আসিফ সৈকত >> ম্যান্ডোলিনের সুরে সর্বজনীন শরণার্থী জীবনের গল্প >> চলচ্চিত্র

0
443

ম্যান্ডোলিনের সুরে সর্বজনীন শরণার্থী জীবনের গল্প

”মন রে আমি বুঝাই কেমন করে, দিল কে আমি বুঝাই কেমন করে,
আরাকান ফেলে এসে, এখন দেখি নিজে ঘর বাড়ি ছাড়া হয়ে গেলাম।
এখন কাঁদি ভেবে, কিভাবে ফিরে যাবো সোনার আরাকানে।”
[বঙ্গানুবাদে মোহাম্মদ হোসেনের গান]

নির্মাতা রফিকুল আনোয়ার রাসেলের ফিচার ডকুমেন্টারি ‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’-এর ক্যামেরার চোখে পর্দায় ফুটে উঠলো সাম্প্রতিক সময়ের শরণার্থী জীবনের এক বাস্তব মানবিক উপাখ্যান। আত্মচেষ্টায় প্রতিষ্ঠিত সুরকার-গীতিকার মোহাম্মদ হোসেন। থাকেন কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে। লাখ লাখ রোহিঙ্গাদের সাথে তিনিও পরিবার পরিজন নিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ২০১৭ সালে ছুটে এসেছেন এই বাংলাদেশে নিরাপদ আশ্রয়ের জন্য। মিয়ানমার সেনাবাহিনীর নিপীড়ন আর প্রশাসন-রাষ্ট্র কর্তৃক নাগরিকতার অস্বীকৃতি’র পটভূমিতে ফেলে এসেছেন তাঁর স্বদেশ। আরাকানের মাটি। অথচ এই সেই মাটি যেখানে তাঁরা জন্মেছেন, বেড়ে উঠেছেন পূর্বপুরুষদের সময়কাল থেকে।

প্রায় একঘণ্টার এই তথ্যচিত্রে মোহাম্মদ হোসেন তাঁর জীবনের কথা বলে গেছেন। ২০১৭ সালে কক্সবাজারের কুতুপালং এলাকার বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে গড়ে ওঠা মধুছরা ক্যাম্পে আসার আগেকার জীবনের কথা। কীভাবে মিয়ানমার আর্মি আর মগদের নির্যাতন-ধর্ষণ আর হত্যার হাত থেকে বাঁচতে গ্রাম-পাহাড়-নদী পেরিয়ে এই বাংলাদেশের সীমান্তে এসে পৌঁছান। ছোটবেলা থেকে মাতৃহীন, একদা দিনমজুর, হোসেন আর দশজন হতদরিদ্র রোহিঙ্গার মতোই আরাকানে বেড়ে উঠেছেন। সীমাহীন পরিশ্রমের মধ্য দিয়ে লাঞ্ছনা, দারিদ্র্র্য, নিপীড়ন আর অবজ্ঞার মধ্যে স্ত্রী-পুত্র-কন্যা নিয়ে জীবন কাটিয়ে দিচ্ছিলেন। শখের মধ্যে একটাই জিনিসই ছিল নিজের। আপন মনে গান তৈরি করে ম্যান্ডোলিনে সুর তুলে গান গাওয়া। মোহাম্মদ হোসেন জানান, কীভাবে অনেকের কাছ থেকে দেখে, শুনে আর বুঝে ম্যান্ডোলিন বাজাতে শিখেছেন। যেহেতু নিজে পড়ালেখা জানেন না, ফলে, মনে মনে কথা বানিয়ে সুরের বাঁধনে বেঁধে গানকে দিল (মনে)-বন্দী করেন তিনি। তাঁর গানে আছে প্রিয় স্বদেশের কথা, সেখানকার জীবন আর ফিরে যাবার স্বপ্নের কথা।

একথা আমরা সবাই জানি, নিজের শেকড়ের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করে কেউ সুখে থাকতে পারেন না। ফলে, এই ক্যাম্প-জীবনে বাংলাদেশ সরকার, দেশি-বিদেশী মানবাধিকার সংস্থা, এনজিওগুলি তাঁদের যতই আশ্রয়, খাদ্য, সহায়তা দিয়ে পূর্ণ রাখুক না কেন, আপন জন্মভূমিতে ফিরে যাবার আকাঙ্ক্ষা তাঁদের একমুহূর্ত স্বস্তি দেয় না। যদিও তিনি জানেন, তাঁর ফিরে যাবার সম্ভাবনা অনিশ্চিত। ফলে, তাঁর গান থেকে ভেসে আসে এরকম কথা :

আগে ন ভাবিলাম, দেশ কেনে ছাড়িলাম
শেষে কাঁদি কাঁদি মরি’রে, শেষে কাঁদি কাঁদি মরি’রে
আমারও দেশান, ফুলেরও বাগান, চাইতে কি সুন্দর লাগে রে –
দেশের মনত উঠিলে, ফুল বিছানাত লেডিলে
কোন খাইত ঘুমে ন দোরে-রে ফরান।

[আগে তো ভাবিনি, কেন দেশ ছেড়ে এসেছি,
এখন দিনরাত কেঁদে কেঁদে মরি।
আমার দেশ যেন ফুলের বাগান, দেখতে ভারি সুন্দর।
দেশের কথা মনে হলে, ফুলের তৈরি
বিছানাতেও নির্ঘুম রাত কাটে।]

‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ চলচ্চিত্রে মোহাম্মদ হোসেনকে উপজীব্য করে শরণার্থী জীবনের সামগ্রিক চিত্র তুলে আনার চেষ্টা করেছেন পরিচালক। কোথাও আরোপিত কিছু নেই, সংযোজন করারও চেষ্টা দেখা যায় না। বেশিরভাগ সময়েই ক্যাম্পের আবহ, পরিবেশ আর বাস্তবতার নিরিখে শব্দ আর চিত্রায়নের সন্নিবেশ ঘটানো হয়েছে। এমনকী ব্যবহৃত সুর মোহাম্মদ হোসেনের ম্যান্ডোলিন থেকেই গ্রহণ করা হয়েছে। আর তাঁর নিজের সুর করা এবং কথার গান তো আছেই। এই গান রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর অতীত-বর্তমান আর দুর্দশার কথা বলে। একসময় রিকশা চালিয়ে, ক্ষেত মজুরের কাজ , বা কুলিগিরি করে সংসার চালালেও ক্যাম্প-জীবনে মোহাম্মদ হোসেন একজন পরিপূর্ণ পেশাদার সঙ্গীত শিল্পী। অক্সফাম বা অন্য সংস্থা’গুলি তাঁকে নিয়ে অনুষ্ঠানের আয়োজন করে। তাঁদের পক্ষ হয়ে নিজের লেখা, নিজের বিপন্ন জনগোষ্ঠীর উদ্দেশ্যে লেখা সচেতনধর্মী গান গেয়ে তিনি অর্থ আয় করেন। এখানে তাঁকে কায়িক শ্রম করতে হয় না।

তথ্য, গবেষণা, সিনেমাটোগ্রাফি, পরিচালনা, সম্পাদনা – সবকিছুতেই নির্মাতার নিজস্ব ভাবনার প্রতিফলনের সামঞ্জস্যতার কারণে ‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ একটি সার্থক Auteur ফিল্ম হয়ে উঠেছে বলা যেতে পারে। জানা গেছে, সিনেমার পোস্ট-প্রোডাকশনের অংশের কাজ শুরুর আগে পরিচালকের শারীরিক অসুস্থতার কারণে এবং পরবর্তীকালে বিশ্বব্যাপী করোনার কারণে ছবির নির্মাণ-প্রক্রিয়া একহাতেই সম্পন্ন করতে হয় নির্মাতাকে। ফলে, কিছুটা কারিগরি সীমাবদ্ধতা থেকে গেছে। ক্যাম্পের জীবন এবং কেন্দ্রীয় চরিত্রের সাথে তাল মেলাতে গিয়ে অনেক ক্ষেত্রে সিনেমার পরিশুদ্ধ আয়োজনের ব্যাঘাত ঘটেছে। কিন্তু দৃশ্যমান অনেক কিছুর অনুপস্থিতি, ঘাটতি উপেক্ষা করে এককথায় বলা যায়, গল্প বলার গতিতে ‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ অনবদ্য। এমন ন্যারেটিভ সচরাচর দেশীয় প্রামাণ্য চলচ্চিত্রে দেখা যায় না। সংক্ষিপ্ত আয়োজনে লক্ষ লক্ষ শরণার্থীর আবাস এই রোহিঙ্গা ক্যাম্পের একটি সার্থক চিত্র ফুটে ওঠে, একেবারে শিশুদের খেলাঘর থেকে উন্মুক্ত বাজারের কেনাবেচার স্থান পর্যন্ত। এই তথ্যচিত্র দেখার আগে আমার নিজের কাছে পরিষ্কার ছিল না, রোহিঙ্গাদের মধ্যে কেবল মুসলমান নয়, হিন্দু ধর্মের মানুষও আছেন। একই জনগোষ্ঠীর দুই ধর্মীয় উৎসব – ঈদ ও দুর্গা পুজার সমন্বয় দেখি ক্যাম্পের নির্বাসিত জীবনে। কেন্দ্রীয় চরিত্র মোহাম্মদ হোসেনের সাথে নির্মাতা রফিকুল আনোয়ার রাসেলের আন্তরিক সম্পর্কের গভীরতা বোঝা যায় তাঁদের অন্তরঙ্গ কথোপকথনে, যেখানে নির্মাতা নিজেও রোহিঙ্গাদের কাছাকাছি ভাষায় কথা বলছেন, আঞ্চলিক টানে।

নিজের ব্যক্তিগত অভিমত হিসেবে বলি, ‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ পুরো তথ্যচিত্রের নীলাকাশ আর বিস্তৃত সবুজ পাহাড়ের সারি আমাকে মনে করিয়ে দিচ্ছিল এমন এক পৃথিবীর কথা যেখানে এই রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর কোনো স্থান নেই। মায়ানমার তাদের বাঙালি হিসেবে বাংলাদেশে ঠেলে দিয়েছে আর বাংলাদেশে তাঁরা আছেন শরণার্থী স্ট্যাটাস নিয়ে। প্রতিদিন তাঁরা ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তা নিয়ে ঘুমাতে যায়। যদিও আমরা জানি, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ধীরে ধীরে রোহিঙ্গা পুনর্বাসন নিয়ে সচেতন হচ্ছে। আন্তর্জাতিক আদালতে গাম্বিয়া মামলা করেছে। সেই অংশটুকু আমরা দেখি তথ্যচিত্রে। তবে এতকিছু ছাপিয়ে মনের অশান্তি থেকে বাঁচতে মোহাম্মদ হোসেনের একমাত্র আশ্রয় তাঁর ম্যান্ডোলিন। সে বলে :

এখানে রোহিঙ্গাদের জীবনের আর শান্তি নাই, আমাদের জীবন এখন অশান্তির বাগান। এখন অশান্তির বাগান যেহেতু হয়ে গেছে, তাহলে কি করবো? আমার শান্তির জিনিসটি আছে, তা নিয়ে এক কোণে চলে যাই। 

মোহাম্মদ হোসেন তাঁর গানে, বাংলাদেশের মানুষের সহযোগিতা আর সম্প্রীতির কথা বলে আন্তরিকভাবে শুকরিয়া জানায়। আমার মনে পড়ে যায়, ১৯১৭ সালে আমাদের বাংলাদেশের এককোটি শরণার্থী একইভাবে আশ্রয় নিয়েছিল পার্শ্ববর্তী দেশ ভারতে, পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর অত্যাচার আর হত্যা-ধর্ষণ থেকে রক্ষা পেতে। সেদিনের সেই নিপীড়িত জনগোষ্ঠী আজ সংগ্রামের মাধ্যমে একটি স্বাধীন দেশের পতাকার নিচে আশ্রয় দিয়েছে আরেক নিপীড়িত জনগোষ্ঠীর লক্ষ লক্ষ মানুষকে। পৃথিবীর ইতিহাসে এ এক বিরল উদারহণ।
‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’-এর প্রযোজক বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস, ঐতিহ্য আর ঘটনা সংরক্ষণের সবচেয়ে শক্তিশালী জাতীয় সংগঠন ‘ মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর’। এমন একটি চলচ্চিত্র নির্মাণের উদ্যোগ গ্রহণ আর সহায়তা দানের বিষয়টি নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। গত ২০ জানুয়ারি ঊনবিংশ ঢাকা আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্র উৎসবে প্রদর্শিত হয় ‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ডকুমেন্টারি মুভিটি। করোনাকালীন সময়ে ইতিমধ্যে দেশের বাইরে ইংল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়াসহ কয়েকটি উৎসবে অনলাইনে এটি প্রদর্শিত হলেও এটাই ছিল দেশের প্রথম মিলনায়তনে বড় পর্দায় প্রদর্শনী। আশা করি, ‘আ ম্যান্ডোলিন ইন এক্সাইল’ ভবিষ্যতে পৃথিবী জুড়ে নানা প্রদর্শনীর মাধ্যমে মোহাম্মদ হোসেনের ম্যান্ডোলিনের করুণ সুর রোহিঙ্গাসহ পৃথিবীর শরণার্থী সংকটের চিরায়ত দুঃখের কাহিনি তুলে ধরে জাতিতাত্ত্বিক নিপীড়ন, হত্যা ও জেনোসাইডের বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত সৃষ্টিতে শক্তিশালী ভূমিকা রাখবে। অভিনন্দিত করি এর পরিচালক এবং এই তথ্যচিত্রের সঙ্গে জড়িত সকল কলাকুশলীকে।