আশরাফ জুয়েল > ঘটনা তেমন কিছুই নয় >> ছোটগল্প

0
490
ঘটনা তেমন কিছুই নয়। গতকাল বিকেল চারটা নাগাদ বাংলা একাডেমি গেটের বিপরীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের সামনের ফুটপাতে বেশ কয়েকজনকে একত্রিত হতে দেখা যায়। মানুষ একত্রিত হতেই পারেন। হয়ত আড্ডা দেবার উদ্দেশ্যে তারা সেখানে একত্রিত হয়েছিলেন। কয়েকজন মানুষের একত্রিত হবার সেই ভঙ্গিমায় কিছু সংঘটিত হবার মতো কোন কিছুই চোখে পড়েনি। কিন্তু ঘটছে না! অনেক কিছুই তো ঘটছে, ঘটেই যাচ্ছে- একই ঘটনায় কারও ফাঁসি হচ্ছে, কেউ হচ্ছেন পুরস্কৃত। ভোরের দৃষ্টিতে ভাবলে, এমনও তো হতে পারে- সামান্য চা-সিগারেট পানের জন্য বা নিছক কৌতূহলকে ঝালাই করার বশে তারা সেখানে একত্রিত হয়েছিলেন, এগুলো সবই অনুমান নির্ভর, আসলে সেখানে কী হয়েছিলো তা এখন পর্যন্ত কেউই জানে না।
কিন্তু কথা অন্যখানে, এই ‘তারা’, আসলে ‘কারা’? হ্যাঁ, দলটা পাঁচ জনেরই। অনুমানযোগ্য, পাঁচ জনই, সংখ্যার বিচারে।
পাঁচ জন ‘এক’
– লম্বা পাঁচ ফিট এক ইঞ্চি
– সম্ভাব্য ওজন তেষট্টি কেজি
– গাঁয়ের রঙ শ্যামলা
– উচ্চমাধ্যমিক পাশ
– বেকার
– পায়ে চটি
– পরনে হাফ হাতা শার্ট ও ফুল প্যান্ট
– সিগারেট খাওয়াজনিত কারণে দাঁতগুলো লালচে
– ডান ভ্রুর উপরে কাটা দাগ
– হাতে সিম্ফনি মোবাইল
– অনবরত কথা বলছেন
– কাউকে ডাকছেন
– সরে গিয়ে দেয়ালের গায়ে প্রস্রাব করে এলেন
পাঁচ জন ‘দুই’
– লম্বায় প্রায় ছয় ফিট
– গাঁয়ের রঙ সদ্য মাড়াই করা ধানের মতো
– হালকা গোঁফ, মাঝেমাঝে দাঁড়িতে হাত বোলাচ্ছেন
– ভাষা : বাংলা
– মনের ভেতর বেশ একটা শান্তি শান্তি ভাব
– বাকিদের সুশৃঙ্খল হবার পরামর্শ দিচ্ছেন
– ওজন আশি কেজি প্লাস
– সম্ভবত শিক্ষিত
পাঁচ জন ‘তিন’
– তরুণী
– পরনে জিনস, ফতুয়া
– চোখে লেন্স
– ইনসমনিয়াক
– ছিপছিপে
– ধূমপানে অভ্যস্ত
– হাতে মার্কসবাদের উপর লেখা একটি চটি বই
– ভাষা : বাংলিশ
– শারীরিক ভাষা ধারালো
– আকর্ষণীয়
পাঁচ জন ‘চার’
– মাথায় টুপি
– বয়স আনুমানিক এগারো বছর
– কুঁচকে থাকা গোল ঘেরের পাজামা
– মুখে একটা অর্ধমৃত প্রাণ লজেন্স
– সামান্য অস্থিরতা
– লাবণ্যময় মুখমণ্ডল
– দৌড় দিয়ে এদিক ওদিক যাচ্ছে
– নিজেদের মধ্যে কী কথা হচ্ছে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই
– গায়ে জোব্বা, জোব্বার বাম পকেট ফুটো
পাঁচজন ‘পাঁচ’
– বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (আগে পাবলিকে ছিলেন এখন বেসরকারি)
– পরনে ইন ছাড়া ফুল হাতা স্ট্রাইপের শার্ট
– পায়ে বাটার পাম সু
– হালকা মদ্যপানের অভ্যাস আছে
– দর্শনশাস্ত্রের উপর তাঁর লেখা গ্রন্থ বিশ্বের নামকরা ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্য
– সম্ভবত আনকনট্রলড ডায়াবেটিসের রোগী, ইনসুলিন নেন নি
– পায়চারী করছেন
– চশমার চোখে অনির্ধারিত ছানি
দলটির মেজাজ বোঝার জন্য হয়ত বর্ণিত বৈচিত্র্যগুলো একেবারেই যথেষ্ট নয়। তবে কিছু ধারণা যে একেবারেই পাওয়া যায় না, তা কিন্তু না, যদিও ধারণার বশে কোন স্থির সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
অবশ্য ধারণাকে পিছে হটিয়ে দিয়ে আরেকটি নতুন সম্ভাবনা দেখা দিলো। কিছু সময়ের মধ্যেই এই দলটাকে কেন্দ্র করে আরও কিছু মানুষকে জড়ো হতে দেখা যায়- এবং এই সংখ্যা বাড়তে থাকে ক্রমশ।
– সংখ্যা; কেউ চোখে দেখেছে, ছুঁয়ে? সংখ্যা আসলে একটা ধারণা, সেটাও নির্ভর করে। অতএব ধারণানির্ভর কোনকিছুকে গ্রহণ বা বর্জন করার জন্যই সংখ্যাকে বিশ্বাস করা জরুরি নয়। কিন্তু তবুও সেই ধারণার বিশ্বাসে পাল তোলে সভ্যতা নামক ক্ষণস্থায়ী ইজম। মৃদুমন্দ বাতাসে ঢলতে ঢলতে এগিয়ে যায় মুক্তবাজার অর্থনীতির দিকে- সংখ্যাতত্ব আসলে ক্যাপিটালিজমের জারজ সন্তান।
একটু ডান দিকে সরে, বামে ঘুরে কথাগুলো বলছেন প্রফেসর, এমন একটা ভঙ্গি, যেন তার পেছনের সারিতে এতক্ষণ যারা ছিলেন তারা সকলেই তার ছাত্র।
– শহর আসলে ক্ষুধা এবং জনসংখ্যা বাড়াতে সবচেয়ে বড় ভূমিকা রাখছে। সেই জনসংখ্যা মানুষ হতে পারে, হতে পারে যে-কোনো ইন-এনিমেট অবজেক্ট। কিন্তু আসলেও কী মানুষের সংখ্যা বাড়ছে? সম্ভবত বাড়ছে, তাকিয়ে দেখুন! প্রফেসর!
ইনসমনিয়াক, ছিপছিপে ধূমপায়ী মেয়েটি হঠাৎ বলে উঠল। তার কণ্ঠস্বর থেকে বেরিয়ে আসা শব্দগুলোকে আষাঢ়ের প্রথম বর্ষণের মতো মনে হল, কিছুটা আত্মবিশ্বাসী এবং একগুঁয়ে।
– এমনটাই চেয়েছিল সময়, ঠিক এমনটা। আপনারা জানেন ব্যাপারটা ঠিক কখন থেকে আরম্ভ হবে? আরম্ভ মানেই শেষ। এই যেমন প্রয়োজন ধর্ম তৈরি করেছে, করেছে তো? আপনি, হ্যাঁ প্রফেসর, ঘুরে দাঁড়ান, এই এভাবে, হ্যাঁ ঠিক এইভাবে, যেভাবে কিছুক্ষণ পূর্বে দাঁড়িয়েছিলেন, হল তো, দিক পরিবর্তন হল? হয়, প্রফেসর, এভাবেই হয়। অতএব প্রমাণিত হল আপনার দর্শন ভুল।
দাড়িতে হাত বোলাতে বোলাতে কথাগুলো বলেন আপাত বিচক্ষণ মানুষটি।
– হয়ত অন্যরকম কিছু হবে, সংখ্যার মতো বা জনসংখ্যার মতো কিছু নয়, হয়ত অন্যরকম কিছু একটা… ধারণার মতোও নয়।
মুখ থেকে প্রাণ ক্যান্ডির অংশবিশেষ ছুঁড়ে ফেলে দিতে দিতে চাপ দাড়ির মানুষটির দিকে তাকিয়ে উত্তর দেয় এগারো বছরের শিশুটি।
ছিপছিপে নারী এবং প্রফেসর চমকিত হয়। তাকায় ছেলেটির দিকে। এতক্ষণ খেয়াল করেনি। ছেলেটি দ্বিতীয়বারের মতো দৌড়ে গেলো, একটা মরা পাতা উড়ে বেড়াচ্ছে, সেটাকে কুড়িয়ে পুনরায় অমনোযোগী হয়ে উঠল সে।
– আসুন আমরা মৃত্যুকে সম্মান জানাই। কাল যে ছেলেটি রেললাইনে তাঁর আত্মাকে বেঁধে রেখে এসেছে, শুধু সে-ই জানে শরীরের ওজন। আপনারা কেউ জানেন না হয়ত।
বেকার হবার আগে সাতষট্টি কেজি ওজনের যুবকটি কবিতা লিখত। ঢলে পড়া সূর্যকে পকেটে পুরে এ মুহূর্তে সে আনন্দে আত্মহারা। ইতোমধ্যে অকুস্থলে বেশকিছু মানুষ জমে গেছে।
হঠাৎ বোশেখের জমাট ঘূর্ণি হাওয়ার মতো বাইস তেইশ বছর বয়সী কয়েকটি ছেলে লাইনের পেছন দিক থেকে এসে গুড়-মুড়ির নাড়ুর মতো জমে থাকা জমায়েতটাকে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়ানোর পরামর্শ দিলো।
সন্ধ্যার পকেটে জমতে আরম্ভ করেছে সূর্যটা। ধুলোর গায়ে হেলান দিয়ে এই দৃশ্য দেখছে শিথিল রোদ। হয়ত আর কিছুক্ষণের মধ্যেই ঘটতে আরম্ভ করবে ব্যাপারটা। নিয়মের স্কুল থেকে ছুটি নেয়া এই শহরের আনন্দিত মানুষ সাদরে গ্রহণ করে ছেলেগুলোর প্রস্তাব। ফোরজি নেটওয়ার্কের মিথ্যে প্রতিশ্রুতির মতোই এতসব অপ্রাপ্তি এবং বঞ্চনা তাদের ক্লান্তিকর করে রেখেছে, আসলে এটাই মোক্ষম সময়- সবকিছুই একটা নিয়মের মধ্যে আসা উচিৎ।
চাপ বাড়ছে। বাড়ছে উপস্থিতি। শুধু লাইনের সামনের ছেলেটিকেই নয়, অতীত নিকটে শহরের কোন মানুষকে এতোটা আনন্দিত হতে দেখা যায় নি। লাইনে নিজেদের জায়গাটা পাকাপোক্ত করে রেখে পকেটে থাকা নতুন খড়খড়ে নোটের মতো ছেলেগুলো ভলান্টিয়ারের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নিয়ে পুরো উপস্থিতির মধ্যে নিয়মের দড়ি চাপিয়ে দিয়েছে। প্রথমে অনেকেই বিরক্ত হলেও পরে বেশিরভাগ মানুষ খুশিই হয়েছে। দেখতে দেখতে লাইনটি ততক্ষণে টিএসসি ছাড়িয়েছে।
মানুষ আসছে, মানুষ বাড়ছে, বাড়ছে তাদের কলহাস্য-রব। মানুষ বুঝে গেছে এটাই সেই সময় যখন লাইনে দাঁড়ানোই সবচেয়ে সময়োপযোগী সিদ্ধান্ত, তাই গালগল্পে মেতে না উঠে তারা সারিতে দাঁড়িয়ে পড়ছে। মানুষের মধ্যে ইতোমধ্যে এক বিশেষ ধরনের উদ্দীপনা তৈরি হয়েছে।
ইলাস্টিকের রাবারের মতো বাড়তেই থাকে লাইনের দৈর্ঘ্য, যা ছিঁড়ে গিয়ে পুনরায় প্রান্তে আঘাত করে না, বরং ছেঁড়ার পূর্বমুহূর্তে আরও কিছু আগ্রহী মানুষ ইলাস্টিকের মতো লম্বা হতে থাকা লাইনটার হাল ধরে নীরবে। লাইনের দৈর্ঘ্য এতক্ষণে টিএসসি থেকে শাহবাগ হয়ে বাংলামটর ছুঁয়েছে।
বাংলামটর থেকে কারওয়ান বাজার এসে লাইনটা একটু থিতু হয়, সিদ্ধান্ত নিতে পারে না। কিন্তু যেহেতু পান্থপথের মোড়ের দিক থেকে অনেক মানুষ এসে কারওয়ান বাজারের লেজে পা রাখে- লাইনটা ওদিকেই বাড়তে থাকে। ফার্মগেটের দিক থেকে আসা লাইনের মানুষেরা জোর আপত্তি জানালে, সিদ্ধান্ত হয় সোহরাওয়ার্দী থেকে কারওয়ান বাজার পর্যন্ত একটিই লাইন থাকবে। এবং একজন পান্থপথের দিক থেকে, একজন ফার্মগেটের দিক থেকে মূল লাইনে যোগ দেবে। অবশ্য ফার্মগেট এবং পান্থপথ, দুই দিকই উপচে পড়ছে, তবে আশার কথা এলোমেলো মানুষ খুব দ্রুত সারিবদ্ধ হয়ে পড়ছে।
বিজয় সরণীর সামনে এসে পুনরায় কিছুটা দ্বিধায় পড়ে লাইনটি। মিরপুরের দিক থেকে অপেক্ষাকৃত বেশি মানুষ এসে লাইনে যোগ দিচ্ছে, মহাখালী থেকে লাইনটি কচ্ছপের গতিতে বনানীর দিকে এগুচ্ছে। বনানী থেকে একটি লাইন চলে যাচ্ছে গুলশান অভিমুখে। লাইন লম্বা হয়েই যাচ্ছে, গলিপথ পেরিয়ে প্রত্যেকটি বাসার সদর দরজা পর্যন্ত মানুষ সারিবদ্ধভাবে সারিতে দাঁড়িয়েছে। এটা খুবই আশাপ্রদ যে, এই শহরের মানুষ অনেকদিন বিশৃঙ্খল থাকার পর কোন এক জাদুর পরশে নিজেদের মধ্যে নিয়মানুবর্তিতার চর্চা করছে। নারী, পুরুষ, সদ্যপ্রসূত শিশু, কিশোর, যুবা, তরুণ এবং এমনকি বৃদ্ধ, বৃদ্ধাও ঘর ছেড়ে নেমে হাসিমুখে সারিতে দাঁড়িয়েছেন। তবে সবাই নেমে এসেছে এ দাবি করা অন্যায় হবে, সবসময় সবাই সবকিছুতে নিজেকে সম্পৃক্ত করার সাহস রাখে না।
দুই
সাংবাদিক হারেফ শাহান খুব পেরেশানিতে পড়েছেন। সাভার গিয়েছিলেন তিনি। মাটির সাথে ইন্ডাস্ট্রিয়াল কেমিক্যাল মিশে শাক-সবজি ফল-ফসলের কী ধরনের ক্ষতি করছে সেটা নিয়ে একটা অনুসন্ধানী রিপোর্ট তৈরির জন্য বেশ কয়েকদিন থেকেই তিনি থেকে গেছেন সাভারে। আজ ঢাকায় ফেরার পথে গাবতলি পেরুলে তার নজরে আসে একটি লাইন, প্রথমে মনে করেছিলেন বিজিবির ট্রাক থেকে চাল সংগ্রহ করার জন্য মানুষ লাইনে দাঁড়িয়েছে, পরে ভেবেছিলেন ওয়াসার পানির গাড়ির উদ্দেশ্যে লাইনে দাঁড়িয়েছেন মানুষ, কিন্তু তার ভুল ভাঙতে খুব বেশি সময় লাগে না। তাঁর অনুসন্ধানী মন মাজার রোড থেকে ছুটে আসতে থাকে অনির্ণেয় লাইনটাকে অনুসরণ করতে করতে।
এ কী অবস্থা? শহরে হৈচৈ পড়ে যাবার কথা, সবাই তীব্র রোদ উপেক্ষা করে হাসিমুখে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। কারও মনে কোন অসন্তোষ নেই, লাইনটি খুব ধীর গতিতে সামনে এগোচ্ছে। এতো ধৈর্য এ শহরের মানুষের? অভিজ্ঞ সাংবাদিক হারেফের এতদিনের অভিজ্ঞতা কী তাহলে ভুল প্রমাণিত হতে যাচ্ছে? না, তা হতেই পারে না। তিনি এগিয়ে যান- অবাক হয়ে লক্ষ করেন প্রায় প্রতিটি গলিপথ থেকে পিঁপড়ার মতো নতমুখ মানুষ প্রধান সড়কের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, পরিশ্রমের ভঙ্গিতে মিলিত হচ্ছে মূল লাইনের সাথে।
শ্যামলীর কাছাকাছি এসেই হারেফ দেখলেন আরেকটি লাইন লিংক রোড থেকে বেরিয়ে ইতোমধ্যে যুক্ত হয়েছে প্রধান লাইনে সাথে, এখানেও বেশ বড়সড় একটা জটলা। তবে এখানেও সমঝোতার স্পষ্ট আভাস লক্ষ করা যায়। তারপরও সহজে সামনে এগুনো যাচ্ছে না। তাই তিনি শ্যামলীতে অবস্থান করেই সংবাদ সংগ্রহ করবেন বলে মনোস্থির করলেন। কিন্তু এতেও বিপত্তি। ইতোমধ্যে বেশ কয়েকবার চেষ্টা করেও সিনিয়র করসপণ্ডেন্টের সাথে যোগাযোগ করতে ব্যর্থ হয়েছেন। ঠিক বুঝে উঠে পারছেন না, সবাই কী আজ খবর সংগ্রহে নেমে পড়েছে?
তবে সারিতে দাঁড়ানো হাসিখুশি মুখের মানুষেরা আজ অন্তত তাঁকে স্বস্তি দিচ্ছে। এই শহরে মানুষকে নানাবিধ যন্ত্রণার ভেতর দিয়ে দিনাতিপাত করতে হয়। অবশ্য তার সাংবাদিক চোখ কতো কিছুর সাক্ষী- এ শহরে একজনের পেটে লাথি দিয়ে অন্য আরেকজনকে তরতর করে উপরে উঠে যেতেও দেখেছেন তিনি, এ শহরে মানুষ হল একে অন্যের সিঁড়ি।
– লাইনটা কিসের? বলবেন একটু?
একজন গৃহবধূকে জিজ্ঞেস করলেন হারেফ শাহান। এই গৃহবধূ তার তিন বাচ্চাকে নিয়ে এই তীব্র রোদের মধ্যে দাঁড়িয়ে আছেন, চেহারায় বিরক্তির লেশমাত্র নেই। লাইনটি এগোচ্ছে ঢিমেতালে, একেবারেই কচ্ছপ গতিতে। অবাক করা বিষয় কেউ এতটুকুও বিরক্ত হচ্ছে না। এই অসহিষ্ণু শহরের অস্থির মানুষগুলোর এমন নাটকীয় পরিবর্তন সাংবাদিক হারেফকে অবাক করে দিচ্ছে।
– জী ম্যাডাম, আপনাকে বলছি, লাইনটা আসলে কিসের, দয়া করে জানাবেন?
কোন উত্তর পায় না হারেফ। এমনটা সাধারণত হয় না। তার বুকে একটা নামকরা টিভির চেস্ট কার্ড ঝুলছে। এটা দেখার পরও ভদ্রমহিলা কথা বলছেন না?
– দেখুন, ম্যাডাম…
ভদ্রমহিলা অত্যন্ত বিনয়ের সাথে সাংবাদিক হারেফকে সামনে এগিয়ে যাবার ইঙ্গিত করলেন। তার স্মিত হাসি এখনো বহাল তবিয়তে ঘর্মাক্ত এবং সুন্দর মুখে খেলা করছে। বাচ্চা দুইটাকে সামনে দিয়ে তিনি মোবাইল ফোনে স্বামীকে তাঁর এবং বাচ্চাদের অবস্থানের বর্ণনা দেয়া আরম্ভ করলেন।
কিছুটা অস্বস্তিতে পড়লেন শাহান। কল করলেন সহকর্মী জিন্নাতকে। পরপর কয়েকবার রিং বাজার পর ফোন ধরলেন জিন্নাত।
– হ্যাঁ, শুনছি শাহান, শুনছি, বলুন। কী? না শুনতে পাচ্ছি না। আপনি জায়গা পেয়েছেন? হ্যাঁ, শাহান, দ্রুত দাঁড়িয়ে যান, হ্যাঁ শাহান, তা না হলে পেছনে পড়ে যাবেন। না শাহান আপনার কথা ভালমতো শুনতে পাচ্ছি না। এদিকের লাইন যাত্রাবাড়ী পেরিয়ে কাঁচপুর ছুঁয়েছে, হ্যাঁ শাহান, যতটা খবর পেয়েছি, না শাহান আপনাকে শোনা যাচ্ছে না। লাইনে দাঁড়ান না হলে পিছিয়ে পড়বেন, শাহান এই সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না।
একনাগাড়ে কথাগুলো বলে লাইনটা কেটে দিলেন, অথবা লাইনটা কেটে গেলো। শাহান বারবার চেষ্টা করেও জিন্নাতকে আর পেলেন না। কিন্তু তার কানে একটা কথা বারবার অনুরণিত হতে থাকলো- ‘এই সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না।’
শাহান লাইনটাকে অনুসরণ করে এগিয়ে যেতে থাকে, তাকে মূলে পৌঁছুতেই হবে। এগোতে এগোতে তিনি অবাক হয়ে লক্ষ করেন, বিভিন্ন বয়সের মানুষ সংযুক্ত হচ্ছে প্রধান লাইনটার সাথে। এবং মানুষ এতো সুশৃঙ্খল হল কবে থেকে? যে মানুষ দেড়শ টাকা দামের যাকাতের শাড়ি নিতে গিয়ে একে অপরের পায়ের তলায় পিষ্ট হয়ে দেদারসে মরে, এরাই আজ এতো শৃঙ্খলাবদ্ধ?
ততক্ষণে শাহান এসে পৌঁছেছে ধানমণ্ডি সাতাশের মাথায়। না, কিছু একটা হয়েছে, কিছুতো হয়েছেই। ‘এই সময় পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না, এই সময় পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না…’
আসতে আসতে শাহান কমপক্ষে শ’খানেক মানুষকে জিজ্ঞেস করেছে, কিসের লাইন এটা? কেউ কিচ্ছু বলে না, শুধু হাসিমুখে সামনে এগিয়ে যাবার ইঙ্গিত করে। যেন এরা জেনেও বলতে চায় না কাউকে। আসলেও কী এরা নিজেরাও জানে? লাইনটা কিসের? জিন্নাতও বলল, এমন সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না।
হঠাৎ লাইনের সামনের দিক থেকে একটা উচ্চারণ অল্প পানির চেলি মাছের মতো লাফিয়ে লাফিয়ে পেছনের দিকে আসতে থাকল, লাইনের সামনের জন মাথা ঘুরিয়ে পেছনের জনকে বলছে, ‘আরম্ভ হয়ে গেছে’ বলেই উল্লাসে ফেটে পড়ছে, কেউ কেউ ভি সাইন দেখাচ্ছে, কেউ আনন্দে আত্মহারা হয়ে লাফালাফি করছে। যেন সামনে থেকে আনন্দের একটা ঢেউ বৈদ্যুতিক গতিসম্পন্ন হয়ে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে পেছনের দিকে। কিন্তু যা অবস্থা, তাতে পেছন বলতে কিছু নেই- বাড়তে বাড়তে এ লাইন এতক্ষণে কোথায় গিয়ে ঠেকেছে কে জানে…। এমনকি মায়ের কোলের দুধের শিশুটি, যে এতক্ষণ অস্থির হয়ে কান্নাকাটি করছিলো, সে-ও, ‘আরম্ভ হয়ে গেছে’ শুনে আনন্দিত হয়ে শূন্যে হাত-পা ছোড়াছুড়ি করতে আরম্ভ করল।
‘এমন সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না।’ ‘আরম্ভ হয়ে গেছে।’ শাহান এখনও কিছুই ঠাহর করতে পারছে না। এতদিনের সাংবাদিক জীবনে খুব কম এসাইনমেন্টে ঠেকেছে সে, কিন্তু আজ সবকিছুই এলোমেলো লাগছে। এগিয়ে যেতে যেতে সে এতক্ষণে এসে পৌঁছেছে ধানমণ্ডি দুইয়ের মাথায়। সে লক্ষ করল সায়েন্সল্যাবের মাথায় এসে ঝিমচ্ছে লাইনটা। শাহান সিদ্ধান্ত নিতে পারে না, বাটার সিগনালের দিকের লাইনটাকে ধরে এগুবে, নাকি মিরপুর রোড ধরে নিউমার্কেটের দিকে এগুবে। তার ভাবনারা চূড়ান্ত অস্থিরতায় ভুগছে। এমন সময়ে আর এক অপ্রত্যাশিত ব্যাপার লক্ষ করল;
– ভাই, শুনবেন, একটু এদিকে আসুন না, এই যে এদিকে, আসলে আমি লাইনটা মিস করেছি, শুনেছি লাইনটা গাবতলি পেরিয়ে হেমায়েতপুর হয়ে সাভারের দিকে চলে গেছে, বলছিলাম কী- এই চেকটা রাখুন, সাইন করা আছে, টাকার অংক! আপনার ইচ্ছেমত বসিয়ে নিয়েন। আমি নিজেও জানি না, এমুহূর্তে আমার একাউন্টে কতো টাকা আছে। আপনার যত ইচ্ছা তুলে নিয়েন। তাও যদি লাইনের জায়গাটা আমাকে ছেড়ে দিতেন! ‘আরম্ভ হয়ে গেছে!’
‘এমন সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না।’ লাইনের পেছনের দিকে গিয়ে অন্য কাউকে চেষ্টা করার ইঙ্গিত করলেন মানুষটি। টাকার প্রস্তাব সানন্দে ফিরিয়ে দেয়া শিখে গেছে এ শহরের মানুষ! অবাক ব্যাপার।
হারেফ অবাক হয়ে যান। লাইনের সামান্য একটা সিরিয়ালের বিনিময়ে ব্ল্যাংক চেক ফিরিয়ে দেয় মানুষ? ফিরিয়ে দিতে পেরে আনন্দ অনুভব করে! হারেফ সিদ্ধান্ত নেয়, লাইনে জায়গা ছেড়ে দেবার বদলে যিনি সারিতে দাঁড়ানো মানুষটিকে ব্ল্যাংক চেক দিতে চাচ্ছিলেন তার সাথে কথা বলবার, কিন্তু হারেফ দেখলেন, শুধু একজন মানুষ নয়, পরপর কয়েকজন মানুষ ব্ল্যাংক চেকের অফার ফিরিয়ে দিলেন। এবং হাসিমুখে চেক অফার করা মানুষটিকে লাইনের পেছনের দিকে গিয়ে দাঁড়ানোর ইঙ্গিত করলেন এবং প্রায় প্রত্যেকেই দুইটি বাক্য উচ্চারণ করলেন, ‘এমন সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না’, ‘আরম্ভ হয়ে গেছে।’
হারেফ এবার ফিরে এলেন সেই মানুষটির দিকে, যিনি একে ওকে ব্ল্যাংক চেক দিতে চাচ্ছিলেন তাঁর দিকে। কিন্তু তাকে খুঁজে পেলেন না। লাইনের কয়েকজনকে জিজ্ঞেস করলে তারা বলল, এদিকে জায়গা না পেয়ে তিনি চেক হাতে লাইনের পেছনের দিকে ছুটছেন, যদি ব্ল্যাংক চেকের বিনিময়ে কেউ তাঁর জায়গাটা ছেড়ে দেয়! অনেক দূরে তাকিয়ে হারেফ দেখলেন, লোকটি পাগলের মতো চেকটি হাতে নিয়ে এর ওর কাছে যাচ্ছেন এবং বরাবরের মতো প্রত্যাখ্যাত হচ্ছেন। একসময় তিনি ভিড়ের আড়ালে হারিয়ে গেলেন।
তিন
গতকাল বিকেলে বাংলা একাডেমির বিপরীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেটে পাঁচজন একত্রিত হবার ব্যাপারটা এতক্ষণে সংক্রমিত হয়ে গেছে পুরো শহরে। ঢাকা শহরের সকল রাজপথ, অলিগলিতে সারিবদ্ধ মানুষ, গতকাল বিকেলের পর থেকে তারা রাস্তাতেই, এতোটুকুও ধৈর্যচ্যুতি ঘটেনি তাদের। কোথাও কোন ঝামেলার খবর পাওয়া যায়নি। কোন গণ্ডগোল বা মারামারির খবরও নেই। লাইন দখলের চেষ্টা হয়েছিলো বটে, তবে সচেতন মানুষ সেই অপচেষ্টাকে ঠেকিয়ে দিয়েছে- মানুষ সারারাত জেগে লাইন পাহারা দিয়েছে। এ শহরের মানুষের পুরনো দোষ- যখন যা বিশ্বাস করে, মনেপ্রাণে করে, তাই হয়ত বারবার তাদেরকে চড়া দাম দিতে হয়েছে। এবারও দিতে হবে কিনা, তা এখনই পরিস্কার নয়।
এক রাতের ব্যবধানে, ‘পাঁচজন-এক’, ‘পাঁচজন-দুই’, ‘পাঁচজন-তিন’, ‘পাঁচজন-চার’, ‘পাঁচজন-পাঁচ’ পুরো শহরের চরিত্রকে একমুখী করে তুলেছে। তবুও অন্তত এই শহরের মানুষেরা ঐকমত্যে পৌঁছুতে পেরেছে, এটাই বা কম কী।
– প্রথমে মাংস খাওয়া আরম্ভ করেছিলো কারা?
– ‘সাহিত্যিকরা পৃথিবীর শত্রু।’
– দশ লক্ষ টাকার বেশ্যা।
– ‘ক্ষুধার্তরাই সৌভাগ্যবান, কারণ তারা চরিতার্থ হবেন।’ কথাগুলো বলার সময় যিশুখ্রিস্ট জানতেন না ক্ষুধার্তরাই তাঁকে ক্রুশবিদ্ধ করবে…
– নিজেকে জানো, তার আগে ভালো করে মরে নিও।
– পাপাচার এবং পাপবোধ এক টেবিলে বসে মদ্য পান করে।
– মানুষের সিং পেছনে, অন্য সমস্ত জন্তুর সামনে…
– প্রগতিশীল একটি কিম্ভুতকিমাকার শব্দ।
– মিথ্যা বলা একটা প্রতিভা।
– পুরুষের একমাত্র কাজ হওয়া উচিৎ নারীকে সঙ্গ দেয়া, এর মাধ্যমেই সমস্ত সৃষ্টি সম্পন্ন হতে পারে।
– নাট্যমঞ্চ আর বিচারসভার ভেতর গুণগত কোন পার্থক্য নেই।
– বেশিরভাগ মানুষ নিয়ম মানলে আইন রক্ষাকারী বাহিনী স্রেফ একটা সংখ্যায় পরিণত হয়।
এসব বোলচাল ছাড়াও আরও অনেক বিষয়েই তর্ক চলতেই থাকে লাইনে দাঁড়ানো মানুষদের মাঝে। এসব ছোটোখাটো বিষয় নজরে না নিলে, মানুষ বড় শান্ত আজ, ভীষণ আনন্দিতও।
গতকাল বিকেল থেকে সারারাত সাংবাদিক শাহান পথে পথে ঘুরেছেন, দেখেছেন মানুষকে, বড় অপরিচিত ঠেকেছে এই মানুষ, অনেকের সাথে কথা বলেছেন তিনি- আর ওদিকে জিন্নাত তাঁর জন্য সারিতে জায়গা রেখেছে, জিন্নাত বারবার এসএমএস দিয়ে তাঁর জন্য সারিতে জায়গা রাখার ব্যাপারটা নিশ্চিত করেছে। কিন্তু সাংবাদিক হারেফ শাহান এই সারিতের শেষ না দেখে ছাড়বেন না, তাকে শেষ পর্যন্ত পৌঁছুতেই হবে।
‘এমন সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না’, ‘আরম্ভ হয়ে গেছে’- মানুষের মুখে মুখে প্রাদুর্ভাবের মতো ছড়িয়ে কথাগুলো। আজ কেউ কথা বলছে না, তাদের আচরণে সামনে এগিয়ে যাবার তীব্র বাসনা ব্যতীত অন্য কিছুর উপস্থিতি লক্ষ করা যাচ্ছে না।
কিন্তু জিন্নাত কেন সারিতে তার জন্য জায়গা রাখল? বিষয়টাকে আর কোন অ্যাঙ্গেলে ভাবা যায় তা নিয়ে আপাতত মাথা ঘামাচ্ছে না সে, এখন পর্যন্ত তাঁর সাংবাদিক জীবনের সবচেয়ে বড় ব্যর্থতা, এই ঘটনা গতকাল সন্ধ্যার পর থেকে এই এখন পর্যন্ত সে প্রায় হাজারখানেক মানুষের সাথে কথা বলেছে।
জিন্নাত যেহেতু সারিতে দাঁড়িয়েছে, সে নিশ্চয় জেনেই দাঁড়িয়েছে। তাঁর কাছ থেকেই মানুষের সারিতে দাঁড়ানোর রহস্য উদ্ধার করতে হবে, একথা ভেবে সাংবাদিক জীবনের উপর ঘৃণা ছুঁড়ে দিতে পিছপা হল না শাহান। জিন্নাহকে ফোন করে পাওয়া যাচ্ছে না, এসএমএসে জানিয়েছে সে এখন শাঁখারিবাজারে, বুড়িগঙ্গা নদীর কাছে ইসলামপুর রোড আর নওয়াবপুর রোডের সংযোগস্থলে দাঁড়িয়ে, ধীরে ধীরে লাইনকে অনুসরণ করছে।
লাইনে জিন্নাতের জায়গা পাবার কথা ছিল না, কিন্তু তাঁর পুরনো প্রেমিক কয়েছ, জিন্নাতের জন্য জায়গা রেখেছিলো, জিন্নাত হারেফের কথা বলায় তার জন্যও সারিতে একটু জায়গা বের করে দিয়েছে কয়েছ। প্রেম এক অদ্ভুত ব্যাপার।
এখন লাইনটা বেশ দ্রুত এগোচ্ছে। মানুষের মুখের হাসি আরও চওড়া হচ্ছে, একে অপরের সাথে খোশগল্প করতে করতে তারা এগিয়ে যাচ্ছে- গন্তব্য বাংলা একাডেমির বিপরীতে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের গেট। ইতোমধ্যে প্রথম পাঁচজন উদ্যানের ভেতর প্রবেশ করেছে। বাকিরা উদগ্রীব, উদগ্রীব মানুষের চোখেমুখে বসে থাকা সারারাতের ক্লান্তি গেইটের কাছাকাছি আসতেই সদ্যস্নাত আকাশের মতো স্বচ্ছ হয়ে উঠছে।
হারেফ টিএসসি পর্যন্ত আসতে পারেন, এখানেও কাউকে জিজ্ঞেস করলে শুধু সামনের দিকে ইঙ্গিত করে- বলে, ‘এমন সময়ে পিছিয়ে পড়া ঠিক হবে না।’
হারেফের জেদ বেড়ে যায়, সে এগিয়ে যায়, পৌঁছে যায় লাইনের প্রথমে, সেখানে এখন প্রসন্নচিত্তে দাঁড়িয়ে আছেন এক নির্ভার মধ্যবয়স্ক পুরুষ, তাঁর সামনেই একজন ভদ্রমহিলা, সম্ভবত তাঁরা সম্পর্কে স্বামী- স্ত্রী।
– লাইনে কেন দাঁড়িয়েছেন আপনারা?
ভদ্রলোক এবং ভদ্রমহিলা বিরক্ত হলেন না, বরং খুশী হয়ে বললেন, শুনতে পাচ্ছেন কিছু? কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না? শুনুন, কান লাগিয়ে।
– না। হারেফ বলল।
– কিছুই শুনতে পাচ্ছেন না?
– না। হো হো করে হেসে উঠলেন ভদ্রলোক। ইতোমধ্যে তাঁর স্ত্রী এগিয়ে গেছেন।
– কিছুই শুনতে পাচ্ছি না।
ভদ্রলোকের কাছ থেকে লাইনে দাঁড়ানোর কারণ জেনে নিয়ে সাংবাদিক হারেফ শাহান যাবেন পুরান ঢাকা দিকে।
পাঁচ জন ‘আট’
– চিকিৎসক
– রোগীদের কোলাহল
– টাকার পা চাটছে
– ধূমপানে অভ্যস্ত
– রোগীর সিরিয়াল হাতে
– ঢোল বাদক
– দ্বৈত অভিনেতা
– স্ত্রৈণ
পাঁচ জন ‘সাত’
– সন্তানসম্ভবা
– তবুও হাস্যোজ্ব্বল মুখ
– পাপ তাড়াচ্ছেন
– পিপাসার্ত
– সিঙ্গেল
– ছাত্রত্ব বহাল
– গভীরতর অসুখের খাদ বুকের গহীনে
– আকাঙ্ক্ষার সমাবেশে অতিথি
পাঁচ জন ‘ছয়’
– বাবরি চুলের সদ্য যুবতী
– বয়স আনুমানিক সতের
– প্রেমিকের খোঁজে ব্যস্ত
– আলিয়াঁস ফ্রসেজে ফ্রেঞ্চ শেখার ক্লাস থেকে বেরিয়ে এখানে এসেছে
– গুলশান ১১২ রোডে বাসা
– বুক কথা বলে
– গভীরতর বস্তুবাদী
– গালের অতিরিক্ত মেদ ঝরাতে সবসময় মুখে চুইংগাম থাকে
– শারীরিক সম্পর্কের স্বাদ গ্রহণ করেছে
– গলায় ডায়মন্ডের হার
– টাচ ফোনের স্ক্রিনে সঁপে দিয়েছে হৃদয় ও মন
পাঁচজন ‘পাঁচ’
– বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক
– পরনে ইন ছাড়া ফুল হাতা স্ট্রাইপের শার্ট
– হাতে চটের ব্যাগ
– মাথায় টুপি
– হালকা মদ্যপানের অভ্যাস আছে
– দর্শনশাস্ত্রের উপর তাঁর লেখা গ্রন্থ বিশ্বের নামকরা ইউনিভার্সিটিতে পাঠ্য
– সম্ভবত আনকনট্রলড ডায়াবেটিসের রোগী
– নারীটির দিকে অবিশ্বাস ভরা দৃষ্টিতে তাকাচ্ছে
– পায়চারী করছেন
পাঁচ জন ‘চার’
– পায়ে বাটার পাম সু
– বয়স আনুমানিক এগারো বছর
– পরনে কুঁচকে থাকা গোল ঘেরের পাজামা
– মুখে একটা অর্ধমৃত প্রাণ লজেন্স
– সামান্য অস্থিরতা
– লাবণ্যময় মুখমণ্ডল
– দৌড় দিয়ে এদিক ওদিক যাচ্ছে
– চশমার চোখে অনির্ধারিত ছানি
– পাঞ্জাবীর বাম পকেট ফুটো
– ছিপছিপে
পাঁচ জন ‘তিন’
– তরুণী
– পরনে জিনস, ফতুয়া
– চোখে লেন্স
– ইনসমনিয়াক
– ধূমপানে অভ্যস্ত
– হাতে মার্কসবাদের উপর লেখা একটি চটি বই
– শারীরিক ভাষা পুরুষের চাইতেও ধারালো
– নিজেদের মধ্যে কী কথা হচ্ছে তা নিয়ে মাথাব্যথা নেই
– আকর্ষণীয়
পাঁচ জন ‘দুই’
– লম্বায় প্রায় ছয় ফিট
– গাঁয়ের রঙ সদ্য মাড়াই করা ধানের মতো
– হালকা গোঁফ, চাপ দাড়ি
– মাঝেমাঝে দাঁড়িতে হাত বোলাচ্ছেন
– ভাষা : বাংলা
– ডান ভ্রুর উপরে কাটা দাগ
– বাকিদের সুশৃঙ্খল হবার পরামর্শ দিচ্ছেন
– ওজন আশি কেজি প্লাস
– বিচক্ষণ
– শিক্ষিত
পাঁচ জন ‘এক’
– লম্বা পাঁচ ফিট এক ইঞ্চি
– সম্ভাব্য ওজন তেষট্টি কেজি
– গাঁয়ের রঙ শ্যামলা
– উচ্চমাধ্যমিক পাশ
– বেকার
– মনের ভেতর শান্তি শান্তি ভাব
– পায়ে চটি
– পরনে হাফ হাতা শার্ট ও ফুল প্যান্ট
– সিগারেট খাওয়া-জনিত কারণে দাঁতগুলো লালচে
– হাতে সিম্ফনি মোবাইল
– অনবরত কথা বলছেন
– যতটুকু বোঝা যায় কাউকে ডাকছেন
-একবার সরে গিয়ে দেয়ালের গায়ে প্রস্রাব করে এল
‘এই অবিশ্বাসী সময়ে কিছু বলার আছে? আপনি লাইনে না দাঁড়িয়ে অহেতুক সময় নষ্ট করছেন? যান যান, গিয়ে দাঁড়িয়ে পড়ুন।’ এই বলে উদ্যানের ভেতরে প্রবেশ করলেন ভদ্রলোক, যেখানে কিছুক্ষণ পূর্বে একে একে প্রবেশ করেছেন তাঁর স্ত্রী, পুত্র এবং কন্যা।
কান খাড়া করে বিচ্ছিন্ন শব্দগুলো শোনার চেষ্টা করলেন হারেফ, সম্ভবত ভদ্রলোকটির কণ্ঠের অস্পষ্ট আওয়াজ, ‘কেউ একজন বারবার জানতে চাইছেন কেন লাইনে দাঁড়িয়েছে মানুষ, কিছুই বলিনি আমি, বলিনি যে, এই অন্যায় অবিচারে ডুবে যাওয়া সমাজে মানুষের চাহিদা ফুরিয়ে গেছে বলে…, অদূরে আরও অনেক মানুষ…’
হাঁটতে হাঁটতে হারেফের মনে পড়ে যায় সাভারের মাটির সাথে মিশে থাকা বিষাক্ত কেমিক্যালের নিউজটির কথা, শুধু সাভারের নিউজটি নয়, তার মনে পড়ে শহরে সরবরাহকৃত পানিতে মিশে থাকা প্রাণঘাতী জীবাণুর কথা, মনে পড়ে খাদ্যদ্রব্যে ভয়ংকর কেমিক্যালের অস্তিত্বের কথা। মনে পড়ে তনু-নুসরাত ধর্ষণ ও হত্যার কথা, মনে পড়ে সাংবাদিক দম্পতি সাগর-রুনি হত্যাকণ্ডের কথা, মনে পড়ে বিচার না পাওয়া অসংখ্য মানুষের চেহারার কথা।
হারেফ দ্রুত হাঁটতে থাকেন শাঁখারিবাজার অভিমুখে। সেখানে তার জন্য লাইনে জায়গা ধরে রাখতে হিমশিম খাচ্ছে জিন্নাত, লাইনে দাঁড়িয়ে তাঁকে জিজ্ঞেস করতে হবে, কেন সে হারেফের জন্য জায়গা রেখেছে…