ইলিয়াছ কামাল রিসাত > পিটার কুকের ফিরে আসা >> ভ্রমণগাথা

0
251

পর্ব ৪

Anna Burnes এর Milkman পড়ছি। এখানে মূল চরিত্র অর্থাৎ যার ভাষ্যে উপন্যাসটা বলা, সে হাঁটতে হাঁটতে বই পড়ে। তার এই হাঁটতে হাঁটতে বই পড়ার আইডিয়াটা মন্দ নয়। রাস্তায় কখন ধাক্কা খেয়ে পড়ে যাই কিংবা গাড়ির গতির ভয়তো আছেই। সে কারণে হাঁটতে হাঁটতে বই পড়ার বদলে ‘সাবওয়ে’ নামক দোকানে বসেই পড়তে থাকি। এর মধ্যে এক ব্রিটিশ ভদ্রলোক, বয়স প্রায় ৭০-এর কাছাকাছি আমার পাশে এসে বসলেন। এত জায়গা খালি থাকতে আমার পাশে এভাবে উৎসুক ভাবে বসলেন, আমি একটু ইতস্তত বোধ করলাম। প্রথমেই ভাবলাম, অনিচ্ছাসত্বেও আমি কি তার সাথে কোনভাবে অভদ্র আচরণ করেছি? প্রশ্নই ওঠেনা, অনেক হিসাব নিকাশ করে নিজেকে সান্ত্বনা দিলাম, না কিছু করিনি।
ভদ্রলোক খুব অমায়িকভাবে জানতে চাইল, ‘কি পড়ছ’? আমি তাকে নাম বললাম এবং বইটা হাতের কাছে এগিয়ে দিলাম। বইটা সে নেড়েচেড়ে পেছনের সারাংশ দেখে আমাকে বইটা ফেরত দিয়ে বলল- ‘তোমাকে দেখে আমার পিটার কুকের কথা মনে পড়ে গেল’। পিটার কুক নামের কেউ আমার পরিচিত নয় কিংবা এমন কাউকে জানিও না।
তাকে বললাম- ‘কে এই পিটার কুক’ আর কেনই বা আমাকে দেখে তার কথা মনে পড়ল তোমার?
এরপরে সে বলল- ‘পিটার কুক ১৯৬০-এর দশকের ব্রিটিশ কমেডিয়ান এবং অভিনেতা। তার কমেডি ঘরানা ছিল তৎকালীন ব্রিটিশ প্রতিষ্ঠানবিরোধী। স্যাটায়ারিক নানা কমেডির মধ্যে দিয়ে সে ও আরো কয়েকজন সাংস্কৃতিক আন্দোলনের সূচনা করেছিল’।
এতটুকু বলতেই আমি তাকে থামিয়ে বললাম- ‘আমার সাথে এর কোন মিলের সম্ভাবনা দেখছিনা। কোথায় মিল খুঁজে পেলে তাই বল। চেহারায়? নাকি দৈহিক গড়নে? অন্য কিছু হবেইনা কারণ আমি অভিনয় জানিনা কিংবা কোন কৌতুকও শুনাইনি তোমাকে’।
সে হাসতে হাসতে বলল- ‘আমার কথা আগে শোন তুমি। এসব কিছুই না। আমি ১৯৬০-এর দিকে লন্ডনে একটা পানশালায় কাজ করতাম। আমার মালিকের সাথে আমার খুব ভাল দোস্তি ছিল। সেই পানশালায় পিটার কুক এসে সারাদিন লিখত আর পড়ত। তখনো সে এত বিখ্যাত হয়ে ওঠেনি। পানশালার মালিক আর আমি বাজি ধরতাম, পিটার কুককে আমাদের মধ্যে যে নানাভাবে বিরক্ত করে দোকান থেকে চলে যেতে বাধ্য করবে সে বাজি জিতবে। মজার ব্যাপার হল- আমাদের দুজনের কেউই সেই বাজিতে জিতিনি কোনদিন। এই পিটার কুকই পরে সারা ব্রিটেনে কমেডিতে অগ্রগণ্য নজির স্থাপন করেছিল। এখন তার কথা খুব মনে পড়ে। সেই সময় কখনো বুঝিনি সে পরে এত বিখ্যাত হবে’।
তার মুখে পিটার কুকের কাহিনি এতই ভাল লাগল আমার, মশগুল হয়ে ছিলাম বেশ কিছুক্ষণের জন্য। সম্বিৎ ফিরে পেতেই তাকে বললাম- ‘সবই বুঝলাম। কিন্তু আমি এতটুকু তোমাকে বলতে পারি, পিটার কুকের মতো অসাধারণ কখনো হবনা’।
সে বলল- ‘অসাধারণ তোমাকে হতে হবেনা। তোমার সাথে সাধারণ সময়ের পিটার কুকের মিল পেয়েছি’।
ভদ্রলোকের সাথে আরো গল্প হচ্ছিল। বলতে বলতে আমার নাম-ধাম-দেশ-পেশা সব জেনে নিল। বাঙালি রান্নার প্রসঙ্গ আসতেই গরুর মাংস ভুনা আর গরম ভাত তাকে একবার খেতে বললাম। সে খুশিতে পইপই। এর মাঝেই সে ব্রেক্সিট নিয়ে বেশ আক্ষেপ করল। ব্রেক্সিট ধারণা তার মোটেই পছন্দ না।
ব্রেক্সিট নিয়ে কোন সাধারণীকরণ করতে এখন একশ’ একবার চিন্তা করা লাগে। এই চিন্তা কি গবেষণার প্রভাব নাকি অন্য দেশে বসবাস করার ফলে জন্মেছে নাকি, জানিনা। ব্রিটিশ নাগরিক যাদের সাথেই কথা বলি, ‘ব্রেক্সিট’ নিয়ে চাপা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন তারা।
আমি একদিন আমাদের ডক্টরাল স্কুলের এক প্রফেসরকে প্রশ্নটা করেই ফেললাম বোকার মতো। ‘যার সাথেই কথা বলি, তোমরা ব্রেক্সিটের বিপক্ষে কথা বল, তাহলে ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোটটা দিয়েছে কে?’
আমার প্রশ্নে উনি একটু ভ্যাবাচ্যাকাই খেয়ে গেলেন। একমিনিট সময় নিয়ে বললেন- ‘আসলে দক্ষিণ ইংল্যান্ডের শহরগুলো যথেষ্ট প্রগতিশীল।ব্রেক্সিটের বিপক্ষে বেশি ভোট দক্ষিণ থেকেই হয়েছে। আর ব্রেক্সিটের পক্ষে ভোট পড়েছে উত্তর অংশের ইংল্যান্ড থেকে’।
কিছুদিন আগেই সহকর্মীদের সাথে আড্ডা দিচ্ছিলাম। খাবারের ফাঁকে ফাঁকে মূল আড্ডা ছিল ব্রেক্সিট নিয়ে। এদের মধ্যে একজন স্কটল্যান্ডের, আরেকজন উত্তরের শহর সান্ডারল্যান্ডের। সান্ডারল্যান্ডবাসী আলেক্স ব্রেক্সিটের বিপক্ষে যুক্তি দিচ্ছিল স্কটল্যান্ডের বেন’কে উদ্দেশ্য করে। বেন ব্রেক্সিটের পক্ষে, আলেক্স বিপক্ষে। আলেক্স উত্তর ইংল্যান্ডের।
আলেক্স আবার এও বলল যে, উত্তর ইংল্যান্ড হাজারগুণ ভাল, দক্ষিণ ইংল্যান্ডের তুলনায়। আমি বেশ অবাক হলাম। কারণ জানতে চাইলে বলে, উত্তর ইংল্যান্ডের মানুষের মধ্যে অহমিকা কম, জীবন যাপনের খরচ কম, চাওয়া পাওয়া কম, আর দক্ষিণ অনেক ব্যয়বহুল এবং শ্রেণিবৈষম্য বেশি (সত্য বটে)।
একটা উত্তরের তরুণী ব্রেক্সিটের বিপক্ষে কথা বলছে, আবার উত্তরাঞ্চলকে দারুণ বলছে, যেটা ইমিগ্র্যান্ট ইংল্যান্ড প্রবাসীদের ধারণার বাইরে। তারা ভাবে, উত্তরের মানুষ অনেক বর্ণবাদী, দক্ষিণ অনেক সহনশীল।আলেক্স এখানে ইউনিক বলা যায়!
সহনশীলতার কথা বলতে গিয়ে এক ভারতীয় বন্ধু মেঘানের কথা মনে পড়ে গেল। সে বলে, ‘গণতন্ত্রে ‘সহনশীলতা’ শব্দ নিয়ে আমার যথেষ্ট আপত্তি আছে। সহনশীল মানে আমার অপছন্দ সত্ত্বেও তাকে সহ্য করতে হবে। তার মানে ওই শব্দেই প্রচ্ছন্ন ঘৃণার বৈধতা দেয়া হয়ে গেছে।’
আমি মেঘানকে পরে বললাম, ‘পারস্পরিক সহাবস্থান’ শব্দটা তাহলে অনেক যুতসই হতে পারে।
সহনশীল হতে হতে এক পর্যায়ে প্রচ্ছন্ন ঘৃণা হয়তো সীমা ছাড়িয়ে গেছে এখানকার অধীবাসীদের। তারই পরিণতি হয়তো এই ‘ব্রেক্সিট’ (আবারো সাধারণীকরণ করে ফেললাম)।
আমার বাড়িওয়ালার কথায় আসি। তিনি জন্মেছেন ফ্রান্সে। নানা পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে এখন ইংল্যান্ডের নাগরিক। ফ্রান্সে তার আত্মীয়স্বজন থাকে। বছরে দুই তিনবার ঘুরে আসেন। ব্রেক্সিট নিয়ে তিনি মহাখাপ্পা স্বাভাবিকভাবেই। তিনি বললেন- ‘নিজের দেশে এখন ভিসা করে যেতে হবে। এই অদ্ভুত পরিস্থিতির পেছনে ইংল্যান্ডের এলোমেলো আবহাওয়াটাই সবচেয়ে বেশী দায়ী। কখন কি সিদ্ধান্ত নেয় ঠিক নেই।
ব্রেক্সিট নিয়ে ভাবনা আমাকে দিয়ে অন্তত হবেনা। এর যে অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক-কূটচাল আছে, তার কেচ্ছাকাহিনি আরো জটিল। এইসব না ভেবে ব্রাইটন শহরে অজস্র সবুজ পার্ক আছে, সেখানে হাঁটতে থাকি। কিছুদূর পর পর তিন চার জন বসতে পারে এমন বেঞ্চ আছে পার্কে। বেঞ্চের মতো মামুলি জিনিসে চোখ পড়া না পড়া একই কথা। হঠাৎ এক বেঞ্চে দেখি ছোট একটা নামফলক, তাতে লেখা ছিল : In loving memory of Jennifer Jane Cross (1958-2012) : Her Sons and Daughters.
ব্যাপারটা দারুণ লাগল। পরে সব বেঞ্চ ভালভাবে খেয়াল করে দেখি সব বেঞ্চেরই নাম কোনো না কোনো মৃতজনের স্মৃতিতে তাদের আত্মীয়-স্বজনরা দিয়ে দিয়েছে। কয়েকটাতে ছিল কিছু কবিতার লাইন। আরেকটা বেঞ্চে লেখা- ‘She showed us the magic of life’.
জীবনের জাদু ব্যাপারটা মন্দ নয়। অবশ্য জীবন নামক ব্যাপারটাই তো ম্যাজিক। এই ম্যাজিকে স্মৃতি-ভাণ্ডার হল সব অনুভূতির সার সংক্ষেপ। আমার বাবার সাথে দুই বছর আগে আমার এক দুপুর গড়ানোর স্মৃতি দিয়ে শেষ করি।
বাবার প্রিয় শখ বড়শি দিয়ে মাছ ধরা। আরো ১০-১৫ বছর আগে ইয়া মস্ত এক-একটা মাছ অনায়াসে ধরে ফেলতেন বিভিন্ন কারসাজি করা বড়শি দিয়ে। আগের মতো ওই তেজ, ধৈর্য, শক্তি নেই তবে শখের যে নেশাগ্রস্ত ইচ্ছাশক্তি তা এখনো বহাল আছে যুবা বয়সের মতো।
সেদিন দুপুর গড়াল। বড়শি হাতে বসে আছেন বাবা। হঠাৎ চোখ চুলকাচ্ছেন। কয়েকদিন ধরেই চোখে বড্ড ব্যথা।
চোখ নিয়ে তার প্রথম ব্যথার বয়ান শুরু করলেন মাছ ধরার ফাঁকে। সেই ১৯৭১ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান গ্রেপ্তার হবার কয়েক মাস বা দিন আগে (স্পষ্ট মনে নেই) হেলিকপ্টারে করে কক্সবাজার সফরে গিয়েছিলেন। অভিযাত্রিক বাবা হেলিকপ্টার আর বঙ্গবন্ধুকে দেখতে সেই মাঠে ছুটে গিয়েছিলেন যেখানে হেলিকপ্টার ল্যান্ড করবে। বঙ্গবন্ধু ও হেলিকপ্টার দর্শন ভালভাবেই হল।
এবার বিদায়ের পালা। বালুভর্তি মাঠটাতে যখন হেলিকপ্টার ফের চলে যাবার জন্য স্টার্ট নিল, পুরো মাঠের বালু ওড়াউড়ি শুরু করলো। বঙ্গবন্ধু উড়াল দিলেন।
আমার বাবা অসীম আগ্রহে তাকিয়ে আছেন হেলিকপ্টারের দিকে। বালুর মধ্যে থাকা ছোট কয়েকটা পাথরকণা বাবার চোখে ঢুকে পড়ল।
ওই দিন বাবার মনে হচ্ছিল ওই ব্যথা হয়তো এতদিন সুপ্ত ছিল। মাঝে মাঝে ব্যথাটা ওঠে। ওই দিনও ব্যথা করেছিল। কিন্তু উত্তাল সময়ের উত্তেজনায় ব্যথা টের পাননি। পরে টের পেয়েছিলেন। পরে অবশ্য দুঃখটা ঘোচ বড় একটা কাতলামাছ ধরে।

[চলবে]