অরুন্ধতী রায় >> নষ্টদের রাজত্ব এভাবে চলতে পারে না >> ভূমিকা ও তর্জমা ফারহানা আনন্দময়ী

0
486

নষ্টদের রাজত্ব এভাবে চলতে পারে না

অরুন্ধতী রায় এই সময়ের নষ্ট রাজনীতির বিরুদ্ধে এবং এই রাজনীতির শিকার সকল নির্যাতিত মানুষের পক্ষে সবসময়ই সোচ্চার; তাঁর সচেতন কলম বরাবরের মতো এবারও সক্রিয়। তিনি চিঠি লিখেছেন, তার বন্ধু জি এন সাঁইবাবাকে; যিনি গত তিন বছর ধরে নাগপুর জেলে রাজনৈতিক বন্দী হিসেবে আটক আছেন, যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি মাথায় নিয়ে। সাঁইবাবার অপরাধ সেই একই; দিল্লি বিশ্ববিদ্যালয়ের ইংরেজি সাহিত্যের অধ্যাপক সাঁইবাবা রাষ্ট্রের চোখে রাষ্ট্রদ্রোহী, তিনি মাওবাদের সমর্থক। ২০১৭ সালে নাগপুর জেলে বসে জি এন সাঁইবাবা একটি চিঠি লিখেছিলেন অরুন্ধতী রায়ের সর্বশেষ উপন্যাস ‘দ্য মিনিস্ট্রি অফ আটমোস্ট হ্যাপিনেস’-এর প্রধান চরিত্র আনজুমকে। আজ যখন নাগপুর জেলে কোভিড ভাইরাস মহামারি আকারে ছড়িয়ে পড়ছে অন্যান্য বন্দীদের মধ্যে, পোলিও আক্রান্ত সাঁইবাবার জামিন চেয়ে সেই চিঠির উত্তর দিয়েছেন লেখক অরুন্ধতী রায়। তাঁর এই খোলা চিঠিতে ব্যক্ত হয়েছে ভারভারা রাও-সহ সেই সব লেখক, বুদ্ধিজীবী, ছাত্র, অ্যাক্টিভিস্টদের জন্য গভীর উৎকণ্ঠা, যাঁদের কলম আর কণ্ঠকে ভয় পেয়ে রাষ্ট্র কারাগারে বন্দী করে রেখেছে দিনের পর দিন। চিঠিটি ‘ন্যাশনাল হেরাল্ড’ পত্রিকায় ছাপা হয়েছে কয়েকদিন আগে।

সুপ্রিয় সাঁই,

দীর্ঘদিনের অপেক্ষায় রেখে তোমাকে হতাশ করার জন্য আমি সত্যিই দুঃখিত। আজ থেকে তিন বছর আগে তুমি আনজুমকে যে চিঠি লিখেছিলে, তার জবাব আজ আনজুম নয়; আমি, অরুন্ধতী, লিখছি। জানো তো, আনজুমের সময়বোধ তোমার বা আমার মতো নয়। টুইটার বা হোয়াটসঅ্যাপের এই বেগবান যোগাযোগধারার সাথে সে পাল্লা দিয়ে চলে না। তিন বছর সময় ওর কাছে খুব দীর্ঘ মনে হয়নি, তোমার চিঠির জবাব দেয়ার জন্য; কিংবা না দেয়ার জন্য। এই মুহূর্তে সে স্বেচ্ছাবন্দীত্বে আছে জান্নাত অতিথিশালার নিজের ঘরে। সবচেয়ে অবাক করা বিষয় হলো, এত বছর পরে ও আবার গান গাইতে শুরু করেছে। ওর ঘরের পাশ দিয়ে হেঁটে যেতে যখন শুনি ও গাইছে, আমি নিশ্চিন্ত হই, ও মৃত নয়। কোন গানটা সবসময় গায়, জানো? ‘তুম বিন কোন খাবারিয়া মোরি লে… তুমি ছাড়া আর কে এমন খবর নেয় আমার…’ যখনই এই গানটা শুনি, আমার তোমাকে মনে পড়ে। আর এটাও আমি জানি, আনজুমও তোমাকে ভেবেই গানটা গাইছে। যদিও এতদিন সে তোমার চিঠির জবাব দেয়নি; কিন্তু তুমি মনে রেখো, তার সকল গানই তোমাকে লক্ষ্য করে। একটু যদি গভীরে কান পেতে শোনো, আনজুমের গান তুমি ঠিকই শুনতে পাবে।
যখন তোমাকে আমি বলছি, তোমার-আমার সময়বোধের সাথে আনজুমেরটা মেলে না, তখন হয়তো আমার ভুল হচ্ছে; তোমার প্রতি খানিকটা অন্যায়ও করে ফেললাম। কারণ, যে মানুষটি যাবজ্জীবন কারাদণ্ডের শাস্তি পেয়ে কারাগারের নিঃসঙ্গ কুঠুরিতে জীবন পার করছে, যার জীবন চলাচল করছে হুইলচেয়ারে, তার সময়বোধের সাথে বরং আনজুমের সময়বোধ অনেকটা মিল খুঁজে পাবে। ইংরেজি বাক্যবন্ধ ‘ডুইং টাইম’ শব্দটা বরং অনেক বেশি সমার্থক তোমার বা আনজুমের সময়বাহিত হওয়ার ধরনের সাথে। আনজুমও তো তোমার মতোই যাবজ্জীবন কারাদণ্ডে আছে, ওর কারাগারটা, কবর; যেখানে গরাদ নেই, রক্ষীরা মানুষ নয়। ওকে পাহারা দিচ্ছে জ্বীনেরা আর জাকির মিয়ার স্মৃতিরা।
সাঁই, তুমি কেমন আছো, আমি জানতে চাইবো না। বসন্তের কাছে তোমার সব খবর আমি পাই, তোমার সব মেডিকেল রিপোর্ট আমি দেখেছি। খুব অবাক হয়েছি, অস্থির হয়েছি, তোমার শরীরের এই ভাঙচুর অবস্থায় এবং কোভিড যখন কারাগারে ছড়িয়ে পড়ছে, ওরা তোমাকে জামিন দিচ্ছে না। সত্যি বলছি, এমন একটা দিন আমার যায় না, আমি তোমাকে ভাবি না। এখনো কি ওরা তোমার বইপত্তর আর সংবাদপত্র সেন্সর করে? তোমার যে সহবন্দীরা আছে, ওরা তোমাকে পালা করে সাহায্য করে? ওরা কি তোমাকে বন্ধুর মতো দ্যাখে? তোমার হুইলচেয়ারটাকে এগিয়ে দেয়? আমার মনে আছে, তোমাকে যখন ওরা গ্রেফতার করে, মানে একপ্রকার ছিনতাই করে নিয়ে যায় তোমার ঘরের সামনে থেকে, তোমার হুইলচেয়ারটা ভেঙেচুরে গিয়েছিল। তবু বলবো, আমরা সৌভাগ্যবান যে, তোমার হাতে অস্ত্র তুলে দিয়ে আর অন্য হাতের নিচে হুইলচেয়ারটা গুঁজে দিয়ে তোমাকে ‘আত্মরক্ষার্থে’ অস্ত্র চালিয়েছ, এরকম কিছু দেখায়নি। এই নাটককে আমরা নাম দিতেই পারি, ‘খাকি ফিকশন!’
স্পষ্ট মনে পড়ে সেইসব দিনগুলো, তুমি আমার বাড়িতে যখন আসতে। আমার ঘরটি হুইলচেয়ার-বান্ধব ছিল না; তাই রাস্তার পাশের অপেক্ষমান ট্যাক্সিচালকেরা তোমাকে কোলে তুলে ঘরে পৌঁছে দিতো। আর সিঁড়ির প্রত্যেক ধাপে তোমাকে সঙ্গ দিতো দুটো রাস্তার কুকুর। চাড্ডা সাহিব (বাবা-কুকুর) আর বান্‌জারিন (মা-কুকুর), ওরা এখনও আছে; আর এই লকডাউনকালে দুটো বাচ্চাও দিয়েছে, লীলা আর শীলা। ওরা আমার কাছা-কাছিই রয়েছে। তবে ওই যে, ট্যাক্সিচালক বন্ধুরা, ওরা কেউ এখন আর নেই। এই কোভিড লকডাউনে তাঁরা কাজহারা হয়েছে। ট্যাক্সিগুলোর গায়ে ধুলো জমেছে, কোথাও কোথাও ছোট গুল্মলতা জন্মেছে, ট্যাক্সির নিচে বড় বড় ঘাস। ওরা সব শহর ছেড়েছে। কাজ নেই যখন, তখন আর শহরে থাকা কী কাজে! সবাই শহর ছাড়েনি, তবে অনেকে ছেড়েছে, লক্ষাধিক তো হবেই।

তোমার বানানো আচারের বোতলগুলো আমি যত্নে রেখেছি। অপেক্ষায় আছি, তোমার মুক্তির পরে আমরা একসাথে বসে আবার খাবো, তখন আচারের বোতল খুলবো। বসন্ত আর মানজিরার সাথে আমি খুব কমই দেখা করতে যাই। কারণ দেখা হলেই আমাদের সম্মিলিত বেদনা বড্ড ভারি হয়ে ওঠে, দু’পক্ষের জন্যই। তবে এটা যে শুধু বেদনা তা নয়, নিশ্চিতভাবেই এটা রাগ, অসহায়ত্ব, আর আমার দিক থেকে এটা খুব লজ্জার। লজ্জা এজন্য যে, আমি অনেক মানুষের কাছে পৌঁছাতে পারছি না সেই চিত্রটা নিয়ে, রাষ্ট্রের কী অন্যায় এবং অমানবিক আচরণের শিকার হচ্ছো তুমি। একজন মানুষ, যে ৯০ ভাগ শারীরিক প্রতিবন্ধকতার শিকার, হুইলচেয়ার ছাড়া সে চলাচলই করতে পারে না, তার প্রতি এই নিষ্ঠুর আচরণের কোনো যৌক্তিকতা আমি খুঁজে পাই না। আমার এই অক্ষমতা আমাকে কষ্ট দেয়, দ্রুততম সময়ে তোমার জামিনের জন্যও আমি যথেষ্ট ভুমিকা রাখতে পারছি না। হয়তো উচ্চতর আদালত তোমাকে আগামীতে জামিনে মুক্তি দেবে, কিন্তু এই মধ্যবর্তী সময়ের অমানবিক যন্ত্রণা তোমার আয়ুকে বিন্দু বিন্দু ক্ষয় করে ফেলবে।
কোভিড-১৯ কারাগারে যে ভয়াল থাবা ফেলছে, রাষ্ট্রও বুঝতে পারছে, এরই পরিপ্রেক্ষিতে তোমার যাবজ্জীবন কারাদণ্ড হয়তো মৃত্যুদণ্ডে রূপান্তর হতে পারে। করোনার এই ক্রান্তিকালে আমাদের অনেক পরিচিত বন্ধু, ছাত্র, লেখক, সাংবাদিক, সমাজকর্মী কারাগারে দুঃসহ যন্ত্রণায় দিন কাটাচ্ছেন, এদের মধ্যে রয়েছেন অশীতিপর বৃদ্ধ লেখক-শিক্ষক ভারভারা রাও। তাঁর শারীরিক অবস্থা নিয়ে আমরা সকলেই উৎকণ্ঠিত। তুমি তো জানোই, ভারভারা রাওকে বন্দী করে রাখা মানে আমাদের সমাজ এবং সাহিত্যের এক আধুনিক স্তম্ভকে কারাবন্দী করার সমান। শারীরিকভাবে খুবই অসুস্থ হবার পরেও দিনের পর দিন তাঁর প্রতি রাষ্ট্রের যে অবহেলা, তা মেনে নেয়া কঠিন। ভিভি’র পরিবারের সদস্যরা অতি সম্প্রতি তাঁর সাথে দেখা করে এসে বলেছেন, তিনি কোভিড পজিটিভ হয়েছেন, এবং হাসপাতালে প্রয়োজনীয় কোনো সেবা তিনি পাচ্ছেন না। তিনি নোংরা, ভেজা একটা চাদরের ওপরে একা শুয়ে আছেন, হাঁটতে-চলতে পারছেন না, অথচ তাকে দেখাশোনা করার জন্য কেউ নেই। তিনি অসংলগ্ন কথা বলছেন! তুমি ভাবতে পারো! ভিভি! এই অবস্থা! যে ভিভি’র বক্তব্য শোনার জন্য একডাকে দশ হাজার মানুষ জমায়েত হয়েছে এক সময়ে! সেই ভিভি! যাঁর কবিতার পংক্তির আঁচে সহস্র মানুষের বিপ্লবী চেতনায় স্ফুলিঙ্গ জ্বলেছে… অন্ধ্র, তেলেঙ্গানা এবং সারা ভারত জুড়ে!
ভিভি’র স্বাস্থ্য নিয়ে আমি খুবই উদ্বিগ্ন, যেমন তোমার স্বাস্থ্য নিয়েও। ‘ভীমা করেগাও এগারো’ মামলায় এদের সাথে আরো যাঁরা কারাগারে বন্দী আছেন, তাঁরা সকলেই আশঙ্কাজনক অবস্থার মধ্যে আছেন, সকলেই কোভিড পজিটিভ। ভার্নেন গনসালভেজ, যিনি কারাগারে ভিভি’কে দেখাশোনা করতেন, তিনি মৃত্যুঝুঁকিতে আছেন। গৌতম নওলাখা, আনন্দ টেলতুম্বডে, এরাও এখানে বন্দীজীবন কাটাচ্ছেন। গৌহাটিতে বন্দী অখিল গাগোইও করোনায় আক্রান্ত। অথচ বারবার জামিনের আবেদন করার পরেও আদালত কাউকেই মুক্তি দেয়ার আগ্রহ দেখাচ্ছে না। আমরা এমন এক নষ্ট রাজার রাজত্বে বাস করছি, যারা এতটাই সঙ্কীর্ণমনা, অনুদার, নিষ্ঠুর এবং বুদ্ধিহীন যে, নিজের দেশের লেখক আর বুদ্ধিজীবীর প্রতিবাদী স্বরকে ওরা ভয় পায়, এদের মেধাকে ধারণ করার সক্ষমতা ওরা অর্জনই করতে পারেনি।
মাত্র কয়েক মাস আগে সময়ের চিত্রটা খানিকটা বদলেছিল। নাগরিকত্ব আইনের বিরুদ্ধে সমগ্র দেশের মানুষ ফুঁসে উঠেছিল একযোগে। গান, কবিতা, পথসভায় চারিদিক সরব হয়ে উঠেছিল প্রতিবাদে, বাতাসে ছিল মানুষের প্রতি মানুষের ভালোবাসা। সাঁই, তুমি যদি দেখতে পেতে প্রতিবাদের সেই আগুন, খুশি হতে। কিন্তু সবই পরিকল্পিতভাবে থামিয়ে দেয়া হলো। দাঙ্গা, জ্বালাও-পোড়াও, খুনের মিথ্যা মামলায় সবাইকে আটকে দেয়া হলো। লকডাউনের অজুহাতে অনেক সমাজকর্মীকে, বিশেষ করে দিল্লি ও উত্তর প্রদেশে মুসলিম তরুণদেরকে আটক করা হলো। গল্পকারেরা নতুন গল্প লেখা শুরু করলো। ট্রাম্পের ভারত সফরকে মাথায় রেখে নাকি প্রতিবাদকারীরা এই জ্বালাও-পোড়াওয়ের ষড়যন্ত্রের ছক এঁকেছিল, যাতে ভারত সরকারের সম্মানহানি হয় আমেরিকান অতিথির সামনে! আমি ভেবে পাই না, এটা কী ধরনের ষড়যন্ত্র হতে পারে, নিজেদেরকে নিজেরা মেরে ফেলার ছক এঁকে!
সবকিছুই যেন উলটোপথে হাঁটা শুরু করলো। আক্রমণকারীকে বাদ দিয়ে, যে নির্যাতনের শিকার হচ্ছে, তাকেই অপরাধী হিসেবে প্রমাণ করার এক প্রশাসনিক খেলা শুরু হলো। এমন খবরও প্রকাশ হয়েছে, বিহারের আরেরিয়া এলাকায় একজন নারী পুলিশ স্টেশনে গিয়ে যখন অভিযোগ করেছে যে তাকে দলবেঁধে ধর্ষণ করা হয়েছে, পুলিশ অভিযোগ নেয়ার বদলে নারীটিকেই গ্রেফতার করেছে, এমন কী ওর সঙ্গে থাকা আন্দোলনকারী অন্য নারীকেও! এটা খুবই ভয়ঙ্কর বিষয়। সবকিছুই যে রক্তক্ষরণ, খুনখারাবি আর শারীরিক নির্যাতনের মাধ্যমেই হতে হবে এমনও নয়। আমরা এখন দেখছি, এলাহাবাদে একদল উগ্রপন্থী মানুষ কিছু এলাকায় সার বেঁধে ঘরের দেয়ালগুলো কমলা রঙের করে দিয়েছে আর সেখানে ঘরের মালিকদের ইচ্ছের তোয়াক্কা না করে সেই দেয়ালে হিন্দু দেবদেবীর ছবি এঁকে আসছে। এই খবরে আমার রক্ত হিম হয়ে এসেছে। সত্যিই আমি জানি না, ধর্মীয় এই বিদ্বেষের পথ ধরে ভারত আর কত দূর অবধি হাঁটতে চাইছে?
সাঁই, তুমি যদি মুক্তি পাও, বেরিয়ে এক বদলে-যাওয়া পৃথিবীর সামনে দাঁড়াবে। তোমার অচেনা। এই কোভিড-১৯ আর সরকারি এই হঠকারী সিদ্ধান্তের লকডাউনে সবকিছু আজ ধ্বংসের মুখে। এই করুণ অবস্থা শুধু দরিদ্র মানুষ আর মধ্যবিত্তের নয়, হিন্দু ব্রিগেডকেও টালমাটাল অবস্থায় ফেলে দিয়েছে। তুমি ভাবতে পারো, প্রায় দেড়শো কোটি মানুষের একটি রাষ্ট্রে মাত্র চার ঘণ্টার নোটিশে মাসের পর মাসের লকডাউন ঘোষণা করা হয়েছিল! এতগুলো কর্মজীবী মানুষ হঠাৎ কাজ বন্ধ করে কোথায় থাকবে, কীভাবে চলবে, কোথায় যাবে, কীভাবে যাবে… সেসবের কিছুই সরকার বিবেচনায় আনার প্রয়োজন মনে করেনি। আক্ষরিক অর্থেই সবকিছুই যেন মুহূর্তের মধ্যে থমকে গেল। কোনোরকম আগাম নির্দেশনা ছাড়াই এই বিপুল জনসংখ্যার দেশটি মুহূর্তেই স্তব্ধ হয়ে গেল। এ যেন ঠিক ধনী মানুষের বখে যাওয়া বাচ্চার চাবিদেয়া পুতুলের মতো! মন চাইলেই চাবি ঘুরিয়ে হঠাতই থামিয়ে দেয়া যায়। কেন যায়! একটাই কারণ, তার কাছে চাবি আছে, তার কাছে ক্ষমতা আছে, তাই।

কোভিড-১৯ আমাদের সামনে এক্সরে প্লেটের মতো হাজির হলো, যেখানে আমরা এত দিনের জমানো প্রাতিষ্ঠানিক অন্যায় অনাচারের ছবিগুলো স্পষ্ট দেখতে পেলাম, যা এত দিন সমাজের বিভিন্ন গোত্রে, জাতিতে প্লেগের মতো ছড়িয়ে পড়েছিল। করোনাকালীন এই লকডাউন শুধু ভারতে নয়, বিশ্বঅর্থনীতিতে বিশাল ধ্বস নামালো, এদিকে ভাইরাসের সংক্রমণে কোনো ধ্বস নামলো না। পৃথিবীব্যাপী তার বিচরণ একই থাকলো। শত-সহস্র শ্রমিক শহরের পথে পথে আশ্রয়হীন আটকে রইলো, খাদ্য নেই, টয়লেট নেই, উপরন্তু পুলিশের হয়রানি… সে এক অভাবনীয় দুরবস্থা দেশজুড়ে। লক্ষাধিক কর্মজীবী মানুষ যখন কর্মহীন অবস্থায় গ্রামে ফেরার জন্য লং-মার্চের মতো পথে নেমে পড়লো, তখন মূলধারার সংবাদমাধ্যমগুলো মাইক্রোফোন নিয়ে তাদের মুখের উপর হামলে পড়লো, এদেরকে ‘পরিযায়ী শ্রমিক’ নাম দিয়ে। এদের কষ্টে যেন মিডিয়াওয়ালাদের প্রাণ যায় যায়!
অথচ তুমি, এবং তোমার মতো যারা দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রযন্ত্রের অন্যায়ের প্রতিবাদ করে কারাগারের এপাশে আছো, তাদের মুখের সামনে এই মাইক্রোফোন দেখা যায়নি কখনো, দেখা যায় না। মিডিয়া বরং তোমাদেরকেই দোষী ভেবে এসেছে, তোমাদের বক্তব্য শোনানোর জন্য কোনো প্ল্যাটফর্ম দেয়নি। যে রাষ্ট্রযন্ত্র আজ পরিযায়ী শ্রমিকদেরকে অসহায় অবস্থায় পথের মধ্যে ছেড়ে দিল, সেই রাষ্টযন্ত্রকে এই মিডিয়াওয়ালারাই মাথায় করে হৈহৈ করেছে, যেদিন তোমরা রাষ্ট্রযন্ত্রের নষ্ট সিস্টেমের বিরুদ্ধে পথে নেমেছিলে। রাষ্ট্র শুধু প্রশংসা শুনতে চায়। এবং এই দেশের সেইসব যোগ্য যে মানুষেরা, যাঁরা সরকার বা রাষ্ট্রকে ভুল ধরিয়ে দিতে পারতো, তাঁরা রাষ্ট্রের ভয়ে নিজেদের কণ্ঠকে নীরব করে রেখেছে, নিজের সুবিধার স্বার্থে কেবল প্রশংসাই করে যাচ্ছে। এতে করে রাষ্ট্রীয় অব্যবস্থা আর সামাজিক অবক্ষয়ের সঠিক ছবিটা আমরা দেখতে পাচ্ছি না। ইতিমধ্যে মহামারী তার আসন শক্তপোক্তভাবে গেড়ে বসেছে। উল্লেখ করার মতো বিষয় হলো, সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত যে তিনটি দেশ, তাদের নেতারা হলেন একুশ শতকের প্রথমভাগের সেই তিন ‘জিনিয়াস’ নেতা – মোদী, ট্রাম্প এবং বোলসোনারো।
ট্রাম্প হয়তো এই মেয়াদের শেষে ক্ষমতার বাইরে বিতাড়িত হবেন। কিন্তু ভারতে এমন কোনো আশাই দেখা যাচ্ছে না এখন পর্যন্ত। কারণ এখানে বিরোধীদল ততটা শক্ত নয়, যতটা হলে মোদীর ক্ষমতার ভিতে ধাক্কা দেয়া যায়। বেশিরভাগ আঞ্চলিক সরকারও মোদীর সরকারের কাছে ক্ষমতায় দুর্বল, হিন্দুত্ববাদী প্রভাবের সামনে দুর্বল। সংসদের এমন কত সদস্য এমনই দুর্নীতিদোষে দুষ্ট যে, ঘুষ নেয়া থেকে বিরত রাখার জন্য তাদেরকে হোটেলের ঘরে আটকে রাখতে হয়! দুর্নীতির বিস্তার এমনই, রাজনীতিকদেরকে নিলামে পর্যন্ত তোলা যায়, নিজেদের স্বার্থ পূরণ করিয়ে নেয়ার জন্য। ভারতে এখন ‘একদলীয় গণতন্ত্র’ চলছে, যা স্বৈরতন্ত্রের ভদ্ররূপ মাত্র। এরকম বাস্তবতায় সভ্যতার দিকে উত্তরণের পথ খুঁজে পাওয়া সত্যিই দুরাশার।
এই লকডাউনের কালে বেশিরভাগ উচ্চমধ্যবিত্ত পরিবারের নাগরিকের আক্ষেপ তারা তোমার মতো বন্দী অবস্থায় দিন কাটাচ্ছে। কিন্তু এই আক্ষেপে সত্যতার পরিমাণ খুব কম। কিছু হোম-ভায়োলেন্স ছাড়া বাকি সব পরিবারে প্রায় স্বাভাবিক জীবনযাপনে তারা সময় পার করছে। তাদের মাথার ওপরে ছাদ আছে, টেবিলে খাদ্য আছে, ঘরে ইন্টারনেট সংযোগ আছে, বাচ্চাদের হাতে আধুনিক গ্যাজেট আছে, পারিবারিক বন্ধনেই আছে তারা। এদের বন্দীত্বের আক্ষেপের সাথে তোমার বন্দীদশার কোনো তুলনাই হতে পারে না। এমনকী, গত বছরের আগস্ট থেকে, ৩৭০ ধারা বিলুপ্তির পর থেকে, এই এক বছর জম্মু-কাশ্মীরের জনগণ যে নিদারুণ একঘরে অবস্থায় জীবনযাপন করছে, এরা সেই বিযুক্ততার কণামাত্রও উপলব্ধি করতে পারছে না। মাত্র ক’মাসের লকডাউনে বাকি ভারতের অর্থনীতির এই বেসামাল অবস্থা, আমি শুধু ভাবছি, তাহলে গত এক বছরে জম্মু-কাশ্মীরের মানুষ কী করে খেয়েপরে বেঁচে আছে! কী কঠিন লড়াই না তাদের লড়তে হচ্ছে!
সাঁই, চিঠিটি একটু বেশি দীর্ঘই হয়ে গেল, লিখতে গিয়ে অনেকটা বিস্তারিত জানাতে হলো তোমাকে। আজকের মতো বিদায়। মনে সাহস রেখো এবং ধৈর্য। এই বন্দীদিন দীর্ঘায়িত হবে না, এই আশা করি। অবিচার বেশিদিন চলতে পারে না। তুমি মুক্ত হবেই, কারাগারের বন্ধ দরজা একদিন খুলবেই। নষ্টদের রাজত্ব একদিন ক্ষয়প্রাপ্ত হবে, এভাবে আসলেই চলতে পারে না। যদি তারা এভাবে চালাতেই চায়, সময়ই একদিন তাদের জবাব দিয়ে দেবে। আমাদের নিজেদেরকে হাতে করে কিছু করতে হবে না, কাঠামোই একটা সময়ে চুরচুর করে ভেঙে পড়বে। এবং এরকম যদি ঘটে সেটার পরিণতি সত্যিই খুব করুণ হবে। কিন্তু সেই করুণ পরিণতি থেকে নিশ্চিতভাবেই আলোকিত কিছু জেগে উঠবে; অন্ধকার সুরঙ্গের শেষে আলোই থাকে।
ভালোবাসা রইলো,

অরুন্ধতী।