ইশরাত তানিয়া > সসেমিরা >> ছোটগল্প

0
761
কেউ ভেবেই পায় না কী করে এতটা নিঃশব্দে কিছু ভেঙে যেতে পারে।
দক্ষিণের দেয়ালে পেরেক ঠিক মতো এঁটে আছে। এতটুকু নড়বড়ে হয়নি। লাল সিমেন্টের মেঝেতে ছড়িয়ে পড়া টুকরোগুলো জড়ো করতে গিয়ে অবাক হয় কেউ। তখন নিবিড় মুহূর্তগুলোর ছায়া ভেসে ওঠে। জলের অনেক গভীরে লুকিয়ে ছিল যা বহুদিন। পরক্ষণেই সময় ঢিল ছুঁড়ে দিলে ভেসে ওঠা ছায়া ভেঙেচুরে যায়। সেই ভেঙে যাওয়াও শব্দহীন।
একটা টুকরোয় ছোট্ট টিপ লেগে আছে। অনেক দিন আগের টকটকে লাল কেমন ধুলোটে মলিন। আনমনে কুড়িয়ে নিতে গেলে হাত কেটে রক্তের কয়েক ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। দেয়ালের দিকে চোখ চলে যায় কারো। সেখানে শুধুই শূন্যতা।
কাঁচের টুকরোগুলো তুলে বারান্দায় দাঁড়িয়েছে অলি। শোবার ঘরের সাথে লাগোয়া বারান্দা। সেখানে রঙের খেলায় মেতেছে নাইন ও’ক্লক, অ্যালমান্ডা, নানান শেডের পিটুনিয়া। শিশু অ্যাকাডেমির সামনে থেকে ফুলের চারাগুলো কিনেছে অলি। কিছুদিন আগে দুটো ক্যাকটাস ফেলে দিয়েছে। কোথায় শুনেছে ক্যাকটাস সময়ের আগেই মরণ ডেকে আনে। সাবেক কালের বাড়ি তাই বারান্দার জন্য বেশ অনেকটা জায়গা বরাদ্দ। এতেই ছোট বড় নানান টবের জায়গা হয়ে গেছে। আজকের সকালটা অন্যরকম। অলি গাছে পানি না দিয়ে দাঁড়িয়েই থাকে।
রোজ সকালে ঘর থেকে শব্দ শোনা যায়। প্লাস্টিকের মগ বার বার ডুবে যাচ্ছে বালতিতে। চোখ না মেলেও রাজীব বুঝতে পারে বারান্দার ফুল গাছে পানি দিচ্ছে অলি। কোনোদিন গানও গায়- ঘরেতে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে।
আগের রাতে শুতে যাবার আগে কথা কাটাকাটি হয়েছে দুজনের। রাতে ভালো ঘুম হয়নি। মশারীর ভেতর মশা। ওহ! কে জানতো শালার তিন তলায় এত মশা থাকতে পারে! বিকেল হলেই জানলা আটকে দেয় অলি। তবুও প্রায় রাতেই মশার পিন পিন কানের কাছে। অন্যদিন মশা না মেরেই ঘুমিয়ে পড়ে রাজীব। মশামারা-জাতীয় ক্ষুদ্র ব্যাপারে সে হস্তক্ষেপ করে না। এইসব কাজ অলির। কিন্তু কাল রাতে তেমন ঘুমই হলো না। দেড় বছরের আদি ওর গা ঘেঁষে ঘুমিয়ে আছে। নরম চুলের স্পর্শ টের পায় রাজীব। ছেলের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। আলোয় মাখামাখি মুখ নিষ্পাপ নিশ্চিন্তের।
অলিকে দেখে এখন বোঝার উপায় নেই রাতে দুজনের মধ্যে নিম্নচাপ বয়ে গেছে। এ মুহূর্তে অলির মনমেজাজ সুরেলা। বারান্দা থেকে ভেসে আসা গানের সুরে রাজীবের হালকা লাগে। শেষ অক্টোবরে বাইরেও নিম্নচাপ। রাজীব বুঝে পায় না টানা তিন দিনের বৃষ্টিতে বারান্দার গাছে পানি দেয়া কেন? অলি নিশ্চিত একটা শক্ত যুক্তি দাঁড় করিয়ে দেবে আর নিজেকে তখন মহামূর্খ মনে হবে রাজীবের।
আধ ইঞ্চি হাসি ওর ঠোঁটে খেলে যায়। হঠাৎ জড়িয়ে ধরলে এখনও অলি থতমত। ফাঁকা বাড়িতেও চমকে গিয়ে কাপড় টেনে সামলে নেয়। কখনও ইচ্ছে হলে রাজীবের বুকে মাথা ঠেকিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। অলির থৈ-কূলহারা এসব অনিশ্চিত আচরণ রাজীবের ভালোই লাগে। হয়তো আগে-থেকে-বলা-যায়-না এমন সব আচরণের জন্য অলি এখনও আকর্ষণীয়। অলির মতিগতি সত্যি বোঝা দায়। যেন ট্র্যাফিক সিগনালের হঠাৎ দেখা হলুদ বাতির মতো। বোঝা যায় না পরমুহূর্তে কি জ্বলে উঠবে। লাল জ্বললে ‘উঁহু’ আর সবুজ এলে ‘আহা’!
অলি ঘরে ঢুকতেই রাজীব উদাস স্বরে গাইল- ‘অলি’তে ভ্রমর এলো গুনগুনিয়ে…
ঠোঁট বাঁদিকে একটু বেঁকিয়ে ওড়নায় হাত মুছে নেয় অলি। আয়নার দিকে একবার তাকায়। কপট রাগে বলে- থাক, ভ্রমর হওয়া লাগবে না। সকাল সকাল অসভ্যতা শুরু হয়েছে!
সিগারেটের প্যাকেট হাতে নিয়ে রাজীব বিরক্ত হলো। শেষ হয়ে গেছে। তবু অলির মন বুঝে বলল- আচ্ছা শোনো, আলনাটা বামে সরিয়ে দিলে বেশ একটু জায়গা হয়।
ফাঁকা প্যাকেটটা রাজীবের হাত থেকে উড়ে গিয়ে প্লাস্টিকের বিনে পড়ল। আগে শোবার ঘরেই সিগারেট ফুঁকত। আদি হবার পর সে বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেটের ধোঁয়া ওড়ায়।
– তা হয়। খাট তো সব সময়ই দেয়ালের দিকে চাপানো। সরানো যাবে না। আলনাটা বরং রুম থেকে বের করে দিও।
আদির ঘুম ভেঙে যায় মায়ের কথায়। ঘুম ঘুম চোখে কাঁদতে থাকে। অলি দুহাত বাড়িয়ে কোলে টেনে নেয়। বাথরুমের বেসিনে হাত ভিজিয়ে মুছে দেয় ছেলের মুখ। ফের ছেলে কোলে খাটে এসে বসে। দশ আউন্সের দুধের বোতল ঝাঁকায়। হাতের তালুতে কয়েক ফোঁটা দুধ পড়ে। গরম ঠিকঠাকই আছে। ছেলের গলায় বিব লাগায় অলি। ফীডারের নিপল মুখে দিয়ে দেয়।
হালকা মেঘ আকাশ ছেয়ে বৃষ্টি ঝরাচ্ছে। তিন দিন ধরে আসি আসি করেও আসছে না। ওই ড্রেসিং টেবিল আর কি। গত পরশু দোকানে ফোন করেছিল অলি। দোকান থেকে দিব্বি জানিয়ে দিল- আজ হবে না। ড্রেসিং টেবিল এখনও কারখানায়। বার্নিশ শেষ হয়নি। মন খারাপ করে ফোনের লাইন কেটে দেয় অলি। বহু বহু কিলোমিটার দূরের ফার্নিচারের দোকান থেকে ভেসে আসে স্পিরিটের গন্ধ। ঠিক সে টের পায় ঘোলা ঘোলা মৃদু বার্নিশের সুরভি। অনেক দূর থেকে গন্ধটা বয়ে এনেছে বাতাস। তাই যেন ঝাঁঝ কিছুটা রেখে দিয়েছে।
এ মাসে ফিক্সড ডিপোজিট ভাঙিয়েছে অলি। ব্যাংকে গেছে আদিকে নিয়ে। মেয়াদ শেষ হবার আগেই টাকা তুলে এনেছে। এর মধ্যে দুবার ফোন করে খবর নিয়েছে ফার্নিচারের দোকানে। দুমাসে ইন্সটলমেন্টে টাকা দেবে।
কয়েক বছর থেকেই একটা ড্রেসিং টেবিলের বড় ইচ্ছে অলির। বিয়ের পর বাবার বাড়ি থেকে আনা আয়না দক্ষিণের দেয়ালে ঠাঁই পেয়েছে। এই আয়না ওর একান্ত নিজস্ব। কাঠের চিকন ফ্রেমে বাঁধানো। স্ট্যান্ডার্ড সাইজ। আয়নার ওপর আগে নেটের সাদা পর্দা ছিল। সেটা ফেলে দিয়েছে অলি। এতে সুবিধা হয়েছে। বাড়তি ঝামেলা যেমন গেছে তেমনি যখন তখন সে টুক করে আয়নায় চেহারাটা দেখে নিতে পারে।
আয়নারও সুবিধা হয়েছে। অলি আসা যাওয়া করলেই আয়নায় ওর ছায়া জাগে। আগে নেটের ঘেরাটোপের ভেতর দিয়ে ঘোলাটে দেখাত অলিকে। শুধু অলি যখন আয়নার সামনে এসে দাঁড়াত তখনই আয়না ওকে স্পষ্ট করে দেখতে পেত। কী ভালোই না লাগত আয়নার। কোমর ছাপানো সমস্ত চুলগুলো তখন বাঁ কাঁধের পাশ বেয়ে নেমে গেছে। মাথাটা বাঁ দিকে সামান্য হেলিয়ে চিরুনির আঁচড়ে সেই চুলগুলো অলির পিঠময় ছড়িয়ে দেয়া। চোখে কাজলের রেখা আঁকা আর ঠোঁটের ওপর গোলাপি পাতলা প্রলেপ ছুঁয়ে দেয়া। লোশান দেবার সময় অলির হাতে কপালে গালে কী অপূর্ব আচ্ছন্নতার মায়া দেখে আয়না। অলি ঘাড়ের দুপাশে, বাহুমূলে জেসমিন সুগন্ধির ঝাপটা ছিটিয়ে দিলে সে মাদকতায় অভিভূত।
কখনও ছোট্ট টিপ তুলে নেয় অলি। বুড়ো আঙুল আর তর্জনী দিয়ে যত্ন করে বসিয়ে দেয় কপালের মাঝখানে আর লালের আভা ছড়িয়ে যায় পুরো মুখ জুড়ে। তারপর রহস্যের মৃদু হাসি বয়ে যায় ঠোঁটের কোণ পেরিয়ে সারা ঘরে। আয়না দেখে অপরূপ অলিকে আর মুগ্ধতায় অলি দেখে আয়না। আত্মমগ্নতায় পারস্পরিক এই দেখাদেখি চলে বহুক্ষণ। দুজনই বিভ্রান্ত হয়। আবার আনন্দিতও।
ছেলে হবার আগে প্রায় সারাদিন আয়নার কাছে ঘুরঘুর করত অলি। এখন অবসর কমে এসেছে। ছেলে সামলে সব কাজ সে আর করে উঠতে পারে না। ঘর ঝাড়ামোছা আর কাঁথা ধোয়ার জন্য একটা মেয়ে ঠিক করেছে। এই দুকাজের বাইরে অজিফা রাতের বাসনপেয়ালা ধুয়ে দেয় আর রান্নার আনাজপাতি কেটে দেয়। এতেই অনেকটা কাজ এগিয়ে যায় অলির। তবে সপ্তাহে গড়ে দুতিন অজিফা কামাই দেবে। এই নিয়মেই চলছে দেড় বছর।
আয়না এখন প্রায়ই ধুলো মেখে পড়ে থাকে। ছায়া শুধু দীর্ঘ হয়। দূরত্বের পরিধি বাড়ে। আর ঘোলাটে হয়ে আয়না দেখে দিন দিন অলির বাড়ন্ত ব্যস্ততা। ধীরে ধীরে বদলে যাওয়া। দিনে একবার বড়জোর দুমিনিটের জন্য দাঁড়িয়ে অলির ঝটপট চুলটা আঁচড়ে নেয়া। এর বেশি কিছুতেই না। অলির চোখ এড়িয়ে যায় লাল নীল টিপ। সেখানেও ধুলোর পরত জমেছে।
অজড় দৃশ্যগুলো ফিরে আসে। তখন হয়তো গুনগুন গান ভাসছে অলির ঠোঁটে। স্প্রে করে ডান হাত পেপার দিয়ে কাঁচ মুছে নিচ্ছে। আর বাঁ হাত সামলাচ্ছে মুখের ওপর লুটিয়ে পড়া কেশচূর্ণ। ঘষে ঘষে আয়নার গা থেকে সে তুলছে টিপের জেদি আঠা। মন খারাপ হলে অলি এসে দাঁড়াত আয়নার সামনে। মন ভালো হলেও। ঝকঝকে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বেলির মালা জড়াতো খোঁপায়। নিজের টলটলে চোখের দিকে তাকিয়ে কত এলোমেলো ভাবনা যে ভাবত। আর আয়না ওকে দেখত মন ভরে।
কত কথাই মানুষ বলে যা হয়তো অনাবশ্যক। তবু কথা না বললে দুজনের চলে না। দিন শেষে অলির সব কথা আয়নার শোনা চাই। সেই স্কুলবেলা থেকে এক সাথে দুজনের বেড়ে ওঠা। আয়না বলত কম। শুনতো বেশি। কত মাঘের আর ফাল্গুনের বিকেলে আয়নাঅলির প্রহর কেটেছে গল্প আর খুনসুটিতে।
চুল বেঁধে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে আছে অলি। হাতে চিরুনি। আয়না মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে বলল- মনে আছে স্কুলে ফুল চুরি করেছিলে?
– হু। গাঁদা ফুল। বাংলা আপার জন্য। হিহি করে হেসে ফেলে অলি। বলে- যা জাঁদরেল ছিল মালি! ধরা পড়লে প্রিন্সিপালের কাছে নালিশ চলে যেত।
একমাত্র আয়নাকেই অলি বলতে পেরেছিল সেই কথা। রাস্তায় কেমন করে টুটুল ওর বুকটা মুচড়ে দিয়েছিল। লজ্জা অপমানে মাকেও বলতে পারেনি। অনেক কেঁদেছিল অলি আয়নার সামনে। আয়না বুঝিয়েছিল এতে অলির কোনো দোষ নেই। অন্যায় করেছে টুটুল। অলি যেন একা একা স্কুলে আর না যায়। সেই থেকে অলির ফিরতে দেরি হলেই দুশ্চিন্তা হতো আয়নার। অলিকে না দেখা পর্যন্ত আয়নার স্বস্তি নেই। দিবারাত্রি দুজন দুজনের মুখোমুখি। আস্থায় আর নির্ভরতায় অলির আয়না নাকি আয়নার অলি সেটা দুজনের কেউ বুঝত না। হয়তো বুঝতে চাইতও না।
গত মাসে দোতলার ভাড়াটে নতুন ড্রেসিং টেবিল এনেছে। আয়নার ওপর ছোট ছোট কাঠের ঘণ্টা দুলছে। এমন অদ্ভুত ডিজাইন অলি জন্মে দেখেনি। খুব ভালো লেগেছিল ওর। বারান্দায় দাঁড়িয়ে দেখছিল সব কিছু, যেন নতুন বউকে বরণ করে ঘরে তুলে নিয়ে গেল। আয়না যেন সোনা বউয়ের মুখ। কাঠের ঘণ্টাগুলো টায়রার ঝুনঝুনি হয়ে আয়নার সিঁথি আর কপাল ছুঁয়ে আছে। বারান্দার ওপাশ থেকে অলি দেখে ড্রেসিং টেবিল কী সুন্দর দুজনের কোলে চেপে সিঁড়িঘর দিয়ে দোতলায় উঠে গেল।
বেশ কদিন ধরেই টানাটানি চলছে। মানে ঘরের আলমারি-খাট-আলনা, এদিক সেদিক ঘুরছে। ড্রেসিং টেবিল আসছে। আলনা এবার ঘরহারা হবে। শোবার ঘরটা যথেষ্ট বড় কিন্তু আলনা রাখার জায়গা নেই। বসার ঘরে আলনা রাখাটাও খুব বিচ্ছিরি ব্যাপার। রান্না ঘরে যাবার সরু লম্বা প্যাসেজে হয়তো কোনো রকমে এঁটে যাবে। এর আগে বাস্তু মেনে শোবার ঘরের দখিন দেয়ালে আয়না সেট করা হয়েছিল। উত্তরে, দক্ষিণে বা পুব দিকে ড্রেসিং টেবিল রাখলে দাম্পত্য সম্পর্ক ভালো থাকে। এবার হয়তো উত্তরে যাবে ড্রেসিং টেবিল।
সিগারেট আনতে গলির মোড়ের দোকানে যায় রাজীব। টিভি অফ করে অলি। গানের রিয়েলিটি শো’র রিটেলিকাস্ট হচ্ছে। আদি খাটের ওপর খেলছে। দাঁতের ব্যথায় অলি বেচারী অস্থির। অজিফার দেখা নেই। কালকের রান্না করা খাবারে আজ চলে যাবে। প্লাস্টিকের বল আর কাপড়ের ডায়নোসার ঠেলে সরিয়ে একটু জায়গা করে নেয় অলি। চুপচাপ শুয়ে পড়ে পাতলা কাঁথা গায়ে দিয়ে। আদি বল আর ডায়নোসার টেনে কাছে এনে খেলতে থাকে। মায়ের দিকে তাকিয়ে হাসে।
বার্নিশ শুকালে ড্রেসিং টেবিলে আয়না বসাবে নাকি আয়না ফিট করে তারপর বার্নিশ। অলির মাথায় সারাদিন এই চিন্তা ঘোরে। বার বার দোকানে ফোন করে জানতে সংকোচ হয়। গতরাতে ড্রেসিং টেবিল নিয়ে কথা হয়েছে রাজীবের সাথে। কথা না আসলে দুজনের একদফা কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে । রাজীব চেয়েছিল ডিপিএস ম্যাচিওর হোক। অলির যেন আর তর সয় না। এতেই আপাত নিরীহ অলি ফোঁস করে উঠেছে।
– আরো আট মাসের ধাক্কা?
– কত টাকা লস হবে হিসাব আছে? আশ্চর্য!
– আশ্চর্যের কী? টাকাটাই দেখলা?
– এমন তো না যে মুখ দেখার কিছু নাই। দেয়ালের আয়নায় কাজ হয়ে যায়।
– কাজ হয়ে গেলে মানুষের আর ড্রেসিং টেবিল লাগতো না।
– মালয়েশিয়ান ওক কাঠের হলে কী সমস্যা হতো?
– সেগুন কাঠ আর ওক কাঠ এক? কী বলো এইসব?
অথচ রাজীবের সাথে এ নিয়ে কথা বলেছে কতবার। দুজন একসাথে গিয়েই ড্রেসিং টেবিল অর্ডার দিয়েছে। মধ্যবিত্ত পরিবারের জন্য বার্মাটিক সেগুনের দাম বেশিই। সেটা বোঝে বলে থেমে গিয়েছিল অলি। ড্রেসিং টেবিল তো আর নিত্যদিন কেনার জিনিস না। ভালো কাঠের হলে ঘুন ধরবে না। নষ্ট হবে না। এটা বুঝে রাজীবও চুপ। সেগুন কাঠে ওর আপত্তি ছিল না। তবু ভেতরকার কথাগুলো একেক সময় উগরে দেয় মুখ। বিপর্যয়টা তখন অনিবার্য।
আয়না টের পায় কী ভীষণ আনমনা অলি। সারাক্ষণ কি যেন ভাবে। আপেলের বদলে আনারস কাটে। আয়নার সামনে দিয়েই আসা যাওয়া করে। আলমারির দিকে যায় কিংবা রান্নাঘরে। একবারের জন্যও আয়নার দিকে তাকায় না। অথচ আয়নায় গাল চেপে কী কান্নাটাই সেদিন কেঁদেছিল অলি।
– রাজীব কেমন করে ভুলে গেল দিনটার কথা?
– কাজের চাপ। বিয়ের তারিখ মনে নাও থাকতে পারে।
– তুমি তো ভুলে যাওনি। বিকালে লাল শাড়িটা পরতে বলেছ। কেক কিনতে বলেছ। ফেরার পথে বেলির মালা কেনার কথা বলে দিয়েছ। আর সে একটা ফোন করতে পারল না?
– ওর ঠিকই সব মনে আছে। বিকেলে ফিরেই কেমন চমকে দেয়, দেখে নিও।
বিয়ের তিন বছর হয়ে গেলে তারিখ মনে রাখাটা রাজীবের কাছে আর গুরুত্বপূর্ণ ছিল না। আয়নার খুব মন খারাপ হতো। অলিকে আশ্বস্ত করে কত কথাই সে বলত। আয়না মনে করিয়ে দিত কাদা লেগে যাওয়া চুড়িদারটা ধোয়ার কথা। বিকেল হলে জানলাগুলো লাগিয়ে দেয়ার কথা। শীত পড়লে মাফলারের কথা কি অলির মনে থাকত? আয়নাই মনে করিয়ে দিত অলির ঠাণ্ডার ধাত। টনসিল ফুলবে।
গ্রীষ্মের দীর্ঘ আলস্যের দুপুরগুলোতে নিঃসঙ্গ অলি ক্লান্ত-বিরক্ত হয়ে উঠত। খাটে বাঁ পাশ ফিরে শুয়ে তাকিয়ে থাকত দেয়ালের আয়নার দিকে কিংবা আয়নায় নিজের ছায়ার দিকে। শুয়ে শুয়েই কথা হতো আয়নার সাথে অলির। অলির সাথে আয়নার।
– গান শোনাও।
– ধুর। ভরদুপুরে গান?
– অবেলায় শুয়ে থাকলে শরীর খারাপ লাগবে।
– আর কী করব?
আড়মোড়া ভেঙে আয়নার দিকে এগিয়ে যেত অলি। বিছানার গন্ধ, ঘরের গুমোট আর ছেড়ে দেয়া জামা পেছনে ফেলে। অরণ্যের এক সতেজ বুনোগাছ হয়ে জড়িয়ে ধরত আয়নাকে। আশ্চর্য স্বপ্নালু রমণীয়তায় ঠোঁট চেপে ধরত আয়নার ঠোঁটে। মিশে যেত আয়না হয়ে।
আয়না তো আজীবন রঙহীন। তবু অলির কথায় কোথাও অল্প রঙ লাগত। অলির চুমুতে সে দিশাহারা হতো। আজকাল এক ঝলক দেখতে পাওয়াই মুশকিল হয়ে পড়েছে। কী ভীষণভাবে সে দেখতে চায় অলিকে! সে অলির কাছে যেতে পারে না। এগোনোর কথা ভাবলেই টলে ওঠে। অক্ষমতায় মুখ থুবড়ে পড়ে। জড়ত্বের গ্লানি নিয়ে তার সমস্ত আয়নাসত্তা ক্রমশ ঝাপসা হতে থাকে। আয়নার যাবার কোনো জায়গা নেই। যেন গরমের ছুটিতে স্কুল বন্ধ হয়ে গেছে। ধুলো আর ঝরাপাতার ভেতর আয়নাকে একলা ফেলে অলি বাড়ি ফিরে গেছে।
কলবেলের শব্দে চমকে ওঠে অলি। রাজীব ফিরেছে কাকভেজা হয়ে। নীল পলিথিনে মুড়িয়ে এনেছে গোল্ডলিফের প্যাকেট।
– ছাতা নিয়ে যাও নাই? বললাম তখন! ইশ রে! একদম ভিজে গেছ।
– আরে কিছু না। এক কাপ চা বানাও।
তোয়ালে দিয়ে ভালো করে মাথা মুছে নেয় রাজীব। একটানা একঘেয়ে বৃষ্টি। রাজীব সিগারেট ধরিয়েছে। বারান্দাটা রাস্তার ওপর। দাঁড়ালেই বোঝা যায় গলিটা চওড়া হলেও যথেষ্ট ঘিঞ্জি। রাস্তার দুপাশ বাড়িঘর, প্রাইমারি স্কুল, লন্ড্রি, বুটিকে ভরপুর। মুদি দোকান থেকে শুরু করে ওয়ালটনের শো রুমও আছে।
ড্রেসিং টেবিলের জন্য টাকাটা সত্যি জলে গেল। ঘুষটুষ খেতে পারলে না হয় এক কথা ছিল। সুযোগের অভাবে সে সৎ এটা বলা যাবে না। যথেষ্ট সুযোগ আছে। একটা গার্মেন্টস এর পারচেজ ডিপার্টমেন্টে কাজ করে। অ্যাপ্রুভড হয়ে যাওয়া অফিস স্টেশনারির কয়েকটা রিকুইজিশান স্লিপ এদিক ওদিক করলেই একটা ড্রেসিং টেবিলের দাম উঠে যায়। চোখের সামনে শাহাদাত ১৪০০ স্কয়ারফুটের ফ্ল্যাট কিনে ফেলল মালিবাগে। আসলে মানসম্মান যাবার ভয়েই সে সিঁটিয়ে থাকে। ঘুষ আর খাওয়া হয় না।
সকাল থেকে নাগাড়ে বৃষ্টি সামান্য ধরে গেছে ততক্ষণে। চা নিয়ে আসে অলি। রাজীবও ঘরে ঢুকে শুয়ে পড়ে।
– ঘুমিয়ে পড়েছ?
– দাও। চা দাও।
টিভি অন করে অলি। চা শেষ করে অলির ডান বাহুতে রাজীব বাম গাল ঠেকিয়ে রাখে। আবারও ঘুম পায় ওর। দাঁতের ব্যথায় নাপা খাবার কথা ভাবছে অলি। এদিকে মন পড়ে আছে সেগুন কাঠের টেক্সচার আর চেস্টনাট রঙে। টিভিতে আবহাওয়ার নিউজ বুলেটিন দেখছে সে। আবহাওয়া অফিসের তরফে জানানো হয়েছে, আপাতত নিম্নচাপটির অভিমুখ উড়িশ্যার উপকূলের দিকে। বিকেল থেকে আবহাওয়ার কিছুটা উন্নতি হবে বলে আশা করা যাচ্ছে।
বৃষ্টির জন্য দুদিন কামাই দিয়ে আজ এসেছে অজিফা। চনমনে রোদে সদ্যকাচা কাঁথাগুলো মেলে দিয়েছে। ছেলের জন্য আতপ চালের গুঁড়ার সুজি বানায় অলি। সুজির পাতিল নামিয়ে অল্প আঁচে ফ্রাইপ্যান বসায়। তেল ঢেলে মিষ্টি কুমড়ার ফালি বিছিয়ে দেয়। একমুঠো ধনেপাতার কুচি ছড়িয়ে দেয় হয়ে আসা রুই মাছের দোপেয়াজায়। লাল টকটকে দেশি মুরগির ঝোলের সবটুকু ঢেলে নেয় বাটিতে। রাজীবের খুব প্রিয় ঝালমুরগি। কাঁথাগুলো এতক্ষণে শুকিয়ে গেছে। তুলে ঘরে আনতে হবে।
আজ সব কাজেই দেরি। সে তো হবারই কথা। দুপুরটা নিরালা হতে গিয়েও হতে পারল না ড্রেসিং টেবিলের আগমনে। রাজীব অফিসে চলে গেছে সেই সকালে। ঘরে অলি আর অজিফা ছাড়া আর কেউ নেই। মেঝেতে রাজ্যের খেলনা মেলে অজিফা খেলছিল আদির সাথে। বুদ্ধি করে বাড়িওয়ালি শাহীনা ভাবীকে ডেকে এনেছিল অলি। শেষ পর্যন্ত ড্রেসিং টেবিলের জায়গা হলো খাটের পাশে নির্ধারিত উত্তরেই। শাহিনা ভাবীকে চা খেতে বলার কথা বলতে ভুলে গেছে অলি। তবে অজিফা যাবার সময় বাড়তি দশটাকা গুঁজে দিল খুশি হয়ে। ড্রেসিং টেবিলের দিকে তাকালো অলি। অদ্ভুত এক হাসির রেখা ওর ঠোঁটে। কিছুটা তৃপ্তির আবার কিছুটা কেমন যেন খাপছাড়া অব্যাখ্যাত।
ড্রেসিং টেবিলের আয়না লম্বাটে গোলাকার। নতুন কালেকশানের ডিজাইন থেকে অলি ওভাল শেপ পছন্দ করেছে। নীচে ডানদিকে তিনটি ড্রয়ার। মাঝখান থেকে বাঁ দিকে দুটি ড্রয়ার। মাঝখানে ড্র্য়ারের ওপরের ফাঁকা জায়গা। সেখানে অলি সাজিয়ে রাখল চিরুনি, ক্লিপ, পাউডার, লোশান, পারফিউম আর টুকটাক প্রসাধনীর বাক্স। চাবির রিংটাও রেখে দিল। অলির ঘরে ড্রেসিং টেবিলের আগমন তো নয় এ যেন আবির্ভাব! এদিক থেকে দেখে অলি। সেদিক থেকে দেখে। কাছ থেকে দেখে। দেখে দূর থেকে। তারপর ফোমের নরম সিটারের ওপর মোহিত হয়ে বসে থাকে ড্রেসিং টেবিলের সামনে। অপলক।
এখনও ড্রেসিং টেবিলকে একটা অপ্রয়োজনীয় আসবাবই মনে হয় রাজীবের। কিন্তু অলির ওই এক ঝোঁক আয়নায় মুখ দেখা। নিজের অজান্তেই অলির চোখ চলে যায় ড্রেসিং টেবিলের আয়নায়। হয়তো অলি কথা বলছে বা কোনো কাজ করছে। ঘুমন্ত ছেলেকে কোল থেকে বিছানায় নামিয়ে রাখছে। ঠিকই এক ফাঁকে চোখ আটকে যায় আয়নায়। কয়েকবার লক্ষ করেছে রাজীব। ড্রেসিং টেবিলের আয়নায় মাত্র কয়েক সেকেন্ড অলির দৃষ্টির স্থায়ীত্ব। কী তীব্র আর গভীর সে দৃষ্টি! নিজেকে যে দেখে, কীই বা দেখে! তখনকার অলির মুখের ভাঁজ, ঠোঁটের কোণ, ভ্রুভঙ্গী সবই অচেনা। কখনও গ্রীবা ডান দিকে সামান্য হেলে যায়। ঠোঁটে আনমনা হাসি।
রাজীব খুব হেসেছে সে রাতে। ফোনের ওপর থেকে চোখ না সরিয়েই বলেছে- নার্সিসিস্ট!
– অ্যাই! একদম আমার দিকে তাকাবা না!
অলির মুখ লালচে। গাল দুটো গরম। অনেকদিন অলির এমন লাজুক, ভ্যাবাচ্যাকা, ধরাখাওয়া, সুখী সুখী হাসিমুখ রাজীব দেখেনি। অলির এই রক্তিমাভা মুখটা দেখছে দেয়ালের আয়নাও। তীক্ষ্ণতায় সে দেখছে অলির মুখাবয়বের প্রতিটি কাঁপন। অলির চোখে জ্বলেওঠা মায়াবী আলো।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে চোখের পাতা টেনে কাজল পরে অলি। পাউডার নিয়ে তুলোর মতো নরম সাদা পাফ বুলিয়ে দেয় মুখে গলায়। ভুলেও কি অলি আর দেয়ালের আয়নার সামনে এসে দাঁড়াবে না? এই অমোঘ অপেক্ষার যেন শেষ নেই, হয়তো শুরুও ছিল না। ক্ষোভ আর বেদনার অসাড়তা ছাড়া আর কিছু বাকি নেই আয়নার।
রাতে আহ্লাদী লালচে মুখ রাজীবের বুকে ঘষে অলি। হঠাৎ যেন কি মনে পড়ে গেছে এমন ভাবে রাজীব বলে- আচ্ছা, কেমন ঘোলাটে হয়ে গেছে আয়নাটা। ফেলে দেয়া যায় না?
মুখ তুলে তাকায় অলি। স্বভাবিক গলায় বলে- হুম…
পরিত্যাক্ত হবার অভিমান আর অধিকারবোধ কবে থেকেই স্থির হয়ে পড়ে আছে। ঝাপসা চোখে দেয়ালের আয়না তাকিয়ে থাকে অলির দিকে। অন্ধ হয়ে যাওয়ায় প্রাণপণ চেষ্টা করে। কিছুতেই পারে না। অপূর্ণ ইচ্ছেগুলো হয়তো আশ্চর্য ধোঁয়া হয়ে হাওয়ায় ভাসতে জানে। ভেসে ভেসে অলির ঘর থেকে একসময় রাতের আকাশে অদৃশ্য হয়ে যায়।
নিঃসঙ্গ কায়াহীন সে অলৌকিক ধোঁয়া দেখা যায় না। শুধু লাল সিমেন্টের মেঝেতে আয়নার ভাঙা টুকরোগুলো শব্দহীন ছড়িয়ে পড়ে চারদিকে।