ইলিয়াছ কামাল রিসাত > কোন সিনেমাটি পাবে এবারের অস্কার? >> চলচ্চিত্র

0
317

ব্যক্তিগত বিবেচনা

আর কয়েক ঘন্টা পরেই জানা যাবে কে-কারা পেলেন এবারের অস্কার পুরস্কার। কার ভাগ্যের শিকে ছিঁড়বে এবার? ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন হলিউড’ চলচ্চিত্রটি কী সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পাবে, নাকি ‘প্যারাসাইট’? ‘১৯১৭’ শীর্ষক সিনেমাও সেরা চলচ্চিত্রের পুরস্কার পেতে পারে। ‘জো জো র‌্যাবিট’-এর সম্ভাবনার কথাও কী উড়িয়ে দেয়া যায়? পুরস্কার ঘোষণার আগেই সম্ভাব্য পুরস্কার পাওয়া নিয়ে এই লেখাটা।
এবারে যে কয়েকটা সিনেমা অস্কারের জন্য মনোনীত হল তার সব দেখা হয়েছে। তাই এই লেখা সামান্য খায়েশ থেকে লিখতে বসলাম। সিনেমা-প্রেমিক হিসেবেই লিখতে বসলাম, পাঁড় বোদ্ধা হিসেবে নয়!
খুব সাধ জাগে মনে নিজের সবচেয়ে ভাললাগা সিনেমাটা ভাল কোন স্বীকৃতি পাক। তবে সত্যি কথা বলতে কী, যে-সিনেমাই পুরস্কার পাক আমার তাতে কোন যায় আসে না। কারণ এ বছরের প্রত্যেকটা মনোনীত সিনেমাই রীতিমত মনের মতো করে উপভোগ করেছি। একটা বাদে। অথচ সেই একটা সিনেমার প্রতি আকর্ষণ ছিল সবচেয়ে বেশি। সেজন্যই মনে হয় হতাশ হয়েছি বেশি। সিনেমাটা হল- বিখ্যাত তারান্তিনোর পরিচালিত ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন হলিউড’। তারান্তিনোর সিনেমার ট্রেডমার্ক দিক : ভায়োলেন্স, ইতিহাসের ভিন্ন ন্যারেশন সবই ছিল সেই সিনেমায়, তাও আমার মন ভরেনি। আমি গল্পের সাথে একাত্ম হতে পারিনি। সিনেমাটার গল্প যে প্রকৃত ঘটনার ছায়া অবলম্বনে, সেই ঘটনার সাথে আমি পরিচিত নই। এবং সেই ঘটনা ১৯৭০-৮০ দশকের আমেরিকান সমাজে এবং হলিউডে সাড়া ফেলে দিয়েছিল। সিনেমার দর্শক হিসেবে আমাকে সব ইতিহাস জানতে হবে এমন কোথাও বলা নেই। আমি যদি সেই সিনেমার সাথে নিজেকে কানেক্ট করতে না পারি তা আর যাই হোক বৈশ্বিক আলোড়ন তুলতে পারে না। অবশ্য তারান্তিনোকে বিশেষভাবে কুর্নিশ করতে চাই এজন্য যে তিনি তার নিজের সমাজের একটা লৌকিক ঘটনাকে তার নিজস্ব স্টাইল দিয়ে এমনভাবে নির্মাণ করেছেন, পুরো যুক্তরাষ্ট্রে সেই সিনেমা দারুণ জনপ্রিয়তা পেয়েছে। কিছু লৌকিক উপাদান কখনই সবার জন্য হয় না। কিন্তু লৌকিক ভাবনাগুলোর সহজবোধ্য অনুবাদ করতে হয় দক্ষ পরিচালক কিংবা শিল্পীকে। আমি পুরো সিনেমায় অ-‘পর’ হয়েই ছিলাম। যদি আমাকে অস্কারের তালিকা থেকে কোন সিনেমা প্রথমেই বাতিল করতে বলা হয় তবে আমি এই সিনেমাকেই বাতিল করব। কিন্তু এই সিনেমা যেহেতু আমেরিকানদের দারুণভাবে ছুঁতে পেরেছেন এটা অস্কার পেয়ে গেলে মোটেও অবাক হব না।
যেহেতু লৌকিকতা ও বৈশ্বিকতার কথা তুলেই ফেললাম, চলে আসি ‘প্যারাসাইট’ সিনেমার আলাপে। এই সিনেমার আলাপ পরে তুলতে চেয়েছিলাম। কিন্তু তারান্তিনো যেখানে ব্যর্থ ঠিক সেখানেই এই সিনেমা সফল, তাই এখনি আলাপটা সেরে নিতে হচ্ছে। এই সিনেমার পরিচালক বং জুন হু এর উক্তি দিয়েই শুরু করা যাক। সম্প্রতি কোন এক পুরস্কার-অনুষ্ঠানে তিনি বলেছেন : ‘সিনেমা যেদিন এক ইঞ্চি সাবটাইটেলের প্রতিবন্ধকতা থেকে মুক্তি পাবে সেদিন সারা বিশ্বের দর্শক সব অঞ্চলের দারুণ দারুণ সব সিনেমা উপভোগ করতে পারবে।’ আসলেই তো, সারা পৃথিবীতে এত দারুণ দারুণ গল্পের সিনেমা হচ্ছে, যা শুধুমাত্র ভাষার সীমাবদ্ধতার কারণেই সবাই মজতে পারছেনা। এই সিনেমার গল্পটা এতই শক্তিশালী আর এতই বৈশ্বিক যা সকলকে ছুঁতে বাধ্য। গল্পটা দুই পরিবারের গল্প। এক গরিব আর এক ধনী পরিবারের গল্প। গরিব পরিবার নানা ছুতায় নানা কৌশলে ধনী পরিবারে চাকরি আদায় করে নেয়। এর পরে ঘটে যাওয়া নানা বিপত্তি আর আশাভঙ্গের গল্প। কথায় আছে, একটা ভাল গল্প থেকে খারাপ সিনেমা হতে পারে আবার একটা খারাপ গল্প থেকেও ভাল সিনেমা হয়ে যেতে পারে। পুরোটাই পরিচালকের মুন্সিয়ানা। এই সিনেমার সংলাপ থেকে শুরু করে সূক্ষ্ণ সংগীতের ব্যবহার, দৃশ্যের সম্পাদনা, গল্পের ওঠানামা সবকিছু দর্শকের হৃদয়ে ঠাঁই করে নেবার জন্য দরকার ছিল বং জুন হু-এর মতো বাঘা পরিচালকের। এই সিনেমায় সবাই নিজেকে কানেক্ট করতে পারবে। এটা একদিকে কোরিয়ান সমাজের গল্প আবার সারা বিশ্বে ক্রমবর্ধমান শ্রেণি-বিভেদের গল্প। এখানে কোন শ্রেণিকেই ভাল-মন্দ ফ্রেমে দেখা হয়নি। বরং প্রথমে ডার্ক হিউমার এবং ধীরে ধীরে সকলকে ‘পরজীবী’ হিসেবেই দেখানো হয়েছে। এই সিনেমা অস্কার পেলে আনন্দে আত্মহারা না হবার কোন কারণ দেখি না।
‘প্যারাসাইট’ ছিল একটা দুর্দান্ত গল্পের যথার্থ পরিচালনা। পারফেক্ট সিনেমার উদাহরণ! এবার আসা যাক ‘দ্য আইরিশম্যান’-এর কথায়। এই সিনেমার দৈর্ঘ্য প্রায় সাড়ে তিন ঘণ্টা। পরিচালক বিখ্যাত মার্টিন স্করসিস। অভিনয়ে জো পেসি, আল পাচিনো আর রবার্ট ডি নিরো। আর কিছু না বললেও চলে এই সিনেমা নিয়ে। এই সিনেমাও একটা বাস্তব ঘটনা নিয়ে। দ্য আইরিশম্যান নামের এক কিলারের গল্প। সিনেমাতে আমেরিকান তৎকালীন সময়ের আন্ডারওয়ার্ল্ড-এর নানা রাজনৈতিক তৎপরতা, অন্তর্দ্বন্দ্ব ও দেশীয় রাজনীতিতে নিজেদের জড়িয়ে যাওয়ার গল্প। এই সিনেমায় যে গল্প দেখানো হয়েছে সেই গল্প আমি আগে জানতাম না। তাই বলে একটা বারের জন্যও মনে হয়নি আমি বিচ্ছিন্ন হয়ে যাচ্ছি সিনেমা থেকে। বরং এই সিনেমার সবচেয়ে ভাল লেগেছে প্রতিটা চরিত্রের সূক্ষ্ণ ও সুচারু চলচ্চিত্রায়ণ। আমেরিকান সমাজের সামগ্রিকতার সাথে সিনেমায় দেখানো প্রত্যেকটা চরিত্রের সাথেই দর্শকের একটা আত্মীয়তা তৈরি হবে দেখামাত্র। সাড়ে তিন ঘণ্টার সিনেমা হলেও দর্শক এই চরিত্রগুলোর প্রেমে পড়ে এই সিনেমায় মজে যাবে। চরিত্রের প্রতি সুবিচার করার এই প্রবণতা ইদানিংকালের সিনেমাগুলোতে খুব কম দেখা যায়। স্করসিসের মতো পরিচালকদের কাছে আজকালের পরিচালকেরা এই জিনিস চাইলে এখনো রপ্ত করতে পারেন। না পারলেও চেষ্টা অন্তত করতে পারেন। ‘দ্য আইরিশম্যান’ অসাধারণ সিনেমা তবে অস্কার নাও পেতে পারে কারণ এর চেয়ে ‘প্যারাসাইট’ কিংবা ‘১৯১৭’ আরো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ।
চলে আসি স্যাম ম্যান্ডিস এর ‘১৯১৭’-এর প্রতি আমার মুগ্ধতার আলাপে। ব্যক্তিগতভাবে আমি নয়টা সিনেমার মধ্যে দুইটা সিনেমাকে অস্কারের দাবিদার মনে করি। সিনেমা দুটি হল : ‘১৯১৭’ ও ‘প্যারাসাইট’। এবং এই দুইয়ের মধ্যে একটা বেছে নেওয়া খুবই কঠিন। আমাকে ক্ষমতা দেয়া হলে আমি দুটিকেই অস্কার দিতাম। যাই হোক, একটা বেছে নিতে হলে আমি বেছে নিব ১৯১৭। কেন? তার ব্যাখ্যাই দিতে চাই।
সিনেমা আমার কেন ভাল লাগে? এককথায় আমার উত্তর : আমি দৃশ্যের পূজারী। শুধু কি দৃশ্যের? দৃশ্যের সাথে গল্প, গল্পের সাথে সংলাপ, সংলাপের সাথে সংগীত, সংগীতের সাথে শব্দের একটা সাংগীতিক সামঞ্জস্য যখন তৈরি হয় তখন সেই সিনেমা দর্শককে না ছুঁয়ে পারে না। ১৯১৭ তেমনই একটা সিনেমা। ধরেন আমি কোন গল্প দেখতে যাইনি। আমি একটা সিনেমাই দেখতে গেছি হলে। যে সিনেমা যতক্ষণ চলবে ততক্ষণ আমার চোখ, মন, হৃদয় আটকে থাকবে পুরো একটানা সারাক্ষণ চুম্বকের মতো। ১৯১৭ তেমনই দারূণ, মনোমুগ্ধকর সিনেমা। এই সিনেমার বিশেষ টেকনিক্যাল দিক সম্পর্কে সিনেমা-পাগল প্রায় সকলেই জানেন। তা হল : এই সিনেমার সিনেমাটোগ্রাফী দেখলে মনে হবে পুরো সিনেমা এক শটেই ধারণ করা হয়েছে। এমন আপাত এক শটের সিনেমা আগেও অনেক হয়েছে। কয়েক বছর আগের পুরস্কার পাওয়া ইনারিতু পরিচালিত ‘বার্ডম্যান’ সিনেমাও তেমন। তবে ১৯১৭ হল যুদ্ধের সিনেমা। গল্পটা একেবারে সাধারণ। প্রথম বিশযুদ্ধে ব্রিটিশ শিবিরের দুই সৈনিককে দায়িত্ব দেয়া হয়েছে অন্য একটা ক্যাম্পে বার্তা পৌঁছে দেয়ার জন্য। আট ঘণ্টার মধ্যেই সেই বার্তা পৌঁছাতে হবে, অন্যথায় প্রায় ১৬০০ সৈনিকের জীবন বিপন্ন হয়ে যেতে পারে। এই বার্তা পৌঁছে দেবারই গল্প এই সিনেমা। পুরো সিনেমায় এই বার্তা পৌঁছে দেবার প্রতি পদে পদে আছে মারাত্মক ঝুঁকি, চ্যালেঞ্জ, অবিশ্বাস, মানবিক মুহূর্ত, বন্ধুত্বের গল্প, ভালবাসার হাতছানি, মরণফাঁদ, সব কিছু। এই সিনেমা নিয়ে আমি অতটা আগ্রহী ছিলাম না। আমি ভেবেছি এটা ‘ডানকার্ক’ সিনেমার মতই এক্সপেরিয়েনশিয়াল সিনেমা হয়তো। গল্পের কিংবা চরিত্রের গভীরতার চেয়ে যুদ্ধের পরিস্থিতির মধ্যেই দর্শককে নিয়ে যেতে চাইছেন পরিচালক। কিন্তু আমি ভুল প্রমাণিত হলাম সিনেমা দেখার পর। এই সিনেমা সবদিক থেকেই অনবদ্য। টেকনিকাল বিষয় বাদেও এই সিনেমা সব দিক থেকে হৃদয়গ্রাহী। সিনেমার ভাষা এমনি হওয়া উচিত! আবারো বলছি, আমি মনে-প্রাণে চাই এই সিনেমাই সেরার পুরস্কারটা পাক।
এবারের অস্কার মনোনয়ন নিয়ে সবচেয়ে আক্ষেপ দেখা গেছে ‘লিটল ওম্যান’ সিনেমার মহিলা পরিচালক গ্রেটা গেরউইগের সেরা পরিচালকের মনোনয়ন না পাওয়া নিয়ে। নারী পরিচালকদের কাজের স্বীকৃতি উপেক্ষিত থাকার বিষয়টা নিয়ে বেশ সমালোচনা হয়েছে। গ্রেটা গেরউইগ সেরা পরিচালকের মনোনয়ন না পেলেও এই সিনেমা সেরা সিনেমার মনোনয়ন তালিকায় স্থান পেয়েছে। ১৮৬৮ সালে মহিলা লেখক লুইসা মে আলকটের একই নামের উপন্যাস থেকেই গ্রেটা এই সিনেমার চিত্রনাট্য লিখেছেন। উনিশ শতকের আমেরিকার এক পরিবারের চার বোনের বয়সন্ধিকালের গল্প। কেন্দ্রীয় চরিত্র জো একজন লেখিকা। তখনকার সময়ে নারী লেখকদের প্রকাশনার জগতে উপেক্ষিত হবার গল্পটাও প্রচ্ছন্নভাবে উঠে এসেছে। নারীকে সমাজের ধরাবাঁধা ছকে সাহিত্যে প্রতিফলিত করার বিষয়টাও এসেছে। লেখিকা জো-এর এই গল্পের সমান্তরালে এসেছে তাদের পুরো পরিবারের সংগ্রামের গল্প। প্রচ্ছন্ন দারিদ্রের চিত্রায়ন নজর কাড়ার মতো। সিনেমার দুটি টাইমলাইন আছে। সকল বোন তাদের আগের সময় নিয়ে স্মৃতিচারণ করছে। বর্তমান আর চঞ্চল অতীতের সময়ের সংঘাতে গল্পটি এগিয়ে যায়। সিনেমাটা অসাধারণ তবে সিনেমার সম্পাদনায় কিছু দুর্বলতা আছে যা চোখে পড়ার মতো। মাঝে মাঝে টাইমলাইনের পার্থক্যটা বুঝতে বেগ পেতে হয়েছে। এই সূক্ষ্ণ কারণেই হয়তো এই সিনেমার জন্য গ্রেটা সেরা পরিচালকের মনোনয়ন পাননি। সিনেমাটাতে প্রচ্ছন্নভাবে নারীবাদের চেতনাও তুলে ধরা হয়েছে। সিনেমাটা দারুণ হলেও অস্কার পাবে না। কারণ আগেই বলেছি : প্যারাসাইট কিংবা ১৯১৭-এর মতো সিনেমা যেখানে আছে সেখানে সন্দিহান হতেই হয়। গ্রেটা গেরউইগের প্রথম সিনেমা ‘লেডি বার্ড’টাও অসাধারণ। তার সিনেমায় স্বাধীনচেতা নারীর পাশাপাশি ধনী রাষ্ট্র আমেরিকার প্রচ্ছন্ন দারিদ্র্য মিনিমালিস্টিক ভাবে ধরা পড়ে। এই সূক্ষ্ণ সুন্দরের জন্যই গ্রেটার সিনেমা আমার খুব পছন্দের।
‘ফোর্ড ভার্সেস ফেরারি’ সুন্দর গল্প ও দারুণ চলচ্চিত্র, সন্দেহ নেই। ক্রিশ্চিয়ান বেল ও ম্যাট ডেমনের অভিনয় আর সামঞ্জস্যপূর্ণ পরিচালনা, সব মিলিয়ে এই সিনেমা সাবলীল চলচ্চিত্র। ‘ফিল গুড’ সিনেমা। বাস্তব ঘটনা অবলম্বনে। দেখার মজা আছে, ভাল লাগার অনেক উপাদান আছে। সবথেকে ভাল লাগার বিষয় হল : আমেরিকার মতো পুঁজিবাদী সমাজের বিশাল পাথরের নিচে এক উদ্দীপ্ত রেসিং চালক (ক্রিশ্চিয়ান বেল) আর প্রতিশ্রুতিশীল অটোমোবাইল ইঞ্জিনিয়ার (ম্যাট ডেমন)এর চাওয়া পাওয়া চাপা পড়ে যায়, এটাই বারবার মূর্ত হতে থাকে। এই সিনেমাও পুরস্কার পাবে না মনে করি। গল্প, সম্পাদনা কোন কিছুতেই প্যারাসাইট কিংবা ১৯১৭-কে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। তবে সব মিলিয়ে দারুণ সিনেমা।
এবার আসা যাক ‘ম্যারেজ স্টোরি’ সিনেমা নিয়ে আলাপে। ব্যক্তিগতভাবে এই সিনেমা আমার খুব পছন্দের। এক নাট্যনির্দেশক আর এক অভিনেত্রী-নির্দেশকের বিয়ে ভাঙার গল্প। ছোট ছোট কিছু ডিটেইল আছে এই সিনেমায়, এগুলো অবর্ণনীয়! যেমন : তারা দু’জন সেপারেশনের সিদ্ধান্ত নেয়ার পর একটা নাটকে পারফর্ম করে। স্বভাবগতভাবেই স্বামী চার্লি স্ত্রী নিকোলের অভিনয়ের খুঁটিনাটি তার ছোট নোটবুকে লিখে রাখে। সেদিনের পারফম্যান্স শেষে যখন তারা বাসায় আসল, অভ্যাসবশতই সেইসব পর্যবেক্ষণ শোনার জন্য চার্লিকে জিজ্ঞেস করে তার নোট সম্পর্কে। নিকোল মনোযোগ দিয়ে শোনে সেসব। একেবারে প্রফেশনাল অভিনেত্রী যেমনটা করে ঠিক সেইভাবে। এরপর ধন্যবাদ বলে লিভিং রুম থেকে রূঢ় চেহারা নিয়ে বেডরুমের দিকে যেতে থাকে নিকোল। যেই লিভিং রুমের আলো থেকে বেডরুমের অন্ধকারে সে প্রবেশ করল, জমে থাকা কান্নায় ভেঙে পড়ল সে। পেছনে করুণ নম্র গগণবিদারী সংগীত। এই দৃশ্য টেনে টেনে অনেক বার দেখেছি। নেটফ্লিক্স প্রযোজিত এসব সিনেমা দেখলে আশার আলো পাই যে এখনো গল্প আর অভিনয়-নির্ভর চলচ্চিত্র দাপটের সাথেই তৈরি হতে পারে। ছোট ছোট ডিটেইলের সুন্দর পরিচ্ছন্ন এই সিনেমাগুলো এরিক রোমারের সিনেমার মতো আলতো হৃদয়-ছোঁয়া। সিনেমা শেষ করার পরেও মাথা থেকে বেরোয় না। ঘোরের মতো চেপে থাকে। পরিচালক নোয়াহ বাউমবাখের এই সিনেমা ইতিমধ্যে অনেক মনোনয়ন পেয়েছে। বলে রাখা ভাল, নোয়াহ বাউমবাখ আর ‘লিটল উইম্যান’-এর পরিচালক গ্রেটা গেরউইগ বাস্তব জীবনে পার্টনার হিসেবে আছেন। এই সিনেমা অস্কার পাবে কি পাবে না বলতে পারব না। আমি সন্দিহান।
বক্স অফিসে, মিডিয়ায় এবং বিতর্কে সাড়া জাগানো সিনেমা ‘জোকার’-এর কথায় আসি। এই সিনেমার গল্প অন্য যে সব সিনেমা মনোময়ন পেল তার চেয়ে কোন দিকেই অসাধারণ মানের গল্প না। বলার মতো বিশেষত্ব : কমিক চরিত্র থেকে আজ অব্দি এমন ডার্ক থিমের সিনেমা কম হয়েছে। বলে রাখা উচিত ক্রিস্টোফার নোলানের ‘ব্যাটম্যান ট্রিলজি’র কথা। সেই তিনটি সিনেমাও সব দিক থেকে অসাধারণ কিন্তু টড ফিলিপ্স পরিচালিত এই সিনেমায় শুধুমাত্র জোকার চরিত্র নিয়েই কাজ করেছেন পরিচালক। জোকারের চরিত্র হিসেবে আবির্ভূত হবার পেছনের ইতিহাস নিয়েই কাজ করেছেন। এই সিনেমার মূল শক্তি হল : জোয়াকিম ফিনিক্সের কালজয়ী অভিনয়, দুর্দান্ত সংগীত আর চোখ জুড়ানো সিনেমাটোগ্রাফী। এই সিনেমা অস্কার পাবে না হয়তো, তবে ফিনিক্সের সেরা অভিনেতা হওয়া ঠেকানোর রাস্তা নেই এতটুকু বলে রাখা যায়। সাথে শ্রেষ্ঠ সংগীতের (অরিজিনাল স্কোর) পুরস্কারটাও ‘জোকার’-এর ঝুলিতেই যাবে মনে হয়।
মাত্র গতকাল দেখলাম আরেক আলোচিত সিনেমা ‘জোজো র‌্যাবিট’। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ নিয়ে এমন স্যাটায়ারিক ড্রামা বোধহয় কম হয়েছে। সিনেমার মূল চরিত্র জোজো (রোমান গ্রিফিন ডেভিস) একজন শিশু অভিনেতা। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন জার্মানিতে এই জোজো একজন পাঁড় হিটলারভক্ত শিশু। অন্যদিকে তার মা যুদ্ধবিদ্বেষী। ঘরে লুকিয়ে রেখেছে এক ইহুদী কিশোরীকে। একদিন জোজোর কাছে ধরা পড়ে যায় সেই ইহুদী মেয়ে। এভাবে গল্প আগাতে থাকে। যুদ্ধ শেষের দিকে এগোয়। হিটলারের প্রতি জোজোর ভক্তি আবার অন্যদিকে ইহুদী কিশোরীর প্রতি মানবিক বোধ জাগ্রত হওয়া : এই দুই বিপরীত মনোজগতের সংঘর্ষের অভিনয় দেখার মতো, তাও একজন শিশু অভিনেতার কাছ থেকে। এই সিনেমা অসাধারণ তবে সিনেমার চিত্রনাট্য, সংগীত, সম্পাদনায় কিছু দুর্বলতা চোখে পড়ে, যে-কারণে এটা মূল পুরস্কার নাও পেতে পারে।
কিছু মূল পুরস্কারের ব্যাপারে আমার মতো একজন আটপৌরে সিনেমাভক্তের কিছু ভবিষ্যদ্বাণী দিয়ে শেষ করছি লেখাটা :
সেরা সিনেমা : ১৯১৭
সেরা পরিচালক : বং জুন হু (প্যারাসাইট)
সেরা মূল অভিনেতা : জোয়াকিন ফিনিক্স (জোকার)
সেরা মূল অভিনেত্রী : রেনে জেলোয়েগের (জুডি)
সেরা সিনেমাটোগ্রাফী : ১৯১৭
সেরা ডকুমেন্টারি : আমেরিকান ফ্যাক্টরি
সেরা সম্পাদনা : প্যারাসাইট
সেরা আন্তর্জাতিক সিনেমা : প্যারাসাইট
সেরা সংগীত (অরিজিনাল) : জোকার
সেরা এডাপ্টেড চিত্রনাট্য : লিটল উইম্যান
সেরা অরিজিনাল চিত্রনাট্য : ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন হলিউড
খুব খুশি হব যদি প্যারাসাইট সেরা সিনেমা হিসেবে পুরস্কার পায়। যেহেতু এটা আমেরিকান পুরস্কার, তাই তাদের লৌকিক আচার, লৌকিক স্মৃতিকাতরতা এসব গল্পই প্রাধান্য পাবার কথা। সেদিক থেকে চিন্তা করলে দেখা যাবে তারান্তিনো পরিচালিত ‘ওয়ান্স আপন এ টাইম ইন হলিউড’-ই পুরস্কার পেয়ে যাচ্ছে।
তবে এ বছর ছিল ভাল সিনেমার খনি। প্রতিবছর এমন দারুণ দারুণ সিনেমাই যেন উপভোগ করতে পারি। এরকমটাই আশা করি।