ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ব্রাইটনের ব্রিটেনে [পর্ব ৩] >> ভ্রমণগাথা

0
162
Farhan Ishrak
পর্ব-৩

‘সময়ের কাছে’ আজ ‘অগ্রসর সূর্যালোক’ নেই

 

দীর্ঘদিন লেখা ছেড়ে দূরে থাকা মানে এই নয় যে লেখালেখি আমাকে ছেড়ে দূর বনবাসে কোথাও চলে গেছে। লিখতে বসার মুহূর্ত নিয়ে অনেক নামজাদা সাহিত্যিকেরা অনেক কিছু বলে গেছেন। বেশিরভাগ প্রথিতযশা সাহিত্যিকের একটা ধরাবাঁধা রুটিন আছে। কেউ ভোর সকালে দুই-তিন ঘণ্টা না লিখলে নাকি হাত কামড়ায়। অনেকে আছেন যখন ইচ্ছা লিখতে বসে যেতে পারেন, যে-কোন পরিস্থিতিতে। আমি তাদের কাতারের কেউ নই তবে দুই এক পাতা যেহেতু লিখি মাঝে মধ্যে, সেই সূত্রে একটা অক্ষরের আত্মীয়তা কোন চুক্তিছাড়াই স্থাপন হয়ে গেছে। গ্যাব্রিয়েল গার্সিয়া মার্কেস কিংবা সাদাত হোসেন মান্টো সবাই আমার আত্মীয়। তারা যে যন্ত্রণা কিংবা আনন্দ নিয়ে লিখতে বসতেন আমিও সেই যন্ত্রণার ভাগীদার মনে মনে হতে চাই। চেষ্টা করতে দোষ কি!
গত এক মাস এই বিদেশ বিভুঁইয়ে ছিল ক্রিসমাস এর মৌসুম। সারাবছর এই সময়ের জন্যই অপেক্ষা করে সারাবিশ্বের খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী মানুষেরা। আমিও সেই সুযোগে আমার প্রেয়সীকে দেখতে গিয়েছিলাম জার্মানি। ফ্লাইট ছিল লন্ডনের স্টানস্টেড এয়ারপোর্ট থেকে। এয়ারপোর্টটা তেমন বড় নয়, কিন্তু এখানকার হেল্প ডেস্ক এত প্রযুক্তি নির্ভর- মাঝে মাঝে বিরক্ত লাগে। আজেবাজে প্রশ্ন ঘোরে মাথায়- তারা কি মানুষ নামক বিভীষিকার সাথে যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন করার জন্যই যন্ত্র ও প্রযুক্তিনির্ভর হয়ে যাচ্ছে, নাকি একুশ শতকের ক্যাশ-লেস অর্থনীতির ধাক্কা সামলাচ্ছে!
অনেকে অনেক যুক্তি দেবে। প্রযুক্তি নির্ভরতার জন্য সবকিছু ট্রান্সপারেন্ট হচ্ছে, মানুষের সময় কম নষ্ট হচ্ছে, দুর্নীতির আশ্রয় নিতে হচ্ছেনা ইত্যাদি।
আমার আবার কথা বলতে ভাল লাগে মানুষের সাথে, যন্ত্রের সাথে নয়। গল্পের ছলে তার বাড়ি কোথায়, পরিবারের খোঁজখবরও নেয়া হয়ে যায়। আমরা আবার অনেক উৎসুক বাঙালি তো! কথার জাদুতে কল্পনা কিংবা মানচিত্র কত দেশ ঘুরে আসা যায় তা ভাবা যায়না!
গত বছর এল সালভাদর যখন গিয়েছিলাম তখন এক দোভাষির সাথে গল্প করতে গিয়ে পেয়েছিলাম দুর্লভ তথ্য। সেখানে গিয়েছিলাম সরকারি কাজে, সেই দেশের নির্বাচন পর্যবেক্ষণ করতে। নির্বাচনের দিন আমাদের সাথে সেই দেশের সবচেয়ে হাই প্রোফাইল দোভাষিকে সংযুক্ত করা হয়েছিল। নাম তার ফ্রেইডা।
ষাটোর্ধ্ব এই দারুণ মহিলার সাথে গল্প করছিলাম। খুব স্বাভাবিক ভাবেই আমরা যার যার দেশের সাহিত্য, সিনেমা এসব নিয়ে গল্প করছিলাম। প্রথমেই পরিচয় করাতে গেলাম আমাদের জনপ্রিয় কালচারাল এম্বেসেডর ‘রবীন্দ্রনাথ ‘-এর সাথে।
তিনি সাথে সাথে বলে উঠলেন- You mean Tagore?
আমি তাজ্জব হয়ে বললাম : Yes…
তারপর তার কথা : Tagore gifted a book to my mother during 1930’s. He also signed the book himself!
আমি তো খনি পেয়ে গেলাম রে! আমি জিজ্ঞেস করলাম : How this is possible?
ইন্টারপ্রেটার ফ্রেইডার বাবা তখন এল সালভাদরের অ্যামবাসেডর হিসেবে কর্মরত ছিলেন লন্ডনে। সেখানেই রবি বাবুর সাথে তার পরিবারের সখ্য।
ফ্রেইডা কথা দিয়েছে আমাকে এ বিষয়ে আরো ডিটেইল জানাবে। রবি বাবুর উপহার দেয়া বইটা বর্তমানে তার ভাইয়ের কাছে আছে।
এল সালভাদরের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য অনন্য। শুধু বলার জন্য বলা না। সাধে কি রবীন্দ্রনাথ ফ্রেইডার মাকে তার বই উপহার দিয়েছিলেন!
আমাদের প্রিয় রবীন্দ্রনাথ এই ব্রাইটন শহরেও এসেছিলেন। তিনি যে কলেজে পড়েছিলেন এবং যেখানে থাকতেন সেসব বিষয়ে বিস্তারিত তথ্য এখনো পাইন্ তবে সময় সুযোগ পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ব সেই কাজে। শুধু এতটুকু শুনেছি লোকমুখে যে, ওকালতি পড়ার জন্য তিনি যখন ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে পাড়ি দেন তখন প্রথমেই এসেছিলেন এই শহরে। আইন বিষয়ে ভর্তি না হয়ে ব্রাইটনের এক স্থানীয় কলেজে ভর্তি হয়েছিলেন। পরে তার মন বসেনি। এসব তথ্য পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে যাচাই করে পরে আরো কয়েক কিস্তি লেখা যাবে। আপাতত বিষয়টা তোলা থাক।
লেখা শুরু করেছিলাম যন্ত্রনির্ভরতার উপর আমার অনাগ্রহ নিয়ে। তারই সূত্র ধরে বিচ্ছিন্নভাবে বেশকিছু প্রসঙ্গে কথা বলা হয়ে গেছে। জার্মানি ঘুরতে যাবার আগে ইংল্যান্ডের বেশ কিছু সহকর্মী কিংবা পরিচিতজনেরা জার্মানি নিয়ে বেশ একটা বিরক্তির ভাব প্রকাশ করে, খেয়াল করেছি। বিরক্তির অন্যতম কারণ হচ্ছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ও হিটলারীয় যুগের ইতিহাস। সেই সময় থেকেই অন্যান্য ইউরোপীয় দেশ, বিশেষ করে ইংল্যান্ডের মানুষজন জার্মানিকে ‘বর্ণবাদী’ বলেই আখ্যায়িত করে। আমি ব্যাপারটাতে বেশ অবাক হলাম এই কারণে যে, আমার স্বল্প অভিজ্ঞতায় তুলনামূলকভাবে জার্মানির মানুষজনকে তেমন মনে হয়নি। বরং তারা অতি ভদ্র আচরণ করে সেই অন্ধকার সময়ের গ্লানি থেকে মুক্ত হবার জন্য। অবশ্য ‘বর্ণবাদ’ বিষয়টা খুব গভীর পর্যালোচনার দাবি রাখে। এক-এক দেশের, সে ইংল্যান্ড হোক কিংবা জার্মানি, এটা নির্ভর করে বিভিন্ন অঞ্চলের উপর। মোদ্দা কথা হল, যে ইউরোপকে আমরা দক্ষিণ এশীয় অঞ্চলের মানুষেরা একটা একক ভূগোল বলে বিবেচনা করি, সেই ইউরোপের নিজের মধ্যেই আছে অনেক বৈচিত্র্য, আছে অনেক মতবিরোধের জায়গা, আছে অনেক বিভক্তি। এই যে বেক্সিটের ঘটনা ঘটতে যাচ্ছে, এটা নিয়ে এখন পর্যন্ত দেখলাম না কোন ব্রিটিশ নাগরিক, বিশেষ করে তরুণ সমাজ এটার পক্ষে কথা বলছে। তারা যারপরনাই বিরক্ত এই ইউরোজোন থেকে বিচ্ছিন্ন হবার ঘটনায়। দিনের একটা বড় সময় তারা ব্যয় করে থেরেসা মে’কে ঠাট্টাতামাসা করে।
কিছুদিন আগেই এক ইংরেজ বন্ধুর বাড়িতে গেলাম। তার বাবা মা দুজনের বয়স প্রায ৭০-এর কাছাকাছি। তার বাবা আমার দেশ ‘বাংলাদেশ’ শোনার পর প্রথমে যে মন্তব্য করল তা শোনার জন্য আমি প্রস্তুত ছিলাম না। ‘তোমরা কাপড় না বানালে আমরা উলঙ্গ থাকতাম, ইংল্যান্ডের মানুষেরা এখন আর কাপড় বানায়না, তারা সস্তা শ্রমমজুরির জন্য লাভের অংক বড় করার আশায় বেছে নেয় তোমাদের দেশের পণ্য, তোমরা এ নিয়ে প্রতিবাদ করনা কেন?’
তিনি আরও বললেন, ‘আমাদের কোম্পানিগুলো এতই মানুষবিমুখ হয়ে গেছে যে, সেলসম্যানের চাকরিও করতে দিচ্ছেনা, সব জায়গায় অটোমেটেড যন্ত্র বসিয়ে দিয়েছে’।
একজায়গায় এসে তাঁর আর আমার দুঃখ একবিন্দুতে মিলে গেল। মানুষ এখন অপ্রয়োজনীয় হয়ে গেছে। আমার দেশ বাংলাদেশে শ্রমিককে কত মজুরি দিচ্ছে তার যেমন তোয়াক্কা করা হচ্ছেনা, তেমনি ইংল্যান্ডে মানুষই দরকার পড়ছে না। মানুষ নামক ভোক্তাকে সব ভূগোলে বাতিলের খাতায় ফেলে রাখা হচ্ছে। গুটিকয়েক কর্পোরেশন আর ১ শতাংশ এলিট নিয়ন্ত্রণ করছে পুরো পৃথিবী।
ঐতিহাসিক হারারি সমাজতান্ত্রিক শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে একটা দারুণ কথা বলেছেন। আগে শ্রমিক আন্দোলন নিয়ে বেশ তটস্থ থাকতে হত মালিকদের। আর এখন শ্রমিক নিয়ে ভাবতেই হয়না। কারণ শ্রমিক নামক প্রপঞ্চই তো উঠে যাচ্ছে। সব কাজ যন্ত্র করে নিচ্ছে!
জীবনানন্দের ‘সময়ের কাছে’ কবিতায় ফিরে যেতে চাই :
…মানুষেরা বার-বার পৃথিবীর আয়ুতে জন্মেছে;
নব নব ইতিহাস-সৈকতে ভিড়েছে;
তবুও কোথাও সেই অনির্বচনীয়
স্বপনের সফলতা- নবীনতা- শুভ্র মানবিকতার ভোর?
নচিকেতা জরাথ্রুস্ট্র লাওৎ-সে এঞ্জেলো রুশো লেনিনের মনের পৃথিবী
হানা দিয়ে আমাদের স্মরণীয় শতক এনেছে?
অন্ধকারে ইতিহাসপুরুষের সপ্রতিভ আঘাতের মতো মনে হয়
যতই শান্তিতে স্থির হ’য়ে যেতে চাই;
কোথাও আঘাত ছাড়া- তবুও আঘাত ছাড়া অগ্রসর সূর্যালোক নেই।
[চলবে]