ইয়োভাল নোয়াহ হারারি > করোনার বিরুদ্ধে লড়াই, মানবজাতি নেতৃত্বশূন্য >> অনুবাদ : ইলিয়াছ কামাল রিসাত

0
3508

করোনার বিরুদ্ধে লড়াই, মানবজাতি নেতৃত্বশূন্য

[সম্পাদকীয় : করোনা নিয়ে বিশ্বব্যাপী যে মানব সংকট দেখা দিয়েছে, সেই সংকট নিয়ে “করোনার বিরুদ্ধে লড়াই, মানবজাতি নেতৃত্বশূন্য” শিরোনামে একটি বিশ্লেষণাত্মক লেখা লিখেছেন আমাদের সময়ের অন্যতম শীর্ষ চিন্তাবিদ-ভাবুক অধ্যাপক ইয়োভাল নোয়াহ হারারি। লেখাটি প্রকাশিত হয়েছে ‘টাইম’ অনলাইন ম্যাগাজিনে। হারারি, অনেকে হয়তো জানেন, Homo Deus: A Brief History of Tomorrow, Sapiens: A Brief History of Humankind এবং 21 Lessons for the 21st Century এই তিনটি বেস্টসেলার বইয়ের লেখক হিসেবে বিশ্বজুড়ে খ্যাতিমান। তাঁর প্রকাশিত এই লেখায় করোনার প্রতিরোধ সম্পর্কে বৈশ্বিক সহযোগিতার মতো এমন কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা ও দিকনির্দেশনা আছে, যা ভাববার মতো। পড়ুন এই অসাধারণ লেখাটি।]

এরকম বিপর্যয়ের কালে, চরম লড়াই দেখা দেয় মানবজাতির নিজেদের মধ্যেই। এই মহামারি যদি আরো বৃহৎ অনৈক্য ও অবিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে যায়, তবে ভাইরাসেরই জয় হবে। মানুষ যখন কলহে লিপ্ত থাকে, তখন ভাইরাস দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, যদি এই মহামারির সময় বিশ্ব সহযোগিতার হাত ধরে এগোয়, তাহলে এই জয় শুধু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধেই ঘটবে না, মানুষ ভবিষ্যতের সকল জীবাণুর বিরুদ্ধেই জয়ী হবে।

অনেকেই করোনা ভাইরাসের কারণে উদ্ভূত বিপর্যয়ের জন্য দায়ী করছে বিশ্বায়নকে। তারা বলছে এই মহামারী ঠেকানোর একমাত্র উপায় হল বিশ্বায়িত এই পৃথিবীকে অবিশ্বায়িত করে দেয়া। তবে স্বল্প-মেয়াদে একে অপরের কাছ থেকে পৃথক থাকলে এই মহামারীর বিস্তার রোধ করা গেলেও দীর্ঘ মেয়াদে একে অপরের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন থাকলে সারাবিশ্ব অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। এতে করে এর সংক্রমণ থেকে রক্ষার কোন প্রতিকারের উপায় থাকবে না। আমাদের বরং এখন বিপরীতটাই করা প্রয়োজন। এর সংক্রমণ থেকে বাঁচার উপায় একে-অপরের পৃথকীকরণ নয়, বরং প্রয়োজন আরো পারস্পরিক সহযোগিতার।
বিশ্বায়নের আগে থেকেই বিভিন্ন মহামারীতে লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ গেছে। চতুর্দশ শতাব্দীতে যখন কোন উড়োজাহাজ কিংবা বিশাল জাহাজ ছিল না, তখন ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর মতো ভয়াবহ মহামারী পূর্ব-এশিয়া থেকে পশ্চিম ইউরোপে ছড়িয়ে পড়েছিল একদশকের মধ্যেই। সেই মহামারী প্রায় ৭৫০ লক্ষ থেকে ২০ কোটি মানুষের প্রাণ নাশ করেছিল- যা সমস্ত ইউরেশিয়া অঞ্চলের জনগণের এক-চতুর্থাংশের চেয়েও বেশি। এক ফ্লোরেন্স শহরেই দশ লক্ষ মানুষের মধ্যে প্রাণ হারিয়েছিল ৫০ হাজার মানুষ।
ফ্রান্সিসকো দ্য এগুইয়া নামের এক ব্যক্তি, যিনি গুটিবসন্তের বাহক ছিলেন- তিনি ১৫২০ খ্রিস্টাব্দের মার্চ মাসে মেক্সিকোতে অবতরণ করলেন। সে-সময়ে মধ্য-আমেরিকায় কোন ট্রেন ছিল না, বাস ছিল না, এমনকি গাধাও ছিল না যানবাহন হিসেবে। তারপরেও ডিসেম্বর মাসের মধ্যেই সেই গুটিবসন্ত মহামারী আকারে হানা দিয়েছিল পুরো মধ্য-আমেরিকায়, প্রাণনাশ করেছিল আনুমানিক মোট জনসংখ্যার এক-তৃতীয়াংশ মানুষের।
১৯১৮ খ্রিস্টাব্দে অত্যন্ত ক্ষতিকর এক ‘ফ্লু’ কয়েক মাসের মধ্যে ছড়িয়ে পড়েছিল পৃথিবীর দূরতম প্রান্তে। এটি অন্তত ৫০ কোটি মানুষের মধ্যে সংক্রমিত হয়, যা পুরো পৃথিবীর তৎকালীন জনসংখ্যার এক-চতুর্থাংশেরও বেশি। তাহিতি দ্বীপপুঞ্জে মারা যায় ১৪ শতাংশের মত মানুষ। সামোয়াতে ২০ শতাংশ। এই মহামারী এক বছরের কম সময়ের মধ্যেই প্রাণনাশ করে প্রায় ১ কোটি থেকে দশ কোটি মানুষের। এই সংখ্যা প্রথম বিশ্বযুদ্ধের নৃশংসতায় নিহত মানুষের চেয়েও বেশি।

এইডস কিংবা ইবোলার মতো ভয়াবহ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলেও ইতিহাসের অন্য যে কোন মহামারীর তুলনায় একবিংশ শতাব্দীতে এসে এসব ভাইরাসজনিত মহামারী অনেক কম সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ করতে পেরেছে। এর কারণ, জীবাণুর বিরুদ্ধে মানুষের মূল প্রতিরক্ষাটা হয়ে উঠেছে তথ্য বিনিময়, পৃথক থাকা নয়।

১৯১৮ পরবর্তী শতাব্দীতে এসে পরিবর্ধনশীল জনসংখ্যা ও উন্নত পরিবহনব্যবস্থার দরুণ মানবজাতি মহামারীর বিপক্ষে আরো অরক্ষিত হয়ে গেছে। মহামারী সৃষ্টিকারী জীবাণুরা এখন মধ্যযুগীয় ফ্লোরেন্স শহরের তুলনায় টোকিও কিংবা মেক্সিকো সিটির মতো আধুনিক শহরের মানুষদের সহজেই শিকারে পরিনত করতে পারে। বর্তমান বিশ্বের পরিবহন ব্যবস্থা ১৯১৮ সালের তুলনায় এখন আরো উন্নত ও আরো দ্রুততর হয়েছে। একটা ভাইরাস ২৪ ঘণ্টার কম সময়ের মধ্যে, অর্থাৎ একনিমেষে প্যারিস থেকে টোকিও এবং মেক্সিতোতে পৌঁছে যেতে পারে। এরকম অবস্থায় আমরা সংক্রমিত রোগের নরকেই বসবাস করছি ধরে নেয়া যায়, যেখানে একের পর এক প্লেগ মানবজাতিকে আক্রমণ করতে পারে।
এত কিছু সত্ত্বেও, মহামারীর পরিমাণ এবং প্রভাব নাটকীয়ভাবে কমে গেছে বলতে হবে। এইডস কিংবা ইবোলার মতো ভয়াবহ রোগের প্রাদুর্ভাব ঘটলেও ইতিহাসের অন্য যে কোন মহামারীর তুলনায় একবিংশ শতাব্দীতে এসে এসব ভাইরাসজনিত মহামারী অনেক কম সংখ্যক মানুষের প্রাণনাশ করতে পেরেছে। এর কারণ, জীবাণুর বিরুদ্ধে মানুষের মূল প্রতিরক্ষাটা হয়ে উঠেছে তথ্য বিনিময়, পৃথক থাকা নয়। মানবজাতি মহামারীর বিরুদ্ধে যুদ্ধজয় অব্যাহত রেখেছে, এর কারণ, জীবাণু বিশেষজ্ঞ ও চিকিৎসকেরা জীবাণুর অন্ধ পরিব্যাপ্তির উপর নির্ভর না করে নির্ভর করছেন তথ্য-উপাত্তের বৈজ্ঞানিক বিশ্লেষণের উপর।

জীবাণুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়লাভ

চতুর্দশ শতাব্দীতে যখন ‘ব্ল্যাক ডেথ’ সংক্রমিত হল, কারও কোন ধারণাই ছিলনা কি কারণে এটি হল এবং এ থেকে নিস্তার পাওয়ার জন্য কি করা যেতে পারে। আধুনিক যুগের আগ পর্যন্ত এসব রোগের জন্য মানুষ দায়ী করত ক্ষুব্ধ প্রভু, হিংসুটে শয়তান কিংবা দূষিত বায়ুকে। কিন্তু কোন ব্যাকটেরিয়া ও ভাইরাসের উপস্থিতি নিয়ে তারা সন্দেহ করত না। মানুষ তখন বিশ্বাস করত, জ্বীন-পরীর উপস্থিতিতে এসব ঘটছে। কিন্তু তারা ভাবতেই পারত না একফোঁটা পানির মধ্যে থাকতে পার প্রাণসংহারক জীবাণুর বহর। সে-কারণে যখন ‘ব্ল্যাক ডেথ’ কিংবা গুটিবসন্ত আক্রমণ করত, তখন কতৃপক্ষ সর্বোচ্চ যে ব্যবস্থা নিত তাহল, বিভিন্ন প্রভু কিংবা সাধকের উদ্দেশ্যে গণপ্রার্থনার আয়োজন করত। এতে কোন লাভ হত না। বরং গণজমায়েতের ফলে আরো অনেক বেশি মানুষ সংক্রমণের শিকার হত।

১৯৬৭ সালে গুটিবসন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষকে আক্রমণ করে যার মধ্যে প্রাণ হারায় ২০ লক্ষের মতো মানুষ। কিন্তু এর পরের দশকেই গুটিবসন্ত প্রতিষেধকের বৈশ্বিক প্রচারণা এতটাই সফল হয় যে, ১৯৭৯ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্ত নির্মূল হওয়া এবং মানবতার জয় ঘোষণা করে।

গত শতাব্দীতে বিজ্ঞানী, চিকিৎসক এবং সেবিকারা সারা বিশ্ব থেকে নানান তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করেছে এবং তা বিশ্লেষণের মাধ্যমে এই সমস্ত মহামারীর কার্যকারণ প্রক্রিয়া বুঝতে পেরেছে। এ থেকেই মানুষ মহামারি থেকে রক্ষা পাবার কলাকৌশল রপ্ত করেছে। বিবর্তন তত্ত্বের মাধ্যমে নতুন রোগগুলি কেন এবং কীভাবে বিকাশ লাভ করে এবং পুরাতন রোগগুলি কেন এত ভয়ংকর হয়ে ওঠে, সে-সব ব্যাখ্যা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয়েছে। এভাবেই বিজ্ঞানীরা বংশগতিবিদ্যার মাধ্যমে জীবাণুর জন্মপ্রক্রিয়া সম্পর্কে বিশদ জ্ঞান লাভ করতে পারছে। মধ্যযুগে যেখানে ‘ব্ল্যাক ডেথ’-এর কারণ সম্পর্কে কেউই অবগত হতে পারেনি, সেখানে এই নতুন করোনা ভাইরাস সম্পর্কে জানতে বিজ্ঞানীদের সময় লেগেছে মাত্র দুই সপ্তাহ। শুধু তাই নয়, বিজ্ঞানীরা এই নতুন ভাইরাসের জিনোম সিকোয়েন্স করতে পেরেছে এবং সংক্রমিত মানুষকে চিহ্নিত করার নির্ভরযোগ্য পরীক্ষা-নিরীক্ষাও রপ্ত করে ফেলেছে।
বিজ্ঞানীরা যখন আবিষ্কার করল কিসের কারণে বিভিন্ন মহামারী হয়, তখন তার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ করাও সহজতর হয়ে উঠেছে। ভ্যাক্সিন ও অ্যান্টিবায়োটিকের ব্যবহার, সুস্বাস্থ্যবিধি এবং উন্নত চিকিৎসা অবকাঠামোর উৎকর্ষের ফলে মানবজাতি এই অদৃশ্য জীবাণু-ঘাতকদের বিরুদ্ধে জয়লাভ করেছে বলেই ধরে নেয়া যায়। ১৯৬৭ সালে গুটিবসন্ত প্রায় ১ কোটি ৫০ লক্ষ মানুষকে আক্রমণ করে যার মধ্যে প্রাণ হারায় ২০ লক্ষের মতো মানুষ। কিন্তু এর পরের দশকেই গুটিবসন্ত প্রতিষেধকের বৈশ্বিক প্রচারণা এতটাই সফল হয় যে, ১৯৭৯ সালে বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থা বিশ্বব্যাপী গুটিবসন্ত নির্মূল হওয়া এবং মানবতার জয় ঘোষণা করে। ২০১৯ সালে একজন ব্যক্তিও গুটিবসন্তে আক্রান্ত হয়নি এবং কেউ মারাও যায়নি।

আমাদের সীমান্ত রক্ষা

ইতিহাসের দিক থেকে ভাবলে, এখন করোনাভাইরাস মহামারির মতো ছড়িয়ে পড়ার বিষয়টা আমাদের কি শিক্ষা দেয় ভেবে দেখা যেতে পারে :
প্রথমত, আপনি আপনার সীমান্ত চিরতরে বন্ধ করে নিজেকে রক্ষা করতে পারবেন না। মনে রাখা দরকার, বিশ্বায়নের অনেক আগেই মধ্যযুগে মহামারী ছড়িয়েছে অনেক দ্রুততার সাথেই। সুতরাং আপনি বা আপনার দেশ যদি এখন বৈশ্বিক যোগাযোগ কমিয়ে হালের ১৩৪৮ সালের ইংল্যান্ডের মতো কিছু করেন, তাতে কোনো কাজ হবে না। নিজেকে আপনি পৃথক করতে চাইলে, মধ্যযুগীয় পন্থায় লাভ হবে না। আপনাকে ফিরে যেতে হবে প্রস্তরযুগে। কিন্তু সেটা কি সম্ভব আপনার পক্ষে?

কার্যকর ‘কোয়ারিন্টিন’ পদক্ষেপের জন্য দরকার আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার। মহামারি না ছড়ানোর জন্য ‘কোয়ারিন্টিন’ এবং ‘লক-ডাউন’ পদ্ধতি অবলম্বন করা খুবই জরুরি। কিন্তু যখন এক দেশ আরেক দেশকে অবিশ্বাস করবে এবং ভাববে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই, তখন সেই দেশের সরকার এই ধরণের শক্ত পদক্ষেপ নিতে গিয়ে পিছিয়ে যাবে।

দ্বিতীয়ত, ইতিহাস এটা শিক্ষা দেয় যে, বৈশ্বিক সহযোগিতা ও নির্ভরযোগ্য বৈজ্ঞানিক তথ্য আদান-প্রদানের মাধ্যমেই প্রকৃত সুরক্ষা পেতে পারি আমরা। এখন কোনো দেশ যখন মহামারীতে আক্রান্ত হবে, সেই দেশটি যাতে সদ্ভাব বজায় রেখে কোনরকম অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের শঙ্কা ছাড়াই অন্য দেশগুলিকে বিষয়টা জানাতে পারে, তখন অন্য দেশগুলির উচিত হবে সমস্ত তথকে আমলে নিয়ে, বিশ্বাস করে, ভুক্তভোগী দেশটিকে অচ্ছুত বা পৃথক না রেখে তার দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়া। আজকে চীন যেমন সারাবিশ্বের সাথে করোনাভাইরাস নিয়ে অনেক গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান বিনিময় করতে পারে। তবে এর জন্যে প্রয়োজন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সর্বোচ্চ মাত্রায় সৌহার্দ্য আর সহযোগিতার মনোভাব বজায় রেখে কাজ করে যাওয়া।
কার্যকর ‘কোয়ারিন্টিন’ পদক্ষেপের জন্য দরকার আন্তর্জাতিক বোঝাপড়া ও সহযোগিতার। মহামারি না ছড়ানোর জন্য ‘কোয়ারিন্টিন’ এবং ‘লক-ডাউন’ পদ্ধতি অবলম্বন করা খুবই জরুরি। কিন্তু যখন এক দেশ আরেক দেশকে অবিশ্বাস করবে এবং ভাববে তাকে সাহায্য করার কেউ নেই, তখন সেই দেশের সরকার এই ধরণের শক্ত পদক্ষেপ নিতে গিয়ে পিছিয়ে যাবে। যদি আপনি আপনার দেশে ১০০ জন করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীকে সনাক্ত করেন, তাহলে আপনি কি সাথে-সাথেই আপনার শহর ও সমস্ত অঞ্চলের সকল কার্যক্রম বন্ধের লক্ষ্যে ‘লক-ডাউন’-এর মতো সিদ্ধান্ত গ্রহণ করবেন? এটা বস্তুত অনেকটাই নির্ভর করবে আপনি অন্য দেশগুলির কাছ থেকে কী প্রত্যাশা করছেন, তার উপর। নিজের শহরকে বদ্ধ করে রাখলে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ে পড়ার সমূহ সম্ভাবনা আছে। কিন্তু আপনি যদি আশ্বস্ত হন যে, অন্য দেশগুলো আপনাকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসবে, তাহলেই ‘লক-ডাউন’-এর মতো কঠোর পদক্ষেপ বাস্তবায়িত করতে পারবেন। কিন্তু যদি আপনি দেখেন যে, অন্য দেশগুলি আপনাকে সাহায্য করবে না, তাহলে আপনি এই ধরনের কঠোর পদক্ষেপ নিতে গিয়ে পিছিয়ে যাবেন। কিন্তু ততক্ষণে উদ্ভূত পরিস্থিতির ভয়াবহতার কারণে অনেক দেরি হয়ে যেতে পারে।
মহামারির ব্যাপারে মানুষের উপলব্ধি করা উচিত, যে-কোন দেশে মহামারি ছড়ালে তা সমস্ত মানবজাতিকেই গ্রাস করবে। এর কারণ হলো, ভাইরাস প্রতিনিয়ত বিকশিত হয়, বিবর্ধিত হয়, বিবর্তিত হয়। করোনা ভাইরাসের উৎপক্তি ঘটেছিল বাদুড়ের মতো প্রাণীর দেহে। এই ভাইরাস যখন মানবদেহে প্রবেশ করে, প্রাথমিকভাবে সেই মানবদেহের সাথে বেশ দুর্বলভাবে নিজেকে খাপ নিতে থাকে। কিন্তু যখন তা মানবদেহে নিজের প্রতিলিপি সৃষ্টি করতে শুরু করে, তখন ভাইরাসটি ব্যাপকভাবে ছড়িয়ে পড়ে (জেনেটিক্সের ভাষায় একে বলে মিউটেশন)। অধিকাংশ মিউটেশনই ক্ষতিহীন হয়ে থাকে। কিন্তু প্রায়শই এই মিউটেশন ভাইরাসকে অনেক বেশি সংক্রামক করে ফেলে। মানবদেহের রোগ প্রতিরোধ ব্যবস্থাকে দুর্বল করে দেয়। এই পরিবর্তিত সংক্রামক ভাইরাস খুব দ্রুত মানুষের মধ্যে ছড়াতে থাকে। একজন ব্যক্তি যেহেতু এই ধরনের পরিবর্ধনশীল ট্রিলিয়ন ভাইরাসের পোষক (ধারক) হতে পারে, সেইহেতু প্রত্যেক সংক্রমিত ভাইরাস ট্রিলিয়ন বার নতুন করে মানবদেহে খাপ খাইয়ে নেয়ার সুযোগ পেয়ে যায়। আসলে প্রত্যেক মানববাহকের শরীর হচ্ছে জুয়া খেলার বোর্ডের মতো, যা ভাইরাসকে ট্রিলিয়নবার লটারির টিকেট দিয়ে দেয় । এরপর ভাইরাসটির শুধু দরকার হয়, একবার মাত্র ড্রয়ের মাধ্যমে জয়ের টিকেট নিয়ে প্রতিষ্ঠা লাভ করা।
এই কথাগুলি নেহাত জল্পনা নয়। রিচার্ড প্রেস্টন তার ‘ক্রাইসিস ইন দ্য রেড জোন’ বইতে ঠিক এটাই দেখিয়েছেন যে, কিভাবে ঘটনার এই চক্রাবর্তের মধ্য দিয়ে ২০১৪ সালে ইবোলার প্রাদুর্ভাব ঘটেছিল। এই প্রাদুর্ভাবের শুরুটা ঘটেছিল যখন ইবোলা ভাইরাস এক বাদুড় থেকে মানুষের দেহে প্রবেশ করে। এই ভাইরাস আক্রান্ত ব্যক্তিদের বেশ অসুস্থ করে ফেলে কিন্তু সেগুলো তখনো মানবদেহের চেয়ে বাদুড়ের দেহেই ভালভাবে অভিযোজিত ছিল। কিন্তু একটা ইবোলা ভাইরাস তখনই এই রোগটিকে মহামারিতে পরিণত করে যখন এই ইবোলার একটা জিনের একটা মিউটেশন পশ্চিম আফ্রিকার মাকোনা অঞ্চলের একজন মানুষকে আক্রমণ করে বসে। এই মিউটেশন, তিনি দেখিয়েছেন, ইবোলা স্ট্রেইনকে সক্রিয় করে তুলেছিল- যাকে বলা হয়েছিল ‘মাকোনা স্ট্রেইন’। এই স্ট্রেইনের সাথে সংযোগ ঘটেছিল মানব কোষের কোলেস্টেরল পরিবাহকের। ফলে, ইবোলা ভাইরাসটি কোলেস্টেরলের বদলে কোষের মধ্যে চলে গিয়েছিল। এই ‘মাকোনা স্ট্রেইনটি’ছিল মানবদেহে চার গুণেরও বেশি সংক্রামক।
এই লেখাটা যখন আপনি পড়ছেন, ঠিক তেমনিই ভয়ংকর এক মিউটেশন হয়তো কোন ভাইরাসের জিনে ঘটে যাচ্ছে, যা তেহরান, মিলান কিংবা ওহানের কাউকে সংক্রমিত করছে। সেটা যদি ঘটে থাকে, তবে তা শুধু ইরান, ইতালি কিংবা চীনদেশের মানুষের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ হবে না, হবে আপনার জন্যেও। সারা পৃথিবীর মানুষ এখন করোনা ভাইরাসকে এরকম ভয়াবহ সুযোগ না দেবার জন্য জীবন-মৃত্যুর স্বার্থে একে অপরের কাছে অঙ্গীকারাবদ্ধ। এর অর্থ, আমাদের সকল দেশের সব মানুষকে রক্ষা করতে হবে।

পৃথিবীতে এখনো লক্ষ কোটি মানুষ আছে যারা মৌলিক চিকিৎসাসেবার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এই সত্য আমাদের সকলের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা এখনো জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্যখাতের কথা ভেবে আসছি। কিন্তু ইরান কিংবা চীনের জন্য উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিতের অর্থ হলো, তা মহামারি থেকে ইসরাইলি এবং আমেরিকানদেরও রক্ষা করবে।

১৯৭০ সালে মানবজাতি গুটিবসন্তকে নির্মূল করতে পেরেছিল। এর কারণ, সবাইকে তখন ভ্যাক্সিন দেয়া হয়েছিল প্রতিরোধের জন্য। যদি এর মধ্যে কোন দেশের মানুষ ভ্যাক্সিন নিতে অপারগ হত, তাহলে তা সমস্ত মানবজাতির জন্যই বিপজ্জনক হতো। কেননা, যতক্ষণ গুটিবসন্তের ভাইরাস টিকে থাকতো ততক্ষণ সে কোথাও না কোথাও বিকশিত হতো এবং এর ফলে সবখানেই তা ছড়িয়ে পড়তো।
ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে, মানবাজাতিকে সীমান্ত রক্ষা করতে হবে। এই সীমান্ত আন্তদেশীয় সীমান্ত নয়। বরং এই সীমান্ত রক্ষা করতে হবে মানব শরীর আর ভাইরাসের মধ্যে। পৃথিবী-গ্রহে প্রতিনিয়ত অগণিত ভাইরাসের উদ্ভব ঘটছে এবং জেনেটিক মিউটেশনের মাধ্যমে নতুন ভাইরাসের বিকাশ ঘটছে। ভাইরাস ও মানববিশ্বের যে সীমারেখা, তার ভেতর দিয়েই ভাইরাস মানবদেহে প্রবেশ করছে। কোন এক ভয়ঙ্কর ভাইরাস যদি এই সীমারেখা ভেদ করে পৃথিবীর কোন প্রান্তে ঢুকে পড়ে, তাহলে তা সমস্ত মানব প্রজাতিকেই ধ্বংসের সম্মুখীন করবে।
তবে আগের যে-কোনো সময়ের তুলনায় গত শতাব্দী থেকেই মানবজাতি তার এই সীমান্তরেখাকে দুর্ভেদ্য করে তুলতে পেরেছে। আধুনিক স্বাস্থ্যব্যবস্থা এই সীমান্তরেখার দুর্ভেদ্য দেয়াল হিসেবে কাজ করে থাকলে চিকিৎসক, সেবিকা ও বিজ্ঞানীরা হলো সেইসব প্রহরী, যারা ভাইরাসের মতো ধ্বংসাত্মক বহিরাগতকে প্রতিনিয়ত পাহারা দিয়ে ঠেকিয়ে রাখছে, যাতে তা মানবদেহকে আক্রমণ করতে না পারে। তবে, এই সীমান্তের বড় একটা অংশ শোচনীয়ভাবে এখনো অরক্ষিতই রয়ে গেছে। পৃথিবীতে এখনো লক্ষ কোটি মানুষ আছে যারা মৌলিক চিকিৎসাসেবার আওতার বাইরে রয়ে গেছে। এই সত্য আমাদের সকলের জন্যই ঝুঁকিপূর্ণ। আমরা এখনো জাতীয়ভাবে স্বাস্থ্যখাতের কথা ভেবে আসছি। কিন্তু ইরান কিংবা চীনের জন্য উন্নত স্বাস্থ্য ব্যবস্থা নিশ্চিতের অর্থ হলো, তা মহামারি থেকে ইসরাইলি এবং আমেরিকানদেরও রক্ষা করবে। এই সাধারণ সত্যটি সকলের অনুধাবন করার কথা। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত, পৃথিবীর সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিরাই এই সত্য থেকে দূরে সরে আছেন।

নেতৃত্বহীন পৃথিবী

মানবাজাতি আজ শুধুমাত্র করোনা ভাইরাসেই আক্রান্ত নয়, তারা আজ নিজেদের মধ্যে অবিশ্বাসের ভয়াবহতারও শিকার। একটা মহামারির বিরুদ্ধে জয়লাভ করতে হলে জনগণের উচিত বৈজ্ঞানিক তথ্য-উপাত্তকে বিশ্বাস করা। নাগরিকদের উচিত তাদের সরকার ও কর্তৃপক্ষকে বিশ্বাস করা এবং রাষ্ট্রের উচিত একে অপরকে বিশ্বাস করা। গত কয়েক বছর ধরেই দায়িত্বজ্ঞানহীন রাজনীতিবিদরা সুচিন্তিতভাবেই বিজ্ঞানের উৎকর্ষ, জনগণের প্রতিষ্ঠান এবং আন্তর্জাতিক সহযোগিতার গুরুত্বকে হেয় করে আসছেন। ফলস্বরূপ, আমরা এই ক্রান্তিকালটা পার করছি কোন নেতৃত্ব ছাড়াই। কিন্তু তারাই পারতেন বিশ্ব-উদ্যোগ হিসেবে উৎসাহ জোগাতে, সংগঠিত করতে এবং অর্থায়ন করতে।
২০১৪ সালের ইবোলা মহামারির সময়ে আমেরিকা এরকম নেতৃত্ব ও ভূমিকা নিয়েছিল। ২০০৮ সালের অর্থনৈতিক মন্দার সময়েও আমেরিকা গ্রহণ করেছিল অগ্রণী ভূমিকা। কিন্তু সাম্প্রতিক কালে আমেরিকা এই ভূমিকা থেকে পদত্যাগ করেছে। এখনকার আমেরিকান প্রশাসন বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার মতো সংগঠনের সহায়তা কমিয়ে দিয়েছে, আর খুব স্পষ্ট ভাষায় জানিয়ে দিয়েছে যে, আমেরিকার আর কোন প্রকৃত বন্ধু নেই। সে এখন শুধু আত্মস্বার্থের বন্ধনে অন্যদের সঙ্গে জড়িয়ে আছে। ফলে, যখন করোনা ভাইরাসের প্রাদুর্ভাব ছড়ালো, তখন আমেরিকা সাইডলাইনে ছিল এবং এখনও পর্যন্ত নেতৃত্ব নেয়া থেকে দূরে সরে আছে। যদি শেষ পর্য়ন্ত আমেরিকা নেতৃত্ব নেয়ার চেষ্টা করে, আমেরিকান প্রশাসনের উপর সবার বিশ্বাস এতটাই কমে গেছে যে, মাত্র কয়েকটা রাষ্ট্র সেই নেতৃত্ব মেনে চলবে বলে মনে হয়। আপনি কি সেই নেতাকে মানবেন যিনি বলবেন, ‘আমাকে সবার আগে প্রাধান্য দিতে হবে?’

এই মহামারি তার পুরনো জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি উদ্ধারের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে। যদি এর সদস্য রাষ্ট্রগুলি বাগাড়ম্বর না করে দ্রুত আক্রান্ত রাষ্ট্রগুলোকে আর্থিক সাহায্য, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে ইউরোপীয় আদর্শের জয় আবারও প্রমাণিত হবে। অন্যথায় তারা যদি নিজেদের রক্ষা করা নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তাহলে এই মহামারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেবে।

আমেরিকার রেখে যাওয়া শূন্যস্থান এখনো কেউ পূর্ণ করতে পারেনি। বরং বিপরীতটাই হচ্ছে। বহিরাগত-আতঙ্ক, বিচ্ছিন্নতার নীতি এবং অবিশ্বাস- এসবই হচ্ছে এখনকার আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বৈশিষ্ট্য। বিশ্বাস এবং সহযোগিতা ছাড়া আমরা করোনা ভাইরাসের ভয়াবহতা থামাতে পারব না, ফলে, এ ধরনের আরো অনেক মহামারি আমরা দেখতে পাব ভবিষ্যতে। কিন্তু ক্রান্তিকাল মানেই একটা সুযোগ। আশা করি, করোনা মহামারির মধ্য দিয়েই মানবজাতি বৈশ্বিক অনৈক্যের সমূহ বিপদটা অনুধাবন করতে পারবে।
উদাহরণস্বরূপ বলি, এই মহামারি তার পুরনো জনপ্রিয়তা ও ভাবমূর্তি উদ্ধারের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নকে বিরাট সুযোগ এনে দিয়েছে। যদি এর সদস্য রাষ্ট্রগুলি বাগাড়ম্বর না করে দ্রুত আক্রান্ত রাষ্ট্রগুলোকে আর্থিক সাহায্য, যন্ত্রপাতি ও চিকিৎসা সরঞ্জাম দিয়ে সহযোগিতা করতে পারে, তাহলে ইউরোপীয় আদর্শের জয় আবারও প্রমাণিত হবে। অন্যথায় তারা যদি নিজেদের রক্ষা করা নিয়েই ব্যস্ত থাকে, তাহলে এই মহামারি ইউরোপীয় ইউনিয়নের মৃত্যুঘণ্টা বাজিয়ে দেবে।
এরকম বিপর্যয়ের কালে, চরম লড়াই দেখা দেয় মানবজাতির নিজেদের মধ্যেই। এই মহামারি যদি আরো বৃহৎ অনৈক্য ও অবিশ্বাসের মধ্যে দিয়ে যায়, তবে ভাইরাসেরই জয় হবে। মানুষ যখন কলহে লিপ্ত থাকে, তখন ভাইরাস দ্বিগুণ বৃদ্ধি পায়। অন্যদিকে, যদি এই মহামারির সময় বিশ্ব সহযোগিতার হাত ধরে এগোয়, তাহলে এই জয় শুধু করোনা ভাইরাসের বিরুদ্ধেই ঘটবে না, মানুষ ভবিষ্যতের সকল জীবাণুর বিরুদ্ধেই জয়ী হবে।