“আমাদের দুজনের ভাবনাতরঙ্গ মিলে যেত” – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় >> অনুবাদ : ফারহানা আনন্দময়ী

0
536

“আমাদের দুজনের ভাবনাতরঙ্গ মিলে যেত” – সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়

বহুমুখি প্রতিভার নাম সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়। অভিনয়, লেখালিখি, নাটক, গদ্য এবং কবিতা তিনটাই, আবৃত্তি… সবেতেই তাঁর অনায়াস উজ্জ্বল চলাচল ছিল তাঁর। বাঙালি এই অভিনেতা অনেক বিখ্যাত চলচ্চিত্র নির্মাতাদের সাথে কাজ করেছেন, যাদের অন্যতম হলেন মৃণাল সেন, তপন সিনহা, অসিত সেন, অজয় কর। তবে তাঁর অভিনয়জীবনের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য সমস্ত কাজ তিনি করেছেন সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে। ১৯৫৯ সালে ‘অপুর সংসার’ দিয়ে শুরু করে ১৪টি চলচ্চিত্রে তিনি সত্যজিৎ রায়ের সহকর্মী ছিলেন, চলচ্চিত্রের মূল চরিত্রের অভিনেতা হয়ে। সৌমিত্রের খুব প্রিয় ২০টি চরিত্র নিয়ে অমিতাভ নাগ লিখেছিলেন “Beyond Apu: 20 Favourite Film Roles Of Soumitra Chatterjee” । সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে তাঁর পরিচয়, কাজের অভিজ্ঞতা নিয়ে যে সাক্ষাৎকার সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় দিয়েছিলেন এই গ্রন্থের লেখককে, সেই নির্বাচিত অংশের অনুবাদ রইলো। অনুবাদ করেছেন ফারহানা আনন্দময়ী।
আজ ১৫ নভেম্বর ২০২০-এ সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায় অনন্তলোকে যাত্রা করলেন। বিনম্র শ্রদ্ধা রইলো তাঁর প্রতি। চিরশান্তিতে থাকুন আপনার সৃষ্টিতে।

প্রশ্নঃ সত্যজিৎ রায়ের সঙ্গে আপনার প্রথম পরিচয়টি কেমন ছিল?

সৌমিত্রঃ প্রথম পরিচয়ের সেই গল্পটি খুব মজার। একদিন সকালে আমার একজন বন্ধু আমার বাড়িতেই আসছিল। বাড়ির কাছে পথেই আমার সাথে দেখা। এ কথা, ও কথা হচ্ছিল আমাদের মধ্যে। গুরুত্বপূর্ণ কোনো আলাপ নয়। ও জিজ্ঞেস করলো, কোথায় যাচ্ছি? যদিও সে ভালোমতোই জানতো, আমি কফি হাউজের দিকেই যাচ্ছি। এরপর জিজ্ঞেস করলো, সকাল থেকে কী কী করেছি! এসব কথাবার্তা যখন হচ্ছিল, আমি খেয়াল করলাম, রাস্তার অপরদিকে দাঁড়ানো একজন লোককে ও চোখ দিয়ে কী একটা ইশারা দিচ্ছে। ওকে জিজ্ঞেস করলাম আমি, লোকটা কে? বললো, “সত্যজিৎ রায়ের সহকারী। ‘পথের পাঁচালি’র পরে তিনি এর ধারাবাহিকতায় আরেকটি সিনেমা বানাতে চাইছেন; “অপুর সংসার। তিনি অপুকে খুঁজছেন। তো, তুমি তো বাংলা সিনেমায় ওভাবে কাজ করোনি, জানি না তুমি এতে রাজি হবে কিনা”। আমি অবাক হয়ে বললাম, পথের পাঁচালির পরে সত্যজিৎ রায়ের কাজ নিয়ে আমার কোনো প্রশ্নই থাকতে পারে না। এই বলে আমরা তিনজনে বাসে চেপে সত্যজিৎ রায়ের বাড়িতে এলাম। তাঁর বসার ঘরে ঢুকতেই, আমাকে দেখে তিনি বলে উঠলেন, “উহুঁ, একজন কলেজছাত্র অপুর জন্য তুমি যথেষ্ট বয়স্ক!” সেটাই ছিল আমাকে বলা তাঁর প্রথম কথা। আমি সারাজীবনেও ভুলিনি সেই প্রথম কথাটা। এরপরে বহুবার, বহুবার তাঁর বাড়িতে গিয়েছি, একসাথে বসে কাজ করেছি। কাজের প্রতি তার মগ্নতা, একাগ্রতা দেখে আমি কেবলই মুগ্ধ হয়েছি। তিনি কথা বলতেন কম। বরং শুনতেন বেশি। সামনের মানুষটিকে বলতে দিতেন। আর তার কথা বলার ভঙ্গীমা, গলার স্বর, শারীরীক ভাষা গভীর মনযোগের সাথে দেখতেন, শুনতেন। নিজের ভাবনার মধ্যে সেই মানুষকে এঁকে ফেলতেন।

প্রশ্নঃ তাঁর চোদ্দটি চলচ্চিত্রে আপনি অভিনয় করেছেন। ধারাবাহিকভাবে আপনাকে তিনি পছন্দ করে নিতেন বিভিন্ন চরিত্রের জন্য। কেন নিতেন, আপনাকে কিছু বলেছিলেন এ বিষয়ে?

সৌমিত্রঃ না। তিনি আমাকে এ বিষয়ে কোনোদিন কিছু বলেননি। তবে আমি বুঝতে পারতাম, আমাদের মধ্যে একটা সহজ বোঝাপড়া আছে। আমাদের দুজনের ভাবনাতরঙ্গ কোথায় যেন মিলে যেত। তিনিও বুঝতে পেরেছিলেন, বিভিন্ন ধরণের চরিত্রে অভিনয় করার জন্য একটা তীব্র ক্ষুধা কাজ করতো আমার মধ্যে। যে কোনো চরিত্রে নিজেকে গড়া আবার অন্য একটা চরিত্রের জন্য সেটাকে ভেঙে ফেলা…এ কাজটা আমি ভালোই পারতাম। যার কারণে অশনি সঙ্কেত-এ একজন পুরোহিত হয়েছি, হতে পেরেছি গোয়েন্দা ফেলু আবার অরণ্যের দিনরাত্রিতে শহুরে নাগরিকও। এরকম আরো আরো। তিনি জানতেন, বিভিন্নরূপের এসব মূল চরিত্রের অভিনয় করতে আমি তাঁকে নিরাশ করবো না।

সত্যজিৎ রায়ের সাথে ভাবনায় সবসময় মিলতো, তা নয়। কাজের ক্ষেত্রে মতভেদও দেখা যেত। তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রম প্রতিভা। আমি কোনোকিছুতেই তার সমকক্ষ নই। তবে একটা জায়গায় এসে নির্ভুলভাবে আমরা মিলে যেতাম। তা হলো, বাঙালি মধ্যবিত্ত চরিত্রের পরম্পরা আর রবীন্দ্রনাথ। আপনি বলতেই পারেন, এই দুটো বিষয় তো বাঙালি মাত্রই কমবেশি ধারণ করেন। হ্যাঁ, এটা অনেকাংশে সত্য। কিন্তু অন্য কোনো বাঙালি অভিনেতা কি আমার মতো করে এতটা পারেন? মনে হয়, না।

প্রশ্নঃ সত্যজিৎ এর নির্মিত এমন চরিত আছে, যেটা আপনি অভিনয় করতে চেয়েছেন। কিন্তু পারেননি। তিনি আপনাকে সেই চরিত্র দেননি?

সৌমিত্রঃ ‘গুপি গায়েন বাঘা বায়েন’-এর গুপি চরিত্রটি। আমি চেয়েছিলাম। কিন্তু তিনি মনে করেছিলেন, গ্রামের দরিদ্র কৃষকের সাথে মেলে, আমার চেহারায় সেই ছাপ নেই।
‘কাঞ্চনজঙ্ঘ্যা’তেও আমার অভিনয়ের ইচ্ছে ছিল। কিন্তু পরিচালক অরুণ মুখার্জিকে আগে থেকে তারিখের প্রতিশ্রুতি দেয়াতে, সময়ে মেলাতে পারিনি। ‘আগুন্তুক’-এও এরকম কিছু হলো। মূল চরিত্রটিতে আমার আগ্রহ ছিল। সত্যজিৎ রায় বললেন, “তোমার চেহারা আর অবয়বে এমন একটা ভালোমানুষি ছাপ আছে, যা দর্শকদের কাছে বিশ্বাসযোগ্য হবে না, যে তুমি রহস্যময় কোনো একজন মানুষ। আগন্তুক হিসেবে মূল চরিত্রটির চেহারার মধ্যে সেই রহস্য থাকা চাই, যাকে দেখে দর্শক দ্বিধায় থাকবে, সে কি আসলেই ভালো মানুষ নাকি মন্দ!” তিনি উৎপল দত্তকেই বেছে নিলেন।

প্রশ্নঃ কোনো এক সাক্ষাৎকারে সত্যজিৎ রায় বলেছিলেন। যে কোনো অভিনেতার জন্য ‘পজ’ জানাটা জরুরি, অর্থাৎ অভিনয়ের ভেতরে কোথায় বিরতি নিতে হবে। এটা একটু কঠিনও বটে। ‘অপুর সংসার’এ শর্মিলা ঠাকুরকে তিনি এ বিষয়ে অনেকটাই শিখিয়ে পড়িয়ে নিয়েছিলেন। আপনাকেও কি তেমনটা শিখিয়েছিলেন?

সৌমিত্রঃ ‘অপুর সংসার’এর জন্য তিনি আমাকে এভাবে খুব একটা নির্দেশনা দেননি। ‘অপুর সংসার’ আমার প্রথম অভিনয়ক্ষেত্র ছিল না। সিনেমায় অভিনয় করিনি আগে, কিন্তু ছোটবেলা থেকে অভিনয় তো করতাম। আমাকে একটু অন্যভাবে তিনি গড়ে নিচ্ছিলেন। প্রথমে উপন্যাসটি পড়তে দিলেন। এর কিছুদিন বাদে চিত্রনাট্য লেখার পরে সেটি আমাকে দিলেন গভীরে ঢুকে পড়ার জন্য। চিত্রনাট্যটি তিনি নিজেই টাইপ করেছিলেন। সব অভিনেতাকেই এভাবে দিতেন, তা কিন্তু নয়। শুটিং-এর তারিখ যখন কাছে এলো, দু’পাতায় অপুর চরিত্রটা তিনি নিজে হাতে লিখে আমাকে দিলেন। বিভূতিভূষণের অপুর সাথে সত্যজিতের অপুর প্রায় পুরোটা মিল থাকলেও, কিছু কিছু জায়গায় তিনি অপুকে তার নিজের মত করে প্রকাশিত করতে চেয়েছিলেন। শুটিং-এর সময়ে আমিও আমার মতো করে অপুকে সাজাতাম। পর্দায় যখন অপুকে দেখা যায় না, সেই সময়টাতে অপু কী কী করতে পারে, এরকম কিছু ভাবনা লিখে রাখতাম আমি। যাতে পুরোটা সময় আমি অপুতেই বাস করতে পারি। মানিক’দাকে দেখিয়েওছিলাম সেটা। সেটা পড়ে আমাকে তিনি উৎসাহিত করলেন আর সাথে এটাও বললেন, “এগুলো ছাড়াও অপু এ সময়টাতে অন্য কিছুও করতে পারে। তুমি ভাবতে থাকো আরো”। এভাবেই তিনি আমাকে ভাবনার জায়গাটা প্রসারিত করে দিলেন।

প্রশ্নঃ আপনার কি কখনো মনে হয়েছে, আপনি সত্যজিৎ রায়ের “One-man Stock company’ হয়ে একটি নির্দৃষ্ট জায়গায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ছেন? বা এমনো কি কখনো মনে হয়েছে, তিনি আপনাকে যথেষ্ট পরিমানে প্রশংসা করছেন না প্রচার মাধ্যমে?

সৌমিত্রঃ হ্যাঁ, সত্যি বলতে কী, কখনো কখনো আমার এমনটা মনে হয়েছে যে তিনি আরেকটু বেশি প্রশংসা করতেই পারতেন। তবে সত্য যেটা, তা হলো, তাঁর এতটা সময় ছিল না এসব নিয়ে ভাববার। আর এসবে তিনি খুব একটা বিশ্বাসও করতেন না। কিন্তু আমি আমার জীবনের সবচেয়ে সেরা প্রশংসাটা তাঁর কাছ থেকেই পেয়েছিলাম। সিনে সেন্ট্রাল ১৯৯০ তে ‘তিন দশকে সৌমিত্র’ নামে যে রেট্রোস্পেক্টিভ করেছিল, তাদেরকে তিনি আমার অভিনয় বিষয়ে চিঠিতে লিখেছিলেন, “আমার সৃষ্টিশীল জীবনের শেষ দিনটি পর্যন্ত আমি সৌমিত্রের ওপরে ভরসা রাখবো”। এর চেয়ে বেশি কি এ জীবনে আমার আর কিছু চাইবার আছে?