আশান উজ জামান > মোমজীবন >> ছোটগল্প >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
590

মোমজীবন >> ছোটগল্প 

দুটো আয়নাকে সামনাসামনি দাঁড় করিয়ে দিলে যে জাদুর সৃষ্টি হয়, তা দেখার ব্যবস্থা অধিকাংশ সেলুনেই আছে। দুই দেওয়ালে আটকে থাকা মুখোমুখি আয়নাগুলো খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে থাকে নিজেদের। একটা আয়না অনেক হয়ে ধরা দেয় অন্যটার চোখে। ক্রমশ ছোট হতে হতে, পিছিয়ে যেতে যেতে তাদের ছবিগুলো এ ওর বুকে গড়ে তোলে অশেষ ধাঁধার সুড়ঙ্গ। দেখলে বিস্ময় জাগে, মজা তো লাগেই। আয়না দুটোর জন্য যদিও খুব সুখকর না ব্যাপারটা। অন্যের ভেতর ঢুকতে পারলে পুলক যেমন জাগে, নিজের ভেতর আরেকজনের উপস্থিতির জ্বালাও কি কম?
প্রায় সমপরিমাণ সেই পুলক আর যন্ত্রণায় যুগপৎ খোশ আর নাখোশ হওয়ার ধাঁধাটা এই বাড়িতেও আছে। একটা আয়না এনেছে বউ, আরেকটা বর। একটা আয়নার কোমর ভাঙা; সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারে না। আরেকজনের চোখের পারা গেছে ক্ষয়ে, দেখতে অসুবিধা। স্বভাব তবু টনটনে দুজনেরই। সেলুনের আয়নাগুলোর মতোই একে অপরকে ঘেঁটে দেখাতে ব্যস্ত তারা। ব্যস্ত তাদের ছেলে-মেয়েও; একজনের ব্যবসা, অন্যজনের চাকরি। বাসার দিকে নজর দেওয়ার সুযোগ হয় না। যে যখন পারে বাজারসদাই আনে, রেধে বেড়ে খায়। অন্যান্য কাজের জন্য ছুটা বুয়া আছে। ফাইফরমাস খাটে অফিসের একটা ছেলে। আয়না দুটোর কাজ এসব তদারকি করা আর বুয়াটাকে চোখে চোখে রাখা। এদের তো খুব হাতটান থাকে, নজর রাখা তাই জরুরি। তবে এই মেয়েটা ভালো, নেয় না কিছু। তবু আজ যখন গেল, গেল যেন সূর্যটাকেও ভাতের থলেতে পুরে, যাওয়ার পরপরই তাই আঁধার করে এলো।
আকাশে মেঘ, বাতাসে ঠান্ডা ভাব।
বাসার সবচেয়ে কম সুবিধার আর বেশি ঝামেলার ঘরটায় বাস করে আয়না দুটো। তাদের সামনে একটা জানলা। তার সামনে দুইতলা একটা গাছ। শিকড় আর ডাল ছড়িয়ে সে ক্ষতি করছিল বিল্ডিংয়ের। মালিক তাই গত সপ্তায় ছেটে দিয়েছে সেসব। আর অবলম্বন হারালে যা হয়, অভাগা গাছটা মুখ থুবড়ে পড়েছে কালরাতের ঝড়ে। তারপর থেকে পড়েই আছে ওই জানলার মুখ বন্ধ করে। বাইরের হাওয়া ঠান্ডা হলেও ঘরটা তাই গুমোট। তার চেয়েও গুমোট বুকে বসে ছিলেন আয়নাদুজন।
বেশ একটু কথা কাটাকাটি হয়েছে। অসহ্য লাগছিল একজনের কাছে অন্যজনকে। পরিস্থিতিটা বুঝতে পেরেই যেন চলে গেল বিদ্যুৎ। আর মুহূর্তেই অদৃশ্য হয়ে গেলেন তারা একে অপরের কাছ থেকে। যেতেই ছুটে বেরিয়ে গেলেন পারা ক্ষয়ে যাওয়া আয়না বানু। মোম জ্বালাতে হবে।
আমরা জেনে গেছি যে অপরজনও আয়না। তবে তিনি বেগম।
ছোটবেলা থেকেই রাজ্যের ভয় এই বেগম আয়নার বুকে। দিনে দুপুরে পাতা পড়ার খসখস শব্দেই তিনি চিৎকার দিয়ে ওঠেন, একা থাকা অন্ধকারে তো শিঙা ফুঁকার জোগাড়! কত রাত যে এভাবে নির্ঘুম কেটেছে তার! ঘরে-বাইরে ভুগতেও হয়েছে খুব। বাপ-মা থেকে শুরু করে শ্বশুর-শাশুড়ি কারোরই ছুরিকথার পোঁচ রেহায় দেয়নি। শুধু বরটাই যা পাশে থাকত সহানুভূতি নিয়ে। ‘ভয় পাসনে, আমি আচি।’ গম্ভীর গলার সেই মোলায়েম স্বরও মাঝেমধ্যে কেঁপে যেত ঘুমের ভেতর বউয়ের আচমকা চিৎকারের ধাক্কায়। সে ধাক্কা এখন আয়না বানুকে সামলাতে হয়। সামলাতে সামলাতে নিজেই নাকি ভয়তেড়ে হয়ে গেছেন তিনি। কারণে অকারণে চমকে চমকে ওঠেন। সন্ধ্যার এই থিতু-হতে-না-পারা আঁধারেই যেমন, বলছেন গা ছমছম করছে। তাকে সাহস দেওয়ার জন্য কিছুটা, আর কিছুটা নিজের ভয় কাটাতেও, আয়না বেগম গলা ছাড়েন জোরে।
‘তা মোমই বলেন বা মই, দুডোই সুমান। দরকার না পড়লি কারুরই খোঁজ হয় না। আবার কাজ শেষে কনে কুতায় পড়ে থাকপে তারও ঠিক নেই। তায় যদি এটটু খুঁত হয়ে যায়, কিম্বা মনে করেন ভেঙেচুরে গেল, তালি তো আর কতাই নেই!’ গায়ের ওপর ছড়িয়ে থাকা কাঁথাটা সরিয়ে দিতে দিতে অবশ্য আরো অচল মনে হলো নিজেকে তার। মই ভাঙলেও তো সারিয়ে নেয় মানুষ, তাকে সারানোর কোনো চেষ্টা নেই যে। ‘কোন কালের পাপে যে এরাম পড়ুটে হইচি, তা কিডা কবে। মানুষটা মরেছে না শান্তি পেয়েছ, আমিও যে কবে যাব!’ বলতে বলতে থামেন। থামতে থামতে কাশেন। কাশতে কাশতে বলেন।
বানু কিছু বলেন না। ড্রয়িং রুমের পর্দা গোটানো। পাশের বাড়ির আইপিএস না ইউপিএসের আলোর ছটা আসছে। তার ভরে ভরেই ঘরময় ঘুরান্তি দিয়ে মোম খুঁজছেন তিনি। আর নানা কথার গড়াপেটা করছেন ভেতরে ভেতরে।
ছোট মেয়েটা পোয়াতি। বর থাকে শহরে। শাশুড়ির সাথে বনে না। এত ঝামেলা পোহাবে কে? ওরা তাই বাপের বাড়ি চলে আসতে বলেছে। কিন্তু বাপের বাড়ি কি আর বাপের বাড়ি আছে? লোকে বলে ‘ভাইয়ের ভাত, আর ভাড়ানির হাত।’ কথাটা তিনি বলতে চাননি ঠিক, বেরিয়ে গিয়েছিল মুখ ফসকে। অমনি ফোড়ন কেটে উঠেছিলেন বেগম। ‘এরাম এ্যাটটা কতা আপনি কতি পাল্লেন, আপা! কী না করচে আমার মেয়েডা আপনার জন্যি!’
বেয়াইন যেন চুম্বক, আর কথা যেন লোহা। গায়ে টেনে নেওয়ার স্বভাবটা তাই গেল না। রাগ হয় খুব। এ নিয়ে রেষারেষিও হয়। তবে আজ সেটা সামলে নিয়েছিলেন বানু। তারপর বুঝিয়ে বলেছিলেন, ছোটবউয়ের না, তিনি আসলে বড় বউয়ের কথা বলেছেন।
ছেলেরা মিলে ভাগাভাগি করে নিয়েছে তাদের। বড় ছেলের ভাগে বাপ, গ্রামে বাস। ছোটটার ভাগে তিনি, থাকেন শহরে। কিন্তু কাঠ যখন শুকনো, চুলোয়ই পুড়ুক বা আকায়, জ্বালুনি তো একই! ফোনে কথা হয় যতবার, প্রায় ততবারই কাঁদে মানুষটা। সেখানে পোয়াতি মেয়ে এসে উঠবে কী করে, আর তাকে দেখাশোনাই বা করবে কে? তার চেয়ে, সবচেয়ে ভালো হয়, তিনিই যদি চলে যান গ্রামে। মেয়েটার সেবা করাও হবে, তার নিজেরও একটু দম ফিরবে। তাছাড়া, বুড়ো মানুষটাও তো হাঁপিয়ে উঠেছে একা থেকে থেকে, তাকে পেলে খুশি হবে। বলেছিলেন সকালে। কিন্তু ‘না’ করেছে ছেলে।-
‘ভাগাভাগির শর্ত ভাঙতি পারব না। যেরাম আছো সেরামই থাকো।’
‘তালি না হয় অদল বদল করি? তুমার বাপ একেনে আসে থাকলো এই কদিন, আর আমি ওকেনে..’
হৈ হৈ করে উঠেছিল ছোটবউ তখন? ‘আপনি কি বাতাসে বুড়ো হইচেন, মা? আম্মু আর আপনি না হয় এক ঘরে থাকতি পারেন। ছোট্ট বাসা, আব্বা আসলি আমি থাকতি দোবো কনে? তাছাড়া, একবারও কি ভেবে দেখেছেন, আমার এই অবস্থায় ওরম এ্যাটটা অসুস্থ মানুষ আমি সামলাব কী করে?’
সুস্থ থাকতেও যে-বউ সুস্থ শ্বশুড়-শাশুড়ির সেবাযত্ন করেনি, অসুস্থ অবস্থায় পড়ুটে শ্বশুরের দেখাশোনা যে সে করবে না, তা তো জানেনই; তবু যে কেন এমন একটা কথা ভাবলেন! নিজের জিব নিজে কামড়াচ্ছিলেন বানু। বড়বউ আর যা-ই হোক, এদিক থেকে ভালো। মাথার ঠিক নেই লোকটার। কাঁথা-কাপড় নষ্ট করে প্রায়ই। সেসব ধোয়া পাকলা করা, শ্বশুরের পাগল পাগল বায়না শোনা, এটা সেটা ঝামেলা সওয়া- গজগজ করতে করতে হলেও করে। তার জায়গায় ছোটবউ হলে কবেই হয়তো বিষ গুঁজে দিত লোকটার মুখে। অথচ কত শিক্ষিত একটা মানুষ বউটা! কী সুন্দর মুখ, আর কী সুরেলা কথা! ভালো থাকলে এমন করে মা ডাকে, আদরে আহ্লাদে এমন জড়িয়ে রাখে, মনে হয় স্বর্গে আছেন। ঝগড়াঝাটির সময় আবার উল্টো। প্রাণটা পারলে ছিঁড়ে নেয় নিজদাঁতে। সেসব নিয়েই দুঃখ করছিলেন। মেয়ের পক্ষে তখন ঢাল ধরলেন বেগম। ‘কষ্ট পায়েন না আপা। ছোট মানুষ, তার উপর পুয়াতি, কী বলতি কী বলে ফেলেছ। ওর কথা ধোরেন না। ও তো আপনার মেয়ের মতোই।’
বানুও ঠিক এই কথাই বলেন।
বুঝদার বলে তার কদর আছে গ্রামে। জা ভাবিরা মান্যগণ্য করত খুব; বউ-ঝিরা অত না মানে না, তবে ফেলেও দেয় না একেবারে। মানুষের বিপদে আপদে ছুটে যেতেন। ঝগড়াঝাটি মিটমাট করতেন। নতুন নতুন শাশুড়ি হয়েই যারা জ্বলন্ত কড়াইয়ে পড়ে, দু’বেলা ঝগড়ার ঝড়ে টালমাটাল হয়ে থাকে, বড় মুখ করে পরামর্শ দিতেন তাদের: ‘বউমাক বিটার বউ না, মনে করবা সে তুমারই আরেট্টা মেয়ে। তালি দ্যাকবা ঠিক হয়ে যাবে সব।’ নিজে যদিও তিনি ঠিক করে নিতে পারেননি কিছুই। পারেননি বেয়াইনও। বউয়ের অত্যাচারে টিকতে না পেরেই তো পড়ে আছেন মেয়ের কাছে। জামাইয়ের কথায়ও ফণা তুলেই উত্তর করেন, ছেলে মনে করে সয়ে তো নেন না। যুক্তির কথা, বলেওছেন ঠান্ডা মাথায়। তাতেও আবার গোমরা মুখ বেগমের।
সেই থেকে আর কথা বলেননি বানু।
সন্ধ্যা উৎরে গেছে, বউটা এই ফিরল বলে। এখনো আলো জ¦লেনি। ঘরের লক্ষী নাখোশ হবে না? কিন্তু বসার শোয়ার রান্নার এমনকি গোসলের ঘর পর্যন্ত দেখা শেষ, মোমের হদিস নেই। কোথায় থাকতে পারে? আরেক দফা খুঁজতে শুরু করলেন তিনি। খুঁজতে খুঁজতেই যোগ দিলেন আগের আলোচনায়।
‘না বিয়েন, ভুলডা আমারই হয়েচ। আপনির বিয়াইরে একেনে আনতি চাওয়া ঠিক হইনি। ওতে আরও দুনো ঝামেলা। তার চেয়ে মনে হচ্ছে নিজির ঘর যকন নেই, বিটার বউরাও সেরাম করে দ্যাকপে না, আমিই বরং চলে যাই মেয়েডার কাচে।’
‘কী বলচেন আপা! আপনিই না বলেন মেয়ের বাড়ি গিয়ে থাকা আর দোজগে থাকা সুমান?’
‘তা তো বলিই। কিন্তুক কী এমন বেহেস্তেই বা আছি, যে দোজগে যাতি ভয় করব?’ আর যে জ্বলে, সে সবখানেই জ্বলে। মেজোমেয়ের বাড়ি গিয়ে ছিলেন বড়নাতি হওয়ার সময়। ওপক্ষের চোখে যেন কিচকিচ করতেন তখন বালির মতো। তপ্তবালির বুকে চাল পড়ে খই হতেও সময় নেয়, তার কথা পড়ার সময়ও পেত না, পাল্টা কথার আগুনতাপে মিলিয়ে যেত হাওয়ায়। কী যে খারাপ লাগত! ছেলের বাসায় মা-বাপ থাকতে পারলে মেয়ের ঘরে পারবে না কেন? ভাবতেন আর কাঁদতেন লুকিয়ে।
শুনতে শুনতে ঠোঁটে বাঁকা হাসি ফুটল বেগমের। এখানে তার থাকা নিয়ে এই মানুষটাই তো কত কথা শোনায়!
‘শুদু কি উরা? কী কবো বিয়েন, মেয়ে পজ্জন্ত যাচ্ছেতাই ব্যাভার করত!’ অবশ্য মেয়ের দু’কথা দশকথায় যতটা পোড়ে, বউ বললে তা পোড়ায় তারচে বেশি। তবে ‘মেয়ের দরকারে আমি না এগোয়ে গেলি যাবে কিডা? পথম বাচ্চা হবে, ভয় যন্ত্রণার কি শেষ আচে? বিপাদ আপাদ যদি কিচু হয়ে যায়? উরা হয়তো দিন গেলিই নতুন আরেট্টা জুটোবেনে; ক্ষেতি যা হওয়ার হবেনে আমার।’
‘থুক্কু, থুক্কু, বালাই ষাট! কী অলুক্কুনে কতা কচ্চেন আপা এই সন্দেবেলায়?’ বলতে বলতে বেগম একদলা থুতু ফেলেন জানলা দিয়ে। তারপর এমনভাবে বেয়াইনকে থামান, যেন মুখ বন্ধ করেই বিপদ থামাবেন! স্বরটাও এত আন্তরিক, আর এত আপন, মন ছুঁয়ে যায় বানুর। মানুষটা এরকমই। এই চুলোচুলি, তো এই আবার কোলাকুলি। উল্টোপাল্টা কথা শুনলে রাগ যেমন হয়, তার কষ্ট দেখে তাই মায়াও তেমন লাগে। তিনি না থাকলে যে ঘুম হয় না তার, সেটাও মনে আসে। জুতোর র্যা কের ড্রয়ারটা আরেকবার ঘাঁটতে ঘাঁটতে তাই বলেন, ‘চিন্তা করবেন না, বিয়েন। হুজুরির কাচেত্তে এ্যাটটা তাবিজ এনে দিয়ে যাবানে..’
‘ওসব তাবিজ কবজ অনেক করিচি আপা। কাজ হয় না। তা চিরদিনির জন্যি তো আর যাচ্চেন না। এই কডা দিন আমি চিষ্টা করবানে এদিকি চালাই নিতি। অবশ্যি মেয়েডার এই অবস্তা, কী দে যে কী করবানে! উটতি বসতিও তো পারিনে ঠিকমতো..’
উঠতে বসতে বানুও কি খুব পারছেন?
শ্বাসকষ্ট বেড়েছে। একটু হাঁটতেই দম যায়। বাসাময় হেঁটে হেঁটে তিনি ক্লান্ত। সোফায় তাই এলিয়ে দিলেন গা। বজ্জাত শরীর। সারাজীবন কারেন্ট ছাড়া কাটিয়ে এসে এ কয়মাসে যেন মোম হয়ে গেছে। একটু তাপেই গলে গলে পড়ে। আচ্ছা, হাতপাখাটা কোথায়? ভাবতেই তার নজর গেল শোকেসের নিচে। সেখান থেকেই উদ্ধার হলো মোমের ঠোঙা। গায়ে তার অযত্নের ঝুল-কালি। মুছতে মুছতে বানু দেশলাই আনতে যাচ্ছেন, তখন নক। নিশ্চয়ই বউমা। তবু জানতে চাইলেন, ‘কিডা?’
‘এই সময় কিডা আসে জানেন না?’
তাড়াহুড়ো করে দরজাটা খুলে দিলেন বানু। ঢুকেই বউ দাঁড়িয়ে থাকল কিছুক্ষণ। হাঁপাচ্ছে। হাতে একটা কাঁঠাল। নেওয়ার জন্য হাত বাড়ালেন শাশুড়ি। না দিয়ে সেটা মেঝেয় ফেলল বউ। ‘যত চাই বকাঝকা করব না, ততই গুবলেট পাকান। মনে করলাম বুড়ো মানুষ, কাঁঠাল পছন্দ করে, তা নিই একটা। সেটাই হয়েছ ভুল। এত বড় বোঝা নিয়ে দাঁড়াই থাকা যায়? কখন থেকে ডাকছি চাবির জন্যি, না শুনে আপনি আরাম করছেন সোফায়!’ বলতে বলতে ব্যাগ খুলল। মোবাইল খুঁজে আলো জ্বালল। জ্বালতেই দেখা গেল, মুখটা যেন ইটখোলার কয়লা, কয়লা যেন পুড়ছে গণগন। গণগনে কণ্ঠেই প্রশ্ন করলো, ‘ঘর অন্ধকার করে রাকিচেন ক্যান?’
ব্যাপারটা ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করলেন বানু। বেগমও ওঘর থেকে গলা বাড়ালেন ব্যথায় কোঁকাতে থাকা স্বরে। ‘সারাদিন অপিস করে এসে আবার কী শুরু করলি, মা? যা স্যান করে নে। তোর শাউড়ি ককন থেকেই তো মোম খোজচে। বুড়ো মানুষ, না পালি কী করবে?’
‘তুমি চুপ করো। যা বোজো না, তা নিয়ে কতা বোলো না। হাতে মোম নিয়ে না জ্বালায়ে বসে আচে! অন্ধকার যে আমি সহ্য করতি পারিনে তা কি সে জানে না? জানে না যে তুমি ভয় পাও? সকালে তার কথা শুনা হইনি বলে জেদ দেখাচ্ছে। নাইলে আর কেন?’ বলতে বলতেই হনহন এগিয়ে গেল রান্নাঘরে।
পুরোনো রঙচটা সোফার পাশে তখন আরেকটা বাতিল সোফা হয়েই দাঁড়িয়ে থাকলেন বানু। অনেক কথা মুখে এলো, আবার সেসব আটকেও গেল দ্বিধাবিভক্ত ঠোঁটে। কাশপোটা ফেলতে না পেরে মুখের ভেতর জমিয়ে রাখার অস্বস্তি নিয়ে ভাবতে লাগলেন পরের ঘটনাক্রম। বউটা এমন গোমরা হয়েই থাকবে কিছুক্ষণ। তারপর গোসল। ভাতের সাথে রাগ মিশিয়ে রাতের খাবার খাবে। পছন্দের সিরিয়াল থাকলে এসে বসবে টিভির সামনে। না থাকলে গিয়ে শোবে। এর মধ্যে চলতে থাকবে দাঁত-চিবুনো কথা।
হয়তো গ্যাসের চুলো অফ করা হয়নি ঠিকমতো। বাথরুমে পানর ট্যাপ ছাড়া থাকে কোনোদিন। কোনোদিন ফুলের টবে পানি দেওয়া হয় না। কোনো না কোনো ভুল বানুর ধরা পড়েই; আর তেতে থাকে ঘর। পা ফেলা যায় না। খোকা ফিরলেই যা একটু তিনি মাটি পান পায়ের তলায়।
নিত্যবেলা এসব আর ভাল্লাগে না। মনটারও ছাই মাথা নষ্ট, কিছুই ঠিক রাখতে পারে না। নিজেকে নিজেই শাপশাপান্ত করতে করতে দেখলেন এগিয়ে আসছে বউমা। হাতে আগুনমুখো কাঠি আর দেশলাই। ‘সারাদিন শুয়ে বসে থাকেন। কারেন্ট না থাকলি সন্ধ্যায় এটটু আলো জ্বালবেন, তাও পারেন না?’ জ্বলন্ত মোমের মতোই জ্বলছে কণ্ঠ তার। শুনেই আবার দম ফসকে যায় বানুর। সেটাকে বাগে আনতে আনতে এগিয়ে যান তিনি। বুকভরা আঁধার আর মোমভরা আলো নিয়ে আলোকিত করেন ছেলে-বউয়ের ঘর। তারপর নিজেদের ঘরে ঢুকছেন যখন, কানে আসে ছেলের কণ্ঠ। ‘জানোই তো অন্ধকারে মা প্রায় কিছুই দেকতি পায় না। তার উপর হাঁপানির রোগ। এই অবস্থায়ও তো এটা-সেটা করার চেষ্টা করছে। তারচে যদি পড়ে থাকতো মাজাব্যথার ভান ধরে, উল্টো সেবা করা লাগত, তালি মনে হয় ভালো হতো তুমার, না?’
সর্বনাশ! দরজাটা আটকানোর কথাও ভুলে গেছেন তিনি। এত সকাল সকালই বা কেন এলো ছেলেটা আজ? আবার তুলকালাম বাঁধবে। ভীষণ অশান্তি থাকবে কদিন। হবু সেই অশান্তির আভাসেই দেখেন, আলো না, মোম থেকে যেন ঠিকরে পড়ছে অন্ধকার।
আজ কি অমাবস্যা? ‘মাজাব্যথার ভান’ ধরা মায়ের ব্যথাটা বেড়েছে খুব। বিছানায় তিনি ছটফট করছিলেন। জামাইয়ের কথার ঝাঁঝে চোখ ভরে এলো। ঝাপসা চোখে দেখলেন মোমটা টেবিলে রেখে শুয়ে পড়ছেন বেয়াইন।

শোয়ার ইচ্ছে মোমটারও করছে। কিন্তু টিনের মোমদানিতে এমনভাবে আটকে আছে সে, নড়ার সুযোগটাও নেই। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়েই কাঁদছে তাই। যে সলতেকে বুকে আগলে রেখেছে সারাজীবন, মুখে আগুন নিয়ে সে-ই জ্বালিয়ে মারছে তাকে। ভাবতে ভাবতে সে তাকাচ্ছে দুইপাশে। দু’পাশের খাটে শোয়া বুড়িমোমদুটোও জ্বলছে। একজনের চোখে আরেকজনের ছায়া। সেই ছায়ায় আবার অন্যজনের ছায়া। সব ক’টা ছায়ার বুকেই আগুন।