করোনার দিনরাত > তারশিক-ই-হাবিব >> ধারাবাহিক উপন্যাস (পর্ব ১)

0
199

করোনার দিনরাত >> করোনা কালের উপন্যাস

একটানা দিতে থাকা লেকচার শেষ হলে ল্যাপটপ বন্ধ করে আমি হাঁপাতে থাকি। তারপর মিনারেল ওয়াটারের বোতল গলায় ঢেলে নেভিব্লু কোটের ওপর মানানসই হালকা লাল টাইয়ের নট ঢিলা করি। ভেতরের সাদা শার্টটা চৈত্রের এই ভ্যাপসা গরমে ইন করা অবস্থায় এখন ডিজকমফোর্টেবল লাগছে। এতক্ষণ রিসার্চারদের সামনে লেকচার দিতে গিয়ে কিন্তু ব্যাপারটা খেয়াল করিনি! মানুষের মনোযোগটাই আসল ব্যাপার! এর প্রতি গুরুত্ব না দিলে অনেক কিছুই ইজিলি এভয়েড করা যায়। আবার এটা ডিফেন্স ম্যাকানিজমও! মানে কোনো ডিসটার্বিং ফ্যাক্ট এড়াতে হলে সেদিকে অত মনোযোগ না দিলেই হয়! নিজেকে কন্ট্রোলে রাখা দরকার। মনে মনে এসব হিসাবনিকাশ চলতে থাকে। এসি চলছে রুমে, কিন্তু গুমোট কাটছে না। মনে হচ্ছে কুয়াশার লেয়ার দেয়ালের গায়ে মাখানো, আর রুমের ভেতরটা যেই কি সেই গরমই! নাকি নিজের শরীর তাতানো বলে এমনটা ভাবছি! জানালার সামনে ইচ্ছা করেই শাটার দেইনি। বাইরের ভিউটা সুন্দর। টেবিলের ওপর পড়ে আছে মানিব্যাগ থেকে বেরিয়ে আসা ভিজিটিং কার্ড। প্রফেসর ডক্টর ফরহাদ চৌধুরী। সোশিওলজিস্ট। নামের পাশে ‘পোস্ট-ডক্টরাল ফেলো’ লেখা। এমবুশ কাগজের দামী ভিজিটিং কার্ডে নীল কালিতে ছাপানো বিভাগ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ঠিকানা, মোবাইল নম্বর ও ই-মেইলও দেয়া আছে। বামপাশে কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোগ্রাম। ওয়াশরুমে যাওয়া দরকার। হাতমুখে পানির ছিটা দিলে চাঙ্গা লাগবে। রুমে বসে ঘণ্টাদুয়েক কাজ করতে হবে। যে বিশ্ববিদ্যালয়ে গেস্ট রিসার্চ কনসালটেন্ট হিসেবে দায়িত্বে আছি, তাদের রানিং সেশনের এই ব্যাচের পাঁচজন রিসার্চারের রিসার্চ প্রজেক্ট দেখাশোনার ও কাজ আদায় করিয়ে নেয়ার দায়িত্ব আমার। আগামী বছর জার্মানীর ইন্টারন্যাশনাল কনফারেন্সে পার্টিসিপেট করার সুযোগ পেতে পারে এখানকার সেরা কাজটি। নিজের বিশ্ববিদ্যালয় করোনার দাপটে বন্ধ বলে তো বসে থাকার জো নেই! ইয়োরোপের যে অবস্থা, তাতে আগামী বছর ইতালির বিশ্ববিদ্যালয়ে এক বছরের জন্য ভিজিটিং প্রফেসরশিপ প্রোপোজাল একসেপ্ট করব কি না, আবার ভাবতে হবে। আরো পরে ই-মেইল পাঠাবো। ওদের অবস্থা তো জবুথবু! দেশের অবস্থা দিনদিন খারাপ হচ্ছে। প্রেসিডেন্টের নির্দেশে সন্ধ্যা ছয়টা থেকে ভোর ছয়টা পর্যন্ত কারফিউ জারি থাকলেই বা কি! মানুষ তো সেই সকাল থেকেই লকডাউন ভেঙে যখন যেভাবে খুশি পথে-ঘাটে হাটে-বাজারে বেরিয়ে আসছে। আর না এসে করবে কী? পরিবার নিয়ে পেটে দানাপানি দিতে হবে না! পরশুদিন ফেসবুকে দেখলাম, গ্রাহক ব্যাংকে গেছেন সঞ্চয় ভাঙাতে। মধ্যবিত্তের টালমাটাল অবস্থা এবার কি শুরু হচ্ছে! মার্চ, এপ্রিল পেরিয়ে মে আগত। বলা হচ্ছে, মের পর করোনার প্রকোপ কমবে। এখনো আরো এক মাসের বেশি! বাসার নানা ঝামেলা ঠেকা দিয়ে চালাতে হচ্ছে! বুয়া না থাকলে যা হয়! ওহ! এখন আর এ নিয়ে ভাবতে ভালো লাগছে না। যে ব্যাপার নিয়ে যত ভাবব, সেটা মাথায় তত চেপে বসবে।
“বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা, পুলিশ ছুঁলে ছত্রিশ – পুলিশের ডাণ্ডাবাজির ভয় আপনার থাকলেও থাকতে পারে, আবার আপনি তা ইগনোর করতেও পারেন। চাইলে আর্মির জলপাইরঙা গাড়িতে লাগানো সাদা ব্যানারে লেখা ‘নিরাপদ সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখুন’ – শ্লোগানকেও এড়িয়ে যেতে পারেন। কেননা, ‘সামাজিক দূরত্ব’ নিয়ে প্রিন্ট মিডিয়ায়, বিভিন্ন গণমাধ্যমে, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে, বিশেষত ফেসবুকে তুলকালাম কাণ্ড কদিন ধরে চলেছে। তাই সমষ্টির প্রতিনিধি হিসেবে আপনি এ ব্যাপারে দ্বিমত পোষণের গণতান্ত্রিক ও বৌদ্ধিক অধিকার রাখেন। হ্যা, আপনি হয়ত বলবেন, তারা সমাজের শিক্ষিত ভদ্রশ্রেণির লোকজন। কাজেই যারা এর চেয়ে লোয়ার স্টেজের, যেমন ধরেন একজন কেরানি বা একজন মুদি দোকানদার, তাদের এসব নিয়ে ভাবনার কী আছে? কজনের, যদি থাকেও? তারা গভমেন্ট পলিসি সম্পর্কে যেটুকু শুনেছে বা জেনেছে, সেটুকু হয় অন্যকে দেখে মানে; নয়ত না মেনেই দিন পার করে। কেউ কেউ মানার ভান করে, সুযোগ পেলে নিয়ম ভাঙে, সুযোগ না পেলে নিয়ম মানে। ও কে! তাহলে এর বিপরীতে পাল্টা যুক্তিও আপনি দিতে পারবেন, যদি কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের পাশের কোনো জনপদে যান। আগে বলে নিই, অনুমান মারফত, আপনি কোন যুক্তি দিচ্ছেন, কীসের ভিত্তিতে। এসব নিয়ে সাক্ষাতে ডিটেলস কথা হবে, নোট রাখতে পারেন। যেহেতু এসব এলাকায় আপনি কিছুদিন ধরে নজরদারি করেছেন অথবা বাসাভাড়া করে ছিলেন অথবা এদিকে আপনাকে হয়ত অফিসের সুবিধা বিবেচনায় রেখে ভবিষ্যতে বাসা নিতে হতে পারে বলে আগেভাগেই ঢু মারছেন কিংবা আপনার ব্যাংক লোন এদিকের একটি ব্যাংকের লোকাল ব্রাঞ্চে এসে রেগুলার ক্লিয়ার করেন মোবাইল ব্যাংকিংয়ের নানা ফ্যাকরায় অতিষ্ঠ বলে! অথবা এদিকে সব ধরনের ডেইলি প্রোডাক্টস ও বাজারঘাটের সুবিধা রয়েছে বলে বা কখনো নিছক চারপাশে কী হচ্ছে, চোখের সামনে দেখতে চাইলে এদিকে আসার সুযোগ রয়েছে, এমনটিও আপনি ভাবতে পারেন।”
ভালোই হয়েছে লেকচারটি, মনে হয়। রাত সাড়ে সাতটা। এ ভবন অবশ্য এখনই বন্ধ করবে না গার্ডরা। রাত দশটা পর্যন্ত টিচারদের নিজ রুমে বসে কাজ করার অনুমতি আছে। তলপেটে চাপ বাড়ছে। এবার উঠতে হবে। এই ফ্লোরের টিচার্স ওয়াশরুমটা আমার রুমের সামনের দিকেই, খানিকটা এগুলে। কিন্তু সেটার অবস্থা এখন বেশ করুণ। কারণ এই আকালের দিনরাতে আমি ছাড়া আর কেউ এ ভূতুড়ে ভবনে পারতপক্ষে আসে না। এমনিতেই এখানে ক্লাস কম হয়, তাও দুপুর একটা পর্যন্ত। দোতলায় দুটো সেমিনার আর অডিটোরিয়ামে মাসে-দুমাসে একটা সেমিনার, বড়জোর! টিচাররাও, যাদের রুম এখানে, ক্লাসের পর তেমন বসেন না, হাতে গোনা দু-চারজন ছাড়া। আসলে রুমে আসি বলে চারপাশে ঘুরে দেখার সুযোগটা থাকে। বাসায় লকডাউন হয়ে থাকলে তো চারপাশের পরিস্থিতি বোঝা যাবে না! পেপার, টিভি, ফেসবুক এসব তো কমন সোর্স। নিজের অবজার্ভেশনটাও তো লাগবে! জয়েন্টলি কাজটা করছি আরো দুজনের সঙ্গে। বাংলাদেশে করোনার ইমপ্যাক্ট নিয়েই আপাতত ভাবছি, কিন্তু পারটিকুলারলি আমার ভাগে ঢাকা শহর। অন্য দুজন ঢাকার বাইরের জেলা শহরের কয়েকটি তুলে ধরবে, র্যা ন্ডম স্যাম্পলিংয়ের মাধ্যমে। আবার! ভাবব না বলে নিজেকে বোঝাচ্ছি, অথচ মনে মনে এসবই ভাবছি! অন্যদিকে মনোযোগ দেয়া দরকার। দরজা খোলার আগে এসি বন্ধ করি। ফ্যানটা কি ছাড়ব এবার? নাকি লক করা বিশাল জানালার দুপাশের দুটো কাচের পাল্লার একটা খুলব? চম্পা ফুলের বিশাল গাছটি চারপাশের নির্জনতা মেখে রাতের অন্ধকারে প্রেতিনীর মতো একঠায় আমার দিকে চেয়ে ছিল। আমি কি ওর মৌনতাকে ভেঙে দিলাম জানালার পাল্লা সরিয়ে! টিউবলাইটের আলো পড়ে বসন্তে চকচকে সবুজ হয়ে ওঠা পাতাগুলো কি ফিসফাস শুরু করল! এতক্ষণ খেয়াল করিনি তো! অথচ ওদিকেই তাকিয়ে ছিলাম! শনশন বাতাস গালের ওপর মৃদু প্রলেপ বুলিয়ে গেল! কানের সুড়ঙ্গে যেন হুড়মুড় করে গর্জন তুলছে কালবৈশাখী। এই সময়ে বলা নেই কওয়া নেই যখন তখনই শুরু হয় দমকা বাতাসের ঘোড়দৌড়! উহ! ধুলোর ঝাপটাও আছড়ে পড়েছে গাছটার ওপর! লম্বা গাছটার ডালপালা ছড়িয়ে পড়ায় মনে হচ্ছে, প্রেতিনী তার এলো চুলগুলো ডানে বায়ে অবিরাম ঝাঁকাচ্ছে। সে কি হুঙ্কার দিচ্ছে আমাকে ভয় দেখাতে! আশেপাশে কেউ নেই! আমিই বা কেমন খেয়ালী! ওভাবে গলা বাড়াতে হয় কাচের জানালার ফ্রেমের বাইরে! জানালার নিচে সানশেডও নেই। একবার যদি হাত ফসকে যায়, একেবারে নিচতলার কংক্রিটের ফ্লোরে চিৎপটাং হতে হবে। সাবধানে নিজেকে ভেতরে ঢুকিয়ে নিই। বেশ ভালো লাগছে চারপাশের এই নির্জনতার মাঝে শনশন করে ছুটে চলা বাতাসের আর্তনাদ। মনে হচ্ছে, সে আমাকে সঙ্গ দিচ্ছে! নাকি আমার সঙ্গ চাইছে! ধুলোর কারণে এবার জানালার পাল্লা বন্ধ করতেই হয়। দরজাটা খোলা। গার্ডদের কেউ যদি পায়চারি করতে করতে চলে আসে! মনে হয় না, তারা এই দুর্যোগের মাঝে নিচতলার গেট বা তাদের ঘর ছেড়ে এখানে আসবে। এদিকে অনেকদিন কাউকে আসতে দেখিনি। সন্ধ্যার আগে এসে প্যাসেজের লাইটগুলো জ্বালিয়ে দেয়া আর সকাল হলে নিভিয়ে দেয়াই তো আপাতত চারতলায় তাদের একমাত্র কাজ! গত দুমাস ধরে সকাল থেকে রাত পর্যন্ত অনেকটা সময় একা একা থাকতে থাকতে কেমন যেন হয়ে গেছি! নিজেকে কি অন্ধকারের বাসিন্দা বলে মনে হয়!

(চলবে)

তাশরিক-ই-হাবিব

কথাসাহিত্যিক, প্রাবন্ধিক ও গবেষক। সম্পাদক দ্বিমাসিক সাহিত্য পত্রিকা ‘পরামকথা’। প্রকাশিত গ্রন্থ : উপন্যাস পান্নাবিবি, নাইয়র, বিশ মিনিট। গল্পগ্রন্থ : ভরদুপুরে ও অন্যান্য গল্প, দম্পতিকথা, বিকল পাখির গান।