আফগানিস্তানের তিনটি কবিতা > ভূমিকা ও ভাষান্তর : মঈনুস সুলতান >> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
179

আফগানিস্তানের তিনটি কবিতা

আফগানিস্তানে কবিতা রচিত হয়ে থাকে প্রধানত পোশতু ও ফার্সি বা স্থানীয়ভাবে পরিচিত দারী ভাষায়। এখানে তিনটি ফার্সি বা দারী কবিতার ভাবানুবাদ উপস্থাপন করা হচ্ছে।

দারী কবিতায় আধুনিকতার সূত্রপাত হয় মূলত ষাটের দশকের প্রথম দিকে পাশের দেশ ইরানের ফার্সি কবিতার বিবর্তনের প্রভাবে। ইরানে ‘ফ্রি স্টাইল পোয়েট্রি’ বলতে বোঝায় প্রবাহমান মুক্তক ঘরানার কাব্যকলাকে, যা প্রচলিত হয় পঞ্চাশ দশকের শেষ দিকে। এক্ষেত্রে মুক্তক ঘরানাকে ধ্রুপদী কাব্য-প্রকরণের দৃঢ় রীতিকলা ভেঙে ভিন্ন একটি ভাবনা-প্রধান কাব্যশৈলী নির্মাণের উদ্যোগ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। ইরানের যশস্বী কবি নিমা ইউশিজ-কে (১৮৯৭-১৯৫৬) মুক্তক কাব্যশৈলীর অগ্রণী কবি বলে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। তাঁর নাম থেকে মুক্তক কাব্যশৈলী ‘নিমায়ী’ কবিতা হিসাবে ইরান ও আফগানিস্তানে পরিচিত হয়ে ওঠে।

আফগানিস্তানেও ‘নিমায়ী’ কাব্যশৈলী বলতে ধ্রুপদী কাব্যকলার বন্ধনমুক্ত হাল জামানার আধুনিক ভাবনা-বিষয়ক কবিতাকে বোঝানো হয়ে থাকে। আফগানিস্তানে ‘নিমায়ী’-রীতি বিকশিত হতে থাকে ষাটের দশক থেকে। এবং সে আমলের কবিদের ‘নিমায়ী’ ধারার ‘ফার্স্ট ওয়েভ’ বা ‘প্রথম তরঙ্গ’ধারার কবি বলা হয়। সত্তরের দশকের দারী ভাষার কবিরা ‘নিমায়ী’ ধারার ‘সেকেন্ড ওয়েভ’ বা ‘দ্বিতীয় তরঙ্গে’র কবি হিসাবে পরিচিত। নব্বই দশক থেকে আজ অব্দি কবিদের অনেকেই ‘নিমায়ী’ ধারার ‘থার্ড ওয়েভ ’বা ‘তৃতীয় তরঙ্গে’র ধারক হিসাবে নিজেদের পরিচয় দিতে ভালোবাসেন। এখানে অনূদিত কবিত্রয় যথাক্রমে ষাট, সত্তর ও আশি দশকের। দারী থেকে সরল ইংরেজিতে কবিতাগুলোর মূল ভাব অনুবাদে সহায়তা করেছেন কাবুল এডুকেশন ইউনিভারসিটির তৎকালীন রিসার্চ অ্যাসিসট্যান্ট ও ইন্টারপ্রিটার মোসাম্মৎ ফিরিস্তা সমন্দর।

ওয়াসেফ বাখতারী

যশস্বী কবি বাখতারী’র জন্ম ১৯৪২ সালে, শৈশবে বেড়ে ওঠেন প্রান্তিক শহর মাঝার শরীফে। উচ্চমাধ্যমিক স্তর থেকে পড়াশোনা মূলত কাবুলে। যুক্তরাষ্ট্রের কলোম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে মাস্টার্স ডিগ্রি লাভ করেন। ছিলেন কাবুল বিশ্ববিদ্যালয়ে সাহিত্যের অধ্যাপক। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে অনুবাদকেরও কাজ করেন কয়েক বছর। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্রে প্রবাসী। পঞ্চাশের দশকে লেখালেখির সূত্রপাত হলেও পাদপ্রদীপের আলোয় আসেন ছ’য়ের দশকে। তিনি ‘নিমায়ী’ কাব্যধারার প্রথম তরঙ্গের পথিকৃত কবিদের অন্যতম।

অগ্নিরোগ

আনারের রক্তাক্ত দানার মতো
লোহিত হরফ দিয়ে লেখা
আমার ভাগ্যের হালখাতা
তার ছিদ্রময় প্রতিটি পাতা,
জলন্ত অঙ্গার হয়ে যেন
পুড়ছে আমার হৃদয়
যারা স্পর্শ করে এ বিধিলিপি অগ্নিময় –
এবং দিতে চায় সজল ত্রাণ
পুড়ে ভষ্ম হয় তাদের প্রাণ;
এ দুর্যোগ –
লোহিত এ অগ্নিরোগ
কুরে কুরে খায় আমাদের
সমুদয় আনন্দ উপভোগ।

আবদুল সামী হামিদ

চিকিৎসা বিজ্ঞান নিয়ে পড়াশুনা করলেও কবি সামী হামিদ পেশায় মূলত সাংবাদিক। তবে রাজনৈতিক কার্টূন আঁকিয়ে হিসাবেও তিনি যশস্বী। ‘এসোসিয়েশন ফর দি ডিফেন্স অব আফগান রাইটারর্স রাইটস’-এর তিনি যুগ্ম-প্রতিষ্ঠাতা। একসময় সম্পাদনা করতেন আন্ডারগ্রাউন্ড সংবাদপত্র ‘সালাম’। ২০০৩ সালে ‘কমিটি টু প্রটেক্ট জার্নালিস্ট’ বা ‘সিপিজে’ তাঁকে ‘ইন্টান্যাশনেল প্রেস ফ্রিডম’ নামক পুরষ্কারে সম্মানিত করে। একই সালে তিনি আততায়ীর ছুরিকাঘাতে মারাত্মকভাবে জখম হন এবং জনসমক্ষে আসা ত্যাগ করেন। লেখালেখির সূত্রপাত ষাটের দশকের শেষ দিকে হলেও জনপ্রিয় হন সত্তরের দশকে। তাঁর বইপত্র প্রকাশিত হতে থাকে আট এর দশক থেকে। তিনি ‘নিমায়ী’ কাব্যধারার দ্বিতীয় তরঙ্গের কবি হিসাবে বিবেচিত।

এক হাজার এবং দ্বিতীয় রাত

ঠিক জানিনা সহনক্ষমতা কতটুকু আমার উদভ্রান্ত হৃদয়ের
ধংসস্তূপের লোহিত পুষ্পটি বাঁচবে কি না সন্দেহ আছে ঢের,
বসন্তের স্বর্গীয় দূত যে কৃষ্ণ খেচর – বাঁধবে কী সে নীড়
নেই তো কবোষ্ণ দেয়ালগিরি কোন – বইবে না সিগ্ধ সমীর।

আছে হয়তো দেয়ালে গর্তের নোনাধরা সংকীর্ণ বিস্তার
তাতে জায়গা হবে কী নীড়ের শুকনো পাতা খড়কুটার?
ফোঁটায় ফোঁটায় তপ্ত মোমের মতো গলে নিয়তি আমার
শিখাপ্রিয় সুদর্শন মথ কী জেনে যাবে বিষয়টা এবার?

হাজার রজনী অতিক্রম করে আসবে যখন দোসরা রাত
মহিমান্বিত হবে কী কিংবদন্তির শাহেরজাদের বরাত?

মোহাম্মদ করিম নাজিহি জিলওয়া

হাল জামানার জনপ্রিয় কবি জিলওয়া’র জীবনের অনেকগুলো বছর কেটেছে পাকিস্তান ও ইরানের শরণার্থী শিবিরে। আশির দশকে তাঁর লেখালেখির সূত্রপাত হয় পাকিস্তানের বেলুচিস্তান প্রদেশে হাতেলেখা পত্রিকা ও মিওিগ্রাফ করা ম্যাগাজিনে। নব্বই দশক থেকে তাঁর রচনা প্রকাশিত হতে থাকে কাবুলের পত্রপত্রিকায়। বর্তমানে কবি কাবুলে বাস করছেন। তাঁকে ‘নিমায়ী’ কাব্যধারার তৃতীয় তরঙ্গের কবি বিবেচনা করা হয়ে থাকে।

হৃদয়ের বেদনার বিষয়

সে ছাড়া কেউ তো জানে না আমার হৃদয়ের দগদগে জখম
বাড়িওয়ালা ছাড়া আর কে-ইবা খবর রাখে
ঘরের নকশা – খুঁটিনাটি – গালিচা… আসবাবপত্র কত রকম
দেখেছে কারা তার নির্মমতার নজীর
যা ডেকে আনে ধংস বিষাদ অবশেষে সমূহ বিনাশ
জলন্ত চূলা ছাড়া অন্য কেউ কী বুঝতে পারে
আগুন ছড়াতে পারে কতোটা সন্ত্রাস?

যখন লিপ্ত হতে চাই তার সাথে ঝগড়া বিবাদ দ্বন্দ্বে
ভালোবাসার চোরাস্রোতে নিমজ্জিত হই –
মুগ্ধ হই আমি কোঁকড়ানো অলকের মৃদু ছন্দে

সরল পাখি জানবে কীভাবে
কতোটা তফাত বার্ডফিডার আর ফাঁদে
জড়াই কীভাবে দেহজ প্রলোভনে – কীসের টানে
উঠে যাই যশের অভ্রভেদী ছাদে

বিজ্ঞজনের প্রাজ্ঞমনে আমার কামনা কুহেলী
আদতে বাকচাতুরীর শিশুতোষ ছল
প্রতিফলিত হয় তার নেশাতুর চোখে
দুই ভুবনের কোলাহল।

যদিবা কখনো বন্ধ হয় স্বর্গের দুয়ার
কী হবে জুলুমের যজ্ঞে পুড়িয়ে তাজা তনুমন
স্বর্গ মোসাফির এক জেনো
তোমার ভেতরেও আছে নিজস্ব ভুবন।