এলিজা রহমান > ‘দি ডিরেক্টর’ : মুভি হয়ে ওঠেনি >> চলচ্চিত্র

0
222
এই সিনেমায় দেখা যায় প্রেমিকাকে খুশি করতে নায়ক ডিরেক্টর হতে চায়, কিন্তু সে হয়ে যায় সন্ত্রাসী। তার বন্ধুদের অনেকেই ডিরেক্টর যারা নায়িকাদের সঙ্গে সম্পর্কে জড়ায়, এটা ঠিক আছে। সে স্ক্রিপ্টে লিখছে কুকিল ডাকছে, এটা কেমন বাংলা শব্দ হলো? কৌতুক হলেও কৌতুকের ভাবটা এর পরের দৃশ্যে আসেনি। তাকে একবারের জন্যেও দেখা যায়নি ক্যামেরার অ্যাঙ্গেল ঠিক করতে, বা ডিরেকশন দিতে, সহকারী হিসেবেও সে এটা করেনি। বরং তাকে দেখা গেছে পিস্তল হাতে নিয়ে অ্যাকশনে যেতে। পূর্ণিমা মেয়েটির তো বাবা-মা আছেন, তাহলে তাদেরকে কেন একবারও দেখা গেল না কোন সিনে? আবার যে মেয়েটা গুলি করে মেরে ফেলল কামু ও পূর্ণিমাকে, সে কেন তাদের মারল সেটা স্পষ্ট নয়। সব মিলিয়ে খুব কষ্ট করে দেখেছি সিনেমাটি। মোশাররফ করিম আর তানভিন সুইটি  বরং স্বাভাবিক অভিনয় করেছেন।
তাছাড়া সিনেমার একজায়গায় পুলিশ অফিসার বলছেন কামুকে অ্যারেস্ট করেন, জীবিত বা মৃত যেভাবে হোক। এখানে ডায়লগ লিখেছেন যিনি তিনি কি জানেন না মৃত মানুষকে কি অ্যারেস্ট করা যায়? এ যদি কৌতুক হয়, তাহলে নিম্নমানের কৌতুকই বলবো। এরকম বাংলাদেশের আরেকটা সিনেমার ডায়লগ শুনেছিলাম, ‘জীবিত বা মৃত আমি ওর লাশ চাই’, ভালো কথা, জীবিত মানুষের লাশ হয় কিভাবে? কামু সাহেব নাকি ব্যক্তিগত জীবনে একজন কবি, আমি জানি না, তবে তিনি ইচ্ছা করলে সাহিত্য-র্নির্ভর ছবি তৈরি করতে পারেন। আমার নিজের ধারণা, ছবি তৈরি করতে হলে প্রথমে অ্যাড ফিল্ম দিয়ে শুরু করা উচিত। তিনি নাটক ভালোই লেখেন বলে শুনেছি। কিন্তু শুধু প্রেমের কাহিনি হলেই মানুষ মুভি দেখে না, যদি-না সিনেমার প্লট ভালো হয়। গল্পটা জমজমাট হয়। অনেক সময় ভালো গানের জন্যেও মানুষ সিনেমাটি দেখে। ভাল স্ক্রিপ্ট না হলে নায়ক নায়িকাদেরও অভিনয় করার কিছু থাকে না। কাহিনিকার গল্পের মধ্য দিয়ে এই সিনেমায় কি বোঝাতে চাইলেন, সেটাও স্পষ্ট নয়। সিনেমাটোগ্রাফি ভালো লাগেনি। লাইট এবং সাউন্ড অনেক বাজে ছিল। কামুকে কেন পুলিশ ধরল, সেটাও স্পষ্ট হয়নি। কিন্তু তাকে যেভাবে তার বন্ধু উদ্ধার করে তার ডেরায় নিয়ে এলো, এটা শুধু অবাস্তব নয়, রীতিমতো হাস্যকর। এরপর অ্যারেস্ট করার কথা বলার পরও দিব্যি সে ঘুরে বেড়ালো, পূর্ণিমাকে কিডন্যাপ করলো, তাকে গান শোনালো (হাতের উপর হাতের পরশ)- এসব কীভাবে সম্ভব? এতে রোমান্স তৈরি হলেও, কৌতুককর হয়নি। এ কী কবিতা লেখা নাকি যে একধরনের চিত্রকল্প তৈরি করে জাম্প করে আরেক ধরনের চিত্রকল্পে চলে যাওয়া যায়?
আসলে গল্পের মূল টোনটা কি সেটাই গল্পকার কাম পরিচালক স্থির করতে পারেননি। এটা যদি হয় ডিরেক্টরদের নিয়ে কৌতুক বা মকারি, তাহলে এই কৌতুকটা হয়ে গেছে খুবই নিম্নমানের। নিম্নমানের অর্থ, কিছুই দাঁড়ায়নি।
পপিকে এই ছবিতে যেটুকু সময় আছেন, ভালোই অভিনয় করেছেন। কিন্তু তার ও মারজুকের অংশটি একেবারেই বিক্ষিপ্ত মনে হয়েছে। কামুর নির্দেশেই তারিক পপিকে অপহরণ করে, কিন্তু কেন তা বোঝা গেল না। অ্যাকশানে যেতে হলেও তো একটা ঘটনা থাকতে হবে। এরপর মারজুক যে তাকে উদ্ধার করলো, তা রীতিমতো অবিশ্বাস্য। ফ্যান্টাসিও হয়নি এটা। আসলে গোজামিল দিয়ে আর যাই হোক সিনেমা বানালে হলে, হলে গিয়ে কেউ সেটা দেখবে না। ইউটিউবে অবশ্য ইন্টারনেটের জন্য কিছু পয়সা খরচ করে দেখা যায় বলে অনেকেই দেখবেন। একজন কবি ছবি বানালেন, সেই কৌতূহল থেকেও কেউ কেউ দেখবেন।
আমরা ধরে নিচ্ছি, একটা ফ্যান্টাসিধর্মী কমেডি মুভি বানাতে চেয়েছেন পরিচালক কামরুজ্জামান কামু। কিন্তু তা এত শিশুসুলভ হয়ে গেছে যে অবিশ্বাসের সীমা অতিক্রম করে বিনোদনের স্তরে উঠতে পারেনি। এই ছবিতে কৃতজ্ঞতার জায়গায় বেশ কয়েকজন কবি-লেখকের নাম দেখলাম, তো তারা কিভাবে কৃতজ্ঞভাজন হলেন, জানতে ইচ্ছা করছে। তারা যদি ছবির কাহিনি বা চলচ্চিত্রায়নে সহায়তা করে থাকেন, তাহলে সেটা তাদের ইমেজকে ক্ষুণ্নই করেছে বলা যায়, আর যদি অলঙ্কার হিসেবে নাম ব্যবহার করতে দিয়ে থাকেন, তাহলে অন্য কথা।
কামরুজ্জামান কামুকে অবশ্যই ধন্যবাদ দেয়া যায় সাহসী পদক্ষেপ নেয়ার জন্য। উনি এতোটাই এগিয়ে এলেন তো একটা ভাল কাহিনিকার আর চিত্রনাট্যকার দিয়ে ছবি করলেই পারতেন। পরবর্তীকালে হয়ত উনি আরো সাহসী ভূমিকা নেবেন, সিরিয়াসলি ছবি তৈরি করবেন। একটা বিষয় বলি। সিনেমা বানানোর আগে ভাবা উচিত যে কমেডি হলে সেরকম কাহিনি লাগবে, সিরিওকমিক হলেও ভাবতে হবে, সেটা করতে পারবেন কিনা, কিংবা হবে কিনা। অ্যাকশন সিনেমা করলেও মাথায় রাখতে হবে গল্পটা কী সেইরকম আর সিকোয়েন্সগুলো অ্যাকশন ছবির উপযোগী কিনা। এই ডিরেক্টর সিনেমাটি না হয়েছে প্রেমের গল্প, না হয়েছে সাইকো থ্রিলার, না হয়েছে অ্যাকশান মুভি, না হয়েছে কমেডি। তো এতগুলো ‘না’ বলাতেই বুঝতে পারছেন, এটি কোনো মুভিই হয়নি। তালগোল পাকিয়ে গেছে।
সব থেকে বড় কথা এই সিনেমায় কোনো ঘটনার পারম্পর্য নেই। হঠাৎ করে একটা বিষয়  ঢুকে পড়ছে। হঠাৎ করে সেই দৃশ্যটা সরে যাচ্ছে। পরে যে ঠিক ঠিক মতো ফিরে এসে কাহিনিকে ঐক্যবদ্ধ করে পরিণামের দিকে এগিয়ে যাবে, সেটা ঘটেনি। এতে সমস্যা হয়েছে যে, সিনেমাটা অনেক স্লো লেগেছে। কাহিনিতে দর্শকদের আকৃষ্ট হবার মতো কিছুই নাই। দেখতে দেখতে মনে হচ্ছিল, অনেকটা কমার্শিয়াল কমিক স্টাইলে মুভিটা বানানোর চেষ্টা করেছেন পরিচালক, কিন্তু কোনোটাই হয়নি।
তবে অভিনয়ে প্রায় সবাই ভালো করেছেন। মোশাররফ তো সবসময়ই ভালো। মারজুক উৎরে গেছেন। তবে অন্য তিন নারীচরিত্রে সুইটি, পপি, নাফিজা বেশ ভালো অভিনয় করেছেন। সেই তুলনায় কামুকে একটু শেকি বা অপ্রতিভ মনে হয়েছে। সিনেমাটোগ্রাফিও আকর্ষক নয়। ইউটিউবে বেশ কয়েক মিনিট সাউন্ডও শোনা যায়নি। এটা নিশ্চয়ই প্রযুক্তির সমস্যা। এটাও কিন্তু রিলিজ করার পর চেক করে ঠিক করার দরকার ছিল।
যাই হোক, একটা কথা ভেবে অবশ্য খারাপ লাগছে। একজন কবি, অনেকটা শ্রম ও আবেগ দিয়ে ছবিটি করেছেন। ছবিটা সেন্সরেও আটকে ছিল অনেক দিন। কিন্তু কিছুই যে হলো না। দি ডিরেক্টর মুভি হয়ে উঠলো না। একে অপচয় ছাড়া কী আর বলা যায়! মুভির শুরুতে পরিচালক কামু আগামীতে মুভি নির্মাণের প্রতিশ্রুতি দিয়ে দর্শকদের তার আগামী ‘লো বাজেটে’র মুভিতে ডোনেট করার আহ্বান জানিয়েছেন। আমরা আশা করি, দর্শকরা যদি এই আহ্বানে সত্যি সত্যি সাড়া দেন, তাহলে আগামীতে কামু এর চেয়ে ভালো কোনো মুভি যেন উপহার দেবেন, এই প্রত্যাশা থাকলো।