আহমেদ স্বপন মাহমুদ > সতত স্মৃতিময় শামীম কবীর এবং শামীম কবীরের গুচ্ছকবিতা

0
581

সতত স্মৃতিময় শামীম কবীর

কবে হবে, মনে হয়, ১৯৮৮ সাল। অনেক দিন আগের কথা! তখনো বিরাজনীতিকরণ শুরু হয় নাই। বরং রমরমা ছাত্ররাজনীতি। ছাত্রমৈত্রী, জাসদ, বিএনপি’র মহড়া হরহামেশাই। ক্রমাগত দানা বাঁধতে থাকে স্বৈরাচার এরশাদবিরোধী আন্দোলন। এর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম বর্ষের ভর্তি পরীক্ষা আসে, শেষ হয়, আবার আসে। কত কত নতুন মুখ। এই নতুনদের মাঝেই আগামীর স্বপ্ন ও সম্ভাবনা।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আশি-নব্বই দশকে মারামারি কম হয় নি। শিবির ক্রমে শক্তি সঞ্চয় করতেছে আগ্রাসী হবার বাসনায়। তো, নানা ঝুটঝামেলায়, রাজনৈতিক কোন্দল, রেশারেশি আবার এরশাদবিরোধী আন্দোলনে ঐক্যবদ্ধ রাজনীতি ইত্যাদি নানf কারণে যখন তখন হল বন্ধ হয়। নোটিশ আসে হল খালি কর, খালি কর। তো, সেই সময়ে রাজশাহীর কাছের শহর বগুড়ায় গিয়ে উঠতাম। বগুড়া তখন সাহিত্যের পীঠস্থান। কবি ও সম্পাদক আনওয়ার আহমদ থাকেন সেখানে। কর্মসূত্রে। কিছুধ্বনি, রূপমসহ আরও দুই/তিনটি পত্রিকা সম্পাদনা করেন। সারা দিনরাত বগুড়াকে মাতিয়ে রাখেন তিনি। বগুড়ায় আরো আছেন বিপ্রতীপ সম্পদক ফারুক সিদ্দিকী, প্রাবন্ধিক বজলুল করিম বাহার, শোয়েব শাহরিয়ার, শেখ ফিরোজ আহমদ বাবুসহ আরো অনেকেই। কবি মাসুদ খানও তখন বগুড়ায়। আর একদল তরুণপ্রাণ যারা লিটলম্যাগ আন্দোদলনকে বেগবান করছেন বগুড়া থেকে। জীবনের ঘোর। আচ্ছন্নতা! সারাদিন আড্ডা। আর শামীমদের মতো তরুণরাই সেই আড্ডার প্রাণ। তো, সেই সময়গুলাতে বগুড়ায় গিয়ে থাকি। আড্ডাবাজি করি। কবিতাও করি। ঘোরমত্ত জীবন!
বগুড়ায় বাসা আমার সহপাঠি কবিবন্ধু আশিক সারওয়ার। দুর্দান্ত মেধাবী, স্বল্প ও মিষ্টভাষি কিন্তু ত্যাড়া। আশিক আর আমি একই হলে একই রুমে থাকি। রুমটা রাজনৈতিক। ৩২১ এসএম হল। সেসব কথা থাক।
১৯৮৮ সাল হবে। একদিন সন্ধ্যার পর হলেই আছি। এর মধ্যে শিবলী মোকতাদির, বায়েজীদ মাহবুব আর শামীম কবির এসে হাজির। শামীম সুশ্রী, চিপচিপে গড়ন। সরু নাক। মুখের মাঝে চিকন ঠোঁটের হাসি যেন লেগে আছে। জানলাম সবে সে ইন্টারমিডিয়েটে পড়ে। কিন্তু ওর লগে আড্ডা দিয়ে কথা বলে কবিতা পড়ে বেশ ম্যাচুয়র্ড মনে হলো। কবিতায় তখন সর্বপ্রাণ নিবেদিত শামীম ও তার বন্ধুরা। বিশেষ করে কবিতার আঙ্গিক, ছন্দজ্ঞান ও শিল্পরসিকতা নিয়ে ওদের জুড়ি পাওয়া ভার! কখনো শিবলী, শামীম, বায়েজীদ ৩২১ নম্বরে বেড শেয়ার করে থেকে যায় আমাদের সাথে, কখনো বগুড়ায়, ফিরে যায়। ওরা তিন কবিই বগুড়ার।
শামীম, বায়েজীদ, শিবলী ঘনিষ্ট বন্ধু। কবি। কবিতাই ধ্যানজ্ঞান। আড্ডা, কবিতা, বোহেমিয়ান জীবনযাপন সেই সময়ের চলতি হাওয়া। সেই সময়ের কবি লেখকরা প্রায় কেউই সেই হাওয়ার বাইরে ছিলেন না। তো, শামীমরা বিশ্ববিদ্যালয়ে আসত মূলত আড্ডা দিতে, সাথে অনুসঙ্গ হিসাবে শিবলীর ভর্তি পরীক্ষা। ১৯৮৮-৮৯ ঘিরে শামীমদের সাথে আড্ডা ছিল প্রায় নিয়মিত। রাজশাহীতে, বগুড়ায়। বগুড়া লেখকচক্র গঠিত হয় ১৯৮৮ সালে। সে বছর পুরস্কার পান হাসান স্যার. হাসান আজিজুল হক। লজ্জায় লাল হবার দশা, সেই পুরস্কার-অনুষ্ঠানে আমিও ছিলাম একজন আলোচক! তো, লোভ বন্ধুদের সাথে আড্ডা। শামীম, শিবলী, বায়েজীদসহ আমরা আড্ডায় মগ্ন, কখনো হোটেলে, লাইব্রেরির সামনে, সাত মাথার মোড়ে, পার্কে, বা ফারুক সিদ্দিকীর বাসায়।
আড্ডাআাজ হিসাবে তখনই নামডাক হয়া গেছিল আমার। তবে আড্ডা যার তার সাথে না। পছন্দের কবিদের সাথে। আমার বিভাগের শিক্ষক কবি অসীম কুমার দাস বিশ্ববিদ্যালয়ের সেইসব কাব্যআড্ডার শিরোমণি। তার নামডাকের অন্ত নাই! জীবন্ত কিংবদন্তি তিনি, তখনি। তো, শামীমরা এসেই খোঁজ নেয় অসীম স্যারের। দেখা হয়, তুমুল আড্ডাবাজি হয়। ক্যাম্পাসে, নিউমার্কেট, সাহেববাজার, পদ্মার পাড়, বিশ্ববিদ্যালয়ে।
শামীমের মাঝে চাপা চাপা ভাব ছিল। চাঁপা চাঁপা ঘ্রাণ বললেও চলে! তার কবিতা তো সেই চাঁপা ঘ্রাণ ছড়িয়ে যাচ্ছে এখনো। ‘শামীমের কবিতার সমগ্র’ করেছে দ্রষ্টব্য। কীসব উত্তম কবিতা তার। তাই কবির বয়স লাগে না। ব্রাণ্ড লাগে না। দম লাগে। শামীম তার কবিতায় দমের শক্তির ছাপ রেখে গেছে। আধুনিক জীবননের উন্মূলতা, নিঃসঙ্গতা, বেদনোবোধ, বোহেমিয়ান যাপনরীতি সবকিছুতেই শামীম বিরাজমান ছিল। গাম্ভীর্য নিয়ে থাকত। কিন্তু সহজ ও সরল। মায়াময়। কবিতায় ফুটে আছে জীবনের ঘোরমত্ত জীবনের বাস্তবতা, বেদনাবোধ, নিঃসঙ্গতা। কিন্তু শামীমের চোখ ছিল আলাদা, দেখার ভঙ্গি ছিল আলাদা, এবং তার কবিতাও তাই আলাদারকমের আগুনের উজ্জ্বলতা নিয়ে হাজির আমাদের সামনে। তার কবিতা নিয়ে আজ আলাপ নয়। বারান্তরে হবে।
তো, বিশ্ববিদ্যালয় পাঠ চুকিয়ে যখন ঢাকা আসি তখন আজিজ মার্কেট হয় হয়। আমরা মানে আজকের আমাদের সময়ের ঢাকাকেন্দ্রিক কব-লেখকরা প্রায় সবাই আজিজে আড্ডা দেই। নব্বইয়েরে একদম প্রথম দিককার সময়ে শামীমকে আজিজে দেখি। আজিজে বিজুর পাঠক সমাবেশের দোতলায় উঠার সিঁড়ির এককোণে বসে বন্ধুর সাথে নিমগন আড্ডা, গল্প। মনে হতো, ধ্যানবিশেষ সেটা। হায়, হ্যালো, চুটিয়ে আড্ডা হতো না তখন শামীমের সাথে।
রমরমা শাহবাগের আজিজে কে আসত না তখন! প্রায় সব লিটল ম্যাগগাজিন সাহিত্যপত্রিকার লেখক সম্পাদক বড় ছোট মিলে সবাই যার যার আড্ডায় মাতোয়ারা। ঢাকার বাইরে থেকেও আসে আজিজে। সরগরম আজিজ তখন। না কাপড়ের দোকান একটাও ছিল না! অনেকে পত্রিকা করে। টগবগে তরুণরা। তখন ‘নদী’ নাম করেছিল খুব। তাজুল ও বন্ধুরা মিলে বের করল ‘নদী’ পত্রিকা। তাজা তাজা সব লেখা। তাজুল, রোজী, আদিত্য, ফ্লোরা, আতিকসহ অনেকেরই আড্ডা তখন আজিজে – ওদের সাথেই বন্ধুত্ব শামীমের। একা, বন্ধুসঙ্গেও যেন নিঃসঙ্গবোধ তার। আর লিখছে দুর্দান্ত সব কবিতা।
একদিন শুনলাম হননকালের কথা। মনটা বিষিয়ে গেল। আহা! কোথায় চাপা চাপা দুঃখ ও বেদনাবোধ চির-অনন্তের পথে চাপা দিয়ে গেল শামীম, না জাগিয়ে দিয়ে গেল!
গেল বছর কয়েক আগেও হুটহাট করে বগুড়ায় চলে যাইতাম। শিবলীরা এখনো আছে। বগুড়া লেখক চক্রের বন্ধুরা আছে। গেলেই ধুন্দুমার আ্ড্ডা। তো, কয়েক বছর আগে শিবলী ও বগুড়ার বন্ধুদেরসহ সারিরয়াকান্দি প্রেম যমুনার ঘাটে যাওয়ার পথে শিবলীকে বললাম শামীমকে দেখে যাব। রাজি। শামীম শুয়ে আছে চিকন শুকনাপাতার মর্মর ধ্বনি আর অনন্তের সুবাস নিয়ে নিজের ঘরে। শামীম লিখে গেছে :

এখন সময় হলো
আমার লাল ঘোড়ার গাড়িতে ফেরার
আমি দুপায়ের হাড় বাজিয়ে ফিরবো
আমার ঘরে
না কোনো ফুলের ঝাড়
কেবল মৃত্যু
আমার ঘরে কী সুন্দর সাজানো [ আমার ঘর]

জন্মদিনে শামীমের প্রতি শ্রদ্ধা।

শামীম কবীরের কয়েকটি কবিতা >>

শাসন চিত্র : বিযোজন

শিবরাত্রি, রমণী-ভূগোল পাতা পথে গিরি-খাত :
নীল অশ্ব, প্রাজ্ঞ প্রেম—
প্রভুর জীবাশ্ম টেনে চলে রাত ভেঙে
লোকান্তরিত রাশ, আস্তাবলে আতন্দ্রা জাবর :
আনাড়ি সহিস, তীব্র ধাবমান যুগ্ম পথে : অখ্যাত রমণী গুপ্ত প্রেম খুলেছিলো।

২.
অনঙ্গ সন্ন্যাস খুলে খুলে কে এসেছে স্বপ্নপনা গৃহে : অভি-
মান নয়, শুধু চূর্ণ কাঁচের অশত্থ ফণা : আমি
মুখস্ত নায়ক, খাঁ খাঁ মঞ্চ—সূক্ষ্মগৃহে।

টোলঘরে পরিচয়

ক.
যেসব টোল থেকে ভেসে গ্যাছে বই
ছাতা শ্লেট আর বেঞ্চ
তারা আনন্দে উৎরোল
অনুগত লাইন লাইন
মুখস্ত রাস্তার মোড়ে মোড়ে
রেলিঙের খোঁজ আর
রেলে কাটা পড়া এক দুঃখী লাঙলের জন্যে
ব’সে থাকে ঠ্যাং মেলে বন
দাফন পোড়ার ঘ্রাণ
ঘ্রাণের আঘ্রাণ ছোটে দিগ্বিদিক
রোজ

কোট্যানজেন্ট মেপে মেপে কামুক দ্বিধার বোল ছোঁড়ে
নিচ থেকে ঢেউ দিয়ে তেতালার ছাদ লক্ষ্য ক’রে
অস্তরাগ ভোজী
টুপি দিয়ে বুক ঢেকে তাহাদের নিকষ শিক্ষিকা
বলে রসায়ন

অনন্তর সেও এক ছাদ
যার ঘুমন্তের মাথা খেয়ে বর্গফুট
ব্যাসগুলি কেটলির ভেতরেই ফোটে

বাস্পীভুত হচ্ছে কেটলী নিরুদ্বেগ আর সেই
সব বিদ্যাবুদ্ধি গিলে খেয়ে তবে
শিক্ষাক্ষেত্র সাঙ্গ হ’লে
তেত্রিশ হাজার নদী কলসে ভরাই
সে কলস তারপর নদে ভেসে যায়

খ.
পরে তারা উচ্চস্থলী থেকে গ্রামে গঞ্জে নেমে গেলে
টোলঘরের ছাদের ওপর গর্দভীর সাথে
কথপোকথন করে

বাংলা গাছ

হাঁটু মুড়ে সামনে আসীন মাঠ নামে
তেহারা চুলের মতো গনগনে আরোহী গো শোনো
ভেষজ ক্রালের চাল থেকে গ্যাছে ভজনা আমার
তাকে পেড়ে আনো
আনতে পারো যদি বলি বারোমাসা
বলি চাকা চাকা উপশম কথা

তেরোটি ভূতের গল্প ক’রেছিতো কাল
ভাই হ’লো গাড়িয়াল তার বউ হারানো অবধি
মা-র নাম উৎবিদিত দূর থেকে দূরে
চ’লে যায় চুলরঙো বাম্পারের কাঠে সুলিখিত
কিছুটা আতরভেদী সাইকেল ঘোর
হৃদয়নিহারী ঐ বাধকতা মানবো ক্যানো
ভীষণ প্রণালী খাবো পরাজয় ঘামবো ক্যানো
গোসলের এক বিন্দু পার্শ্ববর্তী ঘরানায় য্যানো
আমার এ উচ্চগ্রাম লেগে থাকে
তার কাজ যালবন্ত পাখাঅলা শাকচুন্নীদের
ছায়াকে লোপাট করা আর
স্বতঃস্ফূর্ত অনিচ্ছার শিরোপরে ঢালে
ঔ সই বাংলা গাছ সম্মুখান্ত প্রভু লয়ে দৌড়ায়

একবার ভার স্থলনের মধ্যে দ্যাখা হ’লো
আটপৌরে গ্রাসের দোকানে লম্বা পরিচয় গাছ