আলফা : সেলুলয়েডে সাবঅল্টার্ন স্বরলিপি > মাসুদুজ্জামান >> চলচ্চিত্র

0
458

আলফা : সেলুলয়েডে সাবঅল্টার্ন স্বরলিপি > মাসুদুজ্জামান >> চলচ্চিত্র

আলফা : অনন্য দার্শনিকতার শিল্প

Cinema has a unique relationship with philosophy: we could say that it is a philosophical experiment.
– Alain Badiou

“চলচ্চিত্র নিজেই একধরনের দর্শনের জন্ম দেয়। জন্ম দেয় নতুন ধরনের ভাবনার।” কথাটা বলেছিলেন ফরাসি দার্শনিক জাইল দেলিউজ। নাসির উদ্দিন ইউসুফ পরিচালিত ‘আলফা’ মুভিটা দেখতে দেখতে আমার এই কথাটাই মনে পড়ে গেল। ছুটির দিন, শনিবারের এক মন্থর সন্ধ্যা। ‘আলফা’ দেখার জন্য এসে পৌঁছুলাম ঢাকা মহানগরীর পশ্চিম প্রান্তে, সীমান্ত স্টার সিনেপ্লেক্সে। এর মাত্র দুদিন আগে অগ্রজপ্রতিম ইউসুফ-শিমুল দম্পতির সঙ্গে দেখা হয়েছিল একটা বাড়িতে। জেনেছিলাম, সীমান্ত স্টার সিনেপ্লেক্সেও ছবিটা মুক্তি পেয়েছে। তখনই ভেবে রেখেছিলাম, এই নতুন হলেই মুভিটা দেখবো। দেশের নানাপ্রান্তের অসংখ্য সিনেমা হল যখন বন্ধ হয়ে যাচ্ছে, তখন এই হলটি কিছুটা হলেও চলচ্চিত্র দর্শকদের মাঝে প্রাণসঞ্চার করবে।
হলে পৌঁছেই বুঝলাম, কিছুদিন আগে এটি প্রেক্ষাগৃহ হিসেবে উন্মুক্ত করা হয়েছে। ফলে, নতুন ফ্রেশ ফ্রেশ ভাব চারদিকে। লিফট থেকে হল অব্দি। ছিমছাম, মনোরম। ‘আলফা’ ছবিটা দেখতে দেখতে এই ফ্রেশনেস যেন আরও প্রলম্বিত হয়ে সজীবতার রেশটা মনটাকে ভরিয়ে দিল। ছবিটা, যে অর্থে দেলিউজ বলেছেন, ঠিক অনেকটা সেরকমই। নিজেই নিজের একটা দার্শনিক ভাবনা তৈরি করে দিয়েছে। অন্য কারো ভাবনা, বা আরও স্পষ্ট করে বললে কোনো দার্শনিক-সামাজিক ভাবনার প্রেক্ষাপটে এটি নির্মিত হয়নি। কিন্তু এই ভাবনা যে পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফ আর কাহিনিকারের মাথা থেকে এসেছে সেটা বলাই বাহুল্য। সজীব ভাবটা অভিনব মুভি হিসেবেও উপলব্ধি করলাম।
দেলিউজকে আরেকটু স্মরণ করি। তিনি বলেছেন, চলচ্চিত্রশিল্পকে অন্য কোনো কিছুর সঙ্গে তুলনা করা যাবে না। মুভি এতটাই স্বয়ংসম্পূর্ণ শিল্প। চলচ্চিত্র নিজেই নিজের একটা ভাবনা নিয়ে হাজির হয়, যা অভিনব, অপূর্ব আর স্বরচিত। শিল্পমাধ্যম হিসেবে চলচ্চিত্রের অনন্যতার কথা অনেকেই বলেন। স্বয়ং সত্যজিৎ রায় এই অনন্যতার টানেই চলচ্চিত্র-নির্মাণে প্রাণিত হয়েছিলেন। কিন্তু দার্শনিকতা বা ভাবনার অনন্যতা? দেলেউজই স্পষ্ট করে বলেছেন, চলচ্চিত্র নিজেই একধরনের দার্শনিক ভাবনা নিয়ে দর্শকদের সামনে হাজির হয়। (দ্রষ্টব্য Gilles Deleuze, Cinema and Philosophy, translated by Paola Marrati)
দেলিউজ চলচ্চিত্রের কথা যেখানে শেষ করেছেন, সেখান থেকেই আরেকটু ভিন্নরকম চলচ্চিত্র-ভাবনা নিয়ে হাজির হয়েছেন এই সময়ের আরেক প্রভাবশালী ফরাসি দার্শনিক অ্যালান ব্যাদিউ (দ্রষ্টব্য Alain Badiou, Cinema, Texts selected and introduced by Antoine de Baecque, Translated by Susan Spitzer)। তিনি দর্শনের প্রভাব চলচ্চিত্র থেকে খারিজ করে দেননি আবার চলচ্চিত্র যে নিজেই দার্শনিক ভাবনা সৃষ্টি করে চলেছে, সেকথাও স্বীকার করে নিয়েছেন। ব্যাদিউকে কিছুটা উদ্ধৃত করি :
Cinema transforms philosophy. In other words, cinema transforms the very notion of idea. Cinema basically consists in creating new ideas about what an idea is. To put it another way, cinema is a philosophical situation. Expressed abstractly, a philosophical situation is the relationship between terms that usually have no relationship with each other.
সিনেমা ভাবনাকে বদলে দেয়, এই উদ্ধৃতিতেই বলছেন ব্যাদিউ। বদলে দেয় চিন্তাকেও। এরপরই বললেন সেই অমোঘ কথাটি : চলচ্চিত্র মৌলিকভাবে নতুন ধরনের চিন্তা ও ভাবনাপুঞ্জ সৃষ্টি ও ধারণ করে।
দেলেউজ থেকে ব্যাদিউ, এমনকি কিয়ারোস্তামি অব্দি যদি চলচ্চিত্রভাবনাকে সম্প্রসারিত করি, তাহলে গত তিন-চার দশক ধরে বিশ্বচলচ্চিত্রের ধারা, মানচিত্র ও ভাবনা যে বদলে গেছে, সেটা সহজেই বোঝা যাবে। ‘আলফা’ ছবিটাও অনেকটা সেরকম ভাবনাই জাগিয়ে তুললো। একেবারেই আলাদা ধরনের চলচ্চিত্র। কিয়ারোস্তামির মুভিকে যেমন ‘অপর’ বা আদার বলা হচ্ছে, অর্থাৎ ইউরো-মার্কিন চলচ্চিত্র থেকে আলাদা একটা ধারা সৃষ্টি করেছে, ‘আলফা’কে আমার অনেকটা সেরকমই মনে হলো। এই অপরের ব্যাখ্যাটা হচ্ছে, আমাদের যে মূল বাণিজ্যিক চলচ্চিত্র তার তুলনায় তো আলাদাই, একইসঙ্গে বিকল্পধারার চলচ্চিত্র থেকেও আলাদা বলা যাবে। ‘অপর’ অবশ্য আরেকটি দিক থেকেও বলতে পারি ‘আলফা’কে। সেটা হলো এর গল্পটি মূল জনগোষ্ঠীর গল্প নয়, প্রান্তিক কিছু মানুষের গল্প। ‘অপর’ মানুষের গল্প। কিন্তু সে প্রসঙ্গে যাওয়ার আগে চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভ এবং ‘আলফা’র ন্যারেটিভের বিশেষত্ব সম্পর্কে কিছু কথা বলে নিই।
আলফা : ন্যারেটিভের নতুনত্ব
‘আলফা’ চলচ্চিত্রে ন্যারেটিভের নতুন একটা ধরন দেখা গেল। চলচ্চিত্রের ন্যারেটিভের সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য দিক হলো এর ইমেজ বা দৃশ্যকল্প। এই যে প্রতিভাসিত দৃশ্যকল্প, সেই দৃশ্যকল্পই দর্শকদের মনে কী বলা হচ্ছে, সেই ভাবনাটা মূর্ত করে তোলে। মুভমেন্ট আর টাইমের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে এর ইমেজগুলি গড়ে তোলে এর ন্যারেটিভ। খুব সহজ করে গড়ে তোলে চলচ্চিত্রের গল্পের কাঠামো বা গল্প। মুভমেন্টটা কিসের? চরিত্রগুলোর আর দৃশ্যের। কিন্তু এই ছবিতে এই মুভমেন্টটাও খুব কম দেখা গেল। চরিত্রগুলো প্রায় স্থির বা সামান্য হাঁটাচলা করে। ধরা যাক প্রধান চরিত্র আলফার কথা। সে থাকেই একটা বাড়িতে যার চারপাশে শুধু স্থির জলরাশি। ভূমি নেই, ফলে, নেই মানুষের চলাচল। কখনও-সখনও একটা-দুটো নৌকো যেন নদীর মাঝখানের ঘরটা, তাও যে ঘরটাতে আলফা থাকে, পানির স্তর থেকে ফুট দশেক উঁচু। একটা মই বেয়ে সেই ঘরে ঢুকতে হয়। এরপরই সবকিছু থেকে আলফা আলাদা হয়ে পড়ে। ফলে জলের সঙ্গে আলফার সম্পর্ক নেই, ভূমির সঙ্গে নেই, নগরের সঙ্গে নেই, জনমানুষের সঙ্গেও নেই। এমনকি সে যখন কালেভদ্রে ঘর থেকে বের হয়, তখনও সে একা বের হয়। একা একা চলে। একবার শুধু একটা গাধার পিঠে কিছু শিল্পকর্ম নিয়ে তাকে মহানগরীর পথে হেঁটে যেতে দেখা যায়। একটা ঘনসবুজ পাহাড়ি বনের মাঝ দিয়ে যাওয়ার দুটো কী তিনটে দৃশ্য আছে, তখনও দেখা গেল সে একা হেঁটে বন পার হচ্ছে। কিন্তু কোথায় চলেছে, তাও অনির্দিষ্ট করে রেখেছেন পরিচালক। বোঝাই যায়, আলফার ন্যারেটিভটা কতটা আলাদা। সবকিছু স্পষ্ট করে বোঝার মতো করে ইমেজ বা দৃশ্যগুলো নির্মাণ করেননি। দর্শকদের ভাবনার জন্যও কিছু রেখে দেন। কিয়ারোস্তামিই তো একটা সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন, তিনি চলচ্চিত্রের গল্পে সবকথা বলে দেয়ার পক্ষপাতি নন। বরং কিছু কিছু বিষয় এমন অস্পষ্ট করে রেখেছিলেন যাতে দর্শকের ভাবনার জন্য কিছু অবশিষ্ট থাকে। দর্শক যেন ভেবে ভেবে চলচ্চিত্রটার অর্থ করতে পারে। এই যে দর্শকের জন্য কিছু ভাবনার অবশেষ রেখে যাওয়া, ‘আলফা’তেও পরিচালক সেই কাজটিই করেছেন। তবে কিয়ারোস্তামির অনুকরণে নয়, সমকালীন বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেই সেটা করেছেন। মুভিটা থেকে একটা উদাহরণ দিই। যে লাশটি আলফার টংঘরের তলায় বাঁশের খুটিতে আটকে যায়, এই লাশটি কার জানা গেলেও কীভাবে সে খুন হয়েছিল, কারা তাকে খুন করেছিল, সেটা কিন্তু বলা হয়নি। এই যে ন্যারেটিভের নৈঃশব্দ্য, তাও কিন্তু বাংলাদেশের কোনো ধরনের মুভিতে তেমন একটা দেখা যায় না। আর ন্যারেটিভ আলাদা হয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে এর ভাবনা কাঠামোও আলাদা হয়ে যায়। সফল চলচ্চিত্র সেটাই যা আমাদের প্রচলিত ধারণাকে পুনঃনির্মাণ করে দেয়। ধারণার (ভাবনাও বলতে পারি)। এই ভাবনারই পুনঃনির্মাণ ঘটেছে এই মুভিতে। আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে এমন ছবি আর নির্মিত হয়েছে বলে আমার মনে পড়ছে না। এর ন্যারেটিভ যেমন আলাদা, তেমনি এর গল্পটাও একজন সাবঅল্টার্ন বা ব্রাত্য মানুষের। এককথায় সেলুলয়েডে সাবঅল্টার্ন মানুষের স্বরলিপি বলতে পারি মুভিটাকে। মুভিটার মূল থিম এটাই।
আলফা : কী আছে এর গল্পে
গল্পটা একজন শিল্পীকে নিয়ে। এই শিল্পী আবার একজন বিচ্ছিন্ন শিল্পী। রিকশাচিত্রক। রিকশার পেছনে যে চিত্রকর্ম থাকে সেই চিত্রকর্মের সে আঁকিয়ে- অন্য চরিত্রগুলো যাকে ‘আটিস্ট’ বলে সম্বোধন করে। শহরের পাশের নদীটার মাঝখানের একটা টংঘরে তার বসবাস। সেই ঘরের চারপাশে জলরাশি। স্রোতস্বিনী নয় সেই জল। স্থির। তো, লোকটা থাকে নদীর একেবারে মাঝখানে। লোকালয় থেকে বিচ্ছিন্ন। এই থাকার ব্যাপারটি অভিনব বলা যাবে। কিন্তু প্রতীকীও। বোঝা যায়, মহানগরে সে মিসফিট অথবা মহানগরে এই সাবঅল্টার্ন মানুষটির ঠাঁই হয়নি। লোকালয় থেকে তাই সে দূরে থাকে। স্বাভাবিকভাবেই এই শিল্পী একজন প্রান্তিক মানুষ। রিকশার চিত্রকর হিসেবে জীবিকা নির্বাহ করে। প্রাতিষ্ঠানিক কোনো শিল্পশিক্ষা তার নেই। তবু, পালক বাবার প্রভাবে এই ছবি আঁকা সে শিখে নিয়েছে। সেই পালক পিতা প্রয়াত। কিন্তু শিল্পী হবার স্বাভাবিক প্রতিভা তার ছিল বলেই সে ছবি আঁকে। তথাকথিত শহুরে আধুনিক ছবি সে আঁকে না, আঁকে রিকশার ছবি। সস্তা দামের রঙতুলি ব্যবহার করে। তার টংঘরটাই তার ছবি আঁকার স্টুডিও। পরিচালকের এই লোকেশন নির্বাচনের প্রশংসা করতেই হয়। শহরের কোনো বস্তি নয়, কোনো ঝুপড়ি ঘর নয়, তার ঘরটা একাধারে বিচ্ছিন্ন, এককভাবে বসবাস, আর এ কারণেই তিনি ঘরটাকে স্টুডিও করে তুলতে পেরেছেন সহজেই। তার সংযোগ শুধু টংঘরের কাছে নদীপারের বস্তির একজন থার্ড জেন্ডারের মানুষের সঙ্গে। সেই মানুষটি আবার পরিচয়হীন ৪টি শিশুকে লালনপালন করে। থার্ড জেন্ডারের মধ্য দিয়ে পরিচালক দুটি জিনিস দর্শকদের সামনে হাজির করেছেন। প্রথমত, থার্ড জেন্ডারের একজন ‘হিজরা’ও যে মানবিক আচরণ করতে পারে, সেটা তিনি তুলে ধরেছেন; দ্বিতীয়ত, ব্রাত্যজনের মধ্যে থার্ড জেন্ডারের মানুষেরা যে আরও ব্রাত্য জীবনযাপন করে, করতে বাধ্য হয়, সেই ধারণাটা দিতে চেয়েছেন। লক্ষণীয়, এই চরিত্রটি নিম্নবর্গীয় বা সাবঅল্টার্ন চরিত্র। কিন্তু মানবিক। কারোর কোনো সংকট হলে সে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে। তীব্রভাবে আহত হয়। এমনকি দোকানে বসে থাকা যে রসিক ‘দাদা’র দেখা পাচ্ছি, সেও এই নিম্নবর্গীয় মানুষ। গার্মেন্টেসে কাজ করতে যায় যে বস্তির চারটি মেয়ে, তারাও তাই। এই চলচ্চিত্রের গল্পটা এদের নিয়েই। অর্থাৎ এই মুভির কাহিনি সম্পূর্ণই সাবঅল্টার্ন বা নিম্নবর্গীয় মানুষদের কাহিনি। সেই জন্যেই বলছিলাম, এটি সেলুলয়েডে সাবঅল্টার্ন মানুষের গল্প।
আমরা গত কয়েক বছরে বাংলাদেশে মুক্তিপ্রাপ্ত কয়েকটি চলচ্চিত্রে দেখেছি এই ব্রাত্যজনদের উপস্থিতি। এই মুভিতেও সেটাই দেখছি। কিন্তু আগাগোড়া মুভিটি যেভাবে অগ্রসর হয়েছে, তাতে মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্তের মানুষদের কোনো উপস্থিতি নেই। ব্রাত্যজনের রুদ্ধশ্বাস গল্পে ‘আলফা’ নিঃসন্দেহে ব্যতিক্রমধর্মী একটা চলচ্চিত্র। স্বাভাবিকভাবেই গল্পের ধারা অনুসরণ করে মুভিটির ন্যারেটিভ বা দৃশ্যায়নেও এর প্রভাব পড়েছে। টুকরো টুকরো ইমেজগুলোও আকর্ষক।
প্রথম দৃশ্যটাই অপূর্ব। মুহররমের মিছিল চলছে। মুভিটা শুরুই হলো গতিশীল একটা দৃশ্য দিয়ে। মুহররমের উৎসবের মিছিল মানেই কার্নিভ্যাল। এই দৃশ্যটা দেখেই আমার মনে পড়ে গেল মিখাইল বাখতিনের কার্নিভালের কথা। উপন্যাসের গঠনশৈলীর কথা বলতে গিয়ে এই কার্নিভালের কথা তিনি বলেছিলেন। বহুস্বর (পলিফনি) আর বহু মানুষ যেখানে এসে মেশে। এই মানুষগুলো একদিকে যেমন বিচ্ছিন্ন আবার গ্রথিত থাকে। বিচ্ছিন্ন, কারণ নানা শ্রেণির মানুষ এতে উপস্থিত থাকে; আর গ্রথিত, কারণ লক্ষ্য হচ্ছে সবাই মিলে একটি একক উৎসবে অংশগ্রহণ করা বা আনন্দ করা। এরকম একটা কার্নিভাল হচ্ছে মুহররমের তাজিয়া মিছিল। এই মিছিলের ভীড়ের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া একটি আট-নয় বছরের বালক- আলফা- ফুটপাথের এক দোকানির কাছে গিয়ে আশ্রয় খুঁজে পায়। এই দোকানি আবার একা, অর্থাৎ স্ত্রী-সংসার কিছুই নেই।
আলফা এই চলচ্চিত্রের প্রধান চরিত্র। আলফা নামটি কিন্তু বাংলা বা আরবি-ফারসি নাম নয়, বাঙালি মুসলমান এরকম নাম কখনো রেখেছে, জানা নেই। আলফা অর্থ কী? একটু খতিয়ে দেখি? গুগল অভিধান বলছে, আলফা হলো গ্রিক ভাষার প্রথম বর্ণমালা। আরেকটি অর্থ পাচ্ছি গুগলেই- যীশু। এবার এই ছবির মর্ম কিছুটা ধরা গেল। প্রধান প্রোটাগনিস্ট আলফা নামটি তাহলে প্রতীকী নিঃসন্দেহে। সে যীশু। অর্থাৎ দয়ালু, মানবিক। নির্বিরোধ পথেই তার চলা। এই মুভির নায়কের জীবনও তেমনি। একা টংঘরে থাকে। সংযোগ শুধু ওই বস্তির ‘হিজরা’ আর কয়েকটি শিশুর সঙ্গে। কারো ক্ষতি সে করে না। সব কিছুতেই কেমন যেন নিরাসক্তি, ভাবুকতা। শিল্পী বলেই হয়তো তার স্বভাবটি এমন। অথবা তিনকুলে কেউ নেই বলেই হয়তো চুপচাপ থাকে। কম কথা বলে। তার চলাচলের পরিসরও সীমিত। নিজের টংঘর থেকে শহরে যায় রিকশা ব্যবসায়ী মহাজনের কাছে রিকশার জন্য আঁকা ছবি নিয়ে। তবে ভেতরে ভেতরে সে তীব্রভাবে মানবিক। খুব ছোট ছোট দু-একটি দৃশ্যে এই মানবিকতার দিকটি দর্শকের কাছে মূর্ত করে তুলেছেন পরিচালক। আবার যখন গার্মেন্টসে কাজ করতে গিয়ে আগুনে পুড়ে বস্তির সেই চারটি মেয়ে মারা যায়, তখন সে একটা কাপড় মাটিতে ফেলে, তাতে রঙ ঢেলে গড়াগড়ি খায় শুধু আত্মকষ্ট থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য। এই দৃশ্যটা সত্যি দারুণ। দু-তিন মিনিটের দৃশ্য এটি। কিন্তু আবেগের নিঃসরণ হিসেবে অসাধারণ। আরেকটি দৃশ্য আছে যেখানে সে কল্পনায় খোলা প্রান্তরে (চর) দুই হাতে একটা সাদা কাপড় জড়িয়ে স্লো মোশানে নেচে নেচে ঘোরে। এই দৃশ্যটাকে একটা পরাবাস্তববাদী কল্পদৃশ্য বলতে পারি। লাতিন আমেরিকা কিংবা ইউরোপীয় চলচ্চিত্রে এমন দৃশ্য দেখা যায়। এই দৃশ্যটি নির্মাণের ফলে বোঝা যায় পরিচালকের নান্দনিকবোধ কতটা গভীর।
এবার বলি চরিত্রায়ন প্রসঙ্গে। চরিত্রায়নের গভীরে গেলে প্রথম থেকেই বোঝা যায় আলফা একটি প্রান্তিক চরিত্র। তাত্ত্বিক পরিভাষা ব্যবহার করে আগেই যাকে সাবঅল্টার্ন বলে উল্লেখ করেছি। নিকট অতীতে এরকম সাবঅল্টার্ন চরিত্রকে প্রধান করে এই ধারার কোনো মুভি নির্মিত হয়েছে বলে আমার জানা নেই। সাবঅল্টার্ন কি এই কারণে যে সে শহর থেকে কিছুটা দূরে শহরতলির নদীতে বাস করে বলে? লক্ষণীয়, শহরতলি বটে, কিন্তু কোনো লোকালয়ে নয়, থাকে নদীর মাঝখানে। ছবির এই যে লোকেশন, একেবারেই অভিনব। প্রথম থেকেই যখন ক্যামেরা প্যান করে লংশটে তার টংঘরটাকে দূরে আর ক্লোজআপে একেবারে দর্শকদের চোখের সামনে নিয়ে আসছিল, তখন মনে হচ্ছিল এরকম একটা লোকেশনকে কেন্দ্র করে তাহলে একটা মুভি তৈরি হতে পারে। প্রথমে ব্যাপারটা বিশ্বাস করতে পারিনি, কিন্তু যতই সময় গড়িয়েছে, সেই ধারণা পরিচালক ভেঙে দিতে পেরেছেন। বাংলা মুভিতে মনে হয় এই প্রথম এরকম লোকেশনকে কেন্দ্র করে একটা ছবি তৈরি হলো। লোকেশানটা দেখতে দেখতে আমার তারকোভস্কির ‘নস্টালজিয়া’র লোকেশানটার কথা মনে পড়ছিল। সেই লোকেশানটা ছিল বিরান একটা মাঠের মধ্যে একটা বাড়ির। কী অদ্ভুত মিল আর অমিলও। শহর থেকে দূরে আলফার বসবাস একটা নদীতে; আর সেই মুভিতে মাঠের মধ্যে। আলফা জীবনযাপনের আরেকটা দিক থেকেও প্রান্তিক। সেটা হলো তার পেশা- রিকশাচিত্রক। এই যে সাবলর্টার্ন চরিত্র, সেই চরিত্রই তাকে প্রান্তিক করে তুলেছে। শহরতলিতে থাকলেও শহরের মূল কেন্দ্রে সে নেই। নেই মানে, কোনো ঘটনার সূত্রেই শহরের মূল কেন্দ্রে সে থাকে না। লক্ষ করলে দেখা যাবে, আলফা চরিত্রটি পঞ্চমাত্রিক বিচ্ছিন্নতার শিকার :
প্রথমত, সে মুহরমের মিছিলে হারিয়ে গিয়ে পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।
দ্বিতীয়ত, নগরের বাইরে একটা নদীর মাঝে টংঘর করে বাস করে; এই ঘরটির চারপাশে আর কোনো টংঘর বা কিছুই নেই। ঘরটা যেন একটা দ্বীপের মতো।
তৃতীয়ত, ব্রাত্য বা সাবঅল্টার্ন বলে সে বিচ্ছিন্ন।
চতুর্থত, সৃজনশীল মানুষ অর্থাৎ শিল্পী বলে সে বিচ্ছিন্ন। আর দশজন সাধারণ মানুষের মতো নয়।
বিচ্ছিন্ন বলে সে আউটসাইডারও।
পঞ্চমত, আলফা খুব কম কথা বলে। খুব কম মানুষের সংস্পর্শে আসে। আর কম কথা বলা মানেই চরিত্রটি অন্য মানুষদের সঙ্গে কমিউনিকেট করতে চায় না। এও আরেক ধরনের বিচ্ছিন্নতা।
এই মুভিতে নৈঃশব্দ্যেরও একটা ভূমিকা আছে। বড় সিনেমা হলে মুভি দেখার একটা সুবিধা হচ্ছে, মুভিকক্ষেই একধরনের কার্নিভালসুলভ পরিবেশ তৈরি হয়ে যায়। আমি যে সীমান্ত স্টার সিনেপ্লেক্সে মুভিটা দেখলাম, সেটা নতুন হল। নতুনত্বের একধরনের গন্ধ থাকে। কিন্তু নৈঃশব্দ্যটা টের পাচ্ছিলাম তীব্রভাবে। হলের দর্শককুল নিশ্চুপ। আর পর্দায় চলিষ্ণু চরিত্র আছে, সংলাপও বলছে, কিন্তু প্রধান চরিত্রটি কথা বলছে খুব কম। চারদিকে নৈঃশব্দ্য তখন যেন আরও প্রগাঢ় হয়ে উঠছিল। মাঝনদীতে আলফার টংঘরের চারপাশে কোনো জনমানুষ নেই। নগরজীবনের কোলাহলমুক্ত এরকম পরিবেশে আলফার কম কথা বলা নৈঃশব্দ্যকে আরও ঘনীভূত করে তুলেছে। নৈঃশব্দ্যের এই ভাষাটা পরিচালক অদ্ভুত শিল্পকৌশল হিসেবে একদিকে যেমন আয়ত্ত্ব করেছেন, তেমনি ব্যবহারও করেছেন শিল্পকুশলতার সঙ্গে। সংলাপ কম বলার ফলে বিচ্ছিন্নতার বোধটি আরও তীব্র হয়েছে।
এই বিচ্ছিন্নতা বা এলিনিয়েশনের কথা বলতে গিয়েই কার্ল মার্কসের বিচ্ছিন্নতার ভাবনার কথা মনে পড়ে গেল। পুঁজিবাদী সমাজে ব্রাত্য শ্রমজীবী মানুষের বিচ্ছিন্নতা অবশ্যম্ভাবী বলে মনে করেছেন মার্কস। এখানে আলফাও তাই, হিজরা মানুষটিও তাই। এমনকি বস্তির যে বিবাহিত নারী আলফার সন্তান ধারণ করেছে, সেও কিন্তু আলফার কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। তবে তার স্বামী- যে সন্তান জন্মদানে অক্ষম- সে যখন সেই বউয়ের সন্তানকে নিজের সন্তান বলে জানান দেয়, তখন সেই স্বামীটিও যে উপরে উপরে বদমেজাজি হলেও ভেতরে ভেতরে কতটা মানবিক, সেটা বোঝা যায়। ধন্যবাদ পরিচালককে যে ওই স্বামীকে তিনি টিপিকাল অত্যাচারী স্বামী হিসেবে উপস্থাপন করেননি।
‘আলফা’ চলচ্চিত্রের আরও কিছু বৈশিষ্ট্য আছে, যা দর্শকদের ভাবাবে। মহানগরের জৌলুসপূর্ণ মধ্যবিত্ত, উচ্চ-মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের জীবনের তুলনায় নিম্নবিত্তের জীবনযাপন আর জীবনযাপনের পরিসর যে কতটা আলাদা, এই মুভি দেখলেই সেটা বোঝা যাবে। এখানে যে বাংলাদেশকে আমরা দেখি, সেটা খণ্ডিত, খণ্ডিত কারণ আমাদের বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর একটা অংশকে মুভির বিষয় করা হয়েছে। সমগ্র বাংলাদেশের, বিশেষ করে মধ্যবিত্তের বা কৃষকের কথা নেই। একটা মুভিতে সবকিছুর প্রতিনিধিত্ব কখনও আশা করা যায় না, পরিচালক সেই ভুলটা করেনওনি। কিন্তু যাদের কথা আছে তারা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ একটা জনগোষ্ঠী। যে গার্মেন্টসের মেয়েরা আমাদের বৈদেশিক মুদ্রা আয়ের বড় উৎস, অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তাদের কথা মুভিটাতে যেমন আছে, তেমনি “নেই” মধ্যবিত্ত আর উচ্চবিত্তের মানুষদের উপস্থিতি। জাঁক দেরিদাই তো বলেছিলেন কথাটা, “অনুপস্থিতি দিয়েই উপস্থিতিকে বুঝে নিতে হয়।” এই মুভিতেও সেটা ঘটেছে। উপস্থিতি আর অনুপস্থিতির কিংবা যে বাইনারি অপজিশনের (বিপ্রতীপ বৈপরীত্য) কথা বলেছেন দেরিদা, তাও তো মুভিটাতে স্পষ্ট। সেদিক থেকে মুভিটার অর্থ বহুমাত্রিক। তবে কেন্দ্রীয় বিষয়বস্তু নিঃসন্দেহে সাবঅল্টার্ন জনগোষ্ঠীর জীবনযাপন। একজন নিম্নবর্গীয় শিল্পীর বিচ্ছিন্নতা, আসক্তি (বস্তির মানুষদের জন্য), জীবনযন্ত্রণা আর মানবিক গুণগুলোই আমাদের দেখার ও অনুভবের কেন্দ্র হয়ে ওঠে।
পরিচালক ও কলাকুশলীদের কথা
পরিচালকের নাসির উদ্দিন ইউসুফ দীর্ঘদিন ধরে ঢাকা থিয়েটারের সঙ্গে যুক্ত। বেশ কয়েকটি চলচ্চিত্র তিনি এর আগেও পরিচালনা করেছেন। তিনি একজন বীর মুক্তিযোদ্ধা।স্বাভাবিকভাবেই তার জীবনবোধ এদেশের মাটি ও মানুষের সঙ্গে সম্পর্কিত। এই ছবিতেও তার চিহ্ন সুস্পষ্ট। ছবিটির আবহ সংগীতও বেশ ভালো। ক্যামেরার কাজও আকর্ষক। অধিকাংশ দৃশ্যই ওয়াইডার অ্যাঙ্গেলের; ফলে দর্শক হিসেবে চোখকে বহুদূর প্রসারিত করতে পেরে ভালো লেগেছে। অভিনয়েও সবাই উৎরে গেছেন বলা যায়। তবে আমাকে সবচেয়ে আকর্ষণ করেছে গর্ভবতী প্রেমিকা নারীটি আর হিজরার চরিত্রে যিনি অভিনয় করেছেন সেই অভিনেতাটি। মাত্র ৯০ মিনিটের মুভি এটি, কিন্তু রুদ্ধশ্বাস অভিঘাত তৈরি করতে পেরেছে বলে দেখতে বিরক্তি লাগেনি। সব মিলিয়ে এটি একটি ভালো ছবি, দেখার মতো মুভি। আমাদের চলচ্চিত্রের একটি মাইলফলক। এরই সুবাদে পরিচালক নাসির উদ্দিন ইউসুফের চলচ্চিত্র পরিচালনার মুকুটে আরও একটি সোনালি পালক যুক্ত হলো।