ইমতিয়ার শামীম >> তাঁর কোনও তাড়া ছিল না >> প্রবন্ধ/স্মরণ

0
1710

তাঁর কোনও তাড়া ছিল না

‘দেবেশ রায়ের গল্প’ বই দিয়ে যাত্রা শুরু করার পর কখনো ‘বৃত্তান্ত, কখনো ‘আখ্যান’কখনোবা ‘প্রতিবেদন’নামে যা যা তিনি লিখে গেছেন, তা নিছক বৃত্তান্ত, আখ্যান বা প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিন্তু তিনি যে নিজের উপন্যাসকে বৃত্তান্ত, আখ্যান বা প্রতিবেদনের মতো সহজ প্রত্যয়ে চিহ্নিত করতে পারতেন, তা কেবল লেখকের সাহসিকতা নয়, তার একটি ভূমিজ বা অন্তর্গত বিষয়ও আছে, তাতে একটি প্রত্যাখ্যানের বিষয়ও আছে।

কোনো দিনই কোনো কিছুই হয়ে ওঠার তাড়া ছিল না দেবেশ রায়ের; জলপাইগুড়িতে আনন্দচন্দ্র কলেজের ছাদের ওপর বন্ধুদের সঙ্গে ত্রিপলের দড়ি টানাটানি করার সময় তার হাতে এসে পৌঁছেছিল সাগরময় ঘোষের লেখা পোস্টকার্ড – ‘দেশ’ পত্রিকার আগামী সংখ্যায় তার লেখা গল্প ছাপা হবে। তখন তার বয়স ১৯, তৃতীয় বর্ষের ছাত্র, ১৯৫৫ সাল; ভীষণভাবে জড়িয়ে আছেন রাজনীতির সঙ্গে। এর দেড়যুগেরও বেশি সময় বাদে, ১৯৬৯ সালে ছাপা হলো তার লেখা প্রথম বই –‘দেবেশ রায়ের গল্প। তারপরও অনেক অনেক বছর এই একটামাত্র বই-ই ছিল দেবেশের। তাড়া ছিল না, দিনের পর দিন ধরে, বছরের পর বছর ধরে দেবেশ রায় নির্মাণ করেছেন নিজেকে, নির্মাণ করেছেন আমাদের, নির্মাণ করেছেন বাংলা সাহিত্য। তবু তার চলে যাওয়ার শব্দ বড় সশব্দই লাগে, বড় বেদনা হয়েই বাজে; তবু তার চলে যাওয়ার বার্তা শুনে মনে হয় আমাদের, কীসের এত তাড়া ছিল আপনার?
গল্প দিয়ে শুরু করেছিলেন, গল্পে অনন্য একটা অবস্থানও করে নিয়েছেন, কিন্তু তারপরও দেবেশ রায়ের বৈভব বোধ করি উপন্যাসে এবং বাংলা উপন্যাসের শিল্পতত্ত¡ সংক্রান্ত জিজ্ঞাসায়। তিনি উপন্যাসের ইতিহাস ও শিল্পতত্ত্বের অনুসন্ধান করেছেন, বিশ্লেষণ ও মূল্যায়ন করেছেন, তার নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গিকে তিনি এত স্বচ্ছভাবে উপস্থাপন করেছেন যে অন্তর্নিহিত জটিলতাও সহজবোধ্য হয়ে উঠেছে আমাদের কাছে। সাহিত্যরূপের নির্দিষ্টতা স্থির কি না, জিজ্ঞাস্য ছিল তার; তাতে তার পক্ষ থেকে এমন উপসংহারও উপস্থাপন করা হয়েছিল, ‘সাহিত্য রূপের নির্দিষ্টতা স্থির না হলে সাহিত্য চর্চা ব্যাহত হয়’ (উপন্যাস নিয়ে, পৃষ্ঠা ১৭০) – কিন্তু সেই উপসংহারকে দেখা যায় তিনি নিজেই ভেঙেছেন কিংবা অতিক্রম করেছেন, কী এক অভিজ্ঞান থেকে তার মনে ফের সংশয় জেগেছে এবং তিনি সংশয়াচ্ছন্ন হয়েছেন আঙ্গিকের অতিনির্দিষ্টতা এবং তেমন আঙ্গিকের পিছু পিছু চলা কাহিনী-গদ্য বা উপন্যাসপাঠের বাধ্যতা নিয়ে। আবার তার এই উপন্যাসের শিল্পতত্ত্ব-চিন্তার ইতিহাস বিশ্লেষণের মার্কসবাদী পদ্ধতির ছায়াও পড়তে দেখি। যখন তিনি বলেন, ‘‘কোনো-কোনো সময় এমন আসে শিল্প-সাহিত্যের একেকটি ফর্মে, যখন সেই ফর্ম শতবাহু বিস্তার করে তার সময়কে গ্রহণ করে। আবার কোনো-কোনো সময় এমনও আসে শিল্প-সাহিত্যের একেকটি ফর্মে, যখন সেই ফর্ম তার দুটিমাত্র হাতকেও গুটিয়ে ফেলে তার সময়কে প্রত্যাখ্যান করে। মহত্তর নৈতিকতার গর্ভ ছাড়া শিল্প-সাহিত্যের কোনো ফর্মেরই কোনো জন্মস্থান নেই।” (উপন্যাস নিয়ে, পৃষ্ঠা ৮৬)। তখন হঠাৎ করেই মনে হয় ‘অ্যান্টি-ডুরিংয়ের কথা।
প্রথম গল্প যখন লিখছেন তখন তো বটেই, বছর পনের বাদে যখন তার প্রথম গল্পগ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে, তখনও দেবেশ রায় রাজনীতির মাঠে। শিক্ষকতা করছেন বটে, কিন্তু একই সঙ্গে যুক্তফ্রন্টও করছেন। রাজনীতি তার লেখালেখির ওপর কী ভীষণ প্রভাব বিস্তার করে আছে এবং সেই কী ভীষণ প্রভাবকে তিনি কীভাবে বড় বেশি অন্তর্গত করে ফেলতে সক্ষম হয়েছেন, তা আমরা উপলব্ধি করতে পারি ‘গল্পসমগ্রে’র ভূমিকায় দেয়া তারই ভাষ্য থেকে। তিনি বলেন, ‘‘…জলপাইগুড়ির গ্রাম, তার রাজবংশী মানুষজন, সেই মানুষজনে বিবৃত প্রকৃতি, রাজবংশী বাচন, তিস্তা নদী, চা বাগানের শ্রমিক, ডুয়ার্স, ফরেস্টের লোকজন, ফরেস্টের গাছপালা-জঙ্গল-পশুপাখির এক ভুবনে আমার অধিকার কায়েম হতে শুরু করল, দিনের পর দিন ধরে, বছরের পর বছর ধরে। রাজনীতির অজস্র দৈনন্দিন কাজের আষ্টেপৃষ্ঠে লিপ্ততা ছাড়া এ অধিকার আয়ত্ত করা অসম্ভব ছিল কারণ এ কোনো ভ্রমণের অধিকার নয়, এ কোনো দর্শন-শ্রবণের অধিকার নয়, এ এক জনপদের প্রতিদিনের জীবনযাপনের সঙ্গে লেপ্টে যাওয়া, সেই জীবনযাপনের ইতিহাস-ভূগোলের সঙ্গে সেঁটে থাকা। আমার আর কোনো উদ্ধার ছিল না। বা, সেই ছিল আমার একমাত্র উদ্ধার। …বছরের পর বছরের অজস্র গ্রন্থিতে এমন এক বিদ্যুৎ-সংবহন ব্যবস্থার ভিতরে আমি নিজেকে জড়িয়ে ফেলেছি যার বাইরে আমার কোনো প্রজ্জ্বলন নেই, কোনো শিহরণ নেই। আবার অন্যদিকে, জলপাইগুড়ির কোনো লোকজীবনই যেন এখনো আমার গল্প-উপন্যাসের পরীক্ষাভূমি – তা সে ঘটনা বা চরিত্র ভারতবর্ষের যে অঞ্চলেরই হোক না কেন।”
৮৪ বছরের ক্ষণজন্মা দেবেশ রায় (১৯৩৬-২০২০) তার অফুরন্ত সৃজনশক্তিতে একের পর এক উপন্যাস, গল্প, প্রবন্ধ লিখে গেছেন; অবয়ব কিংবা বিপুলতার দিক থেকে যার মিল রয়েছে কেবল অমিয়ভূষণ মজুমদারের সঙ্গে। যদিও রাজনীতি, আদর্শ ও নৈতিকতার অন্বেষণের পথপরিক্রমায় তাদের অমিলও প্রচুর। সেটি অবশ্য এই মুহূর্তে বা এই এ লেখার বিষয় নয়। এটি শুধু মনে করা এ কারণেই যে, দেবেশ রায়ও অমিয়ভূষণের মতো পাবনার সন্তান আর জলপাইগুড়ির অভিজ্ঞতা সম্পন্ন। এইসব ভূমি, জনপদ ও মানুষ তাদের যে অমিত প্রতিভা দিয়েছিল, তার সদ্ব্যবহার করেছেন তারা। সমৃদ্ধ হয়েছে বাংলা সাহিত্য। ‘দেবেশ রায়ের গল্প’ বই দিয়ে যাত্রা শুরু করার পর কখনো ‘বৃত্তান্ত, কখনো ‘আখ্যান’কখনোবা ‘প্রতিবেদন’নামে যা যা তিনি লিখে গেছেন, তা নিছক বৃত্তান্ত, আখ্যান বা প্রতিবেদনে সীমাবদ্ধ থাকেনি। কিন্তু তিনি যে নিজের উপন্যাসকে বৃত্তান্ত, আখ্যান বা প্রতিবেদনের মতো সহজ প্রত্যয়ে চিহ্নিত করতে পারতেন, তা কেবল লেখকের সাহসিকতা নয়, তার একটি ভূমিজ বা অন্তর্গত বিষয়ও আছে, তাতে একটি প্রত্যাখ্যানের বিষয়ও আছে। বাংলা গল্প-উপন্যাস থেকে বাঙালির লোকজীবন সরে গেছে বা যাচ্ছে বলে তাঁর যে অভিযোগ ছিল, ‘লোকবচনের রহস্যময়তা অথচ স্পষ্টতা, লোককৌতূকের প্রবল পৌরুষ, পৌরাণিককে ভেঙে ফেলার অদম্য লোকায়ত সাহস আর কাহিনীকারের নিজস্ব বিবরণের স্পষ্টতা’ বাঙালির ভাষা থেকে সরে যাচ্ছে বলে তাঁর যে অভিযোগ ছিল, তিনি যেন সেই অভিযোগকে সুস্পষ্ট করে তুলতে আর চলমান করে রাখতেই বার বার ফিরে গেছেন বৃত্তান্তের কাছে, আখ্যানের কাছে, প্রতিবেদনের কাছে। পাশাপাশি তিনি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে আমাদেরই ‘দুর্বোধ্য ভাষা’ দিয়ে আমাদের সঙ্গে পরিচয় ঘটিয়েছে এমন সব মানুষদের যারা প্রত্যাখ্যানের ভাষা জানা না থাকার পরও অবিরাম প্রত্যাখ্যানের কাব্য রচনা করে চলেছেন। সত্যি কথা বলতে গেলে, দেবেশের উপন্যাসগুলোর কেন্দ্রীয় চরিত্রই এমন, – ‘আধুনিক উন্নয়নের’ যাবতীয় প্রক্রিয়াকে চার হাত-পায়ে প্রত্যাখ্যান করে চলে সে। লেখক ও পাঠকের সম্মিলিত অভিজ্ঞতা নিয়ে এই চরিত্রের মুখোমুখি হন তিনি নিজেও।
যে কারণে দেবেশ রায় সবচেয়ে বেশি আলোচিত ও নন্দিত, তা বোধকরি এই যে, বাংলা উপন্যাসে বঙ্কিমচন্দ্র প্রথম আধুনিক পুরুষ আর কাব্যে মাইকেল মধুসূদন দত্ত – এই ধারণাকে তিনি প্রত্যাখ্যান করেন। একটি শক্ত ভিত্তির ওপর তিনি দাঁড় করান তার নিজের এই অভিমতকে, বিবরণধর্মী গদ্যাখ্যান প্যারিচাঁদ মিত্র ওরফে টেকচাঁদ ঠাকুরের ‘আলালের ঘরের দুলাল’ এবং কালিপ্রসন্ন সিংহের ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’ই শুরুর বিন্দু বাংলা আধুনিক উপন্যাসের। কেবল ‘উপন্যাস নিয়ে’ (১৯৯১), ‘উপন্যাসের নতুন ধরণের খোঁজে’ (১৯) এবং ‘উপন্যাসের বিবিধ সংকট’ (২০১৮) ইত্যাদি গ্রন্থেই নয়, ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা বিভিন্ন লেখাতেও প্রসঙ্গ থেকে প্রসঙ্গান্তরে যাত্রার মধ্যে দিয়ে দেবেশ তার এই ধারণাকে প্রতিষ্ঠিত করে গেছেন। আমরা দেখেছি উপনিবেশবাদের ইতিহাস কী করে বার বার বাংলা উপন্যাসের নির্মাণ ও পাঠকে বিঘ্নিত করেছে। তিনি দেখিয়েছেন, পাশ্চাত্য উপন্যাসের স্থিরিকৃত ফর্ম কী করে বাংলা সাহিত্যে স্থান করে নিয়েছে এবং রুদ্ধ করেছে ‘আলালের ঘরের দুলাল’ বা ‘হুতোম প্যাঁচার নকশা’র জীবনযাত্রা ও ভাষাকে। এবং এই প্রক্রিয়ায় আমাদের মঙ্গলকাব্যে, চৈতন্যজীবনীতে ও চৈতন্যপরবর্তী সময়ে পালাগানে কাহিনী বলার যেসব ধরণ ছিল তা থেকে ক্রমান্বয়ে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছে বাংলা উপন্যাসের ফরম।
এমন প্রেক্ষাপটে দেবেশ রায়ের কথাসাহিত্যের জন্যে অনিবার্য হয়ে ওঠে বিকল্প পথ। তিনি নিজে যেমনটি ভাবতেন, ‘ব্যক্তির ইতিহাস মানে ব্যক্তির জীবনী নয়। সেই জীবন যে-ইতিহাসের অংশ সেই ইতিহাসে সেই ব্যক্তিকে উপস্থাপন করাই উপন্যাসের কাজ’, – তেমন করে বিশ্বস্ততার সঙ্গে নিজের উপন্যাসকে নির্মাণ করেছেন তিনি। শুরুতেই বলেছি আর তিনি নিজেও বলেছেন, কোনো কিছুর জন্য তাঁর কোনো তাড়া ছিল না; তিনি ধীরে ধীরে এই ভূখণ্ডে এই বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের শান্তিকল্যাণ হয়ে উঠেছেন, হয়ে রইবেন শান্তিকল্যাণ।