আসাদ চৌধুরী > বাঙালির নববর্ষ >> উৎসব সংখ্যা ১৪২৬

0
131

আসাদ চৌধুরী > বাঙালির নববর্ষ >> উৎসব সংখ্যা ১৪২৬

বাংলা সনের চল সাধারণত কৃষক এবং প্রাচীন পদ্ধতির ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এদেশে জুলিয়ান পঞ্জিকাই চালু রয়েছে। খুব কম শিক্ষিত লোকই বাংলা তারিখ বলতে পারেন। তারিখটা বলতে পারলেও সনের ব্যাপারে গোলমাল লাগেই। ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই।
সকল সমাজেই নববর্ষ উদযাপনের রেওয়াজ আছে। কোনো কোনো সমাজে ছ’দিনব্যাপী এই অনুষ্ঠান উদযাপিত হয় সমাজের সকল স্তরের নারী-পুরুষ, ধনী-নির্ধন নির্বিশেষে মর্যাদার সঙ্গে এই দিনটি উদযাপন করে। নববর্ষ উদযাপনের রীতি ভঙ্গি আচার এবং সংস্কার (রিচুয়ালস) একেক সমাজে একেক রকমের। এই রকমফেরে সমাজের পরিচয় স্পষ্ট হয়ে ওঠে। সমাজের উদ্ভব, উৎসবের জন্ম এসব সম্পর্কে যেমন জানা যায়, তেমনি সমাজের পরম্পরা এবং ঐতিহ্য সম্পর্কেও জানা যায়। এতে একটা সমাজের ইতিহাসের বিভিন্ন স্তরের ছাপ ধরা পড়ে, এমনকি পাথুরে প্রমাণের অভাব হলেও আচরণের রীতি পরীক্ষা করে সমাজের বয়স নির্ধারণ করা সহজ হয়ে ওঠে। ইতিহাসে অনেক বাঁক থাকে, অনেক গলি-ঘুপচি থাকে, সে সম্পর্কেও কিছুটা আভাস পাওয়া যায়- কেননা নববর্ষ উদযাপন প্রাচীন রীতি- এইটি মোটেই উটকো ব্যাপার নয়। পণ্ডিতজনেরা এ-ও লক্ষ করেছেন, ঋতুভিত্তিক এই উৎসব সৌর-বৎসরের হিসেবে অথবা চান্দ্রমাসের হিসেবে উদযাপিত হয়- এবং এই উৎসবের ভিত্তিতে রয়েছে পেশা। দেশজ আচার এবং বিশ্বাস এই উৎসবের ভিত্তি। সূর্যের উত্তরায়ণ ও দক্ষিনায়ণ, ঋতু-পরিবর্তন দেখে এই উৎসব উদযাপিত হয়। এইটিই, মুহাম্মদ এনামুল হকের ভাষায় সিজনাল ফেস্টিভাল।
প্রাচীনকালে মিশর, ফিনিশিয়া, ইরান, গ্রিস ও রোম দেশের অধিবাসীরা শারদীয় বিষুব দিনে, সূর্যের দক্ষিণ অয়নশান্ত দিনে এই উৎসব উদযাপন করতেন। প্রাচীন আরবগণ চান্দ্র বৎসরে প্রথম মাসের প্রথম দিন আশুরা পালন করতেন।
প্রাচীন ইরান এবং আর্যদের মধ্যে এই উৎসবের ক্ষেত্রে বেশ মিল দেখা যায়। ইরানের নওরোজ উৎসব ছ’দিনব্যাপী (নওরোজ-ই-কুচক ছোট নববর্ষ প্রথম দিনে, ষষ্ঠ দিবসে নওরোজ-ই-বুজর্গ সংক্রান্ত নববর্ষ), ভারতের দোল উৎসব তিন দিনব্যাপী- এই উৎসব চান্দ্রমাসের হিসেবে উদযাপিত হয়। দ্রাবিড়দের উৎসবও তিন দিনব্যাপী। অস্বীকার করার জো নেই যে, ভাষায় ও সংস্কৃতিতে আমরা এই দ্রাবিড় ঐতিহ্যও বহন করে আসছি।
বিশ্বময় এখন জুলিয়ান ক্যালেন্ডারের প্রতাপ, অর্থাৎ ইংরেজি সন প্রচলিত। এজন্য পহেলা জানুয়ারির মধ্যে আন্তর্জাতিক চরিত্র এত বেশি।
বাংলাদেশের বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রাজা ও বিশিষ্ট ব্যক্তির কল্যাণে বিভিন্ন সন প্রচলিত হয়। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য লক্ষণাব্দ, প্রগণাতি বা পরগনাতি সন, মঘী সন, মরাব্দ বা বিষ্ণুওচী সন, সর্বসিদ্ধ সন বা শ্রীরামসিদ্ধ সন, মিলিক সন বা দানিশাব্দ, ত্রিপুরাব্দ, চৈতন্যাব্দ বা বৈষ্ণব সন।
মোগল সম্রাট আকবরের রাজত্বকালে বাংলা সন প্রচলিত হয়। আকবরের আদেশে বিশিষ্ট পণ্ডিত আমীর ফতেহউল্লাহ সিরাজী ফসলি সন ও সৌরসনের সমন্বয়ে বাংলা সন নির্ধারণ করেন। বাদশাহ আকবর হিজরি ৯৯২ সালের ৮ই রবিউল আউয়াল, ১৩ই মার্চ ১৫৮৫ খ্রিস্টাব্দে নির্দেশনামা জারি করেন এবং এই সন কার্যকর করা হয় ৯৬৩ হিজরির ২৮শে রবিউল অর্থাৎ ১০-১১ই মার্চ ১৫৫৬ খ্রিস্টাব্দ থেকে। পরবর্তীকালে বাংলা একাডেমি বাংলা সনের সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করে এবং ড. মুহম্মদ শহীদুল্লাহর সভাপতিত্বে একটি উপসংঘ এই সংস্কার সাধন করে। উপসঘের নাম ছিল বাংলা পঞ্জিকা সংস্কার উপসংঘ। ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দের ১৭ই ফেব্রুয়ারি উপসংঘের শেষ বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উপসংঘের সুপারিশ অনুযায়ী বৈশাখ থেকে ভাদ্র ৩১ দিন হিসেবে ৩১X৫=১১৫ দিন, আশ্বিন থেকে ফাল্গুন ৩০ দিন হিসেব ৩০X৬=১৮০ দিন এবং চৈত্র ৩০ দিন, অতিবর্ষে (লিপ ইয়ার) ৩১ দিন। ড. কাজী দীন মোহাম্মদ যখন পরিচালক ছিলেন তখন একটি দেয়াল পঞ্জিকা বাংলা একাডেমি কর্তৃক প্রকাশিত হয়। কবির চৌধুরী যখন পরিচালক ছিলেন তখন একটি রোজনামচা প্রকাশিত হয়। বাংলা একাডেমির এই সংস্কার সর্বস্তরে গ্রহণযোগ্য করার জন্য পরবর্তী সময়ে কোনো পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে- এমনটি এখনো শুনিনি।
নববর্ষের করণীয় আচার ও সংস্কারের কিছু পরিচয় দিচ্ছি।
(ক) এই দিনে ধার দেয়া বা ধার নেয়া বারণ।
(খ) বাড়ি-ঘর, জামা-কাপড়, বাসন-কোসন, আসবাবপত্র পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন করা।
(গ) ভালো খাবারের আয়োজন করা। বিশেষ খাদ্য হিসেবে রয়েছে চিড়া, খৈ, দৈ, মুড়ি।
(ঘ) আমোদ উৎসব। এই পর্যায়ে রয়েছে মেলা, লাঠি খেলা, বলী খেলা (কুস্তি), মই দৌড়, ঘোড়-দৌড়, ষাঁড়ের লড়াই, ঘুড়ি ওড়ানো, নৃত্য এবং গান। গানের মধ্যে রয়েছে গম্ভীরা, কবিগান এবং জারিসহ অন্যান্য গান।
(ঙ) গোয়ালঘর সাজানো, বিশেষ করে কুমারী লতা দিয়ে গোয়ালঘর সাজানো। গরুর বিশেষ যত্ন নেয়া।
(চ) ধানের গোলা, ধামা ঝাড়-মোছ করা এবং এতে সোনা-রূপার পানি ছিটানো।
(ছ) লাঙ্গল-মইতে সোনা-রূপার পানি ছিটানো।
(জ) হালখাতা, হাল মহরত। এইটি ব্যবসায়ীদের অনুষ্ঠান। গ্রাহক, পৃষ্ঠপোষক এবং ব্যবসার সঙ্গে সম্পর্কিত ব্যক্তিরা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করা, প্রীতি-বিনিময় এবং আদায় উসুল করা। দেনা-পাওনাটাই প্রধান যদিও, তবু আয়োজনে আপ্যায়নে এটা চাপা পড়ে থাকে। এটা সাধারণত হিন্দু আচার হিসেবে ধরা হয়- এটা বোধ করি ভুল ধারণা। যারা সাবেকী ধরনের ব্যবসা করেন এবং হিসেব রাখার পদ্ধতিও যাদের সাবেকী ধরনের, তারাই এটা করেন। মুসলমান ব্যবসায়ী খাতার উপরে লিখবেন এলাহি ভরসা, হিন্দু ব্যবসায়ী লিখবেন ওঁ গনেশায় নমঃ, বৌদ্ধ ব্যবসায়ী লিখবেন ওঁ ত্রি শরণায় নমঃ এবং খ্রিস্টান ব্যবসায়ী একটি ক্রুশ আঁকেন।
(ঝ) পুণ্যাহ্। এটা আগে প্রচলিত ছিল। জমিদারি ব্যবস্থা উচ্ছেদের পর এটা বাতিল হয়ে গেছে। এটা ছিল প্রজা এবং জমিদারের মধ্যে প্রীতির সম্পর্ক স্থাপনের একটা উত্তম পথ।
এছাড়াও কৃষকদের মধ্যে একটা রেওয়াজ চালু আছে, আমানি খাওয়া। আমানির সঙ্গে অথবা পান্তা ভাতের সঙ্গে কাঁচা আমের ভর্তা খাওয়া।
বাংলা সনের চল সাধারণত কৃষক এবং প্রাচীন পদ্ধতির ব্যবসায়ীদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এদেশে জুলিয়ান পঞ্জিকাই চালু রয়েছে। খুব কম শিক্ষিত লোকই বাংলা তারিখ বলতে পারেন। তারিখটা বলতে পারলেও সনের ব্যাপারে গোলমাল লাগেই। ব্যতিক্রম তো ব্যতিক্রমই।
বাংলা সনের ক্ষেত্রে যেমন, বাংলা ভাষার ক্ষেত্রে দেখা যাবে যে, এক্ষেত্রে সাধারণ কৃষিজীবী মানুষ যতটা সচেতন, সেই সচেতনতাটা শিক্ষিত সম্প্রদায়ের মধ্যে নেই। প্রথমোক্ত সম্প্রদায় অন্য ভাষা জানেন না বলেই হয়তো এই আনুগত্য পঞ্জিকার ক্ষেত্রেও কথাটি সত্য। শিক্ষিত সম্প্রদায় দীর্ঘদিন ধরেই শিকড়বিহীন বৃহতের সঙ্গে, উৎপাদনের সঙ্গে, জনজীবনের সঙ্গে- সম্পর্ক তেমন গভীর নয়। কিছু কিছু ক্ষেত্রে হয়তো সংস্কৃতিক কারণে কিংবা অন্য কোনো কারণে একটা সম্পর্ক স্থাপনের উদ্যোগ দেখা দিয়েছে। পহেলা বৈশাখ এর  মধ্যে একটি। এরপরই তো পঁচিশে বৈশাখ ও এগারই জ্যৈষ্ঠ দুই কবির জন্মদিন। আর এর আগে আটই ফাল্গুন।
পহেলা বৈশাখকে কেন্দ্র করে শিকড়ের দিকে আমাদের মনোযোগ এবং ভাবনা যদি যুক্ত হয় সে তো শুভলক্ষণ। আত্মসম্মান বোধসম্পন্ন সমাজের একটা দায়িত্ব থাকে, ইতিহাসের সঙ্গে, পরস্পরের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করার, ধারাবাহিকতার কণ্ঠসংলগ্ন হওয়ার, ব্যাপকভাবে বৃহতের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক স্থাপন করার। মেলার মধ্য দিয়ে লাঠি খেলা বা গম্ভীরা গানের মধ্য দিয়ে অন্তত একদিন ভর্তা ও আমানি খেয়ে হয়তো তা হয় না- তবে হতেও তো পারে। যে-জাতি ভাষার জন্য দেশের জন্য এত বড় ত্যাগ স্বীকার করলো, আত্ম-অধিকারের সিঁড়ির গোড়ায় এসে হুমড়ি খেয়ে পড়বে কেন? সোজা এগিয়েই যাবে, এগোবেই অবশ্যই সামনের দিকেই। এ অঙ্গীকার বছরের প্রথম দিনেই করতে হয়।
(লেখাটির জন্য মোহাম্মদ আবু তালেব এবং মুহম্মদ সাইদুরের নিকট আমি ঋণী।)