এইসব সোনালি শব্দশস্য >> দ্বিতীয় দশকের নির্বাচিত কবিতা >> আসমা অধরা >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতা >> অতিথি সম্পাদক : সুবর্ণ আদিত্য

0
301

সম্পাদকীয়

আদতে সাহিত্যে দশকওয়ারি হিসাবটা নাকচ করে দেয়া যায় না। নানা কারণে এই বিন্যাস হয়ে এসেছে, ভবিষ্যতেও হবে। সেই আলোচনা থাকুক। বাংলাদেশে সদ্যই দ্বিতীয় দশক শেষ করে আমরা তৃতীয় দশকে পদার্পন করলাম। কবিতায় এই দশকের কবিতা, কবিতার সুর, স্বর, কবিতায় যাপন, আচরণ, শব্দ ব্যবহার/গ্রহণ/বর্জন, নির্মাণ, প্রক্ষেপণ, দৃষ্টিভঙ্গি এবং একইসাথে প্রত্যেকের কবিতায় নিজস্বতা আছে। ব্যাপকভাবেই আছে। সেই সুত্র ধরেই বলা যায়, এই দশকের কবিরা বিশিষ্টতা অর্জন করতে যাচ্ছে। কী অর্থে বিশিষ্ট, তা হয়তো তর্কযোগ্য বিষয়। আমরাও চাই এ বিষয়ে গঠনমূলক আলোচনা-সমালোচনা হোক। করোনাদূর্যোগ হওয়াতে সংখ্যাটি অনলাইনে করতে হলো এবং এমন কাজ অনলাইনেও এটাই প্রথম। হয়তো আজকের এই সংখ্যার মাধ্যমে ভবিষ্যতে খুঁজে পাওয়া যাবে সমকালের বিচরণ। দেখা যাবে কারও কারও গন্তব্যও। এমন অভিপ্রায় নিয়েই এই সংকলন। তাছাড়া দ্বিতীয় দশকের গুরুত্বপূর্ণ কোনও সংকলনও নাই যা পরিপূর্ণভাবে এই দশকের আয়না। সংকলন করতে গিয়ে ভালো কবিতার ভিত্তিতে কবিকে বাছাই করা গেছে। কাজটা কঠিন ছিল। পঁচিশ জন কবির স্বনির্বাচিত পাঁচটি করে কবিতা দিয়ে সাজলো সংকলনটি। তালিকাটা ৩০ হলেও হতে পারতো, কয়েকজন স্বেচ্ছায় অন্তর্ভুক্ত হননি আর কয়েকজনকে আদর্শগত অবস্থানের কারণে বাদ দিয়েছি। তীরন্দাজে ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’ শিরোনামে এই অনলাইন সংখ্যাটি আমাজন থেকে পিডিএফ সংস্করণ করতে যাচ্ছি, কয়েকটি ভাষায় অনূদিতও হবে। গ্রন্থাকারেও আসবে আরেকটি সংখ্যা, বড় পরিসরে। যারা এই সংখ্যায় নির্বাচিত হয়েছেন তারা তাদের কবিতার জন্যই হয়েছেন। আমরা আনন্দিত তাদেরকে যুক্ত করতে পেরে। এমন একটি কাজ করতে পারা তৃপ্তিরও। যারা পাশে ছিলেন, একটু দূরে ছিলেন, কিংবা ছিলেন না – সবাই ভালোবাসার মানুষ। পৃথিবীর সূচনা থেকে আমরাই হেঁটে যাচ্ছি এক সত্তায়, আমাদের গন্তব্য একটাই, আমাদের মিছিল একটাই। লক্ষ্যও অভিন্ন। কবিতার জয় হোক।
সুবর্ণ আদিত্য
অতিথি সম্পাদক
বাংলাদেশের দ্বিতীয় দশকের কবিতা সংখ্যা : ‘এইসব সোনালি শব্দশস্য’
তীরন্দাজ
ঢাকা
১০ জানুয়ারি ২০২১

আসমা অধরা >> স্বনির্বাচিত শ্রেষ্ঠকবিতা

টানেল ও ডাকহরকরা

ডাকটিকিটের জলছাপে দেখেই তার কেশরে হাত বুলিয়ে দেই, সাথে সাথেই অজস্র ঝরাপাতা উড়ে আসে–কিছু আসে খোঁড়া মানুষের মতো গড়িয়ে গড়িয়ে ভেজা সুবাসসহ মাটির ঘ্রাণ ভেসে বেড়ায় চারপাশে। আশ্চর্যভাবে বদলে যায় চারপাশের সবকিছু, ঘূর্ণির মতো উড়তে থাকে টেবিল চেয়ার আর বিছানার চাদরে জড়ানো আলখাল্লা।

একপাশে প্রাচীন টানেল, মাটিচাপা পড়া রেললাইনের স্লিপারে টুকরো পলিথিনের কোণ মাথা উঁচু করে উঁকি দেয় ঊর্ধ্বলোকে। আমি মগ্ন হয়ে ডাকি শ্রাবণ আর চুলে মাখি লেবুফুল। শেষ বেলায়ও আর কেমন হলুদ ছড়ায় না – জারুল জারুল বুনে চলে বনের পথে।

ওখানে পাখির পালকে আগুন জ্বেলে রাখে জবা আর বোগেনভেলিয়ার ঝাড়। ছুঁয়ে দিতে গেলেই আমার ক্ষণজন্মা আঙুল ঝরে পড়ে, ধুয়ে চলে যায় বহতায়। আর ব্যথায় ছটফট করা আমাকে বয়ে নিয়ে চলে পারস্যের রাত, হারকিউলিসের চোখর মতো ঘন নীল জল আরো গাঢ় হয়, বাড়ে ডোবানোর ক্ষমতাও।

মরে যাবার অব্যর্থ ১৫০ কায়দার মতো আমিও গুনতে থাকি অদৃশ্য হতে দৃশ্যে ফেরার জপমালা। তবুও ভিনসেন্ট গগলের রোদচশমায় ঝলসে যায় সকল স্তুতি আর প্রতিফলনের নিয়মাবলি।

কুহক প্রপাত ঘোর

স্বর্ণমৃগ, দেখেছ কি নিরালা জানলার পাশে রাঁধাচূড়োর যত রঙ ঝরে যায় পত্রবৎ, যেন সোনারোদেও মধ্যযাম! আলোয়ান জড়িয়ে ধেয়ে আসে কালকেতু, আসে ফসফরাসের রাত; যেনবা ঝনঝনিয়ে গড়িয়ে গেল কয়েনসমগ্রে জমে থাকা একরোখা ঐকতান।

কেবল যামিনী জানে বুঝি গোপন জটিল যতন, কিন্নরে বাজে রোদনের মতো কেটে যাওয়া সুর। তখনই রক্তিম আঁখি, রক্তাভ পোখরাজ পাখা মেলে উড়ে যায় মৌনবিতান। সেখানে লিখাছিল যত চিৎকার, মৌন গজল, সানাইয়ের সুর; মোৎজার্ট, বিঠোফেন, সিম্ফোনি ও অন্ধ গায়কের গেয়ে ওঠা আধখানা গান।

তবু লুণ্ঠন শেষে ঈশ্বরঘরে এসে নিশ্চিন্ত ঘুমোয় ‘কু’খ্যাত ডাকাত; শিথানপৈথানে জ্বলে থাকা চোরাচোখ, পিঙ্গলে মেখে আড়াআড়ি দুই হাত! ঘুমোয় ঘোর অঘোরমৃতের ন্যায়, তীব্র শ্লেষে হেসে ওঠে বন্দি, পাশ ফিরে শোয় অপঘাত; সেই দেশে কারা ও রক্ষকের পক্ষাঘাতেই পদপাত।

আহা মৃগ, ছুটছ মায়া হরিণীর পিছু? ওই দ্যাখো, দ্যাখো চেয়ে, ওই ভেঙে ভেঙে ঝরে পড়ে শিউলির ঘ্রাণ। কামিনিও মেলে ধরে মুদে আসা চোখ, কেতকীরে কয় কানে কানে, ক্যামোফ্ল্যাজে হারিয়ে গেল ইটিটকারীর জাতকূলমান।

মা

মা, তুমি সমগ্র শীতকাল জুড়ে লেপের ওম। এতো এতো দূর থেকে কাছে যাওয়া যায় না আর। অভিভূত রোদের মতো ডানায় তাপ আঁকি, আর যে নাম যপি সে তুমি। তুমিই ভালোবাসা, ভাটি ও উজান। তুমি অস্তিত্ব, তুমি সত্ত্বা। যে বৃষ্টিতে এবারে এমন কুয়াশা নেমে এলো সে খুব মুষলধার ছিলো না। তবু হালকা ফোটাতেও কী দারুণভাবে ভিজে গেছে সব, পাঁজরের হাড়গুলো জানে। একদিন কোথাও দেখা হলে, আমার মৃত্যুর পর, জেনে নিও কেমন শিউলির মতো ঝরছো অস্তিত্বে। আর তাই বন্ধ করে সমস্ত জানালা উত্তরের মেঘ ঠেকিয়ে রাখি। এসব কিছুই বিলম্বিত করে, কখনো বিড়ম্বিতও। এইরকম বিড়ম্বনাকেও জ্বর বলে ডাকি, তবু এসো!

চলো দিগন্ত জুড়ে মেঘের পোস্টারে আঁকি কিছুটা আলো তোমার মুখের মতো, এমন শীতকালে তোমাকে ঈশ্বরের মতো ডাকি। একটু হাঁটো আলতো পায়ে, প্রাংশু হাত মাথায় রেখে বিড়বিড় করে বলো আগের মতো, ‘নিজেকে কষ্ট দিস,বড় অন্যায় এসব’। শুনে শুনে আবার ভিজে উঠুক চোখ বারবার।

আর শীতকাল! লাল লাল বড় টিপের গায়ে খোদাই করুক অপরূপা জোছনা, আর হীম বাতাস। মাগো, তুমিই ভালোবাসা, তোমাকে ডাকি; অথচ তুমি শতাব্দীপূর্ব বধিরের মিছিলে চলে গেছো জানি, কেবল বিশ্বাস হয় না এখনো

মৃৎপুতুল

শুদ্ধিকরণ কতটা প্রগাঢ় হবার পর অক্ষিকোটরে আলোকবিচ্ছুরণ হয়, আথবা শকুন্তলাকুন্তলে অঘোর অমানিশা ছিল কিনা- জপমান জানেন; আথচ সিসিল প্রান্তরের উত্তরে আকাশ আর ব্রহ্মাণ্ড কেমন রোমহর্ষক সঙ্গমে দক্ষিণকে প্রলুব্ধ করে তোলে; তা কি কেউ জানে!

পর্যায়ক্রমিক দিনের সাথে বনিবনা না হওয়ায় রাত্রিপ্রেম আরো গাঢ়তর হয়, বাদামি রেটিনায় পালকহীন চোখে চেয়ে থাকে প্রতিবেশি পেঁচা। যেমন, আদি ও অকৃত্রিম হ্রদ জানে খোদাইকার্যে ঠিক কতটুকু পারঙ্গম রোদ আর বৃষ্টি; তাতেই পাথর গলে চুইয়ে পড়ে সর্জরস।

নিস্পাপ জারুল জানে না আলট্রা ভেয়োলেট অভিশাপ, তাই বেগুনি ধরে রাখে বুকে। অসহ্য রকম সুন্দরের উপেক্ষালগ্নে পৃথিবী ধূসর থেকে আরো ধূসর হয়, বুভুৎসায় নিশ্চুপ মকরন্দ দেখে মাইলব্যাপী সবুজ। ভিজে যায় আজানালগ্ন শিশির চৌবাড়িতে।

আর এ তল্লাটের সবহে সাদিক – গোথিক গির্জার ঘণ্টা – ধূপধুনো শাখ জানে সমূহ সম্প্রদায়। এখানে নির্বিশেষ লাল লহু মানেই প্রতিহিংসা, সাম্যবাদ নয়।

যাও পাখি

নিজেকে ভাঙো, বিশ্লেষিত হও। প্রতিটি ভাঙা টুকরো উল্টেপাল্টে দ্যাখো, নিজেকে চেনার আলাদা বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান। সম্পন্ন হোক দ্বি, তৃ ও অসংখ্য বিভাজন।

যদি তেমনি বিভাজিত হতে চাও তো পাখি পোষো, যারা কখনোই পোষ মানে না। একদিন ডানা মেলে দিলেই তুমি বুঝে যাবে ইত্যাকার সায়েন্স – পরমাণুদের বিভাজন সমগ্র। পাখি দিনে দিনে মায়া বাড়াবে, বাড়াবে এবং বাড়াতেই থাকবে। তারপর বংশের ধারায় নিপতিত হবে।

যে হরিৎ বনখানি মহিষের মাথার মতো শৃঙ্গ বাগিয়ে শ্বাসমূল ছড়িয়েছিল, তার নাসারন্ধ্রে ঢুকে গেছে তাবৎ পার্থিব ধূলিকণা। শ্বাসের জ্বালায় বিবর্ণ বনে ঝরাপাতার শব্দ কেবল। ঈষৎ সরে যাওয়া দ্রাঘিমায় বিপন্ন জলবায়ু।
এই বনেই পরিযায়ী পাখির অস্থায়ী বাস। বিষ্ঠা ছাড়া ফেলে যাবার আর কিছু নেই। হয়তো ডানা থেকে খসে যাওয়া দু’একটি নীলচে পর থেকে যেতেও পারে। তাও দখিনা বাতাসের করিয়ারে করে ভেসে যাবে অন্যখানে।

বনকুক্কুটের মতন ঠুকরে যাও লাল ঠোঁট। খুঁটে খাও জীবনসমগ্র। তারপরে শ্বাসে শ্বাসে যখন উঠে আসবে লোহিত রঞ্জক, সেইদিন ভেঙে দিও বাদাড়ের গহীন আবাস।

কবিতাভাবনা

জীবন নিজেই এক কবিতা। যা কিছু ঘটে গেছে, ঘটছে বা ঘটতে পারতো, সেইটুকু। যা কিছু আমি বলতে চেয়েছি কিন্তু পারিনি তাই হয়তো বলতে চেয়েছি। পথের পাশে ফুটে থাকা ফুল দেখে, শরীর ফুঁড়ে মেঘ গলে যেতে দেখে, খুব রোদে পুড়ে গিয়ে বা শীতযাপিত অবসন্ন জীবন প্রবল আনন্দ দিলে বা কান্না পেলে কাউকে বলতে চাই। রেখে যেতে চাই দৃষ্টি অথবা ভঙ্গিমা। সর্বোপরি জীবনের এই অদ্ভুত মিছিল, তার স্লোগান।

আসমা অধরা : জন্ম ১৪ মে, ঢাকা। শিক্ষা : স্নাতক। প্রকাশিত কবিতার বই : একদিন ঠিক হেঁটে যাবো [২০১৩] ও হাওয়াকল [২০১৭] এবং ওয়ালাথার পিপিকে [২০১৯]। ই-মেইল : odho14@gmail.com