আবুল হাসান > সমস্ত বিকেলবেলা ধরে >> অগ্রন্থিত দুষ্প্রাপ্য কবিতা >> সংগ্রহ ও ভূমিকা মাসুদুজ্জামান

0
561

আবুল হাসান > সমস্ত বিকেলবেলা ধরে 

 সংগ্রহ ও ভূমিকা : মাসুদুজ্জামান

ভূমিকা  : পটভূমি ও ইতিবৃত্ত

‘সমস্ত বিকেলবেলা ধরে’ কবিতাটি আবুল হাসানের একটি অগ্রন্থিত কবিতা। তাঁর কোনো কাব্যগ্রন্থে কবিতাটি সংকলিত হয়নি। এই কবিতাটি তিনি পড়েছিলেন একটি কবিতা-পাঠের অনুষ্ঠানে। ১৯৭০ সালের ২১ জুলাই ওই স্বরচিত কবিতাপাঠের আয়োজন করেছিল জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্র। সেখানে তরুণ আমন্ত্রিত কবি হিসেবে তিনি কবিতাটি পড়েছিলেন। অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত হয়ে আরও যাঁরা কবিতা পড়েছিলেন তাঁরা হলেন আবদুল মান্নান সৈয়দ, নির্মলেন্দু গুণ, মহাদেব সাহা, আবু কায়সার ও দাউদ হায়দার। নির্মলেন্দু গুণ ওই অনুষ্ঠানেই প্রথম তাঁর সারা জাগানো ‘হুলিয়া’ কবিতাটি পড়েন। সম্ভবত সেটাই ছিল সরকারি আয়োজনে প্রথম কবিতাপাঠের আসর। শুধু তাই নয়, ওই আসরে পঠিত কবিতাগুলি পরের মাসে জাতীয় গ্রন্থকেন্দ্রের মাসিক মুখপত্র ‘বই’ (সম্পাদক সরদার জয়েনউদদীন) পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। পত্রিকার সম্পাদকীয়তে এ প্রসঙ্গে লেখা হয় : “সাম্প্রতিক কালের কবিগোষ্ঠীর মধ্যে সবচেয়ে যাঁরা তরুণতম এবং প্রতিশ্রুতিশীল সেরূপ কয়েকজন কবির কবিতা পাঠের এক আসর বসেছিল জাতীয় গ্রন্থ কেন্দ্রে জুলাই মাসের একুশ তারিখে। আমাদের আধুনিক কবিদের কবিতা দুর্বোধ্য, কেউ কেউ বলেন অবোধ্য। তাই আধুনিক কবিতার কথা উঠলেই একটা ন্যক্কারজনক ইচ্ছার প্রকাশ পাঠকের মধ্যে অতীতে লক্ষ্য করেছি। অত্যন্ত আনন্দের বিষয় সেদিনের সে কবিতা পাঠের আসর আমাদের অতীত এ ধারণা সম্পূর্ণ পাল্টে দিয়েছে। শ্রোতাগণ অপূর্ব মনোনিবেশসহ কবিতা পাঠ শুনেছেন, আরো শুনবার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। কবিতা পাঠের পর আসরে যে জীবন সোচ্চার আলোচনা হয়েছিল, তা হয়তো যারাই এ আসরে যোগদান করেছিলেন, তাঁদের স্মৃতিতে বহুদিন জাগরিত থাকবে। আধুনিক কবিতা শিক্ষাজীবনে একটা অপরিহার্য় অঙ্গরূপে দেখা দেবে এ ধারণা আমাদের ছিল, কিন্তু এতো সত্বর যে আধুনিক কবিতা সাধারণে ব্যপ্তি ও সমাদর লাভ করতে সক্ষম হযেছে তা লক্ষ্য করে আমরা সত্যই অবাক হয়েছি। পঠিত কবিতাগুলি এই সংখ্যারই (আগস্ট ১৯৭০) পত্রান্তরে প্রকাশ করা হলো।”

বলা বাহুল্য,এই সম্পাদকীয় ভাষ্য আমাদের আধুনিক কবিতার ইতিহাসের এক অনন্য দলিল। এই সম্পাদকীয়তেই প্রথম স্পষ্টভাবে স্বীকার করে নেওয়া হয় যে, আধুনিক কবিতা, যা দুর্বোধ্য বলে অভিযুক্ত করা হচ্ছিল, পাঠকরা মনোনিবেশসহকারে শুনেছেন। ষাটের নতুন কবিদের কবিতা সাধারণ পাঠকদের মধ্যে সমাদৃত হচ্ছিল। পরে এই কবিতাই যে প্রতিষ্ঠা অর্জন করবে, এই সম্পাদকীয় ভাষ্যেই তার ইঙ্গিত আছে। এখানে একটা কথা উঠতে পারে, এত গুরুত্বপূর্ণ কবিতা পাঠের আসরে কবিতা পড়ার পরও আবুল হাসান এই কবিতাটি কেন গ্রন্থভুক্ত করেননি? কারণটা, হয়তো এমন হতে পারে যে কবিতাটিকে তিনি গ্রন্থভুক্ত হবার যোগ্য মনে করেননি অথবা বই প্রকাশের সময় কবিতাটি তাঁর সংগ্রহে ছিল না। প্রকৃত কারণ, কী ছিল, আজ আর তা জানার উপায় নেই। তবে এত বছর পরে নতুন করে পড়তে গিয়ে, অন্তত আমার কাছে, কবিতাটি যে দুর্বল, সেটা মনে হয়নি।

আবুল হাসানের ৭০তম জন্মদিন উপলক্ষে কবিতাটি বই পত্রিকায় যেভাবে ছাপা হয়েছিল তার ছবিসহ তীরন্দাজের পাঠকদের জন্য পুনরায় প্রকাশ করা হল।

 

সমস্ত বিকেলবেলা ধরে

 

সমস্ত বিকেলবেলা ধরে তোমাদের কথা মনে হলো

পরিচিত মানুষের ললাট লিখন, এলোমেলো

আরো কত কিছু, সমস্ত বিকেলবেলা ধরে মনে হলো

বাদামের পাতা ঝরে গেল সমস্ত বিকেলবেলা

সুষমার চুলের কাঁটায় চুল বাঁধা হলো এলোমেলো

সমস্ত বিকেলবেলা তোমাদের কথা মনে হলো,

ঝাপসা ক’টি পথিকের সারি এলো গেলো আমি

মৃত মানুষের ঘরবাড়ী পাহারা দিলুম, দামী দামী

সুগন্ধীতে ছাওয়া কার ড্রেসিং টেবিলে দেখলুম

পড়ে আছে ক’ফোটা চোখের জল,ঝাড়া দিয়ে পারদের মাঝে তাকালুম

কে এসে দাঁড়ালো ফের বিতর্কিত সমস্ত বিকেলবেলা তাই

তোমাদের কথা শুধু মনে হলো, তোমরা এখানে কেউ নাই!

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here