ইউভাল নোয়াহ হারারি > করোনা ভাইরাসের পর >> করোনার দিনে

0
561

ইউভাল নোয়াহ হারারি > করোনা ভাইরাসের পর

করোনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে মানব সংকট দেখা দেয়ার পর “করোনার বিরুদ্ধে লড়াই, মানবজাতি নেতৃত্বশূন্য” শিরোনামে একটি লেখা লিখেছিলেন এই সময়ের প্রখ্যাত ঐতিহাসিক ইউভাল নোয়াহ হারারি। সেই লেখাটি তীরন্দাজ-এ প্রকাশিত হয়েছিল। এবার লিখলেন এই লেখাটি। হারারি, অনেকে হয়তো জানেন, Homo Deus: A Brief History of Tomorrow, Sapiens: A Brief History of Humankind এবং 21 Lessons for the 21st Century এই তিনটি বেস্টসেলার বইয়ের লেখক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান। নতুন এই প্রবন্ধে করোনা-পরবর্তী পৃথিবী কেমন দাঁড়াবে তাই নিয়ে এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা আছে, যা আপনাকে ভাবাবে।

মহামারির মধ্য দিয়ে তাই নাগরিকতার আসল পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে আমাদের প্রত্যেককেই বিজ্ঞান-নির্ভর তথ্য-উপাত্ত এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস করতে হবে। অদৃশ্য ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং আত্মসেবী রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা রাখলে হবে না। আমরা যদি সঠিক বিষয়গুলো বুঝে উঠতে ব্যর্থ হই, আমরা আমাদের অর্জিত মূল্যবান স্বাধীনতার কাছ থেকে দূরে সরে যাবো। অথচ এই স্বাধীনতাই হচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষার রক্ষাকবচ।

মানবজাতি এখন ভয়ঙ্কর বৈশ্বিক সমস্যার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে। মনে হচ্ছে এটাই আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় সংকট। আগামী কয়েক সপ্তাহে সাধারণ মানুষ আর সরকারের গ্রহণ করা পদক্ষেপগুলোর উপরই নির্ভর করছে পৃথিবীর রূপ কেমন দাঁড়াবে। আসন্ন বছরগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে। তারা যে শুধু আমাদের স্বাস্থ্যব্যবস্থাকে নতুন রূপে ঢেলে সাজাবেন তাই নয়, সেই সঙ্গে আমাদের অর্থনীতি, রাজনীতি ও সংস্কৃতিরও নতুন রূপ দেবেন। খুব দ্রুত আমাদের কার্যকর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে। এসব পদক্ষেপ গ্রহণের পর দীর্ঘমেয়াদী সময়ে কী ঘটতে পারে, তাও আমাদের বিবেচনায় রাখতে হবে। যখন আমরা বিকল্পের কথা চিন্তা করবো, নিজেদেরকেই প্রশ্ন করে বুঝতে হবে, এই ঝড় থিতিয়ে এলে বসবাসের জন্য কোন ধরনের পৃথিবী আমরা পাবো। হ্যাঁ, এই ঝড় থেমে যাবে, মানবজাতির অস্তিত্ত্ব রক্ষা পাবে, বেশিরভাগ মানুষই বেঁচে থাকবে – কিন্তু আমরা যে পৃথিবী পাবো সেটা হবে ভিন্ন এক পৃথিবী।
অনেক স্বল্পকালীন জরুরি পদক্ষেপ আমাদের জীবনকে নিয়ন্ত্রণ করবে। আপতকালীন জরুরি ব্যবস্থার এটাই হচ্ছে বৈশিষ্ট্য। ঐতিহাসিক প্রক্রিয়াটা দ্রুতলয়ে সামনের দিকে এগিয়ে যাবে। স্বাভাবিক সময়ে কোনো সিদ্ধান্ত নিলে সেটা বাস্তবায়িত হতে বছরের পর বছর লেগে যায়। কিন্তু এখন সিদ্ধান্তগুলি কার্যকর করা হবে মাত্র কয়েক ঘণ্টায়। অপরিণত, এমনকি মারাত্মক প্রযুক্তিগুলিকে কাজে লাগানো হবে। ঝুঁকিটাকে বড় করে দেখা হবে না। বড় বড় সামাজিক পদক্ষেপ আর ব্যবস্থা গ্রহণের ফলে পুরো একটা দেশ হয়তো গিনিপিগ হয়ে যাবে। কী ঘটতে পারে ভাবুন তো যখন সবাইকে বাড়িতে বসে কাজ করতে হবে আর দূর থেকে সবাই যোগাযোগ রক্ষা করবে? কী ঘটতে পারে ভাবুন, যখন পুরা একটা স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয় অনলাইনে রূপান্তরিত হবে? স্বাভাবিক সময়ে সরকার, ব্যবসায়ী সম্প্রদায় আর শিক্ষাবোর্ডগুলো এই ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার ব্যপারে কখনও রাজি হতো না। কিন্তু এখন হবে।
এরকম সংকটের সময়ে আমাদের হাতে দুটো বিকল্প আছে। প্রথমত, স্বৈরাচারী পাহারাদারি ব্যবস্থা চালু করা অথবা নাগরিকদের ক্ষমতায়িত করা। দ্বিতীয়ত, জাতিগত বিচ্ছিন্নতা অথবা বৈশ্বিক ঐক্য-সংহতি রক্ষা করা।
পাহারাদারি ছাতার তলে

করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে অনেক সরকারই নতুন ধরনের নজরদারি উপকরণ ব্যবহার করছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ঘটেছে চীনে। খুব নিবিড়ভাবে মানুষের স্মার্টফোন মনিটর করা হয়েছে, মুখ (ফেস) সনাক্ত করার ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে।

মহামারি ঠেকাতে হলে, সমগ্র জনগোষ্ঠীকে কিছু নির্দেশনা বাধ্যতামূলকভাবে মেনে চলতে হবে। দুইভাবে এটা করা যেতে পারে। একটা হলো জনগণ কী করছে সরকারকে সেটা মনিটর বা পর্যবেক্ষণ করতে হবে আর কেউ যদি নিয়ম ভঙ্গ করে তাহলে তাকে শাস্তি দিতে হবে। আজকে, মানব-ইতিহাসে, এই প্রথম, প্রযুক্তির দ্বারা এটা করা সম্ভব। পঞ্চাশ বছর আগে কেজিবি ২৪০ মিলিয়ন সোভিয়েত নাগরিককে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণে রাখতে পারেনি। প্রয়োজনীয় সমস্ত তথ্য সংরক্ষণ আর প্রক্রিয়াকরণ করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হয়নি। কেজিবি নির্ভর করেছিল মানুষের মতো এজেন্ট আর তাদের বিশ্লেষণের উপর। কিন্তু এই এজেন্টদের পক্ষে প্রতিটি নাগরিককে পর্যবেক্ষণ করা বা চোখে চোখে রাখা সম্ভব হয়নি। কিন্তু সরকারগুলি এখন রক্তমাংসের মানুষের পরিবর্তে প্রযুক্তিনির্ভর সেন্সর ব্যবস্থা আর শক্তিশালী প্রযুক্তির ওপর নির্ভর করবে।
করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করতে গিয়ে অনেক সরকারই নতুন ধরনের নজরদারি উপকরণ ব্যবহার করছে। এর সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ব্যবহার ঘটেছে চীনে। খুব নিবিড়ভাবে মানুষের স্মার্টফোন মনিটর করা হয়েছে, মুখ (ফেস) সনাক্ত করার ক্যামেরা ব্যবহার করা হয়েছে। মানুষের স্বাস্থ্যগত দিকগুলি জানার জন্য তাদের শরীরের তাপমাত্রা মাপা হয়েছে। বাধ্য করা হয়েছে তাদের শরীরে অন্য কোনো রোগ আছে কিনা সেটা জানাতে। চীনা কর্তৃপক্ষ সন্দেহভাজন করোনাবাহী মানুষদেরই শুধু সনাক্ত করেনি, তাদের চলাচলও পর্যবেক্ষণ করেছে, কাদের সংস্পর্শে তারা আসছে, প্রযু্ক্তির মাধ্যমে তাও দেখতে পেয়েছে।
মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে করোনায় আক্রান্ত মানুষ অন্য মানুষদের কাছ থেকে কতটা দূরত্বে আছে বা কাছে আছে, সে সম্পর্কেও প্রত্যেককে সতর্ক করে দিয়েছে।
ফটোগ্রাফি নিয়ে

এখানে যে ছবিগুলি দেখছেন সেগুলি ইতালির জনশূন্য বিরান হয়ে যাওয়া কয়েকটা সড়কের। ছবিগুলো তুলেছেন লকডাউনে থাকা ইতালির সাংবাদিক গ্রেজিয়ানো প্যানফিলি। এই ধরনের প্রযুক্তি পূর্ব-এশিয়ায় দুর্লভ নয়। ইজরাইলের প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহু সম্প্রতি সন্ত্রাসীদের গতিবিধি লক্ষ করার জন্য যে-ধরনের নজরদারি-প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়, কোরোনা ভাইরাসে আক্রান্তদের পর্যবেক্ষণ করার জন্য নিরাপত্তা এজেন্সিগুলোকে সেই ধরনের প্রযুক্তি ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছিলেন। কিন্তু সংশ্লিষ্ট সংসদীয় কমিটি এর অনুমোদন না দিলে ‘জরুরি আইন’ প্রয়োগে করে নেতানিয়াহু ব্যবস্থাটি বলবৎ করেন।

করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে, সেই গোয়েন্দাগিরির ব্যাপারটি এখন ঘুরে যাবে। এখন সরকার জানতে চাইবে আপনার শরীরের তাপমাত্রা কত, আর চামড়ার তলায় আপনার ব্লাড প্রেসার কী অবস্থায় আছে।

আপনি হয়তো বলতে পারেন, এসবের কোনোটাই নতুন কিছু নয়। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে সরকার ও কর্পোরেশনগুলো মানুষের গতিবিধি লক্ষ করা, নিয়ন্ত্রণ করা, ইত্যাদি কাজে অনেক উন্নতমানের প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। এর পরও যদি আমরা সতর্ক না হই, আমাদের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ইতিহাসটি তাহলে নানান গুরুতর প্রশ্নের সম্মুখীন হবে। যারা এর আগে এরকম গোয়েন্দাগিরি করবে না বলে যে সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছিল, এখন গণগোয়েন্দাগিরির এই ব্যাপারটি দেশে দেশে যে শুধু স্বাভাবিক হয়ে উঠবে তাই নয়, বরং এই ব্যবস্থায় নাটকীয় পরিবর্তন আসবে। এতদিন এই গোয়েন্দাগিরি ‘চামড়ার ওপরে’ (বাইরের শরীর) সীমাবদ্ধ ছিল, এখন তা ‘চামড়ার গভীর’ (ভেতরকার শরীর) পর্যন্ত বিস্তৃত হবে।
ফলে কী দাঁড়াবে জানেন। আপনার আঙুল এর আগে যখন আপনার স্মার্টফোন স্পর্শ করতো আর কোনো লিংকে ক্লিক করতো, সরকার জানতে চেষ্টা করতো আপনার আঙুল আসলে কোন লিংকে গিয়ে কী খুঁজছে। কিন্তু করোনা ভাইরাসের সংক্রমণের কারণে, সেই গোয়েন্দাগিরির ব্যাপারটি এখন ঘুরে যাবে। এখন সরকার জানতে চাইবে আপনার শরীরের তাপমাত্রা কত, আর চামড়ার তলায় আপনার ব্লাড প্রেসার কী অবস্থায় আছে।
জরুরি ব্যবস্থা
সমস্যা হচ্ছে, সার্ভিলেন্স বা পর্যবেক্ষণের কোন অবস্থায় আছি আমরা, কীভাবে আমাদের পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে, সামনের দিনগুলিতে কী ঘটবে, সে-সবের কিছুই জানি না আমরা। গোয়েন্দাগিরি বা পর্যবেক্ষণ সংক্রান্ত প্রযুক্তি অনেক দ্রুত বদলে যাচ্ছে। দশ বছর আগেও যা ছিল কল্পবিজ্ঞানের কল্পনা, তা এখন বাস্তব আর ইতিহাস। পরীক্ষামূলক চিন্তার অংশ হিসেবে আসুন ভাবা যাক, কোনো একটা সরকার সার্বক্ষণিভাবে সেই দেশের প্রত্যেক নাগরিকের শরীরের তাপমাত্রা, হার্টবিটের হার বোঝার জন্য একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট হাতে পরা বাধ্যতামূলক করলো। সরকারি ব্যবস্থাপনায় গবেষকরা সমস্ত ডাটা সংরক্ষণ ও বিশ্লেষণ করলো। আপনি জানার আগেই তারা জেনে গেল যে আপনি অসুস্থ। তারা এও জানবে যে আপনি কোথায় অবস্থান করছেন। কাদের সঙ্গে আপনি মেলামেশা করেছেন। ফলে, তারা সংক্রমিত হওয়ার যে চক্র সেটা ব্যাপকমাত্রায় সংকুচিত করতে পারবে। এমনকি নির্মূল করাও তাদের পক্ষে সম্ভব হবে।

করপোরেশন আর সরকার যদি গণহারে আমাদের বায়োমেট্রিক ডাটা পেয়ে যায় তাহলে আমরা নিজেদের সম্পর্কে যতটা জানবো, তার চেয়ে অনেক বেশি জেনে যাবে তারা। তখন তারা শুধু আমাদের অনুভূতি সম্পর্কে বলতে পারবে না, আমাদের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে।

এই ধরনের ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে দিনের মধ্যেই বা দ্রততম সময়ে মহামারি এবং মহামারির স্রোতটা রুখে দেবে। এসব কথা শুনতে বেশ ভালই মনে হচ্ছে তাই না?
কিন্তু উল্টো দিক থেকে ভাবলে এই ব্যবস্থাই এমন নতুন একধরনের গোয়েন্দাগিরিকে বৈধতা দেবে, যা আতঙ্কের কারণ হয়ে উঠবে। উদাহরণ হিসেবে বলি, সিএনএনএ-র পরিবর্তে আমি ফক্স নিউজে ক্লিক করলাম, এতে সহজেই বোঝা যাবে আমার রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি কি, এমনকি জানা যাবে আমার ব্যক্তিত্বের ধরনটা কেমন। শুধু কি তাই? আপনি ভিডিওর মাধ্যমে বুঝে ফেলবেন যে আমার শরীরের তাপমাত্রা কত, ব্লাডপ্রেসারের মাত্রা কেমন, হার্টবিট কত, কোন অবস্থায় আমি হাসি, কী হলে কাঁদি, কী হলে আমি সত্যি সত্যি রেগে যাই।
এটা মনে রাখা দরকার যে, জ্বর-কাশির মতো ক্রোধ, আনন্দ, অবসাদ এবং ভালোবাসার অনুভূতি হচ্ছে শারীরিক বিষয়। যে প্রযুক্তি কাশি সনাক্ত করবে, সেই একই প্রযুক্তি আমাদের হাসিও সনাক্ত করতে পারে। করপোরেশন আর সরকার যদি গণহারে আমাদের বায়োমেট্রিক ডাটা পেয়ে যায় তাহলে আমরা নিজেদের সম্পর্কে যতটা জানবো, তার চেয়ে অনেক বেশি জেনে যাবে তারা। তখন তারা শুধু আমাদের অনুভূতি সম্পর্কে বলতে পারবে না, আমাদের অনুভূতিকে নিয়ন্ত্রণও করতে পারবে। তাদের যা খুশি তারা বিক্রি করতে চাইবে। রাজনীতিবিদরাই হোক বা ব্যবসায়ী, আমাদের প্রভাবিত করবেন বা ব্যবহার করবেন। আর এই বায়োমেন্ট্রিক ডাটা যদি হ্যাক হয়ে যায়, তাহলে তা মারাত্মক হয়ে উঠবে। মনে করেন ২০৩০ সালের উত্তর কোরিয়ার কথা। এই দেশের প্রত্যেকটি নাগরিক ২৪ ঘণ্টা একটা বায়োমেট্রিক ব্রেসলেট পরে আছে। দেশটির মহান নেতা বক্তৃতা করছেন আর ব্রেসলেটের মাধ্যমে প্রকাশ পাচ্ছে যে একজন নাগরিক রেগে যাচ্ছেন। তো, হয়ে গেল আর কি।

সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমনিতেই আমরা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বড় রকমের টানাপোড়েন আর যুদ্ধংদেহি অবস্থার মধ্যে আছি। করোনা সংকট তাতে আরও ঘি ঢালবে। মানুষজনকে আপনি যখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের মধ্যে যে কোনো একটাকে বেছে নিতে বলবেন, তারা সন্দেহাতীতভাবেই স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেবে।

আপনি অবশ্য রাষ্ট্রীয় জরুরি অবস্থার সময় বায়োমেট্রিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিটি সাময়িক সময়ের জন্যে চালু করতে পারেন। জরুরি অবস্থা উঠে যাওয়ার পর এর ব্যবহারও বন্ধ হওয়া দরকার।কিন্তু এই সাময়িক ব্যবহারই দীর্ঘস্থায়ী বা বারবার ঘটতে পারে। কেননা, বারবারই হয়তো জরুরি অবস্থা জারি করার মতো পরিস্থিতির উদ্ভব হতে পারে। আমার দেশে, ইজরাইলে, ১৯৪৮ সালের ‘স্বাধীনতা যুদ্ধ’-এর সময় জরুরি অবস্থা জারি করা হয়েছিল। সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে তখন প্রেস সেন্সরশিপ আর সরকারের জমি অধিগ্রহণের দরকার ছিল। সেই যুদ্ধজয় আমাদের কবেই ঘটেছে। কিন্তু ইজরায়েল কখনই আর জরুরি অবস্থা তুলে নেয়নি। সেই সঙ্গে ১৯৪৮ সালে গৃহীত “সাময়িক” বা আপতকালীন ব্যবস্থারও বিলুপ্তি ঘটায়নি।
যখন করোনা ভাইরাসের সংক্রমণ শূন্যতে চলে আসবে তখনও নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার জন্য ক্ষুধার্ত সরকারগুলো যুক্তি দেখাতে থাকবে যে, দ্বিতীয়বার যাতে করোনার প্রকোপ ফিরে না আসে সেই জন্য আমাদের বায়োমেট্রিক পর্যবেক্ষণ পদ্ধতিটা চালু রাখতে হবে। দ্বিতীয়বার ইবোলা ভাইরাসটা সেন্ট্রাল আমেরিকায় ফিরে আসতে পারে, এরকম ভয়ও তারা দেখাতে পারে। আমি কী বলছি, আপনারা নিশ্চয়ই সেটা বুঝতে পারছেন। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এমনিতেই আমরা আমাদের ব্যক্তিগত গোপনীয়তা নিয়ে বড় রকমের টানাপোড়েন আর যুদ্ধংদেহি অবস্থার মধ্যে আছি। করোনা সংকট তাতে আরও ঘি ঢালবে। মানুষজনকে আপনি যখন ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্যের মধ্যে যে কোনো একটাকে বেছে নিতে বলবেন, তারা সন্দেহাতীতভাবেই স্বাস্থ্যকে প্রাধান্য দেবে।
সাবান পুলিশ
মানুষকে আসলে ব্যক্তিগত গোপনীয়তা রক্ষা করা আর স্বাস্থ্যকে ঠিক রাখার মধ্যে যে কোনো একটাকে বেছে নেয়ার কথা বললেই সংকটের শেকড় অনেক দূর পর্যন্ত বিস্তৃতি পাবে। এই বেছে নিতে বলাটাই মস্ত বড় ভুল। আমরা ব্যক্তিগত গোপনীয়তা আর স্বাস্থ্য- দুটোই বজায় রাখতে পারি। স্বাস্থ্যকেও রক্ষা করবো আবার করোনা মহামারিও ঠেকাবো- দুটোই সম্ভব। কিন্তু স্বৈরাচারী একনায়কতান্ত্রিক জান্তার গোয়েন্দাগিরির বিনিময়ে সেটা করবো না। বরং একটা করতে হবে জনগণকে ক্ষমতায়িত করার মধ্য দিয়ে। এই তো এখনই করোনা ভাইরাসের প্রকোপের মধ্যেও দক্ষিণ কোরিয়া, তাইওয়ান ও সিঙ্গাপুর সাফল্যের সঙ্গে তা সীমিত রাখতে পেরেছে। তারা যে-সমস্ত মানুষ আক্রান্ত হয়েছে বা হতে পারে, তাদের খুঁজে বের করেছে, নির্ভর করেছে ব্যাপক পরীক্ষা (টেস্ট), যথাযথ তথ্যপ্রচার আর ভাইরাসটি সম্পর্কে ভালোভাবে অবহিত জনগণের সার্বিক সহযোগিতার ওপর।
কেন্দ্রীয়ভাবে মনিটর করা আর কঠোর শাস্তি দিয়ে মানুষকে দরকারি নির্দেশনা মেনে চলার পরামর্শ দিয়ে কোনো কাজ হবে না। মানুষকে যখন বিজ্ঞাননির্ভর তথ্য জানানো হয়, যখন সরকারি পদক্ষেপের ওপর জনগণ আস্থা স্থাপন করে, তখন যদি বলেন এই হচ্ছে পরিস্থিতি, এটাই আপনাদের করতে হবে, মানুষ সেটা করবে। কারো মুখাপেক্ষি হয়ে তারা থাকবে না। আত্ম-প্রণোদিত আর পরিপূর্ণ সঠিক তথ্য জানা জনগোষ্ঠী পুলিশ আর উদাসীন অজ্ঞ কিছু মানুষের তুলনায় অনেক বেশি শক্তিশালী আর কার্যকর ভূমিকা পালন করে থাকে।
সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার কথাই বলি। এই বিষয়টি মানুষের পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন আর নিরোগ থাকার পথে একটা বিরাট মানবিক অগ্রগতি বলা যায়। এই সামান্য কাজটি প্রতিবছর লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ রক্ষা করছে। এটা বুঝতে আমাদের কোনো কষ্ট হয় না। অথচ এই সেদিন, উনিশ শতকে বিজ্ঞানীরা আবিষ্কার করেছিলেন যে সাবান দিয়ে হাত ধোয়ার গুরুত্ব কতখানি। আগে ডাক্তাররাও একজন রুগিকে অপারেশন করে হাত না ধুয়েই আরেকজন রুগির অপারেশন করতেন। কিন্তু আজ প্রতিদিন কোটি কোটি মানুষ হাত ধোয়। তারা সাবান পুলিশের ভয়ে যে এটা করছেন তা নয়। তারা বুঝে গেছেন যে আসল ঘটনাটা কি। আমি আমার হাত ধুই কারণ আমি ভাইরাস ও ব্যাকটেরিয়ার কথা শুনেছি, আমি বুঝি যে এই ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র জীবাণুগুলি রোগের উৎসবিশেষ, আর আমি এটাও জানি যে, সাবান এদের নির্মূল করার ক্ষমতা রাখে। কিন্তু এই পর্যায়ে আসতে প্রয়োজন হবে সহযোগিতা, আস্থা আর বিশ্বাসের। সাধারণ মানুষকে বিজ্ঞানকে বিশ্বাস করতে হবে, যেসব সরকারি সংস্থা সেবা দেয়, তাদেরকে বিশ্বাস করতে হবে। বিশ্বাস করতে হবে গণমাধ্যমকেও। এখন অবিবেচক রাজনৈতিক নেতারা স্বৈরাচারী ব্যবস্থার কথা বলতে পারেন। বলতে পারেন, জনগণের ওপর তাদের আস্থা নেই, জনগণকে তারা বিশ্বাস করে না।
সাধারণত, আস্থার বিষয়টি যদি চলে যায় তাহলে রাতারাতি এই আস্থা ফিরিয়ে আনা যাবে না। কিন্তু এখনকার এই সময়টি স্বাভাবিক কোনো সময় নয়। সংকটের এই মুহূর্তে মন দ্রুত বদলে যেতে পারে। আপনি আপনার ভাই-বোনদের সঙ্গে নানা বিষয়ে বছরের পর বছর ধরে তর্ক-বিতর্ক করতে পারেন, কিন্তু যখনই জরুরি কোনো অবস্থার সৃষ্টি হবে, আপনি বুঝতে পারবে কোথায় যেন কোনো কোনো বিষয়ে আপনাদের মধ্যে অন্তর্গত মিল আছে। তখন পরস্পরের প্রতি সহানুভূতিও অনুভব করবেন আপনি। একজন আরেকজনকে সাহায্য করবেন। সময় এখনও ফুরিয়ে যায়নি, পর্যবেক্ষণের পরিবর্তে বিজ্ঞান, সরকারি সেবামূলক প্রতিষ্ঠান আর মিডিয়ার প্রতি মানুষের আস্থা বাড়াতে হবে। আমাদের অবশ্যই প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে, কিন্তু সেটা করতে হবে মানুষকে ক্ষমতায়িত করার জন্য। আমি আমার শরীরের তাপমাত্রা এবং ব্লাডপ্রেসার পরিমাপের জন্য পর্য়বেক্ষণের পক্ষে, কিন্তু সেই তথ্য একটা স্বৈরসরকারের জন্ম দেবে সেরকম কাজে ব্যবহৃত হোক, সেটা আমি চাই না। বরং আমি চাইবো এই তথ্য আমাকে আমার কী করণীয় সেটা বেছে নেয়ার আরও পথ উন্মুক্ত করে দিক, সরকারকে আরও জবাবদিহির আওতায় নিয়ে আসুক।
যদি আমি আমার শরীরে কী ঘটছে ২৪ ঘণ্টা ধরে অনুসরণ করতে পারি, তাহলে নিজে অন্যদের কতটা স্বাস্থ্যঝুঁকির মধ্যে ফেলছি সেটাই শুধু জানবো না, বরং কোন অভ্যাসগুলি আমার শরীরের জন্য ভালো সেটাও জানতে পারবো। আমি যদি করোনা ভাইরাস কীভাবে ছড়াচ্ছে সে সম্পর্কে নির্ভরযোগ্য তথ্য পাই, তাহলে সেসব তথ্য বিশ্লেষণ করে আমি বুঝতে পারবো সরকার সত্যি কথা বলছে কিনা, মহামারি ঠেকানোর সঠিক নীতিমালা গ্রহণ করছে কিনা। মনে রাখতে হবে, লোকে যখন পর্যবেক্ষণের কথা বলবে তখন সেই একই প্রযুক্তি শুধু ব্যক্তিকে পর্যবেক্ষণের জন্য সরকার ব্যবহার করবে তা কিন্তু নয়, ব্যক্তিও সরকারকে পর্যবেক্ষণ করার জন্য ব্যবহার করবে।
করোনা ভাইরাসের মহামারির মধ্য দিয়ে তাই নাগরিকতার আসল পরীক্ষা হয়ে যাচ্ছে। সামনের দিনগুলোতে আমাদের প্রত্যেককেই বিজ্ঞান-নির্ভর তথ্য-উপাত্ত এবং স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের বিশ্বাস করতে হবে। অদৃশ্য ষড়যন্ত্রতত্ত্ব এবং আত্মসেবী রাজনীতিবিদদের ওপর আস্থা রাখলে হবে না। আমরা যদি সঠিক বিষয়গুলো বুঝে উঠতে ব্যর্থ হই, আমরা আমাদের অর্জিত মূল্যবান স্বাধীনতার কাছ থেকে দূরে সরে যাবো। অথচ এই স্বাধীনতাই হচ্ছে আমাদের স্বাস্থ্যরক্ষার রক্ষাকবচ।
আমাদের দরকার বৈশ্বিক পরিকল্পনা
দ্বিতীয় যে দিকটির মুখোমুখি এখন আমরা, সেটা হলো রাষ্ট্রীয় বিচ্ছিন্নতা এবং বৈশ্বিক সংহতির। মহামারি আর এর ফলে সৃষ্ট অর্থনৈতিক সংকট দুটাই বৈশ্বিক সমস্যা। এই সমস্যা দুটির কার্যকর সমাধান সম্ভব হবে যদি বৈশ্বিক সহযোগিতার ভিত্তিতে তা সমাধান করা হয়।

আমরা যদি অনৈক্যের পথ বেছে নিই, তাহলে এই সংকট শুধু দীর্ঘায়িত হবে না, ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় নেমে আসবে। আর আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতি আর ঐক্যের পথ বেছে নিই, তাহলে তা শুধু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের জয় হবে না, ভবিষ্যতের সবধরনের মহামারি আর সংকটের বিরুদ্ধে জয় বলে বিবেচিত হবে। এটাই তো হওয়া উচিত একুশ শতকের মানবজাতির প্রধান লক্ষ্য।

প্রথম এবং আবশ্যিক কাজটা হচ্ছে, ভাইরাসের মোকাবিলা করতে হলে বৈশ্বিকভাবে তথ্য আদানপ্রদান করতে হবে। ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াই করার এটাই হচ্ছে সবচেয়ে বড় মানবিক সুবিধা। চীনের একটা করোনা ভাইরাস এবং আমেরিকার একটা করোনা ভাইরাসের দ্বারা মানুষ কীভাবে আক্রান্ত হলো সেই তথ্য আদানপ্রদান করবে না। বরং চীন আমেরিকাকে মূল্যবান কিছু পরামর্শ দিয়ে শেখাতে পারে করোনা ভাইরাস কী এবং কীভাবে এর মোকাবেলা করতে হবে। ইতালির একজন ডাক্তার মিলানে খুব ভোরে যেটা আবিষ্কার করেছে, তাই সন্ধ্যায় তেহরানে অনেকের জীবন রক্ষা করতে পারে। যুক্তরাজ্য সরকার যদি কোনো নীতিনির্ধারণ করতে গিয়ে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে, তাহলে কী করতে হবে কোরিয়া সে ব্যাপারে যুক্তরাজ্যকে পরামর্শ দিতে পারে, যে কোরিয়া কি না একমাস আগেই এরকম সমস্যার মুখোমুখি হয়েছিল। কিন্তু এই স্পিরিটটার জন্য দরকার বৈশ্বিক সহযোগিতা আর আস্থার মধ্য দিয়ে কাজ করা।
সামনে যে দিনগুলি আসছে, আমাদের প্রত্যেকেরই তখন রাজনীতিবিদদের ষড়যন্ত্র-তত্ত্ব অগ্রাহ্য করে বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্ত আর স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের ওপর আস্থা রাখতে হবে।
দেশগুলির দরকার হবে স্বেচ্ছায় ও মুক্তভাবে তথ্য আদানপ্রদান করা আর বিনীতভাবে অন্য অভিজ্ঞ দেশের পরামর্শ চাওয়া। সেই সঙ্গে যে তথ্য-উপাত্ত আর নির্দেশনা পাওয়া যাবে, সে-সব বিশ্বাস করতে হবে। বৈশ্বিকভাবে চিকিৎসা উপকরণ তৈরির ব্যাপারেও ঝাঁপিয়ে পড়তে হবে এবং অন্যদের সেগুলি দিতে হবে। বিশেষ করে টেস্টিং কিট এবং শ্বাসপ্রশ্বাস সহজতর করার যন্ত্র নিজেদের জন্য এবং অন্যদের জন্য তৈরি করতে হবে। প্রত্যেকটি দেশ স্থানীয়ভাবে এসব তৈরি আর মজুদ না করে বৈশ্বিকভাবে পরিকল্পিত ও সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ করলে উৎপাদন বাড়বে। জীবন রক্ষাকারী যন্ত্রপাতিগুলোকে সততার সঙ্গে যাদের প্রয়োজন তাদের দিতে হবে। যুদ্ধের সময় যেমনটা হয়, শিল্পকারখানাকে জাতীয়করণ করা হয়, ঠিক তেমনিভাবে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি এবং এসবের উৎপাদন ব্যবস্থাকে “মানবিক” করতে হবে। কোনো ধনী দেশ, যে দেশে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রুগির সংখ্যা কম, তারা হয়তো দরিদ্র দেশগুলোকে নানা ধরনের যন্ত্রপাতি দিয়ে সহায়তা করবে। কিন্তু যদি পরস্পরের মধ্যে আস্থার সম্পর্ক থাকে তাহলে অন্যদেশগুলোও সাহায্যে এগিয়ে আসবে।
বিশ্বব্যাপী করোনা প্রতিরোধের জন্য আমরা বিশ্বের জন্য একটা ‘মেডিক্যাল পুল’-ও গঠন করতে পারি। যে সমস্ত দেশ কম আক্রান্ত, সেইসব দেশ জরুরি প্রয়োজনে পৃথিবীর বহুল আক্রান্ত দেশগুলোতে ডাক্তার-নার্স পাঠাতে পারে। পরস্পরের মধ্যে শেয়ার করতে পারে গুরুত্বপূর্ণ মূল্যবান অভিজ্ঞতা। এখন যেখানে মহামারি লেগে আছে, উল্টো দিকে যখন সেটা ঘুরে যাবে, তখন তারা তাদের সাহায্য করতে পারে।
অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেও বৈশ্বিক সহযোগিতার বিষয়টি অত্যন্ত জরুরি। বিশ্ব-অর্থনীতির বৈশিষ্ট্য আর সরবরাহের ধারা অনুসারে যদি প্রতিটি সরকার অন্যদের অগ্রাহ্য করে শুধু নিজের কথা ভেবে সবকিছু করে, তাহলে নৈরাজ্য তৈরি হবে আর সংকট আরও ঘনীভূত হবে। আমাদের দরকার বৈশ্বিক পরিকল্পনা, আর সেই পরিকল্পনাটা করতে হবে খুব দ্রুত।
আরেকটা দিকের ওপর নজর দিতে হবে। সেটা হলো ভ্রমণের বিষয়ে বৈশ্বিক ঐকমত্যে আসতে হবে। মাসের পর মাস যদি আন্তর্জাতিক ভ্রমণ নিষিদ্ধ থাকে, তাহলে অনেককেই দুঃসহ কষ্টের মধ্যে পড়তে হবে। এতে করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধটাও বাধাগ্রস্ত হবে। যাদের ভ্রমণ করাটা খুবই দরকার, সীমান্ত অতিক্রম করা জরুরি- বিজ্ঞানী, ডাক্তার, সাংবাদিক, রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী- তাদের সীমিত আকারে হলেও পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে ভ্রমণ করতে দিতে হবে। নিজ নিজ দেশের প্রয়োজন যাচাই করে বৈশ্বিকভাবেই পৃথিবীর দেশগুলোকে এ ব্যাপারে ঐকমত্যে পৌঁছুতে হবে। যদি দেশগুলোর জানা থাকে যে ভাবনাচিন্তা করে সতর্ক হয়েই সবাইকে ভ্রমণের অনুমতি দেয়া হচ্ছে, তাহলে কোনো দেশই এই ধরনের মানুষকে ভ্রমণ করতে দিতে আপত্তি করবে না।
দুঃখজনক হলো বর্তমানে কোনো দেশই এই কাজটি করছে না। সম্মিলিত নিষ্ক্রিয় পরিস্থিতি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের গলায় ফাঁস হয়ে আছে। দূরদর্শী বয়স্ক কোনো মানুষ নেই। সংকট শুরুর পর এরই মধ্যে বিশ্ব নেতৃত্বের উচিত ছিল সম্মিলিত কর্মপরিকল্পনা নিয়ে জরুরি সভায় মিলিত হওয়া। জি-৭-এর নেতারা একটা ভিডিও কনফারেন্সে মিলিত হয়েছিলেন, কিন্তু তারা এই ধরনের কোনো পরিকল্পনা দিতে পারেননি।
আগের বৈশ্বিক সংকটের সময়ে- যেমন ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক সংকটের সময় এবং ২০১৪ সালের ইবোলা মহামারির সময়- মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নেতৃত্বের ভূমিকা পালন করেছিল। কিন্তু বর্তমান মার্কিন প্রশাসন এই নেতৃত্ব ত্যাগ করেছে। তারা পরিস্কার বুঝিয়ে দিচ্ছে যে আমেরিকার মহান ভাবমূর্তিকে তারা থোরাই কেয়ার করে। ভবিষ্যতের মানবতা নিয়েও তাদের মাথাব্যথা নাই।
মার্কিন প্রশাসন তার ঘনিষ্ঠতম মি্ত্রদেরও ত্যাগ করেছে। আমেরিকা যখন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ভ্রমণ করা নিষিদ্ধ করলো, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোকে সে আগে এটা জানায়ওনি। ভাবটা এমন যে ইউরোপীয় ইউনিয়ন তাদের নিজেদের ভাবনা নিজেরাই ভাবুক, যা করার তারাই করুক। সংকটকে আমেরিকা আরও কলঙ্কিত করে যখন একটা জার্মান ওষুধ কোম্পানিকে কোভিদ-১৯ ভাইরাসের একচেটিয়া স্বত্ব পাওয়ার জন্য দশ লাখ ডলার দেয়ার প্রস্তাব দেয়। আমেরিকার বর্তমান প্রশাসন যদি তার নীতি বদলায় আর বৈশ্বিক পরিকল্পনা নিয়ে এগিয়ে আসে, তারপরও খুব কম দেশই তাতে সারা দেবে। কারণ, যে নেতা দায়িত্ব নেয় না, ভুল স্বীকার করে না, আর যে অব্যাহতভাবে ভালো কাজের সমস্ত গৌরব আত্মসাৎ করে আর অন্যদের অভিযুক্ত করে, তার নেতৃত্ব অন্যেরা মেনে নেবে কেন।
তবে এই মার্কিন শূন্যতা যদি অন্য দেশগুলো পূরণ করতে না পারে, এই মহামারি বন্ধ করাটা অনেক কঠিন হয়ে উঠবে। এর জের হিসেবে বছরের পর বছর ধরে আসন্ন আন্তর্জাতিক সম্পর্কগুলো বিষময় হতে থাকবে। আসলে, প্রতিটি সংকট একধরনের সুযোগও। আমরা আশা করবো, বর্তমানে যে মহামারি চলছে, সেই মহামারি মানবজাতিকে বিশ্বে যে অনৈক্যের সৃষ্টি হয়েছে তা বুঝতে সাহায্য করবে।
মানবতাকে এখন কী করণীয় সেটা নির্ধারণ করতে হবে। আমরা কি অনৈক্যের পথে ধাবিত হবো, নাকি বৈশ্বিক সংহতির পথ বেছে নেবো? আমরা যদি অনৈক্যের পথ বেছে নিই, তাহলে এই সংকট শুধু দীর্ঘায়িত হবে না, ভবিষ্যতে আরও বড় বিপর্যয় নেমে আসবে। আর আমরা যদি বৈশ্বিক সংহতি আর ঐক্যের পথ বেছে নিই, তাহলে তা শুধু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধে আমাদের জয় হবে না, ভবিষ্যতের সবধরনের মহামারি আর সংকটের বিরুদ্ধে জয় বলে বিবেচিত হবে। এটাই তো হওয়া উচিত একুশ শতকের মানবজাতির প্রধান লক্ষ্য।