উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ২]

0
153

পর্ব ২

কোলভিনকে সারখানে পাঠানো হয়েছিল আরো দু’জন আমেরিকানের সঙ্গে। তাদেরকে বেশ ভাবনা চিন্তা করেই বেছে নেওয়া হয়। তারা সব্বাই সারখানিজ ভাষাটা জানতো, এবং দেখতে শুনতেও ছিল গড়পড়তা সারখানিজদের মতোই। নেটিভদের দলে ভিড়িয়ে দেওয়ার জন্য তাদের মুখগুলো হালকা বাদামি রঙের করে দেওয়া হয়েছিল। তিনজনই ছিল ওস এজেন্ট, এবং এমনই বলিষ্ঠ ও পোড়-খাওয়া লোক যে তাদের মনে বদ্ধমূল ধারণা জন্মে গিয়েছিল, তারা মৃত্যুহীন। সপ্তাহ দুয়েক পরে দেখা গেল কোলভিন একাই কেবল টিকে গেছে আর চার-চার বার জাপানি প্রহরীদের হাত থেকে কোনও রকমে মরতে মরতে বেঁচে ফিরেছে। ডিয়ংয়ের বন্ধুত্ব ছাড়া তার বেঁচে যাওয়াটা ছিল কার্যত অসম্ভব।
চতুর্থবারে জাপানিরা যখন তাকে প্রায় ঘিরে ফেলেছিল তখন কোলভিন পালাতে পারবে না জেনেও মরিয়া হয়ে একটা জঙ্গলের পথ ধরে ছুটতে শুরু করে; ছুটতে ছুটতে সে হঠাৎই পৌঁছে যায় যেখানে ডিয়ং তার পোষা মহিষটার গা ধোয়াচ্ছিল। তারা পরস্পরের দিকে কয়েক মুহূর্ত তাকিয়ে থাকে, কোলভিন এক ঝটকায় বুঝতে পারে, ডিয়ং-কে বিশ্বাস করা যায়।
“আমি একজন আমেরিকান ইন্টেলিজেন্সের এজেন্ট, এখানে জাপানিদের ঠেকাতে এসেছি”- সারখানিজ ভাষায় দ্রুত বলে ওঠে কোলভিন। “জাপানি সেনারা আমাকে ঘিরে ফেলেছে, এখনই কোনও গোপন ডেরা খুঁজে না পেলে ওরা আমাকে ধরে ফেলবে। একটু সাহায্য পাওয়া যাবে?”
মোষের ঘাড় থেকে ডিয়ং নীচে কোলভিনের দিকে খানিকক্ষণ তাকিয়ে থাকে। তারপর গড়িয়ে নেমে যথারীতি বুক ফুলিয়ে এগিয়ে আসে কোলভিনের কাছে।
“কোনও চিন্তা নেই, আমি আপনাকে সাহায্য করব,” ডিয়ং বলে, তার চোখ উত্তেজনায় চিকচিক করে ওঠে।
কোলভিনের ঘাড় নাড়ার সঙ্গে সঙ্গে ডিয়ং চটজলদি তার হাতটা ধরে চওড়া অগভীর এক খাদের দিকে ছুটতে শুরু করে। এক হাত দিয়ে সে খাদের কিনার থেকে তিনটে ফাঁপা শরগাছ টেনে ছিঁড়ে আনে আর অন্য হাতে জনকে জলে ঠেলে দেয়।
“এই শরের নল দিয়ে হাওয়া-বাতাস নিতে থাকুন, খবরদার মাথা কিন্তু একদম নাড়াবেন না, যতক্ষণ না আমি আপনার মুখ থেকে শরগুলোকে টেনে বের করছি ততক্ষণ আপনি জল থেকে উঠবেন না”, ডিয়ং বলে।
সে কোলভিনকে জলের আরও ভেতরে ঠেলে দেয় এবং তাকে নীচে রাখার জন্য একটা বড় পাথর চাপিয়ে দেয় তার বুকের ওপর। খাদটা দু’ফুটের মতো গভীর, আর তাতে এতটাই জল যে জন ইঞ্চি ছ’য়েক তলায় সেঁধিয়ে যায়। কয়েক মুহূর্তের জন্য সে রীতিমতো আঁতকে ওঠে। তারপর ধীরে ধীরে কিছুটা হাল্কা বোধ করে, শরের মধ্যে দিয়ে শ্বাস নিতে পারছে দেখে অনেকটা স্বস্তি পায়।
পাঁচ মিনিট পরে, জাপানি সেনাদের তিনজন ওই জায়গাটাতে এসে হাজির হয়। জন খুব আবছা ভাবে তাদের কথাবার্তা শুনতে পায়, তারা চলে যাবার পর সেগুলো বলতেও পারে। জলের নীচে প্রায় মিনিট দশেকেরও বেশি সময় থাকার পর শরের ওপর একটা হালকা টান পড়লো বুঝতে পারে। সে উঠে বসে, মুখ আর গা থেকে কাদামাখা জল ঝরতে থাকে। ডিয়ং তার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে হাসে।
পরের আট মাসে এই দু’জন মানুষ প্রায় গোটা সারখানটা চষে বেরায়। ওই সময়ের মধ্যে তারা উড়িয়ে দেয় বারোটা জাপানি সেনাবাহী ট্রেন, ধ্বংস করে ফেলে ছ’টা মিলিটারি জাহাজী পোত, এবং জলবাহিনির আট-আটটা যুদ্ধ-নৌকার খোলে টাইম-বোমা লুকিয়ে রেখে দেয়।
মৃত্যু নিয়ে এই ছিনিমিনি খেলা তাদের প্রতিটি চিন্তা-ভাবনাকেই নিবিড়ভাবে প্রভাবিত করে তোলে, কোলভিনও ক্রমশ চিনতে পারে ডিয়ং আর সারখানের লোকজনদের। একবার হলো কী, তারা দুজনেই জাপানি সেনাদলের তাড়া খেয়ে যেখানে সারখানিজদের সূক্ষ্ম কারুকার্যময় পাথরের তলায় সমাধিস্থ করা হয়, সেই শোকস্তব্ধ অথচ অনিন্দ্যসুন্দর স্থানে একপ্রকার বাধ্য হয়েই গা ঢাকা দেয়। সমাধিক্ষেত্রের চারপাশটা বৃত্তাকারে আঁকড়ে ছিল চমৎকার সব সাইপ্রাস গাছের সারি। জাপানি সেনাদের থেকে ঢিলছোঁড়া দূরত্বে একটানা ঠায় আটঘণ্টা ধরে তারা ওই সমাধির পাথরের তলা দিয়ে হামাগুড়ি দিতে থাকে, যতক্ষণ না ভোরবেলায় জাপানিরা তাদের খোঁজখবর করা পুরোপুরি ছেড়ে দেয়।
অন্য আরেকদিনের কথা, তারা অপূর্ব অরেঞ্জ নদীর তীরে কোনও এক মন্দিরে আত্মগোপন করেছিল, সে সময় জাপানি সেনাদের নিছক সাধারণ পদাতিক দল নয় বরং কোলভিনের বিরুদ্ধে চূড়ান্ত ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্দেশ্যে ইন্দোনেশিয়া থেকে উড়ে এসেছিল গুপ্তচরবিরোধী বিশেষ বাহিনী। কোলভিন মন্দিরে লুকোতে চায়নি, মন্দিরের পিছনের অংশটা ছিল নদীর ওপর, ফলে পালাবার সম্ভাব্য কোনও রাস্তা ছিল না। ডিয়ং তর্ক করেনি, সে পূর্ণ আত্মবিশ্বাসে জোর দিয়ে বলেছিল যে মন্দিরই সবচেয়ে নিরাপদ।
জাফরান রঙের লম্বা ঢিলা পোশাক-পরা দু’জন সন্ন্যাসীর তত্ত্বাবধানে মন্দিরটা চলত। অসংখ্য ভক্তসুলভ হনুমান মন্দিরের ভেতর ও বাইরের চমৎকার শিল্পকার্য করা পাথরের প্রাচীরের ওপর ভিড় করে থাকত, তারাই মূলত সঙ্গী ছিল তাঁদের। যখন ডিয়ং ও কোলভিন মন্দিরের মধ্যে দ্রুত পা চালিয়ে ঢুকে পড়ে, তখন দু’জন পুরোহিতই ছিলেন সকালের প্রার্থনার দীর্ঘ লাইনে। ডিয়ং ও কোলভিন যে কখন মন্দিরের চূড়ায় উঠতে শুরু করেছে এবং চুপিসাড়ে হনুমানের মতো ভারি পাথরের বিমের আড়ালে লুকিয়ে পড়েছে, আর কখনই যে জাপানি সেনাবাহিনী মন্দিরে পৌঁছে গেছে তাঁরা তা খেয়ালই করেননি। তাঁরা চকচকে কামানো মাথা নিয়ে সূর্যের আলোয় জোর হাতে বারবার নতজানু হতে থাকেন , জাপানি লেফটেন্যান্টের প্রশ্নকে তোয়াক্কা না করেই চলতে থাকে তাঁদের স্তবগান ও ভজন। এমনকী যখন লেফটেন্যান্ট বীভৎস রাগে দানবীয় মুখে একজন পুরোহিতের মাথায় পিস্তল ঠেকান, তখনও মুখ বন্ধ হয়না পুরোহিতের। শেষে যখন লেফটেন্যান্ট বাধ্য হয়ে ট্রিগারে ঘাতক চাপ দিলেন, পাশবিক নৃশংসতায় মাথা ও মগজের রক্তমাখা গন্ধ ছড়িয়ে পড়ল মন্দিরের সিঁড়িতে, তখনও অন্য পুরোহিত তাঁর প্রার্থনা থামালেন না। এমন একান্ত আত্ম-সমর্পণের সামনে জাপানি লেফটেন্যান্ট অদ্ভুত অসহায় বোধ করতে থাকেন। অর্থহীন ও পাতি দায়সারা গোছের অনুসন্ধান শেষে তিনি তাঁর দলবল সমেত মন্দির থেকে বেড়িয়ে যান।
জাপানিরা চলে যাওয়ার পরেও তারা অনেকক্ষণ পাথরের বিমের আড়ালেই অপেক্ষা করে, নীচু স্বরে কথাবার্তা বলতে থাকে। সারখানের মাটিতে মৃত্যুবরণের সৌন্দর্য ও মাহাত্ম্য বিষয়ে সবিস্তারে ব্যাখ্যা করতে থাকে ডিয়ং, এমনকী সে সেই দিন কেন মরতে চাইল না সেব্যাপারেও একটা লম্বা-চওড়া কৈফিয়ত দেয়। আসলে ডিয়ং ছিল সাধারণ পরিবার থেকে আসা এমন এক নেটিভ যে চটকদার আর উত্তেজনাপূর্ণ বিষয়ের জোরালো নেশায় মনেপ্রাণে শহুরে জীবন-যাপন করতে চাইত।
মাস আষ্টেক পর থেকে কোলভিন এই বিচিত্র দেশের মানুষদের ভালোবাসতে শুরু করে। তারা ছোটখাটো, রুচিসম্মত মানুষ, চামড়া সুন্দর বাদামি রঙের, চালচলন যথেষ্ট শোভন ও সংযত। এমনকী সবচেয়ে নীচুজাতের লোকজনেরও মর্যাদা ও আত্মসম্মান বোধ অত্যন্ত মুগ্ধ করেছিল কোলভিনকে। তারা প্রত্যেকেই খুব উদার প্রকৃতির। তাকে খাবার-দাবার, খবরা-খবর ও উপযুক্ত মদত দিতে পিছপা হয়নি। শুধুমাত্র তাদের সঙ্গে দার্শনিক চর্চার বিনিময়ে কোলভিনের জন্য তীব্র সংকটকেও মাথা পেতে নিতে দ্বিধা করেনি তারা। কোলভিন জেনেছে – সারখানিজরা ‘দর্শন’ বলতে বুঝতো – জীবন-মৃত্যু, পাশবিকতা-উদারতা, সদাচার, সন্তানের লালনপালন, চড়া মদের আনন্দ এবং মৃত্যু-পরবর্তী জীবনের সম্ভাব্যতা সম্পর্কিত প্রশ্নমালা।
স্বাধীনতার ঠিক প্রাক-মুহূর্তে জন, ডিয়ংকে ইপিক্যাকের ব্যবহার সম্পর্কে জানিয়েছিল। একবার, বিচ্ছিন্ন এক উপসাগরে একটা সাবমেরিনের সঙ্গে সংযোগ রক্ষার জন্য তারা রেডিয়ো মারফত পাঠানো নির্দেশ অনুসরণ করে চলছিল। সাবমেরিন যখন সময় মতো পৌঁছাল, ক্যাপ্টেন বললেন, ইউনাইটেড স্টেটস মেরিন সারখানে পাঁচ দিনের মধ্যে পা দিতে চলেছে। তিনি তাদের পঁচিশ পাউণ্ড ইপিক্যাকের টিন দিয়ে বলে দিলেন – সকালে মার্কিন যুদ্ধজাহাজ এখানে পৌঁছানোর পরপরই যেন জাপানি আর্মি ক্যাম্পে এই পাউডার খাবারের সঙ্গে মিশিয়ে দেওয়া হয়।
জন এর কারণগুলো ব্যাখ্যা করত ডিয়ংকে। ইপিক্যাক ওষুধের জগতে সবচেয়ে শক্তিশালী বমনকারক ওষুধ রূপে পরিচিত। যতক্ষণ না কোনও ব্যক্তির শরীর থেকে এটা বের করা হয়, ততক্ষণ তার কেবল বমি করার মতোই শক্তি অবশিষ্ট থাকে। আর যদি কাউকে পরিমাণে বেশি দেওয়া হয়, তাহলে নির্ঘাত খিঁচুনি এবং নিশ্চিত সমাপ্তি।
সারখানিজ রাঁধুনিদের হাত দিয়ে তারা জাপানি সেনা ছাউনিতে ওষুধটা প্রয়োগ করে। পরদিন ছাউনির বাইরে ঝো&পজঙ্গলের মধ্যে অপেক্ষা করতে থাকে। সাড়ে টার সময় জাপানিরা ব্রেকফাস্ট করে। ৮টার সময় যুদ্ধজাহাজটি সারখানে পা দেয়। ৮টা ১০ মিনিটে জাপানিরা প্রায় টলতে টলতে ছাউনির বাইরে বেরিয়ে আসে।
প্রথম প্রথম ব্যাপারটা ছিল বেশ মজার – রাস্তা জুড়ে ছুটন্ত সেনারা কেবল বমি করার জন্য থমকে যাচ্ছে। কিন্তু তাদের দৌড়াদৌড়ি ইপিক্যাকের প্রতিক্রিয়াকে আরো বাড়িয়ে দেয়, লোকগুলো কাঁপতে শুরু করে ও মাটিতে পড়ে যায়। বমির চেষ্টায় শরীরগুলো ক্রমশ বেঁকে যেতে থাকে, যন্ত্রণায় দুমড়ে-মুচড়ে যায়; কেননা পাকস্থলিতে বমি করার মতো আর কিছু বাকি ছিল না। এক ঘণ্টা পরে যখন মার্কিন যু্দ্ধজাহাজের সেনারা ক্যাম্পের দিকে এগিয়ে যায়, সেখানে তখন রাস্তা ও রাস্তার পাশের ঘাসের উপরে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে রক্তাক্ত ও ক্লান্ত মানুষের দেহ, যাদের নিজেদের মাথাটুকু পর্যন্ত তোলবার ক্ষমতা নেই।

ডিয়ং এবং কোলভিনের এটাই শেষ যৌথ কর্মকাণ্ড। তিন সপ্তাহ পরে কোলভিন ফিরে যায় আমেরিকায়। একবছর পর সে ওএসএস থেকে ইস্তফা দেয় এবং উইসনকনসিনে মোষের দুধ কেনা, তা শুকিয়ে পাউডারে পরিণত করা এবং সেই পাউডারকে প্যাকেজ বানানোর পারিবারিক ব্যবসা চালাতে থাকে। এটা নিঃসন্দেহে ভালো আর নির্ঝঞ্ঝাট ব্যবসা, আর কোলভিন চালাচ্ছিলও ঠিকঠাক।
১৯৫২ সাল নাগাদ সংবাদপত্রে খবর ছড়িয়ে পড়ল যে সারখানে অভ্যন্তরীণ সংকট ভালোরকমেই দানা বেঁধে উঠেছে এবং তারা কমিউনিস্টদের দিকে ঝুঁকছে। কোলভিন এটা বিশ্বাসই করতে পারল না। সে সারখানিজ-সংস্কৃতি সম্পর্কে নিখুঁত ব্যাখ্যাসহ কীভাবে তাদের নিয়ন্ত্রণ করা যায় – সে সম্বন্ধে একটা দীর্ঘ চিঠি লিখল কংগ্রেস সদস্যকে। চিঠিতে বিনম্রভাবে তাকে পাল্টা জানানো হল যে তার পরামর্শগুলো রাষ্ট্রদপ্তরে পৌঁছে দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্রের নীতি একচুলও বদলালো না। শেষে, কমিউনিস্ট দেশগুলোর সঙ্গে উত্তর সারখানের সীমানাকেন্দ্রিক সমস্যা শুরু হলে, কোলভিনের ধৈর্যের সীমা চুরমার হয়ে যায়।
তাকে বোঝানো হয় যে, সারখানের পরিস্থিতি অত্যন্ত বিচ্ছিরিভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে। বোঝানো হয় যে তারও এক্ষেত্রে একটা ব্যক্তিগত দায় আছে। অতঃপর কোলভিন মনে মনে একটা চমৎকার পরিকল্পনা সযত্নে বুনে ফেলে।
সারখানের বৃষ্টিধোয়া পাহাড়ঘেঁসা অঞ্চলটা ছিল ছোট ছোট শক্ত ও ঘন ঘাসে ঢাকা। ঘাসগুলো এতটাই কর্কশ, রুক্ষ এবং শিকড় মাটির এত গভীরে বিস্তৃত যে ব্যবহারযোগ্য কোনও জমি থেকে এগুলোকে উপড়ে ফেলা প্রায় অসম্ভব ব্যাপার। কোলভিনকে স্যাম্পেল হিসেবে এই ঘাস পাঠানো হয়, সে আবিস্কার করে যে এটা টেক্সাস অঞ্চলে থাকা ছোট পা যুক্ত, চটপটে ও দ্রুত প্রজননে সক্ষম বিশেষ একধরনের গবাদি পশুর খাদ্য হিসেবে ব্যবহৃত হতে পারে। যদি এর দুধ ও অন্যান্য উপজাত দ্রব্যের ব্যবহার সম্পর্কে সারখানিজদের জানানো হয় তাহলে অবহেলায় পড়ে থাকা পতিত জমিগুলো এই পশুপালনে সমৃদ্ধ হয়ে উঠবে, এতে কোনও সন্দেহ নেই। এশিয়াতে এসব উপজাত দ্রব্যের ভালো বাজারও আছে। মাখনটাকে জমিয়ে ঘন করে ঘি বানিয়ে ভারতে বিক্রি করা যায়, সারখানের কারিগরদের মারফত চামড়া ট্যান করে ভালো জিনিস বানানো যায়, এমনকী এর ভেতরকার উপাদানগুলো মূলত অ-খ্রিস্টানরা নেটিভ মেডিসিনেও কাজে লাগাতে পারে।
কিন্তু সবচেয়ে আগে দুধের বিষয়টা সারখানিজদের নজরে আনতে হবে। কোলভিন এ কাজটা নিজেই করে। সে কার্যত পাউডার-নির্মিত দুধ বিক্রির জন্যই সারখানে থেকে যায়। টেক্সাসের গোরুগুলো বছরখানেক পর এখানে পৌঁছাতে শুরু করলে, তাকে তখন টাটকা দুধের উপর জোর দিতে হবে। ব্যবসাটা একবার চালু হয়ে গেলে সে ভাবে, তার শেয়ার বিক্রি করে নিজের মুলুকে ফিরে যাবে।
কোলভিন জানতো – কাজটা বিপজ্জনক; প্রথমত সে সারখানে ফিরেই ডিয়ংকে খুঁজে বের করার চেষ্টা করে। কিন্তু ডিয়ং যেন উবে গিয়েছিল, পুরোপুরি বেপাত্তা । সুতরাং কোলভিন ডিয়ংয়ের কোনোরকম সহযোগিতা ছাড়াই হাইধো শহরের বাইরে প্রথম দুধ বিতরণ কেন্দ্র তৈরি করে ফেলে। সে মাত্র সপ্তাহ দু’য়েক চালায়, দূতাবাস তার প্রকল্পটাকে খামখেয়ালিপনা বলে ঠিকই কিন্তু এর সফলতাকেও অস্বীকার করতে পারে না। এমনকী আমেরিকান রাষ্ট্রদূত লুইস সীয়ারসও বেশ কিছু কনফারেন্সের পর এ ব্যাপারে তাঁর হাত ধুয়ে ফেলেন।
তারপর, কথা নেই বার্তা নেই, ডিয়ং কোথা থেকে এসে হাজির হয় এবং কোলভিনের দিকে বন্দুক তাক করে। বন্দুকের নলের সেই শীতল ধাতব স্পর্শ সে এখনও মনে করতে পারে, তার চারপাশের ধরাবাঁধা রুটিনের বাইরে এটা কেমন যেন অবিশ্বাস্য ব্যাপার । খোলামেলা গুদাম ঘরের মধ্যে দিয়ে জঙ্গলের কোমল বাতাস মৃদুমন্দ বয়ে যাচ্ছিল, বাইরে সারখানি মহিলারা দুধের জন্য ধৈর্য সহকারে অপেক্ষা করছিল, আর দরজার পিছনে তাদের গলা কখনও আস্তে, কখনও বা বাস্তবিক, বেশ কলরোলে পরিণত হচ্ছিল। কোলভিনের পাশেই ১০০ পাউণ্ড টিনের দুধ বানানোর জন্য প্রচুর অ্যাটলাস অটোমেটিক মিল্ক-পাউডার প্রস্তুত। কিন্তু এই সাদামাটা শব্দ ও দৃশ্যের মাঝেই ঘাপটি মেরে ছিল মারাত্মক আশ্চর্য সব উপাদান। মিক্সারের পাশেই মেঝেতে পড়ে থাকতে দেখা যায় ইপিক্যাকের প্যাকেট আর কোলভিনের পাঁজরে বন্দুক ঠেকিয়ে তার পুরানো সঙ্গী ডিয়ং।
“চলো জন, চটপট তোমার মেশিনটা চালাও দেখি, এর মধ্যে দুধ আর ইপিক্যাক ঢালো।”
“ডিয়ং, তোমার মাথাটা দেখছি খারাপ হয়ে গেছে”, কোলভিন বলে, “বন্দুকটা সরাও তো।”
“কোনও মানুষ বোধহয় যখন মরতে বসে, তখন তার খুনিকে পাগলই ভাবে”, ডিয়ং হিসহিসিয়ে উত্তর দেয়। “কিন্তু ভুল ভাবছো, প্রত্যেকেরই মরবার জন্য একটা যুক্তিযুক্ত সময় আছে, আর এবার সম্ভবত তোমার পালা।”
“আরে এখানে যুক্তি-অযুক্তির কথা আসছে কোথা থেকে?” কোলভিন প্রশ্ন করে।
“আমি তো রাজনীতি-টাজনীতিতে নেই, একটা দুধ বিতরণ কেন্দ্রের বন্দোবস্ত করেছি মাত্র। আর তোমার দেশের লোকের কথা ভেবেই এটা করা।”
“শোনো জন, পাউডার দুধ এবং গবাদি পশু রাজনীতির বাইরে নয়, এবং অবশ্যই, যদি খুব একটা ভুল না করি, এটা ইতিহাসের সঙ্গেও জড়িত”, ডিয়ং বলে। “তাড়াতাড়ি হাত চালাও, এই দুধ আর ইপিক্যাক মেশিনে ঢালো। আমার হাতে কিন্তু বেশি সময় নেই।”
“না”, কোলভিন বলে। “আমি দুধের মধ্যে কিছুতেই ইপিক্যাক মেশাতে পারব না, তুমি জানো এটা কী করতে পারে।”
“জানি হে”, ডিয়ং বলে। “আরে তোমার কাছেই তো শেখা।”
“ডিয়ং, ব্যাপারটা বোঝো, মানুষগুলো ইপিক্যাক খেয়ে মরেও যেতে পারে।” কোলভিন আত্মপক্ষসমর্থনের চেষ্টা করে। “তারা তোমার নিজের দেশের লোক।”
“ডিমটা না ভাঙলে তো তুমি কখনই ওমলেট বানাতে পারবে না”, ডিয়ং বলে। “নাও, জন। হাত গুটিয়ে থেকো না। শুরু করো। আমি যদি জানতাম এর পদ্ধতিটা, তাহলে নিজেই করে ফেলতাম। শুরু করো, শুরু করো, তোমার হাতে বড়জোর আর মিনিট তিনেক সময় আছে। তারপর আমি গুলিতে তোমার বুকটা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবো আর প্রত্যেককে বলব যে তুমি দুধে ইপিক্যাকের মতো ভয়ানক বিষ মেশাবার মতলব করেছিলে।”
“কিন্তু এতে লাভটা কী হবে? এসব কার কাজে আসবে?”
“মনে করে দেখো, জন, আমি তোমাকে কী বলেছিলাম, দুধের ব্যাপারটা কিন্তু ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে গেছে। যদি তুমি এই দুধ এবং গবাদি পশুর ব্যবসাটা কায়দামাফিক চালিয়ে নিয়ে যেতে পারো, তাহলে একটা সময়ে সারখানের অর্থনীতিতে ভারসাম্য আসবে আশা করা যায়।”
“তাহলে আমার ভুলটা কোথায়? আমি তো এটাই করতে চাইছি।”
“কোনও ভুল নেই। ভালো আইডিয়া। আমরা তো আগে বনে-বাদাড়ে গা ঢাকা দিয়ে থাকার সময় এ নিয়ে অনেক আলাপ-আলোচনাও করেছি। কিন্তু, সমস্যা হলো, তোমাকে যদি এই কাজটা চালিয়ে যাবার জন্য অনুমতি দেওয়া হয়, তাহলে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে। তুমি সাফল্য পেয়ে গেলে সারখানিজরা তো বিশ্বাস করে বসবে যে আমেরিকাই তাদের মা-বাপ।”
কোলভিন বিষয়টা এতক্ষণে বুঝলো।
“ডিয়ং, তুমি একজন কমিউনিস্ট”, কোলভিন বলে ওঠে।
“এক্কেবারে। বিকল্প আর কোনও রাস্তা খোলা আছে না কি!”, ডিয়ং উত্তর দেয় নরম সুরে। “দেখো জন, তুমিই আমাকে মোষচড়ানো মামুলি একটা মানুষ থেকে জাতে উঠিয়েছিলে, শিখিয়েছিলে এই বৃহত্তর দুনিয়ার কথা। আমিও আমার যাবতীয় বিদ্যেবুদ্ধি দিয়ে তা শিখেছিলাম। কিন্তু, কী আর করা যাবে বলো, কপালটা নেহাতই মন্দ, বলতে বাধ্য হচ্ছি, বিষয়টা আর তোমার পক্ষে নেই। একটা সময় ছিল, এখন নেই। আমেরিকার সুযোগ ছিল, কিন্তু সে হারিয়েছে এবং এখন কমিউনিস্টরাই এগিয়ে আছে।”
“ডিয়ং, শোনো, তুমি তো আগে একবার আমাকে ভরসা করেছিলে”, কোলভিন দ্রুত বলে। “আমি তোমাকে বলছি, বিশ্বাস করো, আমাদের পক্ষই জিততে চলেছে। সেই শক্তি এবং ইচ্ছা এখনও আছে আমাদের।”
“না, তোমাদের ক্ষমতাই বলো আর ইচ্ছাই বলো, কোনওটাই নেই”, ডিয়ংয়ের গলায় পাথর-কঠিন দৃঢ়তা। “যুদ্ধের পর থেকে তোমরা কিছুই করোনি, বরং ক্ষতি করে গেছো। কারণটা খুব সহজ, ক্ষমতা সম্পর্কে তোমাদের আদৌ কোনও ধারণা নেই। আমাদের গোরু-ছাগলের মতো কিনে ফেলার জন্য তোমরা তোমাদের কেরানিগুলোকে পাঠিয়েছো। তোমরা হলে রূপকথার সেই ধনীলোকদের মতো, যাদের মগজটা একেবারে গোবরে ঠাসা।”

[চলবে]

প্রথম পর্বটি পড়ার জন্যে নিচের লিংকে ক্লিক করুন 

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac/