ওলগা তোকারজুক > ফ্লাইটস >> ফজল হাসান অনূদিত উপন্যাস [পর্ব ২]

0
285

চরিত্রচিত্র ২ >> মাথার ভেতরের দুনিয়া

[অনুবাদকের কথা : ‘মাথার ভেতরের দুনিয়া’ নোবেল বিজয়ী পোলিশ ঔপন্যাসিক ওলগা তোকারজুকের ইংরেজিতে ‘ফ্লাইটস্’ উপন্যাসের দ্বিতীয় চরিত্রচিত্র (ভিনিয়েট) ‘দ্য ওয়ার্ল্ড ইন ইয়োর হেড-এর অনুবাদ। পোলিশ ভাষা থেকে উপন্যাসটি ইংরেজিতে অনুবাদ করেছেন জেনিফার ক্রফ্ট। উল্লেখ্য, ‘ফ্লাইটস্’ উপন্যাসে সর্বমোট এক শ’ষোলটি চরিত্রচিত্র রয়েছে, যা এক বাক্য থেকে শুরু করে একত্রিশ পৃষ্ঠা পর্যন্ত দীর্ঘ।]
আমার প্রথম ভ্রমণ ছিল প্রান্তর পেরিয়ে, পায়ে হেঁটে। আমার সেই চলে যাওয়ার বিষয়টি জানতে তাদের অনেক সময় লেগেছিল এবং ততক্ষণে আমি আমাদের মাঝে অনেকটা দূরত্ব তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিলাম। আমি পুরোটা বাগান অতিক্রম করেছিলাম এবং এমনকি – ধূলিমাখা রাস্তা পেরিয়েছি, কখনো ভূট্টার ক্ষেত এবং স্যাঁতস্যাঁতে তৃণভূমি, যেখানে ঘাসফুল ফুটেছিল – খানাখন্দ দিয়ে জায়গাটি চৌকোণার মতো আকৃতি সৃষ্টি করেছিল, তা পেরিয়ে অবশেষে নদীর কাছে পৌঁছেছিলাম। যদিও উপত্যকার সবখানেই নদী বিদ্যমান ছিল, কিন্তু মৃত্তিকার অভ্যন্তরে প্রবাহিত হয়ে জমিনকে সিক্ত করে এগিয়ে চলতো।
বাঁধের উপরে উঠে আমি তরঙ্গিত ফিতার একটা সড়ক দেখতে পেয়েছিলাম এবং সেই সড়ক আমার দৃষ্টির আড়ালে চলে গিয়েছে, হয়তো পৃথিবীর সীমানার বাইরে কোথাও। কেউ যদি ভাগ্যবান হয়, তাহলে সম্ভবত সেখানে নৌকা দেখতে পাবে – সেই ধরনের বিশাল আকৃতির সমতল নৌকা, যা নদীর উভয় দিকেই যাতায়াত করতে পারে। সেসব নৌকা নদীর কূল সম্পর্কে উদাসীন, এমনকি গাছপালা এবং বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে থাকা মানুষেদের উপেক্ষা করে আপন গতিতে ভেসে চলে, অনির্ভরশীল নির্দেশক, বোধহয় মন্তব্য করা সমুচিন নয়, শুধুমাত্র নৌকার নিজস্ব গতি উপভোগ করার জন্য সবাই নীরব দর্শক মাত্র, যা দেখতে অপূর্ব। বড় হয়ে আমি সেই ধরনের একটা নৌকায় কাজ করার স্বপ্ন দেখতাম – এমনকি আরো ভালো হয় যদি আমি নিজেই সেই ধরনের একটা নৌকা হয়ে যাই।
নদীটি বড় ছিল না। নাম ওডার নদী। কিন্তু তখন আমিও তো ছোট ছিলাম। নদীর শ্রেনীবিন্যাস অনুসারে নদীটি ছোটই ছিল, যা আমি পরবর্তীতে মানচিত্র দেখে জেনেছি। তবে বর্তমানে নদীটি আমাজনের রানীর দরবারে একধরনের গ্রামীন শেরিফের মতোই লাগে। কিন্তু তারপরও ওডার নদী আমার কাছে অনেক বেশি প্রিয় ছিল। আমার চোখে সে ছিল বিশাল। আপন ইচ্ছায় বয়ে যেত এবং মূলত বাঁধাহীন। তবে বন্যাপ্রবণ এবং অনিশ্চিত। মাঝেমধ্যে তীরঘেঁষা কিছু একটার সঙ্গে বহমান নদী বাঁধা পেত এবং তখন ঘূর্ণাবর্ত তৈরি করতো। তারপরও নদীর গতি ছিল অবিচল এবং তার অভীষ্ট লক্ষ্য ছিল উল্টোদিকের দিগন্তে লুকিয়ে থাকা সংকল্পের দিকে প্রবাহিত হওয়া। দৃষ্টি কেবল পানির উপর সীমাবদ্ধ থাকতো না, বরং একসময় দিগন্ত পেরিয়ে দূরে কোথাও হারিয়ে যেত এবং তখন ভারসাম্য হারিয়ে ফেলত।
নদী অবশ্য আমার প্রতি কখনোই কোনো মনোযোগ দেয়নি। সে ছিল তার নিজের প্রতি যত্নবান, যা পরিবর্তনশীল এবং তার পানি ছিল অস্থির স্বভাবের। অনেক পরে আমি জানতে পেরেছিলাম যে, সেই পানিতে কেউ দু’বার পা ভেজাতে পারেনি।
নৌকার ওজন বহন করার জন্য প্রত্যেক বছর নদী চড়া মূল্য ধার্য্য করতো – কারণ প্রতিবছরই কেউ না কেউ তার বুকে ডুবে মারা যেত, হয়তো গ্রীষ্মকালে কোনো এক গরমের দিনে গোসল করার সময় কোনো শিশু কিংবা রেলিং থাকা সত্ত্বেও পুলের উপর দাঁড়ানো কোনো মাতাল, যে বিনা কারণে নিচে পড়ে যেত। ডুবে যাওয়া লোকজনদের উদ্ধার কাজটি সবসময়ই খুব ঘটা করে হতো। তখন জনগণ উৎকন্ঠায় থাকত এবং দম বন্ধ করা অবস্থায় অপেক্ষা করতো। উদ্ধার কাজের জন্য ডুবুরি এবং সেনাবাহিনীর নৌকা আনা হতো। মুরুব্বীদের আলাপকালে আমি আড়ি পেতে শুনেছি যে, উদ্ধার করা দেহগুলো ছিল ফোলা এবং ফ্যাকাশে – পানি তাদের জীবন কেড়ে নিয়েছে এবং তাদের মুখাবয়বের বৈশিষ্ট্য এমনভাবে বদলে দিয়েছে যে, মৃতদেহ সনাক্ত করতে নিকট আত্মীয়-স্বজনদের রীতিমতো হিমশিম খেতে হতো।
বাঁধের উপর দাঁড়িয়ে এবং স্রোতের দিকে তাকিয়ে আমি বুঝতে পেরেছিলাম – সব ধরনের ঝুকি থাকা সত্ত্বেও স্থবির কোনো কিছুর চেয়ে গতিশীল কিছু একটা সবসময়ই ভালো : কোনো কিছুর পরিবর্তন স্থায়ীত্বের চেয়ে সবর্দা উত্তম এবং আভিজাত্যপূর্ণ হয়। যা কিছু স্থির হয়ে থাকে, একসময় তার ক্ষয় হবে এবং পচে যাবে। অন্যদিকে যা কিছু গতিময়, তা অনন্তকাল স্থায়ী হওয়ার যোগ্যতা রাখে। সেই থেকে নদী আমার কাছে একটা সুঁইয়ের মতো, যা আমার ফেলে আসা নিরাপদ ও স্থিতিশীল পারিপার্শ্বিকতা, বাগানের চতুর্দিকের দৃশ্যপট, গ্রিনহাউজের ভেতর সারিবদ্ধভাবে ফলানো করুণ শাকসবজি, ফুটপাতের উপর কংক্রিটের ফলক – যেখানে আমরা এক্কাদোক্কা খেলতাম – সব কিছুকেই বিদ্ধ করেছে। পুরো সুঁই ঢুকে গিয়ে খাঁড়াভাবে একটা তৃতীয় মাত্রা তৈরি করেছিল। তা এতটাই বিদ্ধ হয়েছিল যে, আমার শৈশবের দৃশ্যপট রূপান্তরিত হয়েছিল রাবারের খেলনায়, তার চেয়ে বেশি কিছু নয়, যার ভেতর থেকে যে-কোনো সময় ফুস করে বাতাস বেরিয়ে যেতে পারে।
আমার বাবা-মায়ের মধ্যে কোথাও সম্পূর্ণ স্থায়ীভাবে বসতি গড়ার ইচ্ছে ছিল না। তারা একজায়গা থেকে অন্য জায়গায় থেকেছেন, সময়ে এবং অসময়ে, যতদিন না তারা গ্রামের এক স্কুলের কাছে দীর্ঘ সময়ের জন্য বসতি গড়েছিলেন এবং জায়গাটি ছিল উপযুক্ত রাস্তা এবং ট্রেন স্টেশন থেকে যোজন দূরে। তখন তারা অকর্ষিত ক্ষেতের মাঝে আলপথ ধরে কাছাকাছি ছোট শহরে যেতেন, বাজার-সওদা করতেন এবং জেলা অফিসে গিয়ে পূরণ করা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দিতেন। প্রধান এলাকায় অবস্থিত টাউন হলের পাশের দোকানে নাপিতদের গায়ে সবসময় একই অ্যাপ্রোন থাকতো, যা পরিস্কার করা ছিল বৃথা। কেননা ব্লিচ করে ধোওয়ার পরেও খদ্দেরদের চুল রঙ করার দাগ লেগে থাকতো, অনেকটা চীনা অক্ষরের মতো। আমার মা তার চুল রঙ করাতেন এবং সেই সময়টুকু বাবা নিউ ক্যাফের বাইরে রাখা দু’টো টেবিলের একটাতে বসে অপেক্ষা করতেন। কখনো সেখানে তিনি স্থানীয় খবরের কাগজ পড়তেন, যার সবচেয়ে আকর্ষণীয় বিভাগ ছিল পুলিশ রিপোর্ট। দোকান থেকে শশা এবং জ্যামের কৌটা চুরি যাওয়ার চমকপ্রদ সব সংবাদে ভরা থাকতো সেসব রিপোর্ট।
আর তারপর আসতো অবকাশ, তাদের উৎকন্ঠিত ঘোরাঘুরি, গালমন্দ করতে করতে স্কোডা সাজানো-গুছানো হতো, অপেক্ষা করতে হতো সেই সময়ের জন্য, যখন লাঙল ও নিড়ানি দিয়ে পুনরায় চাষাবাদ শুরু করা যেতে পারে। সেই মুহূর্ত থেকে সময় তাদের সবটুকু কেড়ে নিত, সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত।
বাবা-মায়ের যুগে মোটর-বাড়ির প্রচলন ছিল। তারা যেখানেই ভ্রমণ করতেন, সঙ্গে করে মোটর-বাড়ির পেছনে একটা পুরো সংসার বয়ে নিয়ে যেতেন। সেখানে থাকতো গ্যাসের চুলা, ভাঁজ করা ছোট টেবিল এবং কয়েকটা চেয়ার, ভেজা কাপড় ঝুলিয়ে রৌদ্রে শুকানোর জন্য প্লাস্টিকের দড়ি ও গুটিকয়েক কাঠের আংটা। এছাড়া আরো থাকতো ওয়াটারপ্রুফ টেবিলক্লথ, পিকনিকের সমস্ত সরঞ্জাম- যেমন প্লাস্টিকের রঙিন থালা, গ্লাস, হাড়ি-পাতিল, নুন ও গোলমরিচের শিশি এবং গ্লাস।
পথের মাঝে কোথাও থেমে একটা খোলা বাজার থেকে, একসময় যেখানে যেতে বাবা-মা ভীষণ পছন্দ করতেন (অবশ্য এখন তারা আর তেমন আগ্রহী নন। উদাহরণ হিসাবে বলা যায়, তারা গির্জা বা অন্য কোনো স্মৃতিস্তম্ভের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেদের ছবি তুলতে উৎসাহ বোধ করেন না), বাবা একটা কেটলি কিনেছিলেন। এই ধরনের কেটলি সৈনিকদের জন্য ব্যবহার করা হতো। এছাড়া একটা পিতলের যন্ত্র এবং একটা পাত্র, যার ভেতর নল লাগানো ছিল এবং সেই নলের ভেতর দিয়ে তরল পদার্থ ঢেলে আগুন জ্বালিয়ে পানি গরম করা হতো। যদিও ক্যাম্পের জায়গায় বিদ্যুৎ ছিল, তারপরও বাবা ধূমায়িত পাত্রে পানি গরম করতেন। অনেক সময় তিনি গরম কেটলির কাছে হাঁটু গেড়ে বসে গর্বিত ভঙ্গিমায় ফুটন্ত পানির টগবগ আওয়াজ শুনতেন, তারপর একসময় তিনি আমাদের চায়ের ব্যাগের উপর ফুটন্ত পানি ঢেলে দিতেন – একজন সত্যিকারের যাযাবর।
ক্যাম্প এলাকার নির্দিষ্ট জায়গায় বাবা-মা তাঁবু গেড়ে থাকার ব্যবস্থা করতেন। সেখানে তাদের মতো লোকজনের সঙ্গে সবসময় নিবিড় সখ্য ছিল। আশেপাশের প্রতিবেশীদের সঙ্গে, যারা রৌদ্রে শুকানোর জন্য তাঁবুর দড়ির উপর ঝুলিয়ে রাখতো ভেজা মোজা, প্রাণবন্ত গপসপ করতেন। এসব ভ্রমণের কর্মসূচি নির্ধারণ করা হতো গাইড বইয়ের সাহায্য নিয়ে এবং আকর্ষণীয় নিদর্শনগুলি বাছাই করা হতো অত্যন্ত যত্ন সহকারে। দৈনন্দিন কর্মকাণ্ডের মধ্যে থাকতো সকালে সমুদ্র কিংবা নদীতে সাঁতার কাটা, বিকেলে শহরের ইতিহাস ও ঐতিহ্য দেখতে যাওয়া এবং তারপর রাতের আহার করা। তবে বেশিরভাগ রাতে তারা কাঁচের বোয়েম থেকে প্রোসেক করা খাবার খেতেন, যেমন গুল্যাশ এবং টমেটোর সসের মধ্যে ডোবানো মাংসের গোল্লা। কখনোবা পাস্তা তৈরি করতেন, আবার অন্য সময় ভাত রাঁধতেন। সবসময় তারা খরচ কমানোর চেষ্টা করতেন, কেননা তখন পোলিশ মুদ্রা ছিল বেশ দুর্বল এবং বিশ্বের মুদ্রাবাজারেও ধ্বস নেমেছিল। সেই সময় যেসব জায়গায় বিদ্যুৎ ছিল, তারা সেগুলো খুঁজে বের করতেন এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও সেখানে আবার তাঁবু টাঙিয়ে বাস করতেন। তবে সেসব ভ্রমণ ছিল আসল বাড়ির আধিভৌমিক গোলাবৃত্তির মধ্যেই। সত্যিকার অর্থে বাবা-মা ভ্রমণবিলাসী ছিলেন না, বরং আপন ঘরে ফিরে আসার জন্যই তারা ঘুরে বেড়াতেন। তারা আপন নিবাসে ফিরে এসে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলতেন, দায়িত্বপূর্ণ কাজগুলি সম্পাদন করার জন্য। আলমারীর দেরাজের ভেতর স্তূপ করে রাখা চিঠি এবং বিল সংগ্রহ করার জন্য তারা ঘরে ফিরতেন, এমনকি ময়লা কাপড়চোপড় ধোওয়ার জন্যও ফিরে যেতেন। তারা বন্ধু-বান্ধবদের ছবি দেখিয়ে মৃত্যুর কথা স্মরণ করাতেন এবং তখন সবাই দীর্ঘশ্বাস লুকোনোর চেষ্টা করতেন। কারক্যাওনে এরকমই ছিল আমাদের অবস্থা। এর নেপথ্যে রয়েছে অ্যাক্রোপ্যালিস, নগরদূর্গ।
তারপর ফি-বছর তারা স্বাভাবিক জীবনযাপন করেন, আগের রাতের ফেলে রাখা অসমাপ্ত কাজগুলো পরদিন সকালে শেষ করতেন, তাদের জামাকাপড়ের মধ্যে নিজেদের বাড়িঘরের একধরনের সুবাস লেগে থাকতো, মেঝের উপর বিছানো গালিচায় তাদের ক্লান্ত পায়ের চিহ্ন একটা অদৃশ্য পথের সৃষ্টি করতো।
সেই যে জীবন, আমার জন্য ছিল না। স্পষ্ট করে বলতে পারি, আমার মধ্যে সেই ধরনের জিনের উপস্থিতি নেই, যারা কোনো একটা নির্দিষ্ট জায়গায় দীর্ঘ সময় অবস্থান করে এবং সেখানে তাদের শেকড় গজাতে থাকে; আমি তাদের মতো নই। আমি অনেকবার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার শেকড় কখনোই গভীরে পৌঁছুতে পারেনি; যেকোনো সময় হালকা বাতাস এসে আমার শেকড় উপড়ে ফেলতে পারে। আমি জানি না, কেমন করে অঙ্কুরিত হতে হয়। শাক-সবজির মতো আমার সেই ক্ষমতা নেই। আমি মৃত্তিকা থেকে পুষ্টি সংগ্রহ করতে পারি না, আমি অ্যান্টি-অ্যান্টিয়ুস, অর্থাৎ গ্রিক উপাখ্যানের অ্যান্টিয়ুসের বিপরীত চরিত্রের মানুষ। চলাফেরার মাধ্যমে আমি শক্তি অর্জন করি – যেমন বাসের ঝাঁকুনি, উড়োজাহাজের গড়গড় আওয়াজ এবং ট্রেন ও ফেরির দুলুনি আমাকে প্রাণবন্ত করে তোলে।
আমার দেহের গড়ন সুঠাম। আমি ছিমছাম মেদহীন। আমার পেট আঁটসাঁট, ছোট, খাদ্য-চাহিদা নেই। আমার ফুসফুস এবং কাঁধ মজবুত। আমি কোনো প্রেসক্রিপশন অনুসরণ করি না – এমনকি বড়িও খাই না – এবং আমি চশমা পড়ি না। আমি ক্লিপার দিয়ে চুল কাটি – প্রতি তিনমাসে একবার এবং আমি কোনো সাজগোজ করি না। আমার দাঁতগুলো স্বাস্থ্যবান, তবে বোধহয় সামান্য অসমান, কিন্তু অক্ষত এবং আমার একটামাত্র দাঁত ভরাট করা হয়েছে, আমার বিশ্বাস ওটা নিচের পাটির বাম দিকের দাঁত। আমার যকৃতের কার্যকলাপ স্বাভাবিক নিয়মে চলে। অগ্নাশয়ও তাই। আমার ডান এবং বাম উভয় মুত্রগ্রন্থি ভালো অবস্থানে আছে। আমার পেটের যন্ত্রপাতি স্বাভাবিক ভাবে চলে। মুত্রাশয় দারুণ কাজ করে। হিমোগ্লোবিন ১২.৭। রক্তের শ্বেত কণিকা ৪.৫। রক্তের লোহিত কণিকা ১.৬। অণুচক্রিকা ২২৮। কোলেস্টেরল ২০৪। ক্রিয়েটিনাইন ১.০। বিলিরুবিন ৪.২। এই ধরনের অনেক কিছুই এরকম। আমার আইকিউ – যদি সেই ধরনের কিছু কারোর থাকে – ১২১; এটা উত্তীর্ণ হওয়ার মতোই। আমার সূক্ষ যুক্তিগুলো বিশেষভাবে পরিপক্ক, অনেকটা প্রখর স্মৃতিশক্তির মতো, যদিও আমার অন্যান্য বৈশিষ্ট্যে কিছু খামতি আছে। আমার ব্যক্তিত্ব অস্থির অথবা সম্পূর্ণ বিশ্বাসযোগ্য নয়। বয়স হলো মনের মধ্যে। লিঙ্গ ব্যাকরণ সম্মত। আমি আসলে আমার জন্য পেপারব্যাকে ছাপানো বই কিনি, কারণ পড়া শেষ হলে কোনো ধরনের অনুশোচনা ছাড়াই স্টেশনের প্ল্যাটফর্মে অনায়াসে ফেলে আসতে পারি, যাতে অন্য কেউ খুঁজে পেতে পারে। আমি আমার সংগ্রহে কিছুই জমিয়ে রাখি না।
আমি আমার ডিগ্রি শেষ করেছি, কিন্তু কখনোই কোনো একটা নির্দিষ্ট বিষয়ে পারঙ্গমতা অর্জন করতে পারিনি, যার জন্য এখন আমি অনুতপ্ত; আমার বড় আব্বা ছিলেন তাঁতি, তিনি ব্লিচ করা বোনা কাপড় শুকানোর জন্য পাহাড়ের ঢালুতে কড়া রোদে মেলে দিতেন। শুকনো কাপড় ভাঁজ করার জন্য আমি ছিলাম সবচেয়ে উপযুক্ত, কিন্তু বহন করার মতো কোনো অস্থায়ী তাঁত ছিল না। আসলে বুননের কাজ উপজাতীয়দের জন্য একধরনের ধৈর্য্যশীল শিল্প। আমি যখন ভ্রমণে থাকি, তখন সেলাই করি। দুঃখজনক হলেও সত্যি যে, সাম্প্রতিক কালে অনেক বিমান কোম্পানি সেলাইয়ের সুঁই এবং কুরুশকাঠি বিমানে বহন করতে দেয় না। আমি কখনোই শিখিনি, যেমন এখন বলছি, বিশেষ কোনো কাজের ধরন, এবং তা সত্ত্বেও আমার বাবা-মা সবসময়ই আমাকে বলতেন, জীবন চলার পথে, বিভিন্ন ধরনের যেই কাজই করি না কেন, নিজেকে যেন না হারাই, বরং ভাসমান রাখি।
দীর্ঘ বারো বছর পরীক্ষা-নিরীক্ষার পরে আমার বাবা-মা যখন শহরে ফিরে যান, অবশেষে যখন তারা খরা এবং তুষারপাত, সমস্ত শীতের সময় বন্ধ ভাঁড়ারে জমানো স্বাস্থ্যকর খাবার, তাদের নিজেদের ভেড়ার পশম থেকে উল দিয়ে তৈরি লেপ ও বালিশ নিয়ে ক্লান্ত-অবসন্ন, তখন তারা আমাকে সামান্য অর্থকড়ি দিয়েছিলেন এবং আমি আমার প্রথম ভ্রমণে বের হয়েছিলাম।
আমি যেখানেই গিয়েছি, সেখানে টুকটাক কাজ করেছি। বিশাল এক নগরীর উপকন্ঠে অবস্থিত একটি আন্তর্জাতিক কারখানায় আমি বিলাসবহুল প্রমোদতরীর অ্যান্টিনা লাগানোর কাজ করতাম। সেখানে আমার মতো আরো অনেকেই ছিল। আমাদের সামান্য বেতন দেওয়া হতো। আমরা কখনোই একজন আরেকজনকে কোনো প্রশ্ন করিনি – কে কোথা থেকে এসেছি এবং কী আমাদের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। প্রত্যেক শুক্রবার আমরা বেতন পেতাম এবং যারা আগামীতে কাজ করতে চাইতো না, তারা পরের সোমবার থেকে আসতো না। আমাদের মধ্যে অনেকেই স্কুল পাশ করা ছাত্র-ছাত্রী ছিল, যারা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার আগে ছুটির সময় কাজ করতো। অভিবাসীরা এখনো সেই আকাঙ্ক্ষিত পথে চলে, তাদের বিশ্বাস পশ্চিমের কোথাও কোনো আদর্শ দেশ আছে যেখানে সবাই ভাই ও বোনের মতো বাস করে এবং একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র আছে যেখানে সরকার অভিভাবকের ভূমিকা পালন করে; তাদের দেখভাল করে যারা নিজেদের পরিবার-পরিজনের কাছ থেকে – স্বামী বা স্ত্রীদের, পিতা-মাতা থেকে পালিয়ে থাকে; যাদের মনে প্রেম-ভালোবাসার বদলে অশান্তি, যারা বিভ্রান্ত, হতাশায় নিমজ্জিত, যাদের কখনো কোনো অভিযোগ ছিল না। যারা ঋণ পরিশোধ করতে পারে না, তারা ধরা পরার ভয়ে আইনের চোখ ফাঁকি দিয়ে পালিয়ে বেড়ায়। তারপর থেকে তারা উদ্দেশ্যহীন পথচারী, ভবঘুরে। পাগলের মতো অনেক অসুস্থ লোকজন হাসপাতাল থেকে ফিরে যেত, কিন্তু পরবর্তী কালে যারা পুনরায় অসুস্থ হতো, তখন তাদেরকে অদ্ভূত আইনি নিয়ম-কানুনের জন্যে সেখান থেকে উৎখাত করে জোরপূর্বক নিজেদের দেশে পাঠিয়ে দিত।
সেখানে মাত্র একজন লোকের স্থায়ী চাকুরী ছিল। তিনি একজন ভারতীয়, যিনি অনেকদিন ধরে কাজ করছিলেন, যদিও বাস্তবে তার অবস্থা আমাদের চেয়ে কোনো অংশেই ভালো ছিল না। তার বীমা কিংবা বেতনসহ কোনো ছুটি ছিল না। তিনি চুপচাপ কাজ করতেন, ধৈর্য্য ধরে, অবিচলিত ভাবে। কাজে আসতে একদিনও দেরি করেননি, এমনকি কাজ থেকে ছুটি নেওয়ার জন্য কখনো কোনো অজুহাত দাঁড় করাননি। শ্রমিকদের নিয়ে একটা সংগঠন করার জন্য আমি অনেকের সঙ্গে আলাপ করার চেষ্টা করেছি – সেটা ছিল সংহতি দিবস – শুধু সেই দিবসটি পালন করবার জন্য আলাপ করেছি। কিন্তু তিনি তাও চাননি। যাই হোক, তার প্রতি আমার আগ্রহ ছিল এবং প্রতিদিন তিনি টিফিন ক্যারিয়ারে করে যে মশলাযুক্ত খাবার আনতেন, তা আমার সঙ্গে ভাগাভাগি করে খেতেন। তার নাম আমি আর স্মরণ করতে পারছি না।
আমি ছিলাম একজন ওয়েট্রেস, একটা অভিজাত হোটেলের কর্মচারীও ছিলাম এবং একসময় আয়ার কাজ করেছি। বই বিক্রি করেছি। টিকেটও বিক্রি করেছি। কোনো এক ঋতুতে আমি একটা ছোট থিয়েটারে পোশাক তৈরির কাজ করেছি, দীর্ঘ শীতের জন্য ভারী পোশাক, সাটিন দিয়ে হাতকাটা জামা, পরচুলা এবং পেছনের মঞ্চের জন্য আনুষঙ্গিক জিনিসপাতি তৈরি করেছি। যখন আমার পড়াশুনা শেষ হয়েছে, তখন আমি শিক্ষক হিসেবে কাজও করেছি, পুনর্বাসন বিষয়ক পরামর্শক ছিলাম এবং – অতি সম্প্রতি – লাইব্রেরিতেও কাজ করেছি। যখনই আমি কিছু টাকাপয়সা জমাতে পেরেছি, তখনই আবার ভ্রমণে বেরিয়ে পড়েছি।
[চলবে]