আঁখি সিদ্দিকা > বর্ণ-রেখায় প্রাচ্য আর পাশ্চাত্যকে বেঁধেছেন অমৃতা শেরগিল >> চিত্রকলা

0
271

‘দেহ তো হারায়ে যাবে –
কিন্তু ফুরাবে না এই বুঝদিল দিল!
ছবিদের কবিদের যুগ যুগ –
প্রেরণা যুগিয়ে যাবে – অমৃতা শেরগিল!’

ভারতের আধুনিক শিল্পকলার ইতিহাসে দুজন নারী শিল্পীর নাম শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করা হয় যাঁরা পরবর্তীকালের শিল্পীদের নানাভাবে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছেন। প্রথমজন হলেন সুনয়না দেবী (১৮৭৫) আর দ্বিতীয়জন অমৃতা শেরগিল (১৯১৩)। আর পৃথিবীতে যে তিনজন নারী চিত্রশিল্পীকে ফিমেল আইকন হিসেবে গণ্য করা হয় তাঁরা হলেন আমেরিকার জর্জিয়া ওকিফে, মেহিকোর ফ্রিডা কাহলো আর তৃতীয়জন হলেন আমাদের ভারতবর্ষীয় অমৃতা শেরগিল। বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ ভারতীয় নারীচিত্রশিল্পী ‘ভারতীয় ফ্রিদা কাহলো’-খ্যাত অমৃতা শেরগিল মাত্র আঠাশ বছর বেঁচে ছিলেন। জীবদ্দশায় তাঁর আঁকা ছবি বহুল প্রশংসিত হলেও তেমন বিক্রি হয়নি। ছবি এঁকে স্বস্তিদায়ক জীবনযাপনের স্বপ্নপূরণ হয়নি। অথচ এখন ভারতের নারীচিত্রশিল্পীদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি দামে বিক্রি হয় অমৃতার ছবি। শিখ বাবা এবং হাঙ্গেরীয় মায়ের সন্তান অমৃতার জন্ম ৩০ জানুয়ারি ১৯১৩ বুদাপেস্টে; পিয়ানো, বেহালা এবং ছবি আঁকায় পারদর্শী হয়ে ওঠেন বয়স দশ ছোঁয়ার আগেই। কিন্তু তিনি জানতেন তাঁকে রং-তুলিতে বিকশিত হতে হবে। ইতালি ও প্যারিতে জলরং, তেলরঙের বাইরেও ফ্রেসকো এবং তামা-খোদাইয়ের কাজে হাত পাকান। তাঁর আঁকা ‘ইয়ং গার্লস’ তাঁকে ১৯৩৩ সালে প্যারির গ্রান্দ সাঁলোর সদস্য হওয়ার পথ প্রশস্ত করে দেয়।

১৯৩৭ সালে তিনি আঁকেন তাঁর বিখ্যাত ট্রিলজি : ‘ব্রাইড’স টয়লেট’, ‘ব্রহ্মচারিস’ ও ‘সাউথ ইন্ডিয়ান ভিলেজার্স’। তাঁর বিখ্যাত তেলরং ছবিগুলোর মধ্যে রয়েছে ‘জিপসি গার্ল ফ্রম জেবেজনি’, ‘সেলফ পোর্ট্রটে’, ‘ন্যুড’ (চারকোলে করা কয়েকটি ‘ন্যুড’ও রয়েছে), ‘প্রফেশনাল মডেল’, ‘ইয়ংম্যান উইথ অ্যাপলস’, ‘গ্রুপ অব থ্রি গার্লস’, ‘হিল ওমেন’, ‘ইন দ্য লেডিস এনক্লোজার’, ‘টু গার্লস’, ‘এনশিয়েন্ট স্টোরি টেলার্স’ ও ‘ক্যামেলস’।
যশোধারা ডালমিয়ার ‘অমৃতা শেরগিল : এ লাইফ’, ভিভান সুন্দরমের ‘অমৃতা শেরগিল – লাইফ অ্যান্ড ওয়ার্কস’,  ইত্যাদি জীবনীগ্রন্থ থেকে অমৃতার জীবনের কথা জানা যায়।

মা মেরি আনতোয়িনেতে মেয়ে অমৃতার জন্মের কথা নিজেই লিখে গেছেন এইভাবে : ‘‘দানিয়ুব নদীর তীরে হাঙ্গেরির রাজধানী বুদাপেস্টে চারশ বছরের পুরনো মোহনীয় ও মনোরম শহর বুদার আঁকাবাঁকা বর্ণিল রাস্তাগুলো হাঁটু পর্যন্ত বরফে ঢাকা পড়ে আছে। ৩০ জানুয়ারি ১৯১৩ শীতের উজ্জ্বল রোববারের এক তুষারঝরা সকাল। জমাটবাঁধা দানিয়ুব থেকে ওঠে আসা আঁকড়ে ধরা শীতল বাতাস তীক্ষ্ণ শিস বাজিয়ে বয়ে চলছে, সাদা রং ধরেছে তুষারঢাকা জানালা, ফুল কিংবা সুচালো তারকার জটিল ছবি কেউ যেন জাদুকরী হাতে জানালার কাচের ওপর এঁকে রেখে গেছে। জানালার ভেতর থেকে তাকালে দেখা যায়, বাইরে উজ্জ্বল চোখ-ঝলসানো সাদা বরফঢাকা বুদার পাহাড় যেন এক পরির রাজ্য। এমনই একদিনে অমৃতা এই পৃথিবীতে নেমে এলো। আমি আমাদের পারিবারিক বুড়ো ডাক্তারের দয়ার্দ্র বিস্মিত কণ্ঠ শুনতে পাই – ‘এটা একটা মেয়েশিশু! দারুণ মিষ্টি। ঈশ্বর তার হেফাজত করুন।’ কয়েক মিনিট পরই নার্স নরম তুলতুলে লেপে ঢাকা একটি ছোট পুঁটুলি এনে আমাকে দিলো… এই সুন্দর দৃশ্যটি দেখে আমার অন্তর স্পন্দিত হলো, একটা মাংসের দলা যেন আমার গলা রুদ্ধ করে দিলো, আমার ঠোঁটের কাছে গড়িয়ে আসা কথাগুলো অস্ফুট রয়ে গেল। কাজেই আমি পরম আনন্দে ফোঁপাতে শুরু করলাম। প্রোটেস্ট্যান্ট চার্চের ঘণ্টা দুপুরের ঘোষণা দিলো আর পৃথিবীতে আনীত ছোট্ট নতুন অস্তিত্ব তার প্রথম কান্না ধ্বনিত করল।” এর একবছর পর জন্ম নেয় অমৃতার বোন ইন্দিরা। ১৯১৪ সালে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ শুরু হয়।

প্রথম মহাযুদ্ধের পুরো সময়টাই কেটেছে দৈন্যদশায়। অমৃতার বাবা ওমরাও সিং লিখেছেন : ‘‘মহাযুদ্ধ শুরু হলো। ভারত থেকে আমাদের যে আয় নিয়মিত পাঠানো হতো, তা একেবারেই বন্ধ হয়ে গেল। আর্থিক কারণে আমরা দুনাহারাসতি গ্রামে চলে গেলাম। আমাদের এবং শিশুদের দুশ্চিন্তাহীন জীবনের অবসান ঘটল। আমার স্ত্রী অবিরাম খেটে রান্না করে, কাপড় ধুয়ে, যেভাবে সম্ভব বাচ্চাদের লালন-পালন করতে লাগল – তার উদার ও স্বাধীনচেতা প্রকৃতির বিকাশ ঘটল। আমিও প্রচণ্ড শীত ও হিমেল ও বরফ-জমাট আবহাওয়ায় জ্বালানি কাঠ কাটতে এবং কুয়ো থেকে পানি আনতে শুরু করি। সন্তানদের এই সযত্ন লালন মায়ের সঙ্গে তাদের নৈকট্য আরো বাড়িয়ে দেয়। যুদ্ধাবস্থায় খাদ্যদ্রব্যের অপর্যাপ্ত সরবরাহের কারণে আমাদের সন্তান পর্যাপ্ত দুধ ও দুধের তৈরি মাখন থেকে বঞ্চিত হয়। একবার অমৃতা তার আধ-খাওয়া একটি মিষ্টান্ন যখন অভিনেত্রী জাযাই মেরিকে দিয়ে দেয়, তিনি মন্তব্য করেন, ‘এই সুন্দর ও নিঃস্বার্থ মেয়েটি জীবনে সুখী হবে।’ তারপর এলো স্প্যানিশ ফ্লুর মড়ক, বেচারি অমৃতা আক্রান্ত হলো। আমরা ভেবেছি, মেয়েটি আর বাঁচবে না। সে সময় গ্রামে কোনো ডাক্তার ছিল না। বেপরোয়া হয়ে অমৃতার ছোট বোনকে সঙ্গে নিয়ে ডাক্তার আনতে পাশের গ্রামে চলে যান। ডাক্তার আসতে অস্বীকার করেন, নিজের গ্রামেই তাঁর ব্যস্ততার শেষ নেই। তারা যখন ফিরে আসে, আমি তখন অমৃতার দিকে চোখ রেখে নিরুপায় হয়ে তার জন্য প্রার্থনা করে চলছি। মেয়েটি তখন ধীরে ধীরে সেরে উঠতে শুরু করেছে। একসময় সে অসুস্থতা কাটিয়ে ওঠে অমৃতার বাবা-মা।

হাঙ্গেরিতে শেরগিল পরিবার বাস করেছিল ১৯২১ সাল পর্যন্ত। ১৯২১ সালে শেরগিল পরিবার চলে আসে ভারতের শিমলায়। অমৃতা সেখানের সামার হিলে বেহালা আর পিয়ানো দুটিই শেখেন সমানতালে, এমনকি শিমলার গেটি থিয়েটারে কনসার্ট শিল্পী হিসেবেও নিয়োগ পান। আর সেইসঙ্গে চলে ছবি আঁকার শিক্ষা। আট বছর বয়সেই তিনি আর্ট কম্পিটিশানে অংশ নেয়া শুরু করেন, ১৯২৪ সালে মায়ের সাথে চলে আসেন ইতালির ফ্লোরেন্সে। তাই শিল্পী হিসেবে তাঁর ক্যারিয়ার গড়ে উঠতে থাকে মাত্র নয় বছর বয়সেই। এরই মধ্যে হাঙ্গেরিতে অমৃতা কিছুদিন স্কুলে পড়েছিলেন। সেখানে ছোটদের রূপকথার গল্প ইলাস্ট্রেশন করতেন অমৃতা। ছবি আঁকার প্রতি তাঁর আলাদা আগ্রহ দেখতে পেয়েছিলেন অমৃতার মা। মা তাঁকে ফ্রান্সে বেড়াতে নিয়ে যান। পরে মেরি আনতোনিত্তের ডায়েরিতে আমরা নোট পাই যে, অমৃতা তখন ভিঞ্চির মোনালিসা এবং অন্যান্য ছবি দেখেছিলেন (এর আট বছর পরে অমৃতা ঠিক ষোলো বছর বয়সে ফ্রান্সে শিল্পকলা নিয়ে পড়তে এসেছিলেন)। ইতালির রেনেসাঁ পর্বের শিল্পীদের সংস্পর্শে আসেন মাত্র এগার বছর বয়সে আর ১৬ বছরেই ভর্তি হন ফ্রান্সের প্যারির বিখ্যাত Ecole Des Beaux Art-এ। এখানেই মাত্র বিশ বছর বয়সে অমৃতা তাঁর ‘Young Girls’ ছবির জন্য অ্যাকাডেমি পদক এবং ফ্রান্সের গ্রান্দ সাঁলোর সদস্য নির্বাচিত হন, এতো কম বয়সে সাঁলোর সদস্য হওয়া এখনো অব্দি একটি অনন্য রেকর্ড হয়ে আছে এবং এই কৃতিত্ব এশীয়দের মাঝে তাঁরই প্রথম আর একমাত্র। যদিও ১৯৩৪ সালে আবার তিনি স্থায়ী হয়ে ফিরে আসেন শিমলায়।

দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি টান আর ব্যক্তিগত জীবনে পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা নানা বর্ণে ধরা দিয়েছে তাঁর ছবিতে। বোহেমিয়ান স্বভাবের অমৃতা ১৯৩৬ সালের দিকে ভারতের বিভিন্ন জায়গা দেখতে দেখতে পাহাড়ি এলাকাগুলিও ঘুরে দেখেছেন। পারিবারিক বলয়ে মেয়েদের সর্বক্ষণ আবৃত রাখার ব্যাপারে তাঁর খানিকটা আপত্তি থাকতে পারে (ভিভান সুন্দরমের অমৃতা সংকলন বই থেকে জানা যায়, পরে মেরি আনতোনিত্তের সিমলা থাকার সিদ্ধান্তকে অনেকে সমালোচনা করেছিলেন এই বলে যে, অমৃতা রুচিশীল উচ্চকিত বহুমাত্রিক একটি জনসংস্কৃতির পরিমণ্ডল থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন প্রাথমিক বয়সে। আর সিমলার ঔপনিবেশিক এলিটিজম অমৃতার মনোজগৎকে রক্ষণশীল করে থাকতে পারে)। তারপর বহুদিন বাদে অমৃতা যখন ফরাসি শিল্পকলার পাঠ শেষ করে ভারতে ফিরলেন তখন তিনি নিজেকে অনেক প্রতিভাবান দেখতে পেতেন, নিশ্চিতভাবে নিজেকে আবিষ্কার করতে পারতেন উত্তর ভারতের সবচেয়ে প্রগতিশীল সংস্কৃতি সংস্পর্শে। প্রথম থেকেই তিনি লাহোরে বাস করতেন। শেরগিল পরিবার তখন সিদ্ধান্ত নেয়, সিমলায় তারা পাহাড়ি উপত্যকায় বাড়ি কিনবে, যা মূলত ওমরাও সিংয়ের পারিবারিক জমিদারি থেকেও অনেক দূরে। অমৃতার মা মেরি আনতোনিত্তে চেয়েছিলেন একটি আনন্দঘন ব্যক্তিগত জীবন। সেভাবেই তিনি খানিকটা দূরত্ব রচনা করেছিলেন নিকটাত্মীয়দের কাছ থেকে। শেরগিল পরিবার রুচিশীল একটি বাড়ি বানিয়েছিল সিমলায়। অমৃতা এবং তাঁর দুই বছরের ছোট বোন ইন্দিরা তখনো স্কুলে যেতেন না। তাঁদের জন্যে বাড়িতেই শিক্ষক রাখা হয়। ইংরেজি আর ফরাসি শিখতেন তাঁরা বাড়িতে। নাচ আর পিয়ানোতেও ভর্তি হন তাঁরা। তৎকালীন মহারাজা ভূপিন্দর সিংয়ের আমন্ত্রণে ১৯২৩ সালের গ্রীষ্মে ফ্লোরেন্সের ভাস্কর প্যাস্কুইনেলি এসেছিলেন এই শহরে। তিনি তখন মার্বেল পাথরের আবক্ষ মূর্তি বানাতেন। মেরি আনতোনিত্তে তাঁকে বাড়িতে নিমন্ত্রণ করেন। কিছুদিনের মধ্যেই তিনি তাঁদের পারিবারিক বন্ধুতে পরিণত হন। একপর্যায়ে মেরি আনতোনিত্তে তাঁকে কমিশন দিয়েছিলেন তাঁর দুই কন্যা অমৃতা ও ইন্দিরার আবক্ষ মূর্তি তৈরি করতে।

অমৃতার বয়স তখন দশ। চিত্র-প্রতিযোগিতায় নাম লেখান মা আনতোনিত্তে। অমৃতা সেখানে প্রথম পুরস্কার পান। পঞ্চাশ টাকা। মাত্র দশ বছরের অমৃতার অনন্য প্রতিভার পরিচয় পেয়ে তাঁর মা সিদ্ধান্ত নেন মেয়েকে দেশের বাইরে পড়তে পাঠাবেন। চিত্রকলার জন্যে ফ্লোরেন্স তখন দারুণ মোহনীয়। রেনেসাঁসের শিল্প-আন্দোলনের রেশ চারপাশে। ফ্লোরেন্স তখন শিল্পকলায় সারাবিশ্বেই আকর্ষণীয়। যদিও বেশিরভাগ ভারতীয় তখন ব্রিটিশ শিক্ষাকেই সবচেয়ে অগ্রগণ্য ভাবতেন। কিন্তু ওমরাও সিং বনেদি সাংস্কৃতিক আবহে বাস করতেন। অন্য ভারতীয়দের থেকে তাঁর রুচি আর জানাশোনা কিছু ভিন্ন ছিল। তাঁরা তাই সিদ্ধান্ত নেন অমৃতাকে নিয়ে ফ্লোরেন্স যাবেন।

প্যারিতে ছবির স্কুলে অমৃতার ক্লাসমেট বরিস তাসলিৎস্কি নিজেও পরবর্তীকালে বিখ্যাত শিল্পী হিসেবে প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। দুজনের ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা কম হয়নি। অমৃতার বিখ্যাত ছবি ‘ইয়ংম্যান উইথ অ্যাপলসে’র (১৯৩২) যুবকটি বরিসই, অন্য কেউ নন। হ্যান্ডসাম যুবক বরিস গায়ে সাদা শার্ট, হাতে তিনটি লাল আপেল, ১৯৩০-এর দশকে প্যারির প্রদর্শনীতে অন্যতম আকর্ষণে পরিণত হয়। বরিস অমৃতাকে ভালোবাসার কথা অকপটে জানিয়ে গেছেন : ‘‘তার সঙ্গে আমার দেখা ১৯৩০-এ, আমি ব্যু আর্টসের শিক্ষার্থী। যখন অমৃতা ঢুকল চারদিকে অতিকায় নীরবতা, কারণ তার উপস্থিতিই বিশাল। আমার বয়স তখন উনিশ আর অমৃতার সম্ভবত সতেরো। এত কম বয়সে সে এত ভালো ছবি আঁকছে যে, আমাকে বিস্মিত হতে হয়। আমি তার প্রেমে পড়ে যাই। এটাই একমাত্র শিল্প-শিক্ষালয়, যেখান ছেলেমেয়ে পাশাপাশি বসতে পারে, অন্য তিনটিতে বসার ব্যবস্থা আলাদা। কিছুকাল পর আমি এখান থেকে চলে যাই নদী পেরিয়ে ল্যুভে। এই সময়ে অমৃতা আমার তিনটি পোর্ট্রেট করেছে, আর আমার মায়ের একটি। আমাকে পোর্ট্রেটগুলো বিক্রি করে ফেলতে হয়। আমিও অমৃতার দু-তিনটি পোর্ট্রেট করি। অমৃতা আমাদের বাড়িতে আসত। যখন ছুটি কাটাতে যেত, তার ফোনোগ্রাম আর রেকর্ডগুলো আমার কাছে রেখে যেত। তার মা ছিল সংগীতশিল্পী এবং আধা-হাঙ্গেরিয়ান। তাদের বাড়িতে প্রায়ই গানের আসর বসত। আমি খুব গরিব ছিলাম আর সে কারণেই (তার মা) একবার আমাকে সতর্ক করে দিয়েছিল, ওকে স্পর্শ করবে না। বরিস বলেছেন, অমৃতা মানুষের জীবনাচরণ নিয়ে অত্যন্ত আগ্রহী ছিল। চিত্রকলা ও সংগীতের সঙ্গে তার আবেগময় সম্পৃক্ততা। তার মা ছিলেন অনেকটা অনলবর্ষী ব্যক্তিত্বের অধিকারী, বাবাকে কদাচিৎ দেখা গেছে আর বোনটির মধ্যে বড্ড লুকোচুরি ভাব। ‘আমি তার প্রেমে ডুবেছিলাম, কিছু দিন তার কাছ থেকে একইরকম সাড়া পেয়েছি, তারপর একদিন আমাকে বলল, হাঙ্গেরিতে তার এক কাজিনের সঙ্গে তার প্রেমের সম্পর্ক রয়েছে। তাকে সে বিয়ে করবে। তার নাম ভায়োলা।”

প্যারিতে অমৃতার শেষ বছর ১৯৩৪ দুজনের মধ্যে মাঝেমধ্যে দেখা হয়ে যেত। নিরাবেগ অভিবাদনে পরস্পরকে স্বাগত জানাতেন। ততদিনে বরিসও রাজনীতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়েছেন। দ্বিতীয় মহাযুদ্ধ চলাকালে কমিউনিস্ট শিল্পী বরিস গ্রেফতার হন। নাৎসি বাখেনওয়ান্ড বন্দিশিবিরে আটকে রাখা হয় তাঁকে। এখানেই তাঁর মাকে হত্যা করা হয়। ১৯৪৬ সালে মুক্ত বরিস পাবলো পিকাসো ও অন্যান্য শিল্পীদের সঙ্গে ‘প্রতিবাদের জন্য শিল্প’ শীর্ষক প্রদর্শনী করেন। তিনি রাজনৈতিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিত্ব হয়ে ওঠেন।

বরিসের বয়স যখন নব্বই বছর, অমৃতার জীবনী-গ্রন্থকার যশোধারা ডালমিয়া তাঁর সঙ্গে প্যারির স্টুডিওতে দেখা করেন। তিনি লেখককে বলেন : “একসময় আমাদের দেখা হলে ‘গুড মর্নিং’ কিংবা ‘গুড ইভনিং’ বিনিময় করেছি, কিন্তু সেই উষ্ণতা আর ছিল না। প্যারি ছেড়ে যাবার পর তার সঙ্গে আমার আর দেখা হয়নি। ১৯৮৪ সালে ‘ফেস্টিভ্যাল অব ইন্ডিয়া ইন প্যারিসে’ বড় এক চিত্রপ্রদর্শনীতে ক্যাটালগের প্রচ্ছদে অমৃতার ছবি দেখে আমি পুরনো সেই দিনগুলোতে ফিরে যাই। তার ছবির যেসব রিপ্রোডাকশন দেখলাম তা আগের সময়ের ছবির চেয়ে অনেক বেশি বদলে গেছে। আগের ছবিগুলো ছিল সরল, তাতে থাকত সামাজিক কৌতূহলের প্রকাশ। প্যারিতে থাকা কালে অমৃতা সাধারণত ন্যুড এবং পোর্ট্রেটই আঁকত আর তার সবই প্যারির প্রভাবে। কিন্তু পরে যেসব ছবি দেখলাম তা ভিন্ন প্রভাবের, তাতে মানুষের জীবন বিধৃত।”

দেশীয় ঐতিহ্যের প্রতি টান আর ব্যক্তিগত জীবনে পাশ্চাত্যের ধ্যান-ধারণা নানা বর্ণে ধরা দিয়েছে তাঁর ছবিতে। একেবারে ভারতীয় পটভূমির এসময়ের ছবিগুলির মধ্যে Brahmacharis, Village Scene, Three Girls, South Indian Villagers, Tribal Women, Child Bride, Resting, Bride’s Toilet ইত্যাদি বোদ্ধাদের মতে অমৃতার জীবনের এক-একটি মাস্টারপিস।

এর মাঝে ‘ব্রহ্মচারী’র কথা আলাদা করে না বললেই নয়। অমৃতা শেরগিল, যার আঁকা সেরা কাজগুলি ন্যুড আর সেক্সের আবহে ব্যঞ্জনাময় হয়ে উঠেছে, তিনিই পাঁচ সংসারত্যাগী কিশোর ব্রাহ্মণকে ব্রহ্মচারীরূপে ক্যানভাসে তুলে ধরেছেন দেখে অবাক হতে হয়! আরও আছে তাঁর আঁকা Spanish Girl, Gipsy Girl, Namaskar, Hungarian Peasant, Hungarian Village Church। বর্তমানে ভারতের সবচেয়ে দামি চিত্রশিল্পী হলেও অমৃতার শিল্পীজীবন কেটেছে অগুরুত্বপূর্ণ এক অখ্যাত শিল্পী হিসেবে। তাঁর ভাগ্য খানিকটা ডাচ মাস্টার ভিনসেন্ট ভ্যান গঘ আর ফ্লেমিং জুনের শিল্পী স্যার ফ্রেড্রিক লেইটনের মতন। বেঁচে থাকতে ভ্যান গঘ যেমন দুইয়ের অধিক চিত্রকর্ম বিক্রি করতে পারেননি, তেমনি অমৃতাও শিল্পী হিসেবে খুব কমই সমাদৃত হয়েছেন। অমৃতার জীবনের গন্তব্য নির্ধারিত হয়েছিল প্যারির এই একোল দ্য বোজার শিল্পবিদ্যালয় থেকে।

উত্তর ভারতের একটি পাহাড়ি উপত্যকার মেয়ে অমৃতা শেরগিল শিল্পশিক্ষা নিতে এসেছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে খ্যাতিমান শহরে, যে-শহর ছিল তখন সারা পৃথিবীর সাংস্কৃতিক পীঠস্থান। শিল্পকলার রাজধানী। এটি নিশ্চিতভাবে শিল্পের ইতিহাসে দুর্লভ ঘটনা। অমৃতার শিল্পীজীবনকে ত্বরান্বিত করেছিল তাঁর পারিবারিক সিদ্ধান্তটি। অমৃতার জীবনব্যাপী দেখি এর প্রভাব। ছবি আঁকার প্রতি তাঁর অপরিসীম ভালোবাসা, উৎকণ্ঠা, আবেগ। সারাজীবন তিনি ভারতের অমৃতসর, লাহোর, আগ্রা, দিল্লি, সিমলা আর ইউরোপের নানা অঞ্চল- বুদাপেস্ট, জেবেগনি, হাঙ্গেরি, প্যারি, রোম ঘুরে বেড়িয়েছেন। প্রথম জীবনে ফ্রান্সেই তিনি শিল্পী হিসেবে খ্যাতি লাভ করেন। তারপর তিনি ভারতবর্ষকে নতুন করে আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে এর শিল্প-সংস্কৃতির প্রতি আশ্চর্য টান অনুভব করে ফিরে এসেছিলেন সেখানে। একসময় প্রাচ্য আর প্রতীচ্য মিলে অমৃতা হয়ে উঠেছিলেন মিথ। তাঁকে প্রাণিত করেছিল পশ্চিমা শিল্প-আন্দোলনের নির্যাস। ফ্রা্ন্সের শিল্পসমৃদ্ধ ঘটনা তাঁর চিন্তাজগৎকে আলোড়িত করেছিল। আরেক দিকে প্রাচ্যের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য তাঁকে মোহিত করেছিল। নিজের ভেতরে অনুভব করেছিলেন তিনি ভারতবর্ষের শেকড়, তার প্রাচীন চিত্ররীতির বনেদি জৌলুস। একদিকে কাংড়া বাশোলি কিষানগড় তেহড়ি গাড়োয়াল চিত্ররীতির ছাঁট, আবার অন্যদিকে নিজের মধ্যে বহন করেছিলেন তিনি মায়ের ঐতিহ্যে পাওয়া ইউরোপের ইম্প্রেশনিস্ট রঙের আভিজাত্য আর ফর্ম। এই দুই সংস্কৃতির দ্বিবিধ নির্যাসে তিনি বেড়ে উঠেছেন। তাই অনায়াসে তাঁর রক্তে প্রবাহিত হয়েছিল এই দুই সংস্কৃতির আশ্চর্য ঐকতান। আর সেখানেই অহর্নিশি খোঁজা এবং উৎসারণ পরে তাঁর ভবিষ্যতের শিল্পীজীবনকে সুনির্দিষ্ট করেছিল। সাংবাদিক খুশবন্ত সিং তাঁর সম্পর্কে তাঁর আত্মজীবনীতে বলেছেন- Love formed very little part of Amrita’s life, sex was what mattered to her. তাঁর বাইসেক্সুয়াল কর্মকাণ্ড এবং লিভ টুগেদারের সঙ্গী-সঙ্গীনীদের সংখ্যা অনেক।

এ বিষয়ে তাঁর সরল স্বীকারোক্তি ছিল- Naked came I out of my mother’s womb and naked shall I return there; তাই, অমৃতা’র অসামান্য প্রতিভায় আঁকা ন্যুড সিরিজ আর আত্মপ্রতিকৃতিগুলো তাঁর শিল্পভুবনে একটা অসমান্য স্থান দখল করে থাকবে, সেটাই তো স্বাভাবিক!

তাঁর আঁকা Reciling Nude, Nude Group, Two Girls, Sleep, Professional Model এগুলোর মাঝে সবচেয়ে বিখ্যাত ন্যুড পেইন্টিংটির নাম হল ‘Sleep’, শ্বেতশুভ্র বিছানায় একজন নগ্ন যুবতী নারীর ঘুমের দৃশ্য। পৃথিবীতে অসংখ্য ন্যুড ছবি আছে, কিন্তু তার মাঝেও অনন্য এটি। শিল্পমানের বিচারে যেটি আরেক ফরাসী মাস্টার আমেদিও মদিগলিয়ানির Red Nude-এর সমতুল্য। জর্জিনো, এদুয়ার মনে, তিসিয়ান, বতিচেল্লি, রেমব্রাঁ থেকে শুরু করে পৃথিবী-খ্যাত সবার আঁকা ন্যুড চিত্রের মধ্যেও এটি যেন আলাদা। জর্জিনো তাঁর স্লিপিং ভেনাসে, এদুয়ার মনে তাঁর অলিম্পিয়া’তে, বতিচেল্লি তাঁর বার্থ অফ ভেনাস, তিসিয়ান তাঁর রাইজিং ভেনাস, রেমব্রাঁ তাঁর বাথসেবায় চাতুর্যের সাথে লুকিয়ে রেখেছেন নারীর গোপনাঙ্গ। কিন্তু অমৃতা তাঁর স্লিপে নারীকে এঁকেছেন একদম নিজস্ব স্টাইলে, রাখঢাকহীন অকৃত্রিমভাবে- যেখানে নগ্নতার মাঝে ঘুমের সৌন্দর্য কতটা মোহনীয় ও সুখকর হতে পারে, তা অনুভব করা যায়। তাঁর আঁকা শায়িত নারীর শরীর থেকে উজ্জ্বল লাল আর হলুদ আভা ফুটে বেরুচ্ছে প্রগাঢ় ঘনত্বে। সম্ভবত অমৃতার প্রিয় রঙ ছিল লাল। আর তাই অমৃতা এই লালের প্রতি ভালোবাসার কথাও স্বীকার করেছিলেন এভাবে- Red is not only the auspicious color of marriage, it signifies sexuality.

অমৃতা মনেপ্রাণে যে দুজন চিত্রশিল্পীকে কিছুটা অনুসরণ করতেন তাঁদের একজন হলেন পল সেজান আরেকজন পল গগাঁ। একারণেই সম্ভবত জীবনের সেরা এবং সাহসী ছবিটি এঁকেছিলেন তিনি ১৯৩৪ সালে। এটি ছিল তাঁর নগ্ন আত্মপ্রতিকৃতি ‘Self portrait as Tahitian’, এখানে অমৃতা নিজেকে তুলে ধরেছেন তাহিতি দ্বীপের মেয়েদের মতন করে। তাহিতি’র প্রতি অমৃতা’র এই ভালোবাসার কারণ হল তাঁর প্রিয় চিত্রশিল্পী গগাঁ। ফ্রান্সে জন্ম হলেও নিজের দেশে যথার্থ সম্মান না পেয়ে গগাঁ ১৮৯১ সালে চলে যান নির্জন তাহিতি দ্বীপে আর সেখানেই সৃষ্টি করেন তাঁর ভুবনবিখ্যাত তিন মাস্টারপিস ‘Tahitian Women’, ‘Where do we come from’ এবং ‘By the sea’।

পল গগাঁর এই তাহিতিপ্রীতি সঞ্চারিত হয়েছিল অমৃতার মাঝেও, সেই ভালোবাসা থেকেই তিনি নিজেকে নিয়ে এঁকেছেন ‘সেলফ পোট্রেট অ্যাজ তাহিতিয়ান’। তবে গগাঁ যেমন তাঁর মডেলদের ফুল দিয়ে যৌনউদ্দীপক হিসেবে সাজাতেন, অমৃতা তা করেননি। বরং তাহিতির মেয়েদের প্রতীক হিসেবে নিজেকে নিসুতো আর নিখুঁত করে এঁকেছেন।

অমৃতা শেরগিলের বোনের ছেলে ও খ্যাতিমান শিল্পী ও অমৃতার জীবনীকার ভিভান সুন্দরম লিখেছেন : “ইউরোপে থাকা কালে অমৃতা প্রতিবছরই হাঙ্গেরি যেতেন –  একদিকে প্যারি ও ফরাসিদের কাছ থেকে দূরে থাকতে (প্যারি ও ফরাসিদের জন্য তাঁর বড় কোনো ভালোবাসা গড়ে ওঠেনি) এবং অন্যদিকে হাঙ্গেরির গ্রামাঞ্চলে নিজের মানুষদের সান্নিধ্য লাভ করতে। তাঁর কাছে হাঙ্গেরি ভালোবাসা ও সৌন্দর্যের দেশ আর এখানকার সরল ও সৎ কৃষক, তাদের ভাষা ও সংস্কৃতি তাঁর বিশেষ প্রিয়।

প্যারিতে আধুনিক চিত্রশিল্পের অভ্যুদয় ঘটেছে এমন একটি সমাজ থেকে যেখানে ধনতন্ত্রের ঐতিহাসিক বিকাশ সাম্রাজ্যবাদী স্তরে এসে পৌঁছেছে। এখানে আধুনিক চিত্রকলার অনেক নিরীক্ষা প্রযুক্তির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট আর এর ধরন অনেক ক্ষেত্রে যান্ত্রিক এবং সমাজের অমানবিকীকরণকে প্রতিফলিত করে। অমৃতা যে পরিবেশে বেড়ে উঠেছেন, সেখানে এসব সম্পূর্ণ অনুপস্থিত। তিনি যখন প্যারিতে গেলেন বিংশ শতক হয়ে উঠল কেবল তাঁর নিজের অভিজ্ঞতার কেন্দ্র।

তার মানে এই নয় যে, সমকালীনতা এবং শিল্প-সংস্কৃতির অগ্রগামী আন্দোলন সম্পর্কে তিনি বিস্মৃত ও প্রতিক্রিয়াশীল ছিলেন। তিনি আগ্রহ নিয়ে পড়াশোনা করেছেন, তাঁর পছন্দের লেখকদের মধ্যে ছিলেন বোদলেয়র, ভ্যালেরি, দস্তোয়ভস্কি, থোমাস মান, জেমস জয়েস, ডি এইচ লরেন্স এবং আঁদ্রে আদি ও ডেজো সাজবোর মতো লেখক। তাঁর সাহিত্যরুচি উপন্যাসের অন্তর্দর্শী ও মনস্তাত্ত্বিক বিষয়ের প্রতি তাঁর আগ্রহকে প্রকাশ করে। অমৃতার প্রিয় উপন্যাসের তালিকায় ছিল : দস্তোয়ভস্কির দ্য ব্রাদার্স কারামাজোভ, দ্য ইডিয়ট এবং দ্য পসেসড; থোমাস মানের দ্য ম্যাজিক মাউন্টেন এবং মার্শেল প্রুস্তের সোয়ানস ওয়ে ও রিমেমব্র্যান্স অব পাস্ট থিংস।
অমৃতা ভারতে ফিরে এলেন কারণ প্যারিগমনের প্রাথমিক উত্তেজনা মিইয়ে যাবার পর মেট্রোপলিসে তাঁর অভিজ্ঞতা যন্ত্রণাদায়ক হয়ে উঠেছিল। তাঁর রোমান্টিক দৃষ্টিভঙ্গির প্রাবল্য পশ্চিমের সমাজ ও শিল্পের যে বিপুল পরিবর্তন তাকে প্রত্যাখ্যান করে। তাঁর আনুষ্ঠানিক শিল্প-মনোজগৎ সময়ের চেয়ে মনে হয় পিছিয়ে ছিল; তিনি সম্ভবত অনুধাবন করতে পেরেছেন নিজেকে এগিয়ে নিয়ে প্যারির আধুনিক চিত্রকলায় গুরুত্বপূর্ণ কোনো অবদান রাখা তাঁর পক্ষে অসম্ভব। তিনি জানতেন ভারতের চিত্রকলায় তেমন গুরুত্বপূর্ণ কেউ নেই, এখানে কাজ করার প্রয়োজনই বেশি। এই ভাবনাই তাঁকে আত্মানুসন্ধানের জন্য ভারতে ফিরে আসতে তাগিদ দিতে লাগল। ক’বছর পর তিনি ঘোষণা করলেন, ‘‘ইউরোপ পিকাসো, মাতিস এবং অন্যদের, কিন্তু ভারত কেবল আমার।’’

শিল্পসমালোচক কার্লখান্ডালাভালা অমৃতার ছবির সমালোচনা করতে গিয়ে লিখেছেন, হাঙ্গেরির পেস্ট, ভেরোসের প্রকৃতি পাওয়া যায় অমৃতার ছবিতে। এর বিপরীতে আরেকটি শৈলী তাঁকে প্রাণিত করেছিল, যেটা ছিল নাটকীয়- সারফেস ফ্ল্যাট রেখে নম্র ধরনের। এটা অমৃতা পুরোপুরি আয়ত্ত করতে পারেননি বলে মনে করেন অনেকে। সমস্ত দৃশ্যকল্পকে প্রত্যক্ষ করার এক আশ্চর্য প্রখরতা ছিল ওর চরিত্রে। মাকে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার ছবিতে তুমি শুধু চাষির জীবন দেখবে। ভিনসেন্টের সঙ্গে আমার পার্থক্য নেই বেশি।” যার সাক্ষ্য হিসেবে তিনি পটেটো পিলার ছবিটি আঁকেন। হাঙ্গেরির সাধারণ খাদ্য আলু। এই আলুচাষিকে অমৃতা ভারতের হিমাচল প্রদেশেও দেখেছেন। তাঁর ছবিতে চাষি ছিল অতিরিক্ত শ্রমভারে ন্যুব্জ, বিষন্ন। তাঁর ‘হলদি গ্রাইন্ডার’ ছবিতে বাহ্য জগৎকে প্রতীকরূপে গ্রহণ করার ইঙ্গিত পাই আমরা। ফিগারের কম্পোজিশন সিমেট্রিক। উজ্জ্বল কমলা রংকে মেটে রং দিয়ে ম্রিয়মাণ করে তুলতেন। রঙের মূল উৎসের পশ্চাৎপটে অন্ধকার মিশিয়ে দেওয়ার ব্যাপারে দারুণ দক্ষ তিনি। পেছনে তিনটি অন্ধকারের উল্লম্ব পুনরাবৃত্তি সামনের সাদা রংকে ছাড় দেয়। গেরিমাটি রঙে বিষাদ মলিন পরিবেশ, যেখানে দিনের আলো প্রায় শেষ হয়ে এসেছে, কমলা রঙের আভায় নিস্পৃহতা।

শৈলজ মুখার্জী বলেছেন – “অমৃতা খানিকটা মাঁতিসের দ্বারা প্রাণিত ছিলেন। অমৃতার ছবিতে গীতিকাব্যের রং পাওয়া যায়। সাদা, ক্যাডলিয়াম, হলুদ, উজ্জ্বল লাল, এমারেল্ড সবুজ, ভ্যানেসিয়ান লাল, আলট্রামেরিন, আইভরি ব্ল্যাক। অদ্ভুত এক সাদার আধিক্য ‘স্টোরি টেলার’ অথবা ‘এলিফ্যান্ট প্রমেনাদ’ ছবিতে দেখা যায়। এই রঙের ব্যবহার অমৃতাকে ভারতের পাহাড়ি কাংড়া আর বাশোলির প্রতি ঐতিহ্যলগ্ন থাকার ইঙ্গিত দেয়। ফোরশর্টেনিং, পরিপ্রেক্ষিত নেই তাঁর ছবিতে। উজ্জ্বল রঙের সঙ্গে অস্পষ্ট সংমিশ্রণ প্রাচ্য ঘরানার পরিচায়ক। শান্ত পরিবেশে তীব্র আবেগের ভূমি রচনা করেন তিনি শুধু রং দিয়ে। ভারতীয় চিত্রকলায় এক রবীন্দ্রনাথ ছাড়া আর কেউ এভাবে রং ব্যবহার করেননি। এই রং চিত্রের অবিচ্ছেদ্য অঙ্গ হিসেবে অমৃতার ছবিতে অমরতা পায়। রঙের অবারিত জমক ছিল অমৃতার ছবির প্রাণ। মেটে লাল, বাদামি, সবুজ আর অদ্ভুত সাদাকে নানাভাবে ব্যবহার করতেন তিনি। চামড়ার রং বাদামি। খরখরে ত্বক। শিল্প-সমালোচক কার্লখান্ডালাভালা লিখেছিলেন – “অমৃতা শেরগিল অতীতের শৃঙ্খল থেকে মুক্ত করেছিলেন ভারতবর্ষের ছবিকে।” প্রভাব ছিল সেজানের। অজন্তার একটা ফ্রেস্কো অমৃতাকে যতখানি প্রভাবিত করেছিল, ইউরোপীয় রেনেসাঁর রাফায়েলের ম্যাডোনা বা ভিঞ্চিতেও তিনি ততখানি প্রভাবিত ছিলেন না। অমৃতা বলতেন – ‘হোলবাইন বা ভিঞ্চির রেখা অজন্তার মতো নয়। অজন্তার রেখায় প্রাণ আছে। এই দেহরেখা পৃথিবীতে নেই।’ যাকে কনট্যুর বলা যায়, ক্যানভাসে, পাথরে যা হিরে-জহরতের মতো জ্বলে থেকে হারিয়ে যায়। দেহের আকার রেখা নয় শুধু। ড্রয়িংও নয়। শুধু গাঢ় ফিকে করলেই যেখানে নানাবিধ তল-অতল পাওয়া যায়। বাস্তবের নয় কিছুই। মোগল অনুচিত্রের ফুল, নকশা ইত্যাদির স্টাইলাইজেশন তাঁকে প্রভাবিত করে থাকবে। রাজপুত ঘরানার প্রতি খানিকটা আকৃষ্ট হন তিনি। গাঢ় ও হালকা রঙের তারতম্যে আভাসিত প্রকৃতি আঁকেন। তাঁর ছবিতে নারী-পুরুষের অভিব্যক্তি চোখে শুধু নয়, দেহরেখাতেও প্রগাঢ় হয়ে ফোটে। কেউ কেউ সমালোচনা করেছেন – ভারতের আদি বুনিয়াদ বুঝতো না অমৃতা। অজন্তা ঘুরে অমৃতার ছবি পরিণত হয়েছিল।” সমালোচক কার্লখান্ডালাভালা আরও বলেছেন, “বেঙ্গল স্কুলকে আঘাত করেছিল অমৃতার ছবি। ভারতবর্ষের দরিদ্র মানুষদের আঁকতে গিয়ে অমৃতা আনন্দ প্রকাশে সফল হয়েছিলেন। তাঁরা মনে করতেন, অ্যাকাডেমিক রিয়ালিজমের বিপরীতে তাঁর ছবির অবস্থান। এক হাতে বিরুদ্ধভাব, বৈরিতা, অন্য হাতে একটি স্বতন্ত্র নতুন ধারা। চোখ থেকে কতগুলো জিনিস যত দূরে সরে যায় ততই তাদের আনুপাতিক সম্বন্ধগুলো বদলে যেতে থাকে। ওজন আছে, সতেজ শিরদাঁড়া আছে, এমন মুখ আঁকতে গেলে ছন্দগঠনে জোর দিতে হয়, সেদিকে অমৃতা অনন্য অবদান রেখেছেন।

এই মহান নারী শিল্পীর মৃত্যুকে শিল্পবোদ্ধারা অভিহিত করেছেন নানা উপমায়, তার মাঝে অন্যতম হল- The princess who died unknown। বোদ্ধাদের হিসেব মতে তিনি ভারতবর্ষের প্রথম আধুনিক শিল্পী। দিল্লীর একটি এলাকার নাম রাখা হয়েছে অমৃতা শেরগিল মার্গ, একাধিক ডাকটিকিটে আছে তাঁর হিল উইমেনসহ নানা চিত্রকর্ম নিয়ে। বতিচেল্লি, জর্জিনো, গুস্তাভ কুরবের সাথে তাঁর আঁকা ‘স্লিপ’ পৃথিবীর সেরা ন্যুড মাস্টারপিস। একজন শিল্পীর জীবন এর চেয়ে সার্থক আর কীভাবে হতে পারে?

শেরগিল সম্পর্কে ভারতের ‘দ্যা ডেইলি টেলিগ্রাফ’ লিখেছে- She provided a role model for women artists of future generation. তাঁকে যেসব উপমায় মহিমান্বিত করা হয় তার অন্যতম হল তিনি ভারতের ফ্রিদা কাহলো।

অমৃতা বিয়ের কথা ভাবতে পারেন নি। কিন্তু যখন ভবিষ্যতের দিকে তাকিয়েছিলেন, নিজেকে ‘নিঃসঙ্গ বুড়ি’ হিসেবে কল্পনা করে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছেন। শৈশব থেকেই তিনি জেনে এসেছেন, একদিন তাঁর প্রিয়তম বন্ধু এবং মামাতো ভাই ভিক্টর এগানকে বিয়ে করবেন। তিনি এক বন্ধুকে লিখলেন, “আমি নিজেকে ভালোভাবেই বোঝাতে সক্ষম হয়েছি যে, বিয়ে করার জন্য আমার জন্ম হয়নি। কিন্তু আমি চেষ্টা করে যাচ্ছি… আমি কোনো আদর্শ স্ত্রী হতে পারব বলে মনে করি না।” অমৃতার জীবনীগ্রন্থের কিছুটা এখানে উল্লেখ করি : “ভিক্টর তখন হাঙ্গেরিতে, তখনো চিকিৎসাশাস্ত্র অধ্যয়ন করছে। দুজনই সম্মত হন যত শিগগির সম্ভব অমৃতা হাঙ্গেরিতে ফিরে আসার এবং ভিক্টরের মেডিক্যাল স্কুল শেষ না হওয়া পর্যন্ত প্রায় দেড় বছর সেখানেই থাকবেন। অমৃতা এটাও স্পষ্ট করে জানালেন, তারপর দুজনেই ভারতে ফিরে যাবেন কারণ তিনি কেবল ভারতেই ছবি আঁকার কাজটি করতে পারবেন, ইউরোপে নয়।”

অমৃতার মা-ই একসময় এই যুগলকে কাছাকাছি হবার সুযোগ করে দেন। দুজনের বিয়ের প্রস্তাবটি তাঁরই। কিন্তু অমৃতা যখন মা-বাবাকে জানালেন যে তিনি ভিক্টরকে বিয়ে করতে যাচ্ছেন, তখন বিস্ময়কারভাবে তাঁরা পুরোপুরি এর বিরুদ্ধে চলে যান। তাঁর মা চাইলেন, অমৃতা ধনাঢ্য ও সামাজিকভাবে সুপ্রতিষ্ঠিত কাউকে বিয়ে করুক; বাবার কথা এত নিকটাত্মীয়ের সঙ্গে বিয়ে নয়। বিয়ের যে সিদ্ধান্তই তিনি গ্রহণ করে থাকুন না কেন, তাঁর প্রণয়প্রার্থীদের তিনি তেমন প্রত্যাখ্যান করেননি। সিমলাতে স্বল্পকাল অবস্থানের সময় ওয়াল্টার কলিন্স নামের এক ইংরেজ যুবকের সঙ্গে তার নৈকট্যের সুযোগ সৃষ্টি হয়। তিনি তাঁর সঙ্গে মানসিক ও শারীরিক সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েন। হাঙ্গেরিতে যাবার পথে তিনি নিশ্চিত হন যে, তিনি গর্ভবতী হয়ে পড়েছেন।  তিনি চাইলেন জাহাজেই তাঁর গর্ভপাতের ব্যবস্থা করা হোক। জাহাজের ডাক্তার চেষ্টা করলেন, কিন্তু সফল হলেন না। অমৃতার জীবনীগ্রন্থ থেকে আবারও কিছুটা তুলে দিচ্ছি :
“জাহাজ যখন নেপলসে ভিড়ল তিনি অবাক হয়ে দেখলেন ভিক্টর তাঁর জন্য প্রতীক্ষা করছেন। ভিক্টরও জাহাজে উঠলেন এবং তাঁরা একসঙ্গে জেনোয়া পর্যন্ত সফর করলেন – অমৃতার গর্ভধারণের কোনো প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলো না। জেনোয়াতে নেমে তাঁরা একসঙ্গে রাত কাটালেন এবং পরদিন বুদাপেস্টের ট্রেন ধরলেন। ১৯৩৮-এর জুলাই মাসের প্রথম দিকে তাঁরা বুদাপেস্ট পৌঁছালেন, অবস্থান করলেন ভিক্টরের মায়ের দু’রুমের ফ্ল্যাটে।… হাঙ্গেরির জন্য সময়টা মোটেও শান্তিপূর্ণ ছিল না। দ্রুতই অমৃতার রক্তপাত শুরু হলো এবং বড় একটি জমাটবাঁধা রক্তখণ্ড বেরিয়ে এলো। অমৃতার স্বাস্থ্য নিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্ত ভিক্টর পরীক্ষার জন্য এটি মেডিক্যাল ল্যাবরেটরিতে পাঠালেন। তিনি জানলেন, এটি একটি মৃত ভ্রুণ। অমৃতার গর্ভধারণ তাঁদের সম্পর্কের ওপর কোনো প্রভাব ফেলতে পারেনি। প্রথম সুযোগে ভিক্টর যখন রেজিমেন্ট থেকে বুদাপেস্টে ফিরলেন, ১৬ জুলাই ১৯৩৮, রেজিস্ট্রার অফিসে তাঁদের অনাড়ম্বর বিয়ে সম্পাদিত হলো। পরদিনই ভিক্টরকে তাঁর রেজিমেন্টে যোগ দিতে হলো। রণাঙ্গন এড়াবার জন্য ভিক্টর দীর্ঘ ছুটি নিয়ে সস্ত্রীক দেশত্যাগ করেন। ১৯৩৯-এর জুন মাসের মাঝামাঝি কলম্বো হয়ে ভারত এসে পৌঁছান। তারপর শুরু হয় নবদম্পতির অর্থনৈতিক সংগ্রাম। ডাক্তার হিসেবে ভিক্টরের মাসিক আয় একশত ষাট রুপির মতো, আর অমৃতার মা মেয়ের জন্য প্রতিমাসে সরবরাহ করতেন একশো রুপি– ভালো জীবনযাপন করার স্বপ্ন ধূলিসাৎ হতে শুরু করে। যুদ্ধ ও বিষণ্নতা দুজনের জীবনকেই জটিল ও দুঃসহ করে তোলে। অমৃতার ছবি নিয়ে প্রশংসার বন্যা বয়ে যায়। কিন্তু তা বিক্রি হয় না। অমৃতা রং-তুলি থেকে হাত গুটিয়ে নিতে শুরু করেন। ভিক্টরের সঙ্গে সম্পর্ক শীতল হতে থাকে। মানুষ সম্পর্কে তাঁর বিপুল আগ্রহ দ্রুত হ্রাস পেতে থাকে। মানুষের কাছে আর যেতে ইচ্ছে করে না। ১৪ মার্চ ১৯৪১ বোন ইন্দিরাকে লেখেন, ‘আমি নার্ভাস ক্রাইসিসের মধ্য দিয়ে যাচ্ছি, এখনো তা অতিক্রম করতে পারিনি। আমি সৃজনহীন হয়ে পড়ছি, অসন্তুষ্ট হচ্ছি, বিরক্তি আমাকে ঘিরে রেখেছে, আমি এমনকি কাঁদতেও পারছি না’।”

৩ ডিসেম্বর ১৯৪১, অমৃতা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ডাক্তার স্বামী ভিক্টরের মতে তিনি আমাশয়ে ভুগছিলেন। তাঁর অবস্থার দ্রুত অবনতি ঘটে এবং তিনি অজ্ঞানাবস্থায় চলে যান। ৬ ডিসেম্বর অবস্থার চরম অবনতি ঘটলে যখন ডাক্তার রঘুবীর সিংকে ডাকা হয়, তিনি বলেন, অনেক দেরি হয়ে গেছে। ভয়াবহ জলশূন্যতা ও পেরিটোনাইটিসে তাঁর অন্ত্র বিক্ষত হয়ে গেছে। ভিক্টর যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থা করেননি এই অভিযোগও ওঠে। ৭ ডিসেম্বর ১৯৪১ রাভি নদীর তীরে শিখ শ্মশানে মা-বাবাসহ অল্পসংখ্যক বন্ধু ও স্বজনের উপস্থিতিতে মাত্র আটাশ বছর বয়সে তখনকার ভারতের অন্যতম শ্রেষ্ঠ শিল্পী অমৃতা শেরগিলের চিতায় অগ্নিসংযোগ করা হয়। বন্ধুদের বর্ণনা থেকে জানা যায়, কফিনে অমৃতার মুখটি কাশ্মীরি শালের ভেতর আশ্চর্য বিধ্বস্ত ছিল। পরদিন তাঁর দেহভস্ম ছড়িয়ে দেওয়া হয় রাভি নদীর স্রোতে। মাত্র কয়েক বছরের মাঝে এই শিল্পী পৃথিবীকে যা দিয়ে গেছেন তার জন্য তাবৎ পৃথিবী আর শিল্পমহল কৃতজ্ঞতাভরে তাঁকে স্মরণ করবে। প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মেলবন্ধন তিনি ঘটিয়েছিলেন স্বমহিমায়- আপন রেখায়-রঙে-ঢঙে। অমৃতা শেরগিলের জীবনশৈলী আর চিত্রবোধ একত্রে এমনভাবে মিশে গেছে যাকে পৃথক করে দেখা যায় না। অমৃতা তাঁর তীব্র যৌনতাবোধের আলোয়-অন্ধকারে অনুভব করেছিলেন রঙের বৈভক, বিকাশ ও বিন্যাস। যৌনআনন্দ পীড়নে যে সুখ তিনি উপভোগ করেছিলেন সেই আনন্দ আর যন্ত্রণাবোধ রঙের বিন্যাসে ও শৈলীতে ছবির মধ্যে গতি পেয়েছিল। এত কিছুর পরও তিনিই প্রথম ভারতীয় আধুনিক চিত্রশিল্পী, সমকালের অনেকেই সেটা মানতে পারেননি। ফলে, তাঁকে ব্রাত্য হয়েই থাকতে হয়েছিল বহুদিন। পরে তাঁর আধুনিক শিল্পচেতনাকে ধীরে ধীরে আন্তরিকভাবে তুলে ধরা হয়েছে বা হচ্ছে। এরই ধারাবাহিকতায় তাঁর জন্মশতবার্ষিকীতে (২০১৩) গুগুলের ডুডলে স্থান পায় অমৃতার আঁকা ‘থ্রি গার্লস’ ছবিটি, যে ছবিটিতে ভারতীয় নারীদের দুর্দশার কথা ফুটে উঠেছে। ভারতীয় নারীরা পুরুষতন্ত্র প্রভাবিত চিরাচরিত জীবন থেকে যেন মুক্তি পায় না। গতানুগতিকভাবেই জীবন কাটাতে হয় ভারতীয় মহিলাদের। দুর্ভাগ্যজনকভাবে এটিই ভারতের বাস্তব চিত্র। ভারত, ইন্দোনেশিয়া, কেনিয়া, কাজাখস্তান, আর্হেন্তিনা, চিলি, পেরু, আইসল্যান্ড, পর্তুগাল, সার্বিয়া, লিথুনিয়া এবং জাপানের গুগল হোমপেজে দেখা যায় এই ছবি৷ কিন্তু বিচিত্র সুরে বাঁধা এই শিল্পী দূরের কেউ নন, আমাদেরই ভারতবর্ষীয় একজন মহান শিল্পী।