ইলিয়াছ কামাল রিসাত> একবিংশ শতাব্দীর ক্রুসেড >> ব্রাইটনের ব্রিটেনে >>> ভ্রমণগাথা

0
194
পর্ব ৮

যাবার সময় একটা চমকপ্রদ তথ্য তিনি দিয়েছিলেন। তার এক ধর্মগুরু আছেন যিনি তাকে বলেছেন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নাকি এই শতাব্দীর ক্রুসেড।

নির্বাচন কমিশনের সাড়ে তিন বছর চাকরির পর পিএইচডির যে সোনার হরিণের মতো সুযোগ পেলাম তাই সিদ্ধি করতে এসেছি ইংল্যান্ডে। আমলাতন্ত্রে মোটামুটি বেশ অভ্যস্ত হয়ে গিয়েছিলাম। আমলাতন্ত্র একটা ধোঁয়াশার মতো আমার কাছে, এখনো। একটা কাজ সমাধা করার জন্য এত স্তরবিন্যাস, এত প্রক্রিয়া, এত চেক অ্যান্ড ব্যালান্স- কাজটা যে কোন টেবিল থেকে মূলত হয়, তা মাঝে মাঝে আসনে সুস্থিত কর্মচারীরও ধাঁধা লেগে যায়।
তবে আমার সবচেয়ে ভাল লাগত, সেবাগ্রহীতাদের সাথে কথা বলতে। যেমন- নির্বাচন কর্মকর্তা হিসেবে এমাদের একটা নিয়মিত কাজ হচ্ছে জাতীয় পরিচয়পত্র সংশোধন, পরিবর্তন ইত্যাদি। জাতীয় পরিচয়পত্র সর্বোচ্চ সঠিকতা যাচাই করে করা হয়, যেহেতু কোন নাগরিকের প্রকৃত তথ্যাবলি এতেই সংরক্ষিত থাকে। এর অপব্যবহারও আছে প্রচুর। দেখা যাচ্ছে, কোনো সম্পদ বাগিয়ে নেয়ার জন্য কেউ ঠিকানা পরিবর্তন করছে, জাল কাগজপত্র দেখিয়ে বাবা-মা’র নাম পালটে নিচ্ছে, বয়স কমাচ্ছে-বাড়াচ্ছে, নিজের কিছু স্বার্থসিদ্ধির জন্য।
এইসব কারণেই নির্বাচন কর্মকর্তাকে যাচাই করতে হয় সবকিছু বেশ সতর্কতার সাথে। ব্যক্তিগতভাবে যারাই আসত তাদের কারণ জানতে চেয়ে গল্প জুড়ে দিতাম। এতে করে আমার নিজের সুবিধা হত নানা দিক দিয়ে। এক- বেশ কিছুক্ষণ সময় নিয়ে কথা বললে অবচেতনে নানা তথ্য শেয়ার করে ফেলতেন সেবাগ্রহীতারা। এতে করে আমার তদন্তে সুবিধা হত। দুই- যেহেতু সাহিত্যের প্রতি ঝোঁক আছে তাই এক-এক মানুষের জগতে তাদের বয়ানে প্রবেশ করে নতুন নতুন জগত খুঁজে পেতাম। এ ছিল আমার পরম পাওয়া। এরকম অজস্র গল্পের সন্ধান পেয়েছিলাম। তেমনি একটা গল্প এরকম :
এক বৃদ্ধ এলেন একদিন। নাম পরিবর্তন করবেন এই শেষ বয়সে। ৬৪-৬৫ হবে বয়স। সরকারি চাকুরি থেকে রিটায়ার করেছেন বছর কয়েক আগে। পুরো নাম না বলে জাতি টাইটেল উল্লেখ করছি। নাম ছিল ‘শীল’ যুক্ত। পরিবর্তন করে ‘সিংহ’ টাইটেল যুক্ত করতে চান নামের সাথে। ওনার কী কী কাগজ প্রয়োজন তা বলা শেষ করে আমার মনে খচখচ করা প্রশ্নটা করেই ফেললাম- প্রশ্নটা যত না চাকুরির কারণে তার থেকে বেশি হৃদয়ের টানেই করলাম।
এই বয়সে এসে এত আমূল পরিবর্তন কেন ঘটাতে চাচ্ছেন আপনার নামে?
এর পরে উনি যা বললেন তা আমাদের বিদ্বৎ সমাজের বেশিরভাগ মানুষই জানেন। সনাতন ধর্মের জাতিভেদ নিয়ে প্রচুর জ্ঞান লাভ করা, পিএইচডি ডিগ্রিধারী মানুষ ফেসবুকের আনাচে-কানাচে আছেন, পাড়ার অলিতে-গলিতে আছেন, আঁতেল আড্ডায় আরও বেশি আছেন। তবে এই ভদ্রলোক নিজের ব্যাখ্যায় যা বললেন তা বেশ জীবনগামী ও অভিজ্ঞতালব্ধ। তাই উনার বক্তব্যে তথ্যগত ভুল বা অন্যান্য ভুল ধরতে গিয়ে বক্তব্যের মূল কথাগুলো যেন নষ্ট না হয়, পাঠকদের কাছে সেভাবেই তুলে ধরছি।
ভদ্রলোক বলা শুরু করলেন এভাবে :
আপনি যেহেতু আন্তরিকভাবে জানতে চাইছেন তাহলে আমি একেবারে গোড়া থেকে শুরু করি। পৃথিবীর সবথেকে প্রাচীন ধর্ম আমাদের সনাতন ধর্ম, যাকে আমরা বলছি হিন্দু। প্রায় ৫৭০০ বছর আগে এই ধর্মের আবির্ভাব। পুরো পৃথিবীর সকলে এই ধর্ম পালন করত। এর মধ্যে ২০০০ বছর আগে খ্রিস্টান ধর্ম এবং এর কিছুকাল পরে ইসলামের আবির্ভাব। হিন্দু ধর্মের বিধান মতে একটা শ্রেণিবিন্যাসও তৈরি হল সমাজে। মানবদেহে মাথা, বুক, পেট, পা এই অঙ্গব্যবচ্ছেদ অনুযায়ী সমাজের নীতি নির্ধারক হবে ব্রাহ্মণরা, সমাজের প্রতিরক্ষায় নিজেদের ঢাল হিসেবে নিয়োজিত থাকবে ক্ষত্রিয়রা, ব্যবসাপাতি করবে বৈশ্যরা, আর যত সার্ভিস রিলেটেড কাজ তা করবে শূদ্ররা।
নবম শতকের দিকে সেন আমলের কালে এসে ব্রাহ্মণরা ‘কায়স্থ’ নামে একটা এলিট শ্রেণি তৈরি করল যাতে শূদ্র বাদে সবাই অন্তর্ভুক্ত হবে। সমাজের যত সার্ভিস রিলেটেড কাজ অর্থাৎ নাপিত, ধোপা, জেলে, ময়লা পরিষ্কার করা এদের কাছ থেকে নিজেদেরকে আলাদা মর্যাদা দিতেই এই ‘কায়স্থের’ উদ্ভব। এর মধ্যে দিল্লিতে মুসলমানদের আক্রমণ সারা ভারতবর্ষে আলোড়ন তৈরি করল। যে শূদ্র শ্রেণির কথা বলছি তাদের মধ্যে একটা প্রবণতা তৈরি হল মুসলমান বা বৌদ্ধ ধর্মে শিফট করার। নিজের ধর্মের বাইরে যাবার এই প্রবণতা খেয়াল করে সেই এলিট ‘কায়স্থ’ শ্রেণি শূদ্রদেরকে নানাভাবে দমন করার চেষ্টা করল, এমনকি সামাজিকভাবে আরও হেয় করা শুরু করল।

সেই যে তাদের টাইটেলে অপমান যুক্ত হল তা আজও ঘোচেনি। এখনো বিয়ে, ব্যবসা, নানা সামাজিক কাজকর্মে আমাদের টাইটেল শোনার পরে উচ্চবর্ণের লোকেরা হেয় প্রতিপন্ন করে। এই অপমান ঘোচাতে আমি নাম পরিবর্তন করব।

তৎকালীন পেশাগুলোর নামের মূল অর্থ পালটে অপমানজনক অর্থ তৈরি করল। যেমন ‘শীল’ নামের মূল অর্থ ছিল যার চরিত্র সুন্দর, ব্যবহার ভাল। সেই নাম পালটে কায়স্থরা তাদের বলতে লাগল ‘মানবদেহের ময়লা পরিষ্কারক’ বলে। এভাবে ‘দাস’, ‘নাথ’, ধোপী, নানা টাইটেলের অপমানজনক অর্থ তৈরি করতে লাগল সো কল্ড উঁচুশ্রেণি।
সেই যে তাদের টাইটেলে অপমান যুক্ত হল তা আজও ঘোচেনি। এখনো বিয়ে, ব্যবসা, নানা সামাজিক কাজকর্মে আমাদের টাইটেল শোনার পরে উচ্চবর্ণের লোকেরা হেয় প্রতিপন্ন করে। এই অপমান ঘোচাতে আমি নাম পরিবর্তন করব।
– সবই বুঝলাম, কিন্তু এই বয়সে নাম পরিবর্তন করে আপনার কি ফায়দা হবে?
– সহজ ব্যাপার। আমার প্রজন্ম সেই কলঙ্ক থেকে মুক্ত হবে।
বিশ্ব হিন্দু কমিউনিটি নিয়ে ভদ্রলোকের অনেক কাজকর্ম এলাকায়। এছাড়া এই সমিতি, সেই সমিতি করেন। হিন্দু ধর্মের অভ্যন্তরীণ অসমতা নিরসনে তিনি নিরলস কর্মীদের একজন। আমি আরেকটু গভীরে যেতে চাইলাম। তাকে বললাম- ‘নাম পরিবর্তন করলে আপনার যে বিশুদ্ধতা, তা কি নষ্ট হবেনা?
উত্তরে বললেন- আমাদের যা যাবার তা চলে গেছে। এখন এই সমাজে মান-সম্মান নিয়ে বেঁচে থাকতে চাই।
ধর্মশাস্ত্র নিয়ে ভদ্রলোকের নিজের বয়ান বেশ ইন্টারেস্টিং। যাবার সময় একটা চমকপ্রদ তথ্য তিনি দিয়েছিলেন। তার এক ধর্মগুরু আছেন যিনি তাকে বলেছেন ‘সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ’ নাকি এই শতাব্দীর ক্রুসেড।
ভদ্রলোকে কথাগুলো একটা সমাজের হয়তো সামান্য দিক, কিন্তু ব্যক্তিজীবনে ও সামাজিক জীবনে এর অভিঘাত কিন্তু কম নয়। শ্রীচৈতন্য সেটা বুঝেছিলেন। আমরা কী আজও তা বুঝতে পারি? আর ওই যে বললেন, সন্ত্রাসের কথা। এর বিরুদ্ধে ক্রুসেডই তো চলছে বলতে গেলে।
ভদ্রলোকের বয়ান আমি মাঝে মাঝে বোঝার চেষ্টা করি। শেষ কথাটা হয়তো অনেক গভীর। পাঠক, আপনারাও ভেবে দেখুন, সত্যি কতটা গভীর।
[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্ব ৭

http://www.teerandaz.com/%E0%A6%87%E0%A6%B2%E0%A6%BF%E0%A7%9F%E0%A6%BE%E0%A6%9B-%E0%A6%95%E0%A6%BE%E0%A6%AE%E0%A6%BE%E0%A6%B2-%E0%A6%B0%E0%A6%BF%E0%A6%B8%E0%A6%BE%E0%A6%A4-%E0%A6%AE%E0%A7%83%E0%A6%A4%E0%A7%8D%E0%A6%AF/