কাজী রাফি > দূরত্ব >> ছোটগল্প >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

0
474

কাজী রাফি > দূরত্ব >> ছোটগল্প >>> উৎসব সংখ্যা ২০২০

২০১৮ সালের ২২ নভেম্বর, বৃহস্পতিবারে বিয়ে এবং বাসরের পর একবছর চার মাস পার হতে না হতেই আবির আর তাহিয়া নতুন এক বিশ্বকে আবিষ্কার করল। এই পরিস্থিতিতে, পরিবারের পছন্দে বিয়ের পর স্ত্রীর প্রেমে হাবুডুবু খাওয়া আবির মনে মনে এই ভাইরাসকে আশির্বাদ হিসেবেই ধরে নিল।
কিন্তু ভালোবাসাও দূরত্ব চায়। কয়েক সপ্তাহ একসাথে বাস করতে গিয়ে দুজনের মননের ভিন্নতা একে অন্যের প্রতি তীব্র আকর্ষণকেও যেন বিষন্ন করে তুলল। কেনাকাটা করতে গিয়ে, গান শোনার রুচিতে, চলচ্চিত্র পছন্দে, দুজনের ভিন্নতা একে অন্যকে নতুন করে চেনাল। বইপড়া আর লেখা আবিরের প্রিয় অভ্যাস হলেও এ নিয়ে তাহিয়ার বিরক্তির শেষ নেই। লেখালিখি; তাহিয়ার মতে, বিষন্ন এবং হতাশ লোকদের কাজ। হাসি-আনন্দে মেতে থেকে জীবনের সময়গুলো উপভোগ করাই তার মূলমন্ত্র।
কাছে আসার সূত্রের মাঝেও দূরত্ব আশ্রয় নেয় গোপনে। করোনায় কয়েকজন মৃত্যুবরণ করলে তাদের নিজেদের অন্তরঙ্গতায় বাস করা সেই ‘দূরত্ব’ হাঁটি-হাঁটি পায় এগিয়ে আসে। একদিন দুজন একসাথে সুপার শপিং শপে গিয়ে তাদের মাঝে বাস করা অনৈক্য প্রথম কথা বলা শুরু করল,
আজ আমাদের তিন-চার মাসের সব খাবার এবং প্রয়োজনীয় সামগ্রী একসাথে কিনতেই হবে।
আমরা মাত্র দুজন মানুষ। সবাই এভাবে কিনলে তো জিনিসপত্রের দাম বেড়ে যাবে। যারা কিনতে পারবে না…
আহ, আবার জ্ঞান দেওয়া শুরু করলে।
তাহিয়া, পৃথিবীর কোথাও দুর্ভিক্ষ খাবারের অভাবে হয় না। দুর্ভিক্ষ নেমে আসে মানুষের অতিরিক্ত মজুদের কারণে। মানুষ খাবারের সন্ধান পেলেই তা লুট করবে ভেবে গোপনে লুকানো মজুদ পচে যায়। স্টকিং ইজ নেভার গুড। আমাদের ধর্মও তা করতে নিষেধ করেছে। আবিরের মুখের কথা কেড়ে নেয় তাহিয়া,
উফ, কী এক নীতিবান আর ধার্মিকের সাথে বিয়ে হয়েছে– কথায় কথায় রেফারেন্স টানবে না তো। আমি যা বলছি শোনো।
সুতরাং গাড়িভর্তি করে সাংসারিক জিনিসপত্র কিনে ঘরে ফিরল দুজন। সেগুলো গাড়ি থেকে নামানো, ফ্রিজিং সব শেষ করে আবির মাত্র স্নান সারা তাহিয়াকে বলল,
দুজনই দৌড়ের মধ্যে থাকি। করোনা এসে ভালোই হয়েছে। তোমার সাথে জমিয়ে আড্ডা দেবো।
কিন্তু, বাইরে তো যাওয়া হবে না। ইস, কত ইচ্ছা ছিল – কয়েকদিন পর যে কোনো একটা দেশে গিয়ে কয়েকদিন বেড়াব। আর তুমি বলছ, করোনা এসে ভালো হয়েছে!
হ্যাঁ বলছি। সংকটকাল না এলে মানুষ মানুষের আত্মার দিকে ফিরে তাকাতে পারে না। তুমি আমাকে ভালো করে চেনার, কষ্টিপাথরে যাচাই করে নেওয়ার সুযোগ পেলে!
শোনো, এভাবে বেশি প্যানপ্যান করবে না। রান্নার কাজটুকু আমি করব। বাকি সব তোমার ভাগে। শোনো, এ দেশে যত পাপিষ্ঠ আর মিথ্যুক, করোনা এই ভণ্ডদেশে সবাইকে ন্যাংটা করে ছাড়বে। বার বার বলেছি, আমার তো অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্ব আছে; চলো সেখানে সেটল হই। না, উনি দেশে পড়ে থাকবেন। এখানে চিকিৎসা পাবে? এ দেশ তো এখনো চিকিৎসা শব্দ থেকে অনেক দূরে। আবির একথায় খুব হাসলেও বলল,
তাহিয়া, দেখো, ঢাকার আকাশটা এই কয়দিনে কেমন নীল হয়েছে। ক্লান্ত বাতাসও এখন অনেক ফুরফুরে। বলে সে তাদের ফ্ল্যাটের পূর্বদিকের খালের দিকে নখ উঁচিয়ে বলল, এতগুলো টিয়া পাখি আমি আগে কখনো দেখিনি। লেকের ধারে আমাদের এই ফ্ল্যাটটাকে এখন স্বর্গ মনে হচ্ছে। আর এই ভাইরাস আমাদের বলছে…
কী বলছে?
দাঁড়াও। বলে আবির কফির মগটা রেখে তার পড়ার টেবিলে গেল। একটা প্রিন্টেড পাতা এনে তাহিয়ার হাতে দিয়ে বলল,
কাল রাতে তুমি ঘুমালে বসে বসে ভাবছিলাম অনেক কিছু। ভাবলাম এই এলমেলো ভাবনাগুলো লিখে রাখি।
কফির মগে এক চুমুক দিয়ে তাহিয়া পাতাটা চোখের সামনে মেলে ধরল,
কোভিড-১৯ একটা ভাইরাস শুধু নয় আমার কাছে সে একটা চরিত্র। এখন বিশ্বের জনসংখ্যা প্রায় আটশ কোটি। অথচ পঞ্চম শ্রেণিতেই পড়েছিলাম, বিশ্বের মোট জনসংখ্যা পাঁচশ কোটি। অতি মানুষের এত খাবার-পানি, অক্সিজেনের চাহিদা পূরণ করতে গিয়ে এই বিশ্বটা হাঁসফাঁস করবে। প্রাণকে ধারণ এবং লালনের জন্য ব্রক্ষ্মাণ্ডের এই মহান গ্রহটি নিজের অবারিত ঐন্দ্রজালিক শক্তিতে সমৃদ্ধ। প্রাণের শুধু উন্মেষ নয় তার বিকাশেও এই গ্রহের প্রকৃতি মায়ের মতো পুষ্টিময় স্তন্যদায়িনী। সে নিজেই একা মহাকাল পাড়ি দিতে চায় না বলে কিছু কিছু প্রাণ আর প্রজাতিকে পুষ্ট করে নেয়। তাদের মাঝেও বিস্তার ঘটায় ঐন্দ্রজালিক প্রতিভার। কিন্তু তার রয়েছে নিজেকে সুরক্ষার কিছু কলা-কৌশল। নিজেকে সুরক্ষা করার গোপন এবং মোক্ষম অস্ত্রগুলো সে হারিয়ে ফেললে, মানুষের মতো অতি বুদ্ধিমান প্রাণির পদানত হলেই সে ধ্বংস হয়ে যাবে।
আঠার শতক পর্যন্ত পৃথিবীর জনসংখ্যা একশ কোটিতে পৌঁছাতে সময় লেগেছে কয়েক হাজার বছর। কিন্তু পরের একশ বছরেই (১৯২০ সালে) এই জনসংখ্যা দ্বিগুণ হয়েছে। এরপর সেই জনসংখ্যা আরো দিগুণ হয়ে চারশ কোটি বা চার বিলিয়নে পৌঁছাতে সময় লেগেছে মাত্র মাত্র পঞ্চাশ বছরে (১৯৭০) আর এখন?
এই হারে জনসংখ্যা বাড়লে বিভিন্ন প্রজাতির প্রাণিকুল দ্রুত বিলুপ্ত হয়ে যাবে। প্রয়োজনীয় সুপেয় পানি নিঃশেষ হয়ে যাবে। মরণঘাতি এক ভাইরাস আমাকে শেখায়, পৃথিবীতে আগ্নেয়াস্ত্রের জন্য, সীমানা নির্ধারণের জন্য, সমরসজ্জার জন্য আমরা যে প্রস্তুতি নিয়েছি – সুপেয় জলের উৎস অথবা চিকিৎসার ওষুধের পেছনে তার তুলনায় কমই বিনিয়োগ করেছি। মানব সভ্যতার নিদর্শন হিসেবে শিল্প-সাহিত্য আর বিজ্ঞানকে ব্যবহার করলেও তার পিছনেই রাজনীতি এবং ধর্মের কুঠারাঘাত করে সবচেয়ে বেশি। মানুষ নামক প্রজাতির ভয়াবহ বিস্তারে পৃথিবীর তাপমাত্রা বাড়বে হু হু করে। ওজোন স্তরের ক্ষয়, বনাঞ্চল ধ্বংস করে নগরায়ন, সমুদ্রপৃষ্ঠের উচ্চতা বৃদ্ধি – এসবই কেয়ামততুল্য হয়ে উঠবে। সামুদ্রিক সম্পদ এবং রাসায়নিকের ব্যবহার উঠবে তুঙ্গে। পৃথিবী থেকে বিলুপ্ত হবে এমন সব ক্ষুদ্র প্রাণ যারা খাদ্যচক্রের সবচেয়ে বড় নিয়ামক। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা আফ্রিকার জনসংখ্যা বৃদ্ধিরোধে সেখানে মিলিয়ন মিলিয়ন কনডম কনডম বিতরণ করছে, কিন্তু সেখানে ডাক্তারদের চেয়ে ক্যাথলিক দল বেশি যারা কনডম ব্যবহারে তাদের ধর্মীয় বিধি-নিষেধ শেখায়। ফলে কনডমগুলো পড়ে থাকে আবর্জনার স্তূপে অথবা শিশুদের মুখে ফু দিয়ে ফোলানো খেলনার বস্তু হিসেবে।

এটুকু পড়ে হাঁপিয়ে উঠল তাহিয়া। ঠোঁটের কোণের বাঁকা হাসিকে ক্রমশ স্পষ্ট করে তুলল। একসময় সেই হাসির রেশ তার শরীরের ভাঁজে ছড়াল। সে বলল,
তুমি তাহলে আফ্রিকায় একবার যাও। তাহলে কয়েক টন কনডম নিয়ে আসতে পারবে… তবে, প্লিজ যাওয়ার আগে আমাকে সাথে করে নিয়ে যেয়ো।
এই লেখা পড়ার সময়ও তোমার এমন ফান করতে ইচ্ছা হলো?
পাতাটা থেকে চোখ সরিয়ে সেটা পড়ার আর খুব আগ্রহ বোধ না করে তাহিয়া তা ফিরিয়ে দিল আবিরকে। বলল,
বাইরে যেতে পারব কবে, বলো তো? আমি বন্ধুদের সাথে আড্ডা খুব মিস করছি।
তাহিয়া! আমি তো তোমার সাথে সারাদিন আড্ডা দিচ্ছি। সংসারের সব কাজ করছি… এসময় তাদের মিস না করলেও তো হয়!
শোনো আবির, হৈ-হুল্লোড় আর আনন্দ করে মরে গেলেই আমি খুশি। কিন্তু সারাক্ষণ পাশে জ্ঞানী কথাবার্তা শুনতে হবে ভেবে আমি এখন চিন্তিত।
চিন্তিত হলেও তাহিয়া কিছুক্ষণের মধ্যেই আবিরকে ভাবনাশূন্য করে তুলল। ডুবিয়ে নিল তার ভাঁজময় স্বর্গের অন্য জগতে। এই অমৃতলোকে কয়েকদিন কেন আবির বরং যুগ যুগ হোম-কোরাইন্টাইনে থাকতে চায়। ঘরের আলো আঁধারিতে তাহিয়ার ত্বকের ঘ্রাণ-আভায়, তাঁর চোখের মনির আরো গভীরে, আরো গভীরে – তার ঠোঁটের স্পর্শ-স্বাদে – এই জীবনকে কানায় কানায় পূর্ণ করতে চায়। আহা, তার তাহিয়া! তাঁর জন্য সে পাহাড় ডিঙাতে পারে। প্রিয় নারীকে নিরাপদ রাখতে অনিত্য এই জীবনকে তুচ্ছ করতে তার মোটেও দ্বিধা হবে না।

২.

ঘরের রান্নার কাজটুকু ছাড়া ধোয়া-মোছা, বিছানা ঠিক করার দায়িত্ব নিল আবির। সারাদিন স্ত্রীকে সময় দেওয়ার পর সে ঘুমিয়ে গেলে তবেই আবির পড়ার টেবিলে আসে। কিন্তু দুই সপ্তাহেই আবির ঘর-বিছানার কাছে যত সমর্পিত হলো, তাহিয়ার হলো ঠিক তার উল্টোটা। দেশে করোনায় পাঁচজনের মৃত্যু এবং সারাবিশ্বের মৃত্যু পনেরো থেকে মাত্র কয়েকদিনের ব্যবধানে ত্রিশ হাজারে পৌঁছানোর পর সে যেন অস্থির হরিণীর মতো বাইরে ছোটার জন্য টগবগ করে উঠল। একসন্ধ্যায় সে তার চরম বিরক্তি জানাতেই আবির নিজ হাতে চা বানিয়ে এনে কফি-মগটা এগিয়ে ধরে বলল,
আমরা এখন একটা মুভি দেখতে পারি। অবশ্যই তোমার পছন্দের। অথবা লেকের ধারে আমাদের সুন্দর এই বারান্দায় বসে কফি খেতে খেতে আকাশের চাঁদটা দেখতে পারি।
মুভিতে সুন্দর সুন্দর জায়গা দেখাবে। পাহাড়, সাগর-সৈকত দামি রিসোর্ট এসব দেখলে তো মাথাটা আরো নষ্ট হবে।
দুজনের পছন্দের ভিন্নতার জন্য তাদের ঘুম খাওয়ার সময় আর এক থাকল না। এক মধ্যরাতে ঘুম থেকে জেগে আবির পাশে হাত দিয়ে দেখল তাহিয়া বিছানায় নেই। মশারির ভিতর থেকে সে বের হয়ে এলো। কী আশ্চর্য পুরো বাড়ির সব বাতি নেভানো। সব অন্ধকার করে তাহিয়া কি বসে বসে কান্না করছে? কিন্তু কেন? পেছন থেকে ক্রন্দনরত স্ত্রীরূপী প্রেমিকাকে জড়িয়ে ধরে তার মান ভাঙানোর কল্পনায় সে চুপটি করে ঘরের সাথে বারান্দার দিকে সন্তর্পণে পা বাড়াল। কিন্তু সেখানে কেউ নেই। তাহলে কোথায় গেছে তাহিয়া? আবির পুরো বাড়ি, ড্রয়িং রুম ঘুরে অতিথি কক্ষের সামনে এসে দাঁড়াল। ভিতরে কেউ একজন কথা বলছে। তাহিয়ার কণ্ঠই তো!
জীবনে কোনোদিন কান না পাতলেও আবির নিজের অজান্তেই কাজটি করল। কিছুক্ষণ ধরে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করে আবার চুপচাপ ঘরে ফিরল। তাহিয়া তাহলে কেন তার সাথে বিয়েতে রাজি হয়েছে? কী আশ্চর্য, তার সাথে বাস করেও তাহিয়া অন্য কারো সাথে এভাবে কথা বলতে পারে? তার বুকের প্রান্তর ভেঙে আসতে চাইল। ঘণ্টাখানেক পর তাহিয়া নিশ্চিন্তে তার পাশে এসে শুয়ে পড়ল। সে ঘুমিয়ে গেলে আবির বারান্দায় বসে সারারাত আকাশের তারাদের দিকে তাকিয়ে তাকিয়ে কেন যে বার বার চোখ ভেজাল!
ব্যাপারটা দুজনের মাঝে গোপন থাকল না। গোপন যা কিছু তা গোপন না থাকায় ‘দূরত্ব’ শব্দটি তাদের মাঝে এসে বাসা বাঁধে। তাহিয়ার বাবা-মা অনেক বুঝিয়েও মেয়েকে আটকাতে পারল না। মেয়েকে স্বাধীনচেতা করে বড় করে তোলার জন্যে তিনি তার বাবাকে দুষলেন। অস্ট্রেলিয়ার নাগরিকত্বধারীদের একটা বিশেষ ফ্লাইটে সে দেশের সরকার যখন সবাইকে ফিরিয়ে নিয়ে গেল – সেই ফ্লাইটে তাহিয়া চলে গেল। যাওয়ার আগে সাদা কাগজে আবিরের সাথে বিয়েবিচ্ছেদের সব দালিলিক প্রমাণ রেখে সে তাতে স্বাক্ষর করল। তাহিয়া আসলে চলে গেল তার প্রাক্তন ভালোলাগা বন্ধুর কাছে। যাবার আগে বলল,
তুমি অনেক ভালো। তবে, আমি বিনা চিকিৎসায় এদেশে মরতে চাই না। বুঝতেই পারো।
ব্রিফকেস, লাগেজ ঘুছিয়ে দরজার কাছে একবার গিয়ে একবার থামল। পেছন ফিরে তাকিয়ে বলল,
তোমাকে ভুলব না। টেক কেয়ার।

তারপর দিন গড়াল। পৃথিবীজুড়ে মৃত্যুর মিছিলে বাংলাদেশে মৃত্যুর ডামাডোল বাড়তে থাকল। প্রতিদিন পাঁচ-সাত হাজার মৃত্যুর অংক এখন স্বাভাবিক একটি সংখ্যা। এত মৃত্যুকে দাফনের জন্য দিন দিন মানুষের অভাব তৈরি হচ্ছে।
অস্ট্রেলিয়ায় প্রাক্তন বন্ধু শাফিনের সাথে বিয়ে এবং কিছুদিন বসবাস করার পর তাহিয়া হাঁপিয়ে উঠল। খাওয়া-পরা আর ভোগ-সম্ভোগের বাইরে যার আর কোনো জীবন নেই – তার সাথে দিন দিন দিন-রাতগুলো কেমন পাণ্ডুর হয়ে ওঠে! একসময় করোনায় আক্রান্ত হলেন তাহিয়ার বাবা-মা। সিডনি থেকে তাহিয়া ছটফট করলেও বিমানবন্দরগুলো বন্ধ থাকায় তার কিছুই করার থাকল না। তবে, সেখান থেকে অনেক আত্মীয়-স্বজনকে অনুরোধ করেও নিজের বাবা-মায়ের কাছে নিতেও পারল না। যাকে তাদের কাছে নেওয়া সম্ভব মনে হলো – সেই আবিরকে ফোন করার মতো অসম্মান নামক দূরত্বের ব্যাপার আর কিছুতে নেই। সেই দূরত্ব অতিক্রম করা তাহিয়ার পক্ষে আর সম্ভব নয়।

তবে, তাহিয়া না বলতে পারলেও সে জেনে গেল, বাবা-মায়ের পাশে একজন মানুষই ছায়া-মায়া হয়ে দাঁড়িয়ে ছিল – সে আবির। দাফন পর্যন্ত সে তাদেরকে মুহূর্তের জন্যেও ছেড়ে যায়নি। নিজের বাবা-মা’কে হারানোর পর তাহিয়া উপলব্ধি করতে শিখল, মানুষের শরীরের বাইরে তার ভিতরকে যারা খুঁজে বেড়ায় তারাই আত্মাসমৃদ্ধ মানুষ। সংসার শব্দটার অর্থও নতুন করে তার কাছে স্পষ্ট হলো। শাফিন তাহিয়ার নিখুঁত শরীরটার সব মধু আস্বাদনের পর তার কাছ থেকে দূরে থাকতেই পছন্দ করে। আবির ছিল ঠিক তার উল্টোটা। শরীরের চাহিদা মিটে গেলেই বরং আবির নিবিড় মায়ায় তার হাতটা জড়িয়ে ধরত। এক মগ কফি বানিয়ে আকাশের চাঁদ দেখতে চাইতো।
দিন দিন শাফিনের সাথে শারীরিক সম্পর্কের সময়ও তাহিয়া অনুভূতিহীন হয়ে গেল। চোখের সামনে আবিরের মায়াবি মুখটা ছাড়া আর কিছুই তার মনের মধ্যে প্রভাব ফেলে না। শরীরের শিহরন ফেলে আসা স্মৃতির কাছে বিস্মৃত হয়ে সে নিজেকে দ্রুত মুক্ত করতে পারলেই যেন বাঁচে আজকাল। একবার আত্মাসমৃদ্ধ একজন মানুষের সাথে বাস করলে সত্তাহীন মানুষ যে কত বিরক্তিকর – তাহিয়া তা হাড়ে হাড়ে টের পায়। এমন জীবনের চেয়ে করোনায় আক্রান্ত হয়েও মৃত্যুর আগে একবার আবিরের দেখা পাওয়াটুকুকেই এখন তাহিয়ার অনেক বড় কিছু মনে হয়। শাফিনের থেকে সে আলাদা হয়ে প্রায় ষাট কিমি দূরের একটা বাসায় উঠেছে। এরই মাঝে সব দ্বিধা-দ্বন্দ্ব ঝেড়ে তাহিয়া একদিন ফোন করে খুব কান্না করে শুধু বলল,
এতদিন পর বুঝতে শিখেছি, তোমাকে ছেড়ে এসে আমি জীবন থেকে সব হারিয়েছি। এর চেয়ে তোমার সাথে মরে যাওয়াটাও ভালো ছিল। আমাকে ক্ষমা করো, আবির। এয়ারলাইন্সগুলো খুলে দিলে আমি তোমার কাছেই ফিরে আসব।
আবিরের চোখ ভিজে উঠলেও একটাও কথা না বলে সে ফোনটা রেখে দিল।

সেই ছিল তাদের সাথে শেষ কথা। তারপর অনেকবার আবিরের মোবাইল নাম্বার, মেসেঞ্জার, হোয়াটসঅ্যাপ, ভাইবার সবখানে ফোন করে কোনোভাবেই আবিরকে সে আর পায়নি। যে দু-একজন বন্ধু-বান্ধবকে আবিরের সাথে যোগাযোগের জন্য অনুরোধ করল, তারাও তা দুঃসাধ্য বলে জানাল। তাহিয়ার অস্থিরতা বাড়তে থাকল। উদ্বিগ্নতায় সে মাঝে মাঝে দুই একটা হৃৎস্পন্দন হারাতে থাকল। এভাবেই কাটল মাসের পর মাস। গড়াল বছর। এরই মাঝে অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশ আমেরিকার সাথে যৌথ সামরিক মহড়া শেষ করেছে। চীনকে যে কোনো সময় তারা আক্রমণ করতে পারে।
সিডনিতে এ নিয়ে ভীষণ উত্তেজনা এবং সমালোচনা। এসব নিয়ে তাহিয়ার খুব একটা মাথা ব্যথা নেই। সে শাফিনকে দুই বছর আগেই ডিভোর্স দিয়ে আবিরকে খোঁজার সব প্রচেষ্টার পর মানসিকভাবে বিধ্বস্ত। আঁধারকে সে এখন ভয় পায়। ভয় পায় প্রিয় বিড়ালের ডাক। স্বপ্নঘোরে মাঝেই মাঝেই আবিরের হাত ধরে ঝরনার ছন্দে মুখরিত সবুজ পাহাড়ের উপর দৌড়ে বেড়ায়। ঘুম থেকে চমকে থমকে কতক্ষণ সে চুপ করে সময়ের চলে যাওয়ার স্পন্দনে নিজের হৃৎস্পন্দনকে মিলিয়ে কতক্ষণ অনড় বসে থাকে সে জানে না। একদিন পৃথিবীর জন্য এলো এক আলো ঝলমলে দিন। ২০২৪ সালে বিমানবন্দরগুলো খুলে দেওয়া হলো। কালবিলম্ব না করে তাহিয়া দেশে ফেরার জন্য বিমানের টিকেট কাটল। ২২ জানুয়ারি ২০২৪-এর এক বিকেলে তার বিমান ঢাকা এয়ারপোর্টে ল্যান্ড করল। দেশে ফিরে কোথাও না গিয়ে লেকের ধারে তার আর আবিরের স্মৃতি বিজরিত ফ্ল্যাটে গিয়ে উঠল।

পুরো ফ্ল্যাট ধুলোর আস্তরণে ডুবে আছে। তাহিয়া প্রবেশ করামাত্র কিছু ইঁদুর দৌড়াদৌড়ি শুরু করল। আর কোনো দিকে না তাকিয়ে তাহিয়া দৌড়ে খালের ধারে তার ঘরটায় ঢুকল। ঘরে প্রবেশের সময় সে বাসর রাতে যে ঘ্রাণে আচ্ছন্ন হয়ে ছিল, অবাক হয়ে অনুভব করল – সেই ঘ্রাণ আজো এই ঘরে তার জন্য এতদিন অপেক্ষা করেছে! এতদিন পর সেই ঘ্রাণে আবার সেই রাতের প্রতিটি প্রহরকে তাহিয়া যেন আলিঙ্গন করল।
একটা খোলা চিঠি খাটের পাশে টি টেবিলের উপর পড়ে আছে। তাহিয়া স্থির চোখে পাতাগুলোর দিকে কতক্ষণ তাকিয়ে থাকল। যেন সে জানত, ওখানেই একটা চিঠি তার পড়ার অপেক্ষায় আছে অনেকদিন। বিছানা না ঝেড়েই তাহিয়া বসে পড়ল। খুলে যেতে থাকল পাতার পর পাতা –

৩.

তাহিয়া,

তুমি কনডমের জন্য দুষ্টুমি করে আফ্রিকায় যেতে বলেছিলে। আমি জানি, মানুষের আর কোথাও যাওয়ার নেই। সে যেখানে এসেছিল সেই গন্তব্যকে শনাক্ত করতে পারেনি। গন্তব্যকে শনাক্ত করতে না শিখলেই মানুষ থামতে শিখে না। আমি সেই কনডমের স্তূপে নগ্ন মানবের স্তূপ দেখি। এত জনসংখ্যার ভিড়ে মানুষ এত বেশি প্রতিযোগী প্রায় হয়ে উঠবে যে, তারা প্রতিযোগিতাতেই সফল হওয়ায় জীবনের মানে খুঁজবে। মানুষ আত্মা হারিয়ে সেই সফলতাকে উদযাপনের জন্য হয়ে উঠবে পেটুক, কামুক, স্বার্থপর, বিশ্বাসঘাতক। তারা সত্য-মিথ্যার পার্থক্য ভুলে, সস্তাকে সবচেয়ে দামি আর দামি জিনিসটাকে অবমূল্যায়ন করতে শিখবে।
একে অন্যের উপর আধিপত্য বিস্তার করতে গিয়ে মানব প্রজাপতি ধ্বংসের যত কলাকৌশল শিখেছে, নিজেদেরকে মর্যাদাবান করতে তার আত্মা-শরীরকে রক্ষার ন্যূনতম যত্নবান হয়নি। আমি জেনে গিয়েছি আমার গন্তব্য। এই প্রেমহীন মনুষ্য-সমাজে বেঁচে থাকার আর খুব প্রয়োজন বোধ করি না।

২০ ফেব্রুয়ারি ২০২২

সর্বনাশা কোভিড-১৯ এর ভ্যাকসিন আবিষ্কার হয়েছে। আমাদের দেশে কবে এসে তা পৌঁছাবে জানিনা। দুই দুইবার মৃত্যুর দুয়ার থেকে ফিরে এসে মৃত্যুকেই আপন ভাবতে আর কষ্ট হয় না। আমি আসলে বাঁচতে চাইনি। কিন্তু শ্বাসযন্ত্র তো আমার চেয়ে ফুসফুসের বড় বন্ধু। ঢাকা শহর ছেড়ে বাবা-মা’র কাছে চলে গিয়েছিলাম। ছোটবেলা থেকে তাদের সাথে থাকার সুযোগ জীবনে পাইনি। ভেবেছিলাম, বাকি জীবনটা আমার প্রাণের ফুসফুস বাবা-মায়ের সাথেই কাটাব।
কিন্তু আমরা মনে হয়, শেষ মুহূর্তে আকুল হয়ে কিছুকে আঁকড়ে ধরার চেষ্টা করি যে মুহূর্ত ভাসতে থাকে একটা খড়কুটার মতো! আমার বয়ে নিয়ে যাওয়া জীবানু নিয়েই তারা আক্রান্ত হলেন! তবু, একটুও অভিযোগ করলেন না। বরং আমি পাশে আছি – তা তাদের মৃত্যুর চেয়ে অনেক সহজ একটা ব্যাপার। করোনা ফুসফুসের ব্রঙ্ক অ্যালভিয়েলিতে পৌঁছার আগেই হয়তো আমার শ্বাসতন্ত্র পুরো শরীরের কাছে কান্না করে সাহায্য চাইল।
হায়, মানুষ যত না মৃত্যুকে আলিঙ্গন করে দেহগত কারণে, তার চেয়েও বেশি তারা জীবনের কাছে হেরে যায় অনুভবের পরাজয়ের কারণে। এই অনুভবকে বাঁচাতে মানুষের সংগ্রাম শূন্য হলেই হয়তো আমাদের বিলুপ্তি নিশ্চিত হবে। মাকে আমার নিশ্বাসটুকু যতই দিতে চেয়েছি ততই আমি নতুন করে জেগে উঠেছি। অসুস্থ শরীর নিয়েও পাশের ঘরে মায়ের সেবা করতে দ্বিধা করিনি। শরীরকে বিসর্জন দেওয়ার জন্য আমি নিজেকে অবারিত করতে গিয়ে প্রাণকেই পেয়েছি কৈশোরের আত্মা সমেত। একদিনের ব্যবধানে বাবা-মা আমার কোলে মাথা রেখে পৃথিবী থেকে বিদায় নিয়েছেন। নিশ্বাস বন্ধের ক্ষণেও স্রষ্টার কাছে তারা অশ্রুসজল হয়ে তাদের আয়ুর বিনিময়ে আমার আরো আরো চেয়ে প্রার্থনা করলেন।
আমি এখন সেই এতিম কিশোর যে টাইম মেশিনের চাকায় তীব্র গতিসম্পন্ন রঙিন এক বিশ্বকে দেখে আসার পর থমকে থাকা, সাদা-কালো সময়ের জগতকে অবাক হয়ে তাকিয়ে দেখি।

২২ নভেম্বর ২০২৩

বাবা-মা’কে হারিয়ে রাজধানীকে চির বিদায় জানিয়েছি। সেখানে আসলে আমার কেউ নেই। ফ্ল্যাটটাতে তালা ঝুলিয়ে দিয়েছি। তাহিয়ার নামে লিখে দেওয়া ফ্ল্যাটটা যদি কখনো সে বিক্রি করতে আসে! ফ্ল্যাটের দলিলটুকু কোথায় লুকিয়ে রেখেছি – তাও জানিয়েছি। তাকে আর কিছু জানানোর প্রয়োজন নেই। এখন আমি দায়মুক্ত।
আমাদের গ্রামে প্রবেশের আগে মাঠের শেষে পথের বাঁকে যে বটগাছ, সেখানে ক্ষণিক থেমেছিলাম। কত পথিক এখানে থেমেছে ভেবে গাছটার মাথার দিকে তাকালাম। বটফলের রঙের মতো একটা টুকটুকে পাখি লেজ নাচিয়ে নাচিয়ে এ-ডাল, সে-ডাল করছে। ক্যাডেট কলেজ ছুটি হলে যখন বাড়ি ফিরতাম, বাবা এই বটতলার এখানে এসে দাঁড়িয়ে থাকতেন। তার হাতে থাকত একটা টর্চ। সন্ধ্যা হয়ে যেত বাসায় ফিরতে ফিরতে। সাঁঝের ঘুণপোকা ডেকে যেত। অনাদিকাল ধরে সেই ঘুণপোকার ডেকে যাওয়ার ডাক আজো আছে – শুধু বাবা আমার জন্য দাঁড়িয়ে নেই। বাবার সেই দাঁড়িয়ে থাকার চেয়ে মহান কোনো দৃশ্যকল্প আমার কাছে আর নেই। মাঠে কৃষক নেই। নেই বাতাসের তান কেটে দেওয়া শ্যালো মেশিনের ছন্দ। আছে, ঘুটঘুটে অন্ধকারে নিরাকার সব আমার শৈশব-কৈশোরের স্মৃতি। কত কত বসন্তের আনন্দাকুল বাতাস গায়ে মেখে হেঁটে গেছি এই পথ।
এখন আমি বুঝতে শিখেছি, একটা সবুজ পাতায় চিকচিক খেলা করা ভোরের আলো অথবা পুকুরের পদ্ম পাতায়, বসন্তের বুনো কুল গাছটার এক একটা ফলে থেমে থাকা সময় আমার সাথে যে-কথা বলে, তা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। নিজেকে ফিরে পেয়ে নিজের সাথে কথা বলার অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছিল টাইম মেশিনের সামনে যাওয়া সেই দূরন্ত পৃথিবীর মানুষগুলো। সময়ের কৃপায় যারা বেঁচে আছে, তারা নিশ্চয়ই উপলব্ধি করবে, মানুষের বাইরের দুনিয়া যত রঙিন হতে থাকে, তার ভিতরটুকু ততই আবর্জনা ঢেকে রাখার কৌশল রপ্ত করতে শেখে। মিথ্যাকে সত্যের সাথে মেশানোর শিল্পকে মর্যাদা করতে গিয়ে সাদামাটা জীবনকে অমর্যাদার পাপে লিপ্ত হয়। জীবন যত সাদা-কালো চেতনা আর স্বপ্ন তত রঙিন। দখল যত কম হয় মানুষের আকাশটা ততই বড় হয়ে যায়।
কিন্তু এই শহরতলীর মানুষগুলো কোথায় গেছে? কেউ কি এখনো বেঁচে আছে? তারা ভাগ্যবান। কারণ তারা একে অন্যের সাথে প্রতিযোগিতা করার চেয়ে তাদের একটু সঙ্গ পাওয়াকে, কারো মুখের স্নিগ্ধ হাসিকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ মনে করবে। বিপদে তারা আবার মানুষের পাশে প্রদীপের মতো নিজেকে জ্বালিয়ে রাখবে। এই দৃশ্যকল্প ভেবে আমার চলে যাওয়ার ক্ষণটুকু অনেক মোহনীয় হয়ে ওঠে। হায়, মৃত্যু! তোমাকে ভালোবাসতে গেলেই মানুষকে পাশে পাওয়ার কত আকুতি কাজ করে। ভালোবাসার মানুষের উপস্থিতি ছাড়া এই জগতটুকু কত মিথ্যা – তা তো অন্তত জানা হলো!
কোনো দিন, কোনো এক দিন যদি তুমি জানতে পারো, কত ভালোবেসেছিলাম তোমায়, তাহলেই বুঝবে পৃথিবী ছেড়ে চলে যাওয়ার এই সময় মুহূর্তে আমার কোনো দুঃখ নেই। যদি মনে হয়, তোমার পাশে কী যেন নেই – তাহলেই এই পৃথিবীতে আমার প্রাণ উন্মেষটুকু সার্থক হবে। কেন না, আমি জেনেছি এই উদার-অবারিত প্রকৃতি আমাকে একটা উৎকৃষ্ট হৃদয় দান করেছিল বলে আমি চোখের জলে তার অতলে ডুব দেওয়ার সক্ষমতা অর্জন করেছিলাম। এই জীবনের অর্থটুকু এভাবে কয়জনই বা বুঝতে পারে! আজ আমার অনেক বিখ্যাত মানুষের কথা মনে পড়ছে না, শুধু একজনকে যাকে মনপ্রাণ উজার করে ভালোবাসা যায়। সে কি তুমি? আমার স্বপ্ন উন্মেষের কাল থেকে যে নারী আমার ভিতর থেকে তার মায়াবী চোখ মেলে উঁকি দেয়? সে আসলে কে, তাকে জানা হলো না। জানো, তার উড়ে চলার ডানা আছে! আমার জন্য যদি কোনোদিন তোমার মন কেমন করে, নিশ্চিত জেনো – সেদিন তোমার সেই ডানায় পালক গজাবে। তোমার দুই পাখা আমার কাছে আনতে তোমাকে উড়িয়ে নেওয়ার শক্তি অর্জন করবে। ভালোবাসা এমনই –সে মানুষকে উড়াতে শেখায়।
তুমিই কি আমার ভিতরে বাস করা সেই নারী? আজকাল তোমাকে স্বপ্নে দেখি বটে। কিন্তু কী অদ্ভুতভাবে তাকে ‘তাহিয়া’ ডাকলেই সে নিজেকেই চিনতে পারে না। আবার নিজ থেকে সে তার নামটাও বলে না। তোমার থুতনির নিচে তো মা’র মতো ছোট্ট লালচে তিলটা ছিল না! তাহলে? তার চোখের গভীর মায়াময় চাউনিটা ভেসে উঠলেই আমার অস্থির লাগে।

২৪ নভেম্বর ২০২৩

মনে পড়ছে – আমার ছোট্টবেলার এক বন্ধুকে। ক্যাডেট কলেজে সপ্তম শ্রেণিতে সবে ভর্তি হয়েছি। আমি এক গরিব কৃষকের সন্তান ছিলাম বলে যে বন্ধু আমাকে অন্য সব সহপাঠীর মতো আমার দিকে নিচু চোখে তাকায়নি। পঞ্চম শ্রেণিতে স্কলারশিপ পরীক্ষায় আবির নামের যে বাচ্চাটি জেলায় প্রথম হয়েছিল, তার সাদামাটা পোশাকের ভিতর থেকে আর কেউই সেই ঔজ্জ্বল্য খুঁজতে যায়নি। তারা খুঁজেছিল তাকে তাচ্ছিল্য করার ভাষা। ছাত্রাবাসে যেদিন প্রথম এসেছিলাম সেদিন আবির নামের এক কিশোরের কোঁচকানো শার্টের ভাঁজে যত অভাব-অনটনের চিহ্ণ তা শনাক্ত করতে পারাই ছিল তাদের বড় কৃতিত্ব।
কিন্তু মারুফ নামের একজন ছিল ব্যতিক্রম। ক্লাশে মাত্র দুইদিন কাটানোর পরই আমি যখন সহপাঠীদের টিপ্পনিতে বিধ্বস্ত, রাতে লুকিয়ে লুকিয়ে কাঁদছি; যখন আমি ছাত্রাবাস ছেড়ে পালানোর পথ খুঁজছি, তেমন একদিন সে আমার পাশের সিটে এসে বসল। ক্লাশ শুরুর আগেই ইশারায় সে আমাকে বাইরে নিয়ে গেল। টয়লেটগুলো তখন ফাঁকা। টয়লেটে নিয়ে গিয়ে সে একটা কালো বেল্ট বের করল,
এটা তোমার জন্য এনেছি। কাপড়ের বেল্টটা খুলে ফেল। বলে সে নিজেই আনাড়ি আমাকে নতুন একটা বেল্ট পড়ার কৌশল শেখাতে শেখাতে এবং তা পরিয়ে দিতে দিতে বলল,
ওদের কথায় কিছু মনে করবে না। আমি জানি, একটা বছর গেলেই আমাদের ক্লাশমেটগুলো বুঝতে শিখবে, কাপড় আর বেশভূষার চেয়ে তুমি কত দামি! কাটা চামচ দিয়ে লাঞ্চ-ডিনার কীভাবে করতে হয় আজ ডাইনিংয়ে তোমাকে তা শেখাবো। দ্যাখো, বাঙালিরা তো হাত দিয়ে খেতেই অভ্যস্ত – তাই না? কাটা-চামচ দিয়ে প্রথম প্রথম সবার সমস্যা হতেই পারে। কিন্তু তারা তা বুঝতেই চাইবে না। আর তোমাকে এ নিয়ে দুঃখ তারাই বেশি দেবে যারা পরিবার থেকে নয়, এখানে এসে নতুন করে নবাবি শিখেছে।
শহরের সম্ভ্রান্ত পরিবারের আমার সহপাঠী সেই বন্ধুটি সেদিন থেকে আমাকে ছাড়া আর কিছুই বুঝত না। শ্রদ্ধাভরে তাকেই আমি জীবনে প্রথম অন্ধের মতো ভালোবাসতে শিখেছিলাম। তার কারণে আমি নিজেকে বলতে শিখেছি,
তুমি তখনই অন্যদের চেয়ে আলাদা যখন তুমি তোমার পাশের মানুষ অথবা প্রাণগুলোকে অভিন্ন চোখে দেখতে শিখবে এবং সেই প্রাণটির স্থানে নিজেকে বসিয়ে তার সব অনুভূতি, তার জীবনের ঝুঁকি-গ্লানির সংগ্রামকে উপলব্ধি করতে জানবে।
দুই বছরের মাথায় ঘটল নবম শ্রেণিতে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় অঘটন। ক্যাডেট কলেজ ছুটি হলে আমরা একসাথে বাড়ি ফিরলাম। আমার বন্ধুটির আর কখনোই ফেরা হয়নি। শহরে নেমে আমাকে গ্রামের বাস উঠিয়ে সে রিকশার দিকে এগিয়ে গেল। আমার দিকে ফিরে শেষবার হাত তুলে বিদায় জানাতে গিয়েও চলাটুকু থামাল না। একটা বাইক এসে হঠাৎ তার শরীরে ধাক্কা দিল। তার মাথাটা পড়েছিল ড্রেনের কোনায়।
তার রক্তাক্ত মাথা বুকের মধ্য নিয়ে আমি ঝাঁপসা চোখে হাসপাতাল যাচ্ছিলাম। টপটপ অশ্রুভেজা ঝাঁপসা চোখে স্রষ্টার কাছে আমার বন্ধুটির জীবন ভিক্ষা চাইছিলাম। হ্যাঁ, আমি তা চাইছিলাম আমার জীবনের বিনিময়ে হলেও। সে একবার আমার দিকে তাকাল। কী আশ্চর্য! প্রায় নিভে আসা ঝাঁপসা দৃষ্টিতে আমার দুচোখের দিকে তাকিয়ে তার মুখে স্মিত হাসি ফুটে উঠল। আলতো অস্ফুট সুরে সে বলল,
তুমি কাঁ…দ…ছ! কেঁদো না। তোমার কোলে মাথা রেখে চলে যাচ্ছি – আর কী চাই? আমাদের তো চলে যেতেই হয়, বন্ধু।
তাকে সেদিনই হারিয়েছিলাম। তার দাদা এবং বাবা তাঁর এই মৃত্যুশোকটুকু নিতে পারেননি। এত অভিজ্ঞ মানুষও ভালোবাসার কাছে নির্দ্বিধায় জীবন সঁপে দেন। আমি শিখেছিলাম, ভালোবাসাটাও একটা শিক্ষা। সবাই তা রপ্ত করতে শেখে না। সেই শিক্ষা অর্জনে মানুষকে তা রপ্ত করার পরিস্থিতির ভিতর দিয়ে যেতে হয়।

০২ ডিসেম্বর ২০২৩

আমি শিখলাম দুই হাত দিয়ে কিছু ধরার চেয়ে দাঁড়িয়ে থাকা জীবনের জন্য, প্রাণের জন্য বেশি প্রয়োজনীয়। হাতের চেয়ে পা মানুষের জন্য স্রষ্টার বড় সৃষ্টি বটে। তবে আমরা এখনো অস্তিত্বকে শনাক্তকরণে দূরদর্শী নই। ধরতে চাইলেই হাত বাড়াতে হয় না, মন চাইলেই সবকিছু আঁকড়ে ধরতে হয় না। আমরা মুখে যা বলি, যা করি তা যত না মানুষ এবং এই বিশ্বের কল্যাণে, তার চেয়েও বেশি নিজেকে মেলে ধরার, নিজেকে বড় প্রমাণ করার মনস্তত্ত্বে। একজন খেলোয়াড় যতটা মূল্যায়িত স্রষ্টার কাছ থেকে ঐশ্বরিক মেধা-স্নায়ুতন্ত্রপ্রাপ্ত একজন বিজ্ঞানী-শিল্পী ততটাই অবমূল্যায়িত। কেননা মেধাবীদের উত্তেজনাকে সুবিধাভোগীরা ব্যবহার করতে পারে না।
নতুনের আগমন আর পুরাতনদের প্রস্থান – এই চিরায়ত নিয়মের মাঝে আমাদের যে নিত্য-নৈমিত্তিকতা – তাও মাঝে মাঝে প্রকৃতি ভেঙে দেয়। মাঝপথে প্রকৃতি সব বিনাশ করে আমাদের থামতে শেখার শিল্পকে রপ্ত করতে বলে। শুরুর চেয়েও থামতে শেখাতেই বড়ত্ব। শেখায় – ত্যাগের নামই জীবন। প্রবল বেগে চলমান এই মহাবিশ্ব যেন বলছে – খড়কুটোর তুমি নিজেকে তুচ্ছ ভাবতে শিখলেই তুমি জিতে যাবে। তোমার কাছে তোমার আত্মা শনাক্ত হলেই – তুমি জয়ী হয়ে উঠবে। হবে মৃত্যুঞ্জয়ী। ভোগের নাম বিস্মৃতি। বিস্মৃতির নাম জীবন্মৃত্যু। এই ভাইরাস আমাদের শেখাতে এসেছে – প্রাণকে বিসর্জন দেওয়ার এই ত্যাগটা পড়েছে এখন আমাদের ভাগ্যে।

৩০ ডিসেম্বর ২০২৩

স্যাটালাইটগুলো ছুটলেও পৃথিবী তার সব যোগাযোগ হারিয়ে ফেলেছে। ইন্টারনেট, সামাজিক যোগাযোগের সব মাধ্যম, টেলিভিশন কেন্দ্রগুলো চালানোর মতো আর কেউ অবশিষ্ট নেই। টিঅ্যান্ডটি হয়তো সচল। কিন্তু তাহিয়া যে দেশে থাকে সে দেশে কাকে প্রশ্ন করলে তার টিঅ্যান্ডটি নাম্বারটা পাওয়া যাবে? তাহিয়ার মিষ্টি হাসি বাতাসে যেন জলের প্রতিবিম্ব হয়ে ভাসছে। চারদিকে মৃতদেহের পচা গন্ধের মাঝে এই হাসিটুকু এভাবে যখনই বাতাসেই এমন প্রতিবিম্ব তোলে তখনই আমি কেন এত এত বকুলের ঘ্রাণে আচ্ছন্ন হই? কেন মনে হয় ফুলের কাছে পাখিগুলো গোপনে বেঁচে থাকার কী সব সূত্র আউরে চলছে? তোমাকে; ঠিক তোমাকেও নয়, তবে নিশ্চয়ই তোমার তুমিকে খুঁজতে খুঁজতেই কোথায় হারিয়ে যায় আমার সকল ক্ষণ। জলের কিনারে মিলিয়ে যাওয়ার মতো আমিও হারিয়ে যাই আমারই কাছে… নীল জলে আকাশ দেখার মতো করে মুখ উঁচিয়ে বুঝতে চাই, তুমি কেমন আছ!

৫.

তাহিয়ার শরীরের বাঁকে বাঁকে আ-ছড়ে পড়ে স্মৃতির কাছে নুয়ে থাকা দূরত্বের বেদনা। বুকের মাঝে আকুল আবেগে সে পাতাগুলো জড়িয়ে ধরে ধীর পায়ে বারান্দায় এসে দাঁড়ায়। আকাশটা আগের পৃথিবীর চেয়ে অনেক ঝকঝকে নীল। একটা বিমান মানুষের সগর্ব উপস্থিতি জানিয়ে, আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীর অন্য কোন প্রান্তে। তার চেয়ে অনেক বেশি কাঁপছে তাহিয়ার ভিতর। কিন্তু সেই কম্পন আরও স্থির করে তুলছে তার দুই হাত। স্থবির করে তুলছে তার দুই পা। বাতাস ফুঁড়ে বিমানের চলে যাওয়ার মতো তার বুক চিরেচিরে কিছু একটা এ প্রান্ত থেকে অন্যপ্রান্তে চলে গেল। ভিতরের এই যন্ত্রণার যাত্রাপথ বিমানের যাত্রাপথের চেয়ে অনেক লম্বা। ভিতরের বিদীর্ণ এই কান্নার নৈঃশব্দ্য শব্দ হয়ে আছড়ে পড়ছে ফুসফুসের দুই অলিন্দে। ঝাঁপসা চোখে শ্বাস নিতে গিয়ে হাঁপিয়ে ওঠে তাহিয়ার শ্বাসতন্ত্র। বিশ্বটা তার ভারী শ্বাসতন্ত্রকে পরিস্কার করে নিলেও মানুষের জন্য তা ভারী করে তুলেছে হয়তো – আত্মাকে ফিরে পাওয়ার কৌশল হিসেবে। যতই তা ফিরছে ততই নিঃসঙ্গ অনুভবে কেমন আরো একা থাকার মন্ত্র রপ্ত করতে বলছে। স্রষ্টাও সেজন্যই কি একা!
কতক্ষণ ওভাবে গেল জানে না তাহিয়া। তার মুখে নোনতা স্বাদে অনুভূতিগুলো তখনো ঝরছিল। চিঠিটা পড়ার নেশা আবার জেগে উঠল।

০১ জানুয়ারি ২০২৪

ভেবেছিলাম নিজের সাথে কথা বলার চেয়ে আনন্দের চেয়ে আর কিছু নেই। কিন্তু দিন গড়িয়ে যেতে যেতে বুঝলাম, আমরা আসলে নিজের সাথে বলা কথাগুলোকে অন্যের মাঝে প্রবাহিত করতে চাই। অন্যের অনুভূতির অংশ হতে চাই। মানুষ অন্য আর একজন মানুষেরও অংশ হতে না পারলে, তার বেঁচে থাকার খুব বেশি কারণ আর থাকে না। মানুষ ছাড়া মানুষের ভাষা-অভিব্যক্তি অথবা কোন প্রাণধারণ-বহন করে না। অন্য প্রাণীগুলোও নাকি কারণে-অকারণে মরে যাচ্ছে। বেঁচে থাকতে আসলে যোগ্যতার চেয়ে কারণটুকুই বেশি প্রয়োজন।
আমার জানার আগ্রহ সব ফুরিয়েছে, কেননা আমি কাউকে আর কিছু জানাতে চাই না। তাহিয়া, (তোমাকে তাহিয়াই সম্বোধন করছি, কেন না স্বপ্নের সেই মেয়েটা কোনোভাবেই তার নামটা আমাকে জানানোর কারণ বোধ করেনি) তোমাকে অনেক জ্ঞান দান করতাম বলে তুমি খুব বিরক্ত হতে। অথচ তা আসলে জ্ঞানদানের জন্য নয়। আমি তোমার মাঝে তুমুল প্রবাহিত হতে চাইতাম বলেই ওমন করতাম।
আমার কিছু করার প্রয়োজন ফুরিয়ে গেছে বলেই দ্বিতীয়বারের মতো ভাইরাসটা আমার ফুসফুসে বাসা বেঁধেছে। এই শহরের মাটি দিন দিন গাছের মরা পাতা, মানুষের লাশ আর ধূলায় বিবর্ণ হলেও বিচিত্র সব ফুল-পাতায় তার প্রকৃতি স্নিগ্ধ হয়ে উঠেছে। তবু, সারা পৃথিবীতে, আকাশে-বাতাসে যেন একফোটাও অক্সিজেন নেই! জলে ডুবে মরার চেয়ে কার্বন-ডাইঅক্সাইডে ডুবে মরা বড় কষ্টের। যদি এমন হতো, আমি তলিয়ে যাচ্ছি এক অক্সিজেনের সাগরে… তলিয়ে যেতে যেতে তোমার, অথবা সেই-ই যে আমার স্বপ্নসাথীর সেই মিষ্টি হাসির শব্দ শুনতে যদি পেতাম। একটা ফুসফুসযন্ত্রকে কেন স্রষ্টা শ্বাসতন্ত্রের সাথে এভাবে জুড়ে দিলেন? আমি ফুসফুসটা টেনে যদি বাইরে আনতে পারতাম, যদি পারতাম তার সাথে শ্বাসযন্ত্রকে এই অবারিত বায়ুস্তরের মাঝে মেলে ধরতে। যদি একবার নিঃশ্বাসের অভাবে চোখের আলো নিভে যাবার আগে শেষনিশ্বাস নিতে পারতাম…

এরপর কয়েকটা ফাঁকা পাতা। সাদা পাতাগুলোতে যেন নিঃসঙ্গ বাতাস খেলা করছে। শেষ পাতায় লেখা

একটা কবিতা। সেখানে তারিখ উল্লেখ নেই।
ছোট এই শহরের সদ্য নির্মিত বিমানবন্দরে
টেকঅফ করতে গিয়ে থেমে আছে একটা বিমান।
ভুট্টা আর ধানক্ষেতে চিকচিক রোদের গায়ে
নির্জনতার ঘ্রাণ লাশের গন্ধে ব্যকুল।
সন্ধ্যা হলেই একটা তারা নেমে এসে
দেখে যায় জলের পর্দা দিয়ে বানানো
প্রেমগৃহের নিঃসঙ্গ একাকীত্বের পতপত।

শহরের মোগল গম্বুজের ছায়া পড়ে থাকে
জীবিত হাত আবরণী আর মৃত মাস্কের স্তূপে
তবু কখনো কখনো চাঁদের রূপালি আলো
চুপটি করে পড়ে যায় একটি চিঠির শিরোনাম
চুপি চুপি বলে ‘তোমাকে ভালোবাসি পৃথিবী।’

তাহিয়া পাতাগুলো বুকের মাঝে জাপটে ধরল। মাত্র একুশ দিন আগে আবির লিখেছে শেষ লেখাটা। তার থেকে মাত্র একুশ দিনের দূরত্বে হারিয়ে গেছে এক মহাকাল, তার সবচেয়ে প্রিয় পৃথিবী। শরীরের বাঁকে-বাঁকে ঢেউখেলা কান্না থামানোর চেষ্টা করতে করতে অস্ফুট স্বরে সে বলে, ‘আমি তোমার কাছ থেকে আর কোনোদিন কোথাও যাব না, আবির। সত্যি বলছি!’

কাজী রাফি

কাজী রাফি

কথাসাহিত্যিক। প্রথম উপন্যাস ‘ধূসর স্বপ্নের সাসান্দ্রা’র জন্য পেয়েছেন এইচএসবি-কালি ও কলম পুরস্কার ২০১০। অন্যান্য উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা ‘ত্রিমোহিনী’, ‘অরোরার আঙুল’, ‘রূপডাঙ্গার সন্ধানে’।