আশান উজ জামান >> চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা >> ছড়ানো ছিটানো গদ্য >> স্মৃতিকথা

0
345

চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা

আমাদের ওদিকে রাস্তাগুলো হেলেদুলে চলে। হেলতে দুলতে গিয়ে পড়ে যেন না যায়, সে-জন্য পাশ দিয়ে খেজুর গাছের বেড়ি। রাস্তা থেকে নেমে জমি দেখতে যাওয়া আইলগুলোও খেজুরগাছেরই দখলে। শীতের রাতে সেখানে আদিগন্ত কুয়াশারাঙা চরাচর। খেজুর গাছগুলো তাতে ঝাঁকড়াচুলো বাউলের চেহারা নেয়। গলায় গলায় রসের ভাড়ের মালা। মিষ্টি ছেলের দল যদি তখন হঠাৎ বেরিয়ে পড়ে পথে, ওসব ভাড় তাদের না ডেকে পারে না। আর এটা তো জানা কথাই যে, কৈশোরে অমন ডাক না-শোনার সুযোগ খুব একটা হয় না। ফলে, শুনতে পাই, এলাকার খুব কম মানুষই আছে, ছোটকালে ওসব ভাড়ে-ভাড়ে যারা অমৃত খোঁজেনি।
কদিন আগে এবার বাড়ি গেলাম যখন, তখনও শীত কুয়াশার কাল। বাজার থেকে বাড়ি ফেরা, বা রাতে খেয়ে হাঁটতে বেরিয়ে ছোটদের সঙ্গে আড্ডা জমেছে দারুণ। ওরাও নাকি অমৃতের সন্ধানে বেরিয়েছিল একদিন। তা বড় রাস্তার গায়েই যখন ভাড় সারি সারি, কষ্ট করে আর জমিতে নামা কেন? রাস্তা থেকে সামান্য হেলেপড়া গাছ থেকেই ওরা নামিয়ে এনেছে ভাড়। পাটকাঠির ‘স্ট্র’ মুখে নিয়ে রসাস্বাদন তারপর। জমে যাওয়া হিম, কুয়াশার দুধ বয়ে বয়ে ক্লান্ত বাতাস, সময়ও তাই জমেই যেন আছে। তার ভেতর দাঁড়িয়ে তিনটা স্ট্রর মুখে তিন বাঁদরের মুখ। পাশেই কড়া হলুদ বিছিয়ে রেখেছে বিঘাটাক সরষে খেত। একটা সেলফি না হলে কি জুতসই হয়? ওরা তাই নেমে গেছে খানিক। খেজুর গাছ, সরষে ফুল, আর চুরির ভাণ্ড মিলিয়ে নিয়ে ক্লিক যখন হবে, তার আগেই হেড়েগলা – ‘এই কারা রে ওকেনে?’ শুনেই একজন হলুদ ক্ষেতে, অন্যজন আলু ক্ষেতের ভেতর, আর একজন এমনই অবাক, ভাড় হাতেই স্ট্যাচু অব লিবার্টি, দৌড়ানোর কথা ভাবতেও পারেনি নাকি।
শুনতে শুনতে আমিও ফিরে গেলাম অমনই এক কুয়াশারাতে। কলেজপড়ুয়া আমি তখন শহরে থাকি। গ্রামে থাকতে দিন কেটেছে আলগা গরিমাভরা এক তালপুকুরের হাঁটুজলকাদায়। কেটেছে মায়ের হাতের কঞ্চির ভয়ে কুণ্ঠিত, জড়োসড়ো। ফলে লাঞ্ছিত আমি বঞ্চিতই থেকেছি গ্রামে বেড়ে ওঠা অন্যদের মতো উড়ন্ত বাচ্চাকালের অফুরন্ত আনন্দ নেওয়া থেকে। এর-ওর গাছের বরই জাম আম কাঁঠাল পাড়া, গাজর মুলা টমেটো আখ ক্ষেত থেকে মধু চিপড়ে খাওয়া, খেজুর তালের রসে ডুব দেওয়া – শোনা গল্পই সব আমার কাছে। ‘শেখবাড়ির ছেলে, এসব করলে লোকে কী বলবে?’ ‘সামাদ শেখের ব্যাটা এমন করলে কেমন করে হবে?’ – শুনতে শুনতেই দিন গেছে। তো বাড়ি যাওয়ার পথেই সেবার ঠিক করেছিলাম : এবারই সুযোগ, নিরামিষ বৃথা জীবনটাকে কিছুটা হলেও সার্থক এবার করতেই হবে। তখনও এমন রসে ডুবে আছে গ্রাম, ম ম করছে গুড়ের গন্ধ, ঘরে ঘরে টইটুম্বুর পিঠার ঝুড়ি পায়েসের হাড়ি। তো পরিসংখ্যান কথা বলে যাদের পক্ষে, এমন দু’জনকে নিয়ে দল-বাঁধা হলো। হলো ঠিক ঝোঁপেমারা কোপটাও সঠিক। শীতের তুলনায় পোশাক সেদিন কম পরেছিলাম নাকি পোশাকের তুলনায় শীতই বেশি পড়ছিল – জানি না। তবে কাঁপতে কাঁপতে দেখি নেমে আসছে পেটুক ভাড়। আহা, শীতে শুষ্ক গলা আমার চাতকের মতো অপেক্ষায়। সেই অপেক্ষার বারোটা বাজানো বারতা এলো তখনই – ‘এই, কারা রে ওকেনে?’ কণ্ঠটাও চেনা – যাদের গাছ, তাদের বাড়িরই ছেলের! স্বভাবতই আমি উসাইন বোল্ট তখন। কিছুদূর গিয়েই অবশ্য মনে পড়ল গাছের বন্ধু গাছেই রয়ে গেছে। ও কি নামতে পারবে ঠিকঠাক? পালাতে পারবে? ধরাই যদি পড়ে, আমার কথাও কি বলে দেবে? দিলেই তো আমি শেষ। মায়ের হাতের দাগ যেন স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি পিঠে। তারই ব্যথার চোটে নাকি দম ফুরিয়ে আসায় জানি না, গতি তখন কমতে কমতে মো ফারাহ’র মতো। সেটা থামিয়ে বসে পড়লাম উঁচু এক আইলের ওপর। বসতেই শুরু হলো ব্যর্থ রসকাণ্ডের প্রতিক্রিয়ায় কীভাবে আন্দোলিত হবে আমার অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের রূপরেখা – তার হিসাবনিকাশ। আচ্ছা, অন্যরা এলো না কেন? সবাই কি ধরা পড়ল বোকার মতো? মারধোর করছে না তো ফালতু লোকটা ওদের? বছরখানেক ধরে বয়ে চলা ঘড়ির কাঁটায় সেভাবে ঘণ্টাখানেক অপেক্ষার পর দেখি ফিরে এসেছে ওরা। আসতেই পড়লাম উল্টো জেরার মুখে। একা পালিয়ে এলাম কেন, কেন ওদের জন্য দেরি করলাম না – এটা এবং সেটা। কড়ায় গণ্ডায় কৈফিয়তের পরেই তারপর জানা গেল পুরো অনুষ্ঠানের ধারাবিবরণী : ধরাই ওরা পড়েছে বটে, তবে চোর হিসেবে না। লোকটার এক বন্ধু এসেছে রস খেতে, কিন্তু গাছ তাদের হলেও লিজ নিয়েছে তো অন্যরা। ফলে অন্যদেরই রস, খেতে হলে চুরিই করতে হবে। তাছাড়া গাছে উঠতেও পারে না তারা। কাউকে পেলে ধরে গাছে উঠিয়ে দেবে – এমন চিন্তাতেই পা ফেলেছিল। ব্যাটে ঠিকঠাক লেগেও গেছে বল। তারা দুজন আর আমাদের দু’জন মিলে দুর্দান্ত এক দল হয়ে তারা রস খেয়েছে এতক্ষণ। আহা, রূপকথা! শুনে তো আমার বিশ্বাসই হয় না। আমি শুধু জিজ্ঞেস করি, ‘আমার নাম বলিসনি তো? তালি একদম মেরে ফ্যালবে মা আমারে।’ উত্তর পেতে অবশ্য দেরি করতে হলো না। পরের দিন বাঁওড়ে স্নান করতে গিয়েই এক পাড়াতো চাচার জেরার মুখে পড়লাম। ‘রস খাতি গিয়ে ধরা পড়িলে নাকি, হাগা! ভাবি জানতি পারলি তুমার হাড়গোড় আস্ত রাকপ্যান তো?’
কলেজে পড়া অবস্থায়ই যদি এই হয়, আরও পিচ্চিকালে আমার ওপর কী অত্যাচারই না গেছে, ভাবতেও কষ্ট হয় এখন! আহা! তাই বলে কি ডাহা ডাহা শূন্য পেয়েছি চুরির খাতায়? উঁহু! কেউ কেউ তো থাকেই, যারা ঘরের বাইরে বিড়াল মাসি হলেও ঘরের ভেতর বাঘ মামা। বাইরে কিছু করতে না পেরে আমি তাই ঘরেই করতাম প্রতিভার প্রকাশ। সে-সব ঘটনার দুই একটা বলি এই ফাঁকে।
স্কুলে যাওয়া আর আসা ছাড়া বিশেষ কাজ করতে হতো না। সময় কাটে গ্রামময় ঘুরে বেড়ানো চৈতি হাওয়ার মতো। মাঝে মাঝে জমেও যাই ঢালি চাচার মুদি দোকানে, বাঁশের চটার বেঞ্চে। দাবার বোর্ডে সেখানে পটাপট হাতি ঘোড়া মরে। তো ঘোরাঘুরি বলুন, বা কে মরে কে বাঁচে ভাবনা ভেবে দাবাখেলা দেখার পরিশ্রম কি কম? আর ধকল যখন বেশি, তখন খিদেটিদেও কী তুমুল না? তাছাড়া দোকানে ঝুলতে থাকা ক্রিমবল, কাঠিভাজা, মোড়া আর লাঠিবিস্কুট দেখে খেতে মন চাইলে লোকে যতই তাকে লোভ সাব্যস্ত করুক, আমার তো খিদেই মনে হতো। কিন্তু তুমুল সেই খিদে – পেটেরই হোক বা চোখের – মেটানোর উপায় কই? কথায় কথায় মা বলেন, ‘ভাত জোটে না, খাটা খাটা করে।’ অমন মানুষের কাছে কাঠিভাজা খাওয়ার টাকা চাওয়া অমূলক। তাহলে? খাওয়া কি বন্ধ হয়ে যাবে? অতৃপ্তি নিয়েই কি ধুঁকতে হবে আমার শিশুমনকে? কক্ষনো না! ঢালি চাচা-চাচি আমাকে পছন্দ করতেন খুব, করতেন বিশ্বাসও। খেতে হলে তাই খেয়ে নিতাম বাকিতে। ঝামেলা বাঁধতো সেই বাকি শোধ করার প্রশ্নে। মাকে বললে কঞ্চি ভাঙবে পিঠে, আব্বাকে বলারও সাহস নেই। তার পকেটও তো প্রায় খালিই থাকে, দেখেছি। ‘পেটের দায়ে’ আমাকে তাই হাত চালাতে হতো নতুন নতুন উপায়ে।
কাঠমিস্ত্রী আব্বা সপ্তাশেষে যা পান, নিতান্তই তা হাতে গোনা। তা দিয়েই চলে খাওয়া-পরা-মাখা, পড়ালেখা থাকা। দু’কেজি পাঁচ কেজি করে চাল কিনে রাখি। একটা হাড়ার ভেতর থাকে সেগুলো। বুঝতেই পারছেন, শ্বাসও যেন হিসেব করেই ফেলা লাগে আমাদের তখন। প্রয়োজন পড়লে তবু ঢুকে যেতাম ওই চালের হাড়াতেই। যতটুকু চাল টুপির মধ্যে আঁটে, ততটা নিয়ে লুকিয়ে রাখতাম খাটের নিচে বা ঘুলঘুলিতে কিংবা পড়ার টেবিলে। মাগরিব বা এশার নামাজের ছুঁতোয় চলে যেতাম দোকানে। পোয়াটাক চাল, যে দামে কিনেছিলাম তার কমে বিক্রি! বাজার করতে গিয়েও কিছু কিছু ‘রোজগার’ করতে হয়েছে। চাল ডাল কেনার সময় বাজার ঘেঁটে কমদামিটা কিনতাম সবসময়। বাড়ি গিয়ে তারপর হিসেব দিতাম বেশি দামের। ধরা যাক, চালের দাম নয় টাকা সাড়ে নয় টাকা। আমি নয় টাকারটা কিনব, মা দাম জিজ্ঞেস করলে বলব সাড়ে নয় টাকা। ফলে চাচাদের কাছে দাম জিজ্ঞেস করলেও সমস্যা নেই, সাড়ে নয়টাকা দামে তো আসলেই বিক্রি হয়েছে বাজারে! মাঝখান দিয়ে দশ কেজি চাল কিনে থাকলে পাঁচ টাকা আমার! এভাবে তরি তরকারি বা মাছের দামদর উল্টেপাল্টেও কামিয়ে নিয়েছি পাই টু-পাইস। এমন করে আটআনা চারআনা ‘আয় করা’র সুযোগ না থাকলে আমি কিনতাম না কিছু। বেগুনের কেজি দুই টাকা দেখে একবার আমি চলে গেছি অন্য দোকানে। সুবিধা করতে না পেরে আবার ফিরে এসে জিজ্ঞেস করেছি আঙ্কেল, দাম একটু কম করেন। আড়াই টাকা কেজি হলে আমি এক কেজি নেব। আঙ্কেল তো হেসেই খুন, দুই টাকার বেগুন আমি আড়াই টাকায় নিতে চাচ্ছি। মনে পড়লে এখন হাসি থামাতে পারি না আমিও। প্রশ্নও জাগে – দেড় টাকা বলতে গিয়েই আড়াই টাকা বলেছিলাম, নাকি দেড় আড়াইয়ের পার্থক্য বুঝতাম না? যাহোক এভাবে পাওয়া আটআনা চারআনা বুনে বুনে যা হতো, তা দিয়েই চলত আমার বারোয়ারি পেটপুজো। আর চাল বিক্রি করে যা হতো তা নিয়ে গিয়ে জমা দিতাম দোকানে। মাঝে-মাঝে আত্মীয় কুটুম এলে হাতে দশটাকা পাঁচটাকা দিলেও পড়ত সেটা জমার খাতায়। আমি সৎ মানুষ, দোকানের বাকি জমিয়ে রাখতাম না!
তবে খুব বাধ্য না হলে চুরিটুরি করিনি কখনো! একটা ক্রিমবল বা লাঠিবিস্কুট অথবা মুড়ি চানাচুর কিংবা কাঠিভাজা খাওয়া কি বাচ্চাদের অধিকার না? সেই অধিকার যদি ঠিকঠাক না দেওয়া হয়, ছোট্ট আশান তখন কী করতে পারত? অথবা রমজান এলে মামা যখন খেজুরের ব্যবসা করতেন, তখন এক-দুই প্যাকেট খেজুর পকেটে নিয়ে খেয়ে বেড়ানোর ইচ্ছে কি তার হতে পারে না? কিংবা বড় ফুপুর বাড়ি গিয়ে ঘরভর্তি খেজুরের গুড়ের ভাড় থেকে বাটিখানিক তুলে নিয়ে চুমুক যদি সে দেয়ই, কেন তাকে দোষী করবেন আপনি? চুরি বলুন বা ডাকাতি, করেছি তো সব নিজের লোকেদের কাছেই, নাকি? তবু, গৃহস্থের দিনটা যদি এসেই যেত, কী একটা কেলেঙ্কারিই না বেঁধে যেতে পারত!
শত্রুর মুখে ছাই দিয়ে, ‘সৌভাগ্য’ই বলতে হবে, দশ দশে কত শত দিন এসব করেছি, গৃহস্থের দিনটা আসেনি কোনোদিন। ঢাকায় এলাম যখন, খুব মন খারাপ হতো মাঝে-মাঝে। একা লাগত, মনে হতো দুম করে মরে যাই যদি, যদি আর সুযোগ না পাই বলার? এক ছুটিতে গিয়েই তাই মাকে বলে দিয়েছিলাম সব। শুনে মা হেসেই খুন : ‘তাই বলে টুপির মধ্যে চাল নিয়ে যাতিস! ওরে নামাজি ছেলে আমার!’ হাসতে হাসতেই শেষ আমরাও। সম্মিলিত সেই হাসিতে মিশেছিল, ‘মেম্বার সাহেব’ ছোটফুপুর স্বরও। বাড়ি এসেছি শুনেই দেখতে এসেছিলেন তিনি। খুব অবাক হয়েছিলেন, তার ‘প্রায় যুধিষ্ঠির’ ভাইপো এসব করে বেড়িয়েছে তাদের অগোচরে! খুব যত্ন করেন আমাকে। সুযোগ পেলেই পাকশিয়ায় ছুটে যাই আমিও। ছোটবেলায়ও যেতাম। সেখানকারই একটা কথা বেশ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠেছে এবার। একদিন দু’দিন থেকে চলে আসলেও, সেবার ছিলাম মাস খানেক। ফুপার একটা মুদি দোকান ছিল বাজারে। সকালে সকালে আমাকে দোকানে বসিয়ে তিনি অন্যান্য কাজ করে বেড়াতেন। সকালের দিকে খদ্দের কম আসে কিনা কে জানে। বসে বসে আমি রাস্তা দিয়ে চলা সাইকেল মোটরসাইকেল গুণতাম আর সগৌরবে গ্রান্ড চয়েজ বিস্কিট খেতাম! যত প্যাকেট বিস্কিট আমি খেয়েছি সে-সময়, পরবর্তী এই বিশ-বাইশ বছরেও আর খাইনি তত! এবং অবশ্যই, ধরা পড়িনি কোনোদিন! অথবা জেনেও ফুপা না জানার ভান করতেন, কে জানে। এই লেখাটা পড়ার সময় ওঁরা খুব হাসবেন আবার, জানি। কিন্তু কী করব, যা করেছি তা তো বলতেই হবে।
কিছুদিন আগে সেই প্রসঙ্গ উঠতেই দেখি উল্টে গেছে দাবার বোর্ড। মা বললেন, ‘আমারও দুই-একটা ঘটনা আছে। তুমার চুরি করে আমিও কিছু কাজ করিছি।’ তাঁর চুরিবার্তার শিরোনাম শুনেই অবশ্য থামিয়ে দিয়েছি। বলেছি, ‘আমার টাকা তো তোমারই টাকা, মা। যা খুশি তাই করবে তুমি। শুধু আশীর্বাদ কোরো, সে সামর্থ্য যেন থাকে আমার।’ চুরি নাকি আব্বাও করেছেন আমার থেকে। তাতে যদিও আবেগ মেশানো খুব। তবু বলি। শেষ দিকে বেশ অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন যখন, ডাক্তারের নিষেধের বেড়ি আমি একটু আঁটসাঁট করে বেঁধে রেখেছিলাম তাঁর পা-য় – ধূমপান করা যাবে না। লুকিয়ে-চুরিয়ে তবু নাকি নিয়মিতই তিনি দেখা করতেন বিড়ি সিগারেটের সঙ্গে! আর একটা ব্যাপার তো মনে হয় আগেই কোথাও বলেছি। চাকরি পেয়েই আব্বাকে মিলের কাজ ছাড়তে বলেছিলাম। ‘এবার একটু আরাম করুন।’ বাধ্য বাবার মতো তিনি শুনেওছিলেন সব। কিন্তু আমাকে না জানিয়ে প্রায়ই নাকি কাজে যেতেন। বউমার জন্য কিছু কিনে দিতে মন চাইলে যেন ছেলের টাকা নেওয়া না লাগে। আহারে, স্যান্টা ক্লজ বাপ আমার!
আচ্ছা, চুরিদারি অনেক হলো। এবার একটু অন্য প্রসঙ্গ।

মনে আছে, কোনো আপুর বিয়ে হলেই খুব মন খারাপ হতো আমার। মনে হতো, ধরা পড়ার পর পাখিদের উড্ডীন উচ্ছল দিনগুলো যেমন বন্দি হয়ে পড়ে খাঁচায়, অমন করেই কি থমকে যাবে না তারা? নিজের বাড়িঘর পরিচিত মানুষজন ছেড়ে অচেনা পথে অচেনা ঘরে গিয়ে উঠতে হবে থাকতে হবে, কষ্ট হবে না তাদের? এখানে তো ভালোই আছে, খাওয়া পরার কষ্ট নেই, মা-বাবার সঙ্গে থাকে। শুধু শুধু কেন আমগাছের ছাল এভাবে জামগাছে জুড়ে দেওয়া? এমন ভাবনা কেন জন্মেছিল, জানি না। হতে পারে মা-চাচিদের কোনো দুঃখ-দুর্দশা আমায় পীড়িত করেছিল। অথবা আগেই বিয়ে হয়ে যাওয়া কোনো চঞ্চল আপু, যার সাথে আমরা বুড়িচু গাদি লুকোচুরি খেলেছি, বিয়ের পর থেকে তার ‘বড়’ হয়ে যাওয়া দেখে কষ্ট পেয়েছি। আর ভেবেছি, আহা, ডানা ভেঙে গেলে পাখিদের কী কষ্টই না হয়! তো কদিন পরই বিয়ে হয়ে যাবে, এমন এক আপু আমাদের গাছের আম খেতে চাইলেন কথায় কথায়। অন্য সব ক্ষেত্রে যেমন হয়, তেমন করেই হয়তো মায়ের কাছে গিয়ে বলতাম ব্যাপারটা, তিনিই ব্যবস্থা করতেন। কিন্তু পারিবারিক এক ঝামেলায় আমাকে আম পাড়তে কঠোর নিষেধাজ্ঞা দিয়ে রেখেছেন তিনি। তাঁকে গিয়ে বলি কী করে? বাধ্য হয়েই তখন নিজের গাছের আমও চুরিই করতে হলো আমাকে। মাঝারি এক বালতি আম নিয়ে ছুটে গেলাম তার বাড়ির পথে। গেলাম বাঁশবাগানের ভেতর দিয়ে আচ্ছোটি করমচা আর অন্য শত আগাছার ঝোঁপ-ঝাড় মাড়িয়ে। আচ্ছা, এখন মনে হচ্ছে, যাওয়ার সময় একবারও কি আমার সাপের ভয় করেনি? চিরকেলে সাপের ভয়ের চেয়েও আপুর চাওয়া পূরণ করাটাই হয়তো বড় হয়ে উঠেছিল আমার কাছে। নাকি বড় আপুটার ছোটবোনের চোখ অথবা ভুরুর কোনো কারসাজি ছিল সেটা?