ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ব্রাইটনের ব্রিটেনে [পর্ব ১] >> ভ্রমণ

0
254

ইলিয়াছ কামাল রিসাত > ব্রাইটনের ব্রিটেনে [পর্ব ১] >> ভ্রমণ

পর্ব ১

বঙ্গোপসাগরের শঙ্খ বাজে ইংলিশ চ্যানেলের পাড়ে

“সাসেস্কের এই ব্রাইটন শহরের দারুণ একটা দিক হল- Its open for all culture. গ্লোবাল আবহের মধ্যে আছি বলে মনে হয় সবসময়। আফ্রিকা, চীন, জাপান, ভারত উপমহাদেশ, লাতিন আমেরিকা কিছুই বাদ যায়না। একেক জনের একেক রকমের পাগলামি, প্যাশন।”

ইংল্যান্ডের ব্রাইটন শহরের সাথে কক্সবাজারের একটা মিল আছে। দুই শহরেই বিচ আছে। কক্সবাজারের গাঙচিল আর ব্রাইটনের গাঙচিলের একটা পার্থক্য হলো- ব্রাইটনে কানের পাশ দিয়ে শোঁ-করে একটা আওয়াজ দিয়ে চার্চিল স্কয়ারের প্রশস্ত রাস্তা ধরে চলে যায় সমুদ্রের দিকে, কক্সবাজারে এই আওয়াজ পাইনি কোনো দিন।। পুরো শহরটা গাঙচিলে ভরা।
মাঝ বয়সের শুরুতে এসে নিজেকে আবার অ্যাডাপ্ট করতে হচ্ছে নতুন এক সমাজে। ঢাকা শহরের আরবান ফ্লেভার আর এই ব্রাইটন শহরের আরবানিজমের মধ্যে খুব স্বাভাবিকভাবেই অনেক পার্থক্য। আমার প্রিয় ঢাকার চিৎকার চেঁচামেচি তখন জঘন্য লাগলেও এখন তা মিস করি। একাকী মনে হতো না তখন। আর ব্রাইটনে এখন যেহেতু একেবারে শুরুর দিকে, তাই এখানে আপাতত গাঙচিলের উড়ে যাওয়া ছাড়া কোনো শব্দসঙ্গী নাই।
এখানে আসার দ্বিতীয় দিনেই আড্ডা হলো এক ট্যাক্সি ড্রাইভারের সাথে। তার নিজদেশ ইয়েমেন। আমার দেশ বাংলাদেশ জানার পরে সে বলল- ‘আমাদের ইয়েমেন থেকে তোমাদের দেশে হযরত শাহজালাল গিয়েছিলেন।’ আমি তখন শাহজালালের জন্মস্থান কোথায় তা মনে করতে পারছিলাম না। তার কথাতেই সম্মতিমূলক সায় দিলাম। আড্ডাতো চালাতে হবে।
পরে সে বলল- শাহজালালের কথা সে নিজেও জানতো না। সে জেনেছে ব্রাইটনে বসবাসরত বাংলাদেশীদের কাছ থেকে। প্রায় পাঁচ হাজার বাঙালির বসবাস ব্রাইটনে। ড্রাইভার সাকিব আমাকে এও জানাল যে, এই বাংলাদেশীরাই হযরত শাহজালালের নামে ব্রাইটনে একটা মসজিদ তৈরি করেছে।
হযরত শাহজালালের মাজারের জালালি কবুতরের সাথে ব্রাইটনের গাঙচিলের অল্পবিস্তর মিল কোনো কবি হযতো পেয়ে যেতে পারেন কোনো দিন।
গাঙচিলগুলো যখন চার্চিলের বুক ধরে সমুদ্রে আছড়ে পড়ে তখন দুই দেশের মানসিক সীমান্তে শোঁ শোঁ আওয়াজ হতে থাকে।
সাসেস্কের এই ব্রাইটন শহরের দারুণ একটা দিক হল- Its open for all culture. গ্লোবাল আবহের মধ্যে আছি বলে মনে হয় সবসময়। আফ্রিকা, চীন, জাপান, ভারত উপমহাদেশ, লাতিন আমেরিকা কিছুই বাদ যায়না। একেক জনের একেক রকমের পাগলামি, প্যাশন।
আবার আমাদের দেশে যেটা বলে বেড়াতাম যে আমরা পড়ালেখা করিনা, বাইরের সবাই খালি পড়ালেখা করে, অনেক জানে- এই ব্যাপারটা মোটেও স্বতঃসিদ্ধ নয়। এখানেও ফাঁকিবাজ আছে, ক্লাসের সময় গেমস খেলা, বাইরে গিয়ে বিড়ি টান দেয়া ছাত্র-ছাত্রীও আছে। প্যাশনেট কিংবা পাগলাটে চিন্তাবিদ মনে হয় সারা দুনিয়াতেই ঐ গুটিকয়েক। এই গুটিকয়েক লোকই সব পালটে দেয় বিজ্ঞান বলি কিংবা ইতিহাসের চিন্তাধারা, যা-ই বলি।
সবচেয়ে প্রিয় জায়গা এখানকার লাইব্রেরিটা- কোনো ধরাবাঁধা নাই। যার ইচ্ছা সে সাইলেন্ট জোনে গিয়ে পড়ছে, যাদের ইচ্ছা তারা গ্রুপ স্টাডি করছে। আর যার ঘুমের ইচ্ছা সে সোফায় বসে ঘুমাচ্ছে।
মেডিকেল সায়েন্সের ‘বডি’ বা শরীর বিষয়ক বই ঘাঁটতে গিয়ে একটা চিরকুট পেলাম। এই চিরকুটের লেখক কিংবা অনাহুত প্রাপক যেহেতু নিজের ভুলেই এটা বইয়ের ভাঁজে রেখে গেছে তাই এটা আমি পড়লে আশা করি প্রাইভেসি নষ্ট হবেনা। তাই পড়েছি (আত্মরক্ষামূলক যুক্তি দিলাম)।
চিরকুটের লেখাগুলো অস্পষ্ট- মেয়েটা লিখেছে তার ভাললাগা যুবকের প্রতি। বাংলা করলে ব্যাপারটা এমন দাঁড়ায় :
“তুমি আজ লাইব্রেরিতে আসোনি। তাই বলে আমি লেখাপড়া করছিনা তা না। তবে তুমি পাশে থাকলে পড়া আরো ভাল হয়। তুমি থাকলে সম্পূর্ণ লাগে নিজেকে। কারণ তোমার আগে কেউ আমাকে বুঝাতে পারেনি কেন আমি গুরুত্বপূর্ণ! তুমি যেখানেই আছ, তাড়াতাড়ি এসো। আমার অর্থবহতার অনুভব আবার চলে গেলে আমি অস্তিত্বহীন তুলার মতো উড়ে যাব।”
এই চিঠি পড়তে না পড়তে গল্প হলো এক নতুন পিএইচডি ছাত্রীর সাথে। তার বিষয়বস্তু শুনে অসম্ভব রকমের থ্রিলড হলাম। সাহিত্যিক এমিলি ব্রন্টের চরিত্রের দ্বারা অনুপ্রাণিত হয়ে সে একগুচ্ছ কবিতা লিখবে, কয়েকটা ছবি আঁকবে আর কয়েকটা গান কম্পোজ করবে! এই দারুণ জিনিস তার গবেষণার অংশ।
তারই এক বন্ধু গবেষণা করছে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যারা নাৎসি বাহিনীতে ছিল এবং এখনো বেঁচে আছে তাদের স্মৃতিকথা সংগ্রহ করে তার উপর থিসিস লিখবে!
এত গ্রেট সব বিষয়ে গল্প করে করে ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছিলাম ক্ষুধায়। বাঙালির ভাতের ক্ষুধা আর রান্নার ঘ্রাণ নিতে হানা দেই ক্যাফে তুনতুনের ভাইয়া আপুর কাছে। সমাজবিজ্ঞানের এক গবেষণাপত্রে লেখক খাবারের সূচকে পুষ্টির পরিমাণের সূচককে সমালোচনা করে লিখেছিলেন- ‘আমরা ক্যালরি খাইনা, স্বাদ খাই। জিহ্বার ক্ষুধা বড় ক্ষুধা।’
তাইতো, ভাত মাছ ছাড়া আমার চলেনা।

গাঙচিলের আড়ালে গোলাপি আতঙ্ক

এক মাসের বেশি সময় পার করে ফেললাম বিদেশ বিভূঁইয়ে। তারপরেও দেশের সময়ের সাথে মিল রেখে আমার ঘুম ভাঙে। রাত তিনটা চারটার দিকে ঘুম যখন ভাঙে তখন দেশে সকাল ৯-১০টা। অফিস মিস করে ফেললাম এমন অনুভূতি হয়। ঠিক সেভাবেই গত পরশু রাতেও ঘুম ভাঙলো। ঘুম ঘুম চোখে ফেসবুকের নিউজফিডে আধো চোখ বুলাচ্ছি। ব্রাইটনের এক বন্ধুর একটা পোস্ট দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়লাম। ৪-৫ বছরের এক বাচ্চাকে ছিনতাই করে নিয়ে গেছে বিকালের দিকে এক বয়স্ক লোক। চার্চিল স্কয়ারের সামনে থেকে হারিয়ে গেছে। বলে রাখা ভালো, চার্চিল স্কয়ার সবচেয়ে জনসমাগমপূর্ণ এলাকা। সিটি সেন্টার সেখানেই। পুলিশ কর্তৃপক্ষ সিসিটিভি ফুটেজে এক গোলাপি কাপড় পরা মেয়ের সাথে সেই লোকের মিথস্ক্রিয়ার দুই-তিনটা ছবি সব নিউজপেপারে পাবলিশ করে দিয়েছে এবং এর মধ্যে সারা শহরে হেলিকপ্টার রেইড দিয়ে দিয়েছে। ছবিগুলো অস্পষ্ট হলেও কেমন জানি ভুতুড়ে। তার উপর সেইদিন ছিল বনফায়ার নাইট। এইদিনেই ১৬০৫ সালে গাই ফকস তার বিখ্যাত ‘গানপাউডার প্লট’ নিয়ে হাজির হয়েছিলেন রাজতন্ত্র উৎখাতের জন্য। উৎখাত করতে পারেননি। তার বিরুদ্ধেই বনফায়ার নাইট পালন হয়। সবমিলিয়ে রাত ৩-৪টার দিকে আমার পুরো পরিবেশ বেশ ভুতুড়ে লাগতে থাকে।
কিছুক্ষণ পরপর আপডেট নিতে থাকি কি হল। এ করতে করতেই ঘুমিয়ে পড়লাম। সকালে উঠেই নিউজ সাইটে ঢুঁ মারলাম। হেডলাইন এরকম- সিসিটিভির ফুটেজের বয়স্ক লোকটা ঐ মেয়ের বাবা। কেউ একজন পুলিশকে ভুল তথ্য দিয়েছিল। এরপরে সোশ্যাল মিডিয়াতে এত সরগরম দেখে বাবা তার মেয়েকে সাথে করে নিয়ে এসে বলে যান, ‘আমি আমার মেয়ের সাথে চার্চিল স্কয়ারে গিয়েছিলাম ঘুরতে, সিসিটিভির কারণে ব্যাপারটা এত বাজে ভাবে উপস্থাপিত হয়ে যাবে, তা আতঙ্কের।’ পরে থানা-পুলিশ জানিয়ে দিল যে, কোন ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটেনি, মেয়েটার বাবা ছিল ঐ লোক।
শান্ত হলাম। অবাকও লাগছিল। বাবা-মেয়ের স্নেহের ছিনতাইকারী সম্পর্কের এক ট্রমা ততক্ষণে পুরো শহর মাতম করছে। এই খবর মাথায় নিয়ে সারাদিন কেমন জানি অন্যমনস্ক হয়ে ছিলাম।
দুপুর ১টায় জামান ভাইয়ের ক্লাস করার উত্তেজনায় ভুলেই বসলাম সিসিটিভি সমাচার। এই প্রথম সাসেক্স বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্র হিসেবে জামান ভাইয়ের (কথাসাহিত্যিক, গবেষক ও শিক্ষক শাহাদুজ্জামানের কথা বলছি, তিনি আমার পিএইচডি সুপারভাইজার) ক্লাস লেকচার শুনবো। এর আগে সাহিত্যের অনুরাগী হিসেবে শুনেছি বিভিন্ন সেমিনারে, ছাত্র হিসেবে ছিলনা তা। একটা জিনিস খেয়াল করলাম-জামান ভাই শুধু বাংলাদেশীদের মন্ত্রমুগ্ধ করে কথা বলেন না, বিদেশী সকলের কাছেও তার বক্তব্য আকর্ষণীয়। ক্লাস শেষে নানান ছাত্র-ছাত্রী নিজে থেকে অনেক বিষয় নিয়ে তার সাথে কথা বলছিল। কাছ থেকে ব্যাপারটা খুব উপভোগ করছিলাম। লেকচারে জামান ভাই বিশ্বস্বাস্থ্য ও সংস্কৃতি নিয়ে পড়াচ্ছিলেন। এসব বুঝাতে গিয়ে তিনি গবেষকদের দুটি দৃষ্টিভঙ্গির কথা উল্লেখ করলেন। কোন জনপদের সংস্কৃতি কিংবা সমস্যাগুলোকে বুঝতে গেলে দুটো ভিউ থেকে দেখতে হবে- প্রথমটা হলো এমিক ভিউ। এই দৃষ্টি দিয়ে গবেষক বুঝবে কিভাবে একটা জনপদের জীবনযাপন চলে, কিভাবে একটা নির্দিষ্ট আলাদা উপায়ে কোনো কাজ নিজেদের মতো সম্পন্ন করে। এটা মূলত তাদের জীবনের ধরনকেই বোঝায়। জামান ভাইয়ের ভাষায় বলতে গেলে- চলচ্চিত্রের জুম ইন। আর এটিক ভিউ হলো- এই যে পুরো এমিক ভিউ এটাকে একটা বিগ পিকচার দিয়ে যাচাই করা। কনটেক্সচুয়ালাইজ করা- থিওরাইজ করা। অর্থাৎ জুম আউট করা। গবেষকের কাজটা এখানেই। গবেষক এখানে পুরো সমস্যাকে তাত্ত্বিকভাবে ব্যাখ্যা করবেন বিগ পিকচারে স্থাপন করে।
এমিক ভিউ-এটিক ভিউ এসব ভাবতে ভাবতে শেষ হলো ক্লাসটা।

[চলবে]