উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৪]

0
112

কদর্য মার্কিন

পর্ব ৪

দ্বিতীয় অধ্যায়

লাকি লাকি লউ # ২

সালটা ১৯১৭ই হবে, চাষার ব্যাটা লুইজ ক্রুপিটজিনের জন্ম হয় রাশিয়ার আইভ্যানহোতে। কত আর বয়স তখন, কচি বালকই বলা যায়, চোখের সামনে একদিন মা-বাবাকে গুলিতে এফোঁড়-ওফোঁড় হয়ে যেতে দেখেছিল। চমকে ওঠার মতো কিসসুটি নেই, মামুলি স্রেফ আর-পাঁচটা রোজকার ব্যাপারের মতনই ঘটে গিয়েছিল ওটা। লুইস দাঁড়িয়েছিল ভিড়ে গাদাগাদি এক কুঁড়েঘরের জানালায়, একপাল সেনা জওয়ানের চার্জে থাকা লেফটন্যান্টের সঙ্গে তার বাবা-মায়ের বাকবিতণ্ডা কানে ভেসে আসে। কথা বলতে বলতে তার বাবা গোঁয়ারের মতো মাথা নাড়াতে নাড়াতে হঠাৎ পেছন দিকে ফেরে। লেফটেন্যান্ট দুম করে চামড়ার থলে থেকে তার কুৎসিৎ বন্দুকটা বের করে লুইসের বাবার খুলির পিছনটা উড়িয়ে দেন। একচক্কর পাক খেয়ে তার মাকেও গুলি করেন।
রাগ নাকি শূন্যতার ফাঁপা বোধ লুইস কোনও কিছু ঠাহর করার আগেই ঘটনাটা যেন এক নিমেষেই ঘটে যায়। কেবল ভয় নিখাদ ভয়। মনে মনে বাছাই করতে থাকে কোনটা তার পক্ষে নিরাপদ হবে – ছোট কদাকার পিস্তলটা ধরা নাকি এর বদলে অন্য কোনও কিছু।
এরপর তাকে মুরমানস্কের প্রতিবন্ধী শিক্ষাকেন্দ্রে পাঠানো হয়, পাঁচপেঁচি পাতি খাওয়াদাওয়ার উপর টিকে থাকা তার চাষাড়ে দেহটা সেখানেই বেড়ে ওঠে। লুইস আবিষ্কার করে তার একটা ভালো মনও আছে। ক্রমশ সময়ের হাত ধরে ষোলো বছর বয়সে সে খুঁজে পায় তার পালক পিতা : রাষ্ট্রকে । তাকে শেখানো হয় ‘দেশীয় কৃষিপদ্ধতিতে স্বেচ্ছাচারী ব্যাঘাত ঘটানোর’ কদর্য অপরাধে তার বাবা-মাকে হত্যা করা হয়েছে। তারা ‘কুলাক্স’ গোত্রের লোক ছিল, লুইস ইতিমধ্যেই তাদের আন্তরিকভাবে ঘেন্না করতে শিখে গেছে।
১৯৩৪-এ তার ‘সোভিয়েত দ্বান্দ্বিকতার বহুমাত্রিকতা’ প্রবন্ধটি কমসোমল সাহিত্যকীর্তির জন্য লেনিন পুরস্কার পায়। প্রত্যেকেই জানতো তরুণ লুইস ক্রুপিটজিন এক্ষেত্রে একজন নয়া আগন্তুক। তার কিছু কলিগ তো তাকে এর মধ্যেই ‘লাকি’ বলে ডাকতে শুরু করে, তবে সরাসরি মুখের ওপরে নয়।
১৯৩৫-এ তার কূটনৈতিক কেরিয়ার শুরু হয়ে যায়। নিউইয়র্কে সোভিয়েত ট্রেড কমিশনের মোটর চালক হিসেবে নিযুক্ত হয়। বিদেশের দূতাবাস সংক্রান্ত কর্মচারী – যেমন ড্রাইভার, ধোপা, ঠিকে ঝি, বাসন মাজার ঝি প্রভৃতি সবাইকেই বৈদেশিক কাজের শিক্ষানবিশির দল থেকে ঝাড়াই-বাছাই করে নেওয়া হত। দিনের অর্ধেকটা সময় তারা চাকর-বাকরের মতো কাজকম্ম করত, বাকি সময়টা ঠিক করে দেওয়া হত কে কী নিয়ে পড়াশোনা করবে। আসলে রাশিয়া তার দূতাবাস এবং কমিশনে ভিন দেশের লোককে নিয়োগ করতে চাইত না। তাছাড়া এভাবে বৈদেশিক দপ্তরের অফিসারদের প্রশিক্ষণটাও নিখুঁত মাপে ঠিকঠাক দেওয়া যেত।
নিউইয়র্কে থাকাকালীন, সে, ড্রাইভার ক্রুপিটজিন, আমেরিকান ইউনিয়নের সাংগঠনিক ব্যবস্থা সম্পর্কে পড়াশোনা চালাত। আর রাত্রিকালীন সময়ে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক আলেকজাণ্ডার উইলার্ডসের ‘আমেরিকান অভিজাত মনস্তত্ত্বে’র নিবিড় পাঠে নিমগ্ন থাকত।
১৯৩৭-এ ড্রাইভারের কাজ নিয়ে সে প্রাগে যায়। ১৯৩৮-এ বৈদেশিক দপ্তর তাকে পোকিনে কালচারাল কমিশনের ক্লার্ক হিসেবে পাঠায়।
১৯৩৯-এ তাকে আবার মস্কোতে ডাকা হয়। দেখতে দেখতে পরের দু’বছর কেটে যায় Foreign Institute Academy-তে পড়াশোনা করে। রাতের দিকে তার কাজ ছিল ডিকোডিং অফিসারের।
১৯৪১-৪৫-এ ক্রুপিটজিন কী করত না করত তার কোনও রেকর্ড নেই। তবে এটা নিশ্চিত, সে তখন কোনও মিলিটারি সার্ভিসে ছিল না।
১৯৪৫-এ ২৮ বছর বয়সে সে মাও সে তুঙের কর্মচারীদের ওপর পর্যবেক্ষণের দায়িত্ব পায়। ‘মিলিটারি শক্তি কীভাবে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সরঞ্জাম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে’ তা দেখতে মাও তাকে সেনাবাহিনী সমেত ইউনানে পাঠায়। বাড়ি যাবার জন্য প্রতি ছমাস ছাড়া ছাড়া তিনবার নামমাত্র ছুটি পেত, বাদবাকি পুরো সময়টা প্রায় টানা বছর তিনেক তাকে চীনে থাকতে হয়েছিল। একদম শেষ বার যখন সে বাড়িতে আসে তখন তারই এক প্রতিবেশী, বিদেশে চাকরি করতে আগ্রহী, নাডা কোলোসফকে বিয়ে করে ফেলে।
১৯৪৯-এ সে মস্কোতে ফিরে আসে এবং সোভিয়েত ইউনিয়নের বৈদেশিক দপ্তরের এশীয় বিভাগে একটা ভদ্রগোছের পদ পেয়ে যায়।
এর পরের অভিযান সারখানের এক্কেবারে গা-ঘেঁষা এক এলাকায়, কাজটা ছিল দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার জল সংক্রান্ত সার্ভে ও চার্ট তৈরির। জরিপ সংক্রান্ত ব্যাপারে ব্যবহৃত সারখান সরকারের জাহাজ গোর্কিতে চেপে সে আর তার স্ত্রী দুজনে মিলে একসঙ্গে সার্ভের কাজ কারবার চালাতে থাকে।
তারপর তারা মস্কোয় ফিরে এসে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার মস্কো স্কুলে যোগ দেয়। ক্লাস রোস্টারে ক্রুপিটজিনকে Ambassador-designate to Sarkhan হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এই পদটাকে বলা হত first class ambassadorship, কেননা একদিক থেকে দেখতে গেলে সারখান যেমন দু-কোটি লোকের সমৃদ্ধশালী এক দেশ, তেমনি এর কূটনৈতিক অবস্থানটিও যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ। তাছাড়া সারখানের পাশে সোভিয়েত ইউনিয়ন ৩০ সংখ্যাটা দাগিয়ে রেখেছে, তাদের বদ্ধমূল বিশ্বাস ৩০ মাসের মধ্যেই তারা সারখানকে কমিউনিস্ট বৃত্তের মধ্যে এনে ফেলতে পারবে।
নতুন চাকরির প্রস্তুতির জন্য মি. ও ম্যাডাম ক্রুপিটজিন দুজনেই এশীয় এলাকার মস্কো
স্কুলে কঠিন পরিশ্রম ও নিয়ামানুবর্তিতার মধ্যে টানা দু’বছর ধরে একনাগাড়ে পড়াশোনা করতে থাকে। তারা সারখানিজ লেখা ও পড়া দুটোই শিখে যায়। ক্রমে জানতে পারে মোটের উপর সারখানিরা বেশ রোগাপাতলা ছিপছিপে, নরম স্বভাবের ও মৃদুভাষী, তাদের শরীর যথেষ্ট শক্তসমর্থ, কিন্তু সাধারণত যা চোখে পড়ে তারা রীতিমতো শান্তিপ্রিয় ও ধার্মিকগোছের (বৌদ্ধধর্মই আদিধর্ম), প্রাচীন ধ্রুপদী সঙ্গীতের প্রতিও তাদের অল্পবিস্তর অনুরাগ আছে।
Ambassador-designate-ও নিজেকে অবিকল সেই ছাঁচেই ঢেলে সাজায়। খাবার-দাবারের ওপর কড়া লাগাম টেনে প্রায় চল্লিশ পাউণ্ড ওজন ঝরিয়ে ফেলে, ব্যালে নাচ শেখে। সারখানিজ সাহিত্য ও নাটক পড়তে শুরু করে, এমনকী নাক দিয়ে বাঁশি বাজাতেও দিব্যি দড় হয়ে ওঠে। এর পাশাপাশি বৌদ্ধধর্ম ও অনুশীলনকেন্দ্রিক বক্তৃতাগুলো নিয়মিত শুনতে থাকে।
মার্কিন রাষ্ট্রদূত লুইস সীয়ারস তাঁর পরিচয়পত্র সবার সামনে পেশ করার ঠিক এক সপ্তাহের মাথায় রাষ্ট্রদূত লুইস ক্রুপিটজিন পৌঁছে যান সারখানে।
এয়ারপোর্টে হাতেগোনা জনাকয়েক কর্মকর্তাই রাষ্ট্রদূত ক্রুপিটজিনের সঙ্গে দেখা করতে গিয়েছিলেন। তাঁদেরকে তাঁদেরই নিজস্ব ভাষায় আন্তরিক অভিবাদন জানানোর পর তিনি তাঁর নিজের গাড়িতে উঠে বসেন এবং সোভিয়েত দূতাবাসের দিকে রওনা দেন। পরের দিন সকাল সকাল তিনি প্রধানমন্ত্রীর কাছে নিজের শংসাপত্র নিয়ে পৌঁছে যান। বেলা গড়িয়ে বিকেল হলে রাজধানীর বাইরে প্রসিদ্ধ মঠটার উদ্দেশে বেড়িয়ে পড়েন, ওখানে ওই এলাকার বৌদ্ধ ধর্মনেতা প্রধান মঠাধক্ষ্যের প্রতি শ্রদ্ধা নিবেদনের জন্য তাঁকে ডাকা হয়েছিল। সাদা লোকেদের সচরাচর মঠে দেখতে পাওয়া যায় না, তাই ক্রুপিটজিনের আশ্চর্য আবির্ভাব তাদের কিছুটা হতভম্ব করে দেয়। বাইরের হলঘরের সন্ন্যাসীরা তাঁর দিকে কৌতুহলের দৃষ্টিতে তাকায়, কেউ বা মাথা নাড়ায়, কেউ আবার হাসতে থাকে। একজন আবার মান্যগন্য কাউকে খুঁজতে একছুটে দৌড় লাগায় ভেতরে, যাতে করে এই পরিস্থিতিটা আগাগোড়া বাগে আনা যায়। শেষপর্যন্ত উজ্জ্বল দীর্ঘ পোশাক পরিহিত, ওপর থেকে দেখে মনে হয় মঠে নবাগত এমন এক যুবক সাত তাড়াতাড়ি এসে রাশিয়ান রাষ্ট্রদূতের দিকে এগিয়ে গেল এবং বিনীতভাবে তাকে ইংরাজিতে জিজ্ঞেস করল, ‘স্যার, আমি কি আপনাকে কোনও ভাবে সাহায্য করতে পারি?’
তিনিও ইংরেজিতেই উত্তর দিলেন, ‘আসলে আমি প্রণম্য মহান প্রভুর বেদীমূলে আমার বিনম্র শ্রদ্ধা জানাতে এসেছি’, কথাটা শেষ করার সঙ্গে সঙ্গেই তিনি একপিঠে রাশান এবং অন্য পিঠে সারখানিজ ভাষায় মুদ্রিত তাঁর আমন্ত্রণ পত্রটি দেখালেন।
তরুণ সন্ন্যাসী তড়িঘড়ি ক্ষমা চেয়ে দ্রুত ঘর ছেড়ে বেড়িয়ে যায়। আবার দশ মিনিট যেতে না যেতেই ফিরে এসে বলে ‘প্রভু এখনই আপনার সঙ্গে দেখা করবেন। কিন্তু সমস্যা হল তিনি তো কোনও বিদেশি ভাষা জানেন না, তাই দোভাষী হিসেবে আমি আপনাদের সঙ্গ দেব।
আলোছায়াময় লম্বা করিডর পার হবার পর তারা একটা বিশাল ঘরে প্রবেশ করে। সেখানে আর কিছুই ছিল না, কেবল একপ্রান্তে বড়সড় এক সোনালি চেয়ারে একজন বয়স্ক সন্ন্যাসী বসে ছিলেন। সন্ন্যাসীর সামনে এসে ক্রুপিটজিন প্রায় ধনুকের মতো নত হয়ে ধ্রুপদী সারখানিজ ভাষায় বলে ওঠে, ‘আপনাকে শ্রদ্ধা জানানোর সুযোগ ও মর্যাদা পেয়ে আমি নিজেকে কৃতার্থ মনে করছি।’
‘বা! আপনি আমাদের ভাষা জানেন! কই সেক্রেটারিকে বলেননি তো?’
ক্রুপিটজিন তখনও বিনত, উত্তর দেন, ‘হে মহানুভব, মানুষ তার প্রভুর জন্য সবচেয়ে উৎকৃষ্ট শব্দগুলোই সঞ্চয় করে রাখে।’
ক্রুপিটজিন পা মুড়ে মেঝেতে বসেন। সারখানের মহান বৌদ্ধ নেতা এবং রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত লুইস ক্রুপিটজিনের কথাবার্তা শুরু হয়। প্রথমে খোশগল্প, পরে তা দার্শনিক আলোচনার দিকে মোড় নেয়। অন্ধকার নামার আগে পর্যন্ত পুরো বিকেলটা তাঁরা সেখানেই কাটিয়ে দেন।
সে-বছর সারখানে কয়েকটা দুর্ভাগ্যজনক ঘটনা ঘটে। চাষ-আবাদের ঠিক আগে আগেই ভয়াবহ টাইফুন আছড়ে পড়ে জমিগুলোর উপর। বিস্ফোরণের মতো ছিন্নভিন্ন করে দেয় সব কিছু। ধ্বংস করে দেয় শস্যের ভ্রুণগুলোকে। তার বেশ কয়েক মাস পরেই আবার দক্ষিণাঞ্চলে দুর্ভিক্ষ শুরু হয়ে যায়। ক্ষতিগ্রস্ত লোকজন চূড়ান্ত অসহায়তার মধ্যে আর তাদের মাথা ঠিক রাখতে পারে না। উদ্বিগ্ন উত্তেজিত হয়ে বড়লোকদের ফসল লুঠ করতে শুরু করে।
ওদিকে, আমেরিকান দূতাবাসের এক অনুবাদক রাশিয়ার গুপ্তচর হিসেবে কাজ করত। তার মারফত রাশিয়ান দূতাবাস জানতে পারে যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র নাকি ক্ষতিগ্রস্ত এলাকাগুলোর জন্য ১৪০০০ টন চাল জাহাজে করে পাঠাচ্ছে। এর কিছু পরেই অন্য আরেক গুপ্তচরের মাধ্যমে জানতে পারে, খুব শিগগির দিন দু’য়েকের ভেতরেই প্রথম মার্কিন শস্যবাহী জাহাজ পৌঁছে যাবে।
ক্রুপিটজিন যথারীতি উদ্যম ও সাহসিকতার সঙ্গে কাজটা সেরে ফেললেন। তিনি কালোবাজার থেকে কয়েক টন চাল রাজধানীতে আনিয়ে নেন, তারপর একটা ট্রাকে ভরে সুদূর ৩০০ মাইল দক্ষিণে পাঠিয়ে দেন। ওখানেই দুর্ভিক্ষ সবচেয়ে জোরালো থাবা বসিয়েছিল।
দক্ষিণের প্রধান শহর প্লুটালে পৌঁছাতেই তার চারপাশে একটা বড়মাপের ভিড় জমে ওঠে। তখন এক বিশেষ কমিউনিস্ট সংবাদপত্র হেডলাইন করে, ‘সারখানকে দুর্ভিক্ষমুক্ত করবে বন্ধু রাশিয়া। চাল বিতরণের সেই প্রথম পদক্ষেপে ব্যক্তিগতভাবে উপস্থিত থাকবেন রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত স্বয়ং।
এরপর ক্রুপিটজিন স্বশরীরে নিজেই সেখানে হাজির হন।
লাউড স্পিকার এবং এলাকার যত রেডিয়ো স্টেশন ছিল সর্বত্র ভেসে ওঠে ক্রুপিটজিনের কণ্ঠস্বর – ‘রাশিয়া আন্তরিক বিনয়ের সঙ্গে সমস্ত শক্তি দিয়ে তার বন্ধুকে সাহায্য করার জন্য প্রস্তুত।’ তিনি সঙ্গে করে যে পাঁচ টন চাল এনেছিলেন, তা মূলত স্থানীয়ভাবেই সংগ্রহ করা। ‘কিন্তু, একটু ধৈর্য ধরুন’, তাদের তিনি বললেন, একদম খাঁটি সারখানিজ উচ্চারণে : ‘আর কয়েকটা দিন মাত্র, হাজার হাজার টন চাল নিয়ে রাশিয়ার শস্যবাহী জাহাজ পৌঁছে যাবে এখানে এবং সম্পূর্ণ বিনামূল্যে তা বিতরণ করা হবে।’ তারপর তিনি বলতে শুরু করলেন রাশিয়া ও সারখান পরস্পরের বন্ধু আর একথা তো বলাই বাহুল্য মিত্রশক্তিকে একে অপরের পাশে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দাঁড়াতেই হবে। কিন্তু এটাও ভুলে গেলে চলবে না প্রফিট ছাড়া আমেরিকার মতো ঔপনিবেশিক ও ধনতান্ত্রিক দেশগুলো কখনওই এমনি এমনি অন্য কোনও দেশ কিংবা জাতিকে সাহায্য করে না।
অবশেষে এর ঠিক দু’দিন পরে সারখানের রাজধানী হাইধোর বন্দরে ফসল বোঝাই আমেরিকান জাহাজ পৌঁছে গেল। মার্কিন তথ্যকেন্দ্রের লোকজন সেখানে ক্যামেরাম্যান ও টেপ রেকর্ডার নিয়ে সদলবলে হাজির ছিল। সারখানের মার্কিন রাষ্ট্রদূত লুইস সিয়ারসের কাছ থেকে শস্য-ত্রাণ সংগ্রহের জন্য প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং নিজেই উপস্থিত ছিলেন। সাইরেন বেজে উঠল, কিছু ভাল বক্তৃতাও শোনা গেল। বক্তব্যগুলো শেষ হবার পর, জাহাজের খালাসিরা চালের বস্তাগুলো একে একে নামাতে শুরু করল, সেগুলো তারা ডকের নিচে বয়ে আনল, তারপর তুলে দিল আমেরিকান ট্রাকগুলোতে। দুর্ভিক্ষপীড়িত এলাকাগুলোতে প্রাণপণ দৌড় লাগাবার জন্যই ট্রাকগুলো যেন অপেক্ষা করছিল।
ডকের নীচে অর্ধেক রাস্তা পেরিয়ে আসার পর প্রত্যেক খালাসি ওজন করানোর জায়গায় এসে একবার করে থামছিল, আর নিয়মমাফিক তার চালের বস্তাটা ওজন করিয়ে নিচ্ছিল। কেননা সারখানে ঘণ্টার হিসেবে নয়, বরং কে কতখানি ভার বইছে তার ওপরেই খালাসির পারিশ্রমিক নির্ভর করত। দাঁড়িপাল্লা থেকে নামাবার সময় চেকার এসে প্রত্যেক সাদা থলের ওপর কিছু জাবদা গোছের সারখানিজ হরফ দেগে দিয়ে যাচ্ছিল।
ট্রাকগুলো প্লুটালে পৌঁছাতেই প্রায় হাজার দশেক লোক গা ঘেঁষাঘেষি করে জমা হতে শুরু করল। মাইকে ঘোষণা ফেটে পড়ছিল – ‘কয়েক দিন আগে রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত চাল বিতরণের যে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন, এই সেই চাল। দেখুন এবার কিন্তু প্রমাণিত হয়ে গেল রাশিয়া সব সময়ই তার কথা রাখে।’
ভিড় ফুঁড়ে আপত্তির কিছু অস্পষ্ট গুঞ্জন ওঠে – ‘কিন্তু এগুলো তো আমেরিকান ট্রাক। ওই তো আমেরিকান ড্রাইভারেরা! ওরাই তো চালিয়ে এনেছে।’
হ্যাঁ, তাই তো, আমরা জোর করে ছিনিয়ে এনেছি আমেরিকানদের কাছ থেকে,‘বলে উঠলেন একজন সারখানিজ কমিউনিস্ট। ‘মনে নেই আপনাদের, রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত আগেই সাবধান করে দিয়েছিলেন,নআরে এই ধনতান্ত্রিক শক্তিগুলোর উপর কোনও ভরসা নেই, এরা নিজেদের লাভ ছাড়া কোনও কিচ্ছু বোঝে না। তাই দুম করে এদের কাছ থেকে কিছু নেবার আগে ভেবে চিন্তে পা ফেলতে হয়।’
ভিড়ের চোখে-মুখে তখনও ঘোর সন্দেহের ছাপ, তারা তো শুনেছিল যেসব জাহাজে করে চালগুলো এসেছে সেখানে নাকি আমেরিকান ঝাণ্ডা উড়ছিল। আমেরিকান ট্রাক থেকেই তো চাল ঢালা হল, কিন্তু যেই ট্রাকগুলো খালি করে চালগুলো হাতে হাতে দেওয়া হল, অমনি অদ্ভুতভাবে কমিউনিস্ট প্রচারের গাড়িটার মাইক থেকে ঘোষণা ভেসে এল। লোকজন জানল রাশিয়ান রাষ্ট্রদূত নাকি তাঁর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করেছেন।
আরো আশ্চর্য, সারখানের গড়পড়তা সাধারণ মানুষজন যাতে দেখতে ও পড়তে পারে, তার জন্য সবকটা চালের বস্তায় সারখানিজ হরফে সাফ লেখা আছে – ‘এই চাল রাশিয়ার দেওয়া উপহার।’
আমেরিকানরা তখন চাল বিতরণের পাশাপাশি আহ্লাদে আটখানা হয়ে যাওয়া মানুষগুলোর হাসিখুশি মুখের ছবি তুলতে ব্যস্ত। ওখানে যেসব আমেরিকান হাজির ছিল, তাদের মুখে সব কুলুপ আঁটা। তারা তো সারখানিজ ভাষা না পারত পড়তে, না পারত বুঝতে। ফলে, মোদ্দা ঘটনাটা স্রেফ তাদের মাথার উপর দিয়ে চলে গেল, কচুপোড়া জানতেই পারল না কিছু।
প্রায় এক হপ্তা কেটে যাবার পরে আমেরিকান রাষ্ট্রদূত হঠাৎ ঘটনাটা আবিস্কার করলেন। মাথায় যেন আগুন ধরে গেল তাঁর, তীব্র ক্ষোভে ফেটে পড়লেন তিনি। ঝাঁঝালো এক বক্তব্যও তৈরি করে ফেললেন। ওদিকে ওয়াশিংটনের গর্জানিও থামানো যাচ্ছিল না, তড়িঘড়ি কোনও পালটা জবাব দেওয়ার জন্য অবিরাম চাপ আসছিল। সমস্যাটা হল অন্য জায়গায়। পরের দিকে ফসলভর্তি আমেরিকান জাহাজগুলোকে যথেষ্ট নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছিল ঠিকই, কিন্তু সারখানের লোকজন তাদের বিশ্বাস থেকে নড়ল না। তারা মনে মনে ঠিক করে নিয়েছিল, রাশিয়াই তাদের বন্ধু, রাশিয়াই তাদের অভাবের দিনে অনবরত চাল জোগান দিয়ে চলেছে।
এই চালকেন্দ্রিক ঘটনার মাসখানেক পর রাষ্ট্রদূত ক্রুপিটজিন মস্কোতে তাঁর প্রথম রিপোর্ট তৈরি করে পাঠালেন। দীর্ঘ চিঠিতে তিনি বলেছিলেন, ‘সারখানে কমিউনিস্ট কাজকর্ম প্রস্তাবিত কর্মসূচি অনুযায়ী ধাপে ধাপে ঠিকঠাকই এগিয়ে যাচ্ছে। এছাড়া কমিউনিস্টদের একযোগে একেকটা প্রচেষ্টা, সারখানে ক্ষমতা অর্জন করতে গিয়ে সেখানকার সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, ধর্মীয় এবং সামরিক প্রত্যেকটা ক্ষেত্রে রাশিয়ার প্রতিমুহূর্তের লড়াই সবই বিস্তারিত লেখা হয়েছিল রিপোর্টে।
রিপোর্টটার শেষের দিকে দুটো ছোট কিন্তু কৌতুকপ্রদ কমেন্ট করা ছিল।
‘আমেরিকান রাষ্ট্রদূত তো একেবারে রত্ন। তিনি রাজ্য ও প্রতিরক্ষার আন্ডার সেক্রেটারি থেকে শুরু করে নৌ সেনাপতি, জেনারেল, কংগ্রেস, সিনেটর এবং আরো অনেকের কখনও সংক্ষেপে গুণকীর্ত্তন করে, অভিবাদন জানিয়ে, কখনও মিটিং-ফিটিং করে এমনকি নানারকম সোস্যাল ইভেন্টের মাধ্যমে মোটামুটি এক ছাতার তলায় রাখার আপ্রাণ চেষ্টা করে যাচ্ছেন, এই লোকজনেরা অবশ্য কেবলমাত্র ‘নিজেদেরটাই নিজেরা ভাল বোঝে।’ তাঁর কর্মচারীরদের এখানে সেখানে পাহাড়ে কিংবা গ্রামেগঞ্জে ইচ্ছেমতো ছুটি কাটাতে নিষেধ করে দিয়েছেন, আর আশ্চর্যের ব্যাপার, এত সব ঘটনার পরে এখনও তিনি তাঁর খারাপ আচার-আচরণের কারণে সারখানের সাধারণ মানুষ জনকে জ্বালিয়ে মারছেন।’
‘তবে চিন্তার বিষয় হল, চালের জাহাজ নিয়ে আমেরিকার সঙ্গে আমরা যে চালাকিটা করেছিলাম, সেটা তো ধরতেই পারেননি রাষ্ট্রদূত, আর এই আহাম্মকিপনা নিয়ে নির্ঘাত ওখানকার প্রেস রীতিমতো তুলোধনা করেছে তাঁকে। যদি প্রেস এরকম একতরফা আক্রমণ চালিয়ে যেতে থাকে তাহলে তাঁকে সময় বুঝে সরিয়েও দিতে পারে আমেরিকা। কিন্তু তিনি এখানে থাকলেই তো আমাদের সুবিধে। তাই ভাবছি স্থানীয় সারখানিজ খবরের কাগজগুলোর সঙ্গে একটু কথা বলে নেব। ওরা যেন পরের এক দু’সপ্তাহ ধরে ওদের সম্পাদকীয় কলমে ক্রমাগত ওঁনাকে একজন সমঝদার ও লড়াকু লোক হিসেবে স্তুতি করে যায়। একেবারে প্রশংসার বন্যা বইয়ে দিক। আবার Pravda-র মতো কোনও কোনও কাগজকে তীক্ষ্ণ আক্রমণ চালিয়ে যাবার পরামর্শ দেব। US State Department এবং ওখানকার লোকজনকে বোঝনোর জন্য নিন্দা ও প্রশংসার ঠিক এই কম্বিনেশনটাই প্রয়োজন। এতে ওরা বুঝবে যে রাষ্ট্রদূত সীয়ারস দারুণ কাজ করে চলেছেন। আর আমরা তো এভাবেই আমেরিকার চোখে ঠুলি পরাতে চাই। এতে সাপও মরবে, লাঠিও ভাঙবে না।’
‘আরেকটা ব্যাপারেও আমি একটু চিন্তায় আছি। বার্মার এক এজেন্টের রিপোর্টে দেখলাম ওখানকার একটা এলাকায় একজন মার্কিন ক্যাথলিক যাজক নাকি দিব্যি ভাল কাজকর্ম করছেন। ওঁনার নাম ফাদার ফিনিয়ান। রিপোর্ট যদি ঠিকঠাক কথা বলে, তবে এই লোকটি কিন্তু প্রচার ও পাল্টা আন্দোলনের জন্য রীতিমতো দক্ষ, আর গোদের ওপর বিষ ফোঁড়া, তার সঙ্গে যুক্ত হয়েছে খ্রিস্টীয় ন্যায়নীতিকেন্দ্রিক টিপিক্যাল ধর্মীয় প্রতাপ। শোনা যায়, এই যাজক নাকি বর্মী ভাষায় কথা বলেন, নেটিভ খাবারও খেয়ে নেন, এবং নির্ঘাত ওখানে ক্যাথলিক ধর্ম সংক্রান্ত কিছু কিছু কাজের সঙ্গেও জড়িত আছেন। দেখুন, নিজেদের আঁতে ঘা লাগলে, যাজকের চালাকি ঠিক কোন জায়গায় পৌঁছাতে পারে, এ নিয়ে লেনিনের সতর্কবার্তাটি নিশ্চয়ই আমাদের সবারই মনে আছে। তাই আর মনে করাচ্ছি না। সুতরাং, এই লোকটি সম্পর্কে ঠিকুজি-কুষ্ঠি যা তথ্য পাওয়া যায়, তাই পাঠান, আমি জানবার জন্য একেবারে মুখিয়ে আছি।’

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%89%e0%a6%87%e0%a6%b2%e0%a6%bf%e0%a7%9f%e0%a6%ae-%e0%a6%9c%e0%a7%87-%e0%a6%b2%e0%a7%87%e0%a6%a1%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%be%e0%a6%b0-%e0%a6%93-%e0%a6%89%e0%a6%9c%e0%a6%bf%e0%a6%a8-%e0%a6%ac-3/

পরবর্তী পর্বের লিংক আসছে