ইলিয়াছ কামাল রিসাত > হাইডেলবার্গ দুর্গ : ধ্বংস সত্য সুন্দর >> ভ্রমণ

0
217

পর্ব ৯

পাথুরে আর অলিগলিতে উঁচু নিচু পথ ধরে ইতিহাসের ঘ্রাণ নিতে নিতে চলে গেলাম নেকার নদীর পাড়ে। নদীর ওপারে বিশাল পাহাড় আর এপারে সেই দুর্গ। একপলক চোখ পড়ল দুর্গটা। ভাঙা দুর্গ দূর থেকে দেখলে যেমন লাগে, এক মিনিয়েচার ইম্প্রেশন ধরা দিল।

ব্রাইটনের সমুদ্রবিলাস ছেড়ে জার্মানির হাইডেলবার্গের প্রাচীন আর্কেডিয়ায় পাড়ি দিয়েছিলাম কিছুদিন আগে। অতীতের ধ্বংসাবশেষ আর ভবিষ্যতের নগরলীলার এক দোলনায় চড়ে দোল খাচ্ছিলাম সেদিন।
হাইডেলবার্গের নাম বলতেই সবসময় প্রাচীনতম বিশ্ববিদ্যালয়ের নামটাই চলে আসে। গত কিছুদিন আগে এই বিখ্যাত দুর্গের কথা জনমুখে শুনে আসছিলাম। ওইটুকুই। কার্লশ্রুয়ে (Karlsruhe) শহরের একই প্রদেশভুক্ত শহর হাইডেলবার্গ। কার্লশ্রুয়ে সম্পর্কে ইদানিং হয়তো অনেকেই জেনে গেছেন ‘Sheikh Hasina: A Daughter’s Tale’ দেখার পর। মরহুম ওয়াজেদ এই শহরেই গবেষণা করতেন। ১৯৭৫-এর কালো অধ্যায়ের দিনগুলোতে বর্তমান মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তখন এই শহরে অবস্থান করছিলেন। আমাদের দেশের পরিপ্রেক্ষিতে এর বিশেষত্ব আপাতত এটাই। বাকি বিশেষত্ব ও সমাচার অন্য সময়ে করা যেতে পারে। হাইডেলবার্গে ফিরে যাই।
জার্মানির যে ৫/৬ টা শহর ঘুরেছি, সেখানে রাজদুর্গ খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। প্রাক- মধ্যযুগের রাজা-রাজড়ারা উঁচু পাহাড়ে প্রতি প্রদেশেই দুর্গ স্থাপন করে তাতেই অবস্থান ও রাজ্য পরিচালনা করতেন। এসব বিষয়ে বিস্তারিত ইতিহাসবিদেরা বলতে পারবেন। আমি এর বেশি কিছু জানিনা। যেহেতু দুর্গ খুবই সাধারণ বিষয়, তাই হাইডেলবার্গ ভ্রমণের আগে ভেবেই রেখেছি ‘এটা দুর্গইতো, এ আর এমন কি হতে পারে?’ এসব কারণে যাত্রাকালে আহামরি কিছু দেখবো, এরকম আশা ছিলনা। একটা দিন ঘুরে ফিরে খেয়ে দেয়ে কাটাব- এই ছিল মনে!
স্টেশন থেকে নেমেই একটু আধুনিকতা- একটু প্রাচীনতা মেশানো একটা ইম্প্রেশন ধরা দিল। আমার আবার পুরাতন শহরের মিশেল খুব ভাল লাগে। তাই প্রথম ইম্প্রেশন আহামরি দাগ কাটলনা। তার উপর স্টেশনের একেবারে বিপরীতে একটা ভাস্কর্য চোখে পড়ল- লোহার মতো কোন ধাতু দিয়ে গড়া এক যান্ত্রিক ধরনের ঘোড়ার মতা। হঠাৎ দেখলে পিকাসোর কিউবিস্ট ফর্মের ঘোড়া মনে হতে পারে। ‘গুয়ের্নিকা’র একটা ঘোড়ার মতো। ১৯৩০-এর দশকের জার্মান পরিচালক ফ্রিটজ ল্যাংয়ের ‘Metropolis’ সিনেমার আদলে কোন শহর হতে পারে, এমন মনে হচ্ছিল বারবার।
দুর্গের ওদিকে যাব বলেই ঠিক করলাম শুরুতেই। বাস যখন রওনা দিল, ধীরে ধীরে রূপের বদল চোখে পড়তে লাগল। একটু পুরাতন, আরো ঐতিহাসিক একটা গন্ধ ভর করল। সেই পুরনো রাস্তার মতো। বাড়িগুলো দিয়ে এখনো দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সিনেমার শ্যুটিং করানো যেতে পারে, এমন বোধ হচ্ছিল।
বাস যেখানে থামল তার ডান দিক দিয়েই রাস্তা ধরে ৩০০ ধাপের সিঁড়ি ধরে দুর্গে চলে যাওয়া যাবে। মেইন ডিশে যাবার আগে স্টার্টারেই মনস্থির করলাম। তাই নেকার নদি দিয়েই শুরু। নেকার নদীস্থিত ব্রীজের দিকে যেতেই প্রশস্ত রাস্তা আর ঘোরাফেরার স্পেস দেখে মনে হচ্ছিল ‘লাইফ ইস বিউটিফুল’ সিনেমায় শেষ দিকে বাবাকে খুঁজতে ছেলে যখন সুনসান প্রশস্ত রাস্তায় হাঁটছিল, সেই রকম কোন রাস্তা। ইতালির সাথে হাইডেলবার্গ মিলাতে যাবনা। তাও এসব চলে আসে, আমাদের ইউরোপ দর্শনের একটা অংশ জুড়ে তো এইসব সিনেমাই, তাই অবচেতনে চলে আসে এসব দৃশ্যের নস্টালজিয়া!
বাড়িগুলো কেমন জানি খুব কম স্পেসের। পাথুরে আর অলিগলিতে উঁচু নিচু পথ ধরে ইতিহাসের ঘ্রাণ নিতে নিতে চলে গেলাম নেকার নদীর পাড়ে। নদীর ওপারে বিশাল পাহাড় আর এপারে সেই দুর্গ। একপলক চোখ পড়ল দুর্গটা। ভাঙা দুর্গ দূর থেকে দেখলে যেমন লাগে, এক মিনিয়েচার ইম্প্রেশন ধরা দিল। নেকার নদীর ব্রীজের মাঝে দাঁড়িয়ে একপাশে পাহাড় আরেক পাশে দুর্গ রেখে আপাতত নদীদর্শনে নিজেকে ব্যস্ত রাখলাম। ইউরোপের নদীগুলোর মতো প্রশস্ত কিংবা ছড়ানো নয়; কিন্তু একটা সরলরৈখিক সৌন্দর্য আছে, এই ব্যাপারটা খুব ভাল লাগে। রাইন নদী বলি কিংবা লন্ডনে টেমস কিংবা প্যারিসে সেইন- সব শহরেই নদীকে প্রকৃতির সাথে সামঞ্জস্য রেখে একধরনের নদীকেন্দ্রিক নগর ব্যবস্থাপনা খেয়াল করি। এই বিজ্ঞান ও প্রকৃতির মিশেলে জীবনযাপনের ধরন সবাই চায় আজকাল!
নেকার নদীর হাওয়া জুড়ে হাইডেলবার্গের পায়রাগুলো কী-সব বার্তা নিয়ে আসছে তার পাঠোদ্ধার না করেই দুর্গের দিকে হাঁটা দিলাম। বেশি না, ৩০০ ধাপ সিঁড়ি পার করে বাম দিকে হাঁটা দিলাম। পৃথিবীর নানা প্রান্ত থেকে আসা প্রেমিক-প্রেমিকারা কিংবা বন্ধু, শেষ বয়সী এক বৃদ্ধ হাত এক বৃদ্ধাকে হাত ধরে নিয়ে আসছে এই দুর্গের কাছে। প্রকাণ্ড বাগানের মতো পথজুড়ে যা চোখে পড়ল তার দৃশ্যাবলী কেমন হতে পারে তা মাথায় আসছেনা আপাতত।

২০১৯ সালের এই সময়টাতে যখন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স মানুষের কাজকে ছিনিয়ে নিতে পারে এই বিতর্কে ত্রস্ত, পৃথিবী পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়তে পারে এমন ভবিষ্যৎ জেনেও যখন বিভেদের অমোঘ আকর্ষণে টালমাটাল বিশ্ব, তখন হাইডেলবার্গ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ মানব সভ্যতার অমোঘ সত্যের কথাই উচ্চারণ করে- সেটা হলো কিছুই নশ্বর নয়।

হাইডেলবার্গ দুর্গের বিশেষত্বই হলো এর ধ্বংসাবশেষ, প্রাচীনতার ইম্প্রেশন। ভাঙা দুর্গের পরিখা আর পুরো নগরী দেখার যে পয়েন্ট, তা একেবারে মিলেমিশে আছে। তখনকার রাজাধিরাজ এই জায়গা থেকেই হয়তো নিজের রাজ্যের দেখাশোনা করতেন। নেকার নদীর স্রোত, পাহাড়ের হাতছানি ও পুরো শহরটা যেন বার্ডস আই ভিউর মতো ধরা দেয়।
একটু ইতিহাসের দিকে যাই। এই দুর্গ দুইবার ভেঙেছিল। ১৩শ শতকের দিকে এটি নির্মাণ করা হলেও বিভিন্ন ধাপে এর নির্মাণ সম্পন্ন হয়। কিন্তু ১৭ শতকের শেষ দিকে ফরাসিদের সাথে এক যুদ্ধে এর অনেকখানি ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়। পরবর্তী কালে অনেকবার এটি পুনঃনির্মাণ করা হয়। কিন্তু গথিক স্টাইলের এই দুর্গে সেই ধ্বংসের চিহ্ন তখনকার স্থাপত্য-নন্দনে আলোড়ন ফেলে দিয়েছিল। বিতর্ক উঠেছিল দুর্গটার সৌন্দর্য রক্ষা কিভাবে হতে পারে? পুনরায় নির্মাণ করে নাকি ধ্বংসাবশেষ অক্ষুণ্ণ রেখে? এই নান্দনিক চমৎকার বিতর্কের মধ্যে নতুন একটি ধারণাও প্রতিষ্ঠিত হাইডেলবার্গ দুর্গের মাধ্যমে, আর তাহল- ধ্বংসের রূপ সৌন্দর্য্য হয়ে ধরা দিতে পারে। তাই এখনো অক্ষত আছে এসব ভগ্নাংশ। আরো ভেতরে গেলে প্রকাণ্ড বাগানে হাঁটতে হাঁটতে চোখ যায় পুরো একটা ভবন ধ্বসে পড়ে আছে এখনো। দ্বিতীয়বার ভেঙেছিল বজ্রপাতে।
২০১৯ সালের এই সময়টাতে যখন আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স মানুষের কাজকে ছিনিয়ে নিতে পারে এই বিতর্কে ত্রস্ত, পৃথিবী পরিবেশ বিপর্যয়ে পড়তে পারে এমন ভবিষ্যৎ জেনেও যখন বিভেদের অমোঘ আকর্ষণে টালমাটাল বিশ্ব, তখন হাইডেলবার্গ দুর্গের ধ্বংসাবশেষ মানব সভ্যতার অমোঘ সত্যের কথাই উচ্চারণ করে- সেটা হলো কিছুই নশ্বর নয়। ধ্বংস হবে অনেক কিছুই!
সভ্যতার উত্থান-পতনেই মানব ইতিহাসের পর্যায়গুলি বিভক্ত। আলোচনা হয় প্রযুক্তি তুলনা কিংবা নগর ব্যবস্থাপনার। এই ধ্বংসাবশেষের দুর্গের অন্যতম এক বৈশিষ্ট্য হল এটা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অক্ষত অঞ্চলগুলোর মধ্যে অন্যতম। অনেকে মনে করে থাকেন, এই দুর্গের আগের ধ্বংসাবশেষের চিহ্ন অক্ষত থাকাতে পরাক্রমশালী বোমারু বিমান একে আবার ধ্বংস করতে চায়নি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এক আমেরিকান সৈনিক এই ভাঙা অংশের ছবি তুলছিল। তখন দুর্গে ঘোরাফেরা করছিল হাইডেলবার্গ বিশ্ববিদ্যালয়ের এক অধ্যাপক। সেই সৈনিক অধ্যাপকের কাছে জানতে চাইল- এই দুর্গ এভাবে ধ্বংস করল কারা? অধ্যাপক মুচকি হেসে উত্তর দিয়েছিল- ‘তোমরা ভেঙেছ, ভুলে গেছ?’
সেই সৈনিক কিছুক্ষণের জন্য বিমূঢ় হয়ে রইল। কারণ ধ্বংসের চিহ্নগুলো এত তরতাজা আর অমলিন! সৈনিক জানে তারা তা ধ্বংস করেনি, তাও ধ্বংসের ক্রমাগত উপস্থিতি তাকে বিহ্বল করে দিয়েছিল।

একটা জাতি কতটা প্রাণশক্তি থাকলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে আবার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সত্যি, গ্যেটে, মার্কস, হেগেল, রিলকের দেশ জার্মানদের পক্ষেই এটা সম্ভব।

আমিও কিছুক্ষণ ডুবে ছিলাম নেকার নদীর হাওয়ার দিকে তাকিয়ে। কিছুটা হাঁটতে গিয়ে দূরে দেখি একটা ছোট স্মৃতিস্তম্ভ। কাছে গিয়ে দেখলাম জার্মান সাহিত্যের মহান বিশ্বনন্দিত বিশ্বসাহিত্যিক গ্যেটের স্মৃতিস্তম্ভ। সেখানে গ্যেটের ছবি আঁকা ও জার্মান ভাষায় লেখা আছে, “এই দুর্গে তিনি এসেছিলেন।” এখান থেকে ফিরেই হয়তো তিনি দিয়েছিলেণ এই বাণী দিয়েছিলেন : The work of art may have a moral effect, but to demand moral purpose from the artist is to make him ruin his work.
দুর্গ থেকে ফিরে আধোঘুমে আমি দেখছিলাম দুর্গে বসে আছি গ্যেটের ‘সাফারিংস অব ইয়াং ওয়ার্দার’ হাতে নিয়ে। ওয়ার্দার নিজেকে ধ্বংস করেছিল, গ্যেটের পাঠকমাত্রই সেটা জানেন। দুর্গটি দেখতে দেখতে ধ্বংসাবশেষের ভেতর থেকে উঠে আসা জার্মানদের কথা ভাবছিলাম। একটা জাতি কতটা প্রাণশক্তি থাকলে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ক্ষত কাটিয়ে বিশ্বজুড়ে আবার নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে। সত্যি, গ্যেটে, মার্কস, হেগেল, রিলকের দেশ জার্মানদের পক্ষেই এটা সম্ভব।
[চলবে]