ওলগা তোকারচুক > দি হোটেল ক্যাপিটাল >> বিপাশা মন্ডল অনূদিত ছোটগল্প

0
293
এই জায়গাটা শুধু ধনীদের জন্য। এখানে তাদের জন্য লম্বা ইউনিফর্ম পরা কুলি আছে, স্পেনীয় টানে কথা-বলা আজ্ঞাবাহী ওয়েটার আছে; তাদের জন্য আরো আছে চারদিকে আয়নাঘেরা নিঃশব্দ লিফট; পিতলের দরজার হাতল, যে-হাতলে কখনো কোনো আঙুলের ছাপ পড়ে না, কারণ এ হাতলগুলো প্রতিদিন দু’বেলা মুছে দেয় একজন দরিদ্র যুগোশ্লাভ নারী; তাদের জন্য কার্পেটশোভিত সিঁড়ির ব্যবস্থা আছে, যদি তারা কখনো লিফটের ভিতরে আবদ্ধভীতিতে ভোগে; আছে বিশাল বিশাল সোফা, ভারী কম্বলের বেডকভার, বিছানায় নাস্তা করার ব্যবস্থা, শীতাতপ নিয়ন্ত্রণযন্ত্র, তোয়ালেগুলো তুষারশুভ্র, সুগন্ধি সব শ্যাম্পু-সাবান, বাথরুম সাজানো হয়েছে খাঁটি ওককাঠ আর প্রতিদিনের তাজা খবরের কাগজ দিয়ে। এটা শুধু তাদের জন্য, ঈশ্বর যাদের বিশেষ আদেশে বিশেষ উপাদান দিয়ে সৃষ্টি করেছেন, আছে দ্রুতবেগে বারান্দা দিয়ে ছুটে চলা সাদা ও গোলাপি ইউনিফর্মের পরিচারিকা; আমি নিজেও এদেরই একজন।
সম্ভবত ‘আমি নিজে’ বলাটা অনেক বেশি বলা হয়ে যায় এক্ষেত্রে; এখানে ‘আমি নিজে’ খুব অল্পই অবশিষ্ট থাকি, যখন করিডোরের শেষপ্রান্তে ছোট সার্ভিস রুমে আমি একটা ডোরাকাটা অ্যাপ্রন পরি, তখন সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজের আসল রঙটাকেও মুছে ফেলি। আমার শরীর থেকে লুপ্ত্ হয়ে যায় প্রাকৃতিক ঘ্রাণ, খসে পড়ে কানের প্রিয় দুল, আমার গ্রাম্য অভ্যস্ত সাজগোজ আর হাইহিলের জুতো। কেননা অ্যাপ্রন পরার সঙ্গে সঙ্গে আমি নিজের বিদেশি ভাষা, আমার অদ্ভূত নাম, আমার সহজাত রসবোধ, মুখের আকৃতি, সব তুলে ফেলে রাখি; আমার খাবারের পছন্দ, আমার স্মৃতির কোনো ছোটোখাটো সুখকর ঘটনা এখানে কোনো প্রশংসা পায় না- আর আমি এই গোলাপি ও সাদা ইউনিফর্মের মধ্যে নগ্ন দাঁড়িয়ে থাকি- যেন আমি সমুদ্রের কুয়াশা থেকে উত্থিত হচ্ছি। সেই বিশেষ মুহূর্ত থেকে এই হোটেলের পুরো তৃতীয় তলায় এভাবেই আমার বিচরণ, প্রত্যেক সাপ্তাহিক ছুটিতে এই হয় আমার। আমি এখানে সকাল আটটা থেকে কাজ শুরু করি। কিন্তু তখন আমার কোনো ব্যস্ততা থাকে না। ধনীরা তখন পর্যন্ত ঘুমায়। হোটেলটি তাদেরকে নিজের মধ্যে আশ্লেষে-আবেশে জড়িয়ে নেয়, তাদের মৃদু লয়ে দোলায়, যেন এটি একটি বিশাল সামুদ্রিক ঝিনুক, পৃথিবীর গভীরে তাদের অবস্থান, ধনীরা সেই ঝিনুকের খোলসের মধ্যে যেন এক-একটা খুব দামি মুক্তা। দূরের রাস্তায় ট্রাফিকের সরগরম আর মেট্রোরেলের ঘর্ঘর শব্দ এখানকার ঘাসের ডগাগুলিকে শুধু মৃদু আন্দোলিত করে যায়। একটা ঠাণ্ডা ছায়া দীর্ঘসময় ধরে হোটেলের লনে শায়িত থাকে।
আমি এখানে পিছনের দরজা দিয়ে ঢুকি, সঙ্গে সঙ্গে পরিস্কার পরিচ্ছন্নতার জন্য ব্যবহৃত ডিটারজেন্ট, সাবান, থালাবাসন ধোয়ার লিকু্ইড- সবকিছুর বিমিশ্রিত একটা অদ্ভুত ঘ্রাণ, ধোঁয়া আর ইস্ত্রি করা সতেজ লিনেনের সুবাস, লোকজনের ঘন ঘন যাতায়াতের ফলে দেয়ালের ঘেমে-ওঠা গন্ধ, আমার নাকে এসে ধাক্কা দেয়। নোংরা ভ্যাপসা ছোট্ট লিফটটি নিজের কাজ প্রদর্শনের জন্য আমার সামনে এসে থামে। আমি পাঁচ তলার বোতাম টিপি আর আমার সুপারভাইজার মিস ল্যাঙের দিকে এগিয়ে যাই, কাজকর্ম বুঝে নিতে। প্রতিবার তৃতীয় ও চতুর্থ তলার মাঝামাঝি কোথাও এসে, আমার মধ্যে ভয়ের একটা হীমশীতল অনুভূতি বয়ে যায়, শেষে কিনা লিফটটি এখানেই বন্ধ হয়ে যায় আর আমি এই লিফটের মধ্যে এই হোটেল ক্যাপিটালের শরীরের মধ্যে ঘৃণ্য একটা ব্যাকটেরিয়ার মতো চিরকালের মতো আটকা পড়ে যাই। এর পরপরই হয়তো একসময় হোটেলটি আবার জেগে উঠবে আর এর যা কাজ তা শুরু করে দেবে, ধীরে ধীরে আমাকে হজম করে ফেলবে, এমনকি আমার চিন্তাকেও গ্রাস করবে, আমার যা কিছু নিজস্ব অবশিষ্ট রয়ে গেছে এখনো, সব শুষে নেবে, আমি নীরবে চলে যাবার আগেই এটি আমাকে খেয়ে ফেলবে। কিন্তু লিফটটি অবশেষে আমাকে দয়া করে বের হতে দিল।
নাকের ওপরে চশমাখানা ঠিকঠিক বসিয়ে রেখে মিস ল্যাং তার ডেস্কের পেছনে বসে আছেন। তিনি এমনভাবে তাকালেন- যেভাবে এই হোেটেলের আটটি তলার সমস্ত ওয়েট্রেসের সর্দারনি, তিনশোরও বেশি বিছানার চাদর ও বালিশের কভারের বিধায়ক, লিফট ও কার্পেটের রাজসরকার, ঝাড়ু ও ভ্যাকিউম ক্লিনারের অধিকর্তা তাকান। মিস ল্যাং এভাবেই তার চশমার পেছন থেকে আমার দিকে তাকালেন এবং একটা কার্ড নিলেন যেটা বিশেষভাবে আমার জন্য তৈরি করা হয়েছে, যার মধ্যে, প্রতিটি সারি ও কলামে খুব স্পষ্টভাবে তৃতীয় তলার নকশাটা রয়েছে, উল্লেখ আছে প্রত্যেকটি কক্ষের। মিস ল্যাং কখনো হোটেলের অতিথিদের লক্ষ করেন না। তাদেরকে সম্ভবত তিনি উঁচু তলার কর্মকর্তা বলে ভাবেন, মিস ল্যাঙের চেয়েও খানদানি, উর্ধ্বতন কাউকে কল্পনা করা সত্যি জটিল ব্যাপার বৈকি।
এ কারণেই হোটেলটিকে তার আদর্শ ভৌত কাঠামো, একটা জীবন্ত কিন্তু জড় পদার্থ হিসেবে আমাদের খেয়াল রাখতে হয়। এটা সত্যি যে, লোকজন এর ভেতরে জলস্রোতের মতো হুড়হুড় করে আসে আবার চলে যায়, এর বিছানাকে গরম করে, পিতলের বোঁটা থেকে জলপান করে। তারা সঞ্চরণশীল, ফলে চলে যায়। কিন্তু হোটেলটি আর আমরা এখানে থেকেই যাই। এ কারণেই মিস ল্যাং কক্ষগুলো সম্পর্কে আমাকে বলেন, ওগুলো ভুতূড়ে- সবসময় অকর্মক ক্রিয়া হিসেবে উল্লেখ করেন, যেন ওদের অস্তিত্বকে দখল করা হয়েছে অথবা নোংরা হয়ে গেছে কিংবা মুক্ত হয়ে গেছে। এটা করে সে আমার দিকে বিরক্তির চোখে তাকান আমার পোশাকটিও লক্ষ করেন, খুব দ্রুত মেকাপ করা চেহারা তিনি ধরে ফেলেন। সোজাসুজি আমি করিডোর ধরে হেঁটে যাই, আমার হাতে মিস ল্যাঙের সুন্দর ও কিছুটা প্যাঁচানো ভিক্টোরীয় ধাঁচের হাতের লেখায় সারাদিনের কর্মপরিকল্পনা, কী করে আমার কাজ করার শক্তি ও সম্ভাবনাকে সবচেয়ে বেশি খাটানো যায়, সেরকমই ভাবনা তার। এরপর সম্ভবত অসচেতনভাবে আমি হোটেলের অতিথিদের ঘুমানোর অংশটুকু পার হয়ে যাই। আমি এর ঘ্রাণ শুঁকে বলে দিতে পারি কী ঘটছে এখানে। আমি শুধু আমার মাথা তুলি একে চিনে নেবার জন্য।
কখনো কখনো এই অনুমানের ফলাফল একেবারে দশে দশ মিলে যায়; আর্মেনীয় পারফিউম, পুরুষদের জন্য লাজারফেল্ড অথবা তাদের আগ্রাসী পথে টেনে নেয়ার দারুণ দারুণ সব সুগন্ধি। আমি ‘ভোগ’ ম্যাগাজিনের ফ্রি স্যাম্পল থেকে এসব পারফিউমকে চিনতে পেরেছি। পারফিউমের শিশিগুলো দেখেও আমি এদের চিনতে পারি। চিনতে পারি এদের ব্যবহৃত পাউডারের ঘ্রাণ, অ্যান্টি-রিংকল ক্রিম, রেশম, আলগা চামড়া, বিছানাপত্রের উপরে ছড়িয়ে পড়া ক্যামপারিও, চিনতে পারি মেদহীন শ্যামাঙ্গীনিদের আবদারের ছোট চুরুটও। আমার কাছে এসবই হচ্ছে তৃতীয় তলার সুনির্দিষ্ট ঘ্রাণ আর নানান উপকরণ। এগুলোকে আবার যে পরিপূর্ণ ঘ্রাণ বলা যাবে তাও নয়। বরং বলা যায় এগুলি হচ্ছে তৃতীয় তলার বিশেষ ঘ্রাণের প্রথম স্তর মাত্র, যাকে আমি কোনো পুরনো বন্ধুকে হঠাৎ চিনে ফেলার মতো করে সঙ্গে সঙ্গে চিনতে পারি, পোশাক বদলাবার কক্ষে আমার ফিরে যাবার পথে কিছু সময়ের জন্য যেখানে নিজেকে বদলে নেবার একটি জায়গায় এসে আমি থামি। গোলাপি ও সাদা ইউনিফর্মে আবৃত শরীরে আমি করিডোরটিকে একটা ভিন্ন চোখে দেখারত অবস্থায় খুঁজে পাই নিজেকে। আমি ঘ্রাণগুলোকে আর চিহ্নিত করতে পারি না, পিতলের হাতলগুলোতে নিজের প্রতিচ্ছবি আঁকা থেকে নিজেকে সরিয়ে নিই, এমনকী আমি নিজের পায়ের শব্দও আর শুনতে পাই না। করিডোরের দুপাশের আয়তক্ষেত্রের মধ্যে লেখা নম্বরগুলোর উপরেই আমার বিশেষ আগ্রহ নিবদ্ধ থাকে। এই আটটি আয়তক্ষেত্রের প্রতিটি নম্বরলেখা আয়তের পেছনে একটা করে কক্ষ আছে- চৌখুপি ঘর, যৌনকর্মীদের মতো যেটা কিছুদিন পর পর নিজেকে ভিন্ন ভিন্ন লোকের কাছে ভাড়া দেয়। এই কক্ষগুলোর চারটি জানালা রাস্তার দিকে তাকিয়ে থাকে যেখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে স্কটিশ বেশভূষা পরা এক দাড়িওয়ালা লোক করুণ সুরে তার বাঁশি বাজিয়ে চলেছেন।
ওলগা তোকারচুক >>
উপন্যাসিক, ছোটগল্পকার ও প্রাবন্ধিক ওলগা তোকারচুক ১৯৬২ সালে জন্মগ্রহণ করেন। ২০১৯ সালে ঘোষিত ২০১৮ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তিনি। ওলগা গত কয়েক বছর ধরেই পোল্যান্ডের সবচেয়ে জনপ্রিয় লেখক। নোবেল ছাড়াও তিনি অসংখ্য পুরস্কার ও সম্মাননা পেয়েছেন। মাত্র দশ বছর বয়সে তিনি কবিতা লেখা শুরু করেন। এরপর অনেক দিন নীরব থাকার পরে আবার ১৯৯৩ সালে দি জার্নি অব দি বুক পিপল (১৯৯৩) শীর্ষক উপন্যাসের মাধ্যমে পাঠকদের সামনে হাজির হন। যে বইটি পাঠকের মাঝে ইতিবাচক সাড়া ফেলে সেটি হচ্ছে তাঁর ফ্লাইটস শীর্ষক উপন্যাস। এই উপন্যাসটিই তার সবচেয়ে জনপ্রিয় রচনা। ২০১৮ সালে এই বইয়ের জন্য তিনি ম্যান বুকার পুরস্কার পেয়েছিলেন। ওই বছরের জন্যেই তিনি ২০১৯ সালে অর্জন করেন নোবেল সাহিত্য পুরস্কার।