এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা সংকলন >> নৈরিৎ ইমু >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
268

নৈরিৎ ইমু >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতাগুচ্ছ

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।

সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংকলন : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

কবিতাগুচ্ছ

প্রকৃত মুখ

সোপর্দ করি তবে ঘাতকের হাসি,
ময়ূর পাখার পাশে—
দুধে মাখা ভাত;
বাঙাল-বাঙাল ভাষা,
ব্যথিত হবার আছে, কালোরাত্রি।
তোমাকে শোনাতে পারি
পাগলের ফুঁসে ওঠা গান;
রমণী-স্নানের গন্ধে
ভাঁজ খোলা রঙ আলোয়ান।
খুলে দেখি প্রকৃত মুখ;
শিখা-চূর্ণ শেষে —
মৃত্যু পরত ভেঙে
যেনো জমে আছে গলে যাওয়া মোম।

মাতৃত্ব

আমি তার মাতৃত্বসুলভ আচরণে ডুবি
জলহীন, নিস্তরঙ্গে না যায় ভাসা!
কৃষ্ণপক্ষে লেপন করেছি আগুনের ধোঁয়া
ক্রমশ ছড়ালো সে, ছায়াবৃত বৃক্ষদেবী।
আঙুলকাটা রক্তাভ স্রোতের স্পর্শ নিয়ে
ভাবি— ধর্মান্তরিত চেতনার মতোন বদলে যাবো।
ধূপগন্ধী বাতাসে শোকের প্রতীকে সেজে
কৃতার্থ মুখের আদিরূপ ভেঙেচুরে, জাগি—
ঘুমহীন, বেনামী নিশির ভেতর ঘুরে ঘুরে
শ্লোকের গম্ভীর পাঠানুরাগিনীর কণ্ঠ বাজে।
আমি তার মাতৃত্বসুলভ আচরণে, শিশু
অবিকল্পবোধক চিহ্ন নিয়ে সারাবেলা থাকি!

সৎকার

(নাসরিন জে. রানি কে)

আলো দিয়ে দু’হাত বাঁধো তার
সে যে তুমুল অন্ধকার।
ভাঙা চোয়াল, ভাঁজ করা ত্বক
ব্যাপক বিড়ম্বনা;
তাকিয়ে দেখা খুব অপলক
আত্মপ্রবঞ্চনা।
অন্ধকারের ধাক্কা লেগে ভাঙলো সে আয়না।
ভাঙা কাচের গুঁড়ো-ধুলো
বাতাসে তা ছড়িয়ে দিলো,
ধ্বান্তোন্মেষ তিমির প্রসন্নতা;
কালো দিয়ে কালো ঘেরা
বৃক্ষে যেমত লতা।
অন্ধকারের স্রোতে ভাসে নর্ম অভিজ্ঞতা।
বিম্বহীন এক প্রতিবিম্ব
এঁদো রঙের ভার,
সে যে তুমুল অন্ধকার।
আলো দিয়ে দু’চোখ বাঁধো তার
ছায়ার ভেতর অসীম ছায়ার
অনন্ত সৎকার।

শ্রীমতি

কণ্ঠলগ্ন হয়ে আছে ফাল্গুনী যতো কুহুতান, অ শ্রীমতি
সারারাত গঙ্গাজ্বরে আমার বাঁশির কান্না বাজাবো;
তোমার হস্তরেখায় ঘুরেঘুরে বাড়িঘরে ফিরবার পথ
বেঁকে যাবে নিরুদ্দেশে, পাতাঝরা নাঙ্গা অরণ্যে।
এই বাতাস ফের বর্ণপরিচয় লুপ্ত করে বইবে
ঝড়ের পূর্বাভাস কোথাও পাবে না তবু ঘাটে বসে—
ছাই ঘষা কলসিতে বেজে ওঠে একটানা সুর;
অ শ্রীমতি, জলে বিছিয়ে পড়েছে তোমার শাড়ির আঁচল।
আগুন স্পর্শ করেও পুড়বো না, সাধনা এমনতর
তারায় তারায় ধাক্কা লাগে, ভূগর্ভস্থ খনিজের মতন;
গুপ্ত রেখেছো আমায়, অ শ্রীমতি, তোমার বুকে—
শেকড় ছড়িয়ে আছে আমার কৃষ্ণ কৃষ্ণ প্রেমনাম।

ভাঙা সুরাহি

ভাবলাম মরে যাবো,
রোজ ভাবি;
দুপাশ কাটতে কাটতে
ঘুম না আসা রাতে
জবেহ করেছি শাদা রাজহাঁসটিকে,
যার পিঠে চড়ে
পেরিয়ে আসার কথা পুরাণের সিন্ধু
তারই সিদ্ধ মাংস
লেগে আছে আমার দাঁতে!
ভাবলাম মরে যাই,
হাড় মজ্জা আস্বাদিত
জিভ কামড়ে ধরে,
সবাই নিজের খুনী
কোথাও পাবে না কোনো পরিচ্ছন্ন হাত
চোখ ভরা ক্ষমা প্রার্থনা,
মুখ ভরা ঘৃণা,
ঠোঁটের কালশিটে কিছুই পাবো না খুঁজে।
সকাল আমার নয়
দুপুর-রাত্রি, ভায়োলিন দিনকাল
ভোঁতা সময়ের দিকে
বৃষ্টিক্লান্ত গাছেরা ঘুমায়,
জনম মাত্র কৃষান
আয়ু মাত্র জমিন
ঘাম নাই তবু বিস্তর ফলনের দিকে
ফিরিয়ে রেখেছি মুখ।
দেখি গাঁওগঞ্জের গানে
গলা খুলে যায়
মন থৈ থৈ করে
সর্পদষ্ট লাশ, বিষে ভরা শরীর
ভেসে কই যায় চলে
মরণের কালে বুঝি লোকে—
বাচ্চা মেয়ের মতো
অদেখা কারোর সাথে
একা একা কথা বলে
আর বন্ধুত্ব বাড়ায়।
কুড়িয়েছি যা, ভাঁওতাবাজির শেষে
আমার পাতলা ঘুমে
পদ্মফুল মতো পা
সন্ন্যাস চায় নি তো ভানে;
ক্ষিপ্ত চেহেরার পাশে
শান্ত চেহেরাটি রাখি,
ভরসা পাবো না জানি
ধূর্তামি মহাত্মার বাঁকে।
হোমানল দাউদাউ
শিখার নাচনে কাঁপে হৃৎ
উড়ে যাবে পাপ, যতো অনুতাপ—
পুনরায় রাজহাঁস সওয়ারি;
ভাবলাম মরি মরি
রোজ ভাবি,
নিমকহারামের দুনিয়ায়
সদ্য ভাঙা সুরাহি আমি
জল গড়িয়ে যায়—জল, জল, জল—

কবিতাভাবনা

কবিতা কেন লেখি— কবিতাও কিঞ্চিৎ তার সাক্ষ্য দেয় বলে মনে হয়। একান্ত নিজের ধ্যান, অবগাহন আমার, নিজস্ব জায়গা। নিজের ভেতরের তাড়না থেকেই কবিতা লেখি। নিজের জন্য।

কবি পরিচিতি

জন্ম চট্টগ্রামে। প্রকাশিত কাব্যগ্রন্থ : “সন্ধ্যাতারার গাছ” ও “না মর্মরে না মর্সিয়ায়৷।” ইমেইল : imu031@gmail.com Cell: 01818 12 70 97