আশান উজ জামান >> এই আমাদের গাঁ! >> স্মৃতিকথা

0
371

এই আমাদের গাঁ!

কিছু বিল আছে এখনো, দেখলেই বুঝবেন, শরতে এখানে কাশবন সাজাতে আসত আকাশ, তার সাদা সাদা মেঘ নিয়ে। আর বিলের পানিতে দাঁড়িয়ে সেই আকাশ বা কাশের সঙ্গে নিজের পালকের তুলনা করত ঝাঁক ঝাঁক বক।

আপনি যদি আমার গ্রামে আসতে চান কখনো, নাভারণ বাজারে এলেই হবে, ওখান থেকে আপনাকে এগিয়ে আনবে বেতনা। মানুষ বলে এই বেতনা হলো বেতনা, না-খাল না-নদী! তবে আমরা জেনে গেছি, ওটা আসলে নদীই ছিল একসময়, নাম বেত্রাবতী! অসম সুন্দর সেই বেত্রাবতীর অবশেষই ওই বেতনা, ধুঁকে মরছে খালের প্রায়। আসার পথেই দেখা যাবে বুকে ওর ধানের ক্ষেত, মাছের ভেড়ি। আবার কোথাও কিছু নেই, পড়ে আছে শ্যাওলাভরা বিল। সেসব দেখতে দেখতে, অথবা না দেখতে দেখতে, আপনি যখন গোড়পাড়া বাজারে আসবেন, বাঁয়ে মোড় নিতে হবে আপনাকে। এরপর সামান্য একটু পথ, আপনি একাই যেতে পারবেন ভেবে বেতনা তখন চলে যাবে আরও সামনে শাড়াতলা বাজার হয়ে ওদিকে পাকশিয়া কাশীপুর। আর আপনি পা বাড়াবেন পশ্চিমে, লক্ষণপুরের দিকে। আপনার বাঁয়ে, কিছুটা দূর দিয়ে, তখন হাঁটতে থাকবে অপূর্ব সুন্দর এক বাঁওড়, নাম সোনানদীয়া। ওর হাত ধরে অথবা না ধরে কিছুদূর এগুতেই লক্ষণপুর। এরপর বাঁয়ে মোড় নিলে বাঁওড়ের সঙ্গেই আপনি পৌঁছে যাবেন গন্তব্যে। দেশের আর দশটা গ্রামের মতোই সুন্দর আর সাধারণ এই গ্রাম। এখানে ওখানে মাটির বাড়ি ইটের ঘর। প্রায় প্রতিটা বাড়ির পেছনেই বাঁশবন। বাঁশবনে আচ্ছটি ঝোপের ঝাড়, করমচার গাছ, আর এ লতা সে লতা। আড়ালে আবডালে নির্ভয় ঘুরে বেড়ায় সাপ আর বেজি। রাতে অগণন জোনাক পোকা, জ¦লতে থাকে চোখের মণি হয়ে। আর থমকে থাকা ডোবা নালায় হঠাৎ হঠাৎ চ্যাং উলকো শোলমাছের ঘাই।
‘পরেও তো শোনা যাবে তা, আগে বাড়ি ঢুকুন, বিশ্রাম করুন’ বলে বাঁওড়টা আপনাকে আমার বাড়ি চিনিয়ে দেবে। দু’পা হেঁটে আপনি যখন অশেষ বাঁশঝাঁড়ে ঘেরা বাড়িটায় ঢুকবেন, বাঁওড়টা তখন এগিয়ে যাবে সোনানেন্দের দিকে। সে গ্রাম ধরে কিছুটা এগিয়ে গেলে গোড়পাড়া। কিছুদূর গিয়ে সেখানেই থেমে গেছে বাঁওড়টা। বিশ্রামশেষে স্নান করতে তো ও-ই ডাকবে আপনাকে। গেলেই দেখতে পাবেন, কী চমৎকার দেহভঙ্গিমায় সে বয়ে গেছে এদিক দিয়ে। নৌকার ব্যবস্থা করতে পারি যদি, আপনাকে তাহলে দেখিয়ে আনব গোড়পাড়া, সোনানেন্দে, খামারপাড়া আর লক্ষণপুর কীভাবে জড়িয়ে রেখেছে ওকে। দেখিয়ে আনব এর শুরু এবং শেষ। দুই বিন্দুর মাঝখানে বিঘা কতক জমি, স্থলযোগ রচনা করে আছে চারপাশের জনবসতির সঙ্গে। না থাকলে বেশ একটা চক্রই পূরণ হতো বলা যায়। ধারণা করি, ওই যোগস্থানটা বিল ছিল বহু আগে, সেই বিলেরই ছোট্ট একটা ধারা খাল হয়ে বয়ে যেত আরও পুবে, মিশে যেত যে পথ দিয়ে আপনি এলেন সে পথের পুবে ছড়িয়ে থাকা বেতনায়। বৃত্তের ভেতর শত শত বিঘা জমি, সেখানে চাষ হয় স্বাভাবিক নিয়মে। ফল ও ফসল নিয়ে যাওয়ার জন্যই হয়তো, নৌকায় আর কত, পুরোনো বিলটাকে ভরাট করেছে মালিকপক্ষ। আর তাতেই পূর্ণচন্দ্রটায় ছেদ পড়েছে। যাহোক, বাঁওড়জুড়ে আগে শাপলা ফুটত বহু, পানকৌড়ির পাল মাতিয়ে রাখত বেলা। এখন হয়তো সেসব দেখাতে পারব না আপনাকে, কিন্তু বিশ্বাস করুন, আমিও দেখেছি সেসব। এখন কেমন বদলে যাচ্ছে সব। এবার এসে দেখি ফিকে হয়ে এসেছে বাড়িঘেরা বাঁশবনের আঁধারও। কানাচ থেকে পেছনে তাকালেই কিছু বাঁশঝাড়ের ফাঁক গলে উঁকি দিচ্ছে উঠে-যাওয়া-ঘর, পড়ে-থাকা উঠোন। বনে বাদাড়ে রাস্তায় জমিতে কুয়ো-খন্দ ভরাট করে- সবখানে এখন বাড়ি হচ্ছে। যেখানে আগে ইঁদুরও নামত না ঘৃণায়, সেই খানটা এখন ধবধবে লেপা বারান্দা, তুলতুলে গোলগাল হাতে পায়ে হামাগুড়ি দেয় শিশু। পাশেই হয়তো হাঁ করে বসে আছে রান্নাঘর, চুলোজুড়ে জ¦লে যাচ্ছে অতীতের বাঁশ।

বছর-বছর মা দূর্গা আর কালি এসে বেড়িয়ে যেত পাড়াটা ওদের। কত আড়ম্বর আর নিবেদনই না ঘিরে রাখত পাড়াটাকে তখন। তার রঙ আর ঢঙ গিয়ে মিশে যেত খালের পানিতে, পৌঁছে যেত দুপাশের বিলে ও বাঁওড়ে।

রান্না যা হবে, মানে গরিবের ঘরে যা জুটবে, খেয়ে নেব আমরা। তারপর বেরোবো বিল দেখতে। আমাদের পুব যেমন বাঁওড়ের দখলে, দক্ষিণ পশ্চিম উত্তর দিকটায় তেমন প্রকাণ্ড মাঠ। শিক্ষা দীক্ষায় এ গ্রাম প্রভূত উন্নতি করেছে, তবে বাপদাদাদের পেশা তো কৃষিকাজই। মাঠে মাঠে চাষাবাদ আর আশাবাদ বুনেই বছর ঘুরেছে তাদের। সঙ্গে ছিল মাছ ধরা। চাষের জমির জন্য জায়গা ছেড়ে দিয়ে, একটু নিচে দিয়ে তখন বয়ে যেত ভবঘুরে বিল বহু। দক্ষিণে শোলোর বিল, দক্ষিণপশ্চিমে বড়গাড়ি, তারপর একটু পশ্চিমে ঘুরলে মাজামারা, আরেকটু ঘুরলে সোজা পশ্চিমে হাজরাতলা, আর উত্তর-পশ্চিমে ডুঙাঘাটা। কিছু বিল আছে এখনো, দেখলেই বুঝবেন, শরতে এখানে কাশবন সাজাতে আসত আকাশ, তার সাদা সাদা মেঘ নিয়ে। আর বিলের পানিতে দাঁড়িয়ে সেই আকাশ বা কাশের সঙ্গে নিজের পালকের তুলনা করত ঝাঁক ঝাঁক বক। কিছুদিন যেতেই বিলের মাঝের কিছুটা উঁচু জমি ভরে যেত সবুজ খড়ে। তারও কিছু পরে সোনালি রঙ মেখে সেই খড় ছুটে যেত মানুষের উঠোনে, চালের ছাউনি হবে বলে। এতসব কর্মজজ্ঞের মধ্যেও শীর্ণ একটা খাল ওই বিল থেকে বেরিয়ে ওপাশের লক্ষণপুরের মাঠ ঘেঁষে চুপিসারে গিয়ে পড়েছিল প্রিয় বাঁওড়ের বুকে। ওর প্রবাহের মধ্য দিয়ে জলের আদান প্রদান চলত বাঁওড় ও বিলের। অসম সুন্দর বেত্রাবতীরই সন্তান তারা, খালটাই ছিল যোগের সুযোগ তাদের। তাতে বয়েই এর-জল ওর বাড়িতে নাইওর আসত। সঙ্গে থাকত কাঁকিলা বেলে পাকাল উল্কো খলসে আর কইসহ হরেক মাছের ঝাঁক।
কল্পনার চোখ জুড়িয়ে সেসব দেখব আমরা। দেখতে দেখতেই দেখব ছোট্ট একটা ব্রিজ লাফিয়ে গিয়ে খালের ওপারে লক্ষণপুরের মাটিতে পড়েছে। ওখান থেকে ডানে আকাশের মতো বাঁওড়, আর পথ থেকে বাঁয়ে তাকালে খালপাড় ঘেঁষে পাড়–ইপাড়া। বসত গেঁড়ে আছে মৎস্যমানুষ বহুবর্ণে নাকি বাগদি ওরা। যুক্তবর্ণের মতো একঘরের সঙ্গে মিলে থাকত অন্য-অন্য ঘর তাদের। ঘরের গায়ে ঘর, এই ঘরের চালের ওপর ওই ঘরের চাল, তার নিচে আরেক ঘরের ছাউনি। ফাঁকে ফাঁকে যেটুকু ফাঁকা জায়গা, উঠোন বা আনাচকানাচ, সেগুলো জুড়ে থাকত জাল আর মাছ ধরার সরঞ্জাম। মাছের গন্ধে ভরে থাকত বাতাসের মুখ। বাঁওড়ের পাড়ে সাদাটে বেলে মাটির ওপর খয়েরি নকশা এঁকে পড়ে থাকত বিশাল বিশাল জাল। আর ডাঙার পায়ে লুটিয়ে পড়া মিহি ঢেউয়ে মৃদু দুলত ছোট বড় নৌকা- ডুঙা। জালগুলোর মালিক খামারপাড়ার আলিকদর আর লক্ষণপুরের ইয়াসিন। নৌকাগুলোর অধিকাংশও তাদেরই। অন্যগুলো অন্যদের। বাগদীরা ছিল জালাছি তাদের। মাছ উঠলে টাকা, না উঠলে নাই। তবে অধিকাংশই ছিল স্বাধীন, বিলে খালে বর্শা বরশি ঘুনি আর খ্যাপলা জালে মাছের আঁশ বুনে জীবন সাজাত। অভাব ছিল, অনটন ছিল; হাসির উপলক্ষ আর উদযাপনের সুযোগে তবু নেচেও উঠত ঢোলের তালে। বছর-বছর মা দূর্গা আর কালি এসে বেড়িয়ে যেত পাড়াটা ওদের। কত আড়ম্বর আর নিবেদনই না ঘিরে রাখত পাড়াটাকে তখন। তার রঙ আর ঢঙ গিয়ে মিশে যেত খালের পানিতে, পৌঁছে যেত দুপাশের বিলে ও বাঁওড়ে।
খালটা যেন হারিয়ে যাচ্ছে দিনে দিনে। যেমন গেছে বিলটাও। বাঁধ দিয়ে দিয়ে ভেড়ি বানিয়ে বানিয়ে তার দফা রফা করেছে মানুষ। তাই উধাও এখন বিলের বক বা কাশ বা খড়ও। বাঁওড়ের পানকৌড়ি কচুরিপানা আর দামও দেখি না তেমন। তাতে মাছ ধরার সুযোগও আর অবারিত না। তার জল এখন বন্ধকী সম্পর্কে বাঁধা। পাঁচ বছর পরপর হাতবদল হয়। জলে তাই দাপিয়ে বেড়ায় গার্ডের পরে গার্ড, ওষুধের পরে ওষুধ। সবুজ শ্যাওলাভরা পানিতে আগে যে জীববৈচিত্র্য ছিল, তা সব উধাও এখন। মৎসজীবীরাও ছড়িয়ে পড়েছে এ কাজে সে-কাজে। দেখে বোঝা যায়, ভালোই আছে তারা আর্থিকভাবে। চালগুলো পচা খড় বিচালি সরিয়ে টালি পরেছে, পরেছে ঢেউটিন। পুরোনো লম্প সরিয়ে ঘরে ঘরে আলো দিচ্ছে বিদ্যুৎবাতি। আলোর মতোই পরিষ্কার হয়ে উঠেছে সব, হয়ে উঠেছে পরিচ্ছন্ন। পুজো পার্বণে উৎসাহও হয়তো কমেনি। কিন্তু বিচ্ছেদ ঘটেছে চিরকালের বন্ধু সেই জাল ঘুনি আর বর্শা বরশির সঙ্গে। পাড়াটার চোখের নিচে তাই কালচে হয়ে থাকে স্মৃতিকাতর বেদনা। স্বচ্ছ জলে তাকিয়ে সে আকাশ দেখত একসময়। আর আকাশের দেবতারা মুখ দেখার সময় ওই খালে তাকিয়েই দেখে নিত মানুষের আর্জি আর আরতি। আর এখন, বর্ষা ফুরোলেই তাতে উড়ে উড়ে যায় ধুলোর আস্তরণ। বিলগুলো গেছে, যতদিন পারে খালটাও হয়তো অমনই থাকবে পড়ে, স্মৃতির ঝুল ধুলো মেখে। তারপর বুঁজে যাবে একসময়, ঘুঁচে যাবে দু’পাড়ের দূরত্ব তার। সেখানে হয়তো দালান উঠবে, বা বাজার। কিংবা বসবে কোনো কারখানা। শুকনো খটখটে রাস্তায় রাজপাট বসানো ব্রিজটা দেখে পূর্বসূরীদের যদি বোকা ভাবে ভবিষ্যতের লোকেরা তখন, তাদেরকে কি খুব দোষ দেওয়া যাবে আর?