আমোস ওজ > দুই নারী >> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত ছোটগল্প

0
290
Joydeep chottopadhaya

আমোস ওজ > দুই নারী >> রাজিয়া সুলতানা অনূদিত ছোটগল্প

Two Women by Amos Oz, Translation: Razia Sultana

[সম্পাদকীয় নোট : আমোস ওজ (১৯৩৯-২০১৮) ছিলেন ইজরাইলি লেখক, ঔপন্যাসিক, সাংবাদিক ও বুদ্ধিজীবী। বিশ্ববিদ্যালয়ে হিব্রু সাহিত্য পড়াতেন। ১৯৬৭ সালের পর দুই-দুইবার তিনি ইজরাইরি-ফিলিস্তিনি সংকট সমাধানে কাজ করেছিলেন। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা চল্লিশ। কথাসাহিত্য ছাড়াও লিখেছেন শিশুতোষ গ্রন্থ, প্রবন্ধ। তিনি আন্তর্জাতিকভাবে এতটাই খ্যাতিমান ছিলেনযে ৪৫টি ভাষায় তাঁর বই অনূদিত হয়েছে। ইজরাইলি অন্য কোনো লেখক এই মাইলফলক ছুঁতে পারেননি। ইজরাইরের অসংখ্য পুরস্কারসহ পেয়েছেন জার্মান বুক ট্রেডের শান্তি পুরস্কার, ফরাসি সম্মাননা লিজঁ, গ্যেটে পুরস্কার, অস্ট্রিয়ার দ্য প্রিন্স অব আসটুরিয়াস সাহিত্য পুরস্কার, হেনরিখ হাইনে পুরস্কার এবং ফ্রাঞ্জ কাফকা পুরস্কার। গত ২৮ ফেব্রুয়ারি তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তাঁর স্মরণলেখ বা অবিচুয়্যারিতে নিউ ইয়র্ক টাইমস্‌ লেখে : “ওজ ছিলেন ইজরাইলের শীর্ষ বহুপ্রজ লেখক ‍আর সম্মানিত বুদ্ধিজীবী।” এখানে যে লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে তার উৎস হচ্ছে : The Best American Non-required Reading 2014, Edited by Daniel Handler]

আমোস ওজ > দুই নারী

খুব ভোরে, সূর্য ওঠারও আগে ঝোঁপ থেকে খোলা জানালা দিয়ে কবুতরগুলোর বাকবাকুম ডাক ভেসে আসছিল। গভীর, ভারি, একটানা সেই শব্দ শুনতে ভালো লাগছিল ওর। পাইনের বন থেকে মৃদুমন্দ বাতাস আর পাহাড়ের গায়ে মোরগের ডাকও মনে পরশ বুলিয়ে দিচ্ছিল। দূরে একটা কুকুর ঘেউ ঘেউ করে উঠলে আরেকটা কুকুর সাড়া দিচ্ছিল। আলার্ম ঘড়ি বাজার আগেই সেই শব্দে ওসনাতের ঘুম ভেঙে গেল। সে বিছানা ছেড়ে উঠে অ্যালার্মটা বন্ধ করে দিয়ে গোসল সেরে কাজের পোশাক পরে নিল। সকাল সাড়ে পাঁচটায় কাজের পথে পা বাড়াল কিবুজ লন্ড্রিতে। পথে দেখে বোয়াজ আর এরিয়েলার অ্যাপার্টমেন্ট তালাবন্ধ, অন্ধকার। ভাবলো – নিশ্চয়ই ওরা ঘুমোচ্ছে। সেই ভাবনায় ঈর্ষা, দুঃখ বা কষ্ট নেই, শুধুই একটা মিথ্যে ভাবনা – যা-কিছু ঘটেছে তা যেন ওর জীবনে ঘটেনি। অন্য কোনো অচেনা লোকের জীবনে তা ঘটেছে আর দু’মাস আগে নয় অনেক বছর আগে তা ঘটেছে। দিনের আলো তখনও অস্পষ্ট বলে লন্ড্রিতে গিয়ে সুইচ টিপে বাতি জ্বালিয়ে দিল ওসনাত। যে কাপড়গুলো ধুতে হবে সেই কাপড়ের ওপর ঝুঁকে পড়ে সাদা কাপড়গুলো রঙিন কাপড় থেকে, সূতিরগুলো সিনথেটিক থেকে আলাদা করতে শুরু করল। সাবানের গুঁড়া মেশাতে শুরু করলে ময়লা কাপড়গুলো থেকে ঘামে ভেজা শরীরের ক্যামন একটা টক টক গন্ধ এসে নাকে লাগছে। যদিও মেশিনের শব্দে রেডিওর শব্দ আর সঙ্গীত তেমন শোনা যায় না, ওসনাত তবুও রেডিওটা চালু রাখে। ও এখানে কাজ করে। তাই একাকীত্বকে কিছুটা সহজ করে নেয় এভাবে। সাড়ে সাতটায় ধোয়ার প্রথম পালা শেষ করে মেশিন খালি করে তাতে ময়লা কাপড় ভরে দিয়ে ডাইনিং হলে নাশতা খেতে চলে যায়। সে ধীরে হাঁটে – দেখে মনে হয় ভাবনাহীন একজন মানুষ অথবা কোথায় যাবে সেই গন্তব্য জানা নেই। এখানে আমাদের কিবুজে সবাই জানে ওসনাত ধীর, স্থির এক নারী।
গ্রীষ্মের শুরুতে বোয়াজ ওসনাতকে জানায় গত আট মাস হলো সে এরিয়েলা বরাশের সঙ্গে সম্পর্কে জড়িয়েছে। এভাবে ওদের তিনজনের এরকম মিথ্যে একটা জীবনে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। তাই সে সিদ্ধান্ত নিয়েছে- আর নয়, ও ওসনাতকে ছেড়ে দিয়ে এরিয়েলার সঙ্গে থাকবে। ওর জিনিসপত্রও নিয়ে যাবে এরিয়েলার অ্যাপার্টমেন্টে। বোয়াজ বলে, ‘ওসনাত, তুমি তো আর ছোট বাচ্চা নও। তোমাকে বুঝতে হবে এটা কোনো ব্যাপার না। পৃথিবীর সবখানেই এমন হচ্ছে, তাই আমাদের কিবুজেও হচ্ছে। ভাগ্য ভাল যে আমাদের ছেলেপুলে নেই। তাহলে আমাদের জন্য কঠিন হয়ে দাঁড়াত ব্যাপারটা।’
বোয়াজ বাইসাইকেলটা নেবে নিজের জন্য কিন্তু রেডিওটা রেখে যাবে। এতদিন যেমন দু’জনে শান্তিতে ছিল তেমনি শান্তিপূর্ণভাবেই ছাড়াছাড়ি হয়ে যাবে ওরা। এজন্য ওসনাতের রাগ হতে পারে বোয়াজের ওপর – রাগ হলেও বোয়াজ তাতে কিছু মনে করবে না, যদিও রাগ করবার মতো কিছু সে করছে না। ওকে কষ্ট দেয়ার জন্য এরিয়েলার সঙ্গে সম্পর্ক করেনি সে। এরকম হয়েই থাকে। ঘটে যায়। তবে যাই হোক, সে দুঃখিত। সে তার জিনিসপত্র যত তাড়াতাড়ি সম্ভব নিয়ে যাবে – আর শুধু রেডিওই না, ছবির অ্যালবাম, ফুলতোলা বালিশ, বিয়ের উপহার হিসেবে যে কফি সেটটা পেয়েছিল, সেটা রেখে যাবে ওর জন্য, ওসনাত বলেছিল, ‘ঠিক আছে।’
‘ঠিক আছে, মানে কী?’
‘মানে আবার কী? যেতে চাইছ, যাও।’
এরিয়েলা বরাশ দীর্ঘদেহী। বাঁকানো সরু গ্রীবা আর একহারা চিকন গড়ন ওর। চোখ দুটো হাসি হাসি, চুল যেন জলের প্রপাত। একটা চোখ সামান্য টেরা। ও একটা মুরগির খামারে কাজ করে। কিবুজের সাংস্কৃতিক কমিটিরও প্রধান সে। ছুটির দিনের নানারকম প্রোগ্রাম আর বিয়ের অনুষ্ঠান আয়োজনের দায়িত্ব থাকে ওর ওপর। শুক্রবার-রাতগুলোর জন্য লেকচারারদের আমন্ত্রণ জানানো, বুধবার-রাতগুলোতে ডাইনিং হলগুলোতে দেখানোর জন্য মুভি অর্ডার দেয়া – সবই ওকে করতে হয়। বয়স্ক একটা বিড়াল আছে ওর আর বাচ্চা একটা কুকুর। বিড়াল আর কুকুরটার মধ্যে  বেশ ভাব। প্রথমদিকে কুকুরটা বিড়ালটাকে ভয় পেত। তাই সান্নিধ্যে এড়িয়ে চলত ওর। ওর সামন দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় এমন ভাব করত যেন ও অদৃশ্য একটা কিছু, ওকে দেখতেই পাচ্ছে না। এরিয়েলার অ্যাপার্টমেন্টে দিনের বেশিরভাগ সময় দুটোই ঝিমোতো । কেউ যেন কাউকে চিনত না। একটা সোফায় আর অন্যটা নিচে কার্পেটের ওপরে থাকত।
এক আর্মি অফিসারের সঙ্গে এরিয়েলা গাঁটছড়া বেঁধেছিল বছরখানেক আগে। কিন্তু ওর স্বামী ইফরেইম ওকে ফেলে ওর চেয়ে অল্পবয়স্ক এক মহিলা সৈন্যের সঙ্গে চলে যায়। একদিন মেশিনের তেলের দাগ লাগা, ঘামে ভেজা একটা গেঞ্জি পরে বোয়াজ এরিয়েলার অ্যাপার্টমেন্টে এলে এরিয়েলা ওকে জানায় ওর পানির ট্যাপটা ঠিকমতন কাজ করছে না। টিপটিপ করে পানি পড়ে। সেইটে ঠিক করে দিতে বলে বোয়াজকে। বোয়াজের পরনে ছিল ধাতুর তৈরি বকলেস লাগানো চামড়ার একটা বেল্ট। ট্যাপের ওপরে ঝুঁকে পড়ে দেখার সময় ওর পীতাভ রঙের পিঠে ক’বার নরম করে হাত বুলিয়ে দেয় এরিয়েলা। বোয়াজ স্ক্রু-ড্রাইভার আর রেঞ্চ হাতে ঘুরে দাঁড়ায়। তখন থেকেই লুকিয়ে লুকিয়ে এরিয়েলের অ্যাপার্টমেন্টে বোয়াজের আসা-যাওয়া। এসে এরিয়েলের সঙ্গে কখনো আধাঘণ্টা আবার কখনো ঘণ্টাঘানেক সময় কাটিয়ে চলে যায়। কিবুজে কি আর সেই কথা গোপন থাকে? সবাই একদিন জেনে যায়। বলাবলি করতে থাকে – কী অদ্ভুত একটা জুটি! লোকটা একটা রা পর্যন্ত করে না, অন্যদিকে মেয়েটা অনর্গল বলেই চলেছে, থামার নাম নেই।’ কমেডিয়ান রনি শিন্ডলিন যেমন বলে – ‘মধু ভল্লুককে খেয়ে ফেলছে।’ ওদের ব্যাপারটাও সেইরকমই। কিন্তু ওসনাতকে কেউ সেভাবে বলেনি। বন্ধুরা আরও দরদ ঝরিয়ে বলেছে – সে একা নয় – ওর পাশে আছে ওরা সবসময় – কখনও কিছু লাগলে জানাতে যেন একটুও সংকোচ না করে – ইত্যাদি ইত্যাদি।
বোয়াজ সাইকেলের ঝুড়িতে ভরে ওর কাপড়চোপড় নিয়ে এরিয়েলার অ্যাপার্টমেন্টে চলে আসে। প্রতিদিন বিকেলে কাজ থেকে ফিরে গ্যারেজে গিয়ে ময়লা কাপড় ছেড়ে দরজার কাছে গিয়ে এরিয়েলার উদ্দেশ্যে বলে – ‘আজ কিছু হয়েছে?’ এরিয়েলা অবাক হয়ে উত্তর দেয় – ‘কী হবে? কিছু হয় নি। যাও গোসল সেরে এসো, কফি খাবো।’
ডাইনিং হলের গেটের শেষ মাথায় দূরে একদম বাঁদিকে অ্যাপার্টমেন্টের সবার জন্য চিঠির ক্যাবিনেট। এরিয়েলা ওর বাক্সে ওসনাতের গোটা গোটা সুস্থির হাতের অক্ষরে লেখা ভাঁজকরা একটা চিঠি পায়।
তাতে লেখা : বোয়াজ সবসময় ব্লাড প্রেসারের ওষুধ খেতে ভুলে যায়। সকালে আর বিকেলে ঘুমোতে যাবার আগে যেন ও প্রেসারের ওষুধ দুটো খেয়ে নেয়। সকালে কোলেস্টরেল জন্য অর্ধেক বড়ি খেতে যেন ভুলে না যায়। সালাদে সামান্য গোলমরিচের গুঁড়া আর লবণ – কম চর্বিযুক্ত চীজ যেন খায়। মাংস বা স্টেক খেতে একদম নিষেধ। হালকা মশলা দিয়ে মাছ আর মুরগির মাংস খেতে পারবে। রাক্ষসের মতো মিষ্টি যেন না খায়।
ইতি –
ওসনাত।
বিশেষ দ্রষ্টব্য : কালো কফিও যেন কম খায়।
এরিয়েলা বরাশের হাতের লেখা বাঁকা, কিন্তু একটানে লেখে ও। নার্ভাস হাতে ওসনাতের চিঠির জবাবে এরিয়েলা লিখল :
ধন্যবাদ আপনাকে। এতো আন্তরিকভাবে লিখেছেন আপনি। বোয়াজের বুকও জ্বালা করে কিন্তু ও বলে – ওটা কোনো ব্যাপার না। আপনি যা যা বলেছেন সব ঠিকঠাক মতন করার চেষ্টা করব। কিন্তু ওকে বোঝানো শক্ত। শরীর-স্বাস্থ্যের দিকে খেয়াল নেই একদম। অথচ অনেক বিষয় আছে যেসবের প্রতি মোটেও উদাসীন নয় ও। আপনি তা জানেন।
ইতি
এরিয়েলা বরাশ।
ওসনাত এরপর লিখল :
আপনি যদি ওকে তেলে ভাজা, টক আর ঝাল খাবার খেতে না দেন, তাহলে ওর বুক জ্বালা করবে না। – ওসনাত।
কয়েকদিন পর এরিয়েলা উত্তরে লিখল :
প্রায়ই আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি – এ আমরা কী করলাম? ও ওর অনুভূতি প্রকাশ করতে অভ্যস্ত নয় আর আমার অনুভূতি সবসময় বদলাতে থাকে। ও আমার কুকুরটাকে সহ্য করে কিন্তু বিড়ালটাকে দেখতে পারে না একদম। প্রতিদিন বিকেলে কাজ থেকে এসে জিজ্ঞেস করে – কিছু হয়েছে আজ?
এরপর গোসল সেরে কফি খেয়ে আমার হাতলওয়ালা চেয়ারটাতে বসে সংবাদপত্র পড়ে। আমি কফির বদলে চা দিতে গেলে আমার সঙ্গে রাগ করে। রাগে গড়গড় করে আর বলে – আমি যেন ওর সঙ্গে মায়ের মত আচরণ বন্ধ করি। এরপর ও চেয়ারে বসে ঝিমোতে থাকে। একসময় মেঝেতে পড়ে যায়। সকাল সাতটায় ঘুম ভাঙলে রেডিওতে খবর শোনে। এইসময়ে কুকুরটার গায়ে হাত বুলিয়ে আদর করে দেয়। অস্ফূট শব্দে বিড়বিড় করে আদরের ভাষায় কীসব বলে। কিন্তু বিড়ালটা ওর কোলে উঠলে এমন বিরক্তি আর ঘৃণা দেখিয়ে ওকে ছুঁড়ে ফেলে দেয় যে আমি ভয় পেয়ে সরে যাই। অন্যদিকে কোনো দেরাজ আটকে যায় যখন, খুলতে পারি না, ও তখন শুধু দেরাজই ঠিক করে দেয় না – ও তখন খোলার সময় শব্দ হয় বলে কাপড় রাখার আলমারির দুটো পাল্লাই খুলে ফেলে। ঠিক করে দেয় আর একটা হাসি দিয়ে জিজ্ঞেস করে ঘরের মেঝে বা ছাদ ঠিক করতে হবে কি না। আমি নিজেকে জিজ্ঞেস করি – ওর ভেতরে কী ছিল যা দেখে আমি আকৃষ্ট হয়েছিলাম। এখনও মাঝে মাঝে অনুভব করি। কিন্তু আমি ঠিক বুঝে উঠতে পারি না। গোসল করার পরও ওর নখের নিচে মেশিনের তেল কালো হয়ে থাকে। খসখসে হাতে আঁচড়ের দাগ থাকে। দাঁড়ি কামানোর পর চিবুকে খুংরামুড়া লেগে থাকে। জেগে থাকে যখন তখনও মনে হয় ঝিমোচ্ছে। কারণ, ও তো সবসময়ই ঝিমোয়। আমার ইচ্ছে হয় ওকে জাগিয়ে দিই। কিন্তু শুধু অল্পসময়ের জন্য আমি ওকে জাগাতে সক্ষম হই। কেমন করে – আপনি তা জানেন। আবার  সবসময় তাও সম্ভব হয় না। এমন একটা দিন যায় না যেদিন আমি আপনার কথা ভাবি না, ওসনাত। আমি নিজেকে এখন ঘৃণা করি আর ভাবি আপনাকে আমি যে আঘাত দিয়েছি তার কোনো ক্ষমা যদি থাকত। ভাবি, হতে পারে ওসনাত ওর যত্ন নিত না তেমন। হতে পারে ওসনাত ওকে ভালোবাসত না তেমন। তাই বা জানবো কী করে – জানা যে কঠিন। আপনি ভাবতে পারেন আমি ইচ্ছে করেই আপনার সঙ্গে এমন আচরণ করেছি। আমাদের আসলে কোনো উপায় ছিল না। নর-নারীর মধ্যে আকর্ষণের ব্যাপারটা বড় অদ্ভুত! হাস্যকরও বটে। আপনি কী বলেন? আমাদের ছেলেমেয়ে থাকলে আরও বেশি দুর্ভোগ হতো। ওর কী হতো কে জানে? ও কি সত্যিই  কিছু অনুভব করে? তা বলার কি কোনো উপায় আছে? কীভাবে? আপনি খুব ভালো জানেন ওর কী খাওয়া উচিত বা অনুচিত। কিন্তু কী অনুভব করে ও তা জানেন? ওর কী কোনো অনুভূতি আছে আসলে? আমি একবার জিজ্ঞেস করেছিলাম এ ব্যাপারে তার কোনো অনুশোচনা বা দুঃখ হয় কি না। সে আমাকে বলেছে – ‘তুমি  তো দেখতেই পাচ্ছ আমি ওর সঙ্গে নেই, তোমার সঙ্গে  আছি।’
ওসনাত, বলতে গেলে প্রত্যেক রাতে ও ঘুমিয়ে পড়ে। আমি বিছানায় শুয়ে জেগে থাকি। জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকি বাইরে। জানলার পর্দার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো এসে পড়ে আমাদের অন্ধকার ঘরে। আমি সেইদিকে চেয়ে থাকি আর ভাবি আজ আমার জায়গায় যদি আপনি থাকতেন। আপনার নিস্তব্ধতা আমাকে টানে। শুধু যদি সেই নৈঃশব্দ্যের কিছুটা আমি শুষে নিতে পারতাম! ভাগ নিতে পারতাম আপনার কষ্টের। কখনও  মধ্যরাতে আমি উঠে পড়ি, কাপড় পরে দরজার কাছে যাই – ভাবি আপনার কাছে যাব, সবকিছু বুঝিয়ে বলব। কিন্তু কী বলব আমি? বারান্দায় মিনিট পাঁচেক দাঁড়িয়ে রাতের পরিষ্কার আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকি। সপ্তর্ষিমণ্ডলটা কোথায় খুঁজে বের করি। তারপর আবার ঘরে যাই – কাপড় বদলে শুয়ে জেগে থাকি বিছানায়। সে নাক ডেকে শান্তিতে ঘুমায়। তখন হঠাৎ আমার ইচ্ছে হয় দূরে চলে যাই, একেবারে দূরে কোথাও। মনে হয় আমি আপনার কাছে, আপনার রুমে চলে আসি। প্লিজ, বুঝতে চেষ্টা  করুন, শুধু রাতের বেলায়ই আমার এ রকম লাগে যখন আমি শুয়ে জেগে থাকি, যখন ঘুম আসে না। বুঝতে পারি না কী হলো, কেন হলো আর আপনার প্রতি তীব্র নৈকট্য, একাত্মতা অনুভব করি। আপনার কাছাকাছি থাকতে চাই। লণ্ড্রিতে কাজ করতে ইচ্ছে হয় আপনার সঙ্গে। শুধু আমরা দু’জন। আপনি আর আমি। আমি আপনার চিরকুটগুলো পকেটে নিয়ে ঘুরে বেড়াই। কতবার যে ওগুলো বের করে পড়ি। প্লিজ, জানবেন আপনার চিঠির প্রত্যেকটা কথা আমার কাছে মূল্যবান আর আপনি যা লেখেননি সেজন্যও আমি মুগ্ধ। কিবুজের লোকজন আমাদের নিয়ে কথা বলে। মজা করে। ওরা বোয়াজের কথা ভেবে অবাক হয়। বলে পথে যেতে যেতে আমি আপনার কাছ থেকে ওকে তুলে নিয়েছি। মানুষ যেমন ঝুঁকে পড়ে গাছ থেকে ফুল ছিঁড়ে নেয়। বোয়াজের এতটুকুও বাঁধে না, ও দিনশেষে কোন অ্যাপার্টমেন্টে যায়, কোন বিছানায় ঘুমায়। অফিসের কাছে একদিন রনি শিন্ডলিন আমার দিকে তাকিয়ে চোখ টিপ মারে আর হাসে। বলে – ‘তো মোনালিসা, তোমাদের ভালোই চলছে তাহলে, ঠিক কি না?’
আমি কিচ্ছু বলিনি। লজ্জায় চলে গেছি সেখান থেকে। পরে বাসায় এসে খুব কেঁদেছি। ও ঘুমিয়ে গেলে কখনও কখনও আমি কাঁদি। ওর জন্য নয়, ওর কারণেও নয়, আমার জন্য। আমার আর আপনার জন্য। জঘন্য একটা ব্যাপার। আমাদের অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। সেই ক্ষতি  পূরণের নয়। অনেকসময় জিজ্ঞেস করি – ‘বোয়াজ, কিছু বলো আমাকে।’ সে শব্দটি পর্যন্ত  করে না। ওর কিছু বলার নেই। কিচ্ছু বলার নেই ওর। সেই শূন্যতায় আমি লীন হয়ে যাই। যেন ও মাত্র সরাসরি সেই নির্জনতার মরু থেকে এসেছে। কিন্তু কথা থেকে যায় – কেন আমি আপনাকে এসব বলছি? আপনার কষ্ট হচ্ছে। আমি তো আপনার বেদনা বাড়াতে চাই না। বরং উল্টোটাই  চাই যে। আমি আপনার একাকীত্বকে ভাগ করে নিতে চাই যেমন মুহূর্তের জন্য ওর একাকীত্বকে একদিন স্পর্শ করতে চেয়েছিলাম। এখন বাজছে রাত একটা। ও ঘুমোচ্ছে। জরায়ুতে ভ্রূণ যেমন কুণ্ডলী পাকিয়ে থাকে, তেমনি করে কুঁকড়ে শুয়ে আছে ও। কুকুরটা ওর পায়ের কাছে – বিড়ালটা আমার কাছে টেবিলের ওপর শুয়ে। বাঁকানো বাতির নিচে আমি আপনাকে লিখছি আর ওর হলুদ চোখ দুটো আমার হাত যখন যেদিকে নড়ছে, সেইদিকে তাকাচ্ছে। আমি জানি, এর কোনো মানে হয় না। আমার এই লেখা বন্ধ করা উচিত। চার পাতা লিখে ফেলেছি। আপনি যে পড়বেন এই লেখা, তা কি জানি? সম্ভবত আপনি এটা ছিঁড়ে ফেলে দেবেন। ভাবতে পারেন,  আমার মাথা খারাপ হয়ে গেছে। সত্যিই তাই। আমার মাথা এখন নষ্ট। আসুন, আমরা কোথাও দেখা করি, কথা বলি। বোয়াজের খাবার বা ওর ওষুধপত্তর নিয়ে নয়।  (আমি সত্যিই চেষ্টা করি যেন ও ভুলে না যায়। যদিও সবসময় সফল হই না। ও একগুঁয়ে আর যতটা না অবজ্ঞা তার চেয়ে উদাসীনতাই বেশি ওর)। আমরা সম্পূর্ণ অন্য বিষয় নিয়ে কথা বলতে পারি। যেমন ধরুন ঋতু নিয়ে, এই গ্রীষ্মরাতের তারাভরা আকাশ নিয়ে। নক্ষত্র আর নীহারিকার বিষয়ে অনেক আগ্রহ আমার। আপনিও আগ্রহী হতে পারেন। আপনার মতামত বা ভাবনা জানার জন্য আমি অপেক্ষা করে থাকবো, ওসনাত। দু’কথায় লিখলেই চলবে।
ইতি –
এরিয়েলা বরাশ
ওসনাত ইচ্ছে করেই এই চিঠির উত্তর দেয় না। বাক্সে পড়ে থাকার পর সে একদিন চিঠিটা খুলে পড়ে। একবার। দু’বার। তারপর ভাঁজ করে রেখে দেয় দেরাজে। এখন সে জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে নিস্তব্ধতার অতলে। বেড়ার ওপর তিনটে বিড়ালের ছানা; একটা নিজের তালু  কামড়াচ্ছে; আরেকটা গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছে – মনে হচ্ছে ঝিমোচ্ছে, কিন্তু কান খাঁড়া ওর, সামান্য শব্দে নড়ে উঠছে। তিন নাম্বারটার বয়স সবচে’ কম। ওটা নিজের লেজ গুটিয়ে তাতে বারবার পড়ে যাচ্ছে, গড়াগড়ি খাচ্ছে।
মৃদুমন্দ বাতাস বইছে। এককাপ চা ঠাণ্ডা করার মতো শীতল সে বাতাস। ওসনাত জানলা থেকে সরে এসে হাঁটুতে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে সোফায় সোজা হয়ে বসল। সন্ধ্যে ঘনিয়ে আসছে। এখন রেডিওতে কিছুক্ষণ হালকা গান শুনবে, বই পড়বে। পরনের কাপড় বদলে ফেলে অন্য কাপড়গুলো সুন্দরভাবে ভাঁজ করে গুছিয়ে রেখে পরদিন কাজে পরে যাওয়ার কাপড় রেডি করে বিছানায় যাবে। এরপর ঘুমিয়ে পড়বে স্বপ্নহীন রাতের কোলে আর ভোরবেলা আলার্ম বেজে ওঠার আগেই পায়রাগুলোর বাকবাকুম শব্দে ঘুম ভেঙে যাবে ওর।