেন্ট্রেশন ক্যাম্প বানাতে যে পরিমাণ ব্যয় করেছে, করোনার জীবাণু ছড়িয়ে পড়ার নিউজ রুখতে কী পরিমাণ ব্যয় করেছে?

লকডাউন দেয়ার কারণ এইটা না যে আপনি লকডাউন দিয়ে ভাইরাস সংক্রমণ আজীবনের জন্য ঠেকাবেন। লকডাউনের কারণ এইটা যে সংক্রমণটা ধীর করে দেয়া। … কারণ দুনিয়ায় যে পরিমাণ রোগী এইমুহূর্তে করোনা ভাইরাসের সাথে ফাইট করছেন তাদের অর্ধেকের বেশিকে মেডিক্যাল সাপোর্ট দেয়ার ক্ষমতা দুনিয়ায় কোনো রাষ্ট্রেরই নাই। যেটা আছে সেইটা হচ্ছে নাগরিকদের কাছে ক্ষমা চাওয়া আর মেডিকেল সাপোর্ট বানানো। ভ্যাক্সিন বানানো। গবেষণায় টাকা ঢালা।

১৪ শতাব্দীতে ব্ল্যাক ডেথ দাবানলের মতো ছড়িয়ে পড়ে, পাশাপাশি চিকেন পক্স, প্লেগ, সার্স, ইয়েলো ফিভার প্রতিটি মহামারীর ইতিহাস এবং গতিপ্রকৃতির একটা রেখা আছে। সারা দুনিয়ার তথ্যভাণ্ডার বিজ্ঞানীরা তৈরি করেছেন। ইতিহাস শিক্ষা দেয় মহামারীর ব্যাপারে নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য বিনিময় না থাকলে প্রতিরোধ  ব্যবস্থা নেওয়া যায় না। চীন যদি এই তথ্যগুলো আরও আগে দিতো তাহলে দুনিয়ার প্রতিরোধ ব্যবস্থা এইরকম হইতো না।

রিচার্ড প্রেস্টনের ‘ক্রাইসিস ইন দ্যা রেড জোন’ বইতে ইবোলার সংক্রামণ সংক্রান্ত নানান তথ্য আছে, ইবোলা বাদুড় থেকে হইলেও মানবদেহে জেনেটিক রিকম্বিনেশন ঘটায়, ফলে এই মিউটেশানের কারণে আফ্রিকায় মহামারী ছড়িয়ে পড়লেও আফ্রিকান সরকার বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে তথ্য দিয়েছিল বলেই আমরা সেই আকারের মহামারীর পাল্লায় পড়িনি। এখন আপনি যখন এই লেখা পড়ছেন তখনো করোনা নামক ভাইরাসটি মিউটেশান ঘটাচ্ছে!…

নেটিভ আমেরিকান একটা প্রবাদ আছে – যখন শেষ গাছটি কেটে ফেলা হবে, শেষ মাছটি খেয়ে ফেলা হবে, শেষ জলাধারটি বিষাক্ত হবে, তখন তুমি বুঝতে পারবে টাকা খাওয়া যায়না…।

প্রিয় মানুষ, আপনি বুঝতে শিখুন যে প্রকৃতি নিজের ক্ষতিপূরণ আদায় করে নিতে জানে। আর কতোবার সে প্রতিশোধ নিলে আপনি বুঝবেন যে তার ওপর ছড়ি ঘুরানোর ক্ষমতা আপনার নাই?

সে আপনার কোটি কোটি টাকার ধার ধারেনা। তার ওপর অত্যাচার নির্যাতনের জবাব সে কড়ায় গণ্ডায় দিতে জানে। তারে আপনি ঠ্যাকাবেন কি করে?”

জান্নাতুন নয়িম প্রীতি ৩০.০৩.২০

হবে কি হবে না জানি না। কী আছে সামনের দিনে জানি না। ক্ষুব্ধ কবি হিন্দোল ভট্টাচার্য প্যারাসাইট ছবি দেখে প্রশ্ন তুলেছেন,

কে বেশি বিপজ্জনক ভাইরাস না দারিদ্র?

কে বেশি বিপজ্জনক, প্যারাসাইট না সাবওয়ের নীচে থাকা মানুষের গায়ের গন্ধ?

আসলে কারা পরজীবী? কারা ভাইরাস? কারা সংক্রমণের কারণ?

আমাদের বাড়িটা ভাঙে না। প্রত্যেকের বাড়ির ভিতরে এই গুপ্ত কুঠুরীতে লুকিয়ে আছে কেউ না কেউ। আমরা যাদের কাছে পরজীবী। আমরাই, এই পৃথিবীর জঘন্যতম ভাইরাস।

কবির ক্ষোভ দরিদ্রের প্রতি রাষ্ট্রের অবহেলা যা ঘটছে গত কয়েকদিন ধরে। আমি তাঁর কথা শুনে মৃত্যু সংবাদ পেলাম নিউইয়র্ক নিবাসী এককালের ঢাকা টেলিভিশনের প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী লুতফুন্নাহার লতার লেখায়। কী কষ্ট! বাংলাদেশে প্রবেশ করেছি করোনার খবর নিতে। খবরিয়া খবর নেবেই।

নিউইয়র্ক নিবাসী এককালের প্রতিভাময়ী অভিনেত্রী লুৎফুন্নাহার লতা লিখলেন এক শোকগাথা। লতার কত প্রিয়জন যে চলে গেলেন এই ঘাতকের কাছে আত্মসমর্পণ করে।

মির্জা ভাই, এত তাড়াতাড়ি বিদায়?

তাকে আমি ডাকি মির্জা ভাই বলে। আমার সিনিয়র অথবা জুনিয়র সেই খবর আমি জানি না। সম্পর্কটা শুরু হয়েছিল ঠিক এমন সম্বোধন থেকেই। মির্জা ভাই আমার খুব ঘনিষ্ঠ এক বন্ধু। তবে বন্ধু শব্দটায় যেমন গলাগলির একটা সম্পর্ক বুঝায় ওঁর সাথে আমর সম্পর্কটা ঠিক তা ছিল না। তাঁর সঙ্গে ছিল আমার দীর্ঘদিনের ভালো এক পেশাদারী, আন্তরিক আবার আত্মিক সম্পর্ক। হায়! এই “ছিল” শব্দটা লিখতেও বুকটা আবার কেঁপে উঠলো। সম্ভবত ২০০৯ সাল থেকে মির্জা ভাইয়ের সঙ্গে আমার পরিচয়। অসাধারণ অমায়িক, চৌকুস আর ভদ্র মানুষ বলতে যা বোঝায় মির্জা ভাই ছিলেন ঠিক তাই। আমি তাকে সম্বধোন করতাম  ’মির্জা ভাই’ আর মির্জা ভাই আমাকে বলতেন ’বস’। তিনি কেন আমাকে বস বলতেন জানি না তবে তিনি অনেককেই ‘বস’ বলে সম্বধোন করতেন। এটাই ছিল তার স্টাইল। আহা! কত স্মৃতি তাকে নিয়ে? কোন স্মৃতিটা ছোব আর কোনটা ছোব না?? আমি তখন দেলওয়ারে উইলমিংটনে থাকি। আইটি জব করি। কিন্তু মনটা সারাক্ষণ পরে থাকে নিউইয়র্কের দিকে। প্রতি শুক্রবার সপ্তাহান্তে আমি দেলওয়ার থেকে নিউইয়র্ক চলে যেতাম। তখন মির্জা থাকতো ভার্জিনিয়াতে অথবা ওয়াশিংটন ডিসিতে। ঠিক মনে নেই। সেও নিউইয়র্ক যেত। কারণ নিউইয়র্কে তার এবং আমাদের আরেক বন্ধু আকতার ভাইয়ের একটা আইটি স্কুল ছিল। আমাকে দেলওয়ার থেকে মাঝপথ থেকে তারা প্রায়ই তুলে নিত। গাড়িতে উঠলেই মির্জা ভা্ই বলতো, “বস, আপনি ড্রাইভ করেন”। তারপর দেলওয়ার থেকে নিউইয়র্ক-এর সেই দীর্ঘ তিন ঘন্টার পথ। আর সেই পথ কত দ্রুত শেষ হয়ে যেত! সেই যাত্রাপথে থাকতো কত আড্ডা! কত গল্প! কত ভবিষ্যত পরিকল্পনা!

আমি বাংলাদেশে আসার সপ্তাহখানেক আগের কথা। হঠাৎ মির্জা ভাইয়ের কল।

”বস, একটা অনলাইন পত্রিকা করতে চাই। আপনার হেলপ দরকার।” আমি বললাম, “আপনি পত্রিকা বের করবেন আর আমি থাকবো না? দেশ থেকে ঘুরে আসি তারপর আপনার সাথে বসবো এই নিয়ে।” সেই ছিল শেষ কথা তার সাথে। আর কী বসা হল মির্জা?

এই কিছুক্ষণ আগে বাংলাদেশ থেকে খবর পেলাম মির্জা ভাই আর নেই। করোনায় তার প্রাণ দিতে হয়েছে। গত কিছুদিন ধরেই সে করোনায় আক্রান্ত হয়ে এলমহার্স্ট হাসপাতালে ছিল। সে খবর আমার জানা ছিল। আমার আরেক বন্ধু পাভেল চৌধুরী নিউইয়র্ক থেকে জানিয়েছিল মির্জা ভাই আগের থেকে একটু ভালো। শুনে মনটা কিছুটা হলেও স্বস্থি পেয়েছিল। আজ শুনলাম সে আর নেই। একটা মানুষ এই পৃথিবী থেকে এত দ্রুত ’নেই’ হয়ে যেতে পারে তা আমি ভাবতেও পারি না। যে লোকটা দু সপ্তাহ আগেও অফিস করেছে বাচ্চাদের নিয়ে খেলাধুলা করেছে। চোখে তার কত স্বপ্ন! শুনলাম ভাবিও নাকি করোনায়া আক্রান্ত! হায় নিষ্ঠুর নিয়তি। তার ফুটফুটে দুটো সন্তান আছে। খোদা তো সে খবরটা জানে, নাকি? পৃথিবী এত কঠিন কেন?  এই কি আমাদের সাধের ঠুনকো ভালোবাসার জীবন?

মির্জা ভাই, আপনাকে বিদায় জানাই কীভাবে? “বস, এত তাড়াতাড়ি আমাদের কাছ থেকে আপনার চলে যেতেই হল?” কী অদ্ভুত! এখন আপনার আত্মার শান্তি কামনা করে এই লেখা লিখতে হচ্ছে আমাকে! হায়! পৃথিবীটা কত নিষ্ঠুর! আপনার ফুটফুটে দুটো সন্তানের দিকে আমি তাকাতে পারছি না। হ্যাঁ, এখন ভাবিই তাদের একমাত্র ভরসা। প্রাণপণে দোয়া করছি ভাবিও যেন খুব তাড়াতাড়ি সুস্থ হয়ে উঠেন।

কী দুঃসময়! কী দুঃসময়!! বিশাল এক মৃত্যু মিছিলে আমরা হাঁটছি। এর শেষ কোথায়? কেউ জানি না।

সবাই আমার এই বন্ধুটির আত্মার শান্তির জন্যে দোওয়া করবেন।

খবরিয়া জানাচ্ছেন,

ভোরে আমার ঘুম তো ভাঙেই, দূর থেকে আযানের সুর ভেসে আসে ঘুমের ভিতর। আমি মোবাইল ফোনে দেখি কে কেমন আছেন, অচেনা ওয়াহিদ জালাল আমার ঘুমের ভিতরে লিখে গেছেন,

আমরা কে কোথায় আছি কিংবা কোথায় যাব কেউ জানি না। এই পৃথিবীতে আমাদের কোথাও লুকানোর জায়গা আজও কেউ তৈরি করতে পারেনি, পারবেও না। আত্মসমর্পণ ছাড়া কোন উপায় নেই। আসুন একে অপরের জন্য দোয়া করি। আল্লাহ্ তুমিই আমাদের মালিক।

ওয়াহিদ জালাল, ৩০.০৩ ম্যানচেস্টার, ইংল্যান্ড

৩১শে মার্চ ভোরে কত পাখি কলকল করতে লাগল, আমি হরিপ্রসাদ চৌরাশিয়ার সং অফ দ্য রিভার শুনছিলাম, আহা শুনতে শুনতে ফেসবুক খুলেছি। রাজু আলাউদ্দিন মশায়ের কান্নাই প্রায় মিশে গেল চৌরাশিয়ার বাঁশির সুরের ভিতর। সৃষ্টির অতল তল থেকে হাহাকার ধ্বনি উঠে এল।

রাজু আলাউদ্দিন, ঢাকা, ৩১.০৩.২০

ছবির মানুষটিকে পত্রিকা ও আলোকচিত্র জগতের অনেকেই চেনেন। অন্তত নব্বুই দশকের সাংবাদিক ও আলোকচিত্রীদের কাছে তিনি পরিচিতি ছিলেন নিশ্চয়ই। ওই সময়ই তাকে বাংলাবাজার পত্রিকায় সহকর্মী হিসেবে পাই, পরে মানবজমিন-এও সে আমার সহকর্মী ছিল। চটপটে, আলাপী আর বন্ধুবৎসল ধরনের মানুষ ছিল আবদুল হাই স্বপন। খুব সম্ভবত ২০০০ সালের পর তিনি মার্কিন মুল্লুকে পাড়ি জমিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সাল থেকে আমি তার কোনো খোঁজই জানতাম না প্রবাসী হওয়ার কারণে। ২০১০ ফিরে আসারও বহু বছর পর, সম্ভবত ২০১৬/১৭ সালে তার সাথে হঠাৎ করে যোগাযোগ হয় ফেসবুকের মাধ্যমে। সে-ই কীভাবে যেন আমার খোঁজ পেয়ে প্রথমে ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট পাঠায় এবং পরে ফোনে আলাপ হয়। আমাকে দেখার ইচ্ছার কথা জানিয়ে আমেরিকায় যাওয়ার দাওয়াতও করেছিল। আমি কথা দিয়েছিলাম পরের বার গেলে যোগাযোগ হবে। আমি পরে দুবার গেলেও স্বপনের সাথে আর যোগযোগ হয়নি। আজ শুনলাম সে এখন যোগাযোগের সম্পূর্ণ বাইরে চলে গেছে। করোনার নির্বিচার শিকার হলো আমার একসময়ের সহকর্মী ও বন্ধু স্বপন। এই প্রথম এত কাছের এবং এত পরিচিত কেউ করোনার শিকার হলো। সত্যি জীবন কত অনিশ্চিত। স্বপন বয়সে আমার সমান কিংবা আমার চেয়ে দু-এক বছরের ছোটই হবে। আমি যে এখনও বেঁচে আছি – এটাই বিস্ময়। হে বন্ধু, বিদায় জানাবার কথা কখনো ভাবিনি। অপেক্ষায় ছিলাম তোমার আলিঙ্গনের। কিন্তু করোনা সেই আলিঙ্গন থেকে আমাদেরকে বঞ্চিত করলো অসময়ে।

 

দুই

খবরিয়া দেখতে পাচ্ছে, শুনতে পাচ্ছে মানুষের ক্ষোভ, আতঙ্ক, মানুষের কান্না, মানুষের আর্তনাদ ক্রমশ বাড়ছে। বেড়েই চলেছে। মন ভালো ছিল না। সন্ধ্যাবেলায় অগ্রজ লেখক প্রফুল্ল রায়কে ফোন করলাম। ৮৫ বছর বয়স। তিনি একা থাকেন। স্ত্রী চলে গেছেন ক’বছর হলো। এখন মেয়ে এসে আছে। তিনি বললেন, এমন দেখতে হবে ভাবিনি অমর। ৪২-এ ঢাকা থেকে কলকাতা চলে এসেছিলাম কাজের আশায়। ৪৩-এ মন্বন্তরে আবার পালিয়ে গেলাম ঢাকা। তারপর ৪৬, ৪৭… দাঙ্গা, দেশভাগ, উদ্বাস্তু হয়ে আবার চলে আসা কলকাতা। জীবনে কত কিছু দেখলাম। সদ্য প্রয়াত লেখক সুব্রত মুখোপাধ্যায়কে নিয়ে অনেক কথা বলতে লাগলেন। আমাকে বলতে লাগলেন, একদম বেরবে না। একদম না। তাঁকে বেরতে হয়েছিল ওষুধ আনতে। আবার কদিন বাদে বেরতে হবে টাকা তুলতে। ব্যাঙ্ক কাছেই আছে। তবে এখন খুব ভীড়। কদিন বাদে গেলে হবে। সমরেশ (মজুমদার) ফোন করেছিল। সুধাংশু (দেজ পাবলিশিং) ফোন করেছিল। বামাবাবু (করুণা প্রকাশনী) ফোন করেছিলেন। অমর একদম বেরবে না। একদম না। রবিশঙ্কর চলে গেছে, শচীন চলে গেছে, দীপঙ্কর চলে গেছে, সুব্রত চলে গেল… হাহাকার করে উঠলেন তিনি। আমার সমকালের এই বন্ধুরা অকালে চলে গেছে। করোনার দিনগুলি ওরা দেখে যায়নি। তার অনেক আগে।

ভয় অন্তরাত্মায় প্রবেশ করেছে। ক’দিন ধরে খবরের কাগজ স্পর্শ করছি না। খবরের কাগজ, কাগুজে নোট, ধাতুর কয়েন কি ভাইরাসের আশ্রয় হতে পারে? কেউ বলছে হ্যাঁ, কেউ বলছে না। হোয়াটসআপ ভরে যাচ্ছে নানা তথ্যে। তবে হু বলেছে ঘড়ি আংটি থেকে সাবধান। আংটি কে আর পরে? না পরে, জ্যোতিষে যাদের বিশ্বাস, তারা। ঘড়ির পাট উঠেই গেছে মোবাইল ফোন আসায়। একজন বললেন লিকার চা খেলে ভাইরাস মরবে। অন্যজন বললেন এই তথ্য ভুল। এসব ভুল তথ্য ছড়ান ঠিক না। খবরের কাগজের ব্যাপার ধরা যাচ্ছে না। আমি অনলাইন পড়ছি, মিতালি অনলাইন পড়তে পারে না। তার অসুবিধে বেশি। খবরের কাগজ তাকে ঘর থেকে বাহিরে নিয়ে যায়। সে কী করে পারে? ঠিক হলো, একদিন মানে ২৪ ঘন্টা বাদে পড়া হবে। সকালে দুটি কাগজ আসে। পড়ে থাকে। পরদিনও পড়ে থাকে। বাসি কাগজ কি পড়া যায়? কিন্তু কাগজের হকারকে বারণ করিনি। খবর আসছে। পড়ছি না। টেলিভিশন এবং হোয়াটসআপ, ফেসবুক অনেক খবর দিয়ে যাচ্ছে। এই নিয়ে এক খবরের কাগজ বিক্রেতার আবেদন পড়তে দিলেন অরুণ দে। ৩১ তারিখ ভোরে।

আবেদন

যাঁরা সংবাদ পত্র নেওয়া বন্ধ রেখেছেন,

তাঁদের প্রতি

এ কেমন আতঙ্ক, তা থেকে তৈরি গুজব!

বেশ কিছু দৈনিক সংবাদপত্র পাঠক ইদানিং কাগজ নেওয়া বন্ধ রেখেছেন।

তাঁদের মনে হয়েছে, কাগজ থেকে করোনা ভাইরাস তাঁকে বা তাঁর পরিবারকে আক্রমণ করতে পারে। এটি একটি ভুল ধারণা।

হু (WHO) ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের পক্ষ থেকে বারে বারে ঘোষণা করা হয়েছে/হচ্ছে, ‘সংবাদপত্র থেকে উক্ত সংক্রামক সংক্রামিত হ‌ওয়ার কোন সম্ভাবনা নেই’।

পৃথিবীর কোনো দেশে দৈনিক সংবাদপত্র এখনও পর্যন্ত বন্ধ হয়নি। গুজবদাতাদের গুজব ছড়ানো থেকে নিরস্ত্র করছেন সংবাদদাতারা।

এরপর আর‌ একশ্রেণীর পাঠক বলছেন, কাগজ হাত থেকে হাতে ঘোরাঘুরি করে।

তা পাঠক বন্ধু, আপনার পকেটের কত টাকা হাতাহাতি করে আপনার হাত দিয়ে পকেটে ঢুকেছে সে খেয়াল রাখেন, না রাখছেন?

তার বেলা?

পরিশেষে জানাই, আমাদের প্রধানমন্ত্রী, রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রীগণ অত্যন্ত সচেতন হয়ে লকডাউন’এ যেগুলি বন্ধ রাখার নির্দেশ দিয়েছেন তার মধ্যে সংবাদপত্র আছে?

আমি একজন কাগজ‌ওয়ালা, গুছিয়ে কথা বলা বা লেখার শিক্ষাগত যোগ্যতা আমার নেই। কাউকে জ্ঞান বা আঘাত করা উদ্দেশ্য আমার বা আমাদের নয়।

একটু সহানুভূতি, একটু মানবিকতার কাঙ্গাল আপনার কাজ‌ওয়ালিটি। যে সারাবছর আপনার ঘুম ভাঙার আগে ঝড়, জল, দুর্যোগ সঙ্গে নিয়ে হাসিমুখে আপনাকে দিয়ে যায়, টাটকা সন্দেশ। এরপর শুরু হয়, সোনালি রোদ আর একঝলক তাজা বাতাস নিয়ে আপনার দিন।

করজোড়ে আমরা আপনাদের কাছে অনুরোধ করি, কাগজ বন্ধ রাখার আগে, আর একবার আপনার কাগজওয়ালাটিকে স্মরণ করুন।

নিশ্চিত খুঁজে পাবেন না, তার মুখে লেগে থাকা হাসিটি। যেটি আপনিই ফিরিয়ে দিতে পারেন আপনার একটা ভুল ধারণা থেকে সরে গিয়ে।

সকলে সাবধানে থাকুন।

ভাল থাকুন।

ব্যবস্থা করুন করোনা’কে সরানো।

— কাগজ বিক্রেতা।

আজ রাত বারোটায় দেশব্যাপী লকডাউনের এক সপ্তাহ পূর্ণ হতে চলেছে।

প্রচুর ভুয়ো ভিডিও ছড়িয়ে পড়ছে অবিরত ফরোয়ার্ডের মাধ্যমে। চা খেলেই নাকি করোনাভাইরাস সেরে যাবেই, এ একেবারে অব্যর্থ দাওয়াই। চিনের যে ডাক্তারবাবু হুইশল-ব্লোয়ারের ভূমিকা পালন করে এই রোগেই প্রাণ দিয়ে গেলেন, তার গোপন ডায়েরি হাতে পড়েছে সেখানকারই এক বাঙালির হাতে, সে কষ্ট করে ভিডিওর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিচ্ছে চিনের এই গোপন ওষুধ!

ফ্লু-তে চা বা যে-কোন গরম পানীয় মাঝে মাঝে খাওয়া (চিনি-ছাড়া) আরামপ্রদ, তাতে গলার খুকখুকে কাশি বা হালকা ইনফেকশন সারিয়ে ফেলতে সমর্থ। সঙ্গে আদা, লবঙ্গ, লেবু ইত্যাদির প্রলেপ থাকলে তো বটেই। এ দিয়ে সাধারণ ইনফ্লুয়েঞ্জা বশ করা যায়, বশ করা যায় উপসর্গহীন নভেল করোনার আক্রমণও। কিন্তু যখন পরিস্থিতি জোরালো উপসর্গের, তখন?

বাঙ্গালুরুবাসী অমিতাভ প্রামানিকের একটি লেখা পেলাম,

…আমেরিকার পরিস্থিতি খারাপ আমাদের চেয়ে অনেক বেশি। সামনে প্রেসিডেন্সিয়াল ইলেকশন, ট্রাম্পের ওপর প্রচুর চাপ। ট্রিলিয়ন ডলার প্যাকেজে রোগীও কমছে না, মৃত্যুও কমছে না। বিরোধীদের চাপ বেড়েই চলেছে। কন্সপিরেসির পক্ষে আসতে শুরু করেছে প্রচুর জোরালো বক্তব্য। চিন-আমেরিকা বাণিজ্যযুদ্ধ এই সমস্যার সমাধানের পর চলে যাবে বলে মনে হচ্ছে না। আমেরিকানরা বাস্তববাদীর চেয়েও আমেরিকাবাদী। তারা ছেড়ে দেবে না। অন্য একধরনের বিশ্বযুদ্ধের প্রস্তুতি হয়ত ঘনিয়ে উঠছে পৃথিবীর আকাশে।

এসব থেকে মুখ ফিরিয়ে আসুন আমরা আমাদের দেশের ব্যাপারটা দেখি। আগেও বলেছি, আবারও বলছি, এ অবস্থা অন্যদের চেয়ে আমরা ভারতীয়রা অনেক ভালো ট্যাকল করতে পারব। আমাদের সহিষ্ণুতা ও অদ্ভুত সৃজনীশক্তি আমাদের এই বাধা কাটিয়ে তুলতে সাহায্য করবে। তার অনেক প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে সর্বত্রই।

আর্মির লোকেরা তাদের বসতবাড়ি খালি করে দিচ্ছে আইসোলেশনে থাকা সম্ভাব্য রোগীদের জন্যে। আর্মির কারখানায় যেখানে আগ্নেয়াস্ত্র তৈরি হয়, সেখানে এখন জরুরি অবস্থায় তৈরি হচ্ছে মাস্ক আর হ্যান্ড স্যানিটাইজার। চিনির কারখানা জরুরি ভিত্তিতে তৈরি করছে স্যানিটাইজারের অ্যালকোহল। চারদিন আগে টেস্টিং সেন্টার ছিল ৫৯টা, এখন তা বেড়ে দেড়শোর কাছাকাছি। হাসপাতাল অধিগ্রহণ করে তাকে অস্থায়ী হাসপাতাল বানানো হচ্ছে। রেলওয়ের কোচে তৈরি হচ্ছে রোগী রাখার ব্যবস্থা। বিভিন্ন এলাকা স্যানিটাইজ করা হচ্ছে ড্রোন দিয়ে স্প্রে করে।

ডিফেন্স রিসার্চ ল্যাব ঘোষণা করেছে, তারা ভেন্টিলেটর তৈরি করে ফেলেছে। ভেন্টিলেটর তৈরি করেছে মাহিন্দ্রা অ্যান্ড মাহিন্দ্রাও। বিভিন্ন রাজ্যে অতিরিক্ত হাসপাতাল বেড তৈরি করা হচ্ছে সম্ভাব্য প্রয়োজনের কথা ভেবে। কর্ণাটক সরকার অ্যাপ বানিয়ে গুগল প্লে স্টোরে টাঙিয়ে দিয়েছে, যাতে সবাই জানতে পারে তার আশেপাশে কতজন মানুষ কোয়ারান্টাইনে আছে। দিল্লি সরকার গরিবদের আর্থিক সাহায্য ছাড়াও খাবারের রেশন বিলি করছে।

আমার ছোটোবেলার বন্ধু স্বপন মুম্বইয়ে একটা ন্যানো কোটিং কোম্পানির প্রতিষ্ঠাতা। সে আমাকে ফোন করে বলল, ল্যাব চালু করে দিয়েছি, জানিস? সরকার থেকে অনুমতি নিয়ে ন্যানো-সিলভার অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল কোটিং বানাচ্ছি, দরকারে ফ্রিতে দেব। স্যানিটাইজারও বানাতে পারি, যদি অ্যালাউ করে। এই অবস্থায় ঘরে পড়ে থাকলে এতদিন কী ছাতার সায়েন্স পড়লাম!

স্বাস্থ্য নিয়ে ধ্যানধারণার জন্যে মানুষ যেমন ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশনের ওপর ভরসা করে থাকে, তেমনি চিকিৎসার জন্যে ইউএস এফডিএ-র। ওদের সার্টিফিকেট মিললে তবেই ওষুধ বাজারে আসে, তবেই তা প্রেসক্রাইব করা যায়। সবাই জানে ওর মধ্যেও বাণিজ্যিক ঘাপলা থাকে। এখন যখন সবাই জেনে গেছে হু কত অপদার্থ, সে রকম পরিস্থিতি এলে চিকিৎসকরা এফডিএ-র অনুশাসন না মেনেই হয়ত চিকিৎসা শুরু করবেন এবং আমার বিশ্বাস তাতে ভাল ফল পাবেন।

আজকের লেখাটা শেষ করি একটা পেপারের তথ্য-বিশ্লেষণ দিয়ে। আমেরিকা-ইতালি-স্পেনে কেন এত রোগী হচ্ছে ও মরছে, আমাদের দেশে কেন কম, সেই ব্যাপারে এক ক্ষীণ আলোকপাত করেছেন নিউ ইয়র্কের ডিপার্টমেন্ট অভ বায়োমেডিক্যাল সায়েন্সের একদল গবেষক। তাদের মতে আমাদের ছোটবেলায় নেওয়া বিসিজি টিকা (যেটা প্রধানত যক্ষ্মারোগ সামলায়) হয়ত এই ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের শরীরে কিছু প্রতিরোধ খাড়া করতে সমর্থ। আমেরিকা-ইতালি-স্পেনের বাচ্চাদের বিসিজি নেওয়া বাধ্যতামূলক নয়। চিনে ১৯৭৬ থেকে ১৯৮১ সাল অবধি এই টিকা নেওয়া স্থগিত ছিল। তাই এইসব জায়গায় জিনিসটা দ্রুত ছড়িয়েছে, আমাদের এখানে ছড়ায়নি।

এখন অবশ্য করোনাভাইরাস নিয়ে অনেক পেপার লেখা হচ্ছে, সবই তেমন প্রামাণ্য নয়, অনেক কিছুই অনুমান। কিন্তু দেশব্যাপী যে কার্যকলাপ দেখা যাচ্ছে, তা তো মিথ্যে নয়। মিথ্যে নয় শত্রুর প্রতিরোধে আমাদের একত্র হওয়ার বাসনাও।

তার ফল আমরা পাবই। আজ না হোক, কাল।

অমিতাভ প্রামানিক

৩১শে মার্চ ২০২০ (রাত এগারোটা)

***                  ***

এই লেখাটি আশ্বস্ত করল ভোরের বেলা। আসলে আগের দিন অধিক রাতের লেখা আমার কাছে আসে  পরেরদিন অতি প্রত্যুষে। ভোরেই উঠি। এখন উদ্বেগ নিয়েই উঠি। অমিতাভ প্রামানিকের পর আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের মেরিল্যাণ্ড থেকে বিপ্লব পালের কথাগুলি চোখে পড়ল। অতবড় দেশ, অত পাহাড় আর নির্জন প্রান্তর, জনবসতি কম শহরের বাইরে। কিন্তু শহর জনাকীর্ণ। সে দেশে কত চেনা মানুষ, স্বজন পরিজন। বিপ্লব লিখেছেন সন্ধ্যা ছটার কথা। মানে আমাদের এই ভোর। বিপ্লব ওদেশের কথা লিখেছেন, এদেশের কথাও।

এখন সন্ধ্যা ছটা। আজ এখনো পর্যন্ত গত আঠারো ঘণ্টায় আমেরিকাতে মৃত্যু মিছিল ছাড়িয়েছে ৬৫০+  নতুন আক্রান্ত ২১,০০০। বারোটা বাজতে  সত্যিই অনেক দেরী। আজকেই কি মৃতের সংখ্যা ১০০০ ছাড়াবে?  কে জানে! সবই ত আজকাল নাম্বার। মৃতদেহ, পেশেন্ট, ভোটার, ভেন্টিলেটর!

প্রতিদিনই ভাবি, আমরা পিকে পৌঁছেছি। কাল কমবে। একটু আশার আলো। কিন্ত প্রতিদিনই আগের দিনের রেকর্ড ব্রেইক করছি।

আমেরিকার মতন একটা দেশ কেন মহামারী আটকাতে পারছে না? কারণ অনেক…

চীনের মতন কোথাও কোন বলপ্রয়োগ করা হয় নি। ঘরে কেউ থাকলে থাকছে, না থাকলে না থাকছে। মাস্ক নেই। থার্মাল স্ক্যানিং-এর ব্যবস্থা নেই কোন স্টোরে।

কলকারখানা, গ্রোসারি-সবই খোলা। শুধু রেস্টুরেন্ট বন্ধ। এসব কিছুই ঠিক ছিল-যদি প্রোটেক্টিভ মাস্ক,  থার্মাল স্ক্যানিং, স্যোশাল ডিস্টান্সিংও চলত কঠোরভাবে। তাহলেই আটকে যেত এই মৃত্যু মিছিল।

কিন্ত এই দেশের লোকেরা স্বাধীনতা প্রিয়। কাল আমাদের মেরীল্যান্ডের গর্ভনর হোগান ঘোষণা করেছেন সবাইকেই ঘরে থাকতে হবে। এদিকে রাস্তায় প্রচুর লোকে গাড়ি চালাচ্ছে। পুলিশে থামাবে না। পাবলিক হুমকি দিচ্ছে আমেরিকান সংবিধান অনুযায়ী নাকি এমন ডিক্রি কেউ দিতে পারে না। এমন কি ট্রাম্প নিউয়র্ক লকডাউন করতে চেয়েছিলেন। যেমন চায়না করেছিল এপিসেন্টারকে। ট্রাম্পকে নিউয়র্কের মেয়র হুমকি দিলেন কোর্টে দেখে নেবেন।

এ দেশ চালায় কোর্ট আর উকিলে। এত নোবেল লরিয়েট, ডাক্তার বিজ্ঞানী থেকে হবেটা কী?

একটা দেশের মাথায় উকিলদের বসালে এই হবে। পাশাপাশি এই প্রশ্ন উঠবে, হেলথকেয়ার সেক্টর প্রাইভেট মার্কেটের হাতে ছাড়া যায় কি না। কারণ এটা পরিস্কার ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যের সাথে সাথে কমিউনিটির স্বাস্থ্যও গুরুত্বপূর্ণ। এপিডেমিক রোখার কোন কাঠামোই এই দেশের নেই। এটা অন্তত শিক্ষা হোক যে চিকিৎসা ব্যবস্থা যতই উন্নত হোক, এপিডেমিকের সামনে, তা অকার্যকর।

বিপ্লব পাল, মেরিল্যান্ড ৩১.০৩

মার্কো বলল, পৃথিবীজুড়ে শুধু বিষাদ মেঘ, শোনো জয়িত্রী, আমি ঢাকা ছেড়ে একদিন রওনা দিয়েছিলাম, কোথায় যাব ঠিক নেই। বাস কলকাতা যাচ্ছে। আমি হয়ত কলকাতাই যাব। নাকি অন্য কোথাও, আমার ফোনে ক্রমাগত মেসেজ আসছিল মার্কো, এস। পথেই তোমাকে নামিয়ে নেব। পদ্মার আরিচা ঘাট, গোয়ালন্দ, ফরিদপুর, মধুখালি, যশোর, নাভারন… ।

কী সুন্দর সব নাম! জয়িত্রী মুগ্ধতা প্রকাশ করল।

পদ্মার মতো বড় নদী আমি দেখিনি জয়িত্রী। পদ্মার কুল নাই। জ্যোৎস্নারাতে পদ্মা যেন সকল আবরণ মুক্ত হয়ে আকাশে পাড়ি দেয়। পদ্মা এক শাদা পরী, নদীর রূপ নিয়ে এপার-ওপারকে স্নিগ্ধ করছে। হ্যাঁ, আমি নাভারন থেকে আর এগোতে পারিনি বেনাপোল সীমান্তের দিকে। নাভারনে আমাকে নামিয়ে নিল তুহিন। শুভ্র। মন্ময়। তারা বলল, মার্কো সাতক্ষীরা যাবে না?

সেখানে লকডাউন ছিল না?

ছিল, ওরা অনুমতি নিয়ে নাভারন চলে এসেছিল, সাতক্ষীরা এক ছোট শহর। শহর ছাড়াতে ছাড়াতে গ্রাম, জলাভূমি, মাছ আর ধান, নারিকেল, শুকিয়ে যাওয়া নদী বেতনা, প্রাণসায়র। সাতক্ষীরার গায়ে ইন্ডিয়া। কলকাতা যেতে তিনঘণ্টা বড় জোর। সাতক্ষীরার মিষ্টান্ন সুস্বাদু। জোড়া সন্দেশ, কাঁচাগোল্লা, রসগোল্লা, চমচম। কিন্তু তখন সব ময়রার দোকান বন্ধ ছিল। ওরা মার্কোকে নিয়ে চলল কপোতাক্ষ নদ দেখাতে। মার্কোর স্মৃতিতে কপোতাক্ষ আছে। কীভাবে আছে তা মার্কো জানে না। সাতক্ষীরাকে তার ভেনিস মনে হয়েছিল। মনে হয়েছিল হারানো দেশ, হারানো শহর ভেনিসে এসে গেছে সে। আমাকে নিয়ে তারা ব্রহ্মরাজপুর গেল। চেনা লাগল। খুব চেনা। সেই জমিদার না তালুকদারের গৃহ ধ্বংসস্তূপ হয়ে আছে। কাল ভৈরবের মন্দির রয়েছে। পথে ধুলিহর গ্রাম, কে যেন ডাক দিল, কেডা যায়, চিনা লাগে যেন।

মার্কো চেনে। নিকোলো পোলো বলে গিয়েছিল এসব গ্রাম নগর না দেখলে জগতের কিছুই দেখা হবে না তোমার। আমার সব চেনা লাগতে লাগল। নিকোলো পোলো যেন রয়েছেন কোথাও। আম, নারিকেল বাগানে, পান সুপারির দেশে। সেইসব গ্রামে করোনা ভাইরাস প্রবেশ করেনি। শুধু একটা খবর হলো, আয়না বিবি, ময়না বিবি, নাজনিন বিবিদের স্বামী আরব দেশে রয়ে গেছে। ফিরতে পারেনি। এখন তাদের ফোনও বন্ধ। কী হলো তাদের। কাজ গেছে যাক, মানুষ তো ফিরবে? পেটে ভাত জুটছে তো। শুষ্ক, বিশুষ্ক বালিভরা কপোতাক্ষ, মৃতপ্রায় কপোতাক্ষর তীরে বসে তারা অশ্রুপাত করছিল। তাদের চোখের জলেই কপোতাক্ষে যেন বান এসে যাবে। মার্কো এই দেখতেই বুঝি এতদূর এল। জয়িত্রী, কে যেন বলেছিল চোখের জল ফুরিয়ে গেলে অন্ধতা নিবিড় হয়।