ইলিয়াছ কামাল রিসাত> ব্রাইটনের ব্রিটেনে >>> ভ্রমণগাথা [১০]

0
120

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ব্রাইটনের ব্রিটেনে >> ভ্রমণগাথা [১০]

পর্ব ১০ : সমাজবিজ্ঞানের ঝক্কি
মাঝখানে অনেক দিন লিখতে পারিনি! এর জন্য কোন অজুহাত নেই। চাইলে অনেক অজুহাত দেয়া যেতে পারে, এই যেমন- পিএইচডি’র কাজের চাপ, সাবমিশনের চাপ, নিজের গবেষণায় নিমজ্জিত হয়ে থাকা ইত্যাদি ইত্যাদি। যারা লেখালেখি করে কিংবা করতে চায় তাদের জন্য এসব কোন অজুহাত হতে পারেনা। শাহাদুজ্জামান ‘কেন লিখি’র উত্তরে বলেছিলেন, লেখালেখি তার দ্বিতীয় জীবন। সেই জীবনের আলাদা একটা ছন্দ আছে, ওঠানামা আছে, আলাদা প্রতিবেশী আছে, বন্ধু আছে, হয়তো শত্রুও আছে। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, ঐ জগতের অধিপতি তিনি। নিজেই নিজের সার্বভৌমত্ব নির্ধারণ করতে পারেন।
না লিখলেও নানা বিষয় নিয়ে গত বেশ কিছুদিন গড়িমসির মধ্যে দিয়ে যাচ্ছিলাম। পিএইচডি লাইফের উজ্জ্বল দিকটাতো মোটামুটি সবাই জানে। ডক্টরেট করবে, এরপর চাইলে গবেষণায় নিজেকে নিয়োজিত করবে, অথবা কোন চাকরিতে যোগদান করবে এবং বেকারও হয়ে থাকতে পারে এমন নজিরও আছে ভুরি ভুরি!
সবচেয়ে ভয়াবহ যে দিকটার মুখোমুখি হচ্ছি তা হল : একাডেমিক ভাষা রপ্ত করা। আমার গবেষণা যেহেতু চিকিৎসা নৃবিজ্ঞানের বিষয় নিয়ে, সেই হেতু এটা সামাজিক বিজ্ঞানের মধ্যেই পড়ে। যে-কোন গবেষণাতেই মূল ব্যাপার হল- নিজের ক্রিটিকাল আর্গুমেন্ট হাজির করা। ক্রিটিকাল আর্গুমেন্ট বলতে আসলে কি বুঝেছি তা নিয়েও অনেক মতান্তর হতে পারে। তবে সোজা কথায়, আমি যে বিষয়টা নিয়ে কাজ করছি সে বিষয়ে আগেকার যত গবেষণা আছে সবকিছুর একটা গভীর পাঠ-পর্যালোচনা করে তারপর সেই গবেষণার চেয়ে আমার গবেষণা কোন দিক থেকে আলাদা তাই-ই হাজির করা!
প্রসঙ্গক্রমেই এখানে চলে আসে আমাদের দেশের শিক্ষাব্যবস্থার কথা। আমাকে যে এই ক্রিটিকাল আর্গুমেন্ট নিয়ে এত বেগ পেতে হচ্ছে, তা কেন? আমার দেশের পাঁচ বছরের বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে উচ্চশিক্ষার এই বিশেষ উপাদান আমি কেন রপ্ত করতে পারিনি? দুই দিকে অভিযোগের আঙুল তাক করা যেতে পারেঃ এক, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাব্যবস্থা; দুই, নিজের দোষ। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষা ব্যবস্থাকে প্রশ্ন করা আমাদের দেশের প্রেক্ষাপটে খুবই সহজ ঘটনা। শুধু বিশ্ববিদ্যালয় কেন, যে কোন ক্ষেত্রে আমরা আমাদের প্রতিষ্ঠানগুলোকে দিনরাত সমালোচনা করে নিজের আত্মতৃপ্তি মেটাতে থাকি। এখন অন্য প্রসংগে যাবনা। বিশ্ববিদ্যালয়ের কথা বলতে বলতে নিজের কিংবা আমাদের গাফিলতির কথাও বলতে চাই।
আমার বিষয় ছিল সমাজবিজ্ঞান। খুবই জানা কথা, এই বিষয়টা বর্তমান বাজার ব্যবস্থায় নাজুক একটা বিষয়। এবং আমাদের দেশে সমাজবিজ্ঞান কিংবা মানবিক বিভাগের বিষয়গুলোর প্রতি ছোটবেলা থেকেই একধরণের তীব্র তাচ্ছিল্যের অনুভূতি প্রবেশ করানো হয় মনোজগতে। আমার ক্যাডেট কলেজের কথাই বলি- সেখানে তো অষ্টম শ্রেণিতে সবাই রীতিমত যুদ্ধ করত গণিতে ও বিজ্ঞানে ভাল নাম্বার পাওয়ার জন্য। যারা এসব বিষয়ে একটা নির্দিষ্ট মানে পৌঁছুতে পারবেনা তারা বিজ্ঞান পড়তে পারবেনা। অর্থাৎ, নিজের ক্যারিয়ার যদি ঠিক করতে হয় তাহলে অষ্টম শ্রেণির অংক বিজ্ঞান ভাল করে পড়, তবেই তোমার ভবিষ্যত উজ্জ্বল। সমস্যাটা খেয়াল করে দেখুন, বিজ্ঞান পড়তে হলে অংকের জ্ঞান কিংবা বিজ্ঞানের জ্ঞান প্রয়োজন, তাতে সন্দেহ নেই। কিন্তু এই যে, মানবিকে পড়ার জন্য কোন যোগ্যতার দরকার হয়না- এই যে একটা অসম বিবেচনা তাতেই সমস্যা। মোদ্দাকথা, শুধু বিজ্ঞানের বিষয় কিংবা মানবিক কেন, দুই ক্ষেত্রেই যে একটা ক্রিটিকাল সেন্স থাকা দরকার, তা দুই বিষয়েই অনুপস্থিত। ক্রিটিকাল বলতে বুঝাচ্ছি, বর্তমান জ্ঞানকাণ্ডকে প্রশ্ন করার ক্ষমতা।
তাতো নেই-ই, আছে শুধুমাত্র পরীক্ষায় কিছু নাম্বারের ভিত্তিতে কে কোন বিষয়ে পড়ালেখা করবে তা ঠিক করে দেয়া। এবার আসি বিশ্ববিদ্যালয়ে। বিশ্ববিদ্যালয়ে টিকেছে কিন্তু কম নাম্বার যারা পেয়েছে তারা পড়বে নিচের দিকের বিষয়গুলো। এখানে দেখি, যার যে বিষয় ইচ্ছা সে সেই বিষয় পড়বে। আর আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়ে এমসিকিউ পরীক্ষার ভিত্তিতে আবার সেই তথাকথিত ভর্তিযুদ্ধের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে কে কোন বিষয় পড়বে তা।
এবার চলে আসি সমাজবিজ্ঞানের ডেরায়। যেহেতু বেশিরভাগ ছাত্র-ছাত্রীই পড়ালেখা করেছে বাজারদরে ভাল ভাল বিষয়ে ভর্তির জন্য, সেহেতু সমাজবিজ্ঞান কিংবা সামাজিক বিজ্ঞানের অন্য বিষয়ে ভর্তি হয়ে প্রথম বছর কাটায় পরের বছরে আবার ভর্তি পরীক্ষা দেয়ার জন্য (এখন যেহেতু দ্বিতীয়বার ভর্তি পরীক্ষার সুযোগ নেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে, তাই পরিস্থিতি এখন অন্যরকম হতে পারে, আমি বলছি ২০০৭-০৮-এর কথা)। যে-শিক্ষক শিক্ষিকা আছেন তারাও শুধুমাত্র পরীক্ষার খাতিরে ক্লাস শেষ করে যেতেন। তারা এও অবগত যে, এইসব ছাত্র-ছাত্রীরা নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে এই বিষয়ে ভর্তি হয়েছে। তাই ছাত্র-ছাত্রীদের মধ্যে কেউ যদি প্রকৃতপক্ষে গবেষক হতে চায় তো অন্য ৯৫ শতাংশ ছাত্র-ছাত্রীর মানসিক অবস্থা বিবেচনা করে আমাদের শিক্ষকেরাও আর এইসব মূল বিষয়ের দিকে নজর দিতেন না। যে এসাইনমেন্টগুলো জমা দিতাম, তা কোন যুক্তি ছাড়া মার্কিং করা হত। এও যদি বলে দেয়া হত যে, ঐ জায়গার যুক্তি ভাল হয়নি, এই জায়গাটা আরেকটু ভাল ভাবে লেখা যায়- তাও অনেক হত। এখানে আরেকটা বিষয় আছে। আমাদের শিক্ষক-শিক্ষিকারা প্রতি ব্যাচে প্রায় ২০০ জনের মতো শিক্ষার্থী সামলান। তাই কাকে দোষ দিব?
আমাদের বিশ্ববিদ্যালয় তো আর গবেষণা-নির্ভর নয়। জীবন-যাপনের অনেক ক্রাইসিস আছে, অনেক সমস্যা আছে সব জানি, তবে নামকরা বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মতো প্রজেক্টের উপর শিক্ষকদের পারফরম্যান্স নির্ভর করেনা আমাদের দেশে। আমি যে বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন পিএইচডি করছি সেখানে শিক্ষকদের মূল কাজ লেকচার দেয়া নয় (বিদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে যারা উচ্চশিক্ষা লাভ করেছেন তারা সবাই জানেন এ ব্যাপারটা), বরং, বিভিন্ন প্রজেক্টের ফান্ড যে যত আনতে পারে, তার তত কদর। বিভিন্ন গবেষণার ক্ষেত্র খুঁজে বের করে গবেষণা চালিয়ে নেয়াই মূল কাজ সেসব বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষিকাদের।
প্রথমত, ছাত্র-ছাত্রীদের শেখার কোন আগ্রহ নেই যেহেতু সে ধরেই নিচ্ছে এই জ্ঞান সে কোথাও কাজে লাগাবেনা। অনার্স কিংবা মাস্টার্স পাশ করে সে বিসিএস দেবে কিংবা আরেকটা এমবিএ করে নেবে। আমাদের প্রজন্মের এই ছিল টেন্ডেন্সি। আমিও সেই প্রভাবের বাইরে কেউ নই।
দ্বিতীয়ত, যাদের আগ্রহ নেই শেখার তাদেরকে শিক্ষক-শিক্ষিকা আর কি শেখাবেন? এভাবেই কোনরকমের পাঁচ বছর কেটে যায় একজন সমাজবিজ্ঞান শিক্ষার্থীর। তাহলে কিছুই কি শেখা হয়না? হয়। দুই একজন ক্যারিশমাটিক শিক্ষক থাকেন, তারা ক্লাসে এসে কার্ল মার্ক্স, হেগেল, নিৎশে, দেরিদা, ফুকো, এডওয়ার্ড সাঈদ এদের তত্ত্বকথা খুব বিপ্লবী ভঙ্গিতে বলে আমাদের তন্দ্রাচ্ছন্ন করে রাখতেন। ক্লাসরুমে এসে মাদ্রাসা থেকে আসা ছাত্রকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে দেয়া এবং নেকাব পরা ছাত্রীকে ধুমধাম কয়েকটা প্রগতির কথা শুনিয়ে সামাজিক বিপ্লবের আভাস পেতাম গুমোট ২০০ জন শিক্ষার্থীর সেই ভীড়ে। ক্লাসগুলো বেশ ভালই লাগত।
সেই ক্লাসগুলো করতে গিয়ে সমাজবিজ্ঞানের ব্যাপক পরিসর নিয়ে কিঞ্চিৎ ধারণা হলেও কেমন যেন একটা বুদ্ধিজীবী গোছের একটা বিষয় মনে হতে লাগল। তত্ত্ব কপচানো ছাড়া যেন আর কোন বিশেষ পারদর্শীতা নেই এই বিষয়ের। পাশাপাশি তত্ত্বজগতের সকল তাত্ত্বিকদের ব্যাপারে একটা ভাল আগ্রহও জন্মালো। সৌভাগ্যবশত এমন একটা বন্ধুমহলও জুটে গিয়েছিল যারা এমন তত্ত্ব তালাশ করে বেড়াত।
শুরু হল অ্যামেচার ভঙ্গিতে সমাজবিজ্ঞানের চর্চা। আধুনিক-উত্তরাধুনিক দর্শন চর্চার খুঁটিনাটি নিয়ে একটু-আধটু নিজস্ব ভঙ্গিতে জগতের জানাশোনার সেই উদ্বোধন। নিজের প্রাতিষ্ঠানিক পড়ালেখা বলতে শুধু ক্লাসে যেতাম আসতাম আর পরীক্ষা অ্যাটেন্ড করতাম। যেহেতু শিক্ষার্থীরাও বিমুখ, তাই শিক্ষকেরাও উন্মুখ তাই ডিপার্টমেন্ট থেকে মন তুলে নিলাম। বলে রাখা ভাল, শুধু ডিপার্টমেন্ট নয়, আমরাও সেই অর্থে দোষী। পুরো আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা কিংবা আরো ব্যাপক অর্থে আমাদের সমাজব্যবস্থাতেই একটা কাঠামো আছে যে জন্য এরকম পরিস্থিতির সৃষ্টি। এখন আমাদের এই সমাজব্যবস্থার এই দশা কেন? কেনই বা একে আমি সরাসরি মন্দ বলতে চাইনা-সেই আলোচনায় পরে আসা যেতে পারে।
মোদ্দাকথা, ক্রিটিকাল রাইটিংয়ের যে স্টাইল তা আর রপ্ত হয়নি। কেউ পরীক্ষার খাতা দেখে বলে দেয়নি এই সমস্যা ঐ সমস্যা। ফলাফল হল- মুগ্ধতা নিয়ে তাত্ত্বিকদের লেখা পড়ার অভ্যাস গড়ে উঠল। প্রশ্নের বদলে শুধুই মুগ্ধতা। কিংবা প্রশ্ন তৈরি হলেও তা যে ভাষায় প্রকাশ করতে হবে সেই চর্চার ঘাটতি। ঘাটতি তো দূরের কথা নিজের প্রশ্নগুলোকে যে একটা ভাষায় এনে নির্দিষ্ট ভঙ্গিতে আর্গুমেন্ট দাঁড় করাতে হবে সেই প্রয়োজনই কখনো মাথায় আসেনি।
এ পর্যন্ত ব্রাইটনের জীবন নিয়ে নানা লেখালেখিতে ব্রাইটনের জীবনযাপন বেশি প্রাধান্য পেয়েছে। কিন্তু এই লেখায় পিএইচডি করতে গিয়ে আমার নানা প্রতিবন্ধকতার কথাই উল্লেখ করতে চাইলাম অনেকটা সচেতনভাবেই। পরের পর্বেও এ বিষয়ে আরো বিশদ লিখতে চাই।