ওলগা তোকারজুক > ফ্লাইটস্ >> ফজল হাসান অনূদিত উপন্যাস [পর্ব ৪]

0
185

পর্ব ৪

[অনুবাদকের কথা : ‘রোগশোকের উপসর্গ’ নোবেল বিজয়ী পোলিশ ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারজুকের ইংরেজিতে ‘ফ্লাইটস্’ উপন্যাসের চতুর্থ চরিত্রচিত্র (ভিনিয়েট) ‘সিনড্রোম’-এর অনুবাদ। অন্যদিকে ‘কৌতূহলের গোপন কুঠরি’ উপন্যাসের পঞ্চম চরিত্রচিত্র ‘কেবিনেট অব কিউরিওসিটিজ্’-এর অনুবাদ। পোলিশ ভাষা থেকে উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন জেনিফার ক্রফ্ট। উল্লেখ্য, ‘ফ্লাইটস্’ উপন্যাসে সর্বমোট এক শ’ ষোলটি চরিত্রচিত্র রয়েছে, যা এক বাক্য থেকে শুরু করে একত্রিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দীর্ঘ।]

চরিত্রচিত্র ৪

রোগশোকের উপসর্গ

সত্যি বলতে কী, আমার ভ্রমণযাত্রার বিভিন্ন ঘটনার বিবরণ আসলে অসুস্থতার উপাখ্যান। আমার মধ্যে এমন একটা রোগের উপসর্গ দেখা দিয়েছে, যা যে-কোনো ‘ক্লিনিক্যাল সিনড্রোম অ্যাটলাস’-এ সহজেই দেখা যায় এবং যা – কোথাও না হলেও মুদ্রিত রচনায় – প্রায়ই ঘটে। এটা বোঝার চেয়ে আরও ভালো হয় যদি আমরা ‘দ্য ক্লিনিকেল সিনড্রোম’ গ্রন্থের পুরনো সংস্করণের দিকে উঁকি দিই (সত্তর দশকে প্রকাশিত হয়েছে), যা রোগশোক উপসর্গের একধরনের বিশ্বকোষ। গ্রন্থটি আমার জন্য অনিঃশেষ উৎসাহের উৎস। এমন কেউ সাহসী আছেন যিনি মানুষকে সম্পূর্ণ বর্ণনা কিংবা পুরোপুরি ব্যাখ্যা করতে পারবেন, সামগ্রিকভাবে এবং সাধারণ ভাবে, উভয় দিক থেকে? ব্যক্তি-ধারণার এমন দৃঢ় প্রত্যয়কে কে প্রয়োগ করবেন? কে আছেন যিনি এটা দিয়ে একধরনের বিশ্বাসী ‘টাইপোলজি’ নির্মাণ করবেন? আমি মনে করি না, কেউ পারবেন। ভ্রমণযাত্রার মানসিক চিন্তা-ভাবনার সঙ্গে রোগের উপসর্গ সম্পূর্ণ মাপসই। উপসর্গ ছোট, সহজে বহনীয়, তত্ত্ব কিংবা উপাখ্যানের ভারে ভারী নয়। উপসর্গ নিয়ে যে-কেউ কোনকিছু ব্যাখ্যা করতে পারেন এবং পরবর্তী কালে তা ছুঁড়ে ফেলে দিতে পারেন। ধারণাশক্তি আসলে ছুঁড়ে ফেলার মতো একটি যন্ত্র।
আমার রোগটাকে বলে ‘রেকারেন্ট ডেটোক্সিফিকেশন সিনড্রোম’। কোনো ঘণ্টা না বাজিয়ে কিংবা আওয়াজ না করে এই রোগ কিছু নির্ধারিত ভাবমূর্তিতে ফিরে আসে এবং কারুর চেতনার প্ররোচনায় ফুটে ওঠে, অথবা এমনকী তাদের জন্য বাধ্য-বাধকতা অনুসন্ধান করে। রোগটি ‘মিন ওয়ার্ল্ড সিনড্রোম’-এর একটি ভিন্ন রূপ, যা নিউরোসাইকোলজিক্যাল গবেষণায় বিশেষ ধরনের সংক্রমণ এবং যা প্রচার ব্যবস্থার দ্বারা সৃষ্ট, এবং মোটামুটিভাবে বিশদ বর্ণনা পাওয়া যায়। এটা রীতিমতো বুর্জোয়া শ্রেণীর অসুখ, আমি মনে করি। রোগীরা দীর্ঘ সময় টিভির সামনে বসে থাকে, রিমোট কন্ট্রোল টিপে অযথা সব চ্যানেল ঘুরে আসে যতক্ষণ না পর্যন্ত তারা সবচেয়ে ভয়ঙ্কর খবর প্রচারের চ্যানেল খুঁজে পায় : যুদ্ধ, মহামারী এবং দুর্যোগ। এর পর তারা যা দেখে, তাই নিয়ে বিমুগ্ধ থাকে, এবং তখন তারা নিজেদেরকে ওইসব ঘটনা থেকে নিজেদের বিচ্ছিন্ন করতে পারে না।
তবে এসব উপসর্গ তেমন বিপজ্জনক নয়। রোগীর স্বাভাবিক জীবন চালিয়ে যাওয়ার পরিবেশ রক্ষা করে চলে যতক্ষণ পর্যন্ত না সে তার আবেগের কাছ থেকে খানিকটা দূরত্ব বজায় রাখে। এই দুর্ভাগ্যজনক রোগের কোনো নিরাময় নেই। যখন স্বকীয় ব্যবহার তাদের বেশ সতর্ক করে দেয়, তখন রোগীরা মনোবিজ্ঞানীর শরণাপন্ন হয়; তাদেরকে স্বাস্থ্যসম্মত জীবনযাপনের কথা বলা হয় – যেমন কফি এবং মদ্যপান করা থেকে বিরত থাকা, আলো-হাওয়ায়-ভরা ঘরে ঘুমানো, বাগান করা, অথবা তাঁত বা সেলাই কাজে ব্যস্ত থাকা।
আমার অস্তিত্বের চারপাশে উপসর্গগুলো আবর্তিত হয়, যা নষ্ট, ত্রুটিপূর্ণ, অপূর্ণ, ভঙ্গুর অবস্থা থেকে উঠে এসেছে। আমি এ সবেই আগ্রহী, যদিও এসব উপসর্গ যে-কোন রূপে রূপান্তরিত হতে পারে, প্রস্তুত পদ্ধতিতে ভুল থাকতে পারে, এমনকী পথ থাকতে পারে রুদ্ধ। তবে যা বিকশিত হওয়ার কথা ছিল, কিছু কারণে তা হয়নি; অথবা উল্টোটাও হতে পারে, তাহলে নিয়তিকে কে অতিরঞ্জিত করেছে? নিয়মমাফিক যা কিছুর বিচ্যুতি ঘটে, হোক না খুব ছোট বা খুব বড়, বাড়-বাড়ন্ত কিংবা অসম্পূর্ণ, তা বেঢপ এবং দারুণ বিরক্তিকর মনে হয়। যেসব আকৃতি পরিমিতি মানে না, যা গাণিতিক নিয়মে বৃদ্ধি পায়, উপচে পড়ে, উন্নতির পথে এগিয়ে যায়, অথবা অন্যদিকে মোড় নেয়, তাদের একক পরিমাপে ফিরিয়ে আনা হয়। পরিসংখ্যান দিয়ে পুঙ্ক্ষানুপুঙ্ক্ষ বিশ্লেষণের ব্যাপারে আমি মোটেও উৎসাহী নই, যা অনেক মানুষ তাদের মুখের ভাবভঙ্গি আর আত্মতৃপ্তির হাসি ফুটিয়ে রেখে উদযাপন করে। অঙ্গ-বিকৃতি সম্পর্কিত অলৌকিক কাহিনি এবং প্রকৃতির উদ্ভট সৃষ্টির প্রতি আমার দুর্বলতা রয়েছে। সাদাসিধাভাবে এবং প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা নিয়ে আমি বিশ্বাস করি যে, প্রকৃতির উদ্ভট সৃষ্টির ফলে অস্তিত্বের উপরের প্রলেপ মুছে যায় এবং ভেতরের সত্যটুকু প্রকাশিত হয়। এটি হঠাৎ উন্মোচিত অপ্রত্যাশিত সাফল্য। বিব্রতকর পরিস্থিতি হচ্ছে সেটাই যখন নিঁখুত সেলাইকরা স্কার্টের অভ্যন্তর থেকে অন্তর্বাস বেরিয়ে আসে। অথবা আকস্মিকভাবে আবির্ভূত মখমলের আসবাবপত্রের ভেতরে লুকানো ধাতুর কঙ্কাল বা গদিওয়ালা হাতলের চেয়ার থেকে বেরিয়ে আসা স্প্রিং- এর সবই ভুলভাবে সমীহ করা থেকে নির্লজ্জভাবে নমনীয় মোহ থেকে আমাদের মুক্ত করে।

চরিত্রচিত্র ৫

কৌতূহলের গোপন কুঠুরি

আমি কখনই শিল্পকলা জাদুঘরের অত্যুৎসাহী সমঝদার নই যে, খুশি মনে কৌতূহলের গোপন কুঠুরির সঙ্গে বিনিময় করতে পারি; যেখানে সংগৃহীত জিনিসপত্র খুবই দুর্লভ, অদ্বিতীয়, অদ্ভূত, খেঁয়ালিপূর্ণ। সচেনতার ছায়ায় এরা বিদ্যমান থাকে এবং যখন কেউ নজরে আনে তখন দ্রুতই এসবের দ্বারা দৃষ্টি-পরিধি সংকুচিত হয়ে যায়। হ্যাঁ, নিশ্চিতভাবে বলতে পারি আমার মধ্যে এই দুঃখজনক উপসর্গ আছে। সংগৃহীত শিল্পকর্মের মাঝখানে রাখার জন্য আমাকে সংগ্রহ করা হয়নি, বরং হাসপাতালের সন্নিকটে কোনো ছোটখাটো জায়গায়, প্রায়শই বেসমেন্টে আমাকে সরিয়ে রাখা হয়। কেননা তারা মনে করে প্রদর্শনের জায়গাটি অনুপযুক্ত আর তারা তাদের আদি সংগ্রহকারীদের প্রশ্নাতীত রুচি সম্পর্কে সন্দিহান। দুই লেঞ্জা বিশিষ্ট স্যালাম্যানড্যার, আয়ত চতুষ্কোণ বৈয়ামের ভেতর মুখ উপরের দিকে, যেন বিচার-দিনের অপেক্ষায় আছে – দুনিয়ার তাবত প্রাণীর অবশেষে একদিন পুনরুত্থান ঘটবে। ফরমালডিহাইডের মধ্যে ডুবে আছে ডলফিনের কিডনি। একটা ভেড়ার মাথার খুলি, যা সম্পূর্ণ বিকৃত, যেখানে আছে দুই জোরা চোখ-কান ও মুখ; দেখতে অনেকটা দ্বৈতসত্তা বিশিষ্ট প্রাচীন দেবতার অবয়বের মতো। এ ছাড়া আছে গুটির উপর কাপড় পরিয়ে সাজানো মনুষ্য-ভ্রুণ এবং পাশে ছোট কাগজে সুন্দর হস্তাক্ষরে ক্যালিগ্রাফিতে লেখা ‘Fetus aethiopis 5 mensium’। বছরের পর বছর ধরে সংগৃহীত প্রকৃতির এইসব উদ্ভট সৃষ্টি, দুই মাথাঅলা কিংবা মুণ্ডহীন, গর্ভস্থ, অলস ভঙ্গিতে ফরমালডিহাইডে ডোবানো। অথবা ‘Cephalothoracopagus monosymetro’-এর কথাই ধরা যাক। এর একটা নমুনা এখনও অব্দি পেনসালভেনিয়ার এক জাদুঘরে প্রদর্শনের জন্য রাখা আছে। সেখানে এমন একটি মানব ভ্রুণের অবয়ব আছে, যার মাথা একটি কিন্তু দেহ দু’টো। এই অবয়বটাকে কেন্দ্র করে যুক্তিবিদ্যার কাঠামো সংক্রান্ত একটা প্রশ্ন তোলা যায় : ১=২। সবশেষে আসি রন্ধন সম্পর্কিত জ্বলজ্যান্ত একটা নমুনার কথায়। ১৮৪৮ সালের কিছু আপেল আর অ্যালকোহলের মধ্যে ডোবানো; প্রতিটি আপেল দেখতে বেঢপ, অস্বাভাবিক আকৃতির। তবে অনেকেই চিনতে পেরেছেন যে, এসব অদ্ভূত সৃষ্টি অমরত্ব লাভের আশায় আছে এবং যা কিছু ব্যতিক্রমধর্মী, তা-ই টিকে থাকবে।
আমি এ ধরনের অনেক বিষয়েরই মুখোমুখি হই এবং তারপরও আমি আমার ভ্রমণযাত্রার ক্রম ও সূচিটা তৈরি করি; ধীরেসুস্থে এবং অবশ্যই, সৃষ্টির ত্রুটি আর ভুলভাল গতিপথ এড়িয়ে।
আমি ট্রেনে বসে লিখতে শিখেছি, এমনকি হোটেলে এবং ওয়েটিং রুমে অপেক্ষার সময়ও লিখতে পারি। উড়োজাহাজের ট্রে-টেবিলে বসেও আমি লিখতে পারি। দুপুরের আহারের সময় আমার কথাগুলোকে টুকে রাখি, টেবিলের নিচে মাথা লুকিয়ে, অথবা স্নানঘরে থেকেও আমি লিখি। আমি জাদুঘরের সিঁড়িতে দাঁড়িয়েও লিখি। এছাড়া ক্যাফেতে ও রাজপথে চলন্ত গাড়িতে বসেও লিখি। আমি ছেঁড়া কাগজে, নোটবুকে, পোস্টকার্ডে, অন্য হাতে, ন্যাপকিনে, এমনকি বইয়ের মার্জিনের ফাঁকে অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত আকারে নানান কথা টুকে রাখি। সাধারণত সেগুলো হয় ছোট ছোট বাক্যে লেখা বিভিন্ন বিষয়ের ক্ষুদ্র প্রতিচ্ছবি। মাঝে মাঝে আমি খবরের কাগজ থেকে নানান ধরনের উদ্ধৃতি টুকে রাখি। অনেক সময় মানুষের ভিড়ের মধ্য থেকে স্বেচ্ছায় একটি অবয়ব বেরিয়ে আসে এবং তখন আমি আমার ভ্রমণসূচি থেকে সরে এসে সেখানে কিছুটা সময় কাটাই। আসলে এটা একটি ভালো পদ্ধতি যা মাধ্যমে আমি নিজেকে অন্য একটা স্তরে উন্নীত করতে পারি। সময় আমার মিত্র হতে গিয়ে বছরের পর বছর কেটে গেছে। অন্য সব নারীদের যা হয় – আমিও সেইভাবে অদৃশ্য হয়েছি, ফিনফিনেও। আমি ভূত-পেত্নীর মতো চারপাশে চলাফেরা করতে পারি, লোকজনের ঘাড়ের উপর থেকে দেখতে পারি, তাদের তর্ক-বিতর্ক শুনতে পারি এবং পিঠের ঝোলার উপর মাথা রেখে ঘুমিয়ে থাকা অথবা নিজেদের মধ্যে আলাপরত লোকজনের উপর নজর রাখতে পারি। আমার উপস্থিতি সম্পর্কে তারা ওয়াকিবহাল নয়। তারা শুধু ঠোঁট নাড়িয়ে শব্দ তৈরি করে, যা আমি হয়তো কিছুদিনের মধ্যে উচ্চারণ করতে যাচ্ছি।

[চলবে]

পূর্ববর্তী পর্বের [পর্ব ৩] লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%93%e0%a6%b2%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%95-%e0%a6%ab%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%9f%e0%a6%b8-%e0%a6%aa%e0%a6%b0/

পরবর্তী পর্বের [৪] লিংক

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%93%e0%a6%b2%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%95-%e0%a6%ab%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%9f%e0%a6%b8%e0%a7%8d-%e0%a6%ab-2/?fbclid=IwAR03v5tI4xm0xZbEZ763d0ua2hhRH3MMT3s9m-gqpfgz0EK2phuBHx1u2c0