ওলগা তোকারজুক > ফ্লাইটস [পর্ব ৩] >> ফজল হাসান অনূদিত

0
235

পর্ব ৩

[অনুবাদকের কথা : ‘দুনিয়ার মধ্যে মস্তিস্ক’ নোবেল বিজয়ী পোলিশ ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারজুকের ইংরেজিতে অনূদিত ‘ফ্লাইটস্’ উপন্যাসের তৃতীয় চরিত্রচিত্র (ভিনিয়েট) ‘ইয়োর হেড ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-এর অনুবাদ। পোলিশ ভাষা থেকে উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন জেনিফার ক্রফ্ট। উল্লেখ্য, ‘ফ্লাইটস্’ উপন্যাসে সর্বমোট এক শ’ ষোলটি চরিত্রচিত্র রয়েছে, যা এক বাক্য থেকে শুরু করে একত্রিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দীর্ঘ।।]

চরিত্রচিত্র ৩
দুনিয়ার মধ্যে মস্তিস্ক

বিশাল এবং হতাশায় জর্জরিত একটা কমিউনিস্ট শহরে আমি মনোবিজ্ঞান পড়াশোনা করেছি। বিল্ডিংয়ের যেখানে আমার ডিপার্টমেন্ট ছিল, সেটা যুদ্ধের সময় এস.এস. ইউনিটের প্রধান কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করা হয়েছিল। সীমাবদ্ধ নির্দিষ্ট এলাকার ধ্বংসাবশেষের উপর গড়ে তোলা হয়েছে শহরের সেই অংশ, যদি ভালো করে পর্যবেক্ষণ করা হয় তাহলে দেখা যাবে, শহরের অন্যান্য জায়গা থেকে নতুন করে গড়ে তোলা পুরো এলাকাটি তিন ফুট উপরে অবস্থিত। তিন ফুট উচ্চতা আসলে দালান-বাড়ির পাথরকুঁচি। সেখানে কখনোই আমি স্বস্তি বোধ করিনি : নতুন কমিউনিস্ট বিল্ডিং এবং দুর্দশাগ্রস্ত চতুষ্কোণের মাঝে সবসময়ই একটা বাতাস বয়ে যায়, যার শৈত্যপ্রবাহ ছিল বিশেষভাবে তিক্ত, মুখমণ্ডলে যেন হূল ফোটাতো। মোদ্দা কথা, সেই জায়গাটি পুনর্গঠন করা হলেও তা এখনো বধ্যভূমি। আমি আজো স্বপ্নে দেখি সেই বিল্ডিং যেখানে আমি ক্লাশ করতাম – প্রশস্ত বারান্দা যা দেখতে কাটা পাথরের মতো লাগে, মানুষের পায়ের চাপে মেঝে মসৃণ; ক্ষয় হয়ে যাওয়া সিঁড়ির প্রান্ত; মানুষের হাতের ঘষায় সিঁড়ির হাতল পিচ্ছিল যেন পালিশ করা; জায়গাটিতে প্রামাণিক সাক্ষী আছে। সেই জন্য হয়তো ভূত আমাদের তাড়িয়ে নিয়ে বেড়াতো।
আমরা যখন ইঁদুরদের গোলকধাঁধার মধ্যে রেখেছি, তখন দেখেছি যে সবসময় একটা ইঁদুরের ব্যবহার তত্ত্বের সঙ্গে সংঘাত সৃষ্টি করেছে। সে আমাদের চতুর অনুমান সম্পর্কে যৎসামান্য যত্নবান হতে পারেনি। ইঁদুরটি পেছনের ছোট পায়ের উপর দাঁড়াবে, আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষার শেষে দেখা যাবে যে, সে পুরস্কার সম্পর্কে মনোযোগহীন; ‘পাভলোভিয়ান কন্ডিশনিং’-এর প্রফুল্লতাকে অবজ্ঞা করেছে, কেবল আমাদের দিকে একবার তাকিয়েছে এবং তারপর ঘুরে দাঁড়িয়েছে, অথবা ঘুরে কোনো কিছু খোঁজার জন্য হেলেদুলে ঢুকে গেছে গোলকধাঁধায়। তারপর পাশের বারান্দায় একটা কিছু খুঁজবে, আমাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার চেষ্টা করবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না নিয়ম ভেঙে মেয়েরা তাকে ভেতর থেকে বের করে আনবে এবং হাতের মুঠোয় ধরে রাখবে, ততক্ষণ সে চিঁ-চিঁ আওয়াজ করবে, পুরোপুরি বিভ্রান্ত।
হাত-পা ছড়ানো একটি মৃত ব্যাঙকে বাঁকানো যেতে পারে এবং হয়তো বৈদ্যুতিক স্পন্দনের সাহায্যে তাকে সোজা করা যাবে, কিন্তু আমাদের পাঠ্যবইতে এখনো বিষয়টি সেভাবে ব্যাখ্যা করা হয়নি – এটা আমাদের জন্য সংকেত, পরিস্কারভাবে মৃত ব্যাঙের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ ভয় ও উপহাসের লক্ষণ, যার জন্য আমাদের ফাঁপা বিশ্বাস সবসময় শারীরিক চেতনার যান্ত্রিক নির্বুদ্ধিতার সঙ্গে সংঘাত তৈরি করে।
ক্লাশে আমাদের পড়ানো হয়েছে যে, বুদ্ধিদীপ্ত প্রশ্নের সহজ উত্তরের মাধ্যমে দুনিয়াকে বর্ণনা করা যেতে পারে এবং ব্যাখ্যা করাও সম্ভব। সেই অস্তিত্বের জন্য দুনিয়া ছিল জড় এবং মৃত, মোটামুটিভাবে সহজ-সরল আইন-কানুন দিয়ে পরিচালিত, যা ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ এবং জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত করা প্রয়োজন – নকশা বা চিত্রের সাহায্য নিয়ে, যদি সম্ভব হয়। আমাদের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার প্রয়োজন ছিল। প্রয়োজন ছিল প্রকল্প প্রণয়ন করা, এমনকি যাচাই-বাছাই করারও দরকার ছিল। আমরা পরিসংখ্যানের রহস্যের ভেতর ডুবে ছিলাম, বিশ্বাস করতে শেখানো হয়েছে যে, এমন একটি পদ্ধতির সঙ্গে আমাদের পরিচয় করিয়ে দেওয়া হবে যা দিয়ে দুনিয়ার সব কাজকেই পুরোপুরি বর্ণনা করতে পারবো – পাঁচ শতাংশ থেকে পঁচানব্বই শতাংশ বেশি তাৎপর্যপূর্ণ।
কিন্তু আমার জানা মতে এখন যদি একটা কিছু থাকে, তাহলে সেটি হলো, মনোবিজ্ঞানের সবটুকু একসঙ্গে খোলসা করা যে কারুরই কর্তব্য। যদি তাই না হয়, তবে তার বদলে শারীরবিজ্ঞান কিংবা ধর্মতত্ত্বের দিকে যাওয়া উচিত, নিদেন পক্ষে তার পাকাপোক্ত খুঁটি থাকবে – হয়তো বস্তুজাগতিক, নতুবা আত্মিক – মনোবিজ্ঞানের পিচ্ছিল পথের পরিবর্তে। পড়াশোনার জন্য মনস্তত্ব অত্যন্ত সূক্ষ বিষয়।
এটা সত্যি হিসেবে প্রতীয়মান হয়েছিল যে, কিছু মানুষ বলেছেন কেউ হয়তো মনোবিজ্ঞান বিষয়ে পড়াশোনা করতে চেয়েছেন, কেননা তিনি একটা চাকরির প্রত্যাশা করতেন, অথবা জানার কৌতূহল মেটানোর জন্য, অথবা অন্যদের সাহায্য করার জন্য। কিন্তু তার পরিবর্তে অন্য একটা অতি সাধারণ কারণ প্রধান হয়ে উঠেছিল। আমি মনে করি, আমাদের সবার ভেতরে এক ধরনের গভীর গোপন দোষ লুকিয়ে আছে, যদিও আমরা নিজেদেরকে বুদ্ধিমান হিসেবে অন্যদের মনে একধরনের অস্পষ্ট ধারণা তৈরি করি, স্বাস্থ্যবান তরুণ সম্প্রদায় – দোষগুলো আড়ালে লুকানো থাকে, ভর্তি পরীক্ষার সময় অত্যন্ত দক্ষতার সঙ্গে আমাদেরকে প্রতারিত করে।
শক্ত করে আটকে রাখা প্যাঁচানো আবেগ ভেঙে যায়, যেমন যেসব অদ্ভূত টিউমার যা কখনো মানবদেহে সৃষ্টি হয় এবং যা স্বসম্মানিত প্যাথোলজিক্যাল অ্যানাটমি- জাদুঘরেই তার সাক্ষাৎ মেলে। যদি আমাদের পরীক্ষকেরা একই ধরনের মানুষ হতেন, তাহলে কে সব নির্ভুল জানতেন? আমাদের নির্বাচন করার সময় তাঁরা কে কি কাজ করেছেন, বুঝতে পারা যেতো। এসব ক্ষেত্রে আমরা সরাসরি তাঁদের উত্তরাধিকারী হতাম। আমাদের দ্বিতীয় বছরে যখন আত্মরক্ষা ব্যবস্থার সংজ্ঞা নিয়ে আলোচনা করেছি এবং জানতে পেরেছি যে, আমাদের মনস্তত্ত্বের সেই একটা অংশের শক্তির জন্য আমরা নিরহঙ্কারী ছিলাম, আমরা বুঝতে শুরু করেছিলাম যে যদি তা যৌক্তিকতা, মহিমান্বিত এবং অস্বীকারের বিষয় না হয় – সবগুলো বিষয় সম্পর্কে আমরা যদি সামান্য কৌশল নিজেরাই অবলম্বন করি – আমরা যদি দুনিয়া যেভাবে আটপৌঢ়ে ছিল, সেভাবেই দেখতে যাই, যদি আমাদের রক্ষা করার মতো কোনো কিছুই না থাকে, তাহলে সততাপরায়ণ এবং মনোবলের দিক থেকে আমাদের হৃদয় ভেঙে যাবে।
আমরা ইউনিভার্সিটিতে যা কিছু শিখেছি, তা আমরা আত্মরক্ষার ঢাল এবং বর্ম দিয়ে নিজেদের সাজিয়েছি, এর ফলে আমরা এমন শহর, যার স্থাপত্য মূলত দেওয়াল, আত্মরক্ষার জন্য ঢিবি, দুর্গ, বাঙ্কারের রাজ্য।
প্রতিটি পরীক্ষা, প্রশ্নপত্র এবং লেখাপড়া নিয়ে আমরা একজন আরেকজনের সঙ্গে আলোচনা করেছি এই কারণে যে, আমরা যখন তৃতীয় বর্ষ অতিক্রম করে যাচ্ছিলাম, তখন আমার একটা নাম ছিল যা আমার ব্যক্তিবৈশিষ্ট্যের সঙ্গে খাপ খায়নি। সেটা ছিল আমার গোপন নাম আবিষ্কার করার মতো, যে-নামটি একজনকে পরিচিত হওয়ার অনুপ্রেরণা যোগায়।
আমি হাতে-কলমে যে শিক্ষা লাভ করেছি, তা বেশি দিন প্রয়োগ করিনি। একবার আমার এক অভিযানের সময়, যখন আমি বড় শহরে আটকা পড়ে গিয়েছিলাম, আমার কাছে কোনো অর্থকড়ি ছিল না এবং বেঁচে থাকার জন্য আমি আয়ার কাজ করেছি, সেইসময় আমি একটা গ্রন্থ রচনা শুরু করেছিলাম। সেই গ্রন্থটি ছিল পর্যটকদের বিভিন্ন গল্প নিয়ে, অর্থাৎ যা রেলগাড়িতে বসে পড়া যায়। এটা হয়তো আমার নিজের পড়ার জন্যই আমি লিখতাম। আয়তনের দিক থেকে সেটি ছিল একটা আস্ত বইয়ের এককামড় নাস্তা খাওয়ার মতো, যে কেউ পুরোটাই এক সঙ্গে গলাধঃকরণ করতে পারে।
আমি মনোনিবেশ করতে সক্ষম হয়েছিলাম এবং কিছু সময়ের জন্য আমার কর্ণযুগল প্রসারিত হয়েছিল, যা তখন বিড়বিড়ানি, প্রতিধ্বনি এবং ফিসফাস শব্দ শুনতে পেত, দেওয়াল বিদীর্ণ করে দূর থেকে ভেসে আসা কন্ঠস্বরও। কিন্তু আমি কখনোই একজন সত্যিকারের লেখক হতে পারিনি। সবসময় জীবন আমাকে কৌশলে পরিহার করেছে। আমি শুধু তার গতিপথের চিহ্ন খুঁজে পেতাম, খোলস রেখে যেত। সেই সময় আমি তার সঠিক স্থান নির্ধারণ করতে পারতাম, কিন্তু ইতোমধ্যে তা অন্য কোথাও চলে গেছে। আমি শুধু তার রেখে যাওয়া নিদর্শনগুলো খুঁজে পেতাম, যা তার উপস্থিতির সাক্ষী বহন করে, পার্কের গাছের গুঁড়ির ওপর এবড়োখেবড়ো আঁকা দাগের মতো, যা একজন পথচারীর উপস্থিতির নিছক চিহ্ন মাত্র। আমার লেখায় জীবন অসমাপ্ত গল্পে পরিনত হয়, স্বপ্নের মতো কাহিনি, দূর থেকে দেখা অদ্ভূত অগোছালো মনোরম দৃশ্যাবলীর মতো, অথবা আড়াআড়ি ভাবে খণ্ডিত – এবং পুরোটা সম্পর্কে কোনো ধরনের উপসংহারে পৌঁছানো ছিল প্রায় অসম্ভব।
যারা কখনো কোনো উপন্যাস লেখার চেষ্টা করেছেন তারা জানেন সেটা কতটুকু দুরূহ কাজ, নিঃসন্দেহে নিজেকে ব্যস্ত রাখার মন্দ উপায়ের মধ্যে একটি। সব সময় নিজের মধ্যে ডুবে থাকতে হয়, নির্জন চৌহদ্দিতে। এটা একধরনের নিয়ন্ত্রিত মনস্তত্ত্ব, অনিদ্রায় কাজ করার ঘোর-লাগা হাতকড়া, সম্পূর্ণ অনুপস্থিত কর্মতৎপরতা এবং জানালার খড়খড়ির মতো মুখোশের অভাব সাধারণত আমরা একসঙ্গে মিশিয়ে ফেলতাম, কসাইয়ের গায়ের অ্যাপ্রোন এবং রবারের বুটজুতা পড়াতাম, হাতে থাকতো নাড়িভুড়ি বের করার ছুড়ি। সেই নির্জন কক্ষ থেকে শুধু পথচারীদের গোড়ালির খটখট শব্দ শোনা যায়। যতবার কেউ থেমে বাঁকা হয়ে নিচু হয়েছে এবং জানালা গলিয়ে তাকিয়েছে, তখন ক্ষণিকের জন্য একজন মানুষের মুখচ্ছবি দেখতে পাওয়া যায়, এমনকি কিঞ্চিৎ কথাবার্তা হয়তো আদান-প্রদান করা হয়। কিন্তু শেষপর্যন্ত মন নিজেকে নিয়ে এমন ব্যস্ত থাকে যে, নিজেরাই নিজেদের জন্য তাড়াহুড়া করে ক্ষণিকের কৌতূহল দেখাতে নাটক মঞ্চস্থ করে, যেখানে লেখক এবং চরিত্র, অধিবক্তা এবং পাঠক, যাকে বর্ণনা করা হচ্ছে বা হয়েছে, তার পা, জুতা, গোড়ালি এবং মুখ, আগে বা পরে, সেই নাটকের নিছক অংশবিশেষ।
এই অদ্ভূত পেশার প্রতি আগ্রহ জন্মানোর জন্য আমি মোটেও অনুতপ্ত নই : আমি একজন ভালো মনোবিজ্ঞানী হতে পারতাম না। আমি কখনোই শিখিনি কেমন করে ব্যাখ্যা করতে হয়, কিভাবে একজনের চিন্তা-চেতনার গভীর থেকে পারিবারিক ছবি তুলে আনতে হয়। এছাড়া অন্যদের স্বীকারোক্তি সবসময় আমাকে বিরক্ত করে না, যদিও মেনে নিতে কষ্ট হয়। তবে সত্যি বলতে কি, মাঝেমধ্যে এমন অবস্থার উদ্ভব ঘটে যে, আমার ইচ্ছে হয় আমি সম্পর্ক উল্টে ফেলি এবং তাদেরকে নিজের সম্বন্ধে বলা শুরু করি। অকস্মাৎ রোগীর জামার স্লিভ ধরে এবং কথার মাঝখানে বাঁধা দিয়ে নিজেকে আমার জন্য বাঁচাতে হয় : ‘তোমাকে আমি বিশ্বাস করতে পারি না! আমার প্রতিক্রিয়া সম্পূর্ণ আলাদা! ঠিক আছে, এইমাত্র আমি যে স্বপ্ন দেখলাম, তুমি তা বিশ্বাস করবে না!’ অথবা : ‘নিদ্রাহীনতা সম্পর্কে আপনি কী জানেন, জনাব? এবং আপনি কী তাকে আকস্মিক উদ্বেগের আক্রমণ বলবেন? সত্যি, আপনি মশকরা করছেন। বেশিদিন আগের কথা নয়, এমন আকস্মিক উদ্বেগের আক্রমণে আমি আক্রান্ত হয়েছিলাম, অন্যদিকে…’
আমি জানতাম না কেমন করে শ্রবণ করতে হয়। আমি সীমানা লক্ষ্য করতাম না; স্বচ্ছতার ফাঁক গলিয়ে বেরিয়ে যেতাম। আমি পরিসংখ্যান বিশ্বাস করিনি অথবা তত্ত্ব যাচাই করিনি। এক ব্যক্তিত্বকে অন্য একজনের সঙ্গে মিলিয়ে ফেলায় আমাকে সে অতি ক্ষুদ্রবাদী মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করে। স্বচ্ছ জিনিস অস্পষ্ট দেখার এবং অখণ্ডনীয় যুক্তিতর্ক সম্বন্ধে প্রশ্ন করার বাতিক আছে আমার – এটা আমার অভ্যাস, বিপদাপন্ন মানসিক যোগসাধনা, অভ্যন্তরীণ সূক্ষ অনুভূতি উপলব্ধি করার অভিজ্ঞতা বলা যায়। আমি সন্দেহজনক প্রতিটি বিবেচনাকে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবো এবং নিজের মধ্যে রাখবো যতক্ষণ পর্যন্ত না আমি যা আশা করি, তা নির্ধারণ করি: একটাও সঠিক ছিল না, সবগুলো ছিল নকল, বাতিলযোগ্য। আমি চাইনি নির্ধারিত মতামত, যা কেবল বাড়তি বোঝার মতো হয়ে দাঁড়ায়। বিতর্কে আমি একসময় একদিকে এবং আরেক সময় অন্যদিকে – যা আমাকে কখনোই সঙ্গীদের কাছে প্রিয়ভাজন করেনি। আমি আমার মনের ভেতর সংঘটিত একটা অদ্ভূত অনুভূতির সাক্ষী : তর্কের জন্য আমি যতই যুক্তি খুঁজে পাই, ততই আমার মধ্যে বিপরীত যুক্তি এসে উপস্থিত হয় এবং আমি আত্মপক্ষের সেসব যুক্তির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে পড়ি, বিপরীত যুক্তি যতই লোভনীয় হোক না কেন।
আমার নিজের কাছেই যখন সেইসব পরীক্ষাগুলো কঠিন মনে হতো, তখন আমি কেমন করে অন্যদের মূল্যায়ন করবো? ব্যক্তিত্বের নির্ধারণ, সমীক্ষা, পছন্দমাফিক একাধিক প্রশ্নের একাধিক শাখা আমার কাছে ভীষণ কঠিন মনে হতো। শুরু থেকে আমার এই খামতি সম্পর্কে আমি ওয়াকিহাল ছিলাম, যার কারণে আমি ইউনিভার্সিটিতে, যখনই আমরা অনুশীলন করার সুবাদে একজন আরেকজনকে বিশ্লেষণ করতাম, সব উত্তর এলোমেলো ভাবে দিতাম, কপালে যা-ই থাকুক না কেন। আমি শক্তিশালী ব্যক্তিত্বের ভাব নিতাম – সমপদস্থ অক্ষের রেখাচিত্র তৈরি করতাম। ‘আপনি কী বিশ্বাস করেন যে, সেটি হচ্ছে সবচেয়ে ভালো সিদ্ধান্ত, যা সহজে পরিবর্তন করা যায়?’ আমি কী বিশ্বাস করি? কোন ধরনের সিদ্ধান্ত? পরিবর্তন? কখন? কেমন করে সহজ? ‘আপনি যখন কোনো ঘরের মধ্য দিয়ে হেঁটে যান, তখন কী মাঝখানে বা প্রান্তের দিকে মাথা ঝুকে থাকেন?’ কোন ঘর? এবং কখন? ঘরটি কী খালি ছিল, নাকি সেখানে গাঢ় লাল রঙের আসন ছিল? জানালার অবস্থা কেমন ছিল? সেই জানালা গলিয়ে কোন ধরনের দৃশ্য দেখা যেত? বই নিয়ে প্রশ্ন : আমি কী পার্টিতে যাওয়ার বদলে একটা বই পড়বো, অথবা এটাও কী নির্ভর করে কোন ধরনের বই এবং কোন ধরনের পার্টিতে যাবো আমি?
কি আশ্চর্য্যজনক পদ্ধতি! এটা নীরবে ধারণা করা যায় যে, লোকজন নিজেদেরকে চেনে না, কিন্তু কেউ যদি প্রশ্ন করে তাদের উজ্জীবিত করে যা যথেষ্ট বুদ্ধিদীপ্ত, তাহলে তারা নিজেদেরকে খুঁজে নিতে পারবে। তারা নিজেদেরপ্রশ্ন করবে এবং তারাই সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে। এবং তারা অনবধানবশত নিজেদের কাছে প্রকাশ করবে যে, গোপন বিষয় সম্পর্কে তারা এখন পর্যন্ত কিছুই জানে না।
এছাড়া অন্য সব অনুমান, যা ভয়ঙ্কর বিপদজ্জনক – যেমন আমরা অপরিবর্তনশীল, এবং আগেভাগেই আমাদের প্রতিক্রিয়া সম্পর্কে ভবিষদ্বাণী করা যেতে পারে।
[চলবে]
পূর্ববর্তী পর্বটি (পর্ব ২) পড়ার জন্য নিচের লিংকে ক্লিক করুন

http://www.teerandaz.com/%e0%a6%93%e0%a6%b2%e0%a6%97%e0%a6%be-%e0%a6%a4%e0%a7%8b%e0%a6%95%e0%a6%be%e0%a6%b0%e0%a6%9c%e0%a7%81%e0%a6%95-%e0%a6%ab%e0%a7%8d%e0%a6%b2%e0%a6%be%e0%a6%87%e0%a6%9f%e0%a6%b8-%e0%a6%ab%e0%a6%9c/