আহমাদ মাযহার >> কবি নজরুলের সমান বয়সী >> স্মৃতিকথা >>উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
245

কবি নজরুলের সমান বয়সী

উনিশশো একাত্তর এই লেখার বিষয় নয়, সূচনা বিন্দু। তখন আমি ক্লাস ফোরের ছাত্র। থাকতাম ঢাকা নগরী থেকে কিছুটা দূরে, মিরপুরে। পড়তাম পল্লবীর একটা বিস্মৃতনাম স্কুলে। ২৫ মার্চের কালরাত্রির ফাঁক গলিয়ে বেঁচে যাই। কোনোক্রমে এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে গ্রামের বাড়িতে চলে যেতে পারি। তখনকার অনেক কথাই মনে আছে; মনে আছে গ্রামের বাড়ির পুরোনো একটা কাঠের আলমারির কথাও। তবে সে আলমারিতে উল্লেখ করার মতো সম্পদ রাখা ছিল না। থাকার মধ্যে ছিল কিছু পুরোনো কাপড়চোপড়। কয়েকটা ছেঁড়াখোড়া বই-খাতা যে দেখেছি তা স্পষ্ট মনে পড়ে। একটা খাতার পাতায় কয়েক লাইন লেখার ছবি চোখে ভাসলেও কী এর বিষয় ছিল তা লক্ষ করিনি তখন। আব্বাকে জিজ্ঞাসা করেছিলাম, খাতাটির কথা তাঁরও তেমন মনে নেই। তবে তা যে আব্বার দাদা ইব্রাহিম খলিফার ছিল সেটা নিশ্চিত করেছেন। খাতায় লেখা হরফগুলো যে বেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ছিল তা আমার স্মৃতিতে এখনো স্পষ্ট ভাসছে। আব্বা-আম্মার কাছে শুনেছি ইব্রাহিম খলিফা মোটামুটি দীর্ঘজীবী ছিলেন। আমার দাদির কাছেও তাঁর নানা গুণের কথা মাঝে মাঝে শুনতাম। দাদি লেখাপড়া জানতেন না। তাঁর ভাষায় ‘টুক্কা বালা’ পুতুল খেলা থেকে ডেকে এনে আমার দাদার সঙ্গে বিয়ে দিয়ে দেয়া হয়। ফলে বর্ণ পরিচয় ঘটাবার সময়ও পাননি তিনি। যা হোক এই লেখা আমার দাদির প্রসঙ্গেও নয়। তাঁর কথা আলাদা করে লেখার জন্য তোলা রইল। তবে এই লেখায় দাদির কথাও দু-একবার আমাকে না বললে চলবে না।

ইব্রাহিম খলিফার তৈরি চাঁদোয়

মুক্তিযুদ্ধ শেষ হলে বাহাত্তরে ঢাকায় চলে আসি আমরা। পরের কয়েক বছর নিয়মিত বছরে দু-একবার গ্রামের বাড়িতে যাওয়া হতো। একবার গিয়ে দেখি আলমারির ভেতরে উইয়ের আক্রমণ ঘটেছে। নষ্ট হয়ে গেছে অনেক জিনিসপত্র। একাত্তরে আমার দেখা ইব্রাহিম খলিফার খাতাটিও সম্ভবত ততদিনে উইপোকার খাদ্যে পরিণত হয়েছিল। ভাগ্যক্রমে উইপোকার গ্রাস থেকে রক্ষা পাওয়া একটা সম্পদ সেবার আম্মা ঢাকায় নিয়ে আসেন। সেই সম্পদটিরও স্রষ্টা ইব্রাহিম খলিফা। আমার এই লেখার উপজীব্য তাঁর সেই সম্পদ!
দাদির কাছে শুনেছি তাঁর শ্বশুর বৃটিশ আমলে স্কুলে ‘চাইর’ ক্লাস পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। চিঠি লিখতে পারতেন ‘বাংলা আর ইংরাজি’তে। চার পাঁচ বছর বয়সে আব্বা এতিম হন। ফলে দাদার অভিভাবকত্বেই পিতৃহারা তাঁদের দুই ভাইয়ের কৈশোর-তারুণ্যের কাল পার হয়। শুনেছি ইব্রাহিম খলিফা মৃত্যুর দু-এক দিন আগেই তাঁর নাতির ঘরের পুতি এই আমার জন্মের খবর শুনে গিয়েছিলেন। সম্ভবত ইব্রাহিম খলিফার তাঁর অভিজ্ঞানটি আমার হাতে পৌঁছে দেয়ার জন্যই মৃত্যুর জন্য অপেক্ষা করেছিলেন আমার জন্ম পর্যন্ত। ইব্রাহিম খলিফার একটা সাধারণ সৃষ্টিকর্ম কালের করাল গ্রাসকে পাশ কাটিয়ে আমার প্রৌঢ়ত্বের কাল পর্যন্ত পৌছতে পেরেছে বলেই না আমি আজ কিছু একটা লেখার বিষয় খুঁজে পেলাম!
গ্রামের দুচার মাইল সীমানার মধ্যে বর্ষীয়ান কারো দ্বারা ‘কোন বাড়ির ছেঁরা-ও তুমি’ জিজ্ঞাসিত হলে ‘খলিফাবাড়ি’ বলামাত্র বুঝতাম তাঁরা আমার জ্ঞাতিগোষ্ঠীর সবার ইতিহাস জানেন! তো এই খলিফাবাড়ির মানুষদের মধ্যে আমার জ্ঞানসীমার প্রবীণতম খলিফা হলেন ইব্রাহিম খলিফা। খলিফা মানে এখানে ‘পীর’ নয়, ‘দর্জি’। ইব্রাহিম খলিফা বা তাঁর উত্তরসূরীদের কেউ কেউ পাজামা-পাঞ্জাবি সেলাই করলেও তাঁদের খ্যাতি ছিল চাঁদোয়া সেলাইয়ের জন্যও। আমার দাদার ভাইদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতমজনকে আমি কর্মক্ষম দেখেছি একাত্তর-বাহাত্তরে। ততদিনে তিনি অবশ্য এসব কাজ থেকে প্রায় অবসর নিয়েছেন। মাঝে মধ্যে সেলাইয়ের মেশিনের সামনে তাঁকে দেখলেও মনে পড়ে না তাঁকেও চাঁদোয়া সেলাই করতে দেখেছি কিনা! তিনিও এ কাজ করেন কিনা সে জিজ্ঞাসা তখনও আমার মনে জাগেনি। ফলে আমি জানতেও চাইনি। নেহায়েত আমার দাদি গর্ব করে শ্বশুরের চাঁদোয়া সেলাইয়ের খ্যাতির কথা বলতেন বলেই না সে-কথা জানতে পেরেছিলাম। উইপোকার গ্রাস থেকে পুরোনো কাঠের আলমারির যে সম্পদ আম্মা উদ্ধার করে নিয়ে এসেছিলেন তা ছিল ইব্রাহিম খলিফার তৈরি করা একটি ‘চাঁদোয়া’। অনেক যত্নে আম্মা আমাদের পরিবারের এই প্রাচীন সম্পদটি রক্ষা করেছেন। বহুবার আমাদের নিবাস বদল হয়েছে। নানা বাস্তব কারণে ধ্বংস হয়ে গেছে বহু জিনিসপত্র। অকিঞ্চিৎকর বিবেচনা করে আমরাই ধ্বংস করেছি কত মূলবান সম্পদ তা মনে করে এখন কত না ব্যথিত হই!
২০১৪ সালের জুন মাসে একদিন আব্বা-আম্মার সঙ্গে আমাদের পরিবারের নানা পুরোনো প্রসঙ্গ নিয়ে আলোচনা হচ্ছিল। কথায় কথায় আমিই আম্মাকে জিজ্ঞাসা করি সেই চাঁদোয়াটি এখনো আছে কিনা! আম্মা প্রসন্ন হাসি দিয়ে বললেন, ‘থাকত না কেরে! যত্ন কইরা থুইয়া দিছি না!’ বলেই কয়েক মিনিটের মধ্যে ‘চাঁদোয়া’টি আমার সামনে হাজির করলেন। শুধু তাই নয়, যৌবনে আম্মার ‘কৃতকায্য’ অর্থাৎ সৃষ্ট কয়েকটি এমব্রয়ডারিও সেইসঙ্গে বেরিয়ে পড়ল। ছোটবেলায় ওগুলোরও দু-একটা আমি নিজেই আম্মার হাতে রচিত হতে দেখেছি। সে সব নিয়ে অন্যত্র কথা বলা যাবে। ইব্রাহিম খলিফার তৈরি ‘চাঁদোয়া’র প্রসঙ্গেই থাকি।
সাধারণভাবে বললে পাতলা কাপড়ের তৈরি শিল্পিত ছাউনির নাম ‘চাঁদোয়া’। বাংলার হিন্দু পরিবারে যেমন পূজার প্রতিমার মাথার ওপরে চাঁদোয়া এখনো ব্যনবহৃত হয় তেমনিভাবে একসময় গ্রামে ব্যবহৃত হতো মুসলমানদের নানা ধর্মীয় উৎসবেও। এই চাঁদোয়ারই আরেক নাম শামিয়ানা। আজকাল ডেকোরেটর সেবার মধ্য দিয়ে ‘চাঁদোয়া’ ব্যবহারের সংস্কৃতির প্রায় অবসান ঘটতে চলেছে। এখন আর চাঁদোয়া তৈরিতে শিল্পীর হৃদয়সংবেদী স্পর্শের প্রয়োজন পড়ে না, দরকার পড়লে এ ধরনের সামগ্রী এখন শিল্পোৎপাদন প্রক্রিয়ার নির্দয়তায় উৎপাদিত হওয়াই সহজসাধ্য!
উইপোকার গ্রাসে লুপ্ত খাতায় ইব্রাহিম খলিফার হাতের লেখার সৌন্দর্য আমাকে সেই শৈশবেই মুগ্ধ করেছিল। আমার নিজের হাতের লেখা সুন্দর নয় বলে শিক্ষকদের সমালোচনার ব্যথাই হয়তো আমাকে তাঁর হাতের লেখার সৌন্দর্যে মুগ্ধ করেছিল। চাঁদোয়াটি আম্মা আমার হাতে তুলে দিতেই ভাঁজ খুললাম সেটার। গাঢ় লাল ও গাঢ় নীল কাপড়ের সমন্বয়ে একটি বৃক্ষরূপের খানিকটা বিমূর্ত আল্পনা রচিত হয়েছে এতে। বৃক্ষের কাণ্ডে লেখা আছে রচয়িতার নাম-ঠিকানা। যেভাবে তা লেখা আছে তা উদ্ধৃত করছি :
কৃতকায্য ইব্রাহিম সাং গণ্ডারদীয়া
১৩০৬

চাঁদোয়ার এই মাঝের জায়গাটিতে ইব্রাহিম খলিফার নাম ও সাং দেয়া আছে

লেখাটুকু নিপুণভাবে সেলাই করা আছে। এটা যখনই দেখি তখনই উইপোকার খাদ্য হিসেবে বিলীন হওয়া খাতাটির কথা মনে পড়ে। খাতাটির পাতায় লিখিত হস্তাক্ষরও এ রকমই সুন্দর ছিল। এখন বুঝতে পারছি আমার দাদি কেন তাঁর শ্বশুরের গুণপনায় গর্বিত ছিলেন। কারণ মানুষের কাছে ইব্রাহিম খলিফার হাতের লেখার প্রশংসা শোনা যেত। তাঁর হাতের লেখার এই সৌন্দর্যই ছিল সেকালের গ্রামবাসীদের কাছে সর্বোত্তম বিদ্যাবত্তার পরিচয়!
চাঁদোয়ায় লিখিত সালের দিকে দৃষ্টি দেয়া যাক। এর রচনাকাল ‘১৩০৬’। স্মরণীয় যে, গ্রামে-গঞ্জে মানুষ দিনতারিখ বোঝার জন্য পঞ্জিকা ব্যবহার করত; এবং ফসলী সন বাংলা বর্ষপঞ্জিই ছিল তাদের ব্যবহার্য। আমার মায়ের দ্বারা সংরক্ষিত ও বাহিত ইব্রাহিম খলিফার চাঁদোয়াটির বয়স নিরূপণ করতে গিয়ে দেখলাম এখন থেকে ১২১ বছর আগে রচিত হয়েছিল এটি। অর্থাৎ চাঁদোয়াটির ও কবি কাজী নজরুল ইসলামের জন্মবর্ষ একই। নজরুল-জয়ন্তী তিথিতে স্মরণযোগ্য আমার বাবার দাদার নিতান্ত অকিঞ্চিৎকর এক সৃষ্টিকর্মের ইতিহাস-সন্ধান সূত্রে ভিন্ন একভাবে যেন বাংলার লোকায়ত মহাপ্রতিভা কাজী নজরুলকেই পুনরায় সামান্যে স্মরণ করার সুযোগ পাওয়া গেল!