ওবায়েদ আকাশ >> কবিতাগুচ্ছ

0
315
ঘুমাতে পারছেন না মা
শ্রাবণের মেঘ দিয়ে কত রকম চিত্রকর্ম হয়
কত রকম কল্পনা করে মানুষ
আর আমি আঁকতে পারি না বলে একা একা ছাদে উঠে
আকাশের কোথাও না কোথাও আমার মায়ের মুখ আবিষ্কার করে ফেলি
এমন নিপুণ করে বিধাতা এঁকেছেন মায়ের মুখ!
তৎক্ষণাৎ ছাদ থেকে লাফিয়ে গিয়ে মাকে ধরবার কথা ভাবতেই
অন্যায্য বাতাসে ঝুরঝুর করে ভেঙে যায় মায়ের মুখ
এভাবে মা আমাদের পড়ে যাবার হাত থেকে বাঁচিয়ে দিয়ে যান। আর
আমাদের বাঁচাতে বাঁচাতে একদিন নিজেই শূন্যে উড়ে গিয়েছিলেন
আজকাল যেদিকে তাকাই- গৃহকোণ থেকে মিসিসিপি, মহেঞ্জদারো
কেমন একটা মা মা গন্ধ লেগে থাকে
যখন মানুষ বেঁচছে মানুষ, যখন মানুষ কাটছে মানুষ
তার ভেতর ভিজতে ভিজতে মা মা গন্ধ থেকে নিশ্বাস নিয়ে বাঁচি
আর এভাবে সন্তানকে বাঁচাতে বাঁচাতে বহুদূর নক্ষত্রে শুয়েও
নিশ্চিন্তে ঘুমাতে পারছেন না মা
বাড়িভর্তি শূন্যতা
একদিন ঘুম থেকে উঠে মায়ের ঘরে গিয়ে দেখি
কাঁচা মাটির শোক আর ডেটলের ঘ্রাণ একাকার হয়ে
কেমন ভুতুড়ে পরিবেশ সৃষ্টি করেছে
বাড়িভর্তি মানুষের দগদগে শোকের ওপর হামলে পড়ছে ডেটল
আর বাবার সংসারে প্রতিটি অপরিহাযর্তায়
লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে শূন্যতা
মাকে আমি এতটা নির্দয় হতে কখনো দেখিনি
বাড়ির যে কোনো নিতান্ত প্রয়োজনে যেখানে বাতাসের আগে
উপস্থিত হতেন মা, আজ তার জন্য এত এত হাহাকারের ভেতরও
চুপচাপ কোথাও ঘাপটি মেরে আছেন!
একদিন শোকতাপ ভুলে সবাই যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলে
আমি চুপি চুপি মায়ের ঘরে যাই
দেখি কচি কচি নতুন সংসারের পাতা, নতুন সলতের বাতি
আমাদের প্রয়োজনে জ্বালিয়ে রেখেছেন বাবা
আমি সন্তর্পণে পিছু হটে আসি
আজকাল মায়ের ঘরে গিয়ে চিৎকার করে পৃথিবী ফাটিয়ে দিতে ইচ্ছা করে
কিন্তু বাবা ও সংসারের প্রয়োজনের কথা ভেবে কিছুই করতে পারি না
বীভৎস নিস্তব্ধতা
আমার মায়ের মৃত্যুর পর আর তার কোলে ওঠা হলো না
তাঁর মহাপ্রয়াণের পর মুহূর্তমাত্র তাকে ভোলাও সম্ভব হলো না
এখন যখন সন্তানকে জড়িয়ে ধরে মা মা করে ডাকি
আত্মাভিমানে কবর থেকে বেরিয়ে আসেন মা
একবার তারাদের উপাস্য হয়ে
একবার ঝড়ের মাহাত্ম্য হয়ে
একবার শীতের হিমাঙ্ক, আর
একবার বৃষ্টির আর্দ্রতা হয়ে সন্তানকে ভিজিয়ে দিয়ে যান
আর মনে মনে ভাবেন, মৃত্যুকালে তিনি তার সন্তানের দিকে
এতটাই তীক্ষ্ণতা নিয়ে তাকিয়েছিলেন যে, তাতেই নিবদ্ধ হয়ে
আজ আমিও আমার সন্তানের মধ্যে মায়ের অস্তিত্ব খুঁজি
জীবনে মাত্র চার বছর সান্নিধ্য পাওয়া মা
শেষবার আমাকে বুকে জড়িয়ে ধরে নিস্তব্ধ হয়েছিলেন
এ-মতো বীভৎস নিস্তব্ধতা পৃথিবীতে কোথাও দেখিনি!
দূরত্ব
মায়ের কাছে যেতে যেতেও বহুবার ফিরে এসেছি
কত রকম প্রস্তুতি লাগে
কত রকম অসমাপ্তি থাকে
অথচ মায়ের কাছ থেকে আমার দূরত্ব মাত্র নিশ্বাসের বেশি নয়
বাবা, সভ্যতা ও সম্পর্কের দ্যুতি
আমরা তিন ভাই- সবাই শহরে থাকি
আমরা তিন ভাই- পরস্পর দূরত্ব ও নৈকট্য ধরে রাখি
আমাদের বাবা সেই ঘাসের শিশিরেই মুক্তো গুনে গেলেন
আমাদের বাবা প্রায় আশিতে পৌঁছালেন
আজকাল বাড়িতে গেলে প্রায়শই দেখি
বারান্দার চেয়ারে বসে বাবা মুখে হাত দিয়ে কী যেন ভাবেন
বাড়িতে গেলে, বিশেষত আমাকে কিংবা আর ভাইকে দেখে
কী যে হুলস্থুল কাণ্ড ঘটিয়ে দেন! একে-ওকে ডেকে
আর একটা চেয়ার দিতে বলেন
ডাব কেটে দিতে বলেন, তালপাখার বাতাস দিতে বলেন
পারলে নিজের চেয়ার ছেড়ে শহুরে ছেলেকে বসতে দেন!
আর আমার চোখ ছলছল করে জলে ভরে ওঠে
আমি বাবাকে বুঝতে দিই না কিছু। নিঃশব্দে ঘরে ঢুকে যাই!
আর মনে মনে ভাবি
সভ্যতার এই গাণিতিক বাড় না বাড়লে
এই চেয়ার কিংবা শহরের জন্মই হতো না কোনো দিন
আর এই প্রথম আমি সভ্যতাকে গালাগাল দিতে শিখি!
প্রায় সারারাত নির্ঘুম থেকে ভোর হলে
মনে মনে এও ভাবি-
আহা সভ্যতা, ক্রমশ জিরাফের মতো গ্রীবা না তুললে
আমাদের সম্পর্কের এই বিশুদ্ধ দেহটা
হয়তো আড়ালেই থাকত বহুদিন!
কবি-পরিচিতি
জন্ম : ১৩ জুন ১৯৭৩, সুলতানপুর, রাজবাড়ী
পেশা : গণমাধ্যমের চাকরি, দৈনিক সংবাদ, ঢাকা
প্রকাশিত গ্রন্থসংখ্যা : মৌলিক কাব্যগ্রন্থ ১৯টিসহ মোট ৩৬টি।
email: okash1971@gmail.com