একরাম আলি >> কবিতাগুচ্ছ >> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
445

একরাম আলি >> কবিতাগুচ্ছ

ভূমিকম্প

যা জানো, সেটুকুই বলো

ধ্বংসের হাওয়ায় কথা কেঁপে উঠছে
কথারা শুকিয়ে-যাওয়া লতার পরম্পরা, ডগায় সবুজ

মৃত কথার পাশে জীবিতের নীরবতা
শ্মশানে কবরে স্বেচ্ছাসেবীদের আর্ত গান
যেমন আহত কথার করতলে তোমার দুটি ঠোঁট
একই সঙ্গে ডাকছে জীবন আর মৃত্যুকে

কে আগে আসবে
কার অবজ্ঞায় মুছে যাবে দূরের ধ্বংসগুলি?

কান্না

কুকুরের কান্নায় ঘুম ভেঙে যায়
মানুষের কান্না গর্তে-রাখা কাচের বোতলে
নিঃশব্দে ঝরে
সকাল হলে তোমার বোতল আমি দেখি

গাঢ় সবুজ, তার অতল আকার
রাতের ইতিহাসে পূর্ণ
কত অকেজো রাসায়নিক, গুঁড়ো স্বপ্নের দূষণ
পুরোনো সব অনিদ্রার মরচে-পড়া স্তব্ধতা
জমে আছে অপরিমেয় দূরত্বে
কাচের নিশীথ আকাশে, তার গর্তে-গর্তে

চোখের জলের ফোঁটায় মাতৃপরিচয় খুঁজি
চোখের জলের রসায়নে আত্মপরিচয় লেগে থাকে

যুদ্ধ

যেখানে ভাবা হয়, না-ও থাকতে পারে সেখানে
যেমন পতনের ইতিহাস খুলে জানা যায়
শ্যাওলার সবুজে কোনো প্রতিহিংসা নেই

কত প্রাসাদের দরজায় অন্ধ ভিখিরি গায়
ভক্তিরসের গান, যেন অবিনশ্বরের হাতে ভিক্ষাপাত্র
এ কি সমর্পণ? নাকি অভিশাপ?
ঢেউয়ের তোরণতলে চূর্ণ জলের প্ররোচনা?

জাতিগুলি সন্ত্রস্ত, ভাষাহীন, পাথরে পাথরে
সংকেতে লিখে রাখে নিজেদের গান
তাদের ভিন্নতাগুলি বহু-বহু রাতের ঘনত্বে
এ-ওকে জড়িয়ে ধরে
অচেনা সুরে তৈরি করে পায়ে-চলা-পথ

ব্যর্থতা, ব্যর্থতা থেকে সমস্ত যুদ্ধের জন্ম
ওইখানে বায়ুর সীমানা
তারপর রণক্ষেত্র, ঝরাপাতার সন্ত্রাস
আকিল্লিসের আর্তনাদে
একই উচ্চতায় সমবেত মহিলার স্তন কেঁপে-কেঁপে ওঠে

অন্ধত্ব

চোখ জগতের দিকে
দৃষ্টির বৃত্তে ঘোরে
দিন আর রাতের মাঝখানে পাতলা রেখা
সেইখানে অস্থির হয়ে ভাবে– এরই মধ্যে
দেখে ফেলেছে সব… সবকিছু

আকাশের নীচে এই ধোঁয়ার শহর
আমাদের ছড়ানো বাহু ঢুকে গেছে দিকবিদিকে
নষ্ট, ফাঁপা টিউবলাইটের ভেতর
কত-কত সঙ্ঘর্ষে, উন্মাদনায়, সম্পর্কের অপমানে

অন্ধকারে ট্রাকবোঝাই ডিমের ছুটন্ত ঝাঁকুনি
গা-ঘষাঘষি, কুসুমের মর্মন্তুদ ফিসফাস
বন্ধ ক্যাসারোলে ভাপ-ওঠা প্রাণের
হাড়ে, মাংসে কত-না পরাজয়
আমাদের সম্পর্ক বিঁধে আছে মাছের কাঁটায়

খাবার টেবিল তবু একগুঁয়ে অন্ধত্ব চাইছে