কবির প্রেমভাবনা ও প্রেমের কবিতা >> জাহানারা পারভীন / মুজিব মেহদী / চাণক্য বাড়ৈ / নুসরাত নুসিন

0
178

জাহানারা পারভীন >> প্রেমভাবনা ও প্রেমের কবিতা

প্রেমভাবনা >>
এক চিমটি লবন ছিলে, তুমি আমার পান্তা ভাতে
একটা শুকনো মরিচ পোড়া, ছোট্র পেঁয়াজ গরিব পাতে;
বাড়া ভাতে ছাই দিয়ে যে এমন করে হাসতে জানে,
সে যেন আজ ভালই থাকে, করাত কলের বিরল গানে
এ ছাই আমার আশীর্বাদের, যত্ন করে মাজি বাসন
লাল সানকি, তোমারও কি আমার মত ভেঙেছে মন

 

প্রেমের কবিতা >>
কাকতাড়ুয়ার মুখ
উঠোনে উঠোনে শুধুই প্রস্থান;
ছাপ রেখে যাওয়া পায়ের কোরাস,
অথচ চৌকাঠে টানিয়ে রেখেছি ফিরে আসার বার্তা
কথা ছিল কলাপাতায় আকব পিকাসোর মুখ
তাহিতির মেয়েরা আজও মনে রাখে হলুদ হাতের নমুনা…
আর আমি উঠোনে একে রাখি কাকতাড়ুয়ার মুখ
হলুদ ধানক্ষেতে যে চিরকাল দাড়িয়ে থাকে একা…
প্রহসন…
পাল তোলা জাহাজে ধানের বীজ জড়ো করে
ভেবেছি চলে যাব কোথাও…
অথচ কৃষকেরা নিশ্চিত নয়
এগুলো বীজধান, নাকি চিটেধান….
ফসল ফসল করে সারা আশ্বিন দাড়িয়ে থেকেছি মাঠে
অপেক্ষা এমনই…
মেঘের মুখোমুখি দাড় করিয়ে রাখে বৈশাখের পর্বত
তুষের কাছে জানতে চাই
ধানের খোলসে দেখেছে কীনা ফসলের ঘুম
চিটেধানসহ জাহাজ ডুবে গেলে নদীতে
আকাশ থেকে ঝড়ে পড়ে বীজধানের বৃষ্টি…
আত্মহত্যা
হাতের মুঠোতে একটিমাত্র প্রশ্ন
ওভারকোটে নেই ভারী পাথর
টেবিলে রেখে আসিনি চিরকুট
শুধু একটি প্রশ্ন….সামান্য প্রশ্ন
অসতর্ক হাতের অবহেলায় পুড়ে যায় রুটি
তবুও দোষারোপ করবে আগুনকেই!
তাহলে আগুনের কাছেই রেখে যাই বেলুন ও পিড়ি,
মুদ্রিত কথার পাণ্ডুলিপি, বট পাতায় লেখা সামান্য অক্ষর!

মুজিব মেহদী >> প্রেমভাবনা ও প্রেমের কবিতা

প্রেমভাবনা >>
অন্য প্রেম

 

মানবসমাজে প্রেমানুভূতি চিরন্তন। দাদা-দাদিতে ফুরিয়ে গেলে গজিয়ে ওঠে নাতি-নাতনিতে। জগতে জন্ম-মৃত্যু দুটোই যুগপৎ ক্রিয়াশীল থাকা সত্ত্বেও মানুষ বাড়ছে। সংগত কারণে বাড়ছে প্রেমাধারও। কবিতার কারবার যেহেতু অনুভূতির আধার ওই মানুষকে ঘিরে, প্রেমের কবিতা কাজেই লিখিত-পঠিত হবে মানুষের অস্তিত্ব নিঃশেষ না হওয়া পর্যন্ত। আর প্রেমকে যে মূঢ়কুল কেবল নারী-পুরুষের কামজ লক্ষণ হিসেবেই দেখে, তারা জীবপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, দেশপ্রেম, বাৎসল্যপ্রেম, ঈশ্বরপ্রেমসহ তাবৎ প্রেমবৈচিত্র্যের অস্তিত্বকে অস্বীকারের মাধ্যমে জগৎকে খণ্ডিতভাবে ব্যাখ্যা করবার প্রয়াস পায়। এদের উদ্দেশ্যমূলক অভিপ্রায়কে সন্দেহ করুন!
স্বার্থান্ধ রাজনীতি ও ধর্মান্ধতার কূট ইন্ধনে সম্প্রতি জগৎব্যাপে মানুষের মধ্যে অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে অসহিষ্ণুতা ও উগ্রতা উসকে ওঠায় পৃথিবী ক্রমেই অসুস্থ হয়ে পড়ছে। পৃথিবীর এই রোগমুক্তির কার্যকর দাওয়াই হতে পারে অসহিষ্ণুতার নিচে চাপা পড়া মানুষের প্রেমবোধকে উসকে দেওয়া এবং মানুষে-মানুষে ভালোবাসার মহিমাকে উচ্চে তুলে ধরা। এই শুভ ব্রতে প্রেমের কবিতা হোমিওপ্যাথির মতো ধীর কিন্তু টেকসই অবদান রাখলেও রাখতে পারে বলে মনে হয়!
প্রেমের কবিতা >>
অভিমান ফল্ট
ডাউকি ফল্টের চেয়ে ঝুঁকিসংকুল আমাদের অভিমান ফল্ট
মনোভূমির পরতে পরতে জমেছে সমূহ বিপজ্জনক চাপ

নৈঃশব্দ্য নেমে না-আসা অবধি চাপ প্রশমনে আসো প্রাণ খুলে কথা বলি
ঝাঁকে ঝাঁকে কথার প্রসাদ ঢেলে খুলে ফেলি সহিষ্ণুতার দুয়ার
পরস্পরের মনের পালানে লাগাই রাশি রাশি ফুলবান গাছ

মনচ্যুতিপূর্ব এই সতর্কতা আমাদের
নিশ্চয়ই নিয়ে যাবে প্রত্যাশিত শান্তি সরোবরে
প্রেম যাতে পৌঁছুবার অবিকল্প সিঁড়ি

 

বাকোয়াজি
নিখাদ প্রেমের কবিতার দু’প্যারার মধ্যিখানে
আলগোছে ঢুকে গেছে খুনি বাকোয়াজি
কোমরে বারুদ ঠাসা লাল চোখ
অনর্থক মেতে আছে বিটলা বাহাসে
দায়মুক্ত যেন এক নীতিহীন হেলমেটধারী
শৃঙ্খলাকে যথাতথা ছুড়ছে চ্যালেঞ্জ
গতি ও প্রকৃতি তার সন্দেহজনক
পিস্তল ঠেকিয়ে বলে ‘প্রেম দাও’

চাণক্য বাড়ৈ >> প্রেমভাবনা ও প্রেমের কবিতা

প্রেমভাবনা >>
আমার কাছে প্রেম মানে হলো মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং অনুভূতির দ্বিতীয় দুয়ার খুলে যাওয়া। যেকোনো মানুষ যখন প্রেমে পড়ে, সে তখন অন্য এক মানুষে রূপান্তরিত হয়। প্রেমে পড়ার পর তাই, পৃথিবীর সবকিছু তার চোখে ধরা দেয় নতুন রূপে। তার কাছে শব্দ হয়ে ওঠে বাণী, স্পর্শ হয় স্বর্গীয়। আর সৌরভে সে পায় প্রাণ, স্বাদে অমৃত! এই পৃথিবী যতই সুন্দর হোক, তা আমাদের কাছে একসময় খুব একঘেয়ে মনে হতো, যদি না আমরা বারবার প্রেমে পড়তাম। আমরা প্রায়শ প্রেমে পড়ি বলেই প্রতিদিনের সূর্যটা সোনার আলোয় নতুন রূপে উদ্ভাসিত হয়, আর আমরা বিমোহিত হয়ে উঠি। প্রেমের সঙ্গে যৌনতার সম্পর্ক যেমন রয়েছে, তেমনি প্রেম নিরঙ্কুশভাবে যৌনতানিরপেক্ষও বটে। ভিন্ন ভিন্ন সময় প্রেম আমাদের কাছে ভিন্ন ভিন্ন রূপে ধরা দেয় মাত্র। আমি বিশ্বাস করি, প্রেমে পড়ার কোনো নির্দিষ্ট বয়স নেই। জীবনের যেকোনো অধ্যায়ে এসে মানুষের পঞ্চ ইন্দ্রিয় এবং অনুভূতির দ্বিতীয় দরজাটি অকস্মাৎ খুলে যেতে পারে।
প্রেমের কবিতা >>
দ্বৈরথ
তোমার আগুন ফুল ও ফণা হয়ে দুলে ওঠে– এক মর্মর পাথরের ওপরে দাঁড়িয়ে আমি পান করি মধু– গলা দিয়ে নেমে যায় বিষ–
আমার প্রতিটি শিরায় এভাবেই প্রবাহিত হও তুমি– সুবাস ও ছোবলের দ্বৈত সত্তার ভেতরে দাঁড়িয়ে তোমার তীব্র উপস্থিতি উপলব্ধি করি– আর দেখি, মস্তিষ্কের ধূসর দেয়ালে ভেসে উঠছে তোমার ছায়া, ময়ূর-পালকের মতো নীল–
এতকাল এই ফণার বাগানে আছি, আছি মধুর বাগানে- অথচ, এখনও বুঝিনি অর্থপূর্ণ ওই দেহের ইশারা- বলো, কোন অধ্যবসায়ে আয়ত্ত করেছ এই সুনিপুণ কলা- জীবন ও মৃত্যুর দ্বৈরথ-
কেবল তুমিই জানো, কখন ফুল হতে হয়, কখন ফণা-
জলযাত্রা
আমার ছোট টিলটিলে এক নাও
উঠলে তুমি, বললে এবার বাও
যেই বলেছ, সেই ছেড়েছি ঘাট
সেই ছেড়েছি ফেরার আশা
খুব চেনা তল্লাট।
যাচ্ছে সরে দুই দিকে দুই তীর
ছিপছিপে নাও চলছে ধীর-স্থির
নৌকা আমার যাচ্ছে তরতরিয়ে
সগৌরবে- এই পৃথিবীর
সমস্ত রূপ নিয়ে।
যাচ্ছি কেবল, যাচ্ছি কোথায় বেয়ে
জানার ইচ্ছে নেই কি তোমার মেয়ে
দিনের শেষে নামবে যখন রাত
ভীষণ ঝড়ে নৌকাখানা
ডুবলে অকস্মাৎ?
নির্ভাবনায় বৈঠা ফেলি জলে
থামব শুধু তোমার ইচ্ছে হলে
নয়তো এ নাও চলবে নিরন্তর
তোমায় নিয়ে ঘর ছেড়েছি
তুচ্ছ করে অমরত্বের বর।

 

নুসরাত নুসিন >> প্রেমভাবনা ও প্রেমের কবিতা

প্রেমভাবনা >>
এই যে প্রেমের শরীর আর প্রেমের জীবন—তার সঙ্গেই তো দেখা
হওয়ার কথা অযুত-নিযুত মুহূর্তকালের রঙে
ভালবাসা কি মোহমায়া? নাকি মোহমায়া হলো ভালবাসা? ভালবাসার প্রতি কি
কোনো আস্থা রাখা যায় শেষপর্যন্ত? পুরাতন প্রেম ঢাকা পড়ে যায় নব প্রেমজালে।
ভালবাসা মদ ও মদিরা। মৈথুন।
মিলন ব্যপ্ত চলাচল। মৃত্যু।
এই মিলনই মোহনমনে চলাচলের লোভ আনে। ভালবাসা তাই মহা স্পর্শের নাম।
শরীর হলো তাঁর দেবালয়। মহানুভব।
সব পথ মিলনের অভিমুখি নয়। ভালবাসা তাই অমিলিত আস্বাদের নির্মম পরিবেদনাও।
প্রেম এলে আমার নদীর কথা মনে পড়ে। বালকের চোখবন্ধ সাঁতার ভাল লাগে।
মাছের চলাচল ভালো লাগে।
যদিও মোহনডাঙায় জবাফুল ও চিঠি কখনো পৌঁছায় না।
বালকের চোখ এঁকেবেঁকে চলে গেছে দূরে…
প্রেমের কবিতা >>
পরমহংসের ছায়া
উপমাংস। রহস্য। বেহালা।
এ মধুর মর্মরতা—কল্পনা তাকে পেরিয়ে সহজ রাস্তা হতে চায়।
সম্পূর্ণ কলা ও কাকলি, তার অধর ও আধুলি
এক খণ্ড দৃশ্যে এসে দাঁড়ায়।
আমার পূর্ণবৃত্তের পৃথিবী প্রদক্ষিণের সমূহ সংলাপ কেটে কেটে
তাকে বলেছি,
রাজহংস!
তার পাখনা কি স্রোতময়? আনন্দে জোয়ার আসে।
জলের প্লাবনে ভেসে যায় জলের উদ্বৃত্ত।
অবদমন
অবদমন একটা কুহেলিকা—অলিন্দে ফুটে থাকা ফুটফুটে নদ
ছুটে যাচ্ছে ডাক, প্রান্তরের পাখি—আর ওপাশ হলেই বিদীর্ণ্ আড়াল
আর যা কিছু মুখাপেক্ষী, সারস— মিনারের দৈর্ঘ্য নিয়ে ফুটে থাকা হেমলক,
ফুটন্ত, টকটকে, যেন বিদীর্ণ নিমফল—
আমি তাকে বলেছি, ধ্যানবিন্দু কিসের যেন নাম? ফুটে থাকা কি কারাগার?
ধুতুরার মতো চেয়ে থাকো— ধুতুরার মতো আমি চেয়ে থাকি।