আফতাব আহমদ এবং গুলতেকিন খান > কবিতাগুচ্ছ >> যুগলবন্দি

0
378

আফতাব আহমদ >> কবিতাগুচ্ছ

মুগ্ধতা

কারো কারো কথা আজো মুগ্ধ হয়ে শুনি।
ভাবি, কি করে পারেন তারা ডামাডোলে
খুঁজে পেতে বীরচিহু ঘোর রণভূমে –
চোখ বুজে বলে যেতে ঋজু কণ্ঠস্বরে
যা কিছু স্বর্গীয় ছিল তার ইতিহাস,
ত্রুটিহীনতার গল্প, সাফল্যের গান।

কারো আঁকা ছবি আজো মুগ্ধ হয়ে দেখি।
ভাবি, পিতা, এত যে জটিল মেঘরাশি
ভেসে ভেসে নীলাকাশ হেলায় সাজালো,
ভাঙলো পুরোনো বাড়ি নিজের নিয়মে –
তারা পারে, আমি কেন এখনো পারিনা,
জটিল আদলগুলি সরলতা দিয়ে,
কয়েকটি আঁচড়ে তুলে আমার এই
প্রেমশূন্য খাতাকে ভরাতে অনায়াসে?

১৯ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

নুড়ি

পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া নুড়ি,
পর্যটনী বিলাস কোথায় পাবে?
ঝর্ণা যেদিন নিরুদ্দেশে গেল,
সেদিন থেকে আত্মহনন শুরু।

শুষ্ক শেকড় হারিয়ে প্রিয় মাটি,
আমাকে নাও আমাকে নাও কাঁদে :
সুদূর থেকে পাহাড় স্বর্গভূমি;
বেদনা নেই সবুজ ফটোগ্রাফে।

ঈগল ডানার চিহ্ন মাখা মেঘ;
ভাঙে, গড়ে, একই গল্প লেখে।
সিসিফাসের স্বপ্ন শেকল পরা,
আধমরা গাছ হয়না দেশান্তরী।

সামনে আঁধার অতীত বিস্মৃত,
জীবন খোঁজে ঝর্ণা অথই হ্রদে :
পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়া নুড়ি,
শ্যাওলা মাখার সময় কখন পাবে?

৪ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

ত্রিকাল ডুবেছে যার

বর্ষার কালো চুলে ভেসে এল রাতের রুমাল
এখন সময় নয় হাসিমুখে কাউকে ক্ষমার
রাত্রি আর মানবে না তোদের নষ্ট লোকাচার
ত্রিকাল ডুবেছে যার, তার নেই আগামী সকাল।

অভিমানে ভিজে ওঠে মানবীর শ্রাবণ অধ্যায়
কপট শব্দের ভারে মুছে যায় শিল্পের সাজ –
মেকি আধুনিকতার নামে লিখুক লম্পট আজ
বাচাল দর্শনতত্ত্ব, অর্থহীন গদ্য অতিকায়।

৭ সেপ্টেম্বর, ২০১৩

গল্প

গল্পটা এরকম ছিল না কখনো…
সবকিছু শুরু থেকে শেষ হয় জানি,
কিছু গল্প শেষ থেকে শুরু হতে পারে।

হয়তো আকাশ ছিঁড়ে বৃষ্টি নামেনি,
হয়তোবা মেঘদূত অপেক্ষায় দূরে
উত্তর নেবে বলে এখনাে দাঁড়িয়ে।

মাথা উঁচু সান্তিয়াগো নিঠুর সাগরে
মারলিন গেঁথে আছে অপলক চোখে;
উঠোনে একটি কোণা এখনো ভেজেনি,
নয়নচারার দিকে হাঁটছে কিশোর।

কিছু পাড় ভেঙে গিয়ে হয়তো ওঠেনি,
গানগুলি থেমে গেছে ঠোঁটের ওপারে।
কিছু স্বপ্ন নিভে গিয়ে হয়তো মরেনি।
গল্পটা এরকম ছিল না মোটেই…

৩০ আগস্ট, ২০১৩

যদি চাও

যেতে চাইলে যাবে।
কারো পথ চেয়ে রং ফিকে হয় নাকি?

কোনো আয়ুষ্মন গাছ।
মনে রাখে তার নীচে কারা থেমেছিলো?

আলো সব ছায়া হবে, ছায়াগুলি আলো।
দোয়াতের কালিটুকু
ধুঁকে ধুঁকে অবশেষে হয়তো শুকাবে।

মেঘদূত ভাবে
প্রাপক হারিয়ে গেলে
শেষ চিঠি কার কাছে যাবে?

৬ অক্টোবর, ২০১৫

প্রপাত

ঝরা পাতা
অশ্রু আর
অবিরাম ঝরে যাওয়া।
এই বৃষ্টিকণা;

ধূমকেতু
প্রাক-গোধূলির ছায়া
মরা কটালের হাওয়া
প্রজাপতিদের আনাগোনা;

আমিও তাদের
মতো
ঝরে যাই;

তুমি তা জানোনা।

২ আগস্ট, ২০১৫

হারানো বাড়ির খোঁজে

একটি কিশোরী আজো
বর্ষায় জল হয়ে কাঁদে।

হারানো বাড়ির খোঁজে
একটি কিশোর আজো
অনিশ্চিত পায়ে হেঁটে যায়…

২৬ সেপ্টেম্বর, ২০১৪

ব্যালেরিনা

তোমাকে দেখবে বলে সব পাতা হয়ে ওঠে আজো ব্যালেরিনা;
যা কিছু পুরোনো ছিল, তাও হেসে আনমনে অধীরা নবীনা।

আজীবন ক্ষরা থেকে আলগোছে কিছু গল্প বাঁচিয়ে রেখেছো,
বুক জুড়ে অন্ধকার, ভোরের আলোকে তবু আঙুলে মেখেছো।

আসেনি অনেক চিঠি, পর্যটনে বহু জল গড়িয়েছে দূরে,
আইভি লতারা কেঁপে পাথরকে জড়িয়েছে তৃষ্ণার সুরে।

হারানো পথের খোঁজ করেনি তোমাকে জানি তবু স্বপ্নহীনা;
তোমাকে দেখবে বলে শীতের পাতারা তাই আজো ব্যালেরিনা।

২১ নভেম্বর, ২০০৯

লিন্ডসে স্টারলিং – ঊনত্রিংশতি অধ্যায়

তুমি তো মিশ্রকেশী, গান্ধর্ব সন্ধ্যা নামে চারিদিকে
বেহালায় তুমি হাত দিলে।
স্বয়মপ্রভা হয়ে নেচে যাও গিরিখাতে, পাহাড় চূড়ায়,

এত যে রহস্যে মোড়া জীবনের যতিচিহ্নগুলি
বেহালার সাজো তারে বাঁকানো খিলান হয়ে ওঠে,
আমাদের সব স্বপ্ন বরফের বৃষ্টি হয়ে ঝরে।

বেহালা বেহুলা তুমি, আলগোছে ঢেকে দাও
মৃতনগরীতে ফেলা নিরুদ্দিষ্ট সকল শিমুল।
বেহালা তোমার হাতে সূর্যোদয়ের মতো হাসে,
ঝর্ণাজলের মতো কাঁদে,
রহস্যের তার ছিঁড়ে
মাতাল চিত্রলেখা সুরের আক্ষেপ হয়ে নেচে চলে।
মোহনার দিকে।

১১ জানুয়ারি, ২০১৬

খোঁপাতে তার শালুক দোলে

কথা ছিল এই পাবনে
দেখতে তারে যাবো
কোথাও খুঁজে পাইনা তারে
বৃথাই বিসর্জন।

শোনরে বেলী, শোনরে যুঁথি,
শোনরে তোরা শোন,
মনের মধ্যে লুকিয়ে থাকে
পাগলপারা কোণ।

যতই তারে খুঁজিস পথে
অস্ত্র ঢেকে অয়েল ক্লথে
দেয়ালে দিস ধরার নোটিশ
পুলিশি সমন,

সাত রাস্তায় দেখবি হঠাৎ
দাঁড়িয়ে আছেন সাহসিনী
খোঁপাতে তার শালুক দোলে
আঙুলে আই-ফোন।

১৮ ডিসেম্বর, ২০১৪

আধো ঘুমে, ডিঙিনৌকো


বেলা শেষে সব কিছু
ছবি
হয়ে
যায়…


আধোঘুমে,
ডিঙিনৌকো,
দিকভ্রান্ত ঘুড়ি,
আজো ডাকে আয়,
কাছে আয়…


যাদুর সিন্দুকে
স্মৃতি,
পাখির পরান…


চোখের পাতায় থাক
সব গান,
সব অভিমান…


কাটেনা
কুয়াশা দিন
আজো…

১৪ এপ্রিল, ২০১৫

 

[কবিতাগুলির উৎস : আফতাব আহমদের কাব্যগ্রন্থ “যা কিছু স্বর্গীয় ছিল”, প্রকাশক : ফারেনহাইট]

গুলতেকিন খান >> কবিতাগুচ্ছ

মনে হয়েছিল

সবকিছু বুঝে গেছি, এমনটা মনে হয়েছিল।
কি করে বালির শাপে নদী যায় একদিন মরে,
কেতকী গাছের শোকে বর্ষা কেন নামে যে অঝোরে,
রেলিঙে তোমার হাত ছুঁতে গেলে কেন যায় সরে।

সব কিছু ভেঙে যায়, এমনটা মনে হয়েছিল।
মেঘ-সিঁড়ি, বাস্তুভিটে, পাথরে খোদাই করা নাম,
সেগুন কাঠের শিল্প, কবিখ্যাটতি নয়নাভিরাম,
চটজলদি বিয়ে ভাঙে ভেঙে যায় গ্রাম।

সব কিছু পেয়ে গেছি, এমনটা মনে হয়েছিল।
বুঝিনি সাধের ঝর্ণা কোথা থেকে কোথায় গড়ালো।

২৫ জুন, ২০১৯

বৃষ্টি

চেঁচিয়ে পাড়া মাত করলো যারা,
মুক্তো তারা চোখেই দেখেনি;
জীবন তাপে শুকনো যাদের চোখ,
অশ্রু তাদের মুখকে ঢাকেনি।

ভাগ্য কারো পাথর চাপা থাকে
কারো থাকে হালকা পাতায় ঢাকা।
যাকে পেলে বৃষ্টি নামে মনে, তারে
লোকোভয়ে যায়না সঙ্গে রাখা।

আমাকে গান গাইতে বলে যারা
পিছন থেকে সোনায় তরবারি,
আমি তাদের চিনি ভালো, তবু,
না গেয়ে গান থাকতে কি আর পারি?

৬ মে, ২০১৬

ওড়ো

যে জল আকাশে ওড়ে, হতে পারে সেও নিরাবেগ,
কখনো, কখনো। যখন শোকের ঝাঁপি খুলে বসে
মৃতপ্রায় শুকনো লোকালয়, জলের স্বপ্নগুলি
ঘুমায় তৃষ্ণার্ত বুকে, নির্লিপ্ত ভেসে যায় মেঘ।
ঠুলি ও ধর্ম ওড়ে জেরুজালেমের দীর্ণ পথে।

গোধূলিতে হামাগুড়ি দিয়ে
মায়ের ছিন্ন হাত দুই হাতে চেপে ধরে
যে ছেলে থামল একা, গুলিবিদ্ধ বাবার শিয়রে,
ধূলি ও জলের মাপে
তার ওজন হবে না কখনো।

যদি পারো, তাকে বুকে ধরে,
উড়ন্ত জলের স্বপ্নে ডেকে দিয়ো।
বল তাকে, মাটিতে দুঃখ রাখো,
আগামীকালের জন্য জেগে ওঠো;
শোকহীন ভেসে যাও—
মেঘ হও, মেঘ হয়ে ওড়ো

নহবৎ

জলের আলখাল্লা পড়ে মায়েস্ত্রোর ছড়ি হাতে
আকাশ দ্যা খো ভোরে।

মাটির প্রাচীন ক্ষোভ,
পৃথিবীর সব ক্ষত আগুনের যত অহংকার,
সুর হয়ে নামলো অঝোরে।

দু’হাতে মেঘের গান ধরে থাকি পার্সিফোনি হয়ে,
ভাবি কবে জীবনের বেড়ে ওঠা সব অভিমান
দিকচক্রবালে যাবে সরে।

১১ জুন, ২০১৬

পরবাস

কোন দিকে যাওয়া যায় একথা ভেবেছো বহুকাল
উৎস থেকে মোহনায় অথবা উল্টো দিকে হেঁটে
জন্ম অবধি।
বাঁ দিকে সাগর রেখে ডান দিকে বালি
যদি যাওয়া যেত ভূমধ্যসাগর ঘেঁষে দূরে।
তারপর অতলান্ত জলে ব্যর্থ ডুবে যাওয়া।

যদি পারো মেঘের অপেক্ষা করো আরো কিছুদিন
সূর্য মাথায় নিয়ে হেঁটো না,
তপ্ত বালিতে পা পুড়ে যাবে।
তৃষ্ণার্ত থেকে যাবে যে টুকু স্বপ্ন ছুঁয়ে আছো।

তুমি চলে গেলে, এই সমতলে
কে জাগাবে ঘুমন্ত পাখিদের, ফুলপরীরা গাইবে কি কোনো গান গির্জার কয়ারে?
এত সহজে কি ভোলা যাবে পিয়ানোয় আমার আঙুল?

৪ অক্টোবর, ২০১৫

পাঁজর

আমার বড় একলা লাগে
পাঁজর থেকে ব্যাংটি বলে।
কাঁদছো কেন, বন্ধু আছে
আশেপাশেই, নামবে জলে?

বন্দী থাকা কঠিন ভীষণ,
সূর্য দেখবো একটুখানি!
বোকার মত কি সব বল?
সকাল-বিকেল চোখে পানি!

ঘ্যানর ঘ্যানর কেঁদে কেটে
মাথার মধ্যে কথা বলে।
বোঝাই তাকে আদর করে
জাম গাছে কি আঙুর ফলে?

১৮ সেপ্টেম্বর, ২০১৫

সাহস

আমাকে দিও না দুঃখ বলেছিল সে
সে কথা শোনেনি নদী, এমনকি সেও
বসেছে পসরা নিয়ে, হয়নি পাংতেও
বার বার একথাই কেন মনে আসে?

আমাকে দিও না দুঃখ বলেছিল সে
বোঝেনি সে বলেছিল তাকে ভালবেসে
ভেবেছিল এখনো সে কি সাহসে আসে
তারই কাছে,

যাকে ঠেলে দিয়েছিল নীল পরবাসে।

৩০ মে, ২০১৪

তোমার জন্য মাত্রাবৃত্তে

[আফতাব আহমদ, জন্মদিনে, তোমাকে…]

তোমার জন্য মাত্রাবৃত্তে লিখব বলে যখন ভাবি
ছিপের তিন মাল্লা মিলে হারিয়ে ফেলেন নাকের ছাবি
যখন ভাবি তোমায় নিয়ে উঠবো গিয়ে নতুন তীরে
শ্যাওলা জলে নলোক খুঁজে পানকৌড়ি যায় না ফিরে।

এমন একটা ছন্দ পেতাম তোমায় নিয়ে মুখ ঢাকা যায়
বৈঠা হেনে ছিপটি টেনে হয়ে গেছি আজ অসহায়
ঝড়ে ডোবার জাহাজ তুমি নও যে সেটা সবাই জানে
তোমার কিছু যায় আসে না মানে কিংবা অসম্মানে।

তোমার জন্য মাত্রা বৃত্তে লিখব বলে ভাবতে থাকি
নাগর দোলায় একটু সময়, আর কিছুটা থাকুক বাকি।

২ আগস্ট, ২০২৯

[কবিতাগুলির উৎস : গুলতেকিন খান ও আফতাব আহমদের ফেসবুক]