ইশরাত তানিয়া >> পুনরুত্থানের সময় >> ছোটগল্প

0
363

পুনরুত্থানের সময়

তেল চিটচিটে পাতলা কাঁথার তলে ঝাঁকি খেয়ে শরীর নড়ে ওঠে।
নরম হয়ে আসা সুতার সূক্ষ্মতা দিয়ে দ্বিধাদ্বন্দ্ব শেষে মাঘের হিমকনা শরীরের ভিতর ঢুকে গেলে, কফিলউদ্দীনের মনে হয় এইসব বদ জিনের কারসাজি। হাওয়ায় ভর দিয়ে জোছনা কাঁথা ফুঁড়ে ঢুকতে পারে না। আলোর কিয়দংশ কাঁথার ওপর পায়ের কাছটায় পড়ে থাকে। অধিকাংশটুকু বিছানার অন্য পাশে। এমনতর ঝাঁকি কেই-বা তাকে দিবে? হয়তো ঠা ঠা গুলির শব্দে এমন কাঁপুনি উঠল ঘুমন্ত শরীরে। ভয়ে কুঁকড়ে বিছানার সাথে সিঁটিয়ে গেল কফিল। এই বুঝি ঘিলু ছিটকে মাখামাখি হয়ে যায় কাঁথা-বালিশে। পর মুহূর্তে চোখ খুললে মনে পড়ে যুদ্ধ শেষ হয়ে গেছে।
হয়তো ডাল ভেঙে পড়েছে টিনের চালে। একবারও তার মনে হয় না এইটা রাতচরা পাখির কারবার হতে পারে। অথবা কোনো বদ ইনসানের ছোঁড়া ঢিল ছিটকে পড়েছে। কফিল ভেবে নেয় এই আওয়াজ মানে খড়ের উপর দিয়ে বদ জিন উড়ে গেছে। কালেমা তৈয়ব পড়ে সে। লম্বা লম্বা শ্বাস নিয়ে বোঝার চেষ্টা করে তামাকের গন্ধ পাওয়া যায় কিনা। খালের ওপর থেকে ঠাণ্ডা বাতাস কুয়াশা নিয়ে আসে। তামাকের গন্ধ পায় না কফিল। হাড় জিরজিরে কালোকুলো নিজের শরীরের ওপর বোঁটকা গন্ধ ছড়ানো কাঁথাটা জুত মতো টেনে নেয়। এবার কাঁথা ছেড়ে কিঞ্চিৎ চাঁদের আলো পড়ে থাকে বিছানার অর্ধেকে।
আকাশে চাঁদ প্রায় নিবু নিবু। আন্ধার নিশি ঘোলা হয়ে অস্পষ্ট আলো ফুটছে। আর দেরী করা চলে না। কাঁথা সরিয়ে উঠে পড়ে সে। দোর খুললে ঘন কুয়াশা ভেদ করে দৃষ্টি বড়জোর একহাত দূরত্ব অতিক্রম করতে পারে। তলপেটে পেচ্ছাবের বেগ বাড়ে কফিলের। আছাড়পিছাড় খেয়ে বাড়ির পাশে জঙ্গলে দুই পা ইটের ওপর তুলে ছরছর করে পেশাব ছাড়ে। অ্যামোনিয়ার গন্ধে নিজেরই মাথাটা ঝিমঝিম করে।
জীবনটা তার ম্যান্দামারা। এই জীবন নিয়ে কী করতে পারে, ভাবতে ভাবতে তব্দা মেরে যায় কফিল। বউ ছিল কোনো কালে। এখন বাপের বাড়ি থাকে। এই গ্রামেরই আরেক মাথায়। এমন ভাদাইম্যা লোকের সংসার করার কোনো ইচ্ছা তার নাই। কফিলের বাবা নাই, মা নাই। এক বোন ছিল। যুদ্ধের আগেই দফায় দফায় সবাইরে কবরের মাটি টেনে নিলে তাজ্জব হয় কফিল। মাটির হিসাব বড় কঠিন হিসাব। ফুফুদের অভিশাপেই ভিটামাটিতে একদিন ঘুঘু চড়বে। হাড়ভাসা বুকের ওপর হাত বুলায় কফিল। তখন হয়তো শীতে কয়েকটা পাতা খসে পড়ে গাছআলগা হয়ে। মৃদু শব্দ ওঠে। কিন্তু কফিলের কান পর্যন্ত যায় না।
কফিলের বাপে দুই বোনকে সম্পত্তির ভাগ দেয়া দূরের কথা ঘরের ভিটায়ও উঠতে দেয় নাই। ঘরের ভিট থেকে চালতা গাছের নিচ পর্যন্ত উঠানের জমিনে গড়াগড়ি করে কাঁদে দুই বোন। তাদের পরনের মলিন শাড়ি আরও মেটেরঙা বাদামি হয়ে যায়। কফিল আর কচি সবুজ থেকে গাঢ় সবুজ হয়ে যাওয়া বাপের আমলের চালতা গাছ, শেষতক এই দুই, বাদামি হয়ে যাওয়া শাড়ির সাক্ষী হয়ে থাকে।
আচমকা খেজুরের রসের গন্ধ নাক থেকে মস্তিষ্ক হয়ে জিভে ঠোক্কর মারে। কফিল শুধু জিভ থেকে লালার নিঃসরণ টের পায়। জিভ দিয়েই গলার দিকে লালা ঠেলে দিয়ে যেন গুড় দিয়ে মুড়ি খাবার ইচ্ছাটাকেই গিলে নেয়। ভাঙা ট্রাঙ্ক থেকে ইঁদুরেকাটা নীল মাফলার বের করে কফিল। হাড্ডিসার খাটো শরীরে লুঙ্গির খুট থেকে পয়সা গুনে আবার রেখে দেয়। দুপুরের দিকে চক্ষু মুদে শোওয়া ছিল কফিলের বাপের স্বভাব। এই নিদের তোড়ে ভেসে গেছে বাজারের দোকান। নিদ পাড়তে পাড়তে জমিবেচা সাইকেল, রেডিও ইত্যাদিও খোয়া গেছে যথাসময়ে। এখন এককানি জমি দিয়ে সারা বছরের খোরাক হয় না কফিলের। বাপের ঘুমের স্বভাব না পেলেও গায়েগতরে মজুর খাটার তাকত নেই কিনা তাই এক-আধবেলা খেয়ে না খেয়ে কফিলের দিন চলে।
কয়েকদিন আগেও ঘুমের ঘোরে শরীর ঝাঁকি দিয়েছিল। সন্ধ্যায় জামাইল্যার চায়ের দোকানে কাঠের বেঞ্চে বসে দু পা নাড়তে নাড়তে কফিল সেই ব্যাপারটার ফয়সালা করছিল মনে মনে। না জানি কেমনতর ঘুমের ঘোর লেগেছিল চক্ষে। ঠিক য্যান শ্যাক মুজিব। মুখে কালো পাইপ।
– আমি আসছি কফিল উদ্দিন। তোরে নিয়া যামু।
-ডর করে।
-ডর কী রে ব্যাটা? আমি আছি না? যাবি?
-কই যামু। ঢাকা?
– এত ডরাইস না। মিলিটারির লগে যুদ্ধ করবি ক্যামনে?
– বন্দুক দেখলে ডর করে।
কালো পাইপ থেকে ধোঁয়া ছাড়েন নেতা। মুগ্ধ চোখে চালতা গাছের দিকে তাকিয়ে থাকেন – কী ঢকের গাছ হইছে! চালতা ধরে কেমন?
-হ। ভালোই ধরে। কেডায় খাইব? পোলাপাইনে নিয়া যায়।
-ভয় নাই। ট্রেনিং নিতেছে ‘মুক্তি’রা। তুইও ট্রেনিং নিবি। দ্যাশটারে বাঁচান লাগবো।
চুপ করে থাকে কফিল। মুখ তুলে দ্যাখে শেখ মুজিবের মুখ চালতার সাদা ফুলগুলোর সাথে মিশে যাচ্ছে। ধন্দ লাগে কফিলের চোখে। আসমান থেকে জোছনার দুধ ঝরে পড়ে যেন জমাট বেঁধেছে চালতাফুলে। ঘোরগ্রস্ত হয়ে সবুজ চালতা পাড়ে কফিল। হাতের ওপর ডিনামাইটের মতো বিকট শব্দে সেই চালতা ফেটে গেলে একঝাঁকিতে নিদ ছুটে যায়। বারুদের গন্ধের বদলে কালো পাইপের তামাকের গন্ধ ভুরভুর করে। এত পষ্টাপষ্টি সব। এই গন্ধ ঘুমে না জাগরণে কফিল ঠাহর করতে পারে না। ভয়ে মুখ হাঁ করে শ্বাস নেয়। নেতারে সে বলতেই পারল না, ট্রেনিং নিতে গিয়ে ভয়ে পালিয়েছে। রাইফেল, ডিনামাইট দেখেই সে কাঁপছিল। নিজের মনে বিড়বিড় করে শেখ মুজিবের সাথে অসমাপ্ত কথার সমাপ্তি টানে কফিল – বন্দুক দ্যাকলে য্যান ভূমিকম্প হয়, এমুন হেই ঝাঁকি। ডরে কাঁপন উঠে।
সেই রাতে শেখ মুজিব অবাক হয়েছিলেন। জানানো হয়েছিলো তাঁর সাথে একজন দেখা করতে এসেছেন। ব্যক্তিটি যে জুলফিকার আলী ভুট্টো, সেটা তিনি ভাবেন নাই। লায়ালপুর জেলে ফাঁসির আসামীর সেলে তাঁর দিনরাত কেটে যায়। নিঃসঙ্গ কারাবাসে রেডিও নাই, পত্রিকা নাই। মৃত্যুদণ্ড দেয়া হবে জেনেও আশ্চর্য অবিচল তিনি। ভুট্টোকে দেখে ভাবছিলেন – এখানে সে ঠিক কীভাবে? আর ভুট্টো দেখছিল বন্দী নেতার একমাথা ঘন চুলে ধূসরতার পরিমাণ বেড়েছে। শুকিয়ে গেছেন শেখ মুজিব। একটু যেন থেমে থেমে হেঁটে এলেন। তখনও তিনি জানেন না ভুট্টো পাকিস্তানের সিএমএলএ এবং প্রেসিডেন্ট আর তিনি স্বাধীন বাংলাদেশের প্রেসিডেন্ট।
-আপনি চাইলে যখন খুশি চলে যেতে পারেন। ভুট্টো বেশ স্বাভাবিক গলায় বলেন – কিন্তু দুই দেশের মধ্যে আমি যোগসূত্র রাখতে চাই। এর জন্য দরকার আনুষ্ঠানিক চুক্তি।
শেখ মুজিব বুঝতে পারেন না আদৌ কী তিনি মুক্ত নাকি বন্দী। মুক্তি আর মুক্তির প্রতিশ্রুতির ধোঁয়াটে পার্থক্যটুকু জানেন বলেই উচ্ছসিত হন না। চিন্তিত চোখে তাকান ভুট্টোর দিকে। এটা কি তাহলে শর্তসাপেক্ষে মুক্তি? দৃঢ়ভাবে তিনি বলেন – জনগণের সাথে কথা না বলে আমি কিছু বলব না। আগে ফিরে যাই, দেশের মানুষ কী বলে শুনি।
– আর কিছুদিন এখানে থাকতে পারেন কি না ভেবে দেখবেন।
হতাশার একটি নিঃশ্বাস সাবধানে ভুট্টোর ফুসফুস থেকে বেরিয়ে আসে। দুদেশের মধ্যে আবার সম্পর্ক গড়ার সম্ভাবনাকে শেখ মুজিবুর রহমান মৌখিক নিশ্চয়তাটুকু পর্যন্ত দিলেন না। এদিকে জাতিসংঘের চাপ। সোভিয়েত সরকার সতর্ক করে দিয়েছে- শেখ মুজিবের কিছু হলে দায় পাকিস্তানের। জুলফিকার আলী ভুট্টো চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়ালেন। এই বন্দিকে আটকে রেখে লাভ নেই।
কফিল দেখে স্টোভে আগুন দেয় জামাইল্যা। চাদরে মাথাসহ তার শরীর পেঁচিয়ে রাখা। মুখখানা শুধু দেখা যায়। হাত দুইটা বার বার চাদরের ভেতর থেকে বের করতে হয়। এতেই জামাইল্যার হাত বরফের চাক্কা হয়ে গেছে। দুই হাতের পাতা ঘষে ঘষে সে তাপ বাড়ানোর চেষ্টা করে তারপর লাকড়ি ঠাস্‌তে থাকে চুলার মুখে। আরেক বেঞ্চে বসে আছে পার্টির তিনজন লোক। কফিল দেখে কুয়াশায় খড়ি আর লাকড়িগুলো চুপসে আছে তার শিশ্নের মতোই। আগুনে কিছু শুকনা পাটকাঠি পুড়লে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে। নারকেলের মালা থেকে একমুঠ তুষ নিয়ে চুলার মুখে ছেড়ে দেয় জামাইল্যা। লকলক করে আগুন দাপায়। বাতাসে জিভ চাটে। জালাইল্যার চায়ের কেতলিতে পানি টগবগ করে বলক তোলে।
– নেতারে কি মুক্তি দিছে?
– রেডক্রসের বিমান ভাড়া কইরা পিণ্ডি এয়ারপোটে রাখছে।
– চা দে জামাইল্যা।
– রেডিওতে কইতাছে পিআইএ’র বিমান। ভুট্টো কিন্তু বলে নাই নেতারে কই লইয়া যাইতাছে।
– পিঞ্জিরার পাখি উড়িয়া গিয়াছে। এইডা কইছে।
– ঢাকায় আসব মনে হয়?
– রেডিওতে শুনছি বঙ্গবন্ধু লন্ডন পৌছাইছেন।
চা পাতা দিয়ে কোনক্রমে ঠোঁট নাড়ায় জামাইল্যা – এমুন জাড় পড়ছে এইবার। কী কও কফিল ভাই? খকখক করে কাশে জামাইল্যা। পিচ্ছিল কফ ফেলে দোকানের খুঁটির বাইরে। মাটিতে পড়ামাত্র এক ঘুর্ণি খেয়ে কফের দলা ধূলার পাতলা পরতে ঢেকে যায়। সেদিকে ভ্রুক্ষেপ না করে একে একে তিনটি চায়ের কাপ বাড়িয়ে দেয় পার্টির লোকজনের হাতে। পার্টির উছিলায় সেদিন এককাপ চা জুটে গিয়েছিল কফিলের কপালে।
জীর্ণ শিকা থেকে কয়লা নিয়ে সে দাঁতে ভাঙে। চিবিয়ে ডান হাতের মধ্যমা দিয়ে দাঁতের ওপর ঘষে নেয়। ট্যাপ খাওয়া টিনের ঘটি থেকে পানি নিয়ে কুলকুচি করে। মুখের ভিতর থেকে পানি যত দূরে সম্ভব ছুঁড়ে ফেলে। দুর্বাঘাসের গায়ে সেই কয়লাকালো পানি লেগে থাকে দুই এক মুহূর্ত। তারপর গড়িয়ে নেমে যায়। এতে মাটির খয়েরি রঙ কালচে মেরে যায়। মুখ ধুয়ে সিজদার ভঙ্গিতে মাথা নিচু করে লুঙ্গি তুলে ধরে কফিল। নরম কাপড় পানির ফোঁটাগুলো শুষে নেয় হাত আর মুখ থেকে। তখন গুড় জ্বাল দেয়ার বাসনা নাকের ভেতরে ঢুকে এমন ধাক্কা দেয়, কফিলের আবারও মনে হয় বহুদিন এই ঘরে মেয়েছেলের ছাপ নাই। বিহানে কী বৈকালে পিঠামিঠা নাই। মাঘ মাসে খ্যাতাবালিশে রোদের ওম নাই।
ইঁদুরেকাটা নীল মাফলার গলায় জড়িয়ে মনটা খারাপই হয়। গোল করে কাটা জায়গাটা বুকের ওপর হাঁ করে তাকিয়ে আছে। কয়েকবার ভাঁজের মধ্যে ঢোকানোর চেষ্টা করেও ফায়দা হয় নাই। ফুটাওয়ালা মাফলারে অসুবিধা নাই কিন্তু এই মাফলার পরে নেতার সাথে দেখা করতে হবে ভেবে কফিল কষ্ট পায়। বাসের চাকা যত জোরে ঘোরে, জানলা দিয়ে তত আসে হাওয়ার ঝাপট আর ধূলাবালি চোখে নাকে ঢুকে যায়। শুকনো ঠোঁট-জিভের ওপর বালি কিচ কিচ করে। একসময় পেট্রোলের গা-গোলানো গন্ধটা বাইরে যেতে গিয়েও যায় না। দুলুনিতেও ঘুম আসে না কফিলের। স্নায়ু এতটুকু শিথিল হয় না। জানলার ওপাশে ভোর ফুটে ওঠে।
লন্ডনের শীতের সকাল। বাইরে ঝিরঝিরে বৃষ্টি। এডওয়ার্ড হিথ কিন্তু এই হঠাৎ ভিজিটের কথা জানেন না। আসলে তিনি লন্ডনেই ছিলেন না। পিআইএ’র বিমান হিথরো বিমানবন্দরে নামার এক ঘণ্টা আগে পাইলট লন্ডনে রেডিওবার্তা পাঠিয়েছে। ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বুঝলেন শেখ মুজিবুর রহমানকে লন্ডনে নিয়ে আসা হচ্ছে।
বিমান বন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ থেকে সেন্ট্রাল লন্ডনের ক্ল্যারিজেস হোটেলে এলেন শেখ মুজিব। বড় ছেলের সাথে ফোনে কথা বললেন – তোরা সবাই বেঁচে আছিস তো? কেমন আছে তোদের মা? বেগম মুজিবের গলা আর্দ্রতায় বুঁজে আসছে। মানুষটার কথা আর শুনতে পাবেন কিনা সেই আশঙ্কা থেকে নির্ভার হয়ে চোখ মোছেন শাড়ির আঁচলে। হোটেলের বাইরে ব্রিটেনে-প্রবাসী হাজার হাজার বাংলাদেশের মানুষ। বৃষ্টির জলের সাথে মিশে যাচ্ছে তাঁদের আনন্দাশ্রু। শুধু লন্ডন নয় বার্মিংহাম, ম্যানচেস্টার থেকেও মানুষ ছুটে আসছে।
তড়িঘড়ি করে এডওয়ার্ড ফিরলেন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে। বাংলাদেশকে ব্রিটেন তখনও পর্যন্ত স্বীকৃতি না দিলেও তিনি সম্মান জানালেন শেখ মুজিবকে। অফিসের বাইরে এসে শেখ মুজিবের গাড়ির দরজা খুলে দিলেন। সেখানে এক ঘণ্টা আলোচনা হলো। সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রয়োজনে ব্রিটিশ সহায়তার প্রতিশ্রুতি দিলেন এডওয়ার্ড।
ক্ল্যারিজেস হোটেলের বলরুমেই প্রথম প্রেস কনফারেন্স করলেন শেখ মুজিব। সারা বিশ্বের রাজনীতি তাকিয়ে আছে লন্ডনের দিকে। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি বিশ্বকে জানালেন তাঁর মুক্তির খবর। হাত থেকে কালো পাইপ নামিয়ে রাখলেন। দৃঢ়স্বরে তিনি বললেন – মুক্তির মহাকাব্যিক সংগ্রাম শেষে আমরা স্বাধীনতা অর্জন করেছি… আমার লক্ষ লক্ষ মানুষের যেন মৃত্যু না হয়…
সাংবাদিকদের সাথে প্রশ্নোত্তর শুরু হয়। প্রশ্ন শেষ হয় একসময়। শেষ হয় শেখ মুজিবের উত্তরও। যুদ্ধবিদ্ধস্ত দেশটার জন্য মন বড় অস্থির তাঁর। ব্রিটিশ সরকারকে অনুরোধ করলেন দ্রুত তাঁকে দেশে পাঠানোর জন্য। লন্ডনে একদিনের যাত্রাবিরতির পর ব্রিটিশ বিমান বাহিনীর কমেট জেট আকাশে উড়াল দিল ঢাকার দিকে। শেখ মুজিবকে নিয়ে।
তুমুল হর্ষধ্বনি শুনলেন তিনি। কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইলেন প্লেনের সিঁড়িতে। তীব্র সূর্যালোক চোখে সইয়ে নিতে যতক্ষণ। ইন্দিরা গান্ধীর অনুরোধে দেশে ফেরার পথে নয়া দিল্লীতে সাময়িক যাত্রাবিরতি। দুধাপ করে সিঁড়ি পেরিয়ে নিচে নেমে এলেন শেখ মুজিব। লালগালিচা পেতে, গান-স্যালুটে তাঁকে স্বাগত জানানো হলো। তিনি দেখলেন মন্ত্রিপরিষদের সাথে আছেন ভি ভি গিরি আর ইন্দিরা গান্ধী। বেজে উঠল আমার সোনার বাংলা…
বিমানবন্দরের আনুষ্ঠানিকতা শেষ হলো। মোটর শোভাযাত্রায় শেখ মুজিব এলেন দিল্লী প্যারেড গ্রাউন্ডে। সেখানে পাবলিক মিটিং হবে। একই সাথে আনন্দিত আর পরিশ্রান্ত শেখ মুজিবুর রহমান। রাষ্ট্রীয়ভাবে এই প্রথম বিদেশের মাটিতে কোনো জনসমাবেশে ভাষণ। উন্মুক্ত মঞ্চে ইন্দিরা গান্ধীর ভাষণের পর ইংরেজিতে ভাষণ শুরু করলেন তিনি। জনতার সারি থেকে জোর দাবি এলো ভাষণ দিতে হবে বাংলায়। আপ্লুত হন তিনি। একবার তাকালেন পাশে দাঁড়ানো ইন্দিরা গান্ধীর দিকে। মৃদু হাসি ইন্দিরার ঠোঁটের কোণে।
– ভাষণ বাংলাতেই হোক। শ্রীমতি গান্ধীর অনুরোধ করলেন শেখ মুজিবকে।
অযুত হাসি ভাসছে রোদের আলোয়। আপ্লুত শেখ মুজিব প্রাণখোলা হাসি দিয়ে শুরু করলেন – আমার ভাই ও বোনেরা। সঙ্গে সঙ্গে উল্লাসে ফেটে পড়ল জনতা। হাততালি দিয়ে স্বাগত জানালো স্বাধীন বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতিকে। ভারত সরকারের লম্বা যাত্রাবিরতির প্রস্তুতি সংক্ষিপ্ত করলেন তিনি। আড়াই ঘণ্টার যাত্রাবিরতির পর দেশের উদ্দেশ্যে উড়াল দিলেন। নিঃসঙ্গ কারাবাসে একফোঁটা কাঁদেননি, অথচ এ মুহূর্তে থেকে থেকে কেন যেন চোখ ভিজে উঠছে।
গুলিস্তান বাস টার্মিনালে নেমে রুখা দাঁড়ির ওপর দিয়ে গাল চুলকায় কফিল। তারপর হাঁটতে থাকে স্বাধীন দেশের রাস্তায়। তামাকের গন্ধ পায় হঠাৎ। থমকে দাঁড়ায় কয়েক মুহূর্ত। তারপর এই গন্ধ ঢাকা শহরের বাতাসে এলো কীভাবে এই ভাবনায় আচ্ছন্ন হয়ে হাঁটতে থাকে কফিল। লুঙ্গির নিচে পুরনো কোহিনূর হাওয়াই চপ্পল পরা আরও পুরনো দুটো পা ধূলায় ধূলায় সাদা হয়ে যায়। শুকিয়ে আসা পায়ের পাতার ফাটল রক্তে নরম হয়ে ওঠে। পায়ের নিচে কড়কড় করে ভাঙে ইটের খোয়া কিংবা মাটির ঢ্যালা। তোপখানা রোড পার হয়ে সেগুনবাগিচার দিকে মানুষের উত্তাল ঢেউয়ে বুদবুদের মতো তলিয়ে যায় কফিল। ফের ভেসে ওঠে মুখে শ্লোগান নিয়ে। চারপাশে অবিরাম জয় বাংলা। মুহুর্মুহ তোমার নেতা আমার নেতা শেখ মুজিব, শেখ মুজিব।
কত অমাবস্যা পূর্ণিমার পরে আজকে দেশে আসবে নেতা তাই সূর্য যেন আরও লাল, আরও প্রকাণ্ড হয়ে সকালের ছাইরঙা আকাশ ছেয়ে ফেলেছে। হেলিকপ্টার উড়ছে। নিচে অগণন নারী-নর হাঁটছে তো হাঁটছেই। ম্যান্দামারা জীবনে এমন দৃশ্য দেখে নাই কফিল। মানুষ আর মানুষ। রাষ্ট্রসীমানার মফঃস্বল আর নগরী থেকে এরা রাজধানীতে এসেছে জমি আর পানি ডিঙিয়ে। এদের কেউ এসেছে মাংস ভাত খেয়ে। কেউ দুধ ভাত, কেউ শুকনা মুড়ি খেয়ে। অবিমিশ্র আনন্দ বেদনায় কেউ তিব্বত স্নো মেখে, কেউ খড়ি ওঠা গালে। কেউ পাপ, কেউ পুণ্যের কাজ সেরে। কারো হাতে ঢোল-বাঁশি, পত্রিকা, কারো হাত খালি। কফিল জানে না বাংলাদেশ বেতার থেকে ধারাবিবরণী প্রচার করছে। প্রচার হচ্ছে আকাশবাণী আর বিবিসির স্পেশাল বুলেটিন। নিরক্ষর কফিল পড়তে পারে না, আজকের দৈনিক ইত্তেফাকের শিরোনাম – ‘ওই মহামানব আসে…’
মানুষের ঢেউয়ে মিশে যায় কফিল। সবাই যেন তারই মতো বেঘোর আন্ধার ঘুম থেকে উঠে এসেছে। সেগুনবাগিচা থেকে রমনা পার্কে যাবার পথে শত শত থেকে হাজার হাজার, হাজার হাজার থেকে লক্ষ লক্ষ স্বপ্নোত্থিত মানুষের নিঃশ্বাস পায় কফিল। তাদের পায়ের আওয়াজও যেন দৃশ্যমান হয়ে উঠছে। সেই কালো পাইপের তামাকের গন্ধেই হয়তো সম্মোহিত হয়ে তাঁরা হাঁটছে। কোন গায়েবি সংকেতে এই বিশাল যাত্রার সংঘটন হতে পারে সেটা কফিলের বোধগম্য হয় না।
একটা জনযাত্রা কখনো স্বঅভিযাত্রা হয়ে যেতে পারে। সেকথা জানার আগেই চলমান ধারার সাথে ধাবিত হয় কফিল উদ্দিন। নেতাকে নিতে এসেছে সে। গন্তব্য রেসকোর্স ময়দান।