উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৩]

0
138

কদর্য মার্কিন

পর্ব ৩

কোলভিন জানতো ডিয়ংকে বিশ্বাস করানোর আর কোনও উপায় তার হাতে নেই। শুধু এটুকুই বোঝে, সে কেবল নিজেকেই বাঁচাতে পারে।
“ইপিক্যাকটা আমার হাতে দাও”, কোলভিন তিক্তস্বরে বলে।
“নিজের হাতেই নাও আর মিক্সারের ভেতর ঢালো,” ডিয়ং বলে।
কোলভিন এই প্রথম টের পেল – বন্দুকের নলটা তার পিঠ থেকে সম্পূর্ণ সরে গেছে। মুহূর্তের মধ্যে কোলভিন বিদ্যুৎগতিতে এক চক্কর ঘুরে গিয়ে ডিয়ংয়ের গলা আর কাঁধের সন্ধিস্থল লক্ষ্য করে হাত দুটোকে সজোরে শূন্যে ছুঁড়ে দেয়। আঘাতটা যদি ঠিকঠাক জায়গায় পড়তো, তাহলে ডিয়ংয়ের বন্দুক-ধরা হাতটা নির্ঘাত প্যারালাইজড হয়ে যেত। মারটা আকস্মিক এবং ভয়ংকর জোরে এলেও, লক্ষ্য থেকে কিছুটা সরে যায়। কোলভিন প্রায় জান্তব ভঙ্গিমায় পাল্টি খেয়ে তার পায়ের কাছে পৌঁছে গিয়েছিল। কিন্তু বন্দুকটা তখনও ডিয়ংয়ের হাতে এবং তা কোলভিনের বুকের দিকে তাক করা। ডিয়ংয়ের চোখে-মুখে তীব্র যন্ত্রণার চিহ্ন, নিজেকে অজ্ঞান হওয়া থেকে রুখতে সে আপ্রাণ চেষ্টা করে। কোলভিন ডাঁই করে রাখা দুধের ড্রামের মধ্যে ঝাঁপ দেয় আর সেই সময়েই ডিয়ং তাকে লক্ষ করে গুলি চালায়। ওই একনিমেষেই, মেঝের উপর ছিটকে পরা অবস্থায় কোলভিন দু’টো ব্যাপার আঁচ করতে পারে। এক, বুলেটটা তার ডান হাতের উপরের অংশে লেগেছে, মনে হচ্ছে হাড়গোড় ভেঙে গেছে। দুই, তার দেওয়া আঘাতের তীব্র যন্ত্রণায় ডিয়ংয়ের হাত থেকে বন্দুকটা প্রায় খসে পড়ছে।
যে মুহুর্তে ডিয়ং তাকে মেঝেতে আঘাত করতে উদ্যত হয়, ঠিক তখনই কোলভিন প্রায় হাতে-পায়ে ভর দিয়ে আবার খাড়া হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। সে পিপের সারিগুলোতে গায়ের জোরে ধাক্কা দেয় এবং সেগুলো গড়াতে গড়াতে সরাসরি তাদের মাঝখানে এসে পড়ে। সরু গুদামঘরের মধ্যে এবার হয় ডিয়ংকে বন্দুক ছাড়তে হবে নয়তো সতর্কভাবে কোলভিনের কাছে এগিয়ে আসতে হবে, লুকানোর আর কোনও জায়গা নেই সেখানে। ডিয়ং একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে নিজের হাতের দিকে, আঘাতের প্রতিক্রিয়ায় তার মুখখানা তখনও দোমড়ানো-মোচড়ানো। হাতটা খেঁচে গিয়ে অবশেষে মুঠো আলগা হয়ে গেলে, .৩৮ বোরের রিভালভারটি ট্রিগার-চাপা আঙুলে খানিকক্ষণ ঝুলতে থাকে এবং তারপর ঠকাস করে মেঝেতে পড়ে যায়।
কোলভিন চকিতে জোরালো গোত্তা মারে ডিয়ংকে, তার ডান হাত কোলভিনের দিকে অসহায়ভাবে ঝুলতে থাকে, বাঁ কাঁধ দিয়ে ফের জোর ধাক্কায় তাকে প্রায় ধরাশায়ী করে দেয়। এই তীব্র যন্ত্রণা আগের আঘাতটাকেও ফিকে করে দেয়, ওই অবস্থাতেই সে কোলভিনের নীচে থেকে মরিয়াভাবে প্রাণপণ লড়াই চালাতে থাকে। কোলভিন তার নিজের হাতদুটো ব্যবহার না করেও ডিয়ংকে বন্দুকের নাগাল থেকে দূরে রাখে। ডিয়ংয়ের পা দুটোকে পা দিয়ে পেঁচিয়ে কাঁচির মতো দৃঢ় ও শক্ত করে ধরে রাখে। খানিকক্ষণের জন্য গুদামঘরের শূন্যতায় এক মৃত্যু-নীরবতা নেমে আসে। ডিয়ংয়ের ফুসফুস থেকে কোনও রকমে বেরিয়ে আসা শ্বাসের শব্দ শুনতে পায় কোলভিন। ডিয়ংও কোলভিনের ক্ষতিগ্রস্ত ডান হাতটা দেখতে পায় এবং সেখানে দু-দু’বার পরপর ঘুঁষি চালায়। তীব্র আঘাতে কোলভিন যন্ত্রণায় কঁকিয়ে ওঠে এবং তার শরীরটা যেন অবশ হয়ে যায়। ডিয়ং ঘন ঘন শ্বাস নিতে থাকে। কোলভিন আবার তার পা দু’টো মুচড়ে দেয়, যাতে সে কোলভিনের আহত হাতের কাছে পৌঁছাতে না পারে, যে যন্ত্রণা তার মাথার ভেতর দলা পাকিয়ে উঠে দৃষ্টিকে আচ্ছন্ন করে দিচ্ছিল তা থেকে ক্রমশ মুক্তি পায়।
কোলভিন বিস্ময়ে হতবুদ্ধি হয়ে দেখে, সারখানের মহিলাদের লাইনটি ক্রমে গুদামঘরের দরজার কাছে এগিয়ে এসে তাকে আর ডিয়ংকে কৌতূহলের সঙ্গে দেখছে। লাইনের একদম সামনে বয়সের ভারে নুয়ে পড়া, তীক্ষ্ণ-দৃষ্টির প্রায় সত্তর বছরের এক বৃদ্ধা। বাকিদের মতো সেও হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে আছে, রকমসকম দেখে মনে হলো, সে-ই যেন নেত্রী।
“আমি ওকে গুলি করেছি, ও দুধের মধ্যে কোকোল মেশাতে যাচ্ছিল।” ডিয়ং কর্কশভাবে চেঁচিয়ে ওঠে। “রাস্তা ছাড়ো, একটু সাহায্য করো তোমরা, ব্যাটাকে আমরা পুলিশের হাতে তুলে দেবো।”
কিছুক্ষণের জন্য আচ্ছন্ন কোলভিন বুঝতে পারে না ডিয়ং কী বলছে। তারপর স্মৃতির উপর থেকে ঝাপসা পর্দাটা আস্তে আস্তে সরে গেলে একটা উন্মাদ রাগ তার মগজের চরাচর জুড়ে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে। কোকোর শুঁটি থেকে তৈরি হয় কোকোল নামক দেশি ড্রাগ, তাদের ধারণা এটা খুব শক্তিশালী মদ। হাইধোয় এরকম প্রচুর কিসসা শোনা যায় যে ধর্মপ্রাণ মেয়েরা নাকি কেবল কোকোলের জন্যই তাদের সতীত্ব হারিয়েছে। আবার এমন গল্পও শোনা যায় – এর সর্বনাশা প্রয়োগে কুমারীরাও বেশ্যা হয়ে যেতে বাধ্য হয়েছে। এর দ্রুত ও চূড়ান্ত প্রতিক্রিয়া সারখানিদের মোটেই অজানা ছিল না। ফলে তাদের ভয় পাওয়াটা ছিলো অত্যন্ত স্বাভাবিক।
“মিথ্যে কথা”, কোলভিন তীক্ষ্ণ আর্তনাদ করে। সে তখন হতবুদ্ধি, মাত্রাছাড়া ক্রোধে সে বুঝতে পারে তার চারদিকে যেন একটা ভীষণ তামাশা চলছে। সে যেন আদ্যপান্ত কোনও ভয়াবহ ঠাট্টার মধ্যে ডুবে যাচ্ছে। “এই লোকটাই আমাকে দুধের মধ্যে ইপিক্যাক মেশানোর জন্য জোরজারি করছে।” কয়েক সেকেণ্ডের জন্য তারা থমকে যায়, দু’জনেই বৃদ্ধ মহিলার মুখটা পড়ার চেষ্টা করে। ডিয়ং ক্রমাগত একই অভিযোগ করে চলে। আর কোলভিন চিৎকার করে তা অস্বীকার করতে চায়। কিন্তু প্রবল অসহায়তায় সে বোঝে যে তার গলা এতটাই দুর্বল যে বৃদ্ধা ঠিকঠাক শুনতেই পাচ্ছে না। সে এটাও লক্ষ করে যে কোকোলের নামটা শোনামাত্রই বৃদ্ধা আমূল স্তম্ভিত হয়ে গেছে।
কোলভিন এরপর আর মিনিট পাঁচেকের মতো সজ্ঞানে ছিল এবং এক একটা মিনিট কাটছিল যেন ভয়াবহ বন্য দুঃস্বপ্নের মতো। হাইধোর যে ছোটখাটো রুচিশীল মহিলাদের কোলভিন এতদিন বন্ধুর মতো ভেবেছিল, তারাই তার উপর একঝাঁক হিংস্র বাজপাখির মতো ঝাঁপিয়ে পড়ে। ছোট ছোট হাতগুলো নখ দিয়ে তার পা দু’টোকে প্রায় আঁচড়ে চিরে ফেলে এবং সমস্ত শরীর ক্ষত-বিক্ষত করে দেয় তীক্ষ্ণ আঘাতে। তার শার্ট দিয়ে আঙুলগুলোকে দুমড়ে-মুচড়ে ফেলা হয় এবং তারা বুকের উপর এঁকে দেয় দগদগে লাল রেখা। চারপাশের খেপে যাওয়া হাতগুলো আকস্মিক তার মুখের উপর এলোপাথাড়ি চড়-থাপ্পড় মারতে থাকে, সে আরো হতভম্ব হয়ে যায়।
“আমি তোমাদের বন্ধু”, শব্দগুলো কোলভিন এত ক্ষীণ স্বরে কোনও রকমে বলে যে সে ছাড়া আর কেউই তার গলা শুনতে পায় না। ভয়াবহ আতঙ্কে সে তার বক্তব্যের নিষ্ফলতা এবং শারীরিক অসহায়তা স্পষ্টই অনুভব করতে পারে।
মহিলাদের দঙ্গলটা সমস্ত নীতিজ্ঞান-ট্যান ভুলে গিয়ে চূড়ান্ত হিংস্রতায় তার উপর আছড়ে পড়ে। তাদের মধ্যে আবার একজন তার ভেঙেচুরে যাওয়া হাতটির ঠিক ওপরে উঠে দাঁড়ায় এবং নৃশংসভাবে একঝটকায় সেটাকে মুচড়ে দেয়। যন্ত্রণার সাদা কুয়াশা শুধু তার চোখের পিছনে কিম্বা মাথার মধ্যেই ঘুরপাক খায় না, সমস্ত গুদামঘর জুড়ে বাষ্পের মতো ছড়িয়ে পড়তে থাকে। কোলভিন আবছা চেতনায় টের পায় তার উপর চড়ে উঠে বিশৃঙ্খল মহিলার দল দানবীয় উল্লাস ও বিকট চেঁচামেচি জুড়ে দিয়েছে। একটা সময় সে ব্যাথার বোধটাকে নিরেট ভোঁতা করে ফেলে, এমনকী তখনও যখন তার কানদুটোকে ধরে মাথাটাকে তুলে কংক্রিটের মেঝেতে দুম করে ঠুকে দেয় ওরা। গোলমালটা ক্রমে এক অকথ্য বিতিকিচ্ছিরি আকার ধারণ করে।
চারদিক থেকে আঙুলের নখ, ছোট, ধারালো আগ্রাসী সব নখ তার দিকে ধেয়ে আসে। আঘাতগুলো এক এক করে আসলে তাও না হয় সহ্য করা যেত, কিন্তু এই সম্মিলিত আক্রমণে দেহটা যেন অসহ্য যন্ত্রণায় জ্বলে ওঠে। মনে হলো, অদ্ভুতুড়ে একপাল মুরগির থাবার আঘাতে ছিঁড়েখুঁড়ে তাকে যেন মৃত্যুর দিকে টেনে হিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। কিন্তু নিঃসীম যন্ত্রণায় ডুবে যেতে যেতেও তার খারাপ লাগে – নিজের জন্য, সারখানের মানুষদের জন্য, তাদের বন্ধুত্বের জন্য আর তাদেরকে ঘিরে গড়ে তোলা স্বপ্নগুলো হারিয়ে যাওয়ার জন্য।
অবশেষে মুক্তি। চোখের দৃষ্টি ধূসর হয়ে যায়, শোনার ক্ষমতা কমে যেতে থাকে, এক ভোঁতা অবসন্নতা ক্রমশ গিলে ফেলে তাকে। সে বোঝে তার জিভ মুখ থেকে বেরিয়ে আসতে শুরু করেছে, নাক দিয়ে কান দিয়ে গড়িয়ে পড়ছে লাল রক্ত এবং ডিয়ং পালিয়েছে তার পায়ের শিকল থেকে। কোলভিন বিনা বাধায় তার অচেতন অবস্থাকে মেনে নেয়, যা যন্ত্রণা ও আতঙ্কের তলানিতে জমে ওঠা ধোঁয়াশার থেকে আলাদা কিছু বলে মনে হয় না তার।
দু’ঘণ্টা পরে কোলভিনের অচেতন শরীরটাকে হাইধোর আমেরিকান দূতাবাসের সিঁড়ির উপর ফেলে আসা হয়। সম্পূর্ণ উলঙ্গ অবস্থায়, দেহ জুড়ে অজস্র আঁচড় শুকিয়ে শক্ত হয়ে বেগুনি কালশিটে পরে গেছে। শ্বাস-প্রশ্বাস চলছিল, তবে খুবই ধীরে ধীরে। বুকের বাঁ দিকে, মাংসের গভীরে পিন দিয়ে গাঁথা কাগজে ইংরেজিতে একটা নোট লটকানো ছিল। বক্তব্যটা হলো – “এ একজন আমেরিকান ধর্ষক। তোমরা একে ফিরে পেতে পারো। কিন্তু মনে রেখো, যেসব আমেরিকান আমাদের মেয়েদের নষ্ট করার চেষ্টা করবে, তাদেরও একই পরিণতি হবে।”
ওদিকে আবার , সারখানের রাজপুত্র নঙ্, রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের অফিসে গেছিলেন। এই সাক্ষাৎকারটা তিনি তখনই দিয়েছিলেন।
“এরকম তো আরও অনেক কার্টুন আছে, ওয়াশিংটনে রিপোর্ট করতে হবে, এখানকার মানুষজন আমেরিকান প্রতিনিধিদের প্রতি খুব একটা সহানুভূতিশীল নয়।“ রাষ্ট্রদূত সীয়ারস বলছিলেন। “দেখুন, এটাতে ব্যক্তিগতভাবে আমার কিছু যায় আসে না, কিন্তু এ ধরনের কার্টুন বাস্তবিকই অসম্মানজনক এবং দু’দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রেও যথেষ্ট ক্ষতিকর।”
রাজপুত্র নঙ্ সারখানের অন্যতম বিশিষ্ট কবি ও নাট্য-সমালোচক। অন্য সারখানি বুদ্ধিজীবীর মতো আশা করা যায় তিনিও নিজের প্রতিভাকে প্রয়োজনে চূড়ান্তভাবে দেশের কাজে নিংড়ে দিতে পিছপা হবেন না। এখন তিনি একজন কূটনীতিক অফিসারের ভূমিকায়।
“স্যার, আমি আপনাকে কোনও রকম ঠকাবার চেষ্টা করছি না”, রাজপুত্র নঙ্ বললেন। “আমার মনে হয় ইস্টার্ন স্টার কোনও কারণবশত আমাদের বৈদেশিক নীতি সম্পর্কে সমালোচনা-প্রবণ হয়ে উঠেছে। আরও নির্দিষ্ট করে বলা যায় – বিদেশি সাহায্যের বিনিময়ে যে অনুদানের বাতাস এদেশে বইছে, তা গ্রহণ করতে এরা প্রকৃ্তই অনিচ্ছুক। কিন্তু একটি গণতান্ত্রিক দেশের প্রতিনিধি হিসেবে সংবাদপত্রের স্বাধীনতায় হস্তক্ষেপের ব্যাপারে আমাদের অনিচ্ছার কথাটা আপনিও নিশ্চয়ই বুঝতে পারছেন।”
তাঁরা আরও কিছুক্ষণ কথাবার্তা চালালেন, এর মধ্যেই রাজপুত্র নঙ্ রাষ্ট্রদূত সীয়ারসকে বললেন – তিনি তাঁর বিরক্তিটাকেও যেমন বুঝতে পারছেন, তেমনি এই সরাসরি ও স্পষ্ট বক্তব্যেরও প্রশংসা না করে পারছেন না। তিনি চলে যাবার পরে, রাজপুত্র নঙ্ গোটা পরিস্থিতিটা ঠিকঠাক পড়ে ফেলেন আর অন্যদিকে নিজেকে খুব খাটো মনে হয় রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের।
সেদিন বিকেলেই প্রশাসনিক অধিবেশনে সারখানি মন্ত্রিসভার বিশিষ্ট উপদেষ্টা কমিটি আলোচনায় বসে। রাজপুত্র নঙ্ প্রথম কথা শুরু করলেন :
“ভদ্রোমহোদয়গণ, আমি মনে করি আমরা কখনই আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্র কিংবা সোভিয়েত ইউনিয়নের সঙ্গে সম্পর্কের ক্ষেত্রে আত্ম-প্রতারণা করিনি”, তিনি বললেন। “আমরা এই জাতিগুলোর মধ্যে কারও শিবিরেই থাকতে চাইনি। আমরা চাই সারখানের স্বাধীনতা ও সমৃদ্ধি। অর্থাৎ আমরা যার থেকে খুশি সাহায্য ও সহযোগিতা নেব, তবে কোনও কিছুর মূল্যে নয়। এবং আমাদের স্বাধীনতা হারানোর বিনিময়ে তো অবশ্যই নয়।”
“তাই তো কমিউনিস্টরা আমাদের ‘ঔপনিবেশিকদের পা-চাটা’ বলে আর আমেরিকানদের কাছে আমরা ‘নিরপেক্ষতাবাদী’” প্রধানমন্ত্রী বলে ওঠেন।
“আমরা সাহায্য পেতে চাই, কিন্তু কোনও খেসারত না দিয়ে, যা বলতে গেলে প্রায় অসম্ভব” রাজপুত্র নঙ্ বলে চলেন। “সুতরাং একটা ছোট জাতি শক্তিশালী জাতির হাতের তালুর নীচে থেকে, যা করে থাকে আমরাও তাই করছি – দর কষাকষি করছি। আমি মনে করি এ ব্যাপারে আমরা সহমত যে মূলত দু’ধরনের লোকের সঙ্গে লাভ-ক্ষতি নিয়ে দরদাম করা যায় – এক অহং কিংবা ঔদ্ধত্যহীন জ্ঞানী মানুষ যাঁরা অন্যের সমস্যা স্বচ্ছভাবে দেখতে পান, অথবা কোনও বোকা লোক। কিন্তু আমেরিকানরা কেন জানি না বোকা লোকগুলোকেই আমাদের রাষ্ট্রদূত হিসেবে পাঠায়।”
“বলুন, আপনার সঙ্গে আজ সকালে রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের কী কথা হলো,” প্রধানমন্ত্রী জিজ্ঞেস করেন।
“আহা রে! লাকি লুইসের মনে সুখ নেই,” রাজপুত্র নঙ্ না হেসেই বললেন। “এই মানুষটিকে কখনই তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করবেন না। তিনি বোকার হদ্দ, কিন্তু জানেন কখন সময় বুঝে আত্মরক্ষা করতে হয়। সকালে ইস্টার্ণ স্টারে প্রকাশিত কার্টুনটির ব্যাপারে তিনি গভীর অপমানিত বোধ করেছেন। এক্ষেত্রে তাঁকে নিয়ে ঠাট্টা তামাশা করার কিছু নেই। কিন্তু আমি মনে করি, রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের ডানাগুলো ছেঁটে না ফেললে আমেরিকা যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আমরা কুড়ি মিলিয়ন ডলারের যে চুক্তির চেষ্টাটা করছি সেটা যে কোনও সময় বিশ বাঁও জলে ডুবে যেতে পারে।”
ঘরের ভিতরে কেউ কোনও টুঁ শব্দ করলেন না। প্রধানমন্ত্রীর ইঙ্গিতে এককাপ করে চা পরিবেশন করা হলো। তখনও সবাই চুপচাপ।
“তাহলে ভদ্রোমহোদয়গণ?” প্রধানমন্ত্রী প্রশ্ন করেন। প্রত্যেকেই জানেন কী করা উচিত, কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর পক্ষে সে কাজে প্রত্যক্ষভাবে নামতে বলাটা বড্ড বেশি রূঢ় মনে হতে পারে।
“আমার মনে হয়, আমরা ইস্টার্ণ স্টারের প্রকাশককে রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের ওপর তোষামোদমার্কা কার্টুন এবং সম্পাদকীয় লেখা ছাপাতে বলতে পারি।” ইউ নঙ্ অনিচ্ছার সঙ্গে বললেন। নঙ্-এর শালীপতিভাই-ই ইস্টার্ণ স্টারের প্রকাশক।
“আমার মতে, এটা এই রোগের চমৎকার এক দাওয়াই।” প্রধানমন্ত্রী বলেন। তারপর ইউ নঙ্-এর হঠাৎ অপ্রস্তুত হয়ে যাওয়াটাকে এড়িয়ে যেতে তিনি তৎক্ষণাৎ পরবর্তী বিষয়ে চলে যান।
ওই দিনই শেষ বিকেলে রাষ্ট্রদূত সীয়ারস জন কোলভিনকে দেখতে হাসপাতালে যান। তিনি দারুণ খোশমেজাজে ছিলেন। মাত্র আধ ঘণ্টা আগেই ইস্টার্ণ স্টারের সম্পাদক তাঁকে ফোন করে তাঁর সম্পর্কে প্রকাশিত হতে চলেছে এমন একটা তোষামুদে প্রবন্ধ পড়ে শুনিয়েছেন। সিয়ারস তাঁকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন, আর শুধু কী তাই, সেক্রেটারিকে নির্দেশ দিয়েছেন তাঁর কাছে যেন চটজলদি একবাক্স হুইস্কি পৌঁছে যায়।
হাসপাতালে কোলভিনের রুমের কাছে এসে তিনি কিছুটা ইতস্তত করছিলেন। কোলভিনের চোখদুটো ছিল খোলা; মুখে অসংখ্য ছোট ছোট আঁচড়ের দাগ। রাষ্ট্রদূত এগিয়ে গিয়ে কিছুটা যেন আন্তরিকভাবেই তাঁর দিকে ঝুঁকলেন।
“আরে, তোমাকে দেখছি পুরো ফিচকে বিল্লির মতো লাগছে”, তিনি উচ্ছ্বসিতভাবে বলে ওঠেন। “মনে হচ্ছে ভয়ানক কিছুর সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছো।”
কোলভিন চোখ বন্ধ করে।
“আপনি কি জানেন গতকাল আমার সঙ্গে কী হয়েছে?” সে প্রশ্ন করে।
“কেন, জানি তো, আমার সংবাদদাতা আমাকে বলেছে, তুমি কোনও ভুলভাল মেয়ের সঙ্গে জড়িয়ে পড়েছিলে। মনে করে দেখো, ছোকরা, আমি তোমাকে আগেই সাবধান করেছিলাম। পাহাড়ি এলাকায় তুমি এরকম ফ্রি হুইলিং চালিয়ো না। এ সব ঘটনা অহেতুক আমেরিকার মুখে চুনকালি মাখাবে। যত তাড়াতাড়ি সম্ভব আমি তোমাকে আমেরিকায় ফেরত পাঠানোর চেষ্টা করছি।”
কোলভিন চোখ বুঁজেই থাকল। রাষ্ট্রদূত মিনিট কয়েক অপেক্ষা করলেন, তারপর ফেরার জন্য ঘুরলেন। যখন তিনি ঘরের প্রায় অর্ধেকটা পেরিয়ে গেছেন, কোলভিন ভারি গলায় বলে ওঠে, “সীয়ারস,” তিনি থমকে গেলেন, সে বলল, “আমি যাবো না।”

(চলবে)

পূর্ববর্তী পর্বের [পর্ব ২] লিংক 

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac-2/

পরবর্তী পর্বের (পর্ব ৩) লিংক

http://www.teerandaz.com/category/%e0%a6%85%e0%a6%a8%e0%a7%82%e0%a6%a6%e0%a6%bf%e0%a6%a4-%e0%a6%89%e0%a6%aa%e0%a6%a8%e0%a7%8d%e0%a6%af%e0%a6%be%e0%a6%b8/