ইলিয়াছ কামাল রিসাত > মৃত্যুর উত্তর-দক্ষিণ >> ব্রিটেনের ব্রাইটনে >> ভ্রমণগাথা

0
182

পর্ব- ৭
মৃত্যুর উত্তর-দক্ষিণ

জার্মান সমাজবিজ্ঞানী নরবার্ট ইলিয়াস এর ‘The Loneliness of Dying’ বইটা পড়তে গিয়ে বোধিপ্রাপ্ত হলাম এই যে, আধুনিক মানুষের মৃত্যু নিয়ে শব্দভাণ্ডার সংকুচিত হয়ে আসছে। মৃত্যু নিয়ে যেসব শব্দ ব্যবহৃত হয়, তা অনেক রাখাঢাক করে বলা হয় যেন জীবিতরা প্রশান্তি পান, ভয় না পান, যেন দীর্ঘ জীবনের মিথে পচন না ধরে। এবং বিশেষ করে শিশু-কিশোরেরা যেন মৃত্যু নিয়ে কোনরকম ভাবনা না করে, সেজন্য বাবা-মা বিশেষভাবে মৃত্যুর বিষয়টা আলোচনা থেকে দূরে সরিয়ে রাখেন। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, দাদা-দাদী কিংবা নানা-নানীর সমাধিস্থলে যাবার সময় তাদের বলা হয়, তারা বেড়াতে যাচ্ছে দাদা-দাদী, নানা-নানীর সাথে দেখা করতে পার্কে কিংবা উদ্যানে।
মৃত্যুর মতো সত্য বিষয়টা কৌশলে লুকিয়ে রাখা হচ্ছে। কেন লুকিয়ে রাখা হচ্ছে, তারই অনুসন্ধান করছেন নরবার্ট ইলিয়াস এই বইতে। আধুনিকতার অনেক মিথের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল- মানুষ ‘অমর’ হবে একদিন! এই ভাবনার সাথে প্রগতির একটা উচ্চাভিলাসী সম্পর্ক স্থাপিত হয়েছে সেই প্রাচীনকালেই। তাইতো বর্তমান জগতের সবজান্তা গুগল একটা প্রজেক্ট চালু করেছে, যার লক্ষ্য হল মানবজাতির অমরত্ব লাভের প্রযুক্তি উদ্ভাবন করা। এই প্রজেক্ট সফল কিংবা ব্যর্থ যাই হোক, তা সময়ই বলে দেবে।
এই যে আধুনিক মানুষ মৃত্যু নিয়ে রাখঢাক করে কথা বলছে, আমাদের সংস্কৃতিতে ব্যাপারটা একটু ভিন্ন। অন্য অনেক পরিবার কিংবা ঐতিহ্যের কথা জানিনা, তবে অধিকাংশ বাংলাদেশী মুসলমান পরিবারে ছোটবেলা থেকেই মৃত্যু নিয়ে একধরনের ভয় ছড়িয়ে দেওয়া হয়। মুসলমানদের ইবাদত নামাজ আদায়ের জন্যও এই ভীতি সঞ্চারের কৌশল অবলম্বন করে অধিকাংশ পরিবার ও ধর্মীয় আলেম ব্যক্তিগণ।
আলোচনাটা অনেক গভীরে চলে যাচ্ছে। দুই ধর্মের দর্শনের মৌলিক পার্থক্য হাজির করা হয়ে যাচ্ছে। আমি আপাতত এই দর্শনের পার্থক্যে যাচ্ছি না। আলোচনাটা নিবদ্ধ করব মৃত্যু বিষয়টা পশ্চিমা সমাজে অনেকটা সামাজিকভাবেই মৃত হয়ে গেছে, সেই ব্যাপারে। মৃত্যু নিয়ে কেউ কথা বলে না, মৃত্যু নিয়ে কথা বলাটা অনেকটা ট্যাবুর মতো হয়ে গেছে এখানে। সবচেয়ে লক্ষণীয় যে বিষয়টি তা হল, এই একবিংশ শতাব্দীতে এসে তাদের কাছের কোন আত্মীয় যখন মারা যায়, সেই শোকপ্রকাশের কোন ভাষাই তারা খুঁজে পায়না। মৃত্যু নিয়ে তাদের ভাষায় একধরনের বন্ধ্যাত্ব চলছে।
ইলিয়াসের প্রস্তাব হল, মধ্যযুগে অন্তত মৃত্যুটা ছিল অনেক খোলামেলা একটা বিষয়। সামাজিকভাবে কিছু প্রথা ও ঐতিহ্যও চালু ছিল। কিন্তু এখন সেসব প্রথা ও ঐতিহ্য প্রায় মৃত। কেউ মারা গেলে সমাধিস্থলের ব্যবস্থা নিজেদের করতে হয়না, মৃতদেহ বহন করে নিয়ে যাবার কাজ করতে হয়না, এমনকি শেষ মুহূর্তে যে স্পিচ রাখার কথা, তাও ঠিক করতে হয়না। এসব কাজ করে দেয় বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান। সামাজিক শোক প্রকাশের পরিবর্তে এখন ব্যক্তিগত শোক ব্যবস্থাপনায় চলে গেছে মানুষ। তাও আবার ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে সেই সেবা কিনে নিতে হয়। মৃত্যুর সঙ্গে অনেক বিষয় একসাথে জড়িয়ে গেছে- পশ্চিমা যুক্তিবাদ, ব্যক্তিতন্ত্র ও শোকের বাণিজ্যিকীকরণ।
এই যে পরিবর্তন তার প্রভাব কি বাংলাদেশের মতো দেশে পড়েছে? এভাবে প্রাতিষ্ঠানিকতা না পেলেও কিছু অন্তত হয়েছে। পার্থক্য একটাই- আমরা আমদের ধর্মীয় আচারগুলোকে কোন না কোনভাবে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করি, অবচেতনে। আমি ইংল্যান্ডে আসার ঠিক কিছুদিন আগে আমার কর্মস্থলের সর্বোচ্চ পদাধিকারী ব্যক্তির বাবা মারা যান। স্যারের পৈতৃক আবাস ঢাকা থেকে অনেক দূরে দক্ষিণের এক শহরে। ঢাকায় একটা জানাজা পড়া হল। বাকি জানাজা হবে নিজের শহরে। এম্ব্যুলেন্স ভাড়া করা হল- সবচেয়ে দামি এম্ব্যুলেন্স। মৃত লাশের সর্বোচ্চ যত্ন করা হবে তাতে। পুরো গাড়িবহর একসাথে রওনা হল। এম্ব্যুলেন্সটা মধ্যিখানে। বাকি সকল গাড়িতে থাকা আমরা যেন প্রটোকল দিয়ে নিয়ে যাচ্ছি। গাড়ি ধীরে চালানোর কথা বলা হচ্ছে চালককে, যেন মৃত লাশ কষ্ট না পায় (ইন্টারেস্টিং)।
রাত সাড়ে দশটায় ঢাকা থেকে রওনা দিয়েছে লাশসমেত গাড়িবহর। চট্টগ্রামে বিরতি দেয়া হল সেখানকার আত্মীয়স্বজনেরা মৃতের লাশ এক নজর দেখার জন্য। যারা জানাজায় শামিল হতে পারবেন না কক্সবাজারে, তারা এক নজর দেখে যাচ্ছেন, লাশের গায়ে মুখে হাত বুলিয়ে যাচ্ছেন। কেউ দোয়া দুরূদ পড়ে দিচ্ছেন। চট্টগ্রামে প্রায় তিন ঘণ্টা বিরতির পর আবার রওনা দিল সেই গাড়িবহর। কক্সবাজার শহরে প্রবেশের ঠিক আগেই একটা উপজেলায় এক বাড়ির সামনে আরেকটা বিরতি দেয়া হল। বলাবাহুল্য, মৃতের ভাইবোন সেই উপজেলায় থাকতেন। অনেক স্মৃতি সেই বাড়িতে। তাই কিছুক্ষণের জন্য লাশের অবস্থানের জন্য এই বিরতি। সেখানেও এক ঘণ্টার বিরতি শেষে কক্সবাজার শহরে পৌঁছে বিকালবেলা দাফন হল মৃতের।
ব্যাপারটা থেকে যেটা পরিস্কার সেটা হল, আমাদের মতো দেশগুলোতে ধর্ম কিংবা সংস্কৃতি সব আচারের মধ্যে মৃত্যুর একটা সরব উপস্থিতি এখনো টের পাওয়া যায়। সমাজে ‘মৃত্যু’ এখনো জলজ্যান্ত একটা গুরুত্বপূর্ণ আলোচনার বিষয়।
আমার এখনো মনে আছে, আমার দাদী মারা যাবার পর আমার বাবা প্রতি সন্ধ্যায় দাদীর কবরে গিয়ে রাত ৯টা পর্যন্ত ঠায় বসে থাকতেন, মাঝে মাঝে কান্না করতেন, আর প্রায়ই দাদীর সাথে একা একা কথা বলতেন। পুরো পরিবারে শোকের ছায়া নেমে এলেও ছোট-বড় সবাই মিলে মৃত দাদীর স্মৃতিচারণ করেছিলাম। মৃত্যু যেন একটা অবসর যাপনের মতো বিষয় হয়ে উঠেছিল সেই কয়েকটা দিন। কিংবা অন্য কিছু!
এই দূর ব্রাইটনে বসে মৃত্যুর তুলনামূলক ইতিহাসে যখন মেতে উঠছিলাম, তখনই খবর পেলাম কবি আল মাহমুদ মারা গেছেন। মাথায় একটা প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছিল- ‘ যে সকল কবি সাহিত্যিক কিংবা লেখক ভাষার সমৃদ্ধি ঘটিয়ে যান, তাদের মৃত্যুতে এই আধুনিক সময়ে শোকের ভাষা কেমন হতে পারে?
শেষ করছি ‘সোনালি কাবিন’ নিয়ে আল মাহমুদের নিজের অনুভূতির আখ্যান দিয়ে। প্রভাবশালী একটি পত্রিকায় লিখেছিলেন কথাগুলো। তিনি জানতেন, এই কাব্যই তাঁকে বাংলা কাব্যজগতে এনে দেবে অমরতা-
“…একদিন হঠাৎই লিখে ফেললাম ‘সোনার দিনার নেই, দেনমোহর চেয়ো না হরিণী/ যদি নাও, দিতে পারি কাবিনবিহীন হাত দু’টি’—এক নম্বর সনেটটি। লেখার পর আমার সে কী উত্তেজনা—ঘরের ভেতরে পায়চারি শুরু করি, নিজের কবিতা নিজেই মুগ্ধ হয়ে পড়ি! একেকটি সনেট লিখতাম আর ঘরের ভেতর পায়চারি করতাম। সেসব মুহূর্তের কথা বর্ণনা করা যাবে না। আর এখন তো বয়সের ভারে আমার স্মৃতি-বিস্মৃতি সবই একাকার। তাই অনেক কিছু এখন আর মনে করতে পারি না। তবে সনেট আঙ্গিকে আমি প্রেমের কবিতাই লিখতে চেয়েছিলাম। এ জন্য আগেই এ বিষয়ে পড়াশোনা করেছি—প্রথমে আট, পরে ছয় লাইন; সনেটের এই যে ফর্ম—একসময় ইতালিয়ান বেদেরা এভাবে গান গাইতেন। তাঁদের বলা হতো ত্রুবাদুর। তাঁরা যাযাবর ছিলেন। বেদেদের গানকে কবিতার ফর্মে প্রথম রূপ দিলেন পেত্রার্ক। এরপর অনেকেই এ ধারায় লিখছেন। কিটসও লিখেছেন এই ধারায়। বাংলা ভাষায়ও অনেকে লিখেছেন, সার্থক হয়েছেন। মাইকেল মধুসূদন দত্তের সনেট ১৪ মাত্রার। এর অনেক পরে আমি লিখলাম ‘সোনালি কাবিন’। লেখার পরই মনে হয়েছিল, সনেটগুলো বাংলা সাহিত্যে আমাকে অমরতা এনে দেবে। আজ দেখি, আমার ধারণা বেঠিক নয়, আশ্চর্যজনকভাবে সফল হয়েছে সনেটগুলো!”