উইলিয়ম জে. লেডারার ও উজিন বুর্ডিক >> কদর্য মার্কিন >> তর্জমা : অনিন্দিতা দত্ত ও শান্তনু ঘোষ >> ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ১]

0
220

The Ugly American

কদর্য মার্কিন

পর্ব ১

একটি চিরকুট
লেখকদ্বয়ের তরফ থেকে
বইটি উপন্যাসের আকারে লিখিত; কিন্তু এর ভিত্তি বাস্তব। এককথায়, আমরা যা লিখেছি বাস্তবিকই তা ঘটেছিল। কাহিনির পটভূমি এশিয়া, কিন্তু ঘটনাগুলো যে কেবল সেখানেই আবদ্ধ ছিল তা নয়, ঘটেছে বিশ্বজুড়ে, প্রায় ঊনষাটটা দেশে, যেখানে হাজির ছিল প্রায় দুই লক্ষাধিক আমেরিকান।
বইটির শেষে আমরা একটা ডকুমেন্টারি এপিলগ যোগ করেছি , আশা করি এতে পাঠক বুঝবেন আমরা যা লিখেছি তা নিছক কোনও ক্রুদ্ধ স্বপ্ন নয়, বরং সত্য ও তথ্যকেই উপন্যাসের কাহিনিতে তর্জমা করা হয়েছে। নাম, স্থান, ঘটনা এগুলো আমাদের আবিষ্কার; কোনও ব্যক্তিমানুষকে নিছক অস্বস্তিতে ফেলা আমাদের লক্ষ্য নয়, আমরা উদ্দীপিত করতে চেয়েছি আমাদের চিন্তার চলন, কাজের ধরনকে।
উইলিয়ম জে. লেডারার
উজিন বুর্ডিক
পার্ল সিটি , ওয়াহু
হাওয়াই টেরিটরি
১৯৫৮

প্রথম অধ্যায়

লাকি, লাকি লউ # ১

সারখানের মার্কিন রাষ্ট্রদূত স্যার ল্যুইস সীয়ারস বেজায় চটে গেছিলেন। এয়ার কন্ডিসনার অফিসটাকে ঠাণ্ডা রাখলে কী হবে, অসহ্য জ্বালা ধরানো এক অস্বস্তি তাঁর ভেতরে পাক দিয়ে উঠছিল। হাইধোর সবচেয়ে জনপ্রিয় সংবাদপত্র ‘সারখান ইস্টার্ণ স্টার’-এর সম্পাদকীয় পাতাটা ফের উল্টে নিয়ে কার্টুনটা বেশ খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখতে লাগলেন।
রাষ্ট্রদূত সীয়ারস মনে মনে বললেন – চুলোয় যাক প্রধানমন্ত্রী আর যত সব চুনোপুঁটি উপদেষ্টাদের বক্তিমে, এই ‘ইস্টার্ণ স্টার’ আসলে একটা পাক্কা কমিউনিস্ট কাগজ আর কী অলুক্ষণে কাণ্ড, দেখতে পাচ্ছি কার্টুনটা অনেকখানি আমারই মতো।
রাগের চোটে আকস্মিক এক ঝটকায় মাথাটা কাগজ থেকে সরিয়ে নিয়ে জানলার দিকে দৃষ্টি ফেরালেন তিনি। দূতাবাসের সামনের লনটি দীর্ঘ, সযত্নে ছাঁটা, টাটকা সবুজ স্রোতের মাঝখান দিয়ে হাইধোর প্রধান রাস্তার দিকে ঢালু হয়ে নেমে গেছে। দু’পাশে রঙের ছটা যেন উজ্জ্বলতায় ফেটে পড়ছে … ব্যোগেনভেলিয়ার লাল ও বেগুনি মাদকতা, হিবিস্কাসের নরম আচ্ছন্নতা, বট গাছ থেকে ঝুলে থাকা অসংখ্য অনবদ্য সব অর্কিড আর বাঁশঝাড়ের নিবিড় প্রাণজুড়ানো সরলরেখা। লনের শেষপ্রান্তে রট আয়রনের একটা বেড়া দূতাবাসের মাঠটাকে রাস্তার শব্দ ও কোলাহল থেকে বিচ্ছিন্ন করে রেখেছে।
কাঠের বোঝা অথবা হয়তো ভিজে পাতার ওপর সাজিয়ে-গুছিয়ে রাখা মুলো, মরশুমি পেঁয়াজ, বীনস এমনই সব নানা সবজির ঝুড়ি পিঠে চাপিয়ে মহিলারা সার বেঁধে গ্রাম থেকে চলেছিল হাইধোর দিকে, রোজকার মতোই। কখনও-সখনও এক আধজন মহিলাকে আবার মাথায় মাছের ঝোড়া নিয়ে যেতে দেখা যায়, ওই খুদে রুপোলি শরীরগুলো যেন সকালের প্রথম কচি রোদ্দুরকে আঁকড়ে ধরে রাখে। সাইকেলে চেপে গেলেও যে কোনও লোককে মহিলাদের এই কিচিরমিচির করা সারির পাশ ঘেঁষেই যেতে হয়।
কার্টুনের প্রতি তার বিরক্তির কথা বেমালুম ভুলে গিয়ে রাষ্ট্রদূত সীয়ারস ভাবেন – যত্ত সব বদখত ছিঁচকে হনুমানের দল। মেয়েগুলো দিনরাত সর্বক্ষণ খেটেখুটে মরে আর অকর্মার ঢেঁকি ছেলেগুলোকে দেখো, মজা লুটবার বেলায় ষোল আনা মাতব্বর।
মোটরচালিত যানবাহনের মধ্যে একমাত্র স্রেফ ট্রাকটাই যা এখানে চোখে পড়ে, মার্কিন মিলিটারি উপদেষ্টার দলই ওগুলো সারখানিজ সরকারকে দিয়েছে। ইঞ্জিনে স্টার্ট দেওয়া হল কি হল না, এক্কেবারে পয়লা ধাক্কাতেই ট্রাকগুলো রাস্তায় নেমে পড়ে আর হর্নগুলো এমন ভাবে একনাগাড়ে গাঁক গাঁক আওয়াজ করতে থাকে, যেন গাড়িগুলো সমস্ত পূর্ণগতিতে চালিয়ে দেওয়া হয়েছে। এই সব ট্রাকের সারি হ্যাণ্ড গ্রেনেডের বাক্স, আংটা লাগানো তারের গোছা, গ্যাসোলিন ও তারের পিপে, ৫০ ক্যালিবার মেশিনগানের বড়সড় আয়তাকার বাক্স ইত্যাদি হরেক কিসিমের মিলিটারি মালপত্তর বয়ে নিয়ে যায় সটান উত্তরের দিকে।
হঠাৎ রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের মাথায় আসে – আরে, এর আগাপাশতলা গোটাটাই তো আমেরিকায় তৈরি। এক নিমেষে তাঁর রাগের পারদটা খানিক থিতিয়ে এল , চোখ ফেরালেন ‘ইস্টার্ণ স্টার’-এর পাতায়, বিশেষ করে কার্টুনটার দিকে। যদিও তাঁর ওপর লাগাতার একবগ্গা চাপিয়ে দেওয়া গুটিকয়েক শব্দ ছাড়া তিনি আর কোনও সারখানিজ শব্দ পড়তে পারতেন না, তবে এখানে বিষয়টা ছিল ঢের বেশি সোজাসাপ্টা। কার্টুনে এক ছোটোখাটো নাদুসনুদুস আমেরিকানকে দেখা যায় যার ঘাম জ্যাবজ্যাবে চোখমুখ, মুখটা অনেকটা বেমক্কা গলা ফাটানো খচ্চরের মত হাঁ করা, গায়ে গতরে রোগা-পাতলা অথচ সুঠাম স্বাস্থ্যে ভরপুর সারখানিজ এক ব্যক্তিকে সে গলায় দড়ি পরিয়ে একটা নির্দিষ্ট চিহ্নের দিকে টানতে টানতে নিয়ে যাচ্ছে। চিহ্নের মধ্যে সারখানিজ শব্দ দুটোকে রাষ্ট্রদূত অনায়াসেই চিনতে পারলেন, – “কোকা কোলা”। আর ওই বেঁটেখাটো মানুষটির তলায় লেখা ছিল একটা ইংরেজী শব্দ ‘Lucky’।
দূতাবাসের সারখানিজ জানা কয়েকটা টিকিওয়ালা আমেরিকানকে ঘাড় ধাক্কা দিয়ে সিধে জাহান্নামে পাঠিয়ে দেবার ইচ্ছে হলো রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের। তিনি USIS এর সঙ্গে যুক্ত নেটিভ ট্রানস্লেটারদের জেরা করতে মনেপ্রাণে ঘৃণা বোধ করতেন। তাঁর সন্দেহ এই সব নরকের কীট, ব্যাটা হনুমানের দল সবসময় মিথ্যা কথা বলতে ওস্তাদ। তবে এবার আর তাদের তৈলমর্দনে কোনও কাজ হবে না, কেননা হুমদো মার্কা মোটাসোটা চরিত্রটির নাম পরিস্কার লেখাই আছে ‘Lucky’।
সীয়ারস যখন একসময় যুক্তরাষ্ট্রীয় রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন তখন তাঁকে লোকে ‘লাকি, লাকি লুইস’ বলে ডাকত। একটানা আঠারো বছর তিনি একজন সফল ও জনপ্রিয় সেনেটর ছিলেন; কিন্তু পাশাপাশি এমনও চাপা কানাঘুষো শোনা যায় তিনি নাকি নিতান্ত বরাত জোরেই বরাবর নির্বাচনে জিতে এসেছেন। ডেমোক্র্যাট সীয়ারস যখন প্রথমবার জিতলেন তখন ড্রিউ পিয়ারসন বলেছিলেন তিনি নাকি ডেমোক্রেটিক বছরে একজন খাঁটি ডেমোক্র্যাট হিসেবে যথেষ্ট লাকি। পরবর্তী ঘোড়দৌড়ে, নির্বাচনের মাত্র দিন দশেক আগে বলা নেই কওয়া নেই তাঁর রিপাবলিকান প্রতিদ্বন্দ্বীর বিনা নোটিসে স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটে, সীয়ারস ভেবেছিলেন মার দিয়া কেল্লা, এবার তো তার পোয়া বারো। এরপর তৃতীয় অভিযানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বীর স্ত্রী একটা বিচ্ছিরি রকমের স্ক্যান্ডালে জড়িয়ে পড়েন। তবে সীয়ারস মিহিভাবে আড়চোখে নজর করলেন , চতুর্থ বারে তাঁর পরাজয়টাকে কিন্ত কেউ ‘ব্যাডলাক’ বলে মনে করলো না।
আসলে সত্যি কথা বলতে কী, তাঁর শেষ নির্বাচনে হেরে যাওয়া নিয়েও সীয়ারস খুব একটা উদ্বিগ্ন ছিলেন এমনটা নয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে অভিজ্ঞতা মারফত তিনি জেনেছিলেন – পার্টি তাঁর কাছে অন্তত কিছুটা হলেও ঋণী। নির্বাচনের ঠিক দু’দিন পর, তাঁর ভোটিং রেকর্ড যখন হাতের মুঠোয় তখন তাঁকে ন্যাশানাল কমিটিতে তলব করা হয়।
রাজনীতির প্যাঁচপয়জার তাঁর জন্য গুছিয়েই রাখা ছিল।
“কী ধরণের কাজ আপনি পছন্দ করেন লাকি?” তাঁরা জিজ্ঞাসা করলেন।
“বেশ দীর্ঘমেয়াদী সামন্ততান্ত্রিক বিচারকের কাজ”- তাঁর তড়িঘড়ি জবাব।
“ঠিক আছে, কিন্তু দু’বছরের আগে তো তেমন কোনও পদ পাওয়া যাবে না। আপাতত লাকি, আপনি কি রাষ্ট্রদূত হতে চান?”
“আমি, রাষ্ট্রদূত?” প্রায় বিদ্যুৎ গতিতে মানসচক্ষে ভেসে ওঠে সেন্ট জেমসের কোর্টের সামনে মর্নিং কোট ও স্ট্রাইপ দেওয়া প্যান্ট পরে হাজির হওয়ার এক দৃশ্য অথবা প্যারিসের বিশাল ঝাঁ চকচকে দূতাবাসের দিকে তিনি নিদারুণ ব্যস্তসমস্ত হয়ে ছুটে চলেছেন – নিজের মনে এমনই সব ছবির কল্পনা করতে করতে বলে উঠলেন সীয়ারস। সীয়ারস এমন একজন বিচক্ষণ রাজনীতিবিদ, যিনি তাঁর মুখে ফুটে ওঠা যে কোনও প্রত্যাশার ছাপকে নির্দ্বিধায় ধরে রাখতে পারেন। “দেখো বাপু, একজন রাষ্ট্রদূত যা আয় করে, তার থেকে ব্যায়ের বহরটা সবসময়ই বেশি হয়। যদি আপনারা এরকম একজন জনহিতৈষীকে পেয়ে যান , যিনি আমার মতো বেফালতু লোককে সমর্থন করে চলবেন তাহলে তো ল্যাঠা চুকেই গেল, কিন্তু আমার বর্তমান পরিস্থিতির হাল হকিকত সম্পর্কে আপনারা যে জানেন না তা তো নয় । এই আঠারো বছর ধরে আমি যা পেয়েছি, গোটাটাই সেঁদিয়ে গেছে পার্টির উদরে”।
আর কোনও রকম কথা না বাড়িয়ে কুশলী ব্যক্তিটি সম্মতি দিয়ে দেন। আসলে কথাটা এমনই মার্কামারা, যা হামেশাই শুনতে শুনতে কান প্রায় পচে গেছে, তবু তাদের স্পর্শ না করেও পারে না।
“সারখানে একটি রাষ্ট্রদূতের পদ ফাঁকা আছে”। তিনি বললেন। “১৭৫০০ ডলার দেওয়া হবে ইচ্ছে করলে তা থেকে আপনি নিজের জন্য সঞ্চয় করতে পারেন। বিনোদন ভাতা হিসেবে আছে ১৫০০০ ডলার তাছাড়া আপনি বিনা ট্যাক্সে মদও কিনতে পারেন। রাষ্ট্রদূতের জন্য একটি ম্যানসনও আছে, যা আবার আপনি বিনা ভাড়ায় পেতে পারেন”।
“এই সারখানটা আবার কোন চুলোয়?”
“বার্মা ও থাইল্যান্ডের মাঝে এটা একটা ছোট্ট দেশ”।
“দেখুন, আপনারা তো জানেন, আমি কোনও রকম কুসংস্কারের ধার ধারি না কিন্তু ওই কালোকুলোদের সঙ্গে কাজ করতে গেলেই আমার হাঁফ ধরে যায় ”।
“ওরা কালো নয়, বাদামি। বেশ, আপনি একান্তই যদি না চান, তাহলে আপনাকে লিগ্যাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবেও রাখতে পারি…”।
“আমি রাজি”।
প্রথম প্রথম কাজের দায়িত্বটা রাষ্ট্রদূত সীয়ারসের খুব একটা মন্দ লাগেনি। সস্তার মদ সম্পর্কিত খবরটা নির্জলা সত্যি, তিনি আজ পর্যন্ত যত বাড়িতে থেকেছেন, সেই তুলনায় রাষ্ট্রদূতের এই ম্যানসনটা সবচেয়ে খোলামেলা আর চমৎকার সাজানো-গোছানো। এই বাড়িটির প্রতি শ্রীমতি সীয়ারসের উচ্ছ্বাস ছিল দেখার মতো। কিন্তু তাঁর(সীয়ারসের) পৌঁছাতে না পৌঁছাতেই কার্টুন কাণ্ডটি শুরু হয়ে যায় আর তিনি ভয়ানক মুষড়ে পড়েন। আমেরিকায় বিশাল বপু ও লাল মুখের জন্য পরিহাস-বিদ্ধ হয়ে তাঁকে কখনও এমন মন-খারাপ করতে হয়নি। প্রকৃত অর্থে রোটারি মিটিং-এ তিনি এই বলে তাঁর বক্তব্য শুরু করতেন “দেখো হে, একজন স্থুল চেহারার মানুষ হিসেবে আমি মনে করি, এখনো অব্দি তোমাদের কাজে লাগিয়ে ওয়াশিংটনে যা কিছু কাজকম্ম করছি তাতে ভুলচুক তো বিশেষ কিছু দেখতে পাচ্ছি না”। কথাটা শুনে সবার হাসি পেয়ে যেত। কিন্তু রাষ্ট্রদূত সীয়ারস হাড়ে-হাড়ে টের পেয়ে যান যে নেটিভদের কাছে নিজের শরীরকে নিয়ে রসিকতা করাটা এক ধরণের বেখাপ্পা উন্নাসিকতা বৈ আর কিছু নয়, এর মানেটা সম্পূর্ণ পাল্টে গিয়ে অহেতুক একটা ঘোরালোগোছের ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায় ।
দরজা খুললে দেখা যায়, তখনও সীয়ারস পলকহীন স্থিরদৃষ্টিতে কার্টুনের দিকেই তাকিয়ে আছেন। আর এই যে ইনি হলেন গিয়ে মার্গারেট জনসন, দূতাবাসের প্রেস-অ্যা্টাসে। তুমুল উত্তেজনার আঁচে যেন ফেটে পরার মতন অবস্থা, সুপ্রভাত টুপ্রভাত ওসব সম্ভাষণ টম্ভাষণ সব কিছু শিকেয় তুলে তরবরিয়ে বেদম গতিতে বাক্যিবৃষ্টি শুরু করলেন।
অনর্গল এক নিঃশ্বাসে বলে চললেন, “স্যার, কাল রাতের বেলায় কে জানে কখন কয়েকটা জঘন্য নোংরা গুন্ডাটাইপের লোকজন পাউডার দুধ নির্মাতা কোলভিনকে এলোপাথারি পিটিয়ে দেহটাকে দূতাবাসের সিঁড়িতে ছুঁড়ে ফেলে রেখে গেছে ”। “আমরা ডাক্তার ডেকেছিলাম, তিনি বলেছেন লোকটি এ যাত্রায় বেঁচে যাবে। কিন্তু, খবরের কাগজের জন্য এ ব্যাপারে এক্ষুনি একটা স্টেটমেন্ট তৈরি করে রাখলে ভালো হয়”।
“ওহ্! পিটের দোহাই” রাষ্ট্রদূত সীয়ারস রেগে খাপ্পা হয়ে বললেন “এ সমস্ত ঘটনাগুলো সাত সকালেই কেন ঘটে বলতে পারেন? তারা তাকে অযথা তুলোধোনাই বা করতে গেল কেন?”
“আমরা ঠিক জানি না”, মার্গারেট বললেন। “তবে শরীরে পিন আঁটা এক টুকরো চিরকুট পাওয়া গেছে যাতে তার সারখানিজ মেয়েদের উত্যক্ত করা সম্পর্কে কিছু মন্তব্য লেখা আছে”।
রাষ্ট্রদূত সীয়ারস চেয়ারে খানিকটা এলিয়ে বসলেন, মুখে মৃদু হাসি ।
“আহা বেশ তো, আমি না হয় তাকে বকে দেব”।– তিনি মজা করে বললেন। “আমি সবসময় ভাবতাম এই কোলভিন নামের ছোকরাটি একটু বেশিই সিরিয়াস ধাতের। শোনো ম্যাগি, এ এমন কোনও আহামরি নতুন ঘটনা নয় – হাতের কাছে জুতসই কেচ্ছাটেচ্ছা না পেলে পেশির বাহাদুরি ফলানোটাই তাদের একমাত্র সম্বল যা তারা সবসময় ব্যবহার করে থাকে।
রাষ্ট্রদূতের মন্তব্যগুলো শুনে মার্গারেটের চোখে-মুখে বিরক্তির ভাব ফুটে উঠলেও, কথা বলার সময় তাঁর গলা ছিল যথেষ্ট শান্ত।
“স্যার, ঘটনাটি কিন্তু খুব মারাত্মক দিকেও গড়াতে পারত,” তিনি বললেন। “কে বলতে পারে, কখন কোন রাজনৈতিক দল এরকম কোনও ঘটনা তুলে সেটাকে নিয়ে ঘোঁট পাকাবে আর আমাদের চারদিকটা একেবারে নয়ছয় করে করে ছেড়ে দেবে”।
“ওহ্, ছাড়ো তো এসব, ম্যাগি,” সীয়ারস বললেন। “কবে থেকে আবার ছোকরা ছুকরীর প্রেম-পিরীতির মতো ফালতু রদ্দিমার্কা ব্যাপারগুলো বৃহত্তর রাজনীতিকে প্রভাবিত করছে বলতে পারো? তুমি যদি সত্যি সত্যিই কোনও কিছু নিয়ে উদ্বিগ্ন হতে চাও, তবে এই নাও এই কার্টুনটা নিয়ে একটু ভাবো তো দেখি। ওই প্রিন্স নঙ, না কী যেন নাম হতভাগা বেল্লিকটার, ওটাকে পাঠাও, এই কূটনৈতিক ক্যাচালের জন্য ওই ব্যাটাই দায়ী। আগে এই খবরের কাগজের ঝামেলাটার একটা হেস্তনেস্ত করে নিই, তারপর তো আবার ওই মাথামোটা কোলভিনটাকে হাসপাতালে দেখতে যেতেও হবে”।
মিস জনসন বিনম্র ভাবে ঘাড় নাড়েন এবং অফিস ছেড়ে বেরিয়ে যান।
নেহাতই এক মাথামুণ্ডুহীন ছেঁদো স্বপ্নের ভেতরে জন কোলভিন তার ব্যান্ডেজ সম্পর্কে সচেতন হয়ে ওঠে। ধীরে ধীরে ফিরে আসে বাস্তবে। হাসপাতালের ঘরটা রোদ ঝলমলে এবং শান্ত। কোনের জগ-টগ রাখার জায়গাটা যেন এক অলীক উপায়ে তার ঠাঁই পাকাপোক্ত করে নিয়েছে আর বিছানাটা মনে হল অদ্ভুত ভাবে হাজির হয়েছে তার(কোলভিনের) সামনে। অবশেষে, বুঝতে পারল – সে নিজেই এই স্বপ্ন-দৃশ্যের একটা অংশমাত্র। বিছানায় পড়ে ছিল সে, গজ তুলো দিয়ে পট্টি বাঁধা, ওষুধের কোমল আস্তরণের নীচে ব্যাথার জোরালো উপস্থিতিটা টের পেল এবার।
যে সব ঘটনার সিঁড়ি বেয়ে হাসপাতালে তার ঠাঁই হয়েছে তা ধোঁয়াশার ধূসর পেরিয়ে চেতনার বৃত্তে ক্রমশ স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ওরা যখন একের পর এক তুলকালাম তাণ্ডব চালাচ্ছিল, তখন কিছুতেই সে নিজের চোখকে বিশ্বাস করতে পারছিল না, তার মগজে ঝলসে ওঠে ডিয়ং এর মতো একজন পুরনো বন্ধু, যে কিনা বছর দশেক আগে তাকে প্রাণে বাঁচিয়েছিল, তার সঙ্গে সন্ত্রাসে ভাগীদার হয়েছিল, সে এখন তার পিছনে বন্দুক ধরে আছে – এটা কী করে মানা যায়। মনে পড়ে, ১৯৪৩-এ সারখানে বিমান থেকে নামার পর তার সঙ্গে ডিয়ং-এর আকস্মিক দেখা হয়ে গিয়েছিল। আর সেই সময়ই ডিয়ং সাক্ষাৎ মৃত্যুর মুখ থেকে তাকে প্রায় ছিনিয়ে নিয়ে আসে।

(চলবে)