অরুণাভ রাহারায় >> অলোকরঞ্জন : হিরণ কিরণ ছড়ায় জ্যোৎস্নারাতে >> জন্মদিন

0
204

অলোকরঞ্জন : হিরণ কিরণ ছড়ায় জ্যোৎস্নারাতে

[সম্পাদকীয় নোট : সমকালীন বাংলা কবিতার অন্যতম শীর্ষ কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত ১৯৩৩ সালের ৬ অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন। শুধু শক্তিশালী কবি হিসেবে তিনি খ্যাতিমান নন, তাঁর গদ্যও পৃথক একধরনের শৈলী ও রীতির কারণে স্বচিহ্নিত, উল্রেখযোগ্য। এই মুহূর্তে তিনি জার্মানিতে তাঁর জন্মদিন পালন করছেন। জন্মদিনে  তাঁর প্রতি আমাদের সশ্রদ্ধ অভিবাদন।]

কবিকঙ্কণ পরাব তোমার হাতে
এ কাঁকন শুধু শব্দ দিয়েই গড়া
হিরণ কিরণ ছড়ায় জ্যোৎস্নারাতে

প্রকৃতির হৃৎপিণ্ডে ভাস্বর হয়ে ওঠা এক বাড়িতে বসে যখন অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর কবিতা পড়ছি তখন তিনি জার্মানির হাইডেলবার্গ শহরে তাঁরই কবিতার অনুবাদক এলিজাবেথ গুন্টারের সঙ্গে জন্মদিন উদযাপন করছেন। কবি অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তর লেখালিখির সঙ্গে আমার চেনাশোনা কম দিনের নয়। বহু পরে কবিকে কাছ থেকে চেনারও সুযোগ পেয়েছি। মনে পড়ে, ২০১১ সালের ডিসেম্বর মাসে এক শীতের সকালে কলেজস্ট্রিট থেকে ২৪০ নম্বর বাস ধরে পৌঁছেছিলাম যাদবপুরে। সেখান থেকে পায়ে হেঁটে শক্তিগড়ের মাঠ। তাঁর আবাসনের নামটিও ভারি চমৎকার: ‘দৃষ্টিকোণ’। এই নামের একটি কবিতায় তিনি লেখেন :

ফিরে এসে দেখি, দেয়ালে ফাটল-ফুটো
আমি জানি কোন ছিঁচকে চোরের দল
চুরমার করে দিতে এসেছিল, পারেনি

এই অবকাশে ঝোপের আড়াল থেকে
দু-ডজন ফেউ ‘পরাভববাদী’ ডেকে
আমাকে আমার অকৃতার্থতা জানালো

সঙ্গে সঙ্গে ফুটো ও ফাটলগুলি
নানা নকশায় প্রসারিত করে তুলি
সারা ঘর শুধু জানালা জানালা জানালা…

(দৃষ্টিকোণ/ শিকড়টুকুই তবু মাটির ভিতরে সলতে)

সেই প্রথম দেখা আজও অমলিন। দূর দেশে ফিরে গেলে তাঁর সঙ্গে ফোনে যোগাযোগ হয় নিয়মিত। আর কলকাতায় এলেই তো গুরুদেবের সঙ্গলাভ। কত বই যে তাঁর কাছ থেকে উপহার পেয়েছি, তাঁর ইয়ত্তা নেই। বই দিয়ে কিছুদিন পরেই খোঁজ নেন সেটা পড়েছি কিনা! ২০১২ সালে তাঁকে একটি অনুষ্ঠানে নিয়ে যাওয়ার দায়িত্বভার পড়েছিল আমার ওপর। আমরা একটা হলুদ ট্যাক্সি ধরে সুকান্ত সেতুর ওপর দিয়ে কোথায় যে ভেসে গেলাম। যেন ‘পাতাল গ্যারেজ থেকে গাড়ি তুলে সূর্যের সফর!’

ওই সময় একটি দৈনিকের রবিবাসরীয় সাহিত্যের পাতায় তাঁর কবিতা বেরিয়েছিল :

সারাটা শহর দূষিত হয়েছে ডিজেলে
তোর কাছে কেন আসতে আমার এতটা
দেরি হয়ে গেল ডিটেলে বলব সেকথা
আজ নয় কাল অথবা পরশু বিকেলে
ভাবতে ভাবতে সবই হয়ে যায় একদা

তোর কথা আমি সকালে ততটা ভাবি না
কিন্তু যখনই দিনান্তে আসে গোধূলি
তোর মুখ দেখি আকাশে আকাশে বিতত
তুই না থাকলে আসলে আমার কীহত
সেকথা জানি না হয়ত হতাম নিহত

(ছেলেটি-মেয়েটি/ অংশ)

কিছুক্ষণ পর সেই গাড়িতে উঠে এলেন ফরাসিবিদ চিন্ময় গুহ। তিনিও ওই অনুষ্ঠানে অংশ নেবেন। আমি বসেছি সামনে। পেছনের সিটে যেন গল্প করছেন গ্যোয়েটে আর ভিকতর য়্যুগো! সে এক পরম পাওয়া। এর কিছুদিন পর একটি বাণিজ্যিক পত্রিকার কবিতা অংশের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ি। পুজো সংখ্যার জন্য অলোকদা লিখে দেন আশ্চর্য কবিতা :

আলপথের ওপর দিয়ে মায়ের কাছে এক্ষুনি ফিরলাম

ফেরার পথে মেরুন মেঘে
জ্বলতেছিল একখানি মোম
সুসংযত তারই আলোয়
পার হচ্ছিলাম যোজন যোজন

বাবার চলে যাবার পরে আমার আসা এবার এই প্রথম।

(সোনালি মাঝখানটা দিয়ে/ অংশ)

কবিতাটি আমাকে নিয়ে যায় তাঁর শৈশবের রিখিয়া ঝোরায়। তাঁর মায়ের কাছে : ‘আমি যত গ্রাম দেখি মনে হয় মায়ের শৈশব।’ তাঁর মা নীহারিকা দাশগুপ্তর লেখা ‘মায়ের শৈশব’ বইটিতে আলোকরঞ্জনকে খুঁজে পাওয়া যায় একেবারে নতুন ভাবে। রিখিয়ার স্মৃতি সম্পর্কে আমাকে এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছিলেন :

“পুজোর দিনগুলি বলতে আমার রিখিয়ার দিনগুলি মনে পড়ে যায় অনিবার্যতই। সন্ধিক্ষণের মুখে পিতামহ ডেকে আমাকে শোনাতেন মিলটনের প্যারাডাইস লস্টের তৃতীয় সর্গ, যেখানে পবিত্রতম আলোর সংজ্ঞা আছে। আমাকে তিনি একই সঙ্গে বোঝাতেন যে, পুজো বলতে কোনও সাম্প্রদায়িক চার্যার প্রশ্নই ওঠে না। দেখতে দেখতেই পুজো এসে যেত তাঁরই প্রতিষ্ঠিত মণ্ডপে। পুজোর কয়েকদিন আমার মায়ের ওপর প্রচণ্ড চাপ পড়ত। এর মধ্যে মনে রাখতে হবে এটা রিখিয়ার পুজো। পটভূমিতে ছিল কলকাতা থেকে আমাদের ইভাকুয়েশনের অভিক্ষেপে সাঁওতাল পরগণায় চলে আসার স্মৃতি। এই যে পুরো পটভূমি, তার পথিকৃৎ ছিলেন আমার মা। যাকে কলকাতা থেকে আসা গ্রামের সবাই ‘মামনি’ বলে ডাকত। তাঁর কাছে সাংস্কৃতিক দীক্ষা নিত।”
অলোকরঞ্জন দাশগুপ্ত  কোনো ধর্মে বিশ্বাস করেন না তিনি মানবতায় বিশ্বাসী। তাঁর একটি কবিতাতেও আমরা সেকথা পাই : “স্পর্শকাতর কোন জন কে ধর্মভীরু / কার বিশ্বাস গেরুয়া কার কান্না মেরুন / এসব কথা ভাবতে ভাবতে দশ বারোজন সমাজপতির দল / চত্বরে এক ঘুরপাক খায় / তাদের মুখে তুখোর অনর্গল / খৈ ঝরে যায়, খৈ ঝরানোর ধ্বনি / সৃষ্টি করে সর্বনাশা পার না হবার ধূসর বৈতরণী।”

অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে নিয়ে স্বল্প পরিসরে কিছু লেখা যায় না। একদিকে আলো ফেললে অন্যদিকে বাদ পড়ে যায় মহাসমুদ্র! তাঁর অনুবাদে নানা সময় পড়েছি বিদেশি কবিতা। বিশেষ করে জার্মান কবিতা। তাঁর অনুবাদের ভাষাও আশ্চর্য। গুন্টার গ্রাসের ‘রাতের স্টেডিয়াম’ কবিতার প্রথম লাইন তিনি তরজমা করেন এভাবে, ‘ক্রমশ আকাশে প্রকাশমান হল ফুটবল’। তাঁর অনুবাদে প্রকাশ পেয়েছে হাইনরিশ হাইনের কবিতার দ্বিভাষিক সংকলন ‘প্রেমে পরবাসে’। ২০ সংখ্যক কবিতাটি এমন :

রাইন নদের সুন্দর স্রোতে,
যেইখানে তাঁর মুকুললহর
আপন বিশাল গির্জে সমেত
মস্ত, মহান ক্যোলন শহর

গির্জের এক ছবি একঠায়
স্বর্ণচর্মে আছে অঙ্কিত;
আমার বাঁচার গোলকধাঁধায়
কীর্ণ করেছে স্মিত রশ্মি তো।

আমাদের ওই করুণাময়ীকে
ঘিরে ভাসে ফুল, দেবদূত যত।
চোখ দু’টি, ঠোঁট গাল দুটো ঠিক
হুবহু আমার প্রেমিকার মতো।

আমার জীবনদেবতা অলোকরঞ্জন দাশগুপ্তকে আমি উৎসর্গ করেছি একটি কবিতার বই। আজ, জন্মদিনে, তাঁর কবিতা দিয়েই শ্রদ্ধাঞ্জলি :

আমি আমার চিরকিশোর মুখ
সারা জীবন রক্ষা করব জীরনের এই মাটির ফুলদানিতে।

রোজ সকালে জলসেচন করব
গঙ্গা থেকে, উত্তেজনা স্মৃতির পদ্মা থেকে।
আমি আমার চিরকিশোর চোখ
দুর্ঘটনায় প্রয়োগ করে দুঃখিত হব না।

মাঝে-মাঝে মাটির টবগুলি
ধরিত্রীর বাগান থেকে বয়ে আনব এ-ঘরে ওই-ঘরে।

আমি তোমার পায়ের কাছে থাকি
লোকে ভাবুক বিনয়, আমি জানি তুমি আশ্রয় দিয়েছ।

দূরে গেলেই ভীষণ কেঁপে উঠে
অসংকোচে তোমার দেওয়া মন্ত্রে ফিরে আসি।

গুরু, তোমার প্রার্থনার ভাষা
আমার মতো আর কে এমন অযত্ন করেছে?

আমি তোমার অনন্ত সবুজ
শোষণ করে-করে হব দূর্বাদলশ্যাম।

(মন্ত্র/ নিজস্ব এই মাতৃভাষায়। কবি আবুবকর সিদ্দিকের সঙ্গে যৌথ কাব্যগ্রন্থ)