ওলগা তোকারজুক > ফ্লাইটস্ >> ফজল হাসান অনূদিত ধারাবাহিক উপন্যাস [পর্ব ৭]

0
188

ফ্লাইটস্ [পর্ব ৭]

চরিত্রচিত্র ৯ >> কুনিকি : পানি

ভিস দ্বীপে এখন মধ্যাহ্নকালীন ভাতঘুমের সময় এবং ছোট্ট এই শহরটি প্রায় ফাঁকা হয়ে আছে। রাস্তার ডান দিকে সমুদ্র সৈকতে তিন রমণী হালকা নীল রঙের ঘুড়ি ওড়াচ্ছিল। কুনিকি গাড়ি থামিয়ে তাদেরকে ভালো মতো পর্যবেক্ষণ করে। রমণীদের মধ্যে একজনের পড়নে ক্রিম রঙের ট্রাউজার, যা তার বিশাল নিতম্বের সঙ্গে আষ্ঠেপৃষ্ঠে লেগে আছে।
কুনিকি ছোট্ট একটা ক্যাফেতে ব্রাঙ্কোকে খুঁজে পায়। ব্রাঙ্কোর টেবিলে আরো তিনজন লোক বসেছিল। বরফ মিশিয়ে তারা মদ খাচ্ছিল। কুমিনিকে দেখে ব্রাঙ্কো আশ্চার্য হয় এবং চোখেমুখে স্মিত হাসি ফুটিয়ে তোলে।
‘আপনি কী কিছু ভুলে গিয়েছেন?’ ব্রাঙ্কো জিজ্ঞেস করে।
বসার জন্য লোকগুলো কুমিনির দিকে একটা চেয়ার এগিয়ে দেয়, কিন্তু কুনিকি বসে না। সে খোলাখুলিভাবে ঘটনার আদ্যপান্ত ক্রমান্বয়ে তাদের বলতে চায় এবং ইংরেজিতে বলার জন্য প্রস্তুতি নেয়। একই সময়ে সে তার মস্তিস্কের অন্য অংশ নিয়ে ভাবতে থাকে, যদিও ভাবনাটা একধরনের স্বচ্ছ প্রলেপ মাত্র, যা সবাই এমন পরিস্থিতিতে করে। সে বলে, ওরা চলে গেছে – ইয়াগোদা এবং তার ছেলে। সে কখন এবং কোথায় গেছে, তারও বিস্তারিত বর্ণনা দেয়। কুনিকি আরো বলে, সে অনেক খুঁজেছে, কিন্তু কোথাও ওদের হদিশ পায়নি।
একসময় ব্রাঙ্কো জিজ্ঞেস করে, ‘তোমাদের মধ্যে কী ঝগড়া হয়েছে?’
কুনিকি বলে, ‘না।’ যা সত্যি, সে তাই বলে। অন্য দু’জন নিজেদের গ্লাসে মদ ঢালে। গ্লাস থেকে সামান্য গলায় ঢেলে স্বাদ নিতে কুনিকির কোনো আপত্তি নেই। সে মদের স্বাদ নেয় এবং জিহ্বায় মিষ্টি ও টক অনুভব করে। ব্রাঙ্কো টেবিল থেকে ধীরেসুস্থে এক প্যাকেট সিগারেট এবং লাইটার তুলে নেয়। ব্রাঙ্কোর দেখাদেখি সঙ্গীরাও উঠে পড়ে। অনিচ্ছা সত্ত্বেও অন্য সবাই উঠে দাঁড়ায়, যেন তারা কোনো এক লড়াইয়ের জন্য প্রস্তুতি নিতে যাচ্ছে – অথবা হয়তো তারা সেখানেই শামিয়ানার নিচে ছায়ায় আরো কিছুক্ষণ থাকতে চায়। কিন্তু তারা সবাই চলে যাচ্ছে। কুনিকি নাছোরবান্দার মতো তাদের অনুরোধ করে, যাওয়ার সময় প্রথমেই তারা যেন পুলিশকে খবর দেয়। ব্রাঙ্কোর মধ্যে দ্বিধাদ্বন্দ্বের দোলাচল। তার কালো দাড়ির মাঝে কয়েকটা সাদা দাড়ি উজ্জ্বল হয়ে ফুটে আছে। তার পড়নের হলুদ রঙের টিশার্টে শামুকের ছবি এবং ছবির সঙ্গে লাল রঙে লেখা ‘শামুক’।
‘হয়তো মহিলা পানির কাছে গিয়েছে।’
সম্ভবত মহিলা তাই করেছে। তারা সবাই মিলে মতৈক্যে পৌঁছায় : ব্রাঙ্কো এবং কুনিকি রাস্তার নির্দিষ্ট স্থানে যাবে। অন্য দু’জন পুলিশ স্টেশনে যাবে এবং পুলিশকে ভিস শহরে আসতে অনুরোধ করবে। ব্রাঙ্কো সতর্ক করে বলে, কমিজা শহরে মাত্র একজন পুলিশকর্মী নিয়োজিত আছে। বরফগলা গ্লাসগুলো তখনো টেবিলের উপর দাঁড়িয়ে।
কুনিকি যেখানে আগে গাড়ি থামিয়েছিল সেই জায়গা চিনতে তার তেমন অসুবিধা হয়নি। তবে তার কাছে মনে হয়েছে যেন ঘটনাটি অনেক বছর আগে ঘটেছে। আলাদা ধরনের সময় অতিক্রম করে যাচ্ছে, ভীষণ তিক্ততায় এবং ধারাবাহিকভাবে। একসময় সাদা মেঘের আড়াল থেকে সূর্য বেরিয়ে আসে এবং হঠাৎ করে চারপাশে উত্তাপ ছড়িয়ে পড়ে।
‘হর্ন বাজান,’ ব্রাঙ্কো বললো। কুনিকি হর্ন বাজায়।
হর্নের আওয়াজ দীর্ঘ এবং শোকাতুর, যা অনেকটা বন্য-জন্তুর কন্ঠস্বরের মতো শোনায়। তারপর আওয়াজটা ভেঙে টুকরো হয়ে ছোট-ছোট প্রতিধ্বনি সৃষ্টি করে এবং শেষে থেমে যায়। তারা জলপাই বাগানের ভেতর দিয়ে চলতে শুরু করে। মাঝে মাঝে গুরুগম্ভীর শব্দ করে। আঙুরলতার বাগান অবধি না পৌঁছানো পর্যন্ত তারা একজন আরেকজনের পেছনে দৌঁড়ায় না। তারপর সংক্ষিপ্ত সময়ের জন্য থেমে তারা আলাপ করে সিদ্ধান্ত নেয় যে, পুরো এলাকা জুড়ে খোঁজাখুঁজি করবে। তাদের মধ্যে কয়েকজন গাছের ছায়ায় সারি বেধে খুঁজতে শুরু করে এবং হারিয়ে যাওয়া মহিলাকে ডাকে : ‘ইয়াগোদা। ইয়াগোদা।’ কুনিকি জানে, আদি পোলিশ ভাষায় তার স্ত্রী নামের অর্থ হচ্ছে ‘বেরী’, অর্থাৎ ‘জাম’। যদিও নামটার অনেক ব্যবহার হয়েছে, কিন্তু এই সময়ের আগ পর্যন্ত সে নামের অর্থ বেমালুম ভুলে গিয়েছিল। হঠাৎ একসময় অস্পষ্ট এবং অদ্ভূতভাবে তার মনে পড়ে যে, প্রাচীন শাস্ত্রীয় কোনো অনুষ্ঠানে সে অংশগ্রহণ করছে। সেই বাগানের ঝোঁপের ফাঁকে গাঢ় বেগুনি রঙের টসটসে পাকা আঙুর ঝুলে আছে, যা উরোজের বোঁটা বলে ভ্রম হয় আর রীতিমতো অবাক হয়। পাতায় আচ্ছাদিত গোলকধাঁধা যেন চিৎকার করে ডাকছে, ‘ইয়াগোদা! ইয়াগোদা!’ কে কথা বলছে? কাকে সে খুঁজছে?
কুনিকি এক সেকেন্ডের জন্য থামতে বাধ্য হয়। তার শরীরের একপাশে ব্যথা। তবুও সে গাছের সারির মাঝপথ ধরে রীতিমতো লাফিয়ে পথ চলতে থাকে। প্রশান্ত ছায়ায় দাঁড়িয়ে সে কান খাড়া করে। সম্পূর্ণ থেমে যাওয়ার পূর্বমুহূর্ত পর্যন্ত ব্রাঙ্কোর চাপা কণ্ঠস্বর পাতার ফাঁকে অনুরণিত হয়। তখন সে মাছির গুঞ্জরণও শুনতে পায়, যা শান্ত প্রকৃতির পরিচিত শব্দ।
একটা আঙুরের বাগানের পরে আরেকটা আঙুরের বাগান। মাঝখানের একটা সরু রাস্তা তাদের পৃথক করে রেখেছে। কুনিকি এবং ব্রাঙ্কো থামে। ব্রাঙ্কো তার মোবাইল দিয়ে কাউকে ফোন করে। সে শুধু ক্রোয়েশীয় ভাষায় দু’টো শব্দ, ‘স্ত্রী’ এবং ‘শিশু’, উচ্চারণ করে। এ দু’টো শব্দই কুনিকির কানে পোলিশ শব্দের মতো বাজে এবং তার পক্ষে বোঝা সম্ভব হয়। সূর্য কমলা-রঙ ধারণ করে; বিশাল ও স্ফীত – তাদের চোখের সামনেই ক্রমশ নিস্তেজ হতে থাকে। মনে হয় শিগগির তারা সূর্য়ের দিকে সরাসরি তাকাতে পারবে। ইতোমধ্যে আঙুর বাগান গাঢ় সবুজ রঙে ভরে উঠেছে। সেই সবুজ বাগানে দু’জন ক্ষুদ্র মানুষ অসহায়ের মতো দাঁড়িয়ে থাকে।
সন্ধ্যা নাগাদ কয়েকটা গাড়ি এসে পৌঁছায় এবং কয়েকজন লোক জটলা করে দাঁড়িয়ে আছে। কুনিকি একটা গাড়ীর ভেতর বসে আছে এবং ব্রাঙ্কোর সাহায্য-সহযোগিতা নিয়ে মনে হয় এলোমেলোভাবে বিশালদেহী ঘামে-ভেজা পুলিশ কর্মকর্তার প্রশ্নের উত্তর দিয়ে যাচ্ছে। সে খুবই সহজ-সরল ইংরেজিতে জবাব দেয় : ‘আমরা থেমেছি। সে বাচ্চাকে নিয়ে গাড়ি থেকে নেমে যায়। ‘ওরা ঠিক ওখানে নেমেছে’ বলেই সে আঙুল উঁচিয়ে জায়গাটি দেখায়। ‘আমি গাড়ীতেই বসে ওদের ফিরে আসার অপেক্ষায় ছিলাম, বলতে পারেন প্রায় পনের মিনিট। তারপর আমি ওদের খুঁজে বের করার সিদ্ধান্ত নেই। কিন্তু ওদের নাগাল পাইনি। আমি জানি না, কী ঘটেছে।’ কুনিকিকে এ-সময় হালকা গরম মিনারেল ওয়াটার খেতে দেয়া হয়। সে ঢকঢক করে সবটুকু পানি পান করে। ‘ওরা হারিয়ে গেছে।’ কুনিকির কন্ঠস্বরে ভয় আর উৎকন্ঠার মিশেল। তারপর সে আবার বলে, ‘হারিয়ে গেছে।’ গাড়ি আসার অপেক্ষায় থাকার ফাঁকে পুলিশ অফিসার কাউকে ফোন করেন। ‘এখানে হারিয়ে যাওয়া অসম্ভব, বন্ধু আমার,’ সে অন্য প্রান্তের লোকটিকে বললো।’ ‘বন্ধু আমার’ কথাটা শোনার সঙ্গে-সঙ্গেই কুনিকির মস্তিস্কে ঘণ্টাধ্বনি বাজে। তারপর ওয়াকিটকিতে অফিসার অন্য প্রসঙ্গে চলে যায়। ইতিমধ্যে দ্বীপ ছেড়ে চলে যাওয়ার আগ মুহূর্ত পর্যন্ত একটা ঘন্টা কেটে গেছে।
এরই মাঝে সংঙ্কুচিত সূর্য আঙুরলতার আড়ালে ডুবে যেতে থাকে। তারা যখন পুরো পথ অতিক্রম করে উপরে উঠে আসে, তখন তাকিয়ে দেখে সমুদ্রের উল্টো দিকে সূর্য ডুবে গেছে। কেউ পছন্দ করুক বা না-ই করুক, তাদের কাছে ডুবন্ত সূর্যটা অনিন্দ্য সুন্দর লাগে। অবশেষে তারা ফ্ল্যাশলাইট জ্বালায়। আবছায়ায় তারা দ্বীপের ঢালু বেয়ে নেমে আসে সমুদ্রের তীরে। সেখানে অসংখ্য খাঁড়ি রয়েছে। তারা দু’টো খাঁড়ি পর্যবেক্ষণ করে। একটা খাঁড়িতে ক্ষুদ্রাকৃতির বেশ কয়েকটি বাড়িঘর আছে এবং সেখানে বিশেষ একধরনের পর্যটক থাকে। এরা হোটেলে অবস্থান করতে চায় না। বেশী ভাড়া দিয়ে পানি বা বিদ্যুৎ সাশ্রয় করে না। রান্নার জন্য তারা পাথরের তৈরি অথবা গ্যাসের চুলা ব্যবহার করে। তারা মাছ ধরে এবং সেসব মাছ সরাসরি সাগর থেকে ধরে এনে গ্রিলে রান্না করে খায়। না, তাদের কেউ শিশুসহ কোনো মহিলাকে দেখেনি। লোকগুলো রাতের খাবার খাওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছিল। টেবিলের উপর রুটি, পনির, জলপাই আর বেচারা মাছ। বিকেলেও মাছগুলো সাগরের গভীরে মনের সুখে খেলা করছিল। যখনই কুনিকি বুঝতে পেরেছে যে মহিলা হারিয়ে গেছে কিংবা ভুল পথ ধরে কোথাও চলে গেছে, তখন থেকেই তার অনুরোধে ব্রাঙ্কো বারবার কোমিজাতে ফোন করছিল।
মধ্য-রাতের দিকে লোকজনের ভীড় কমে যায়। তাদের মধ্যে দু’জনকে কুনিকি এর আগে কোমিজায় দেখেছে। তারা হলো দ্রাগো ও রোমান। তারা দু’জন একসঙ্গে হেঁটে গাড়ির দিকে যায়। সাহায্য করার জন্য কুনিকি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ। কিন্তু সে জানে না, এই কৃতজ্ঞতাটা কেমন করে প্রকাশ করবে। ক্রোয়েশীয় ভাষায় ‘ধন্যবাদ’-কে কী বলে, তা সে ভুলে গেছে; অবশ্যই পোলিশ ভাষায় ‘dziękuję’-এর [টীকা ১] কাছাকাছি, অথবা অনেকটা ‘dyakuyu’ অথবা ‘dyakuye’-এর [টীকা ২] মতো কিছু একটা বলা হয়। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে কী বলা হয় তা সে জানে না। অনেক আন্তরিকতার সঙ্গে তারা নানান বিষয় নিয়ে আলাপ-আলোচনা করে। সহজ ইংরেজির ফাঁদে পা না দিয়ে সমাধান খুঁজে বের করে যে, শব্দটা প্রচলিত স্লাভিক একটা শব্দ- ‘koiné’-এর [টীকা ৩] মতো কিছু, ব্যাকরণ ছাড়াই যে শব্দটি ব্যবহার করা যায়।
সে-রাতে কুনিকির বাসস্থানের কাছে একটা নৌকা এসে ভেড়ে। কারণটা হলো, বন্যার জন্য সবাইকে অন্যত্র সরিয়ে নেওয়া হবে। ইতোমধ্যে অনেক দালানবাড়ির দোতলা পর্যন্ত বন্যার পানি পৌঁছে গেছে। রান্নাঘরের মেঝের টাইলসের ফাঁক গলে পানি ঢুকেছে এবং বিদ্যুৎ সরবরাহের জায়গা থেকে গরম পানি বের হচ্ছে। অনেকের বইপত্র ভিজে গেছে। কুনিকি একটা বইয়ের পৃষ্ঠা খোলে এবং দেখে, বইয়ের পৃষ্ঠা থেকে অক্ষরগুলো মুখের প্রসাধনের মতো খসে পড়েছে। ফলে, পৃষ্ঠা ফাঁকা এবং অস্পষ্ট দেখায়। একসময় সে অনুভব করে, এর মাঝে সবাই কখন যেন আগের নৌকায় চড়ে চলে গেছে আর সে-ই একমাত্র থেকে গেছে।
কুনিকি ঘুমের ভেতর বৃষ্টিপতনের শব্দ শুনতে পায়। বৃষ্টি আকাশের বুক চিরে অলস ভঙ্গিতে ঝরে পড়ছে। শীঘ্রই বৃষ্টি পড়ার গতি বাড়বে এবং হয়তো অল্প সময়ের জন্য মুশলধারে নামবে।

অনুবাদকের টীকা

[১] dzikuj – পোলিশ ভাষায় এর অর্খ ‘ধন্যবাদ’।
[২] dyakuyu অথবা dyakuye – ইউক্রেনীয় ভাষায় এভাবেই কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা হয়, যা অনেকটা ধন্যবাদ-জ্ঞাপক।
[৩] koiné – স্লাভিক এলাকার আঞ্চলিক ভাষা বা কথা।

চরিত্রচিত্র ১০ >> বেনেডিক্টাস, ক্যুই ভেনিত

এপ্রিলের মহাসড়ক। সূর্য্যের লাল আভা রাস্তার পীচের উপর শুয়ে আছে। কিছুক্ষণ আগে থেমে যাওয়া বৃষ্টির জন্য সারা জগত যেন চকমকে সাজে সজ্জিত হয়েছে – দেখতে ঈস্টারের কেকের মতো। গুড ফ্রাইডের সন্ধ্যেয় আমি গাড়ী চালিয়ে নেদারল্যান্ড থেকে বেলজিয়ামে যাচ্ছিলাম। জানি না, আমি এখন কোন দেশের মাটিতে আছি। কেননা সীমানা, যা ব্যবহার করা হয়নি, অনেক আগেই অদৃশ্য হয়ে গেছে। রেডিওতে মৃতদের আত্মার শান্তির জন্য সমবেত প্রার্থনার সঙ্গীত পরিবেশিত হচ্ছিল। আশির্বাদের সময় সড়কের উপর আলো এসে ঠিকরে পড়ছিল এবং সেই আলো আমাকে আরো বেশি মানসিক শক্তি যোগান দিচ্ছিল।
অথচ বাস্তবে আমি বেলজিয়ামে পৌঁছে গেছি, যেখানে অন্য সব পর্যটকদের জন্য রাস্তা আলোকিত করে রাখা হয়েছে, এবং এই মুহূর্তে আমার কাছে এর চেয়ে অধিক অন্য কোনো অর্থ বহন করে না।

অনুবাদকের টীকা
[১] চরিত্রচিত্রের শিরোনাম ‘বেনেডিক্টাস, ক্যুই ভেনিত’ – ক্যাথলিক গির্জায় পরিবেশিত সংক্ষিপ্ত ভজন-সঙ্গীত অথবা স্তোত্রের একাংশ। লাতিন ভাষায় প্রথম চরণ‘বেনেডিক্টাস ক্যুই ভেনিত ইন নমিনে ডোমিনি’, অর্থাৎ ‘সে-ই ধন্য যার আগ মন ঈশ্বরের নামে।’

চরিত্রচিত্র ১১ >> প্যানোপ্টিকন্

প্যানোপ্টিকন্ [টীকা ১] এবং ওন্ড্যারক্যামার [টীকা ২], জাদুঘরের গাইড থেকে আমি যেমন শিখেছি, দু’টো উল্লেখযোগ্য বিষয় ছাড়া অন্য কিছু নয়, এদের উপস্থিতি জাদুঘরের গুরুত্ব বাড়িয়ে দেয়। বিশেষ ধরনের এসব জাদুঘরে সবধরনের কৌতূহলোদ্দীপক জিনিসপত্র রাখা হয়, যা এসবের মালিকদের কাছ থেকে এবং দূরদেশের বিভিন্ন জায়গা থেকে সংগ্রহ করে আনা হয়।
তবে ভুলে গেলে চলবে না যে, জাদুঘরের ভেতর কয়েদীদের উপর অনবরত নজরদারি করার জন্য বেনথাম তার মেধাবী বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তার পছন্দ মতো নামকরণ করেছিলেন ‘প্যানোপ্টিকন্’। তাঁর প্রধান উদ্দেশ্য ছিল তিনি এমন একটা কাঠামোর নকশা তৈরি করবেন, যেখানে প্রত্যেক কয়েদীর গতিবিধি সবসময় লক্ষ রাখা যাবে।

অনুবাদকের টীকা

[১] প্যানোপ্টিকন্ – এটি গ্রিক শব্দ, যার উৎপত্তি ‘প্যানোপ্টেস’, অর্থ ‘সব দেখা’। ইংরেজ দার্শনিক এবং সামাজিক ব্রহ্মবাদী জেরেমি বেনথাম ১৭৯১ সালে কারাগারের স্থাপত্য নকশার কথা বলতে গিয়ে এই শব্দটি ব্যবহার করেছিলেন। এই নকশা চক্রাকার এবং কাচের ছাউনি দিয়ে ঘেরা, যে কারণে অনায়াসে একজন রক্ষী সারাক্ষণ কয়েদীদের গতিবিধির উপর নজর রাখতে পারে। শুরুতে নকশাটি তেমন সাড়া জাগাতে পারেনি, কিন্তু পরবর্তীকালে এই নকশার উপর ভিত্তি করে যুক্তরাষ্ট্র এবং যুক্তরাজ্যের কয়েকটি কারাগার নির্মাণ করা হয়।
[২] ওন্ড্যারক্যামার – প্রাকৃতিক ইতিহাস সমৃদ্ধ একধরনের জাদুঘর, যেখানে প্রদর্শিত জিনিসপত্র ক্রয় করা যায়।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের (পর্ব ৬) লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%93%e0%a6%b2%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%95-%e0%a6%ab%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%9f%e0%a6%b8%e0%a7%8d-%e0%a6%ab-3/

পরবর্তী পর্বের (৮) লিংক : আসছে