ওলগা তোকারজুকের সাক্ষাৎকার > ‘সাহিত্যের কোনো সীমানা নেই…’ >> মাইনুল ইসলাম মানিক অনূদিত

0
284
‘জগতে একটামাত্র সাহিত্যই আছে’ > ওলগা তোকারজুকের সাক্ষাৎকার
ভূমিকা
পোলিশ বংশোদ্ভূত ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারজুক। তিনি ‘ফ্লাইটস’উপন্যাসের জন্যে ২০১৮ সালের ম্যান বুকার ইন্টারন্যাশনাল প্রাইজ অর্জন করেছিলেন। পেয়েছেন এবছরে ঘোষিত ২০১৮ সালের নোবেল পুরস্কারও। পোল্যান্ডে তুমুল জনপ্রিয় এই লেখিকার ‘ফ্লাইটস’উপন্যাসটি খোদ তাঁর নিজের দেশেই কয়েক লক্ষ কপি বিক্রি হয়। বইটি অনূদিত হয়েছিল ত্রিশটিরও অধিক ভাষায়। উপন্যাসটিতে তিনি পাঠকদেরকে সতেরো শতকের ফ্লান্ডার্স থেকে শুরু করে আঠারো শতকের ভিয়েনা এবং সেখান থেকে নিয়ে গেছেন প্যারিতে। জোর্তিবিজ্ঞানের রূপক ব্যবহার করার পাশাপাশি এই উপন্যাসটিতে তিনি দেহতত্ত্ব ও মনঃসমীক্ষণ নিয়ে তাঁর-নিজস্ব ভাবনার বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছেন। উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছিলেন জেনিফার ক্রফট। তিনি উপন্যাসে কনস্টেলেশন রীতির প্রয়োগ করে থাকেন। এই রীতিটি প্রথমে পাঠকের জন্যে কিছুটা বিরক্তির উদ্রেক ঘটায়। তবে তাঁর ফ্লাইটস উপন্যাসটি সেসব ছাপিয়ে যায় এবং পাঠকগণের মাঝে এক নান্দনিক সৃজনশীল কর্ম হিসেবে ব্যাপক সাড়া ফেলে। তাঁর এই সৃজনশীলতা প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “সৃজনশীলতা বলতে আমি যা বুঝি, তা হলো আগের যে-কোন সময়ের চেয়ে আরো অভিনব উপায়ে নিজেকে অতিক্রম করে নতুন কিছু বলা। ইতিমধ্যেই যা করা বা লেখা হয়ে গেছে, সে সবের পৃনরাবৃত্তি করাকে আমি সৃজনশীলতা মনে করি না। নতুন বিষয়, নতুন রীতি নিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়া উচিত।”
এখানে সাহিত্য নিয়ে, বিশেষ করে উপন্যাস নিয়ে কী ভাবেন, পেন ইন্টারন্যাশনালের সাথে এখানে প্রকাশিত লেখিকার কথোপকথনে তা উঠে এসেছে। এখানে পাওয়া যাবে তারঁর মধ্য-ইউরোপীয় একজন লেখক হয়ে ওঠার গল্প, পোল্যান্ডের রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং তাঁর সর্বশেষ বইয়ের প্রতিক্রিয়াসহ নানান বিষয়-আশয় সম্পর্কে তাঁর অভিমত।

সাক্ষাৎকার

প্রশ্ন : রাজনীতির সংজ্ঞায় কি সাহিত্যের কোন ভূমিকা আছে কিংবা সক্রিয়তাবাদে কী এর কোন অবদান রয়েছে? আপনি কি মনে করেন সাহিত্য একধরনের শিল্প এবং সাহিত্য কী সেই শিল্প থেকে সরে গেছে?
তোকারজুক : সাহিত্য যদি কোন বিশেষ ক্ষেত্রে অবদান রাখেও, আমি বলব সেই অবদানটুকু সচেতনভাবে রাখা হয়ে ওঠে না। যদি কোন লেখক শুধুমাত্র সক্রিয়তাবাদের জন্যে লিখে থাকেন, তবে তা নিখাঁদ শিল্প হয়ে ওঠে না। আপনার মনে থাকার কথা আমি কমিউনিস্ট আমলের জোরালো প্রোপাগান্ডার মধ্য দিয়ে বেড়ে উঠেছি। প্রোপাগান্ডা কতটা কার্যকর, তা আমি জানি- এটি একটি বইয়ের সবটুকু শিল্পগুণ নিঃশেষ করে দিতে পারে, একজন শিল্পীসহ সব সৃজনশীলতার ক্ষেত্রেই এটি প্রযোজ্য।
আপনার কি মনে হয় এখনো সেই ধরনের প্রোপাগান্ডার মধ্য দিয়ে কাজ করে যাচ্ছেন?
দেখুন, পোল্যান্ডে এখনো একটি জোরালো প্রোপাগান্ডা আছে। আমার শৈশব কাটিয়ে আসা কমিউনিজমেও এরকম প্রোপাগান্ডা দেখেছি বলে মনে পড়ে না। এটি এখন অনেক বেশি শক্তিশালী এবং সুসংহত। ইন্টারনেট এবং ভুয়া নিউজের মাধ্যমেই এই অবস্থার সৃষ্টি হয়েছে। আমাদের সরকার একটি প্রোপাগান্ডা-যন্ত্র তৈরি করতে চায়। তারা ইতিহাসকে নিয়ন্ত্রণ করতে চায়, নিজের মতো করে সংজ্ঞায়িত করতে চায়; আমাদের অতীতকে নতুন করে লিখতে চায়, মুছে ফেলতে চায় অন্ধকার দিকগুলো। পোল্যান্ডে এমন একটা সময় আমরা পার করছি যে সময়টাতে লেখকদের ভূমিকা খুবই অর্থবহ। জগতকে যথাযথভাবে লিখতে হলে আমাদেরকে সৎ ও শোভনীয় হতে হবে।
আপনার শেষ বই ‘দ্য বুকস অফ জ্যাকব’। সমকালীন পোল্যান্ডের আবহে লিখিত এই বইটিতে কি একভাষী, একজাতিগত মিথ প্রতিফলিত হয়নি?
আমার মনে হয় আমার বইটির বিষয়বস্তু হচ্ছে একটি বহুজাতিক পোল্যান্ড, যা নতুন ভার্সনের ইতিহাস প্রবক্তাদের জন্যে স্বস্তিদায়ক নয়। এই বইটি প্রত্যাহার করা হয়েছিল। এটি নতুন ইতিহাস প্রবক্তাদের উপযোগী নয়। আমার কাছে আরেকটি বিষয় খুবই আনন্দদায়ক যে সমকালীন যুদ্ধটুদ্ধ এখন আর রাস্তায় হয় না। অস্ত্র দিয়ে হয় না। এখনকার যুদ্ধ হয় শব্দ ও আখ্যানের মধ্য দিয়ে। এটি রাশিয়া ও পুতিনের মাঝেও দেখা যায়। প্রশ্ন হচ্ছে, এই বাকবিতণ্ডার শব্দযুদ্ধে গল্পটা কে ভালো বলে যেতে পারে।
‘ফ্লাইটস’ সবেমাত্র ইংরেজিতে অনূদিত হয়েছে। সবাই বলছে এটি আধুনিক মনস্তত্ত্বনির্ভর লেখা, যা স্থির হওয়ার পরিবর্তে সর্বদাই গতিশীল থাকতে চায়। আপনি কি সর্বদা গতিময় থাকার এই ধারণাটিকে আপনার সকল লেখালেখির একচ্ছত্র বিষয়বস্তু বলবেন?
হ্যাঁ। আমি একটা উপন্যাস লিখেছিলাম ‘হাউস অফ ডে, হাউস অফ নাইট’, যার স্থিরতা একধরনের স্ত্রোত্ত। উপন্যাসের নায়িকা একটা বাড়ি কেনে এবং এটার দ্বারা দেখানো হয় একটি মাত্র স্থানে শেকড় গেড়ে অবস্থান করাটা কত চমৎকার হতে পারে। কিন্তু আমার মনে হয় বইটা আমি এমনভাবে লিখেছি যেন আমি একটা স্বপ্নের মধ্যে আছি : যা কিছু আমি সুন্দর হিসেবে কল্পনা করি, তা কিছুটা বিষাদময়ও। আমার মনে হয় গতিময় হওয়া, শেকড়হীন হওয়াটাই আমার কাছে যথার্থ, এটাই আমার ধারণা। এমনকি আমার প্রথম উপন্যাসের শিরোনামও ছিল ‘সফর’।
আপনি একবার নিজেকে মধ্য-ইউরোপীয় লেখক হিসেবে উল্লেখ করেছিলেন এবং মধ্য ইউরোপের সিলেসিয়াতে আপনি একটি লেখক উৎসবের আয়োজনও করেছিলেন। মধ্য ইউরোপীয় হওয়াটা আপনার কাছে কী ধরনের বিষয়? স্থান, নাকি লেখালেখির বিষয়ের দিক থেকে আপনি মধ্য ইউরোপীয় মনে করেন?
শেষ পর্যন্ত বিষয়টি আমি স্পষ্ট করিনি কিন্তু এ ব্যাপারে আমার নিজস্ব কিছু মতামত রয়েছে। আমার মনে হয় সাহিত্য পশ্চিম ইউরোপের তুলনায় মধ্য ইউরোপের ইতিহাসে একটি ব্যতিক্রম ভূমিকা রেখেছে। যেমনটা বলা যায়, মধ্য ইউরোপের সাহিত্য হচ্ছে অধিক অবসর ও বিনোদনকেন্দ্রিক, এটি মধ্যবিত্তের জৈবনিক অভিজ্ঞতা বৃদ্ধির প্রয়োজনে।
প্রথম বিষয়টি হচ্ছে সাহিত্য অস্ত্রের ভূমিকা পালন করেছে। এটি পোল্যান্ডের বিভাজনের মধ্য দিয়ে লোকজনের পরিচয় প্রতিষ্ঠা করেছে। এমনটা আমরা বলতে পারি। সাহিত্যের সবসময়ই করণীয় কিছু ছিল। তবে তা সবসময়ই ছিল রাজনৈতিক এবং রাজনৈতিক বিষয়ের সাথেই সম্পৃক্ত।
পরের বিষয়টি হচ্ছে, কখনোই দীর্ঘ সময় ধরে আমাদের কোন মধ্যবিত্ত শ্রেণি ছিল না। বিভক্ত অবস্থায় পোল্যান্ডের আর্থিক সমস্যা ছিল, আর মধ্যবিত্তরা রাশিয়ান, জার্মানসহ অন্যান্য ভাষায় কথা বলত। এটা অন্যান্য সমাজের অংশই ছিল। মধ্যবিত্ত শ্রেণি না থাকলে আপনার পাঠক থাকবে না। লক্ষ লক্ষ লোক অশিক্ষিত থাকলে বইয়ের বাজারও থাকবে না। পোল্যান্ডে কবিতা খুবই জনপ্রিয় ছিল। কবিতায় আমাদের দু’জন নোবেল বিজয়ীও আছেন। কবিতাই একমাত্র উপকরণ যার দ্বারা ব্যাখ্যা করা যায় আমরা কোন অবস্থায় আছি, বিশ্ব কোথায় আছে। কবিতা মুখস্থ করা সহজ, আপনি মঞ্চে পড়তে পারবেন, আবৃত্তি করতেও পারবেন। একারণে উপন্যাস পিছিয়ে পড়েছিল।
অপর দিকে, পোল্যান্ডে উপন্যাসের একটা কাঠামো আছে এবং তা ঐতিহাসিকভাবে সম্পৃক্ত। এই বইগুলো হৃদয়কে প্রসারিত করার জন্যেই লেখা হয়েছিল। এই উপন্যাসগুলো পোলিশ ইতিহাসকে সাহসিকতা ও বীরত্বপূর্ণ দেশ হিসেবে দেখিয়েছে চেতনাকে শাণিত করার প্রয়াসে। এগুলোর লক্ষ্য ছিল চমকপ্রদ রূপকথার গল্পের বিনির্মাণ। কিন্তু জানেনইতো সাহিত্যে করণীয় হচ্ছে অন্য অতিরিক্ত কিছু। পশ্চিম ইউরোপে আমাকে প্রায়ই জিজ্ঞেস করা হয় : আপনি মধ্য ইউরোপ থেকে এরকম নিরিক্ষাধর্মী উপন্যাস লিখছেন কেন? আমি মনে করি, বাস্তবতাসম্মত বিবিধ অনুভূতি রয়েছে আমাদের। আমাদের বাস্তবতা যুক্তরাজ্যের মতো স্থিতিশীল নয়। সবকিছু একই রকম, সবসময়ই, চাই তা পুরনো দালানই হোক কিংবা পুরনো পানশালা। ধরুন, আপনি এই ট্র্যাডিশনের সাথে সম্পৃক্ত। আপনার যদি ওয়ারশোর মতো একটা রাজধানী থাকে, যেটি পরিপূর্ণভাবে যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে গেছে, তখন আপনি সাহিত্য যা খুশি লিখতে পারবেন। কারণ সবকিছুই পরিবর্তনশীল, জলবৎ। জলবৎ বাস্তবতার অনুভূতি খুবই শক্তিশালী।
ধ্রুপদী সাহিত্যের মতো একটা গল্পের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত বলে যাওয়ায় আমরা বিশ্বাসী নই। কারণ বাস্তবে সাধারণত এমনটা ঘটে না। কোন কিছুই এতটা গতানুগতিক সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয় না।
গল্প বলা, গল্প অনুধাবন করা, অনেকটা চতুর্দিকে লাফঝাঁপের মতো, সম্পূর্ণ আপাতবিরোধী আবর্তন। সম্ভবত, কাঠামোর উপর সেটিরই একটি প্রভাব আছে।
মধ্য ইউরোপ ও অন্যান্য সাহিত্যের মধ্যে একটা ভিন্ন ধারণা রয়েছে যা মূলত বিনোদন নয়; নৈতিক প্রয়োজনে, সমাজের ত্রুটি-বিচ্যুতি ব্যাখ্যা করার প্রয়োজনেই লেখালেখি। আপনিও কি এমনটাই মনে করেন?
হ্যাঁ, এটা অস্ট্রেলীয় সাহিত্যের জন্যে সত্য। নিজের দেহে গর্ত করা, সেটির যন্ত্রণা অনুভব করা বেদনাদায়ক। এটা সম্ভবত মনোবিশ্লেষণজনিত কারেেণও হতে পারে। এর বীজ এখন মধ্য ইউরোপেও। আপনি যদি মধ্য ইউরোপের সাহিত্যের মতো কিছু নিয়ে কথা বলেন, বলতেই হয়, এটি খুবই সঘন, অন্ধকার; মানবিকতার অন্ধকারাচ্ছন্ন অংশে একটুখানি আলো নিক্ষেপের মতো। আমার মনে হয়, মধ্য ইউরোপের ইহুদি ঐতিহ্যও আরেকটা গুরুত্বপূর্ণ জিনিস। এটি আমাদের সমাজ ও সংস্কৃতিতে ব্যাপকভাবে উপস্থিত।

একেবারেই শেষ প্রশ্ন : আমরা এই সীমানার তারল্য নিয়ে অনেক কথাই বলেছি। একজন পোলিশ বংশোদ্ভূত লেখক হিসেবে পরিচিত হওয়ার মতো আর কিই-বা আছে? লেখকের জাতিগত পরিচয় আপনার কাছে কোন গুরুত্ব বহন করে কি-না, কিংবা এই ধারণাটি আপনার মধ্যে বিরাজ করে কি-না?

আমি গভীরভাবে উপলব্ধি করি, সাহিত্যের কোন সীমানা নেই। জগতে একটামাত্র সাহিত্যই আছে, এবং সেটি প্রকাশমাধ্যম হিসেবে একাধিক ভাষা ব্যবহার করে থাকে। একারণেই অনুবাদকগণ খুবই গুরুত্বপূর্ণ। তারা ভাষাসমূহের মধ্যবর্তী পলকা সংযোজনকারীর মতো আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেন, জগতের সকল সাহিত্যই একটিমাত্র সাহিত্য। যখন আমি চীনা ভাষার কোন বই পড়ি, আমি খুবই ব্যক্তিগত কিছুর পরিচয় পেয়ে যাই যা আমার মাঝে গতিশীল। এটা আমার কাছে অলৌকিক কিছু। আমাদের অবচেতনেই এমন অনেক কিছু থেকে যায় যা সাহিত্য সৃষ্টির উৎস। ভাষা ও সংস্কৃতিতে আমি একজন পোলিশ লেখক। কিন্তু আমি আমার নিজেকে একজন সার্বজনীন লেখক হিসেবে বিবেচনা করি।